আপনি যখন একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৭
গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের চাহিদা আগেও ছিল, রয়েছে এখনও। ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং ছাড়াও বেসরকারি বৈচিত্র্যময় সব প্রতিষ্ঠানেও এখন ভালো গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের চাহিদা রয়েছে। তবে অন্য অনেক পেশার মতোই গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে ভালো করতে হলে দরকার বাড়তি কিছু বৈশিষ্ট্য। লিখেছেন খন্দকার এনামুল হক জীবনের প্রতিটি ধাপকেই একেকটা যুদ্ধক্ষেত্রের সাথে তুলনা করা চলে। এই যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিটি ধাপ সাফল্যের সাথে পাড়ি দিতে পারলেই সফল হয়ে ওঠে জীবন। এমন বিভিন্ন ধাপের এক পর্যায়ে আমাদের বেছে নিতে হয় কোনো একটি পেশা, যা কি না আমাদের আয়ের উত্স। বর্তমান সময়ে হরেকরকম পেশায় মানুষ জড়িত। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে প্রযুক্তি-নির্ভর অনেক পেশা রয়েছে। এসব পেশার মাধ্যমে অনেক সহজেই সফলতার শিখরে পৌঁছানো যায়। এমন একটি পেশা হলো গ্রাফিক্স ডিজাইন। আর এই পেশাটি যে বেছে নিয়েছেন তিনি হলেন একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তবে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ জানলেই সফল গ্রাফিক্স ডিজাইনার হওয়া যায় না। গ্রাফিক্স ডিজাইন একটা শিল্প। এই শিল্পের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে আপনাকে শৈল্পিক মনের অধিকারী হতে হবে, থাকতে হবে কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্যই আপনাকে তৈরি করবে একজন শৈল্পিক ও সেইসাথে সফল গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে। নিজেকে আপডেট রাখুন অনেক গ্রাফিক্স ডিজাইনার আছে যারা মনে করেন, অ্যাডোবি ফটোশপ, অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর, কোয়ার্ক এক্সপ্রেস জানলেই গ্রাফিক্স ডিজাইনার হওয়া যায়। কিন্তু বিষয়টি সত্য নয়। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রতিনিয়তই সফটওয়্যার হালনাগাদ হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন সফটওয়্যার। তাই সফল গ্রাফিক্স ডিজাইনার হতে হলে নিজেকে আপডেট রাখতে নতুন নতুন সফটওয়্যার সম্পর্কে ধারণা নিন, গ্রাফিক্স সফটওয়্যারের নতুন ভার্সনগুলোর ব্যবহার করুন। প্রতিনিয়ত গ্রাফিক্স রিলেটেড ফিচার এবং বই পড়ুন। গড়ে তুলুন ছবির ভাণ্ডার গ্রাফিক্স ডিজাইনারের সবচেয়ে চাহিদার বিষয় হচ্ছে বিভিন্ন রকমের ছবি বা আর্টওয়ার্ক। কাজের সময় চাহিদামাফিক যথার্থ ছবির প্রাপ্যতা আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে। তাই আপনার কম্পিউটারে একটি ইমেজ বা ছবির ভাণ্ডার গড়ে তুলুন। অবসর সময়ে গুগলে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের ছবি সার্চ করুন এবং যেটা ভালো লাগবে সেটাই সেভ করে ফেলুন আপনার ইমেজ ভাণ্ডারে। ফটোগ্রাফারদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলুন, তাদের কাছ থেকে ছবি সংগ্রহ করুন। সাথে সবসময় একটি ক্যামেরা রাখুন অথবা ভালো মানের ছবি তোলা যায় সেরকম একটি স্মার্টফোন রাখুন। রাস্তায় চলাফেরার সময় বিভিন্ন বিষয় আপনার দৃষ্টিগোচর হবে। সেগুলো সেসব বিষয়গুলো ক্যামেরায় তুলে রাখুন। এই ছবিগুলো জরুরি সময় আপনার কাজে লাগবে। পর্যালোচনা করুন গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের কাজ করার কয়েকটি মাধ্যম রয়েছে। আপনি যদি কোনো প্রকাশনী সংস্থা বা পত্রিকার গ্রাফিক্স ডিজাইনার হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনার কাজের আউটপুট সম্পর্কে অনেক ধারণা পাবেন। কোন কালারটি আউটপুটে কতটুকু আসছে, কতটুকু কম আসছে সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করুন। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বই-ম্যাগাজিন-পত্রিকা দেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আজকে যে রঙ ব্যবহার করেছেন, পরবর্তীকালে অন্য রঙ ব্যবহার করে আউটপুট যাচাই করে নিন এবং পর্যালোচনা করুন। এভাবে বিভিন্ন রঙের আউটপুট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গড়ে তুলুন নিজের মধ্যে। ভেক্টরের ব্যবহার কমিয়ে আনুন বর্তমানে গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের কাজের সুবিধার জন্য ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ভেক্টর আটওয়ার্ক পাওয়া যায়। অনেকে এই ভেক্টর ব্যবহার করে অল্প সময়ে তাদের কাজ সমাপ্ত করে থাকে। এতে করে আপনার শৈল্পিকতার বিকাশ ঘটবে না এবং কাজটিও শৈল্পিক বা নান্দনিক হবে না। তাই ভেক্টরের ব্যবহার কমিয়ে এনে নিজেই সৃষ্টিশীল কিছু করার চিন্তা করুন। আবার ভেক্টর ডিজাইন অনুসরণ করে নিজেই ভালো কোনো ডিজাইন করে নিতে পারেন। একটি পেনসিল ও ডাইরি রাখুন নিজের সাথে একজন শৈল্পিক ডিজাইনার হিসেবে কোনো ডিজাইন করার আগে ডাইরিতে আর্টওয়ার্ক করে নিন। এতে করে কাজ করতে সুবিধা হবে। যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, মাথায় কোনো ডিজাইন সংক্রান্ত চিন্তা আসলে তা ডাইরিতে নোট করে রাখুন। ক্লায়েন্টের চাহিদা ভালো করে বুঝে নিন মনে রাখবেন আপনি যখন কোন ডিজাইন দাঁড় করাবেন, তখন অনেকেই বাহবা দিবে; আবার অনেকেই বলবে কাজটি এভাবে না করে ওভাবে করলে ভালো হতো। আসলে একেকজনের পছন্দ একেকরকম। তাই কাজের ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টের চাহিদাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। কোনো কাজ করার আগে ক্লায়েন্টের চাহিদা মন দিয়ে শুনুন। সেই অনুযায়ীই ডিজাইনটি তৈরি করুন। কাজ করার সময় আশেপাশে ক্লায়েন্টকে বসিয়ে রাখবেন না। এতে করে কাজ করতে সমস্যা হবে। অন্য ডিজাইনারদের সাথে আলোচনা করুন বিভিন্ন গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলুন। ডিজাইন বা রঙ নিয়ে আলোচনা করুন। বিভিন্নজনের মতামতগুলো পর্যালোচনা করুন। এগুলো ডিজাইন করার সময় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করবে। কাজের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলুন মনে রাখবেন এটি একটি শৈল্পিক পেশা। তাই হৈ হুল্লোড়ের মাঝে এই কাজ করা যায় না। আপনি যেখানে বসে কাজ করবেন, সেখানে নিবর পরিবেশ নিশ্চিত করুন। মনোযোগটি যেন শুধুমাত্র আপনার কাজের মাঝেই থাকে, সেটা খেয়াল রাখুন। প্রয়োজনবোধে কাজের সময় হালকা মেলোডির কোনো গান বা যন্ত্রসংগীত শুনতে পারেন। এতে মনোযোগ অন্য কোনো দিকে যাবে না। খিটখিটে মেজাজে কাজ করলে কাজের প্রতিফলন ভালো আসবে না। তাই মেজাজ ঠাণ্ডা রাখুন। কাজের স্থানে এয়ারফ্রেশনার ব্যবহার করুন যাতে সুন্দর একটি গন্ধ আপনাকে মুগ্ধ রাখ। খেয়াল করে দেখবেন, রাতে যেকোনো কাজই ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে করা যায়। কারণ এসময়টি সাধারণতই কোলাহলমুক্ত থাকে। তাই আপনার কর্মস্থলে যদি সঠিক পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারেন তাহলে বাসায় একটি আলাদা ঘরে এসব বিষয় মাথায় রেখে পরিবেশ গড়ে তুলুন। প্রয়োজনে সেখানে রাতের বেলায় কাজ করুন। নিজের মাঝে শৈল্পিকতার প্রতিফলন ঘটান গ্রাফিক্স ডিজাইন যেহেতু একটি শিল্প, তাই আপনিও একজন শিল্পী। নিজের আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, চালচলনে শৈল্পিকতার ছোঁয়া লাগানোর চেষ্টা করুন। এতে করে আপনার ক্লায়েন্ট আপনাকে দিয়ে কাজ করাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। মনের অস্থিরতা পরিহার করুন। ঘড়ি এবং ক্যালেন্ডার দেখার অভ্যাস কমিয়ে আনুন। বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় ওয়েবসাইটে ঢুকে সময় নষ্ট করবেন না। রিফ্রেশমেন্টের জন্য ভালো চলচ্চিত্র দেখুন। তবে এমন কিছু দেখবেন না যাতে মস্তিষ্ক বা মন উত্তেজিত হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে যন্ত্রসংগীত শোনার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কবিতা কিংবা গল্পের বই পড়ুন। আর মনে রাখবেন, আপনি আপনার কাজে যত বেশি সময় দিবেন, আপনার কাজটি তত বেশি শৈল্পিক হবে। অপ্রয়োজনীয় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গ ত্যাগ করুন। গ্রাফিক্স ডিজাইনের সাথে শৈল্পিকতার বিষয়টা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই একজন শৈল্পিক মানুষ হিসেবে আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করুন। শেষে বলতে হয়, নিজের ভেতরে আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে যে আপনি সফল গ্রাফিক্স ডিজাইনার হতে পারেন। এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে অনুসরণ করুন ওপরে আলোচিত বিষয়গুলো। এগুলো আপনাকে ভালো একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে। চর্চার বিকল্প নেই। তাই বিষয়গুলোর চর্চা আপনাকে সাফল্যের পথে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে যাবে।