গল্প

চোট

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ১৯:৪৪

কতবার মুন্না এই ক্ষতিপূরণ অফিসের চক্কর কেটেছে সেটা বলা মুশকিল। সে বছর এপ্রিল থেকে এ বছর মে মাস, এর মধ্যে দিন দশেকের বেশি এই অফিসটাকে ভুলে বাড়িতে বসে থাকেনি সে। টাকার আশায় খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঠিকই উপস্থিত হয়েছে। মানুষে বলে, ‘ধুর মিয়া, ওই টাকার আশা ছাইড়া দাও। নতুন ফ্যাক্টরি দেখ, কত্ত কাজ আছে যেইহানে দুই পা না হইলেও চলে।’ হ্যাঁ, আছে। আবার এক পা দিয়েই যে সেলাই মেশিন চালাতে পারবে তা মুন্না নিজেও জানে। কিন্তু মেশিন চলতেই তার যে কী হয়ে যায়! মেশিন ছুঁলেই যে তার মাথার ভেতরে হাজার ভোল্টের কারেন্ট চলতে থাকে, তা সে কাকে বোঝাবে! 

মাস চারেক আগে অবশ্য কারা যেন তার এলাকায় এসেছিল, একগাদা ভালো মানুষ ছিল তারা। বাড়ি বাড়ি খুঁজে মুন্নার মতো লোকগুলোকে স্কুলের মাঠে এনে জড়ো করেছিল। মুন্নার মতো মানে, মুন্নার মতোই যারা ওই গার্মেন্টস  ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে করতে কে জানে কীভাবে ছাদ আর দেয়ালের ভাঙা টুকরোর নিচে চলে গিয়েছিল; ঘটনার আকস্মিকতায় যারা প্রথমে বুঝতেই পারেনি বেঁচে আছে কি নেই। মাঠে এক সারিতে তাদের জড়ো করে ভালো মানুষেরা হিসেব-নিকেশ করেছিল। খুঁটিয়ে দেখে ঠিক করেছিল কার কী লাগবে। মুন্না তখন বসে ছিল একটা চারকোনাচে কাঠের গাড়ির ওপরে। কয়েকটা সরু কাঠ জোড়া দিয়ে বানানো গাড়ি। কাঠগুলো কোথা থেকে যেন জোগাড় করেছিল বাড়ির কাছের মজিদ মিস্ত্রি। তারপর পেরেক দিয়ে একটার সঙ্গে আরেকটা লাগিয়ে মজিদ সেটাকে বানিয়ে ফেলেছিল একটা তক্তা, নিচে আটকে দিয়েছিল চারটা চাকা। মুন্না অবশ্য শুরুতে ওটাতে বসতে চায়নি। ওরকম জিনিসে তো বসে লুলা ফকিরেরা, যাদের দুটো পা কাটা। মুন্নার মেজাজ খারাপ হয়েছিল ওটা দেখে। তার যে আস্ত একটা পা আছে সেটা কি মজিদ দেখতে পায় না? মজিদ অবশ্য মুন্নার রাগ দেখেও কিছু মনে করেনি। বরং চিন্তিত ভঙ্গিতে বলেছিল, ‘কী করবা, মিয়া, একটা ভালা লাঠি বানাই দিতে পারতাম। কিন্তু তুমি কি একটামাত্র লাঠির উপরে শইলটা ছাড়তে পারবা? পইড়া যাবা না?’ মুন্না সত্যি পারত না, কিছু একটা ধরে দাঁড়ালেও টালমাটাল পাড়ে যেত। ওভাবে পরীক্ষা করতে গিয়ে কয়েকবার ব্যথাও পেয়েছিল পিঠে আর কোমরে। ব্যথা পেয়ে উঠে বসলেই ঘরের কোণে পড়ে থাকা মজিদের বানানো কাঠের গাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকত। পড়তে পড়তে, ব্যথা পেতে পেতে একদিন কোমরে হাত ডলতে ডলতে চিত্কার করেছিল, ‘কই রে, সোনালু, ওই গাড়িটা আগাই দে দেহি...’ বড় মেয়েটা ছুটে গিয়ে গাড়িটা ঠেলে এনেছিল। আনার সময়ে মুখে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার মতো ভু ভু করে শব্দ করেছিল। তা দেখে মুন্নার আর ওটাতে বসতে লজ্জা করেনি। সে উঠে বসার পরে বাচ্চা মেয়েটা খানিক ঠেলা দেবারও চেষ্টা করেছিল। গাড়িটা নড়েনি। মুন্না তখন সোনালুর ছোট্ট দুটো হাতের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেছিল। 

ভালো মানুষেরা এসেছিল কোনো এক অফিস থেকে। এরা এতকিছু কীভাবে করে! কে দেয় টাকা? কেন দেয়? মুন্নার মাথায় এসব প্রশ্নের কোনো জবাব আসে না। শুধু অবাক লাগে যে তার মতো মানুষের কথাও কেউ ভাবে! মনে পড়ে ভালো মানুষেরা মুন্নার শরীরের উচ্চতা মেপেছিল, ওজন লিখে নিয়েছিল। এসবের জন্য অবশ্য দুজনে মিলে ধরাধরি করে দাঁড় করিয়েছিল তাকে। আর তার সপ্তাহখানেক পরে মুন্নার বাড়িতে চলে এসেছিল চকচকে একটা ক্র্যাচ। পড়ন্ত বিকেলের রোদেও স্টিলের ক্র্যাচটা চকচক করছিল। নিজের নামে ডাকতে শুনে মুন্না ঘরের দরজা খুলে হাঁ করে সেদিকে তাকিয়ে ছিল। পা কাটা যাওয়ার পর থেকে আশপাশের মানুষজন ক্র্যাচের কথা বলেছিল বটে কিন্তু দুই-দুইটা বাচ্চার খাওয়া আর খোড়া পা নিয়ে ঘরে বসে থাকা, তার ওপরে না-আছে কোনো আয়, এই অবস্থায় হসপিটালে গিয়ে ক্র্যাচের বায়না করা যায়? মুন্না তাই মজিদের গাড়িটাতেই স্থায়ী হয়েছিল। ভাগ্য যখন তাকে লুলা দেখতে চায় তখন লুলা ফকিরই সই। কিন্তু ভালো মানুষদের দয়ায় গড়া চকচকে ক্র্যাচ দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল চব্বিশ বছর বয়সী মুন্না।

প্রথম প্রথম বগলের নিচে জিনিসটা ঠেকালেই কাতুকুতু লাগত। ‘কী মিয়া, ক্যারাচ পাইয়া তো দেখি মহাখুশি হইছ, হাসি আর থামে না!’ মজিদ মিস্ত্রি টিটকারি মেরেছিল একদিন। মুন্না তখন বিস্তৃত হেসে বলেছিল ‘কী যে কন, মজিদ ভাই, হালার ক্যারাচটা ক্যান জানি খালি কুতকুতি দেয়। স্মৃতির একটা ওড়না দিয়া ক্যারাচটারে প্যাঁচায়ে নিছি, তাও দেখি কুতকুতি গেল না।’

‘অভ্যাস হইয়া যাইব, মিয়া, একটা পা যে নাই, অভ্যাস হইয়া গেল না?’ মজিদের সান্ত্বনা মুন্নার বুকে এসে লেগেছিল। লাগার কথা ছিল পায়ে, কাটা জায়গাটা এখনো ব্যথায় টনটন করে। পা না থাকার অভ্যাস কি আর সহজে হয়! মনে মনে বলেছিল মুন্না। তারপর, এই যে স্মৃতি নাই, অভ্যাস কি হলো তার? চোখ বন্ধ করলে মনে হয় স্মৃতি আছে। আবার চোখ খুললে স্মৃতির স্মৃতিরা বুকের ওপরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। কোনো কোনোদিন মাথার মধ্যে ঘুরে ফিরে ওই এক বিল্ডিং ভাঙার দিনের স্মৃতি, রাত থেকে সকাল আর তারপর দিন আর রাতের হিসেববিহীন দীর্ঘ সময়ের নানান ছবির আনাগোনা।

আগের দিনের সকাল থেকেই ফ্যাক্টরিতে কানাঘুষা শোনা যাচ্ছিল। বড় ইঞ্জিনিয়াররা নাকি আসবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে যে বিল্ডিং আসলেই ভেঙে পড়তে পারে নাকি। এমনিতে মুন্না আর সেখানকার প্রায় সব শ্রমিকরাই জানত যে তিন তলায় সিঁড়িঘর থেকে বড় ফাটলটা শুরু হয়েছে। ফাটলটা সাদা দেয়ালের গায়ে ঝুড়ি নামা বটগাছের উন্মুক্ত শিকড়-বাকরের মতো এঁকে বেঁকে তিন তলা থেকে চার তলা, চার তলা থেকে পাঁচ তলা তারপর আরো ওপরে উঠে যাচ্ছিল প্রতিদিন। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে ক্লান্ত শ্রান্ত শ্রমিকদের চোখ বেশিরভাগই সেই ফাটলের দিকে যেত না। তাছাড়া তাদের মধ্যে কে থাকে ঝকঝকে তকতকে ঘরে যে দেয়ালে সামান্য ফাটল নিয়ে চিন্তিত হবে! তবে কেউ কেউ ছিল, যারা ভয় পেত, অন্যদের মধ্যেও ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। যেমন চারতলার বয়লারে কাজ করত মান্নান। সকালে কাজ শুরুর আগে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে যদি কখনো দেখা হয়ে যেত, কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলত, ‘মাতার উপরে ছাদ ভাইঙা পড়লে কুনদিক দিয়া দৌড় দিবা কিছু ঠিক কইরা রাখছ, মিয়া?’ মুন্না হাসত, ‘ছাদ ভাইঙা পড়লে আর দৌড়ানির কী, মান্নান ভাই? ওইখানেই তো ফিনিশ।’ মান্নান রেগে যেত, ‘অ্যামনে অ্যামনেই ফিনিশ, কী কও, মিয়া?’ মান্নান সিঁড়িতে ওঠা একদল শ্রমিকের দিকে তাকাত। কারো কোনো বিকার নেই। দুমদাম শব্দে যে যার কাজের টেবিল কি ঘরটার দিকে ছুটছে। হতাশ হলেও কখনো কাছের দু-চারজনকে বলার চেষ্টা করত, ‘এইরাম তো চলে না, আমাগো উচিত স্যারদের সঙ্গে কথা কওয়া।’ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেশিনের সঙ্গে মেশিনের মতো কাজ করা মানুষগুলোর মান্নানের কথায় কান দেওয়ার সময় থাকত না। কিন্তু সেখানকার হাজার পাঁচেক মানুষের মধ্যে মান্নানের মতো কিছু মানুষ ছিল, যারা বারবার কাউকে না কাউকে বিল্ডিং ভেঙে পড়ার ভয় দেখিয়ে যাচ্ছিল। এ নিয়ে বড় স্যারেরা এসে কিছু বক্তৃতাও দিয়েছিল। তাদের কথার অর্থ ছিল, ফাটল সম্পর্কে শ্রমিকদের অভিযোগ খুঁটিয়ে দেখা হবে। সেই বক্তৃতা শুনতে শুনতে মুন্না বুঝতে পেরেছিল যে মান্নান বা তার মতো ভয় পাওয়া মানুষগুলোর কথার খানিক মূল্য থাকলে থাকতেও পারে। স্মৃতিও ছিল মান্নানের দলে। বাড়িতে ফেরার পথে ওই একই প্যানপ্যানানি চালু রাখত, ‘দেইখো, এই বিল্ডিং আমগো মাতার উপরে ভাইঙা পড়বে। হক্কলে বলতেছে।’ এই কথাটা বরাবর মুন্নাকে বিপন্ন করত। সে না-পারবে চাকরি ছাড়তে না-পারবে অন্য অনেক শ্রমিকের মতো ফাটল নিয়ে চেঁচামেচি করতে। সকাল বিকেল নির্বিঘ্নে কাজ করে মাস শেষে পয়সাটা গুনে নেওয়া ছাড়া তার অন্য কোনো কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে ভালো লাগত না। কখনো মিনমিন করে স্মৃতিকে সে বলেওছিল, ‘তুমি যে অগো সাতে মিল্যা ফাটল নিয়া এত চেঁচামেচি করতেছ, চাকরিডা গ্যালে কী করবা? দুই দুইটা ছুডো মাইয়া বাড়িত নিয়া রাখছ, সেইডা খেয়াল থাকে না?’

‘এই চাকরি গ্যালে বহুত চাকরি পাওয়া যাবে। এই দ্যাশে গার্মেন্টের অভাব?’ ঠোঁট উলটে জবাব দিত স্মৃতি।

‘আরে গাধা মাইয়া, সাতে সাতে পাইবা নাকি চাকরি? আর নতুন জায়গায় এত বেতন পাইবা? বোনাস পাইবা? ওই দিকে মাইয়া দুইটা...’

‘খালি দুইটা, মাইয়া দুইটা! ওই মাইয়া দুইটাই কি তোমার দুই চোখের বিষ হইছে?’

মেয়েদের নিয়ে এভাবে বললে মুন্নার খারাপ লাগত। নিজের বাচ্চা না বলে সে কি তাদের আদর-যত্ন কম করত? তাছাড়া স্মৃতিই তার সবকিছু। স্মৃতি ছাড়া একটা দিনও সে নিজেকে কল্পনা করতে পারত না। তাই স্মৃতি যে বাচ্চাদের এত আদর করে বড় করছে তারা তার চোখের বিষ হবে কেন! এই কথা স্মৃতিকে বহুবার বলা হয়েছে। মনে মনে মুন্না জানে যে ওই বাচ্চাদের বড় করার জন্যই তার আর স্মৃতির চাকরি থাকা উচিত, আয়ও বাড়া উচিত। এই কথা মুন্নার মাথায় আসে বাচ্চাদের সে ভালোবাসে বলেই। তাছাড়া ওই যে স্মৃতি কথায় কথায় বলত অন্যের বাচ্চা, সে কথা কি মুন্না ভুলেও কোনোদিন ভেবেছে? স্মৃতি অন্যের বাচ্চা মানুষ করতে চায়, করুক না! তার দয়ার শরীর। মুন্নারও তাতে হাত বাড়াতে অসুবিধা নেই। স্মৃতির সঙ্গে পরিচয় হবার পরে সে অবশ্য প্রথমে ভয়ে ভয়ে তাকে প্রস্তাবটা করেছিল। বাচ্চাগুলোকে নিজের কাছে না রেখে করতইবা কী বেচারা। বাচ্চাদের মা ছিল রুবি, স্মৃতির বান্ধবী। স্মৃতি আর রুবি ছিল দুই শরীর এক আত্মা। রুবি মরে গেলে তার বাচ্চা তো স্মৃতিকেই দেখতে হবে, মুন্না তা বুঝত। আগে যে গার্মেন্টসে স্মৃতি চাকরি করত সেখানে একদিন লাগল আগুন। শ্রমিকরা বারবার পেচ্ছাব করা আর পানি খাওয়ার ওছিলায় যেন কাজ ফেলে বাইরে বের হতে না পারে তাই ফ্লোরের দরজা সুপারভাইজাররা বন্ধ করে রাখত। একেক চেয়ারে বসে সাত-আট ঘণ্টা একেকজন কাজ করত, পানির জন্য হাত বাড়ালেই ধমক। তাতে করে দুটো কলার কম বানানো হতো, তিনটা পকেট লাগানো হতো কম।  কী আর করা, শ্রমিকদের কেউ কেউ দাঁড়িয়ে কাজ করত। আট-নয় ঘণ্টা কেবল দাঁড়িয়েই কাপড় কাটত কেউ। বসা যাবে না, সরা যাবে না। কাজ শেষের দিনক্ষণ আগে থেকে ঠিক করা আছে, সুপারভাইজারের নজর আছে, তার ওপরে তদারকি আছে ম্যানেজারের, তার পেছনে আছে মালিক। মালিক তারিখ নিয়ে রেখেছেন, সেদিন কাজ শেষ না হলে তার ক্ষতি আর সবার চাকরি শেষ। আগুন লাগার দিনে স্মৃতি ছিল দোতলায়। কিন্তু আগুন লাগল যেখানে, সেখানে আটকা পড়ল রুবি। রুবি আর স্মৃতি একসঙ্গে থাকত। একসঙ্গে রাঁধত, খেত। ফ্যাক্টরিতে আসা-যাওয়া করত একসঙ্গে। ফ্লোরে আগুন লাগলে সেই রুবি বন্ধ দরাজায় ধাক্কা দিতে দিতে ধোঁয়া গিলে অজ্ঞান হয়ে গেল। তারপর বন্ধ দরজার পাশে পড়ে থেকে আগুনে পুড়ে মরল। ফ্লোরের জানালা ভেঙে কেউ লাফ দিল, কেউ স্মৃতির মতোই অজ্ঞান হয়ে পড়ে থেকে আগুনের স্পর্শের অপেক্ষায় থাকল, আর কেউ দিগিবদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে এদিক ওদিক দৌড়াতে লাগল, বেরোবার একটা পথের জন্য হাহাকার চিত্কার করতে লাগল। স্মৃতির মতো পড়ে থাকা শরীরের দিকে কারো নজর গেল না। কাপড় আর কাগজের প্যাকেটে ভর করে আগুন হেঁটে এসে তাদের আলিঙ্গন করল। তখন তার কচি বাচ্চাদুটোকে কি স্মৃতি ফেলে দেবে? সে তো জানতই যে বছরখানেক আগে বাচ্চাদুটো গছিয়ে দিয়ে রুবির স্বামী আরেকজনকে বিয়ে করে কে জানে কোথায় চলে গেছে। এখন সেই বাচ্চা মুন্নাই বা ফেলে দেয় কী করে। মুন্না তাই নিজের বাচ্চার মতো করেই তাদের মানুষ করতে থাকল। লোকে নানান কথা বলেছিল বটে, ‘একে তো বিয়া নাই, তায় আবার দুই বাচ্চার বাপ। ভালোই হইছে, সবকিছু রেডিমেড পাইছ। গার্মেন্টের কাপড়ের লাগান।’ মুন্না এসব কথা শুনে মন খারাপ করলে স্মৃতি মুখ ঝামটা দিয়ে বলত, ‘কী হয় বিয়া কইরা? বাপে দিছিল না বিয়া? তারপর আরেট্টু হইলে তো আমারে বেইচাই দিতাছিল ব্যাডা। ভাগ্যিস পালাইয়া বাঁচছি আর ওই রুবির কাছে আইসা উঠছি। রুবিই আমারে বাঁচাইছে, গার্মেন্ট চিনাইছে, জীবন দিছে। তার বাচ্চারে অহন আমার জীবন দিতে হইব।’ বলে নিয়ে মুন্নার কাছ থেকে সরে গিয়ে বাচ্চাগুলোর মধ্যে যেটাকে কাছে পায় জড়িয়ে ধরত। বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বলত, ‘তোর মা আগেই অজ্ঞান আছিল রে। শইলডা আগুনে পোড়ার কষ্ট পায় নাই। আহা, তার চামড়াগুলা, তার হাড্ডি-মাংস সব পুইড়া ছারখার, চিনতেও পারে নাই কেউ। আহহা রে..’

স্মৃতির হাহাকারে মুন্নার তখন নিজের কথার জন্য খারাপ লাগত। এমনিতে কথা সত্য। মুন্না জানত স্মৃতি কী বোঝাতে এসব বলে। বাবা-মা মিলে তাকে ভাসিয়েই দিয়েছিল। ষোলো বছর বয়সী মেয়েটাকে এমন কারো হাতে তুলে দিয়েছিল যে তাকে পতিতালয়ের দরজায় পৌঁছে দিতে দ্বিধা করেনি। এই গার্মেন্টসের কাজ, রুবির দেওয়া জীবন তাই স্মৃতির জন্য নতুন জীবন। আর এইসব কারণে স্মৃতি এখন পুরো দুনিয়াটাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর শক্তি রাখে। মুখের ওপর বলে দিতে পারে, ‘বিয়ার দরকার নাই আমার। থাকলে থাকো, না থাকলে যাও গিয়া।’ মুন্না যায়নি। স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে ছিল যেদিন থেকে এই গার্মেন্টসে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে সেদিন থেকেই। মুন্না জানত, এই সমাজ মেয়েটার দিকেই আঙুল ওঠায়, বিয়ে করা বউকে পতিতালয়ে ঠেলে দিলে সমাজের মাথাব্যথা নেই, কিন্তু বিয়ে না করে অন্যের সঙ্গে থাকলে সমাজের মাথায় আগুন ধরে যায়। স্মৃতি যেহেতু কারো ওঠানো আঙুল দেখতে পায় না, আর দেখতে পেলে আঙুল মটকে ভেঙে দিতে পারে, তাই মুন্নার আর কী? তাকে বড়জোর মাঝেমধ্যে শুনতে হতো, ‘কী মিয়া, খুব ফুর্তি, না? হুদামিছা বিয়া আর সংসারের মইদ্দে আছ!’ এই সমস্ত কথার উত্তর দেওয়ার মতো মানসিকতা মুন্নার কখনো হয়নি। তাই না-শোনার ভান করে পাশ কটিয়ে যেত। মনেপ্রাণে সে স্মৃতিকে ভালোবাসত, তার সঙ্গে টিনের ঘরটাতে থাকতে থাকতে বিয়ে না-হবার কথা তার মনে থাকত না, এমনকি রুবির দুটো বাচ্চা যে তাদের বাচ্চা না, বাচ্চাগুলোকে মাঝেমধ্যে গোসল করানো কি খাওয়ানোর সময়ে তা মনেও থাকত না। আসলে স্মৃতি যাতে খুশি হতো, মুন্নার ছিল তাতেই আনন্দ।

কিন্তু ছাদ ভেঙে পড়ার আগের দিনে স্মৃতির কাণ্ডটা মুন্নার একদম পছন্দ হয়নি। মুন্না তাকে হাজারবার মনে করিয়ে দিয়েছিল মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো কথা মানুষজনের সামনে যেন বলাবলি না করে। চাকরি না থাকলে সংসারে কী ঝামেলা হয়ে যাবে, মনে করিয়ে দিতে ভেলেনি কখনো। অথচ সেদিন স্মৃতি শেষ পর্যন্ত করলটা কী!

ইঞ্জিনিয়ারের দল যখন বিল্ডিংয়ের ফাটল পরীক্ষা করে বলে দিল যে বিল্ডিং থেকে সবাইকে বের হয়ে যেতে হবে, এখনই কাজ বন্ধ করতে হবে, তখন একে একে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকল। দিনের শুরুতে মানুষগুলোর হাতের আর পায়ের নিচের মেশিন যখন তুমুল বেগে ছুটছে তখন এল খবরটা। অ্যালার্ম বাজিয়ে সবাইকে বের করে দিয়ে গার্মেন্টসে ছুটি ঘোষণা হয়ে গেল। যার যার টিফিন বাক্স নিয়ে একযোগে শ্রমিকেরা নামতে লাগল সিঁড়ি ধরে। ছুটি না-চাইতেই ছুটি, এ কেমন কথা? ভারি মজার ব্যাপার! কার বহুদিন ধরে কোথায় যাওয়ার ছিল, কে কোথায় সারাদিন কাটাতে পারবে, এই সমস্ত কথা বলাবলি করতে করতে তারা সিঁড়ি ধরে নেমে আসছিল। নামতে নামতে যেই গেটে উপস্থিত, মুন্নার চোখ ছানাবড়া; দেখে স্মৃতি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এক সাংবাদিকের কাছে একটানা নানান কথা বলে চলেছে, ‘এই ফাডা তো আজকের না। বিল্ডিং ভাইঙা পড়তে পারে এইটা আমরা হক্কলে জানি। মালিকেরাও জানে। কাজ না করলে আমাদের চাকরি থাকব না, তাই আমরা কাজে আসি। কিন্তু ফাডার ব্যাপারে তারা অ্যাদ্দিন কোনো ব্যবস্থা নেয় নাই। আসল কথা হইল, বিল্ডিং ভাইঙা আমরা মরলে তাদের কী? তাদের দরকার সময়মতো কাজ শেষ করা। এখন আইজকা কী মনে কইরা কাজ বন্ধ করছে সেইটা কইতে পারতেছি না।’ ছোটখাটোমতো সাংবাদিকের পিছনে দাঁড়িয়ে মুন্না নিজের ঠোঁটের ওপরে আঙুল রেখে স্মৃতিকে চুপ করতে বলছিল। খেলা দেখানো বাঁদরের মতো মুন্নার হাত-পা নাড়ানো দেখে পিছন থেকে ক্যামেরাম্যান তাকে দিয়েছিল এক ধাক্কা।

‘আমি সত্য কথা কইলে তুমার সমস্যা কী কও তো?’ স্মৃতি খেঁকিয়ে উঠেছিল ক্যামেরা বন্ধ হবার পরে। 

‘ওই, আইজ না-হয় ছুটি হইছে, কাইল কি গার্মেন্ট খুলব না? তুমি আবার কাজে আইবা না? টিভির মইদ্দে এইগুলা দ্যাখলে ম্যানেজার তোমারে রাখব?’

‘তুমারে কইছি না আরো অনেক গার্মেন্ট আছে? আর শোনো, এইবার গার্মেন্ট খুললে আমরা কয়েকজন মিল্যা দল করব। যার খুশি আমাদের দলে যোগ দিবে, যার খুশি দিবে না, মালিকের তাবেদারি করবে। আমরা মালিকের সঙ্গে আমাদের সমস্যা নিয়া কথা বলব।’

‘বলো কী তুমি, স্মৃতি!’

‘ঠিকই বলি। টেরেড ইউনিয়নের নাম শুনছ তুমি?’

স্মৃতির কথা শুনে বুকটা কেঁপে উঠেছিল মুন্নার। যার খুশি যোগ দিবে যার খুশি দিবে না, এই কথাটা যে মুন্নাকে উদ্দেশ্য করেই স্মৃতি বলেছে তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু খামোখা রাগারাগি করার ইচ্ছা মুন্না সে সময়ে বোধ করেনি। বরং মনে হচ্ছিল বাড়ি গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নেবে। আকস্মিক ছুটির সংবাদে শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি ভর করেছিল, মনে হচ্ছিল বহুকাল আরাম করে ঘুমানো হয়নি। ঘুম ঘুম ভাবটা ধরে রাখতে স্মৃতির সঙ্গে ঝগড়া করার আগ্রহ পায়নি মুন্না। মুখ বন্ধ রেখে তাই বাড়ির দিকে পা চালিয়েছিল। জনমানুষের স্রোতে হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পেয়েছিল, গার্মেন্টসে নাকি অনির্দিষ্ট কালের জন্য ছুটি দেওয়া হয়ে গেছে। আপাতত মালিকেরা না-ডাকা পর্যন্ত আর আসতে হবে না। শুনে মুন্নার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছিল, দারুণ মজার ব্যাপার তো, কাজ করতে হবে না, আসতেও হবে না, কিন্তু মাস শেষে বেসিক বেতনটা ঠিকই গুনে নেবে! ঘুমঘুম ভাবটা আরো জাঁকিয়ে এসেছিল তখন। স্মৃতি বলছিল, ‘হইল তো? বাড়ি গিয়া ঘুমায়ে থাকো।’

‘আইজ ঘুমাবো। কাইল তুমারে নিয়া ঢাকা শহরে বেড়াইতে যাব, বুঝলা?’

‘এহ, শখ কত! মাইয়াগুলা কার কাছে থাকবে?’

‘ক্যান, রাহেলা যে দিনের বেলায় তাদের রাখে, কইলে কি একদিন রাইতেও রাখতে পারবে না? কয়টা টাকা বেশি দিয়া দিও তারে। আমার লগে একা একা এট্টু ঘুরতে মন চায় না তোমার? এই ধরো, ঢাকায় গেলাম, ছবিটবি দ্যাখলাম আর কী...’

তখন হয়তো মুন্নার কথা স্মৃতির পছন্দ হয়েছিল। মুখে ওড়না চেপে মুচকি হেসেছিল সে। হাত ধরে বাড়ি ফিরেছিল দুজনে। মেয়েদেরকে সন্ধ্যায় রাহেলার বাড়ি থেকে আনার নিয়ম। দুপুর থাকতে বাড়ি ফিরলেও স্মৃতি তাদের আনেনি। ঘরের দরজা বন্ধ করে মুন্নার বুকের লোম খামচে ধরে শুয়ে পড়েছিল। তারপর যখন ঘুম ভেঙেছিল তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি গায়ে কাপড় চড়িয়ে স্মৃতি বাচ্চাদের আনার জন্য রওনা দিয়েছিল। মুন্না তখনো ওঠেনি। শুধু পাশ ফিরে জড়ানো গলায় স্মৃতিকে বলেছিল, ‘রাহেলারে কাইল খুব সকাল সকাল সোনালু আর রুপাইরে নিয়া যাইতে বইলো। আমরা ঢাকা যাবো।’ স্মৃতি মুচকি হেসে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল।

পরদিন সকালে স্মৃতি বহুদিন বাদে তার মুখে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রসাধন মেখে তৈরি হয়েছিল। মেয়েরা রাহেলার সঙ্গে চলে গেলে মুন্না স্মৃতির ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। প্রসাধনের নিচে ঢাকা পড়া তার চেনা স্মৃতিই বেশি ভালো নাকি এই অচেনা নারী, এই নিয়ে দোটানায় পড়েছিল। তারপর স্মৃতির গলা চেপে ধরে বলেছিল, ‘তুমি আমারে ছাইড়া যাবা না কুথাও।’ দেয়ালে টাঙানো আয়নার দিকে চোখ রেখে স্মৃতি চুলে ক্লিপ আটকাতে আটকাতে বলেছিল, ‘মানে? কই যাব?’

‘কুথাও যাবা না। আমার কাছে থাকবা।’

‘আছি তো।’

‘তাইলে আমারে বিয়া করো না কেন?’

‘করব না। বিয়া চাই না। কী করবা?’

স্মৃতি আয়নার ভিতরের মুন্নার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিল। মুন্নাও আয়নার ভিতরের স্মৃতির মুখ কঠিন হয়ে যেতে দেখছিল। দুজনে মিলে ঘুরতে বেরোনোর আগে এরকম রাগারাগির মানে হয় না। মুন্না তাই মত বদলে পিছন থেকে স্মৃতির কোমর জড়িয়ে ধরেছিল। তারপর চেপে ধরে মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি উঁচু করে তুলেছিল তাকে। স্মৃতি তখন জোর করে মাটিতে নেমে ঘুরে গিয়ে মুন্নার বুকে মুখ লুকিয়ে বলেছিল, ‘তোমার কাছেই তো আছি। কিন্তু তার জন্যি বিয়া করার দরকার কী পড়ল? বিয়ায় বিশ্বাস নাই আমার।’ মুন্না তখন কিছু না বলে স্মৃতির মসৃণ চুল থেকে খানিক সরে যাওয়া ক্লিপটা সোজা করে লাগাতে ব্যস্ত হয়েছিল।

যখন তারা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছেছে তখন দুজনের ফোনই পরপর বেজে উঠেছিল। কাজে যাওয়ার ডাক। ঠিক আটটায় গার্মেন্টসে ঢুকতে হবে। আজকে না গেলে চাকরি তো যাবেই আগের পাওনাও পাওয়ার আশা থাকবে না। এটা যে পরিষ্কার হুমকি তা তারা দুজনেই ভালোমতো জানত। এরকম হুমকি-ধামকিতে তারা অভ্যস্ত। মুখ শুকনো করে যখন গার্মেন্টসের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল তারা তখন একের পর এক ঢাকাগামী বাস তাদের দিকে ধুলো উড়িয়ে হাওয়া হচ্ছিল। মুখে হাত চাপা দিয়ে জুলজুল করে সেদিকে একঝলক তাকানো ছাড়া উপায় ছিল না।

ফোন পেয়ে বাসস্ট্যান্ড থেকে ফ্যাক্টরি পর্যন্ত হেঁটে যাবার সময়ে দুজনের মুখই ছিল তালামারা। গেটের সামনে মানুষের ভিড়। বিভ্রান্ত কথাবার্তা কানে আসছিল, ‘ফাটলের তাইলে কী হইল ভাই? কাইল এঞ্জিনিয়রেরা যে কইল...’

‘ঠিক আছে ঠিক আছে, কুনো অসুবিধা নাই,’ গেটে দাঁড়ানো দারোয়ানের উত্তর।

‘বিল্ডিং ভাইঙা পড়বে না তো?’

‘ভাইঙা পড়বে ক্যান? সব ঠিক কইরা ফেলসে তো। মালিক বলছে ওইটা খালি প্লাস্টারের ফাটল, ওই ফাটলে কিছু হয় না।’  

ভেতরে ঢুকতে মনটা টানছিল না মুন্নার। হয়তো স্মৃতিরও। সিঁড়ি থেকে স্মৃতি যখন চার তলায় ঢোকে আর তাকে পাশ কাটিয়ে মুন্না উঠে যায় আট তলায়, তখন কানে কানে ফিসফিস করে স্মৃতিকে বলেছিল, ‘মন খারাপ কইরো না, ঢাকা আরেকদিন যামুনে।’

বিল্ডিংয়ে তখন বিদ্যুত্ ছিল না। আটতলায় বসানো দানব জেনারেটরগুলো বিকট শব্দ তুলে পুরো বিল্ডিং কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। তবে ঠিক সময়মতো হাজার জোড়া পা পড়েছিল হাজার হাজার সেলাই মেশিনে। আগের দিন ছুটি পেয়ে কে কোথায় চলে গিয়েছিল কিন্তু ছাঁটাইয়ের ভয়ে আবার এক ছাদের নিচে জড়ো হতেও সময় লাগেনি। ঘোড়া ছোটানোর মতো একের পর এক তাদের পা মেশিনে পড়েছিল। কুলুকুলু ঢেউয়ের মতো তালে তালে দুলে উঠেছিল। দ্রুত করতে হবে, আরো দ্রুত! পালকের মতো নরম সিল্কে কি পাতলা ফিনফিনে সুতিতে তখন চোখের পলকে নকশা বসেছে, কোনো টুকরো হয়ে উঠেছে হাতা, কোনোটা কলার... তার ওপরে আঙুরের মতো বোতাম কি চমত্কার কোনো পুঁতি বাসা বেঁধেছে। তারপর ইস্ত্রি হবে, ভাঁজ হবে, নির্দিষ্ট দিনে প্যাকেট হয়ে যাবে দূর দেশে। অনেক টাকাওয়ালা মানুষেরা খুব সস্তায় সুন্দর পোশাক গায়ে ওঠাবে। টাকার পাহাড় থেকে সবচেয়ে কম পরিমাণ টাকা খসাতে কোম্পানিরা প্রতিযোগিতায় নামবে, আরো কম দাম, আরো কম, আরো...

মেশিনগুলো চলতে শুরু করতেই প্রলয়ের মতো ঝাঁকুনি আর শব্দ। এ প্রলয়ে অভ্যস্ত তারা সবাই। কিন্তু একাধারে দানবীয় শব্দের মাঝখানে অন্য কিছু হয়ে গিয়েছিল যার ব্যাপারে মুন্নার ঠিক জানা নেই। চোখের সামনে মাথার ওপরে কী যেন ভেঙে পড়ে সাদা ধুলায় সমস্তকিছু অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। পায়ের নিচে মেশিনটা হাওয়া হয়ে এক মুহূর্তের মধ্যে সে যেন কোথায় তলিয়ে গিয়েছিল। তারপর সব নিস্তব্ধ।

যখন আবারও ক্ষীণ কোনো শব্দ কানে এসেছিল তখন দিন বা রাত, সেদিন কি তার পরদিন, সেসব বোঝার ক্ষমতা ছিল না। ঘাড়ের কাছে তীব্র যন্ত্রণায় হাতটা সেদিকে উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু হাতটা কেন যেন মাথায় পৌঁছাতে পারেনি। মাঝখানে দেয়ালের মতো কিছু আড়াআড়ি শরীরের ওপরে পড়ে ছিল। তাতে হাত বুলিয়ে দেখেছিল মুন্না, দেয়ালই। সামান্য নড়তে চেষ্টা করতেই টের পেল যে বাম পা আটকে আছে কোথাও যেখানে ব্যথার তীব্রতা এত বেশি যে প্রায় অনুভূতিবিহীন। কোনোরকমে জোরে কয়েকটা নিশ্বাস নিয়ে অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছিল সে। কিছু শব্দও হয়তো করেছিল সেখানে শোনার কেউ ছিল না। বাকিদের অস্তিত্ব বোঝার সম্ভাবনাও ছিল না, তাকে যেন কেউ দেয়াল দিয়ে ঘিরে রেখেছে আর বাম পা আটকে রেখেছে খোদাই করে।

যতটুকু মনে পড়ে, সে মেশিনে কাজ করছিল। খুব তাড়া ছিল। ঘণ্টায় আশিটা শার্টের সামনে-পিছনের অংশ জোড়া দেবার কথা ছিল তার। টেবিলের একমাথায় পাশের জনের কাছ থেকে আসা টুকরোগুলো স্তূপ হয়ে উঠছিল। পাশাপাশি দুটো স্তূপ। দ্রুত স্তূপগুলো থেকে একটা করে টুকরো হাতে নিয়ে কোণের সঙ্গে কোণ মিলিয়ে জোড়া দিচ্ছিল সে। তারপর? পায়ের কাছ থেকে মেশিনটা কেন যেন পিছলে চলে গেল, পিছনে পিছনে সে-ও। মাথার ওপরে খুব জোর দিলে কিছু চিত্কার-চেঁচামেচির স্মৃতি কানে আসে বটে। তার থেকে বেশি আসে যান্ত্রিক শব্দ কিংবা আকাশে বিদ্যুত্ চমকানোর মতো হুড়মুড় করে কিছু ভেঙে পড়ার শব্দ। এইসমস্ত ভাবনার মাঝখানে তার হঠাত্ মনে পড়েছিল স্মৃতির কথা। স্মৃতি কই? সে তো ছিল চার তলায়। সে-ও কি এভাবেই কোথাও আটকে আছে? হতে পারে। বিল্ডিং ভেঙে পড়লে এভাবেই হয়তো ফাঁক-ফোকরে মানুষ আটকে থাকে। কেউ কি মরেও? না না, ওরকম টসটসে স্মৃতি এভাবে মরতে পারে না। স্মৃতি স্মৃতি স্মৃতি... অথচ তারপর কখন যেন স্মৃতির কথা আর মনে এল না। ফোকরের মধ্যে আটকে থাকতে থাকতে পা থেকে অনেক রক্তের একটা নদী হয়ে গেল। গরম, তারপর ঠাণ্ডা তারপর শুকনো শুকনো। হাত দিয়ে হাতড়ালে দেয়াল ছাড়া কিছুর নাগাল পাওয়া গেল না। কখনো মনে হলো সে যেন ঘরের মধ্যে কোনো আলমারির পিছনে লুকিয়ে আছে। কখনো মনে হলো কোনো গর্তে চাপা পড়েছে। মুখে যা আসে, আর্তনাদ বা চিত্কার তা-ই করে ডাকাডাকি করল ক্রমাগত। তার শব্দ শোনার মতো কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব কোথাও আছে বলে মনে হলো না। একসময় গভীরভাবে সে ভাবতে শুরু করেছিল, সে কি আসলে মরে গেছে? এটা কি মরার পরের অবস্থা? বেঁচে আছে না মরে গেছে তা বোঝার জন্য শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে জোরে একটা ঝাঁকি দিয়ে উঠতে চেয়েছিল সে। কিন্তু পা ছাড়াতে পারেনি। শেষে মনে হয়েছিল হাত যেন নতুন কিছু খুঁজে পেয়েছে, দেয়ালের ভাঙা অংশের আরেক মাথায় মানুষের শরীরের মতো কিছু হাতে লাগল। ঠাণ্ডা শরীর কিন্তু এখনো নরম। পাশাপাশি মেশিনে যারা বসে তাদের কেউ কি? কে হতে পারে? অনেকের নাম ধরে ডাকাডাকি করল মুন্না। কোনো নামই যেন শরীরটার পছন্দ হলো না। সাড়া নেই। একসময় মুন্নার আর ডাকার শক্তি থাকল না। গলা শুকিয়ে চামড়ার সঙ্গে চামড়া লেগে যাচ্ছিল যেন, মাঝখানে বাতাস যাবার ফুটোটাও বন্ধ হয়ে আসছিল। ঠিক তখন কারা যেন কথা বলছিল। দূর থেকে আসা ক্ষীণ শব্দের মতো সে শব্দকে অনুসরণ করে মুন্না জীবনের শেষ শব্দ উচ্চারণের চেষ্টায় জোরে একটা চিত্কার দিয়েছিল। তারপর কারা যেন ধীরে ধীরে ভাঙা দেয়ালের এদিক ওদিক থেকে টর্চের আলো ফেলছিল। অনেক পরীক্ষা করে বলেছিল, মুন্নাকে বের করে আনা তাদের পক্ষে সম্ভব না। অত বড় দেয়াল পায়ের ওপর থেকে সরানোও যাবে না আর পা আটকে থাকা মুন্নাকে বের করাও যাবে না, এরকমই সিদ্ধান্ত ছিল তাদের। কিন্তু তাদের দেওয়া পানি খেয়ে মুন্নার তখন কোত্থেকে যেন কথা বলার, এমনকি হাউমাউ করে কাঁদারও জোর চলে এসেছিল। কাঁদতে কাঁদতে তাদের অনুরোধ করেছিল পা কেটে তাকে বের করে আনতে। তারা প্রথমে রাজি হয়নি। বারবার চলে গিয়ে নিস্তব্ধতায় মুন্নাকে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল। প্রতিবার মুন্নার মনে হচ্ছিল, এবার তারা আর ফিরবে না। কিন্তু সামান্য পানি শরীরে এত শক্তি জোগায়! আগের চেয়েও জোরে চিত্কার করছিল সে, ‘পা কাইটা বের করেন, ভাই। ও ভাই, কই গেলেন আপনেরা? আমার পা লাগবে না। আমারে এইখান থেইকা বের করেন, ভাই। দয়া করেন।’ শেষে একটা করাত নিয়ে ফিরেছিল তারা। স্পর্শের দূরত্বে পড়ে থাকা লাশটা সরিয়ে সেইদিক দিয়ে করাত হাতে তার সামনে চলে এসেছিল একজন। চোখের সামনে করাত দিয়ে পা কাটা হচ্ছিল, মুন্না অপলক সেই দিকেই তাকিয়ে ছিল। মানুষের খোঁজে অনেক চিত্কার করেছে, কিন্তু পা কাটার ব্যথা যেন ব্যথা নয়, বেঁচে ওঠার প্রক্রিয়া, তাই মুখ বিকৃত করে নিশব্দে তাকিয়ে থাকা শুধু। বাইরে বেরোনোর আগেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সে। পরে শুনেছিল বেরিয়েছিল বিল্ডিং ভাঙার প্রায় তিন দিন পরে।

হাসপাতালে তখনো লোকে লোকারণ্য। মেঝেতে শুয়ে কাতরাচ্ছে মানুষ। তার মধ্যে মুন্না স্মৃতিকে শুধু চোখে চোখে খুঁজত। দেখত কত লোক আসে আর যায়, তারা কেউ স্মৃতিকে চেনে না। কারো সময় নেই খুঁজে দেখার। জিজ্ঞাসা করতে করতে ক্লান্ত লাগত মুন্নার। মনের মধ্যে ভয় ধরত, স্মৃতি বেঁচে থাকলে সে কি তাকে খুঁজতে আসত না? আবার নিজেই সাহস সঞ্চয় করত, হতে পারে সে-ও তার মতোই কোনো হাসপাতালে পড়ে আছে। কী করে খুঁজবে? শেষে একদিন হাসপাতালে কয়েকজন সাংবাদিক আসে। ছবি তোলার ফাঁকে হাতের ছোট্ট টেলিভিশনে বিল্ডিং ভাঙার ছবি দেখে আর নিজেদের মধ্যে আলাপ করে। তাদের চালানো ছবিতে হঠাত্ স্মৃতির কণ্ঠস্বর শোনা যায়। কাটা পায়ে বিছানার ওপরে ছেঁচড়ে মুন্না তাদের কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করে। স্মৃতি কি তবে বেঁচে আছে? খানিক পরেই সে বুঝতে পারে, এটা হলো সেইদিনের ছবি, ওই যে বিল্ডিং ভাঙার আগের দিন স্মৃতি সাংবাদিকদের বলছিল ফাটলের কথা। আর মুন্না পিছন থেকে হাত-পা নেড়ে তাকে চুপ থাকতে ইশারা করছিল। স্মৃতির কণ্ঠস্বরে মুন্নার চোখে পানি আসে। চোখ মুছতে মুছতে শুনতে পায় সাংবাদিকদের মধ্যে উত্তেজিত একজন বলছে, ‘এই যে, এই যে, এই মেয়েটা বলছিল যে ফাটলটা অনেকদিনের আর অনেক ছড়িয়ে যাওয়ার পরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আহা, বেচারি! পরশুদিন আমি নিজে ওর লাশ দেখছি। প্রথমেই যে লাশগুলো বের করে মাঠে রাখল, তার মধ্যে ছিল।’

মুন্নার আর স্মৃতিকে খুঁজতে হয়নি। আর তখন হুট করে মনে পড়েছিল বাড়িতে পড়ে থাকা মেয়ে দুটোর কথা; রাহেলা, হ্যাঁ, রাহেলার কাছেই হয়তো আছে তারা।

ক্র্যাচে ভর করে ক্ষতিপূরণ অফিসের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে এইসমস্ত ছবি মন থেকে সরাতে পারে না মুন্না। তারচেয়েও বেশি চোখের সামনে ভাসে যখন অফিসের কেউ প্রশ্ন করে, ‘কাগজপত্র কিছু আনছেন? সম্পর্ক প্রমাণ করতে না পারলে ফর্ম কীভাবে ফিলাপ হবে? পরিবারের লোকছাড়া অন্য কাউকে টাকা দেওয়া যাবে না।’

আহা সম্পর্ক! কাকে সে বোঝাবে স্মৃতির সঙ্গে কী ছিল তার সম্পর্ক? কাগজপত্রই কি শুধু বলে দিতে পারবে সে কী ছিল স্মৃতির! দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে অফিসটা থেকে বারবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে যেতে হয়। ওদিকে মেয়ে দুটোর জন্য কোনোরকম খাবার জোটাতে পারলেও তার বেশি কিছু করার সাধ্য নেই মুন্নার। তারা যে এখন স্মৃতির বাচ্চা, তারও কোনো প্রমাণ নেই। কে জানত হঠাত্ জীবনে এত কিছুর প্রমাণ দরকার পড়বে? ভাবতে গেলে প্রায়ই নিজেকে খানিক বোকা বোকা লাগে। অথচ হাল তো ছাড়া যায় না। মানুষ আসছে, ফর্ম ফিলাপ করছে, অপেক্ষা করছে, খোঁজ-খবর আর হিসাব নিকাশ হলে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। শুধু স্মৃতির বাচ্চারা কেন পাবে না তাদের পাওনা? এ যে অন্যায়, তা মুন্না ছাড়া আর কে বুঝবে! মজিদ মিস্ত্রি অবশ্য এই কথা শুনলে হাসে। বলে, ‘কী যে ন্যায়-অন্যায়ের কথা কও না তুমি! পানির মধ্যে মাটি ফেইলা ওই বিল্ডিং উডাইছে। নিয়ম ছাড়াই ইচ্ছামতো উঁচু করছে। ফাডল দেইখাও মানুষগুলানরে জোর কইরা তার মধ্যে ঢুকাইছে। আর এখন তুমি আইছ ন্যায়-অন্যায় নিয়া? হা হা হা...’

‘তা ঠিক তা ঠিক, ভাই। এইখানে ন্যায়-অন্যায় বইলা কিছু নাই।’

‘আমার কথা শোনো, ওই টাকার আশা বাদ দিয়া নিজে যা পাইছ জমায়ে রাখো। আর যে কুনো একটা কাজ কইরা কুনোরকমে চলতে চেষ্টা করো।’

‘কিন্তু গার্মেন্টের কাজ ছাড়া আমি তো আর কিছুই শিখি নাই।’

‘আরে মিয়া, আমি কিছু কাঠের কাজ শিখায়ে দিবনে তোমারে, চলব?’

মুন্না ভাবে, সাহস হারিয়ে ফেললে হয়তো এমনই হয়; মজিদের কথায় চট করে সায় দিতেও তার ভয় লাগে। মনে হয় তাকে দিয়ে আর কিছু হবে না। ওদিকে আশপাশের বহু মানুষ সাক্ষ্য দিলেও স্মৃতির নামের টাকা পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিতে হয় তাকে। অফিসটার বারান্দায় বসে মনে মনে স্মৃতির সঙ্গে কথা বলে, আমারে মাফ করো, আমি মাইয়া দুইটারে না ভালোমতো খাওয়াইতে পারি, না নিজে রাখতে পারি। অথচ বাড়ি ফিরে বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকালে আবারও ওই অফিসে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তখন কেন যেন মনের মধ্যে স্মৃতি বলে ওঠে, সেইটাই ভালো, আরেকবার গিয়া দ্যাখো না...             

মাঝেমধ্যে মুন্নার মনে হয় এই চক্কর কাটায় কেবলই সময় নষ্ট। মজিদ মিস্ত্রি এসে বলে, ‘ধুর মিয়া, ওই টাকার চিন্তা বাদ দাও। তুমি গার্মেন্টে না যাইতে চাও, নিজেই একটা মেশিন কিন্যা বাজারে বইসা যাও।’

কথা ঠিক, মুন্না কিছু টাকা তো পেয়েছে। মজিদের কথামতো মেশিন নিয়ে দর্জিগিরি করা যায়। কিন্তু মুন্না জানে ওই মেশিন কেনাই সার। মেশিনে পা দিলেই তার মাথা ঘোরে। কিছুদিন আগে পরিচিত এক দর্জির দোকানে গিয়ে কাজ করতে চেয়েছিল। কাজ নিয়ে যেই বসেছে দেখে চারদিক থেকে দেয়াল তাকে চেপে ধরছে। সে ধীরে ধীরে একটা ছোট্ট খোপের মধ্যে আটকে যাচ্ছে। চারদিকে সাদা ধুলা, নিশ্বাস নেওয়া দায়। চোখের সামনে শুধু অন্ধকার। সে না দেখতে পায় কাপড়, না মেশিন। কাপড় হাতে চিত্কার করে মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে বেরিয়েছিল দর্জির দোকান থেকে। দর্জি বাইরে এসে কাপড়টা তার হাত থেকে নিয়ে রাগ করেছিল, ‘ধুর মিয়া, কাস্টমারের কাপড়টা দিলা তো ময়লা কইরা। এইসমস্ত পাগলামির কুনো মানে হয়?’

সেইদিন থেকে বাজারের লোকজন জেনে গেছে যে মুন্নার শুধু পা না, বিল্ডিংয়ের নিচে চাপা পড়ে তার মাথাটাও গেছে। নিজেকে মুন্না অনেক বোঝায় তারপর। এইসমস্ত পাগলামির আসলেই কোনো মানে নেই। যা হয়েছে, হয়েছে। সে এখন চাইলে কাজ করতেই পারে। শেষে একজনকে অনেক সাধাসাধি করে একটা ফ্যাক্টরিতে চাকরি পাওয়া যায়। মুন্না ভাবে, এক পায়ে মেশিন চালাতে অসুবিধা তো নেই। সে পারবে। তাছাড়া, ক’দিনে কাপড় কাটার কাজটা শিখে ফেলতে পারলে আর চিন্তা নেই। তারা যদি বসে বসে কাপড় কাটতে দেয়, তাহলে তো হয়েই গেল। অনেক সাহস সঞ্চয় করে কথামতো সময়ে মুন্না ফ্যাক্টরির সামনে হাজির হয়। কিন্তু এ কী, বিল্ডিংয়ের সিঁড়িতে পা রাখতেই মাথার ওপরে কড়কড় শব্দে ছাদ ভেঙে পড়ে। এদিকের দেয়াল এসে পড়ে মুন্নার সামনে। ওদিকের দেয়াল গিয়ে পড়ে আরেক দিকে। মাঝখানে ছোট্ট খোপের মধ্যে মুন্না যায় আটকে। চারদিকে ধুলা আর সাদা সবকিছু। চোখ মেললেও কিছুই দেখা যায় না। হাত বাড়ালে নরম নরম মানুষের শরীর, নিথর কিন্তু তখনো গরম। হাতড়ে হাতড়ে সেসব শরীর সরাতে সরাতে মুন্না চিত্কার শুরু করে, ‘পা কাইটা বের করেন, আমার পা লাগবে না, দয়া করেন...’

চাকরির কথা বলে যে এনেছিল সে বিরক্ত হয়ে বলে, ‘আরে কী হইল, মাটিতে গড়াইতাছ ক্যান, মিয়া? আর কী বকতাছ আবোল তাবোল?’

‘আমার পা লাগবে না, বের করেন আমারে...’

‘ধুর আমি খামোখাই তোমার লাইগা এত ব্যবস্থা করলাম। গার্মেন্টে আর আইসো না তুমি, মাথার চিকিত্সা করাও গিয়া।’

ক্র্যাচটা দূরে ছিটকে পড়েছিল। লোকটা বিরক্ত হলেও সেটা কুড়িয়ে এনে মুন্নাকে ধরে ধরে দাঁড় করায়। তারপর  জানতেও চায়, ‘বাড়ি কি একলাই যাইতে পারবা?’

মুন্না বাড়িতে একাই ফিরে আসে। চাকরির আশায় লোকটাকে এটা সেটা বুঝিয়ে লাভ হবে না, এই গামেন্টস ফ্যাক্টরির দুনিয়ায় সে যে অচল হয়ে গেছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ফেরার সময়ে মেয়েদের জন্য সামান্য খাবার কিনে আনে। সোনালুকে হঠাত্ বেশ বড় দেখায়। মুন্নার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে সে রুপাইকে লোকমা করে তুলে খাওয়ায়। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে মুন্না ভাবে, এইভাবে দিন কাটবে তো? এইভাবে এদের কি আরেকটু বড় করা যাবে—যতদিন না তারা নিজেই কোনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজে ঢুকতে পারে? ভাবনার সঙ্গে সঙ্গেই বিছানা নাড়িয়ে কেঁপে ওঠে মুন্না... চারদিকে ভাঙা দেয়াল আর টুকরো ইটের স্তূপ, ধুলায় ঘোলা সবকিছু, তার মাঝখানে চিত্ হয়ে পড়ে আছে মেয়েদুটো। এখনকার চেয়ে বেশ বড় দেখাচ্ছে তাদের। স্মৃতির মতো লাল লিপস্টিকে রাঙানো তাদের ঠোঁট, অথচ মুখে কেবল অর্থহীন চিত্কার। ধুলো আর ভাঙা দেয়ালের স্তূপে হাতড়ে হাতড়ে হাতের নাগালে নানান ভঙ্গিতে পড়ে থাকা লাশ ছুঁয়ে দেখছে। v