‘যাচ্ছি কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল রাইসুল আসাদ রুশো। ভোরের রোদ লাগছে চোখে, কুঁচকে রেখেছে চোখ-মুখ। গাড়ি চালাতে চালাতেই হাত চালাল চুলের ভেতর। ফিরে তাকাল একবার পেছনের সিটে বসা বন্ধুর দিকে।
‘বাঁয়ে,’ শান্তকণ্ঠে বলল জোসেফ হাওয়ার্ড।
মোড় নিয়ে গাছপালার মধ্যে দিয়ে যাওয়া পথধরে আরো কিছুদূর এগোল রুশো। নীল ভ্যানটা এনে রাখল মস্ত এক ইস্পাতের ফটকের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করল। ফিরে চেয়ে জানাল, ‘বন্ধ।’
‘বন্ধ?’ ভোঁতা প্রতিধ্বনি শোনা গেল যেন প্যাসেঞ্জার সিট থেকে। জোসেফের দিকে তাকাল এক জোড়া ঘুমজড়িত চোখ। ‘এই সাতসকালে ঘুম থেকে টেনে তুলে বন্ধ চিড়িয়াখানা দেখাতে নিয়ে এসেছ আমাদের?’
নীরবে একমুহূর্ত রুশোর ছোট ভাই রাজাকে দেখল জোসেফ। কৃত্রিম বিষণ্নতায় মাথা নাড়ল। ‘ঘুমাও, খোকা। ঘুম ভাঙলে আমাকে বলো।’
হেসে উঠল রুশো। ‘ওর সঙ্গে খামোকা কথা বলিস, রাজা। কথায় পারবি না। হাজার হোক উনি আমাদের প্রফেসর জোসেফ খান।’
‘প্রফেসর’ উপাধিটা রুশোই দিয়েছে বন্ধুকে। কম্পিউটার আর ইলেকট্রনিকসে অসাধারণ জ্ঞান জোসেফের।
‘কথা বলব কি?’ ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল রাজা। ‘ধরে এখন মার লাগাব। ব্যাটাআ! একে তো রোববার, চিড়িয়াখানা খুলতে এখনো এক ঘণ্টা বাকি। এতই যদি দেখানোর ইচ্ছে, আরো পরে আনতে পারল না?’
বেপোর্ট জুলজিক্যাল গার্ডেনে ঢোকার দরজার দিকে তাকাল রুশো, কর্মীরা ঢোকে যেখান দিয়ে। বলল, ‘রাজা ঠিকই বলেছে, জোসেফ। আরো পরে আনলেও পারতে।’
‘দরজা তো খোলেইনি,’ যোগ করল রাজা, ‘জানোয়ারেরাও নিশ্চয় এখনো ওঠেনি।’
হাসতে হাসতে ভ্যান থেকে নামল জোসেফ। ‘যে জানোয়ার দেখাতে এনেছি, দেখার পর বলবে, ওটার ঘুম না ভাঙাই ভালো।’
‘আবার রহস্য করে কথা বলে! ধরো তো ওকে, দাদা, কিল শুরু করি। আপনিই মুখ খুলবে।’
‘রহস্য না, রাজা,’ হাসিমুখে বলল জোসেফ, ‘ঠিকই বলছি। কয়েক হপ্তা ধরে ডক্টর ডোনাল্ড রিচারের সঙ্গে কাজ করছি। বিখ্যাত হারপিটোলজিস্ট।’
‘কী লজিস্ট?’ ঘুম চলে গেল রাজার।
‘হারপিটো। সাপ বিশেষজ্ঞ। বিষধর সাপ আর তাদের বিষ নিয়ে গবেষণা করেন ডক্টর রিচার। বিশেষ করে গোখরা জাতের সাপ। আমার কাজ হলো, আবহাওয়া-নিয়ন্ত্রক খাঁচা বানিয়ে দেওয়া। নতুন সাপের জন্যে নতুন ডিজাইনের।’
‘নতুন কি আসছে এখন?’ জিজ্ঞেস করল রুশো।
‘একটা অস্ট্রেলিয়ান টাইগার স্নেক, কিংবা বলতে পারো বাঘা সাপ। পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক সরীসৃপ। ক্যালিফোর্নিয়ায় ওই সাপ আর একটিমাত্র আছে। বিশেষ অতিথির জন্যে বিশেষ ঘর বানাতেই হবে।’ চারপাশে তাকাল জোসেফ, যেন তার গোপন কথা কেউ শুনে ফেলবে। ‘তাছাড়া সাপটার অতিরিক্ত দাম। সে জন্যেই ওটার আগমনের খবর যথাসম্ভব গোপন রাখতে চান ডক্টর।’
‘আমি তো জানতাম দুনিয়ার সবচেয়ে বিষধর সাপ কেউটে।’
মাথা নাড়ল জোসেফ। ‘কেউটের বদনাম বেশি, লোকে চেনেজানে তো। ভারতে আর মালয়েশিয়ায় প্রতি বছর বহু লোক কেউটের কামড়ে মারা যায়।’
‘তাহলে কেউটেই বেশি মারাত্মক,’ রায় দিয়ে ফেলল রাজা।
হাসল জোসেফ। ‘তোমার যুক্তি ফেলে দেওয়া যায় না, বেশি মারলে বেশি মারাত্মক। তবে, কেউটের কামড় খেয়ে চিকিত্সা ছাড়াও অনেক সময় লোক বাঁচে। কিন্তু বাঘা সাপের কামড় খেলে আর সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সা না করালে বাঁচার কোনো আশা নেই। মরবেই। কেউটের চেয়ে টাইগার স্নেকের বিষ চব্বিশ গুণ বেশি শক্তিশালী। আরো আছে। অন্য সাপ মানুষ দেখলে পালায়, লুকিয়ে পড়তে চায়, টাইগার ঠিক উল্টো। বাধা পেলে তো রুখে দাঁড়াবেই, না পেলেও তেড়ে আসে। ভাগ্যিস, পৃথিবীতে ওই সাপের সংখ্যা খুব কম, আর লোকালয়ের কাছে থাকে না।’
‘সাপটা তাহলে দেখার সৌভাগ্য হবে আমাদের?’ আগ্রহী মনে হলো রুশোকে।
পকেট থেকে ব্রোঞ্জ রঙের ছোট একটা প্লাস্টিকের কার্ড বের করল জোসেফ। ‘সিকিউরিটি পাস। গেট খোলার জন্যে। এটা দেখালেই ঢুকতে দেবে আমাকে।’
কয়েক সেকেন্ড পরই তালা খুলে গেল। গেট খুলল জোসেফ। আবার ভ্যানে উঠল সে আর রুশো। গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকল, থামল এসে কর্মচারীদের পার্কিং লটে।
ছোট একটা বাড়ি দেখাল জোসেফ। ‘ওটা সিকিউরিটি শ্যাক। সারা চিড়িয়াখানা জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে রাখা হয়েছে অ্যালার্মের তার আর নানারকম সেন্সর। ওগুলোকে ফাঁকি দিয়ে কিছুতেই যেতে পারবে না।’ পকেটে চাপড় দিল সে। ‘তবে পাস থাকলে আর অসুবিধে নেই।...ওই যে, বাঁয়ের এল-প্যাটার্ন বিল্ডিংটা, ওটাই গবেষণাগার। ওখানেই যাব।’
‘এত কড়াকড়ি কেন?’ ভুরু কুঁচকাল রুশো। ‘চিড়িয়াখানা থেকে কি চুরি যাওয়ার ভয়?’
‘কিছু কিছু প্রাণী আছে, অত্যন্ত দামি,’ জোসেফ জানাল। ‘তবে কিছু প্রাণী আছে, যেগুলো দামি হলেও চুরি করার সাহস করবে না কেউ। যেমন ধরো, আঠারো ফুট লম্বা পাইথন। তবু, বলা তো যায় না। নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতেই হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। এতে সুবিধে আছে। ঢোকার সময় পাস লাগে, বেরোনোর সময় লাগে না। সর্বক্ষণ তোমার ওপর চোখ রাখবে ইলেকট্রনিক আই। ধরো, ভুল করে বাঘের খাঁচায় ঢুকে পড়লে...’
‘কসম, দাদা!’ হঠাত্ চেঁচিয়ে উঠল রাজা, জোসেফের কথায় কান নেই, তাকিয়ে আছে একটা গাড়ির দিকে। সুন্দর গাড়ি, মোটর সাইকেল, এসব তার হবি। ‘পিলারি ফোর হানড্রেড! আরিশ্শালার, রঙটা কি দেখেছ!’ পার্কিং লটের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির দিকে হাত ঝাঁকাল সে। ‘যেন আগুন জ্বলছে! আমি শিওর, ওটা কাস্টম-মেড হাই-পারফরমেন্স ড্রাইভিং মেশিন।’ মৃদু শিস দিয়ে উঠল সে।
‘হ্যাঁ, সুন্দর,’ রুশো বলল। ‘তা দাম কী রকম হবে, জনাব গাড়িপাগল?’
‘এই চিড়িয়াখানার কর্মীরা যা আয় করে, তার চেয়ে বেশি,’ গাড়িটার ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না রাজা।
‘হবেই তো!’ তেঁতুলের টক ঝরল যেন জোসেফের কণ্ঠ থেকে। ‘বেতন আর কত পায়। আমার কথাই ধরো, একটা নতুন কম্পিউটার সিসটেম কিনতে পারলাম না আজতক। অথচ দাম আর কত?’ গাড়িটার দিকে বুড়ো আঙুল দেখাল সে, ‘আগেও দেখেছি ওটা। এই চিড়িয়াখানার কারো নয়।’
‘গুড মর্নিং, খান,’ লটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জোসেফকে শুভেচ্ছা জানাল একজন সিকিউরিটি ম্যান।
‘ডিক বনার,’ দুই বন্ধুর সঙ্গে সিকিউরিটি গার্ডের পরিচয় করিয়ে দিল জোসেফ।
হাত মেলাল ডিক। ক্লিপবোর্ড একটা লিস্ট বের করে দেখল। ‘হ্যাঁ, অ্যাগ্রুভ লিস্টে নাম আছে।’ দুটো খাম বের করে জোসেফকে দিতে দিতে বলল, ‘নাও। তোমার বন্ধুদের।’
‘পাস,’ একটা করে খাম রুশো আর রাজার হাতে দিল জোসেফ। ‘বুকে লাগিয়ে রাখবে, ল্যাবরেটরিতে যখন থাকবে।’
‘জোসেফ,’ ডিক বলল, ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটর খুঁজছিলেন তোমাকে। দেখা করো গিয়ে।’
ভ্রুকুটি করল জোসেফ। ‘যাচ্ছি। ডিক, রুশো আর রাজাকে একটু ঘুরিয়ে দেখাবে?’
‘তুমি যাও।’
দ্রুত চলে গেল জোসেফ। সেদিকে চেয়ে বিড়বিড় করল ডিক, ‘পাগলা রিচার আবার কামড়াবে!’
‘পাগলা রিচার!’ অবাক হলো রুশো। ‘ডক্টর ডোনাল্ড রিচারের কথা বলছেন?’
‘হ্যাঁ। আদা-কাঁচকলা সম্পর্ক দুজনের। বেচারা খানের চেয়ার গরম করে ফেলেছেন ডক্টর। টিকতে দেবেন না।’
‘কেন?’ ডিকের সঙ্গে গবেষণাগারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল রাজা।
‘কিসের জানি ওইয়ারিং করেছিল খান। ভুলে একটা ম্যাগনেটিক স্ক্রু-ড্রাইভার রেখে দিয়েছিল পকেটে। পকেটের বাইরে ঝুলছিল পাসটা। পাসের কোড গড়বড় করে দিল চুম্বক। ফলে, ল্যাবের একটা সেন্সরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বেজে উঠল পাগলাঘণ্টি।’
ওদেরকে স্ন্যাক বারে নিয়ে এল ডিক। ‘আরো কিছুক্ষণ ল্যাবে ঢুকতে পারব না। ঢুকতে মানা করেছে। নতুন সাপটাকে খাঁচায় ভরবে এখন।’ মেহমানদের জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু খাবে?’
‘নাস্তাই খাইনি এখনো,’ জোরে নিঃশ্বাস ফেলল রাজা। মিনিটখানেক পরেই হট ডগ চিবাতে আরম্ভ করল।
নাক দিয়ে বিচিত্র শব্দ করল রুশো, যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। ‘কী করে যেন পারিস! এই সক্কাল বেলা হট ডগ...গলা দিয়ে নামে কী করে?’
‘যা খিদে পেয়েছে,’ চিবাতে চিবাতে বলল রাজা, ‘স্রেফ শুকনো রুটিও গিলে ফেলতে পারব এখন।’ আর কথা না বাড়িয়ে ডিকের দিকে তাকাল। ‘তাহলে, কার্ডের কোড মুছে গিয়েছিল জোসেফ খানের? তাতে ডাক্তারের কী? তাঁর তো কোনো ক্ষতি হয়নি?’
‘আমিও তা-ই বলি,’ রুশোও সুর মেলাল ভাইয়ের সঙ্গে। ‘ডক্টরের এত রাগার কী কারণ?’
ছোট একটা পুকুরের পাশ দিয়ে চলেছে ওরা। সিলের বাসস্থান। তাজা মাছকে ধাওয়া করে ধরে ধরে খাচ্ছে সিলেরা। সেদিকে চেয়ে ডিক বলল, ‘কারণ আছে। তখন একটা কেউটেকে খাঁচা থেকে বের করে দুধ দোয়াচ্ছিলেন ডক্টর। ঘণ্টার শব্দে চমকে হাত থেকে ছেড়ে দিয়েছিলেন সাপটা। আরেকটু হলেই ওটা তাঁর হাতে কামড়ে দিয়েছিল।’
হট ডগে কামড় দিতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেল রাজা। ‘বলেন কী! গরু দোয়াতে শুনেছি, ছাগল-মোষ-উট এমনকি আলপাকা দোয়াতেও শুনেছি। সাপ দোয়াতে তো শুনিনি কখনো?’
‘আমি শুনেছি,’ হেসে বলল রুশো। ‘সাপের বিষ বের করে নেয়াকেই অনেকে বলে দুধ দোয়ান। সাপের ওপর একবার একটা ছবি দেখেছিলাম। জোর করে হাঁ করিয়ে বিষদাঁত ঢুকিয়ে দেয়া হয় একটা কাগজের চাদরের ভেতর দিয়ে। চাদরটা বাঁধা থাকে কাচের জারের মুখে। ফোঁটা ফোঁটা বিষ ঝরে পড়ে জারের মধ্যে।’
‘এই কাজকে পেশা হিসেবে নেয় লোকে?’ বিশ্বাস করতে পারছে না রুশো।
‘খুব বিপদের কাজ,’ একমত হলো ডিক। ‘সাবধান থাকতে হয়। আর সাবধান না থেকে অন্যায় করেছে খান, ডক্টর রেগেছেন সেজন্যেই। বলেছেন, খানের চাকরি তো খাবেনই, চিড়িয়াখানার ত্রিসীমানায় যাতে ঢুকতে না পারে কোনোদিন, সেই ব্যবস্থাও করবেন।’
বাঘের খাঁচার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল রুশো। ভেতরে পায়চারি করছে শক্তিধর জানোয়ারটা। দেখতে দেখতে বলল সে, ‘আপনার কথায় মনে হচ্ছে, ডক্টর লোক সুবিধের নন।’
‘লোকের পেছনে লেগে থাকা স্বভাব তাঁর,’ রুশোর কথা এড়িয়ে গিয়ে বলল ডিক। ‘সাপের মতো নিঃশব্দে এসে ঘাড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবেন, কী করে দেখবেন। নিজের সহকারীকেও ছেড়ে কথা কন না,’ হেসে বলল সিকিউরিটি গার্ড। ‘আর ডক্টর বিগলকে তো পারলে ঘাড় ধরে বের করে দেন।’
‘ডক্টর বিগল আবার কে?’ জানতে চাইল রাজা।
‘ডক্টর নেলি বিগল, চিড়িয়াখানার পার্টটাইম ডাক্তার। ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারে চাকরি করেন, আমাদের এখানে কাজ করেন কন্ট্রাক্টে। দরকার হলেই এসে রোগী দেখে যান। ভালো ডাক্তার। চমত্কার মহিলা।’
হেঁটে চলল তিন জনে।
‘মহিলার কাছ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত রিচারের,’ হাঁটতে হাঁটতে বলল ডিক। ‘ধারাল মগজ, সন্দেহ নেই; সাপ সামলাতেও ওস্তাদ। তবে মানুষ সামলানোয় একেবারে আনাড়ি, ব্যবহারই জানেন না।’ হাতে ধরা কফির কাপে চুমুক দেয়ার জন্যে থামল। ‘জোসেফ খানের কপালে দুঃখ আছে।’
‘হয়তো কিছু বলবে না,’ আশা করল রাজা। ‘এতক্ষণে মেজাজ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।’
শ্রাগ করল ডিক। ‘ভোলার লোক নন ডক্টর, মাপ করতে জানেন না। তোমাদের পাস যে কী করে ম্যানেজ করল খান, সেটাই বুঝতে পারছি না!’ ঘড়ি দেখল সে। ‘কিন্তু এত দেরি করছে কেন? এতক্ষণ তো লাগার কথা নয়।’
‘চাকরি গেলে মন খারাপ হয়ে যাবে বেচারার,’ আফসোসের সুরে বলল রুশো। রাজার দিকে তাকাল। ‘নতুন মডেলের কম্পিউটার আর কেনা হবে না ওর।’
মাথা ঝাঁকাল রাজা। ‘পাগলই হয়ে যাবে। কিছুদিন ধরে তো শুধু ওই কম্পিউটারেরই আলোচনা।’
বাদামি রঙ করা একটা পাথরে তৈরি বাড়ির কাছে এল ওরা। ডিক বলল, ‘এটাই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সেকশন। দেখি গিয়ে, কী হচ্ছে?’
সিঁড়িতে অপেক্ষা করল দুই ভাই। ডিক যখন ফিরে এল, চিড়িয়াখানায় ঢুকতে শুরু করেছে কিছু কিছু দর্শক। সে জানাল, ‘এখানে নেই। কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে। ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখি। এতক্ষণে নিশ্চয় কাজ শেষ।’
এক ফালি ঘন বন পার হয়ে এল ওরা। গবেষণাগারের সামনে এসে দাঁড়াল।
‘দেখি, তোমার পাসটা বের করো,’ রুশোকে বলল ডিক। ‘কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, শিখিয়ে দিই। কার্ড নিয়ে দরজার ফ্রেমের পাশের ্পটে ঢোকাতেই খুলে গেল দরজা।
বেশি বড় নয় ল্যাবরেটরিটা। তবে প্রতিটি ইঞ্চিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। রাশি রাশি কাচের বাক্স সারি দিয়ে রাখা হয়েছে দেয়াল ঘেঁষে, ওগুলোতে সাপ ভরা। একটা বাক্সে একটা টিম্বার র্যাটল, লেজের অসংখ্য বোতাম ঝাঁকি দিয়ে বিচিত্র ঝনঝন আওয়াজ তুলেছে। হুঁশিয়ারি। ফণা তুলে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে ভয়ঙ্কর এক কালকেউটে।
‘দেখেই গা গুলাচ্ছে,’ বলল রুশো। ‘এই সাপের সঙ্গে বাসা। আরিব্বাপরে!’
তার কথায়ই যেন রেগে গিয়ে হিসিয়ে ওঠে বাক্সের দেয়ালে ছোবল মারল কেউটেটা।
‘না না না, তোমরা খুব ভালো মানুষ,’ হাত তুলে সাপটাকে তোয়াজ করার ভঙ্গিতে বলল রাজা। ‘তোমাদের কথা তো হচ্ছে না, বুনো সাপের কথা বলছে।’ এদিক ওদিক তাকাল।
‘কিন্তু জোসেফ কই?’
‘দেখে আসি,’ বলতে বলতেই রওনা হয়ে গেল ডিক। বারান্দার একটা মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
‘নতুন সাপটা দেখতে দেখতে হয়তো ভুলে গেছে আমাদের কথা...,’ শেষ করতে পারল না রুশো, শোনা গেল তীক্ষ চিত্কার।
‘ওদিক থেকে আসছে,’ বলেই একটা বারান্দা ধরে দৌড় দিল রাজা। একটা দরজার সামনে এসে পথ শেষ, দাঁড়িয়ে গেল সে। সামনে দরজার গায়ে নেমপ্লেট : ডক্টর ডোনাল্ড রিচার।
‘ডক্টর রিচাআর!’ দরজায় কিল মারতে শুরু করল রুশো। ভারী পাল্লা।
জবাব নেই।
ফ্রেমের পাশে ্পট দেখতে পেল রাজা। ‘কার্ড ঢুকিয়ে দেখো তো, দাদা।’
ফোকাল রুশো। সাড়া দিল না দরজা। আবার ডাকল সে, ‘ডক্টর রিচার!’
অস্বস্তিকর নীরবতা।
মাথা নাড়ল রুশো, ‘নিশ্চয় অন্য কোনো কোডে খোলে। আমাদের মতো সাধারণ দর্শক ঠেকানোর জন্যে, নিরাপত্তাব্যবস্থা।’
ততক্ষণে ছুটতে শুরু করেছে রাজা, লোক ডেকে আনার জন্যে।
মাস্টার কি নিয়ে তার সঙ্গে এসে হাজির হলো দুজন গার্ড।
তালা তবুও খোলা গেল না।
‘নষ্ট করে দিল না তো!’ বলল একজন। দরজায় কিল মেরে ডাকল, ‘ডক্টর রিচার!’ জবাব না পেয়ে মাথা নাড়ল। ‘হবে না। ভাঙতে হবে।’
সকলে মিলে কাঁধ লাগিয়ে ঠেলা দিল, ধাক্কা দিল। লাভ হলো না। ভারী একটা শাবল খুঁজে নিয়ে এল একজন গার্ড। অনেক চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত খুলতে পারা গেল। হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল ওরা। ঠিক এই সময় হাঁপাতে হাঁপাতে এল জোসেফ।
‘এই, কোথায় ছিলে তুমি...?’ রাজা বলল।
ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে এগিয়ে গেল জোসেফ। থমকে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ডক্টর রিচার!’
ডেস্কের ওপর মাথা রেখে পড়ে আছেন ডক্টর। তাঁর পাশে একটা খাঁচা, তাতে অস্ট্রেলিয়ার অফিসিয়াল সিল মারা। খোলা পড়ে আছে খাঁচাটা। শূন্য। ডালার ওপর রক্তলাল কালি দিয়ে স্টেন্সিল করে আঁকা মানুষের হাড়ের ক্রসের ওপর খুলি—হাই ভোল্টেজ বৈদ্যুতিক খুঁটিতে যেমন থাকে। নিচে ইংরেজিতে লেখা—বিপজ্জনক : বিষধর সাপ!
ডিক ফিরে এসেছে। দৃশ্য দেখে নীল হয়ে গেছে ঠোঁট, মৃদু মৃদু কাঁপছে।’
‘শুনছেন, ডক্টর?’ হাত ধরে নাড়া দিল জোসেফ। প্রথমে আস্তে, তারপর জোরে। সাড়া না পেয়ে কব্জির কাছে নাড়ি দেখল। ‘সর্বনাশ! সাপের কামড়ের লক্ষণ!’ খালি খাঁচাটার দিকে চেয়ে ঢোক গিলল, চোখে আতঙ্ক। ‘নিশ্চয় সাপ ছিল এর মধ্যে! পালিয়েছে!’
‘টাইগার স্নেক!’ বিড়বিড় করল রুশো। ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ!’
অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করতে লাগল। শুধু দূরাগত একটা ফ্যানের ঝিরঝির কানে আসছে।
‘সাহায্য দরকার,’ টেলিফোনের দিকে এগোল রাজা। হাত বাড়াতেই থাবা পড়ল বাহুতে। সরিয়ে দিল জোসেফ। হ্যাঁচকা টানে নিয়ে চলে এল টেবিলের কাছ থেকে।
‘কী, জোসেফ...!’ থেমে গেল রাজা।
আঙুল নেড়ে দেখাল জোসেফ।
হাঁ হয়ে গেল রাজা। দেখেছে।
ডেস্কের ঠিক মাঝখানে একগাদা কাগজ। ওপরের কাগজগুলো নড়ছে!
দুই
স্তব্ধ হয়ে দেখছে সবাই। ওপরের দিকে চেয়ে হেসে উঠল রুশো। ‘বাতাস। ডেস্কের ওপরের ভেন্টিলেটার দিয়ে আসছে।’
জোসেফের দিকে তাকাল রাজা। সুস্থির হতে পারেনি এখনো জোসেফ। এখানে ওখানে ঘুরছে চঞ্চল দৃষ্টি, কোণে, আনাচে-কানাচে।
‘মিস্টার কককে ডেকে আনি,’ বলল একজন গার্ড। ‘অ্যাম্বুলেন্সের জন্যেও পাঠাতে হবে।’
‘মিস্টার কক?’ জোসেফকে জিজ্ঞেস করল রুশো।
তাদের সবাইকে বাইরে যাওয়ার নির্দেশ দিল আরেক গার্ড।
‘রিচারের অ্যাসিসটেন্ট,’ জোসেফ জানাল। ‘সাপ বেশির ভাগ সে-ই ঘাঁটাঘাঁটি করে।’
জোসেফের বাহুতে হাত রাখল রাজা। ‘তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? হয়েছে কী?’
‘হয়েছে অনেক কিছুই,’ রাজার হাত সরিয়ে দিল জোসেফ। জোরে নিঃশ্বাস ফেলল। ‘চাকরি খুইয়েছি। রিচার বলার পর থেকেই মাথা গরম হয়ে গেছে আমার। ঘুরেছি, আর ভেবেছি।’
জেমস কক এলেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অ্যাম্বুলেন্সের লোকজন। বললেন, ‘আপনারা সব বাইরে দাঁড়ান। আমি না ডাকলে ঢুকবেন না। দেখি আগে, সাপটা কোথায় গেল। নইলে আবার কাউকে কামড়াবে।’
পেশাদার লোক, মনে মনে স্বীকার করতেই হলো রাজাকে। লম্বা, কৃশকায়, পাতলা হয়ে আসা চুল, মানুষটাকে দেখে মনেই হয় না বিষাক্ত সাপ ঘাঁটতে পারে। ছয় ফুট লম্বা লাঠির মাথায় লাগানো স্নেক হুক হাতে নিয়ে সারা ঘরটা সাবধানে খুঁজলেন তিনি। ‘নেই।’ ঘোষণা করলেন। ‘চলে গেছে।’
‘চলে গেছে?’ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল রাজা। পেছনে রুশো, তার পেছনে জোসেফ। ‘কোথায়?’
কাঁধ ঝাঁকালেন কক। ‘কী জানি! হয়তো দরজা খোলা রেখেছিলেন মাইকেল। বদ্ধ জায়গা থেকে পালানোয় ওস্তাদ সাপেরা। তোমার নাকের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যাবে, টেরই পাবে না।’ শুকনো হাসলেন তিনি। ‘তোমরা দরজা খোলার পরই হয়তো বেরিয়েছে। আরো যে কাউকে কামড়ায়নি, এতেই আমি খুশি।’
এক কোণে লাঠিটা ছুড়ে ফেললেন কক। ‘দামি একটা সাপ বেরিয়ে গেল। সবচেয়ে বিষাক্ত। ভয়ের ব্যাপার। কাকে যে কখন...,’ কথা শেষ না করেই দরজায় দাঁড়ানো গার্ডকে ডেকে বললেন তিনি, ‘জলদি খুঁজে বের করতে হবে। সবাইকে গিয়ে বলো, দেখলে যেন সরে থাকে। আমাকে ডাকে। একা একা মাতব্বরি করতে গিয়ে কামড় খেয়ে না মরে।’ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললেন। ‘ওই যমদূতকে একা ধরার সাহস আমারও নেই। তবু কী আর করা। আর তো কেউ পারবে না।’
স্ট্রেচারে তোলা হলো রিচারকে। বের করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে অনুমতিপত্র সই করে দিলেন কক। ডাক্তারকে বয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল হাসপাতালের লোকেরা।
‘কোথায় নিচ্ছে?’ জিজ্ঞেস করল রাজা।
‘ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টার,’ জবাব দিলেন কক। ‘বেপোর্টে সাপের কামড়ের চিকিত্সা হয় একমাত্র ওই হাসপাতালে।’ আবার নিষ্প্রাণ হাসলেন। ‘বড়জোর মাইল দুয়েক হবে এখান থেকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডাক্তারের হাতে পড়বেন রিচার।’
‘রুশো, তোমাদের গাড়িতে আমাকে ওখানে নিয়ে যাবে?’
অনুরোধ করল জোসেফ। ‘আমি শিওর হতে চাই...,’ দ্বিধা করল সে। ‘হয়তো তাঁর উপকারে লাগবে।’
‘অত ভেবো না,’ সান্ত্বনা দিলেন কক। ‘দোষটা তোমার নয়।’ দরজা পর্যন্ত ছেলেদের এগিয়ে দিলেন তিনি। ‘এদিকটা গুছিয়েই আমি যাবো হাসপাতালে।’
দ্রুত পার্কিং লটে চলে এল তিনজনে।
‘অদ্ভুত লাগছে!’ ড্রাইভিং সিটে বসে বলল রুশো। ‘গেল কোথায় সাপটা? ডক্টরের অফিসে জানালা নেই, দরজাটাও ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। সাপটা ভেতরেই থাকার কথা।’
‘স্পোর্টস কারটায় করে চলে গেছে হয়তো,’ রসিকতা করল রাজা। ‘ওই যে আগুনরঙা গাড়িটা তখন...আরি, নেই তো।’
‘দেখ, আমি সিরিয়াসলি বলছি,’ গম্ভীর হয়ে বলল রুশো। ‘আর রিচারের দরজায় তালাই বা ছিল কেন?’ ইঞ্জিন স্টার্ট দিল সে।
‘আরো অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করেছি আমি,’ জোসেফ বলল। ‘অফিসের ভেতরে কেমন গুমোট লাগছিল। অথচ ল্যাবরেটরিতে তাপমাত্রার ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকে এখানকার বিজ্ঞানীরা। সাপ নিয়ে কারবার তো। অফিসে একরকম ছিল, ল্যাবরেটরিতে আরেকরকম।’
‘ব্যাপারটা তো তাহলে রহস্যময়,’ কৌতূহলী হলো রাজা। ‘তবে সবচেয়ে রহস্যময় হলো ওই সাপ গায়েব হয়ে যাওয়াটা।’
হাসপাতালে পৌঁছাল ওরা। পথ দেখিয়ে ওদেরকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে নিয়ে এল একজন নার্স। দরজায় দাঁড়িয়ে এক মহিলা, পাতলা ফ্যাকাশে মুখ, খাটো করে ছাঁটা ধূসর চুল। পুরনো ফ্যাশনের চশমা নেমে চলে এসেছে নাকের ডগায়। চশমার ওপর দিয়ে ছেলেদের দিকে তাকালেন। ‘আরে, খান? আবার পুড়েছো নাকি?’
বন্ধুদের জানাল জোসেফ, সোলডারিং আয়রন দিয়ে একবার হাত পুড়িয়ে ফেলেছিল সে, তখন ডাক্তার বিগল হাজির ছিলেন চিড়িয়াখানায়। মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিলেন।
‘না, ডাক্তার। ডক্টর রিচারের খবর জানতে এসেছি। কী মনে হয়?’
‘আমিও তা-ই জানতে এলাম,’ পেছন থেকে বললেন কক। কখন এসেছেন, বুঝতে পারেনি ছেলেরা।
মাথা নাড়লেন ডাক্তার। ‘এখনি কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে অবস্থা খুব খারাপ।’
‘কথা বলা যাবে?’ উত্কণ্ঠা ঢাকতে পারছে না জোসেফ। ‘কী হয়েছিল জিজ্ঞেস করতাম।’
‘আমিও করতাম,’ বললেন মিস বিগল। ‘কী ঘটেছিল, জানা যেত।’
‘মানে?’ ভুরু কোঁচকালেন কক। ‘সাপের কামড় নয়!’
আস্তে মাথা ঝোঁকালেন ডাক্তার। ‘হয়তো!’
‘দাঁতের দাগ নেই?’ জোসেফ জানতে চাইল।
মেঘ জমল ডাক্তারের চেহারায়। নিজের ঘাড়ে হাত দিয়ে বললেন, ‘এই জায়গায় ফুটো আছে। সাপের দাঁতের মতোই লাগে, তবে মোটে একটা।’
‘এক-দেঁতো সাপ!’ রাজা অবাক।
দ্বিধা করলেন ডাক্তার। ‘মাঝেসাঝে দাঁত পড়ে যায় সাপের, কিংবা ভেঙে যায়। কিন্তু শিগগির গজিয়ে যায় আবার। যেটা কামড়েছে, সেটার কি একটা ছিল?’
‘জানি না,’ কক বললেন। ‘নতুন এসেছে। দেখার সময়ই পাইনি। তবে, যারা পাঠায় ভালোমতো দেখেই পাঠায়। খারাপ মাল হলে পাঠায় না। তাছাড়া,’ এক-এক করে চার জনের মুখের দিকেই তাকালেন তিনি, ‘সাপের শরীরে অ্যান্টিবডি নেই। সামান্য কেটে গেলেই ইনফেকশনে মারা যেতে পারে। কাজেই, দাঁত ছাড়া জখমি সাপ পাঠানোর কথা নয়।’
ইশারায় সকলকে আসতে বলে অফিসের দিকে চললেন ডাক্তার। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসলেন চেয়ারে। ‘কক, অফিসে সাপটাকে নিয়ে গিয়েছিলেন কেন রিচার?’
‘বলতে পারবো না! সাপ পরীক্ষা করার জন্যে বিশেষ জায়গা আছে ল্যাবরেটরিতে। সেখানে গিয়েই দেখি আমরা। আর, গর্দভ ছাড়া একটা টাইগার স্নেককে একা বাক্স থেকে বের করতে যাবে না কেউ।’ জোরে মাথা নাড়লেন সর্প-সহকারী। ‘রিচার আর যা-ই হোন, বোকা নন।’
চশমা খুলে চোখ ডললেন ডাক্তার। ‘আর ঘাড়েই বা কামড় খেলেন কীভাবে?’
‘ঠিক,’ কথাটা ধরল রুশো, ‘সাপ ছোবল মারে নিচের দিকে। ওপরে দাগ গেল কীভাবে?’
‘হয়তো ঝুঁকে খাঁচাটা খুলছিলেন ডক্টর,’ জোসেফ বলল। ‘সেই সময় হঠাত্ বেরিয়ে এসে ছোবল মেরেছে।’
‘হয়তো,’ বললেন কক। ‘খাঁচা খোলার জন্যে ঝুঁকলে মাটি থেকে রিচারের ঘাড় পাঁচ ফুট ওপরে থাকার কথা। সাপটা আট ফুট। নাগাল পেতেই পারে। কপাল ভালো ওর, সাপের বিষ হজম করার ক্ষমতা আছে। নইলে এতক্ষণে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।’
‘সাপের বিষ হজম?’ রাজা বুঝতে পারছে না।
উঠে পায়চারি শুরু করলেন মিস বিগল। ‘সাপের বিষের প্রতি মৃদু ইমমিউনিটি তৈরি করা সম্ভব। খুব সামান্য পরিমাণ বিষ রক্তে ঢুকিয়ে দিয়ে সহ্য করিয়ে নিতে হয়, ধীরে ধীরে বাড়াতে হয় বিষ ঢোকানোর মাত্রা। তাতে ইমমিউনিটি তৈরি হয়। সাধারণ বিষে আর তখন কিছু হয় না, এমনকি মারাত্মক বিষও সহ্য করে টিকে থাকতে পারে অনেকক্ষণ।’
‘তার মানে?’ ডাক্তারের দুই ভুরুর মাঝে ভাঁজ পড়ল। ‘সাপের কামড় খেয়ে আগেও এসেছিলেন, চিকিত্সা করেছি, সেরেও উঠেছেন। কিন্তু এবারের অবস্থা ঠিক বুঝতে পারছি না। সাড়া দিচ্ছে না শরীর।’ টেবিল চাপড় মারলেন তিনি। ‘কেন?’
‘অ্যান্টিভেনম দেয়া যায় না?’ রাজা পরামর্শ দিল।
‘অ্যান্টিভেনিন,’ শুধরে দিলেন ডাক্তার। ‘টাইগার স্নেকেই কামড়েছে, শিওর হতে পারলে তা-ই দিতাম। ভুল ওষুধ দিলে ভালো না হয়ে ক্ষতিও হতে পারে, এমনকি মৃত্যু। প্রথমে সাপটাকে দেখতে চাই আমি। দেখতে চাই, ওটার একটাই দাঁত কি না।’
উঠে দাঁড়ালেন কক। ‘যাই, খোঁজায় সাহায্য করিগে। রিচারের কোনো পরিবর্তন হলেই আমাকে জানাবেন, ডাক্তার।’
মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালেন মিস বিগল।
তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন কক।
‘সাপ সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন,’ রাজা বলল।
‘হ্যাঁ, জাত-সাপুড়ে,’ বললেন ডাক্তার। ‘রিচারও জাত-সাপুড়ে, তবে দুজনের স্বভাব দু রকম। কক শান্ত, সাপের মতোই ঠাণ্ডা। রিচার ঠিক উল্টো, বদমেজাজি, শান্ত হতেই যেন জানেন না।’ জোসেফের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। ‘তোমার নিশ্চয় এসব শুনতে ভাল্লাগছে না?’
মাথা নাড়ল জোসেফ।
ফোন বাজল। রিসিভার তুললেন ডাক্তার। নীরবে শুনলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, ‘বুঝেছি। হ্যাঁ, থ্যাংক ইউ।’ রিসিভার রাখতে রাখতে ছেলেদের বললেন, ‘রিচারের অবনতি হচ্ছে। এখনি যাচ্ছি আমি।’
ঘড়ি দেখল রাজা। ‘দুপুর তো হয়ে এল। দাদা, চল, ক্যাফিটেরিয়ায় কিছু খেয়ে নিই।’ মিস বিগলকে বলল, ‘আমাদের সাহায্য লাগলে জানাবেন।’
মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে দ্রুত চলে গেলেন ডাক্তার।
হাসপাতালের ক্যাফিটেরিয়ার চলল ছেলেরা।
স্যান্ডউইচ খাওয়া সবে শেষ করেছে, এই সময় সেখানে এসে হাজির হলেন ডাক্তার বিগল। ‘আরো খারাপ হচ্ছে,’ ভোঁতা কণ্ঠে জানালেন তিনি। ‘অ্যান্টিভেনিন দরকার। কিন্তু চিড়িয়াখানা থেকে এখনো পাইনি। মনে হয় সবাই সাপ খুঁজতে বেরিয়েছে। তোমরা গিয়ে এনে দিতে পারবে?’
‘নিশ্চয় পারব,’ পেছনে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল রুশো। ‘কয়েক মিনিট। এই যাব আর আসব।’
পকেট থেকে কাগজ বের করে খসখস করে কিছু লিখলেন ডাক্তার। ‘স্টোরের চার্জ যে-ই থাকে, তাকে দেখিও। দিয়ে দেবে।’
‘এই, চলো,’ বলে ভ্যানের দিকে দৌড় দিল রুশো।
ওরা চিড়িয়াখানায় পৌঁছে দেখল, স্টাফ আর গার্ডেরা ছড়িয়ে পড়েছে। সাপ খোঁজায় ব্যস্ত।
‘আরে,’ গেট পেরিয়ে এসে বলল জোসেফ, ‘সিকিউরিটি সিস্টেম অফ করে দিয়েছে। গেট খোলা।’
‘কেন দিল?’ রাজার প্রশ্ন।
‘ওই যে, এত লোককে ঘোরাঘুরি করতে হচ্ছে। বার বার অ্যালার্ম বাজতে থাকবে, সেই জন্যে হয়তো।’ ডিককে দেখে বলল, ‘স্টোরের চাবি হয়তো তার কাছেই।’ কয়েক পা এগিয়ে হাত নেড়ে তাকে ডাকল।
‘আসতে পারব না,’ ডিক বলল। ‘এদিকে অসুবিধা।’
ছেলেরাই এগিয়ে গেল। ডাক্তারের নোট ডিকের হাতে দিল রুশো। ‘এই ওষুধটা এখনি চেয়েছেন।’
একনজর দেখেই বলে উঠল ডিক, ‘এসো। বিষ আর অ্যান্টিভেনিন একই জায়গায় রাখি, ডক্টর রিচারের অফিসের পাশের ঘরে।’ তাড়াতাড়ি ওদেরকে নিয়ে চলল সে। একটা খোলা দরজার সামনে পৌঁছেই থমকে গেল।
তার কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল ছেলেরা। বিষ আর অ্যান্টিভেনিন রাখার তাকগুলো খালি। একটা শিশি কিংবা জার, কিচ্ছু নেই।
গুঙিয়ে উঠল ডিক। ‘আবার চুরি! এরপর কী ঘটবে?’
‘চুরি?’ অবাক হয়ে বলল রুশো। ‘কী বলছেন?’
‘কথাটা গোপন রাখা হয়েছে,’ ডিক বলল। ‘শুধু টাইগারটাকেই খুঁজছি না আমরা। আরো কিছু সাপ গায়েব। মারাত্মক বিষধর কিছু সাপ চুরি করে নিয়ে গেছে, কিংবা ছেড়ে দিয়েছে।’
‘এখনি ডাক্তার বিগলকে ফোন করা দরকার,’ বলল জোসেফ। ‘রিচারের জীবন নির্ভর করছে অ্যান্টিভেনিনের ওপর।’
মাথা ঝোঁকাল রুশো। ‘হ্যাঁ, তা-ই। ডিক, ডক্টর রিচারের ফোনটা ব্যবহার করা যাবে?’
‘যাবে। তোমরা করো গিয়ে। আমি মিস্টার ককের কাছে যাচ্ছি, তাঁকে জানান দরকার।’
ফোনে কথা বলছে রুশো। রাজা ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরটায়। দেয়ালের কাছে বইয়ের সারি। এককোণে একটা কম্পিউটার। টাইগার স্নেকের খাঁচাটা শূন্য পড়ে আছে ডেস্কের কাছে। বাক্সের ডালায় লেখাটা আরেকবার পড়ার জন্যে এগোতেই ভাঁজ করা একটা রঙিন কাগজ চোখে পড়ল তার। খুলে দেখল, একটা টিকেটের ছেঁড়া অংশ। লেখা :
অ্যাডমিট ওয়ান : মাসট্যাংস ভার্সাস টি...
অক্টোবর ১—টিটান স্টেডিয়াম, মি...
দুটো লাইনের শেষটা নেই, ছিঁড়ে ফেলেছে, তবে বোঝা যায়। নিউ জারসিতে ফুটবল খেলা হয়েছিল, সেটার টিকেট।
রিসিভার রাখার শব্দে চোখ তুলে তাকাল রাজা। রুশোর মুখ থমথমে। বলল, ‘লস অ্যাঞ্জেলেসের রেপটাইল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ফোন করেছেন ডাক্তার বিগল। কাছাকাছি একমাত্র ওখানেই টাইগার স্নেকের অ্যান্টিভেনিন পাওয়া যেতে পারে। প্লেনে করে আনাতে হবে।’
‘রিচারের অবস্থা কেমন?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল জোসেফ।
‘ওষুধ আসা পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন ডাক্তার। লাইফসাপোর্ট মেশিনে তুলে দেয়া হয়েছে ডক্টরকে।’ সারা অফিসে চোখ বোলাল একবার রুশো। ‘দেখ অবস্থা। পারিবারিক ছবি নেই, পার্সোনাল স্টাফ নেই, শুধু গবেষণার যন্ত্রপাতি। ভদ্রলোক খালি সাপ নিয়েই থাকতেন।’
‘ভুল করছ, দাদা,’ ভাইয়ের হাতে টিকেট-ছেঁড়াটা তুলে দিল রাজা।
‘ছেঁড়া টিকেট। তো?’
‘এই অফিসের অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে মেলে না। বেখাপ্পা।’
‘এসেছে হয়তো কোনোভাবে। কারো পকেট থেকে পড়েছে, কিংবা...’
‘এখানে কে...?’ দরজার কাছ থেকে বলে উঠলেন কক। ‘ও, তোমরা।’ নরম হলো কণ্ঠস্বর। ‘চুরির কথা বলেছে আমাকে ডিক। মাথাব্যথা আরো বাড়াল।’
চিউইং গাম বের করে মুখে পুরলেন সর্প-সহকারী। ছেলেদের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন প্যাকেটটা। ‘নেবে? ইদানীং সিগারেট ছেড়েছি।’ হাসলেন, কেমন যেন বোকা বোকা দেখাল হাসিটা। ‘এক বদভ্যাস ছাড়তে আরেক বদভ্যাস।’
চিউইং গাম নিল না ছেলেরা। খাবে না। আবার প্যাকেটটা পকেটে রেখে দিলেন কক। আনমনে দলা পাকাচ্ছেন মোড়কটা। ‘ডাক্তারের কোনো খবর আছে?’
খবর জানাল রুশো।
শুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন কক। ‘এখনো বেহুঁশ? খুব খারাপ। ওরকম লোকের দরকার আছে, যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে।’
‘অনেকদিন কাজ করছেন তাঁর সঙ্গে, না?’ রাজা জানতে চাইল।
শ্রাগ করলেন কক। ‘কয়েক মাস। কেন?’
‘হয়তো কিছু জানাতে পারবেন আমাদেরকে।’ ছেঁড়া টিকেটটা দেখাল রাজা। ‘এটা এখানে এল কীভাবে, বলতে পারবেন?’
গাম চিবানো থামিয়ে টিকেটটার দিকে তাকিয়ে রইলেন কক। ‘রিচারেরই বোধহয়, সে-ই এনে ফেলেছে। ওহহো, দেরি হয়ে গেল আমার। কাজ পড়ে আছে।’ দ্বিধা করলেন এক মুহূর্ত। ‘তোমাদের পাসগুলো দিয়ে দাও। এমনিতেই অনেক ঝামেলা হচ্ছে এখানে, আর কোনো দুর্ঘটনা চাই না।’
হল থেকে কে যেন ডাকল, তাড়াতাড়ি চলে গেলেন কক।
দরজায় উঁকি দিল ডিক বনার। ‘ইয়াং ম্যান, এবার তো তোমাদের যেতে হয়।’
‘চুরির ব্যাপারে কী করলেন?’ রাজা জিজ্ঞেস করল।
‘কিছুই হয়নি এখনো। অ্যান্ডি কারসন, আমাদের সিকিউরিটি চিফকে জানিয়েছি। তিনি ফোন করেছেন পুলিশকে। তদন্ত করতে আসবে ওরা। সাপ খুঁজতেও সাহায্য করবে।’ জোসেফের কাঁধে সহানুভূতির হাত রাখল সিকিউরিটি গার্ড। ‘কাছাকাছি থেকো, খান। ও, আমাকে যেতে হচ্ছে।’ বলে প্রায় ছুটে চলে গেল।
বন্ধুর দিকে উদ্দেশ্য নিয়ে তাকাল রুশো। কিন্তু জোসেফ তাকিয়ে আছে বইগুলোর দিকে, শূন্যদৃষ্টি। জোসেফ, বাড়িতে কিছু বলে এসেছ? চিন্তা করবে না?’
‘না। বাবা-মা কেউ নেই। বেড়াতে গেছে।’
‘তাহলে আমাদের সঙ্গেই থাকো,’ রাজা বলল।
ওরা অফিস থেকে বেরোনোর জন্যে পা বাড়িয়েছে, এই সময় প্রায় ছুটে ঢুকল দুজন শ্রমিক। একজন ছুটে গেল ফোনের দিকে। আরেকজন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।
‘কী ব্যাপার?’ রাজা জিজ্ঞেস করল।
‘একটা সাপ,’ বলল দরজার কাছের লোকটা।
‘টাইগার স্নেক?’ উজ্জ্বল হলো রুশোর মুখ।
মাথা নাড়ল লোকটা। ‘জানি না।’
‘কোথায়? বনের ভেতর?’ জোসেফ জানতে চাইল।
‘না। এখান থেকে ছয় ব্লক দূরে একটা ধোপার দোকান থেকে ফিরছিল এক মহিলা। পথে একটা বাচ্চাকে বিরাট এক সাপ নিয়ে খেলতে দেখেছে, এক বাড়ির পেছনে। আজ সকালে চিড়িয়াখানা বন্ধ করা নিয়ে এমনিতেই কানাঘুষা চলছিল, এখন জানাজানিই হয়ে গেল ব্যাপারটা...ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে অবশ্য। কিন্তু এসব খবর কি আর চাপা থাকে? গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে চিত্কার করে সব বলছে মহিলা।’
‘ছেলেটাকে কামড়েছে নাকি?’
‘জানি না। ব্যাক,’ ফোন করছে যে লোকটা, তাকে দেখাল শ্রমিক, ‘কারসনকে ফোন করছে। ওখানে লোক পাঠানোর জন্যে। গিয়ে দেখে আসুক কী হয়েছে।’ হতাশভঙ্গিতে মাথা নাড়ল সে। ‘কী যে অবস্থা হবে! আধডজন সাপ বেরিয়ে গেছে। আবহাওয়াও গরম থাকবে না, রাতে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।’
‘তাতে কী?’ রাজা বলল।
কালো হয়ে গেল লোকটার মুখ। ‘সাপের রক্ত ঠাণ্ডা। ফলে শীত সহ্য করতে পারে না। ঠাণ্ডা পড়লেই লুকানোর জন্যে গরম জায়গা খোঁজে। এই যেমন বাড়িঘর...’
‘ধোবাখানা,’ ফোন রেখে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল ব্যাক। ‘ওখানে বেশি গরম।...ওরা রওনা হচ্ছে, মিস্টার ককও সঙ্গে যাচ্ছেন। ওই লন্ড্রি থেকেও নাকি ফোন করেছে,’ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে লোকটা। ‘আরো একজন দেখেছে সাপটাকে। বলল, লম্বায় আট ফুটের কম না।’
চমকে উঠল জোসেফ।
পরস্পরের দিকে তাকাল রুশো আর রাজা।
টাইগার স্নেকটাও আট ফুট লম্বা।
তিন
অস্থির হয়ে উঠল জোসেফ। ‘আমাদের কিছুই করার নেই?’
মাথা নাড়ল ব্যাক। ঘড়ি দেখল। ‘এতক্ষণে নিশ্চয় চলে গেছেন মিস্টার কক। কিছু জানলে ফোন করে জানাবেন।’
ধীরগতিতে গড়িয়ে চলল যেন সময়। অবশেষে ফোন বাজল। ছোঁ মেরে তুলে কানে ঠেকাল ব্যাক। নীরবে শুনল ওপাশের কথা। হাসি ফুটল মুখে। ‘ডরি? আজ এই প্রথম সুসংবাদ শোনালে। থ্যাংক ইউ।’ আস্তে রিসিভার রেখে দিল সে।
‘কী?’ তর সইছে না রাজার।
হাসল ব্যাক। ‘আমাদের একটা সাপই। তবে ডরি, ভয়ের কিছু নেই।’
‘ডরি?’ রুশো বলল। ‘ডরিটা আবার কে?’
‘সাপটার নাম। আট ফুট লম্বা একটা রাজগোখরো।’
‘রাজগোখরো? ধোবাখানায়?’ দুশ্চিন্তা কাটেনি জোসেফের। ‘ছেলেটাকে...’
হাসি মুছল না ব্যাকের। ‘না, কামড়ায়নি। কিছুদিন আগে এক সার্কাস পার্টির কাছ থেকে কেনা হয়েছে সাপটা। ওটাকে দিয়ে খেলা দেখাত। বিষদাঁত ভেঙে দিয়েছে। মস্ত, কুিসত ওই সাপটা এখন...’
‘নির্বিষ,’ বাক্যটা শেষ করে দিল তার সঙ্গী। ‘মানে বিষথলিতে বিশ থাকলেও সেটা রক্তে ঢোকাতে পারে না আরকি। কামড়াতে পারে না। যাক, বাঁচা গেল।’
ভ্রুকুটি করল ব্যাক। ‘গেল, এবারকার মতো। তবে...,’ কথাটা শেষ করল না সে। কিন্তু ঘরের সবাই বুঝল, কী বলতে চায়। কারণ, টাইগার স্নেকটাকে এখনো পাওয়া যায়নি।
ঘর থেকে বেরোতে যাবে সবাই, দরজা জুড়ে দাঁড়াল বিশাল বপু। মিস্টার ড্রেক ডানকান, বেপোর্টের পুলিশ চিফ। রুশো-রাজাকে ভালো করেই চেনেন, ওদের বাবা রাইসুল আসাদের বিশিষ্ট বন্ধু তিনি। বাবার মতোই ছেলেরাও গোয়েন্দা হতে চায়, জানেন। ওদের দেখে খুশিই হলেন। ‘আশা করছিলাম সাপুড়ে দেখব, এখন দেখি আমাদের দুই বিখ্যাত খুদে টিকটিকি,’ দুই ভাইয়ের দিকে চেয়ে সস্নেহে হাসলেন তিনি।
পেছনে উঁকি দিলেন কক, তাঁর পেছনে আরেকটা মুখ। ইউনিফর্মই বলে দিল, সঙ্গের লোকটি অ্যান্ডি কারসন, চিড়িয়াখানার সিকিউরিটি চিফ। ল্যাবরেটরিতে পুলিশের আনাগোনা বোধহয় পছন্দ হলো না ককের। কারসনের দিকে চেয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হচ্ছে এখানে? ইনি কে?’
‘আমি ড্রেক ডানকান, বেপোর্টের পুলিশ চিফ,’ নিজেই নিজের পরিচয় দিলেন পুলিশ অফিসার। ‘আপনি কে?’
‘আমি ডেমস কক, এখানকার ইনচার্জ। আপনি এখানে ঢুকেছেন কেন?’
‘মিস্টার কক’, এগিয়ে এলেন কারসন, ‘পুলিশকে আমি ফোন করেছি।’
‘তুমি? কেন?’ ফেটে পড়লেন কক। ‘একদল ভোঁতামুখো খাকিপোশাক এখানে কী করবে? চোর ঠ্যাঙানো এককথা, আর জন্তুজানোয়ারের সঙ্গে ব্যবহার আরেক। এখানে ওরা কী করবে?’
রাগ ঢাকতে পারলেন না কারসন। ‘চুরি হয়েছে, স্যার। অবস্থা খুব খারাপ।’
জবাবে কড়া কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন কক, ষাঁড়ের মতো গোঁ গোঁ করে উঠলেন ডানকান। সাগর কলার মতো মোটা আঙুল নেড়ে বললেন, ‘আপনি থামুন তো।’ কারসনের দিকে ফিরে বললেন, ‘খুলে বলুন সব। কিচ্ছু বাদ দেবেন না।’ কককে হুঁশিয়ার করলেন, ‘কথার মাঝে আর আপনি কথা বলবেন না, বলে দিলাম।’
দ্রুত চিফকে সব কথা জানালেন কারসন। রিচারের দুর্ঘটনা থেকে সাপ গায়েব হয়ে যাওয়ার কথা পর্যন্ত, সব।
‘সাপের বিষও চুরি?’ ডানকান বললেন।
‘শুধু বিষ না, স্যার। অ্যান্টিভেনিনও।’
‘প্লাস আধডজন সাপ। হুঁ, পরিস্থিতি সত্যি মারাত্মক। এতটা আশা করিনি। সাপগুলো এখন কোথায় আছে জানার উপায় নেই। গর্তে থাকতে পারে, লোকের বাড়িতে গিয়ে ঢুকতে পারে। কিংবা চুরিও হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সাপ চুরি করতে আসবে কে?’
‘আমি বুঝতে পারছি না, চিড়িয়াখানার এত লোকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এভাবে গায়েব হলো কী করে সাপগুলো?’
‘ভালো প্রশ্ন,’ বলে উঠল আরেকটা কণ্ঠ। ‘কী করে গায়েব হলো? কিংবা কীভাবে চুরি হলো? তো আপনি এখন কী করতে চান, মিস্টার ডানকান?’
একসঙ্গে ঘুরে গেল সব ক’টা চোখ।
কঠিন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন ডানকান, ‘কে আপনি?’
দামি পোশাক পরা, ব্যায়াম-পুষ্ট একজন মানুষ এগিয়ে এল। মাথায় লাল চুল। ‘আমি হেনরি মরগান। নাম নিশ্চয় শুনেছেন। নিউ ইয়র্কের কিছু বিশিষ্ট পত্রিকায় খবর সাপ্লাই দিই। মনে হচ্ছে এখানে খুব গরম খবর আছে।’
সরু হয়ে এল চিফের চোখ। ‘মরগান।’ মাথা চুলকালেন তিনি। ‘প্লাস্টিক কেলেঙ্কারির সেই রিপোর্টটা আপনিই লিখেছিলেন না? আর বারমেট বে-তে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার গল্প?’
‘হ্যাঁ, আমিই সেই অধম,’ হাসল মরগান। ‘এখন আমি বেপোর্ট চিড়িয়াখানা থেকে সাপ উধাওয়ের রিপোর্ট শুরু করেছি। শহরে ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত সাপ। লোকের জানার অধিকার নিশ্চয় আছে, কখন, কোথায় তারা কামড় খাবে।’ একটা টেপ রেকর্ডারের মাইক্রোফোন ডানকানের নাকের নিচে ঠেলে দিল রিপোর্টার।
‘আমরা...ইয়ে, মানে...আমি...মানে...,’ কথা হারিয়ে ফেলেছেন যেন দুর্ধর্ষ পুলিশ অফিসার। তাঁর গোল লাল মুখ আরো লাল হয়ে উঠেছে। লম্বা দম নিয়ে সাহস সঞ্চয় করলেন বুঝি, গমগমে ভারী কণ্ঠে বললেন, ‘সাপগুলো খুঁজে বের করার জন্যে সাধ্যমতো চেষ্টা চালাব আমরা। এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ আমাদের হাতে আসেনি, যাতে জোর দিয়ে বলা যায় সাপগুলো শহরেই ঢুকে পড়েছে। এমনও হতে পারে, কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে, তার বাড়ির মাটির তলার ঘরে এখন ওগুলো বাক্সবন্দি রয়েছে...’
‘প্রমাণ নেই, না?’ ধমকের সুরে বলল রিপোর্টার। ‘কী প্রমাণ চান? টাইগার স্নেকের মতো ভয়ঙ্কর বিষাক্ত একটা সাপ ছুটে গেছে, কামড় খেয়ে হাসপাতালে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ডক্টর ডোনাল্ড রিচার। এখান থেকে মাত্র ছয় ব্লক দূরে ধোবাখানায় গিয়ে ঢুকেছিল একটা কালকেউটে, ধরে আনা হয়েছে এইমাত্র, আরেকটু হলেই ছয় বছরের একটা বাচ্চাকে দিয়েছিল শেষ করে। এরপরও আর কী প্রমাণ লাগে?’ বরফের মতো শীতল হয়ে উঠল তার কণ্ঠ। ‘আপনার কী মনে হয়, চিফ? বাচ্চাটা মারা গেলে তবেই আপনি তাকে প্রমাণ বলতেন?’
বিচিত্র শব্দ বেরোল চিফের নাক দিয়ে, যেন স্পার্কিং প্লাগে ময়লা জমে যাওয়ায় ফটফট করে বিগড়ে যেতে চাইছে দমকলের ইঞ্জিন। জবাব তৈরি করে বলার আগেই ঝটকা দিয়ে তাঁর সামনে থেকে মাইক্রোফোন সরিয়ে আনল মরগান, ধরল কারসনের মুখের কাছে। ‘আপনি এই চিড়িয়াখানার সিকিউরিটি ইনচার্জ, রাইট?’
মাথা ঝাঁকালেন কারসন, অস্বস্তি বোধ করছেন।
‘আপনিই তাহলে ওই সাপগুলো ছুটে যাওয়ার জন্যে দায়ী?’ আবার প্রশ্ন করল রিপোর্টার।
ফাঁদে পড়ে যাওয়ার ভয়ে মাইক্রোফোনের কাছ থেকে সরে এলেন বেচারা সিকিউরিটি চিফ। কিন্তু মরগান ছাড়ল না তাঁকে, আবার নাকের নিচে মাইক্রোফোন নিয়ে গিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগল। পিছাতে পিছাতে অফিসের এককোণে গিয়ে ঠেকলেন কারসন।
ওদেরকে দূরে সরে যেতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ডানকান। ‘ওকে ঢুকতে দিল কে এখানে?’ কেউ জবাব দিতে পারল না। শ্রাগ করলেন চিফ। নিজের লোকদের আদেশ দিতে শুরু করলেন—সার্চপার্টি তৈরি করে সাপ খুঁজতে যাওয়ার জন্যে।
রাজার দিকে তাকাল রুশো, চোখে বিস্ময়। নিচু কণ্ঠে বলল, ‘কিছু বুঝতে পারছি না! সাপ চুরি করবে কে? সেইসঙ্গে বিষ, অ্যান্টিভেনিন? নাহ্, বোঝা যাচ্ছে না!’
‘আর বেরই বা করল কীভাবে?’ আরেকটা প্রশ্ন যোগ করল রাজা।
ভারী গুঞ্জন শোনা গেল। ডক্টরের ডেস্কের ওপর বয়ে গেল একঝলক বাতাস। কাগজ ওড়াল। মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল একটা কাগজ, ধরে ফেলল রুশো, ওটা পেপারওয়েট চাপা দিতে দিতে তাকাল সিলিঙের দিকে। তুড়ি বাজাল, ‘তাহলে এই ব্যাপার!’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল সে।
রাজাও তাকাল। চেঁচিয়ে উঠল সে-ও, ‘নিশ্চয়ই! দরজায় তালা, জানালা নেই...এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা।’
‘এই, কী বলছ তোমরা?’ ছেলেদের কথায় আকৃষ্ট হলেন চিফ। ‘কীসের ব্যাখ্যা?’
‘কী করে চুরি করেছে অনুমান করতে পারছি,’ রুশো বলল। ডেস্কের ওপরে সিলিঙে বিশাল ভেন্ট দেখাল সে, বাতাস চলাচলের পথ।
একবার দেখেই ফিরলেন চিফ। তাঁর একজন লোককে বললেন, ‘মাইক, উঠে দেখে এস তো।’
‘আ-আমি...,’ ভয়ে ভয়ে ভেন্টের দিকে তাকাল পুলিশম্যান।
‘হ্যাঁ, তুমি!’ গর্জে উঠলেন ডানকান। ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া লোকটার দিকে চেয়ে অবাক হলেন। ‘কী হলো তোমার?’
‘সাপ, স্যার। ওখানে সাপ থাকতে পারে। সাপ সামলাতে পারে ওরকম কাউকে পাঠালে...!’
‘মাইক, যাও। এটা অর্ডার!’
ঢোক গিলল মাইক, মাথা ঝাঁকাল, করুণ হয়ে উঠেছে চেহারা। বেরিয়ে গেল মই আর স্ক্রু-ড্রাইভার আনার জন্যে। খানিক পরেই ফিরে এল টর্চলাইট আর টুলভেল্ট হাতে নিয়ে। পেছন পেছন এল চিড়িয়াখানার একজন শ্রমিক, কাঁধে মই।
স্ক্রু-ড্রাইভার ঢুকিয়ে চাড় দিতেই খুলে গেল ভেন্টের কব্জা লাগানো ধাতব জাফরি।
সেদিকে চেয়ে বললেন ডানকান, ‘তোমার থিওরি মানা যাচ্ছে না, রুশো। জাফরির স্ক্রুগুলো এপাশে। ওপাশ থেকে কী করে খুলবে?’
‘ভালো করে দেখুন, চিফ, স্ক্রু নয় ওগুলো। একধরনের হুড়কো। ওপাশ থেকে খোপ দিয়ে হাত ঢুকিয়েই খুলে ফেলা সম্ভব।’
এগিয়ে এসে আরো কাছে থেকে দেখলেন চিফ। মাথা ঝাঁকালেন। ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। ওপাশের শ্যাফটটা দেখে এস, মাইক।’
দ্বিধা করছে মাইক। ডানকান আরেকবার গর্জন করে উঠতেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোকরে মাথা গলাল সে। থামল। তারপর উঠতে শুরু করল মইয়ের ধাপ বেয়ে, উঠে গেল শেষ ধাপে। শরীরের অর্ধেকটা এখন ফোকরের ভেতরে।
হঠাত্ তার বিস্মিত চাপা চিত্কার চমকে দিল সবাইকে।
ধীরে ধীরে ফোকর থেকে নেমে এল মাইক। রুমাল দিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছে কী যেন। আরো নিচে নামলে দেখা গেল, কালো হাতওয়ালা একটা স্ক্রু-ড্রাইভার। বলল, ‘কেউ ছিল ওখানে, কোনো সন্দেহ নেই। ধুলোর মধ্যে তাজা চিহ্ন দেখলাম। ভেন্টের কয়েক ফুট ভেতরে পড়ে ছিল এই স্ক্রু-ড্রাইভারটা।’
‘দেখি তো,’ মাইকের হাত থেকে সাবধানে জিনিসটা নিলেন চিফ, রুমালে চেপেই। যাতে আঙুলের ছাপ মুছে না যায় হাতল থেকে। দেখে আবার ফিরিয়ে দিলেন সহকারীর হাতে, মাইকের আঙুল তখনো মৃদু কাঁপছে। চিফ বললেন, ‘ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। আঙুলের ছাপ খুঁজুক।’ ককের দিকে ফিরলেন তিনি। এতক্ষণ ধরে নীরব হয়ে আছেন সর্প-সহকারী। তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন চিফ, ‘স্ক্রু-ড্রাইভারটা চিনতে পারছেন?’
রাগ করে মাথা নাড়লেন কক। ‘আমি কী করে চিনব? নাম লেখা আছে নাকি?’
‘আছে,’ শান্তকণ্ঠে বললেন চিফ। ‘এটাতে খোদাই করা আছে, নামের আদ্যাক্ষরই হবে।’
‘তা-ই? কার নাম?’
শ্রাগ করলেন ডানকান। ‘জানি না। এটা দিয়ে যে কাজ করত, হয়তো তার। এ কে। কার নাম?’
হাঁ হয়ে গেল ককের মুখ। তিনি কিছু বলার আগেই অস্ফুট শব্দ শোনা গেল দরজার কাছে। বারান্দা ধরে দৌড় দিল কেউ আউটার ল্যাবরেটরির দিকে।
চেঁচিয়ে আদেশ দিলেন ডানকান, ‘ধরো, ধরো ওকে!’
থেমে গেল ছুটন্ত পদশব্দ, শুরু হলো ধস্তাধস্তি। দু দিক থেকে ধরে টানতে টানতে বেচারাকে নিয়ে ঘরে ঢুকল দুজন পুলিশ।
মাইকের হাত থেকে আবার স্ক্রু-ড্রাইভারটা নিয়ে দেখলেন চিফ। বিড়বিড় করলেন, ‘এ কে।’ তাকালেন ভীত মুখটার দিকে।
থ হয়ে গেছে রুশো আর রাজা। দৌড় দিয়েছিল তাদের বন্ধু জোসেফ। বিড়বিড় করল রুশো, ‘এ কে! জোসেফ খান!’
চার
জোসেফের হাত ধরে টানল মাইক। ‘ভালোয় ভালোয় আসবে না হাতকড়া লাগাব?’
বিশ্বাস করতে পারছে না রুশো আর রাজা।
‘জোসেফ, কী করেছ?’ জিজ্ঞেস করল রুশো।
‘কিছুই করিনি।’
স্ক্রু-ড্রাইভারটা তুলে ধরলেন চিফ। ‘তোমার?’
মাথা ঝাঁকিয়ে স্বীকার করল বিষণ্ন জোসেফ।
ফোঁস করে মুখ দিয়ে বাতাস ছাড়লেন চিফ। ‘থানায় নিয়ে চলো ওকে। জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।’
‘আঙ্কেল,’ রুশো বলল, ‘আপনার বিশ্বাস, জোসেফ এসবে জড়িত?’
‘আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু হবে না। তোমার কথায়ই ভেন্ট খুঁজলাম, নিজের চোখেই দেখলে জোসেফের স্ক্রু-ড্রাইভার পাওয়া গেল। ওর বিরুদ্ধেই গেল ব্যাপারটা।’
‘কিন্তু ও আমাদের সঙ্গে ছিল,’ প্রতিবাদ করল রাজা।
‘রিচার যখন চিত্কার করেছেন, তখনো কি ছিল?’
‘না...তখন ও...অ্যাডমিনিস্ট্রেশন...।’
শুকনো গলায় বললেন চিফ, ‘দেখ, জোসেফকে আমিও চিনি। কিন্তু যতক্ষণ প্রমাণ না করা যাচ্ছে, ও জড়িত নেই, ছাড়তে পারছি না।’
আবার প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল রাজা, তাকে থামাল রুশো। ‘এস, এখানে কথা বলে লাভ হবে না। বাবাকে খবর দিই। দেখি, কী করতে পারে।’
তিন ঘণ্টা খাটাখাটনির পর জোসেফের জামিন করাতে পারলেন মিস্টার রাইসুল আসাদ আর তাঁর উকিল মিস্টার হ্যারিস মিলার। আদালতের কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে ডিনারে বসেছে সবাই—রাইসুল আসাদ, হ্যারিস মিলার, রুশো, রাজা আর জোসেফ। চোখমুখ কালো করে রেখেছে সে। একদম চুপ।
‘ভালো বিপদে পড়েছ তুমি, জোসেফ,’ উকিল বললেন। ‘তোমার বিরুদ্ধে প্রমাণ যা পাওয়া গেছে, জেলে ঢোকানোর জন্যে যথেষ্ট...।’
‘কিন্তু,’ প্রতিবাদ করতে চাইল জোসেফ।
হাত তুলে থামালেন মিলার। ‘আমাকে শেষ করতে দাও। তোমার বিরুদ্ধে কেস খাড়া করার চেষ্টা করবে এখন পুলিশ। ওই দৌড়টা দিয়েই খারাপ করেছ।’
অসহায় ভঙ্গিতে চারপাশে তাকাল জোসেফ। যেন এই জাল থেকে বেরোনোর পথ খুঁজছে। ‘আপনি ভালো করেই জানেন, আমি সাপ চুরি করিনি।’
নড়েচড়ে বসলেন মিস্টার রাইসুল আসাদ। ‘দৌড়টা দিলে কেন?’
বুকের ওপর ঝুলে পড়ল জোসেফের মাথা। ‘আমি...স্ক্রু-ড্রাইভারটা দেখে মাথা গরম হয়ে গেল। সাংঘাতিক ভয় পেয়েছিলাম।’
বন্ধুর বাহুতে সান্ত্বনার হাত রাখল রুশো। ‘এখানে কেউ আমরা তোমাকে চোর ভাবছি না। তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্যেই সব কথা জানতে চাইছেন মিলার আঙ্কেল।’
‘জোসেফ,’ রাজা জিজ্ঞেস করল, ‘ওটা ভেন্টের মধ্যে গেল কী করে, বলো তো?’
হাত নাড়ল জোসেফ। ‘কী করে বলি? আমার টুলবক্সে ছিল। সাপের খাঁচাটা বানানোর সময়ও ছিল বাক্সে আমি শিওর। ইস্, কেন যে কাজটা নিলাম!’
নরম গলায় মিস্টার রাইসুল আসাদ বললেন, ‘জোসেফ, আসল কথাটাই এখনো তোমাকে বলেনি হ্যারি।’
‘আসল কথা?’
‘ডক্টর রিচার মারা গেলে, তুমি সাংঘাতিক বিপদে পড়বে,’ শান্তকণ্ঠে বললেন তিনি।
‘শোন’, ছোট্ট কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করলেন মিলার, ‘বুঝিয়েই বলি। ধরো, রিচার মারা গেলেন। আর পুলিশ প্রমাণ করে ফেলল, একটা অপরাধ ঘটার সময় তিনি আহত হয়েছেন। অপরাধ মানে ওই চুরির কথাই বলতে চাইছি আরকি আমি। খুনের দায় চাপবে তোমার ঘাড়ে।’
‘খুন!’ আঁতকে উঠল রাজা।
দু হাতে মাথা চেপে ধরল জোসেফ।
তার কাঁধে হাত রাখলেন মিস্টার রাইসুল আসাদ। ‘জোসেফ, মাথা গরম কোরো না। তোমাকে বাঁচানোর সব চেষ্টা আমরা করব। শুধু মাথা গরম করে উল্টোপাল্টা কিছু করে বোসো না।’
মিলার বললেন, ‘তোমাদের বাড়ি সার্চ করার জন্যে ওয়ারেন্ট তৈরি করে ফেলেছে ডানকান।’ তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকালেন জোসেফের দিকে। ‘কিছু পাবে না তো?’
দীর্ঘ একমুহূর্ত উকিলের দিকে তাকিয়ে রইল জোসেফ। তারপর মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘নিশ্চয়ই, আমি বেপোর্টের সবচেয়ে বড় ক্রিমিন্যাল! আমার বাড়িতে লাশ পড়ে আছে, সাপ লুকিয়ে রেখেছি বেসমেন্টে। আর কোনো দোষ চাপানোর আছে?’ লাফিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল সে। ‘আমার সাহায্য লাগবে না। আমি চুরি করিনি। বিশ্বাস না করলে কী আর করব। একা থাকতে দিন আমাকে।’
‘শোন, জোসেফ...,’ কথা শেষ করতে পারলেন না মিস্টার রাইসুল আসাদ। দমকা হাওয়ার মতো দরজার দিকে ছুটল জোসেফ। বেরিয়ে গেল।
‘বাবা,’ রাজা বলল, ‘ওর ব্যবহারে কিছু মনে কোরো না। ওর এখন মাথার ঠিক নেই।’
মিলার উঠে দাঁড়ালেন। ‘আমিও যাই।’ মাথা নাড়লেন নিরাশ ভঙ্গিতে। ‘ছেলেটার জন্যে ভয় হচ্ছে আমার, বিপদ বাড়াবে।’
‘বাবা, কিছু করতে পার না?’ অনুরোধ করল রুশো।
‘করতে তো চাই,’ ভীষণ চিন্তিত লাগছে মিস্টার রাইসুল আসাদকে। ‘কিন্তু জরুরি একটা কেস রয়েছে এখন আমার হাতে। একদম সময় করতে পারছি না।’ আনমনে টেবিলে টাট্টু বাজালেন তিনি। ‘ছেলেটার কপালই খারাপ। মোটিভ আছে। রিচারের সঙ্গে শত্রুতা, কিছুক্ষণের জন্যে নিখোঁজ হয়ে থাকা, সবই তার বিপক্ষে যাবে।’ দুই ছেলের দিকে তাকালেন। ‘তবে, সাপগুলো নেই তার কাছে। এক কাজ করো, সাপগুলো খুঁজে বের করো। আর জানার চেষ্টা করো, সাপ ছুটে যাওয়ায় কার লাভ হয়েছে।’ হাসলেন মিস্টার রাইসুল আসাদ। ‘গোয়েন্দা হওয়ার শখ তো। এইই সুযোগ।’
ছেলেরাও হাসল।
‘তবে,’ বললেন তিনি, ‘কাজটা সহজ হবে বলে মনে হয় না। জটিল রহস্য আর ভয়ানক বিপদের গন্ধ পাচ্ছি আমি। হুঁশিয়ার থেকো।’
পরদিন সকালে, হাতের খবরের কাগজটা টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলল রাজা। ‘সামনের পৃষ্ঠার খবর হয়ে গেছে জোসেফ খান। দেখ, কী সব রোমাঞ্চকর হেডিং দিয়েছে।’
নাস্তা খেতে খেতে মুখ তুলল রুশো। ‘ওসব ছাইপাঁশ দেখার দরকার নেই। এখন কাজ করতে হবে আমাদের। মুশকিল হলো, কোনো সূত্র নেই হাতে। যা আছে, সবই জোসেফের বিপক্ষে। ওর আচরণও মস্ত ক্ষতি করবে।’
‘বুঝতে পারছি,’ অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল রাজা। ‘কী মনে হয় তোমার?’ আসলেই কি জোসেফ দোষী?’
ভাইয়ের দিকে নীরবে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল রুশো। মাথা ঝাঁকাল। ‘আমার মনেও এসেছে প্রশ্নটা। জানি তো, কম্পিউটার কেনার জন্যে কী রকম পাগল হয়ে উঠেছে সে। কিন্তু ও বলছে চুরি করেনি, কথাটা বিশ্বাস করতে হচ্ছে আমাদের। ও না করলে অন্য কেউ করেছে। সেটাই খুঁজে বের করতে হবে এখন।’
জোরে নিঃশ্বাস ফেলল রাজা। ‘কোথায় গেল, তা-ও জানি না। কাল রাতে অনেক চেষ্টা করেছি, কেউ ফোন ধরল না। ওদের বাড়িতে একবার গিয়ে দেখলে হয়।’
আধ ঘণ্টা পর জোসেফদের বাড়িতে পৌঁছাল দুই ভাই। বাড়ির সামনে ভিড়, তিনটে পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে।
ভ্যান থেকে নেমে এগিয়ে গেল দুজনে।
‘হাই, রাজা,’ ভিড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক কিশোরী। রাজার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। সোনালি চুল। কাছে এসে বলল, ‘খবরের কাগজে জোসেফের দুরবস্থার কথা জানলাম। পড়েই ছুটে এসেছি আমি আর শেরখান।’ মেয়েটার গভীর নীল চোখে শঙ্কার ছায়া। ‘জোসেফের কিছু হবে না তো?’
প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রুশো জিজ্ঞেস করল, ‘ডানা, শেরখান কই?’
‘ওই তো,’ হাত তুলে দেখাল ডানা।
বিচিত্র ভঙ্গিতে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে ছোটখাটো এক হাতি। কাছে এসে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। ও শেরখান, ডানার বড় ভাই। রুশো-রাজার মতোই ওরাও জোসেফের বন্ধু।
‘এই, রুশো, জোসেফের কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করল শেরখান। ‘গেছে কোথায়?’
‘বাড়িতে নেই?’ জিজ্ঞেস করল রুশো।
‘না। খবর পড়েই ছুটে এলাম। বাড়িতে গেলাম না। এই, তোমাদের বিশ্বাস হয়, ও এমন কাজ করেছে?’
‘না,’ একইসঙ্গে মাথা নাড়ল রুশো আর রাজা।
মাথা নেড়ে সোনালি চুল ঝাঁকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল সুন্দরী ডানা, ‘আর লোকেরও যা স্বভাব! একজনের জীবন যায়, আর ওদের আনন্দ দেখ। যত্তোসব!’ দর্শকদের ভিড়ের দিকে চেয়ে নাক কুঁচকাল সে।
বাড়ির দিকে এগোল চার জনে। লনের কাছে দেখা হলো পল নিউম্যানের সঙ্গে। তরুণ বয়েসি এই পুলিশ অফিসারকে চেনে ওরা, ঘনিষ্ঠতা আছে।
কিন্তু এখন হাসল না পল। গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই যে, তোমরা। জোসেফকে দেখেছ?’
‘না,’ জবাব দিল রুশো। ‘কেন? আবার কী হলো?’
ইঙ্গিতে দেখাল পল। একটা বড় বাক্স ধরাধরি করে আনছে দুজন পুলিশ, খাঁচার মতো দেখতে। ‘জোসেফদের বাড়ির বেসমেন্টে পাওয়া গেছে।’
‘কী আছে ওতে?’ ডানা জিজ্ঞেস করল।
ভাবলেশশূন্য চেহারা পলের। ‘দুটো সাপ। এতবড় গোখরো জীবনে দেখিনি।’
‘গোখরো!’ আঁতকে উঠল শেরখান। এখানে?’ তাড়াতাড়ি আশপাশে তাকাল সে, যেন দেখতে পাবে লনের মধ্যে আরো সাপ কিলবিল করছে।
‘বেসমেন্টে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল,’ আবার বলল পল।
‘আমাদের চিড়িয়াখানার সাপ,’ পেছন থেকে বলে উঠল একটা কণ্ঠ।
ফিরে চাইল ছেলেরা। জেমস কক, রাগে লাল মুখ। ভাঁজ করা একটা কাগজ পলকে দিতে দিতে বললেন, ‘আটটা সাপের লিস্ট আছে। বর্ণনা আছে। গোখরোদুটোর সঙ্গে মেলে কি না দেখুন। আমি শিওর, মিলে যাবে।’ মুঠোবদ্ধ হলো আঙুল। ‘কী চোরের চোর রে বাবা! আর কী ব্যবহার করেছে সাপগুলোর সঙ্গে! আসলে,’ হাত নাড়লেন, ‘মানুষ যে কী বোকা! সাপ দেখলেই চমকে যায়। ভাবে, কী সাংঘাতিক! অথচ ওগুলোর মতো নিরীহ জীবই হয় না।’
খাঁচাটা এনে রাখা হলো পলের সামনে।
ওটার ওপর ঝুঁকলেন কক। ‘আর কী সুন্দর, দেখুন? কোথায় ভালোবাসবে, তা না। লোকে করে কি, চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে ব্যাগ বানায়, জুতো বানায়, ইতরের দল! আমি তো বলি, গোক্ষুরের চেয়ে ওরা খারাপ। মরুক গে! হ্যাঁ, চোরটার কথা বলি। ওই ব্যাটাকে নিয়ে গিয়ে জলদি জেলে ঢোকান। লোকটা ওই জুতো বানানেওয়ালাদের চেয়ে শয়তান।’
‘শুনুন,’ হাত তুলল রুশো। ‘আপনি কি জোসেফকেই চোর মনে করছেন?’
রুশোর দিকে তর্জনীর খোঁচা মারলেন কক। ‘আমি মনে করতে যাব কেন? সেটা যারা করার তারা করবে। আমি আমার সাপ পেলেই খুশি। তবে, আমি জানি রিচারের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল তোমাদের বন্ধু খানের। রিচার এখন হাসপাতালে, আর চিড়িয়াখানার সাপ খানের বেসমেন্টে। কী প্রমাণ করে?’ কেউ জবাব দেওয়ার আগেই ঘুরে গটমট করে চলে গেলেন তিনি।
‘ফ্যানাটিকের মতো কথাবার্তা!’ সর্প সহকারীর কথা পছন্দ হয়নি রাজার।
তিক্ততা দূর করার জন্যে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল শেরখান, হাত নেড়ে দেখাল, ‘দেখ কত লোক জমেছে!’
‘দু বার তাড়িয়েছি,’ বিরক্ত হয়ে বলল পল। ‘কত তাড়াব? আসছে তো আসছেই। বেশ ভালো সাড়া ফেলে দিয়েছে আমাদের জোসেফ সাহেব।’
‘আমাকে ওদের বাড়িতে ঢুকতে দেবেন?’ অনুরোধ করল রুশো।
মাথা নাড়ল পল। ‘সরি, ভাই, পারছি না। পুলিশি তদন্ত চলছে এখন। এই সময়ে বাইরের কাউকে ঢুকতে দিতে পারি না, তোমারও জানা আছে।’
‘আছে, কিন্তু...’
‘সরি,’ আবার বলল পল। ‘তবে, একটা কাজ করতে পারি। কোনো তথ্য জানলে, তোমাকে সেটা জানাব।’
নিজের কাজে চলে গেল পল নিউম্যান।
শেরখান বলল, ‘বাড়ির বাইরে সূত্রটুত্র পাওয়া যাবে না?’ গেয়েন্দাগিরিতে রুশো-রাজার মতো শেরখানও আগ্রহী। তিন জনে মিলে একটা গোয়েন্দা সংস্থা করার কথা ভাবছে অনেকদিন থেকেই। ওদের সঙ্গে ডানা থাকতে চাইলেও আপত্তি নেই।
উজ্জ্বল হলো রাজার মুখ। ‘মন্দ বলোনি। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, সব সাজানো ব্যাপার, জোসেফকে ফাঁদে ফেলার জন্যে। সাপগুলো এখানে আনা সম্ভবই ছিল না তার পক্ষে। যে এনেছে, অসাবধানে কোনো চিহ্ন ফেলেও যেতে পারে।’
বাড়ির বাইরে যতটা সম্ভব খুঁজে দেখল চার জনে। চিহ্ন পাবে কোথায়? মাড়িয়ে সব একাকার করে দিয়েছে লোকে। ‘নাহ্, পাওয়া যবে না,’ হাত ঝাড়ল ডানা।
‘হুঁ,’ ওদের ভ্যানের সামনে পার্ক করা গাড়িটায় হেলান দিল রাজা। ‘কিন্তু জোসেফের ঘাড় থেকে দোষ সরাতেই হবে।’ ভাইয়ের দিকে তাকাল। ‘দাদা, রিচারের অফিসে আরেকবার দেখলে কেমন হয়?’
‘কেন?’
‘ভেন্টিলেটরের এয়ার শ্যাফটে কেউ ঢুকে দেখেনি। ওখানে কোনো সূত্র থাকতেও পারে।’ হাসল রাজা। ‘বাবা আমাদের প্রথম পাঠ কী দিয়েছিল?’
রুশোও হাসল। ‘প্রশ্ন করো। কাজ না হলে, আবার করো। তাতেও কাজ না হলে আবার করো।
পকেট থেকে বাদামের প্যাকেট বের করল শেরখান। হাতের তালুতে। ঢালল ঝরঝর করে। করুণ চোখে তাকাল ওগুলোর দিকে। তারপর বেছে সবচেয়ে ছোট বাদামটা নিয়ে মুখে ফেলে বাকিগুলো আবার ভরে রাখল প্যাকেটে। ওটা পকেটে রাখতে রাখতে বলল, ‘কী যে কপাল নিয়ে এসেছি, সঙ্গে খাবার থাকতেও খাবার উপায় নেই। কিছুই খাই না, তা-ও হাতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছি দিন দিন।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। বাদামটা চিবিয়ে গিলে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কী যেন বলছিলে? ও, প্রশ্ন। অনেক প্রশ্ন জমা আছে আমার কাছে। কতজন লোক জড়িত এই কেসে? ঢুকল কোন পথে ওরা? ছাদের ওপর দিয়ে? ল্যাবের ভেতর দিয়ে? সাপগুলো কী করে বের করল? কিছু সাপ ছাড়া কেন? নিজে নিজেই ছাড়া পেয়েছে, নাকি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে?’ হাসল। ‘আরো বলব?’
‘না না, বাপু, আর দরকার নেই,’ দু হাত নাড়ল ডানা। রুশো-রাজাকে জানাল, ‘কাল টিভিতে খবরটা শোনার পর থেকে আমাকে জ্বালাচ্ছে। খালি এসব প্রশ্ন করছে। আমি কী উত্তর দেবো, বলো? জানি?’
‘কিন্তু,’ গর্বের ভঙ্গিতে মাথা দোলাল শেরখান, ‘স্বীকার করতেই হবে, এগুলো জরুরি প্রশ্ন।’
‘করছি,’ রুশো বলল। ‘এও স্বীকার করছি, কোনোটারই জবাব জানি না আমরা। রাজা ঠিকই বলেছে। ল্যাবরেটরিতে ভালোমতো তদন্ত হয়নি। ডক্টর রিচারের অফিসে আরেকবার খোঁজা দরকার।’
‘তা তো বুঝলাম,’ প্রশ্ন তুলল শেরখান। ‘কিন্তু ঢুকবে কীভাবে? জামাই আদর করে নিয়ে গিয়ে তোমাকে ল্যাবরেটরিতে ঢোকাবে না ওরা।’
‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। দিনের বেলা পারব না। তবে...’
‘তবে কী?’ ডানা বলল। ‘রাতে? ধরতে পারলে কিলিয়ে ভর্তা বানাবে।’
‘পারলে তো বানাবেই। তবে তোমাদের সে ভাবনা নেই...’
‘মানে?’ বাধা দিয়ে বলল শেরখান। ‘আমাদের নেই কেন?’
‘তোমরা তো আর যাচ্ছ না।’
‘কেন, যাব না কেন?’ তীব্র প্রতিবাদ করল শেরখান। তার কথার পিঠে বলল ডানা, ‘আমরা কি জোসেফের বন্ধু নই? শুধু তোমরাই?’
‘থাক, থাক, হয়েছে,’ ডানা রেগে যাচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি হাত তুলল রাজা। ‘যাবে, তোমরাও যাবে। রাত আটটায় তৈরি থেকো। কে জানে, জোসেফের সঙ্গেই হাজতবাস করতে হয় কি না আমাদের!’
পাঁচ
বাকি দিনটা জোসেফকে খুঁজে বেড়াল চার জনে। কোথাও পেলো না। বিকেলে যার যার বাড়ি গিয়ে ডিনার খেয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে মিলিত হলো।
ঠিক আটটায়, চিড়িয়াখানায় ঢোকার মুখে, পথের মোড়ে গাছপালার আড়ালে ভ্যান রাখল রুশো। পা টিপে টিপে গেটের দিকে এগোল চার জনে। রুশো আর রাজার পাসগুলো ফেরত নিতে ভুলে গিয়েছিল প্রহরীরা, এখনো ওদের কাছেই রয়েছে। কোড বদলান হয়নি। রুশোর পাসটা ্পকেটে ঢোকাতেই খুলে গেল দরজা।
অন্ধকারে নিঃশব্দে গবেষণাগারের দিকে চলল ওরা।
প্রবেশপথের সামনে এসে থামল। ফিসফিসিয়ে বলল রুশো, ‘এটাই।’
‘লোকটোক নেই,’ ডানার কথায়ই বোঝা গেল, ভয় পাচ্ছে।
‘তাতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই,’ রাজা বলল। ‘সারাদিনই তো সাপ খুঁজেছে। রাতে যাদের ডিউটি, তারাও নিশ্চয় ওই কাজেই ব্যস্ত। নিশ্চিন্তে সারতে পারব আমরা।’
‘বেশি আশা কোরো না,’ বলল রুশো। ‘কড়া সিকিউরিটি এখানে। ফাঁকি দেওয়া সহজ হবে না। ভেতরে ঢুকে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকবে সবাই। দুটো পাস, লোক চার জন। অন্য দুজনকে ছাড়বে কি না ইলেকট্রিনিক আই, বোঝা যাচ্ছে না। একসঙ্গে থাকলে হয়তো ফারাকটা ধরতে পারবে না। হয়তো মনে করবে, খুব মোটা দুজন লোক আমরা।’
‘দুজন না, পাঁচ জন ভাববে,’ হেসে বলল রাজা।
‘পাঁচ জন?’ বুঝতে পারল না রুশো।
‘হ্যাঁ। শেরখান একলাই তিন জন।’
অন্য সময়ে অন্য কোনোখানে হলে প্রাণখুলে হাসা যেত, এখন পারা গেল না। তবু, মুচকি হাসি চাপতে পারল না রুশো। ‘আর বেশিদিন মোটা থাকবে না। খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে তো।’
‘হ্যাঁ,’ করুণ কণ্ঠে অনুযোগ করল শেরখান, ‘দেখ না, কী বলে! খাওয়া কত কমিয়ে দিয়েছি এখন! তখন এত ভালো আইসক্রিমটা কিনেও খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে আবার ফেরত দিয়ে এলাম। আর কী করব? মোটা হয়েছি সে কি আমার দোষ?’
‘আরে, শেরখান সত্যি সত্যি রাগ করেছ দেখছি,’ আন্তরিক দুঃখিত হলো রাজা। ‘কিছু মনে কোরো না, ভাই, এমনি বললাম...’
‘হয়েছে,’ রুশো বাধা দিল। ‘ওসব কথা বাদ দিয়ে চলো এখন, যে কাজে এসেছি।’
এখানেও কোড পরিবর্তন করা হয়নি। রুশো কার্ড ঢোকাতেই খুলে গেল ভারী দরজা। দুজন দুজন করে গা ঘেঁষে ভেতরে ঢুকল ওরা। ঘণ্টা বাজল না, সাইরেন বাজল না। তার মানে মনে হয় ফাঁকিতে পড়েছে যান্ত্রিক চোখ, নয়তো বন্ধ করে রাখা হয়েছে এখনো অ্যালার্ম সিস্টেম।
নির্জন বারান্দা পেরিয়ে ডক্টর রিচারের অফিসে চলে এল ওরা। ভাঙা দরজা মেরামত করা হয়নি। সুইচ খুঁজে বের করে টিপে দিল রাজা। ফ্লোরোসেন্ট লাইটের উজ্জ্বল আলোর বন্যায় ভেসে গেল ঘর।
‘ব্যস, হয়েছে,’ রুশো বলল, ‘আর গা ঘেঁষে থাকার দরকার নেই।’ রাজার কাছ থেকে সরে এল সে। ‘সিকিউরিটি চেক পয়েন্টগুলো ল্যাবের ভেতর, এখানে নয়।’
‘উফ! বাঁচলাম!’ বলে বোনের কাছ থেকে সরল শেরখান। ‘এত সাবধানে চলাফেরা করা যায় নাকি।’
‘শুরু করা যাক এবার।’ ভেন্টের দিকে হাত তুলল রাজা। ‘স্ক্রু-ড্রাইভারটা যখন পাওয়া গেছে ওখানে, আরো কিছু যেতে পারে। পুলিশ বেশি ভেতরে ঢোকেনি।’
‘শেরখান ওটার ভেতরে ঢুকতে পারবে না,’ রুশো বলল। ‘রাজা, তুই আর ডানা যা। আমরা ঘরটা খুঁজব।’
শেরখান আর রুশোর কাঁধে ভর রেখে এক-এক করে উঠে এল দুজনে। শ্যাফটে ঢুকে পকেট থেকে টর্চ বের করল রাজা। সরু ইস্পাতের সুড়ঙ্গ ধরে এগোল। কেমন যেন অবাস্তব লাগছে জায়গাটা। মুখে লাগছে হালকা বাতাস, ওদের গা ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে পেছনে। বালিতে বুকে হেঁটে এগোনোর দাগ, নতুন।
পেছনে প্রায় গায়ের সঙ্গে ঘেঁষে রয়েছে ডানা। ফিসফিস করে বলল, ‘রাজা, আমার ভাল্লাগছে না। কেমন যেন ভুতুড়ে!’ সামনে কালো এক গর্ত দেখাল। ‘ওটা কী?’
‘মনে হয়, মেইন ভেন্টিলেশন শ্যাফট। ছাদ থেকে মেঝেতে নেমেছে।’ নিচের দিকে চেয়ে কী বোঝার চেষ্টা করল রাজা। ‘নাকি আরো নিচে গেল?’ চার কোনা গর্তটায় আলো ফেলে উঁকি দিয়ে তাকাল। আরো পাইপ দেখা গেল, তার নিচে নালা।
‘ওগুলো কেন?’ ডানা বলল। ‘নিশ্চয় ঘর ঠাণ্ডা কিংবা গরম রাখার জন্যে। তলা দিয়ে আরো অনেক সুড়ঙ্গ গেছে, বোঝা যাচ্ছে।’
মাথা ঝাঁকাল রাজা। ‘যাব কোন দিকে? ওপরে, না নিচে? চোর কোনখান দিয়ে এসেছিল?’
রাজার কাঁধে হাত রাখল ডানা। ওপরের দিকে আঙুল তুলে দেখাল। ‘ওই যে, দেখ, আকাশ।’
ধাতব সুড়ঙ্গে আরেকটা দাগ দেখে নিশ্চিত হয়ে গেল রাজা। ‘ওপর দিয়েই এসেছিল চোর।’
‘কীভাবে? দেখছ কতবড় ফ্যান?’
রাজার মনে পড়ল, কীভাবে রিচারের ডেস্কের কাগজ উড়ছিল বাতাসে। তখন ওই ফ্যান ঘুরছিল, বোঝা গেল। বলল, ‘টর্চটা ধরো। আমি ওপরে উঠব।’
‘খুব সাবধান!’
মসৃণ ধাতব দেয়ালে পিঠ ঠেসে ধরে আরেক দেয়ালে পা ঠেকাল রাজা। এক পা তুলে দিল ওপরে, পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে রেখেই ঠেলে তুলল কয়েক ইঞ্চি, তারপর তুলে দিল আরেক পা। আবার ঠেলে উঠল কয়েক ইঞ্চি। এভাবেই উঠে গেল ফ্যানের ঠিক নিচে।
টর্চের আলোয় চকচক করছে ফ্যানের ইস্পাতের ব্লেড। ধীরে ধীরে ঘুরছে, বাইরে থেকে আসা বাতাসে। ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ব্লেড থামাল রাজা, ব্যথা লাগল হাতে। বাতাসের চাপে ঘুরছিল, তাতেই এত জোর, আর বিদ্যুতে ঘুরলে কী প্রচণ্ড জোর হবে ভেবে অবাক হলো সে।
ধাতব দেয়ালে ওয়েল্ডিং করে ফ্যানের ফ্রেম লাগানো হয়েছে। ফ্রেমের একটা দণ্ড ধরে ব্লেডের ফাঁক দিয়ে টেনে তুলল শরীর। মাথার ওপর জালিকাটা ভারী ধাতব ঢাকনা। জাফরির ফাঁক দিয়ে তারা চোখে পড়ছে। ঠেলে ঢাকনা তোলার চেষ্টা করল সে। নড়ল না ওটা।
‘ডানা,’ ডেকে বলল রাজা, ‘টর্চটা উঁচু করে ধরো।’
‘হবে?’
‘হ্যাঁ, হবে। দেখা যায়। ঢাকনার কিনারে আঁচড়ের দাগ, খোঁচা লেগে রঙ উঠে গেছে। নিশ্চয় কেউ ঢুকেছিল এখান দিয়ে।’
‘ঢাকনা সরান যায়?’
আরেকটু উঠল রাজা। হুড়কো দেখতে পেল। ‘পারতাম, একটা স্ক্রু-ড্রাইভার হলে। আঙুল দিয়ে বল্টু ঘোরাতে পারছি না।’
‘দাঁড়াও, নিয়ে আসি।’
‘রাখো, রাখো, যেতে হবে না। পকেটে ছুরি আছে। ওটা দিয়ে চেষ্টা করে দেখি।’
বেশ কায়দা-কসরত করে পকেট থেকে ছুরিটা বের করল রাজা। এক দেয়ালে পিঠ, আরেক দেয়ালে পা। গায়ের জোরে আটকে রয়েছে মসৃণ চারকোনা পাইপটার মধ্যে। তবু, বেকায়দা অবস্থায় থাকতে থাকতে ইতিমধ্যেই প্রতিবাদ জানাতে আরম্ভ করেছে পেশি। তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে। দাঁত দিয়ে কামড়ে ফলাটা বের করতে বেশ অসুবিধে হলো।
হুড়কো খোলার চেষ্টা চালাল রাজা। কয়েক সেকেন্ডেই বুঝে গেল, কেন জোসেফের ভারী স্ক্রু-ড্রাইভার ব্যবহার করতে হয়েছে চোরকে। ওই হুড়কোর তুলনায় তার ছোট যন্ত্রটা নিতান্তই খেলনা। বেশি চাপাচাপি করতে গেলে ছুরির ফলাই ভাঙবে শুধু, লাভ হবে না। চেপে রাখা বাতাস ফুসফুস থেকে বের করে দিয়ে বলল, ‘হচ্ছে না। স্ক্রু-ড্রাইভার লাগবে।’
‘নো প্রোবলেম,’ নিচ থেকে বলল ডানা। ‘নিয়ে আসছি। যাব আর...’
তার বাক্যের শেষ অংশ হারিয়ে গেল জোরাল গুঞ্জনে। ভারী বৈদ্যুতিক মোটর চালু হয়েছে।
‘রাজা!’ চেঁচিয়ে বলল ডানা। ‘জলদি নেমে এস!’
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। আতঙ্কিত হয়ে দেখল রাজা, ঘুরতে শুরু করেছে বিশাল ফ্যানের দানবীয় পাখাগুলো। গতি বাড়ছে দ্রুত। কী ভয়ানক বিপদে পড়েছে, বুঝতে অসুবিধে হলো না তার। ওটার মধ্যে পড়লে চোখের পলকে তাকে কিমা বানিয়ে ফেলবে ব্লেডগুলো।
‘ডানা!’ মোটরের গর্জন ছাপিয়ে চিত্কার করে উঠল রাজা। ‘জলদি গিয়ে দাদাকে বলো। জলদি করো, আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না!’
জবাব শোনা গেল না। মোটর আর বাতাসের শব্দ ভীষণ হয়ে উঠেছে।
অতি-সাবধানে ইঞ্চি ইঞ্চি করে আরো ওপরে উঠে গেল রাজা, ঢাকনাটা এখন তার চাঁদি ছুঁয়েছে। ব্যথা শুরু হয়ে গেছে পায়ের পেশিতে, খিঁচ ধরে যাবে যে কোনো মুহূর্তে। বেরোনোর একটাই পথ। ওপর দিয়ে, ওই ঢাকনা তুলে। খুদে ছুরির ফলা দিয়েই হুড়কো খোলার আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করল সে।
পায়ের পেশিতে দহন শুরু হয়েছে, মাংসের ভেতরে জ্বলন্ত কয়লা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যেন। পিঠে অসহ্য ব্যথা। ঘামে ভেজা হাতের তালুতে থাকতে চাইছে না ছুরির হাতল, পিছলে যায়। মোচড় দিল আবার। সামান্য নড়ল হুড়কোর স্ক্রু। চাপ বাড়ল। শব্দ শুনল না, কিন্তু টের পেল ভেঙে গেছে ছুরির ফলা। ব্লেডের ওপর পড়ল ওটা, বাড়ি খেয়ে প্রচণ্ড শব্দ করে ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেল নিচে।
মুক্তির পথ নেই!
‘ডানা!’ ককিয়ে উঠল রাজা।
জালির ফাঁকে আঙুল ঢুকিয়ে শরীরের ভর রাখতে চাইল, তাতে খানিকটা বিশ্রাম পাবে খিঁচধরা মাংসপেশি। কিন্তু ফুটেগুলো এত সরু, আঙুল ঢুকল না।
আর আটকে থাকতে পারল না সে। পিছলে পড়তে শুরু করল। কানের পর্দায় যেন আঘাত হানছে ফ্যানের শব্দ, বাইরে থেকে বাতাস টানছে ওটা, টান অনুভব করছে রাজা। অমানুষিক চেষ্টায় পায়ের চাপ একটু বাড়াল বটে, কিন্তু বাড়িয়ে রাখতে পারল না। কথা শুনছে না পেশি। আবছা অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল সে। টের পাচ্ছে ধীরে ধীরে নেমে চলেছে ফ্যানের কাছে।
দুর্বল হয়ে আসা পায়ে ভয়াবহ যন্ত্রণা। পেশিতে খিঁচ ধরলে যে এমন ব্যথা হয়, কল্পনাও করেনি কোনোদিন সে। আর বড়জোর কয়েক সেকেন্ড, তারপরই পড়বে গিয়ে ওই মারাত্মক ইস্পাতের পাতের মধ্যে। শার্টের ঝুল পতপত করছে বাতাসে, ব্লেডের সঙ্গে লাগল বলে।
মরিয়া হয়ে উঠল রাজা। উঠেও গেল কয়েক ইঞ্চি। কিন্তু এজন্যে আরো বেশি মূল্য দিতে হলো পেশিকে। এতক্ষণ স্থির ছিল পা, এখন কাঁপতে শুরু করল। অবাধ্য হয়ে উঠল পুরোপুরি। শরীর ঠেকিয়ে রাখারও আর সাধ্য হলো না। দ্রুত পিছলে পড়তে লাগল।
আর মাত্র ক’সেকেন্ড। তারপরেই...!
ছয়
সম্ভাব্য প্রতিটি জায়গা খুঁজে দেখছে রুশো আর শেরখান। খালি সাপের খাঁচা থেকে শুরু করে কম্পিউটার প্রিন্টারের মেসেজ, কিছুই বাদ দিচ্ছে না।
‘নাহ্, কিছুই নেই,’ নিরাশ হয়ে বলল শেরখান। ‘ডানা আর রাজা কী করছে কে জানে।’
হঠাত্ ঝিরঝির আওয়াজ কানে এল ওদের, গায়ে লাগল ঠাণ্ডা বাতাস।
হাসল শেরখান। ‘ভালো হলো। যা গরম লাগছিল এখানে।’
ঠং করে বিচিত্র শব্দ হলো। ভেসে এল ভেন্ট দিয়ে।
চমকে উঠল রুশো। ‘বিপদে পড়ল না তো!’ উদ্বিগ্ন চোখে ভেন্টের দিকে তাকাল সে।
বড় বড় হয়ে গেল নিডের চোখ। ‘সর্বনাশ! ফ্যান চালু হওয়ার পর শব্দটা এসেছে। তার মানে ব্লেডে বাড়ি খেয়েছে কিছু।’ খাপ করে রুশোর হাত চেপে ধরল সে। ‘জলদি করো ! ওদের বের করো।
চেঁচিয়ে ডাকতে গিয়ে থেমে গেল রুশো। প্রহরীরা শুনে ফেলবে। কিন্তু আর কী করার আছে?
ডানার ফ্যাকাশে মুখ উঁকি দিল ভেন্টের মুখে। ককিয়ে উঠল, ‘রাজা মারা যাচ্ছে! জলদি ওকে বাঁচাও! ফ্যান...ফ্যান বন্ধ করো।’
বোনকে নামাতে সাহায্য করল শেরখান।
ভেন্টের দুই ধার খামচে ধরে নিজেকে টেনে তুলল রুশো। মুখ বের করে শেরখানকে বলল, ‘ফ্যানের সুইচটা খুঁজে বের করো।
আমি যাই।’
‘রুশো ভাই,’ ডানা ডাকল, ‘এটা নিয়ে যাও।’ টর্চটা বাড়িয়ে দিল সে।
শ্যাফটে ঢুকে গেল রুশো। শেরখান আর ডানা পাগলের মতো খুঁজতে শুরু করল ফ্যানের সুইচ। পেলো না। শেরখান বলল,
‘নিশ্চয় অফিসের বাইরে আছে। চলো চলো দেখি।’
‘না, ভাই!’ সাবধান করল ডানা। ‘তোমার পাস নেই।
অ্যালার্ম বেজে উঠবে।’
বোনের কথায় কান দিল না শেরখান। সে দরজায় বাইরে পা রাখতে না রাখতেই বেজে উঠল ঘণ্টা। কানফাটা শব্দে ঢাকা পড়ে গেল ফ্যানের ঝিরঝির।
‘পেয়েছি!’ বলে উঠল ডানা। একটা বুকসের পাশে। ডায়াল ঘুরিয়ে ‘জিরো’তে নিয়ে এল সে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল ফ্যানের মটরের গুঞ্জন, কমে গেল ভেন্টের মুখ দিয়ে বেরোনো বাতাস।
ঘণ্টাও বন্ধ হলো ওদিকে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে নিশ্চয়।
ছুটে আসছে পদশব্দ।
‘এবার একটা জুতসই গপ্পো শোনাতে হবে আমাদের, বিড়বিড় করল শেরখান।
দরজায় দেখা দিল গার্ডের পোশাক পরা এক লোক। ‘কে তোমরা?’ মোটা গলায় প্রশ্ন। ‘এখানে কী?’
শ্রাগ করল শেরখান। হাসল বোকার মতো। ‘চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিলাম, অফিসার।’
শ্যাফট ধরে দ্রুত এগচ্ছে রুশো। নিডের গলা কানে আসছে, কথা অস্পষ্ট। মুখে বাতাসের ঝাপটা কমে গেছে হঠাত্ করে, নিশ্চয় সুইচ বন্ধ করে দিয়েছে শেরখান কিন্তু দেরি হয়ে যায়নি তো? আরো দ্রুত এগোল সে। পৌঁছে গেল মেইন শ্যাফটের মুখের কাছে।
‘রাজা?’ ডাকল সে। ‘এই, রাজা, কোথায় তুই?’
নিচ থেকে উঠে এল মৃদু গোঙানি। পেনলাইটের স্বল্প আলোয় দেখা গেল,
শ্যাফটের তলায় পরে আছে রাজা।
‘এই রাজা, ঠিক আছিস তুই?’ জিজ্ঞেস করল উদ্বিগ্ন রুশো।
জবাবে আবার গোঙানি।
নিচে নামল রুশো। ভাইয়ার ওপর আলো ফেলে ডাকল, ‘রাজা।’
এবার আর গোঙানিও নেই। কপালে ফাটা দাগ। ভাইয়ের কাঁধ চেপে ধরে ঝাঁকি দিল রুশো। ‘এই, রাজা? রাজা? কথা বলছিস না কেন?
‘উফ, ব্যথা পাচ্ছি তো! ছাড়, গোঁ গোঁ করল রাজা।
এতক্ষণে হাসি ফুটল রুশোর মুখে। ‘কপাল কেটেছে। আর কোথায় ব্যথা পেয়েছিস?’
আরেকবার গুঙিয়ে উঠে বসল রাজা। ‘পেয়েছিস মানে? রীতিমতো বল খেলা হয়েছে আমাকে নিয়ে। উফ, বাবা গো, চোর কিলান কিলিয়েছে।’
‘কী হয়েছিল?’
‘কী আর হবে? আরেকটু হলেই কিমা হয়ে গিয়েছিলাম। ফ্যানটা হঠাত্ চালু হয়ে গেল, আমিও পিছলে পড়তে শুরু করলাম। যখন হাল ছেড়ে দিলাম, তখনই বন্ধ হয়ে গেল ফ্যান। আর এক সেকেন্ড এদিক ওদিক হলেই গেছিলাম। তারপর আর ধরে রাখতে পারলাম না নিজেকে। ফাঁক দিয়ে কীভাবে যে পড়লাম।’
‘ডানা খবর দিয়েছে আমাদের। ওর কাছে ঋণী হয়ে গেলি।’
হাসল রাজা। ‘ঋণী থাকতে আপত্তি নেই আমার।’
ওপর দিকে তাকিয়ে গায়ে কাঁটা দিল রুশোর। বাতাসে অল্প অল্প ঘুরছে ফ্যানের ব্লেড। ‘রাজা, বড় বাঁচা বেঁচেছিস।’
‘আমি ভাবছি, চোরেরা ফ্যানটার কথা জানে কি না?’
‘নিশ্চয় জানে।’
মাথা ঝাঁকাল রাজা। দাঁড়াতে গিয়ে ককিয়ে উঠল। ‘বাবারে ভর্তা হয়ে গেছে সব!’ দাঁড়ানোর চেষ্টা করল না আর, দেয়ালে হেলান দিল। ‘সুইচটা নিশ্চয় রিচারের অফিসে। তার মানে, চোর ঢোকার আগে ফ্যান বন্ধ করে দিয়েছিল কেউ। এমন কেউ, যার অধিকার আছে ওই অফিসে ঢোকার।’
‘তারপর আবার চালু করে দিয়েছে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল রুশো, ‘চোর বেড়িয়ে যাওয়ার পর। আমরা ঘরে ঢুকে ফ্যানটা চালু পেয়েছি। চোরের সঙ্গে রিচার হাত মেলাননি তো?’
টর্চ নেভানো। অন্ধকারেও যেন রাজার চোখে বিস্ময় দেখতে পেলো রুশো। ‘কী বলছ?’ বিস্মিত কণ্ঠ। ‘রিচার নিজের সাপ নিজে চুরি করবেন কেন?’
‘সাপ কেন চুরি হলো, সেটাই বুঝতে পারছি না আমি। আরেকটা ব্যাপার হতে পারে,’ থামল এক মুহূর্ত রুশো। হয়তো সুইচ অফ করে চোরকে সাহায্য করা হয়নি। চোর জানে কখন ফ্যান চালু হয়, কখন বন্ধ থাকে। বিরতি দিয়ে দিয়ে হয়তো চালু হয় ভেন্টিলেশন সিস্টেম। ওই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে সে।’
‘এটা হতে পারে। ডক্টর রিচারকে চোরের সাগরেদ ভাবতে পারছি না আমি। তাহলে তিনি আহত হতেন না।’
‘ব্যাপারটা অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে।’
‘তা পারে। কিন্তু বিশ্বাস করা কঠিন।’
‘তা ঠিক। তবু, জোসেফকে চোর ভাবার চেয়ে রিচারকে চোর ভাবতে রাজি আছি আমি।’
বাইরে চাঁদ উঠেছে। শ্যাফটটের মুখ দিয়ে আবছা আলো আসতে শুরু করেছে।
‘বেরোনো দরকার এখান থেকে, রুশো বলল,। ‘ওদিকে ওরা কি করছে কে জানে! সুইচ খুঁজতে গিয়ে অ্যালার্ম চালু করে দিয়েছে। ঘণ্টার শব্দ শুনছি আমি।’
‘এখনি বেরোব? আর সুযোগ না-ও পেতে পারি। ছাদটা একবার দেখে গেলে হয় না?’ কপালের কাটায় হাত বোলাল রাজা। ‘কী আছে দেখা দরকার।’
‘উঠতে পারবি?’
‘পারব।’
‘চল তাহলে। তাড়াতাড়ি করতে হবে।’
কিন্তু ঢাকনা খোলার জন্যে একটা স্ক্রু-ড্রাইভার দরকার।’
তলায় নানারকম বাতিল জিনিস পড়ে আছে। পেনলাইটের আলোয় শক্ত একটা ইস্পাতের পাত দেখতে পেলো রুশো, স্ক্রু-ড্রইভারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। জিজ্ঞেস করল, এটা দিয়ে হবে?’
‘হতে পারে।’
শ্যাফট বেয়ে আগে আগে উঠতে শুরু করল রুশো। খানিক আগে যেভাবে রাজা উঠেছিল, সেভাবে। রাজাও তার পিছু নিল। ব্লেডের ফাঁক দিয়ে যাওয়ার সময় শিউরে উঠল সে।
স্ক্রু-ড্রাইভারের মতো সহজে হলো না বটে, তবে পাতাটা দিয়ে হুড়কোর স্ক্রু ঘোরানো গেল। ঢাকনা খুলে ফেলল রুশো। বেরিয়ে এল খোলা ছাদে। অক্টোবরের ঠাণ্ডা বাতাস পরশ বোলাল চারপাশে। বাড়িটাকে অর্ধচন্দ্রের আকারে ঘিরে রেখেছে ছায়াঢাকা বন। কানে আসছে চিড়িয়াখানার নিশাচর জীবের বিচিত্র ডাক।
কোনো কোনোটা ভীতিকর। কেমন অপার্থিব পরিবেশ, এই পৃথিবীতে নয়, যেন অন্য গ্রহে পৌঁছে গেছে ওরা।
গাছগুলো দেখিয়ে বলল রুশো, ‘নিচে থাকলে ওই গাছের জন্যে ছাদ দেখা যাবে না।’
মাথা নেড়ে সায় জানাল রাজা। ছাদের কিনার ধরে হাঁটতে শুরু করল। মিহি বালিতে ঢেকে রয়েছে সারা ছাদ। পেনলাইটের আলোয় পায়ের ছাপ চোখে পড়ল। ঝুঁকে বসে ভালোমতো দেখল সে। ‘দুজন মনে হচ্ছে। বেশিও হতে পারে।’
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলো ফেলছে রুশো।
কী ভেবে আবার শ্যাফটের মুখের কাছে এসে দাঁড়াল রাজা।
হাত নেড়ে ডাকল ভাইকে। ‘আলো ফেল তো এখানে?...এই যে, দেখ, দাগ।’ রঙ নেই এই জায়গায়, উঠে গেছে ঘষা লেগে। সেটায় আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল, ‘দড়ির ঘষা। ভারী কিছু দড়িতে বেঁধে টেনে তোলা হয়েছে।’
একমত হলো রুশোও। ‘এখন বুঝতে পারছি, কী করে বের করেছ। কিন্তু নিল কে? সাপ দিয়ে কী করবে সে?’
‘হয়তো কোনো খেপাটে সংগ্রহকারী।’
‘হয়তো তবে খেপাটে বলা যায় না, বলতে হয় বদ্ধ উন্মাদ। বাঁচতে পারবে না। লুকিয়ে রাখা কঠিন হবে। সাপপাগল লোক কে কে আছে এই শহরে, সহজেই খুঁজে বের করে ফেলবে পুলিশ। আয়, পুরো ছাতটা ঘুরে দেখি আর কিছু পাওয়া যায় কি না।’
আলো ফেলে খুব ধীরে ধীরে এগোল ওরা। সতর্ক দৃষ্টি, যাতে কোনোকিছুই চোখে না এড়ায়। হঠাত্ থেমে গেল রুশো। ছাদের কিনারে ফেলে রাখা কয়েকটা বাক্স দেখিয়ে বলল, ‘দেখেছিস!’
‘আরে! ওই বাক্সটার মতোই তো! টাইগার স্নেকটা যেটায় করে এনেছে।’
কাত হয়ে আছে একটা বাক্স, ঢাকনা খোলা। ভেতরে আলো ফেলল রুশো। খালি বাক্স। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে রাজার নজরে পড়ল ব্যাপারটা। আঁকাবাঁকা একটা ছায়া। ভয়ের ঠাণ্ডা শিহরণ শিরশির করে নেমে গেল তার শিরদাঁড়া বেয়ে। চাপা গলায় বলল, ‘দাদা, দেখ!’
আলো ঘোরাল রুশো। বালিতে আরেকটা দাগ স্পষ্ট, এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। পায়ের ছাপ নয়, বড় কোনো সাপের বুকে হেঁটে এগিয়ে যাওয়ার মতো দাগ। ইস্, আরেকটা বড় টর্জ যদি হাতে থাকত! পেনলাইটের ম্লান আলো। ব্যাটারি কমে যাওয়ায় আরো কমে এসেছে। দাগটা অনুসরণ করে গেলে আচমকা মারাত্মক জীবটার মুখোমুখি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
যাবে?
দুজনেই একমত হলো, দেখা উচিত। খুব সাবধানে দাগ ধরে ধরে এগোল ওরা।
দাগটা শেষ হয়েছে ছাদের কিনারে। বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার জন্যে ড্রেনপাইপ আছে, ওটার মুখের কাছে।
সাপটাকে না দেখে খুশিই হলো রুশো। ‘বোঝা গেল, ডরি কোনদিক দিয়ে পালিয়েছে।’ দূরে তাকাল সে। গাছপালার ভেতরে একঝাঁক আলো দেখা গেল। ‘ওটাই ধোবাখানা। ওখানেই গোখরাটাকে পাওয়া গেছে। বাচ্চাটা খেলছিল।’
‘হ্যাঁ। পাইপ দিয়ে নেমে বনের ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছিল।’
পেনলাইটের ম্লান আলোয় আরো কতগুলো দাগ দেখতে পেলো দুজনে।
‘দেখ, চ্যাপ্টা কিছু একটা পড়েছিল এখানে,’ রুশো বলল। ‘আর এই যে, এখানে দাগ। বাক্সের কোণা ঘষে গেছে মনে হয়। তাড়াহুড়োয় হাত থেকে বাক্স ফেলে দিয়েছিল হয়তো চোরটা।’
‘হুঁ। ডরির খাঁচা। কোনোভাবে পড়ে খুলে গিয়েছিল, তারপর আর সাপটাকে ধরতে পারেনি চোর। পালিয়েছিল ওটা।’
ওখান থেকে কয়েক ফুট দূরে একটুকরো দড়ি পাওয়া গেল। ওদের অনুমান, ওটা দিয়ে বেঁধেই খাঁচাগুলো টেনে তুলছে চোর। তারপর ওটা ঝুলিয়ে আবার মাটিতে নামিয়েছে। দড়ির কাছে পড়ে আছে আরেকটা বাক্স। ডালা বদ্ধ। অক্ষত।
‘এটা ফেলে গেলে কেন?’ আনমনে বলল রাজা। এগিয়ে গিয়ে ওল্টানোর জন্যে হাত বাড়াল, লেবেলে কী লেখা আছে, পড়বে। বাক্সের ধার সবে ছুঁয়েছে তার আঙুল, থাবা মেরে হাত সরিয়ে দিল রুশো।
বাক্সের ভেতরে রাগে হিসিয়ে উঠল প্রাণীটা’
খাঁচাটা খালি নয়!
সাত
লাফিয়ে সরে এল রাজা, যেন তাজা বোমায় হাত দিতে যাচ্ছিল।
সরাসরি বাক্সের ওপর আলো ফেলল রুশো। প্লাস্টিকের মিহি তার দিয়ে ঢাকনা তৈরি হয়েছে। ভেতরে কী আছে স্পষ্ট চোখে পড়ে না। কালচে-বাদামি একটা সরীসৃপের নড়াচড়া বোঝা গেল। লেবেলে বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে : ক্রেইট।
‘ক্রেইট!’ উত্তেজিত কণ্ঠে প্রায় চিত্কার করে উঠল রুশো। ‘গোখরোর একটা প্রজাতি। এটা এখানে ফেলে গেল কেন?’
কেঁপে উঠল রাজা। ‘আরি দেখ ভালো করে! হুড়কো খোলা! চোরটাই খুলে রেখে গেছে কি না কে জানে! নাকি তাড়াহুড়োয় ফেলে পালিয়েছে, বন্ধ করার আর সুযোগ হয়নি? আল্লাহই জানে, এটার বিষদাঁত আছে, না ডরির মতো ভাঙা!’
নড়ে উঠল আবার সাপটা। ফাঁক হলো বাক্সের ডালা। বেরিয়ে এল আঁশযুক্ত একটা নাক।
হুড়কো লাগাতে গেল রাজা। চোখের পলকে মুখ বের করে ফেলল সাপটা, ছোবল মারল। ঝট করে হাত সরিয়ে আনল সে, লাফিয়ে সোজা হতে গিয়ে ধাক্কা লাগাল রুশোর হাতে, উড়ে চলে গেল পেনলাইটটা।
ম্লান আলো যা-ও বা ছিল, গেল চলে। মেঘে ঢাকা পড়েছে চাঁদ। খোলা ছাদে কুিসত ভয়ঙ্কর এক সরীসৃপের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হবে এখন। সবচেয়ে বড় ভয়, খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়েছে বিপজ্জনক প্রাণীটা।
‘কিছু করা দরকার!’ জরুরি কণ্ঠে বলল রাজা।
জবাব দিল না রুশো।
‘এই, দাদা, কথা বলছ না কেন?’
‘কী বলব? ওটার ইচ্ছের ওপরই এখন সবকিছু নির্ভর করছে। ঠাণ্ডা সইতে না পেরে আবার হয়তো বাক্সে ঢুকবে।’
‘যদি না ঢোকে? যদি বাক্সের চেয়ে গরম কিছুর খোঁজে আসে? মানুষের শরীরের তাপ?’
চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ওরা। সময় যেন স্থির। অন্ধকারে দেখার চেষ্টা করছে, কান খাড়া রেখেছে সামান্যতম শব্দের জন্যে। কিন্তু নিঃশব্দে চলাচল করে সাপ।
মেঘের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল চাঁদ। দেখা যাচ্ছে বাক্সটা। সাপটা নেই, মানে, বাক্সের বাইরে দেখা গেল না। ভেতরে কী আছে? সাবধানে ঝুঁকে হুড়কোটা লাগিয়ে দিল রুশো। তারপর থাবা দিল ডালার ওপর।
ভেতরে রেগে উঠল সাপটা। যে কারণেই হোক, বেরিয়েও বেরোয়নি, আবার ঢুকে গেছে বাক্স। বোধহয় বাইরে শীত বলেই।
হুড়কো লাগিয়েও নিরাপদ মনে করল না রুশো। দড়িটা তুলে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলল বাক্সের ডালা, হুড়কো খুলে গেলেও ডালা তুলতে পারবে না আর সাপটা। ‘যাক, এইবার নিশ্চিন্ত।’ হাসল। ‘এটা ফিরিয়ে দেয়ার সময় কী গল্প শোনাব চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে?’
‘যা খুশি বলে দিলেই হলো, কিছু যায়-আসে না আর। শেরখান আর ডানাকে নিশ্চয় ধরে ফেলেছে এতক্ষণে।
পাইপ বেয়ে নামল দুজনে। দরজা দিয়ে ঢুকল ল্যাবরেটরিতে। পাগল হয়ে উঠল পাগলা ঘণ্টিগুলো। তৈরিই ছিল প্রহরীরা। দুই ভাইকে নিয়ে এসে রিচারের অফিসে ঢোকাল। ডেস্কের ধারে চেয়ারে মুখ কালো করে বসে আছে শেরখান আর ডানা। দুই ভাইকে দেখে উজ্জ্বল হলো মুখ।
আরেকটা পরিচিত মুখ রয়েছে ঘরে।
‘যাক, ভালোই আছ,’ বলল পল নিউম্যান। ‘দয়া করে বলে ফেল তো এখন ঘটনাটা কী? পুরো শ্যাফটে খুঁজলাম তোমাদের। গিয়েছিলে কই?’
একটা বাক্স নিয়ে ঢুকল একজন প্রহরী। দেখে চমকে উঠল পল। ‘এটা পেলে কোথায়?’
‘ওদের কাছে,’ দুই ভাইকে দেখিয়ে দিল গার্ড।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকাল পল।
‘দেখ,’ গম্ভীর হলো পল, ‘এমনিতেই বিনা অনুমতিতে ঢুকে যথেষ্ট অন্যায় করেছ। তার ওপর চোরাই মালসহ হাতেনাতে ধরা পড়ার শাস্তি বুঝতে পারছ? চোরাই আটটার একটা নয়তো?’
‘মনে হয়। আমরা চুরি করিনি। জোসেফকে সাহায্য করতে চাইছি।’ কীভাবে কী ঘটেছে সংক্ষেপে জানাল রুশো।
‘হুঁ’ মাথা দোলাল পল। ‘তাহলে এই ব্যাপার। ছাদ দিয়ে নেমেছে। বেরিয়েছেও ওই পথেই।’
‘তা-ই তো মনে হলো। চোর একলা নয়, তার সহকারী আছে।’
‘কেন, একজনে পারে না?’ শেরখান বলল।
‘কি জানি। বোধহয় না।’
‘সহকারীটা কে?’ মোলায়েম কণ্ঠে বলল পল। ‘জোসেফ?’
‘জোসেফ কিছুই করেনি!’ রেগে গিয়ে বলল রাজা।
‘কিন্তু সবকিছু তো ওকেই নির্দেশ করছে।’
‘কী নির্দেশ করছে? একটা স্ক্রু-ড্রাইভার? যে কেউ ফেলে রাখতে পারে ওটা শ্যাফটে। আর বাড়ির বেসমেন্টে সাপ? ফাঁসানোর ইচ্ছে হলে ওগুলোও লুকিয়ে রেখে আসা যায়।’ রাজার চোখ জ্বলছে। ‘বেচারাকে ফাঁসান হয়েছে।’
নীরবে রাজার দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে রইল পল। তারপর বলল, ‘জোসেফের টাকার প্রয়োজন ছিল।’
‘ছিল। নতুন মডেলের একটা কম্পিউটার ভীষণ পছন্দ তার। তাতেই বা কি? কেউ কোনো জিনিস কিনতে চাইলেই কি সে চোর প্রমাণিত হয়ে গেল নাকি?’
‘না, তা প্রমাণিত হয় না,’ হাত নাড়ল পল। ‘ও চোর না হলে আমিও খুশি হতাম। কিন্তু ব্যাংকে ওর অ্যাকাউন্টে দশ হাজার ডলার জমা পড়েছে।’
মুহূর্তের জন্যে স্তব্ধ হয়ে গেল রাজা। হাত তুলল। ‘কখন জমা করল সে? সকাল থেকে ছিল আমাদের সঙ্গে, তারপর নিয়ে গেলেন আপনারা। ব্যাংকে যাওয়ার সময়ই পায়নি।’
‘টাকা জমা দেয়ার জন্যে আজকাল ব্যাংকে যাওয়ার দরজার পড়ে না।’ ঘরের কোণে রাখা একটা কম্পিউটার দেখাল পল। ‘ওটার সাহায্যে অর্ডার পাঠিয়েছে। সকালে ওই কাজ করে থাকতে পারে।’
জবাব দিতে পারল না রাজা। রুশোর দিকে তাকাল। সেও কিছু বলতে পারল না। ঢোক গিলল রাজা, মাথা নাড়ল জোরে জোরে। ‘যত যা-ই বলুন, আমি বিশ্বাস করি না, জোসেফ এ কাজ করেছে। ঘাপলা একটা নিশ্চয় আছে কোথাও, যেটা বের করতে পারছেন না আপনারা।’
‘তাছাড়া,’ মুখ খুলল রুশো, ‘কয়েকটা সাপের জন্যে দশ হাজার ডলার দিতে যাবে কে?’
‘অনেকেই আছে,’ শুকনো গলায় বলল পল। ‘ডক্টর বিগলের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছি। তিনি বললেন, বিষাক্ত সাপ দামি হওয়ার অনেক কারণ আছে।’ নোটবুক বের করে পাতা ওল্টাল সে। ‘লিখে এনেছি। রাজগোখরোর বিষ প্রতি আউন্সের দাম পনেরো শ ডলার। মালয়েশিয়ান গোখরোর বিষও একই দাম। ক্রেইটের বিষ,’ মেঝেতে রাখা সাপের খাঁচাটার দিকে তাকাল সে, ‘বারো শ ডলার।’ শব্দ করে নোটবুক বন্ধ করল। ‘টাইগার স্নেকের বিষ সবচেয়ে দামি, প্রতি আউন্স পঁচিশ শ ডলার। এবং, তোমাদের অবগতির জন্যে জানাচ্ছি, একটা সাপ এক হপ্তায় এক আউন্স বিষ সহজেই সাপ্লাই দিতে পারে। তার মানে, বছরে ওই একটা সাপ থেকেই আয় করা যাবে পাঁচ লক্ষ ডলার। কী মনে হয়, দামি?’
চুপ করে রইল সবাই।
‘আরো আছে, আবার বলল পল। ‘রেপটাইল ফার্ম আর ল্যাবরেটরিগুলোতে বিষাক্ত সাপ হীরার চেয়ে দামি।’
বিড়বিড় করল রুশো, ‘সাপের বিষ যে এত দাম, জানতাম না!’
‘করে কী বিষ দিয়ে?’ রাজা জানতে চাইল।
‘বেশিরভাগ, গবেষণা। ডাক্তার বিগল বললেন মরফিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় বিষ। তবে ব্যবহার হয় না সাধারণত, কারণ খুবই দামি। মিলান সহজ নয়।’ ক্রেইটের খাঁচার দিকে তাকাল পল। ‘সাপের বিষ আহরণকে পেশা হিসেবে নিতে চায় না তেমন লোকে। কাজটা খুব বিপজ্জনক।’
‘হ্যাঁ, ভুলচুক হলে ক্ষমা নেই,’ মাথা ঝাঁকাল রুশো।
‘কাজেই বুঝতেই পারছ, জোসেফের সঙ্গে কথা বলা এখন খুবই জরুরি। সমস্ত প্রমাণ তার বিরুদ্ধে। লুকিয়ে থেকে বাঁচতে পারবে না।’
‘দেখুন,’ ডানা বলল, ‘জোসেফকে আমরা অনেকদিন থেকে চিনি। সে ওরকম কাজ করতে পারে না।’
‘হ্যাঁ, আমিও তা-ই বলি,’ বোনের সঙ্গে সুর মেলাল শেরখান। এসবের অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে। জোসেফ কখনো কিছু চুরি করেছে বলে শুনিনি।’
‘সবকিছুরই প্রথমবার বলে একটা কথা আছে,’ পল বলল। ‘ও তোমাদের বন্ধু, তাই বিশ্বাস করতে পারছ না। জোরাল সব প্রমাণ, ফেলবে কী করে?’
‘সিকিউরিটি বলল চোর ঢুকেছে,’ পেছন থেকে বলে উঠল একটা কণ্ঠ, ‘তাই দেখতে এলাম।’ ঘরে ঢুকলেন জেমস কক। শেরখান আর ডানাকে দেখলেন। ‘ও, ধরা পড়েছে।’ রুশো আর রাজার ওপর চোখ পড়তে বললেন, ‘তোমরা এখানে কী করছ?’ জবাবের অপেক্ষা করলেন না। পলকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘খানের খবর কী? পাওয়া গেছে?’
মাথা নাড়ল পল।
‘বেশ, পাওয়া গেলে,’ কঠিন হলো ককের কণ্ঠ, ‘একটা খবর জানাবেন তাকে। হাজার হাজার ডলার দামের একটা রাজগোখরোর সর্বনাশ করে দিয়েছে সে। সকাল পর্যন্ত বাঁচে কি না সন্দেহ।’ স্বর নরম করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডক্টর রিচারের খবর কী?’
‘ভালো না...,’ থেমে গেল পল। খাঁচার মধ্যে হিসিয়ে উঠেছে ক্রেইট।
এতক্ষণে বাক্সটার দিকে চোখ গেল ককের। ঝুলে পড়ল নিচের চোয়াল। প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘ক্রেইট!’
‘এটার জন্যে ওদের ধন্যবাদ জানাতে পারেন, মিস্টার কক,’ রুশো-রাজাকে দেখাল পল। ‘ওরা খুঁজে পেয়েছে ছাদের ওপর।’
‘ছাদের ওপর? ওটা ওখানে গেল কীভাবে?’ বিস্ময় ফুটল ককের চোখের তারায়। ‘ওরাই বা ওখানে কী করতে গিয়েছিল?’
‘ওদের বন্ধুকে নির্দোষ প্রমাণ করতে। কিছু সূত্র পেয়েছে...,’
‘ওসব সূত্র-ফুত্র নিয়ে মাথাব্যথা নেই আমার,’ বাধা দিয়ে বললেন কক। ‘নিয়মিত খাজনা দিই আমি, ওই খাজনা থেকে বেতন যায় আপনাদের পকেটে। আমি আশা করব, চুরির তদন্ত করে সেটার কিনারা করবে পুলিশ, কয়েকটা বাচ্চা ছেলে নয়!’ লম্বা দম টেনে ধীরে ধীরে ছাড়লেন তিনি। ‘দেখুন, আমি খুব ক্লান্ত। কালও অনেক কাজ আছে। দয়া করে আপনারা যদি এখন যান...সাপটাকে ঠিকঠাক করে রেখে আমিও যেতে পারি।’
পল নিউম্যানের মুখে রক্ত জমল। ‘বিনা অনুমতিতে চিড়িয়াখানায় ঢোকার জন্যে এদের বিরুদ্ধে নালিশ করতে চান?’
হাত নেড়ে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেন কক। সাপের খাঁচাটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
ছেলেদের দিকে ফিরল পল। ‘তোমরাও যেতে পার। তবে ভবিষ্যতে এরকম কাজ আর করবে না। পরের বার আর সাপ না-ও পেতে পার।’
বেরোনোর সময় পকেট থেকে কার্ডটা বের করে একজন গার্ডকে দিয়ে বলল রুশো, ‘সকালে এটা ফেরত দিতে ভুলে গিয়েছিলাম।’
রাজাও তার পাসটা বের করল। থমকে গেল। অবাক হয়েছে। ‘এই, দাঁড়াও দাঁড়াও,’ ভাইকে বলল সে। ‘ছাদ থেকে নেমে আমরা ল্যাবরেটরিতে ঢোকার সময় অ্যালার্ম বেজেছিল। কেন?’
হাসল সিকিউরিটি ম্যান। ‘তোমাদের পাস এখন বাতিল। কোড পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন পাস দেয়া হয়েছে স্টাফদের। সেরেছি। এই ঘণ্টাখানেক আগে।’ পাসগুলোর দিকে ইঙ্গিত করল সে। ‘এগুলো স্যুভেনির হিসেবে রেখে দিতে পার।’
পাস দুটো আবার পকেটে ভরে রাখল দুই ভাই। পলের পিছে পিছে পার্কিং লটে চলল ছেলেমেয়েরা।
রুশো জিজ্ঞেস করল পলকে, ‘ডক্টর রিচার কেমন আছে? অবস্থা কতটা খারাপ?’
‘ভালো না।’
‘অ্যান্টিভেনিন কাজ করছে না?’
‘আসেইনি এখনো।’
‘কী? আসেনি! কেন?’
‘নিয়ম-কানুন!’ তিক্তকণ্ঠে বলল পল। ‘বিষ, সিরাম, এসব জিনিস বর্ডার পার করতে হলে বিশেষ অনুমতির দরকার হয়। আজ রাত সাড়ে দশটা নাগাদ এসে যাওয়ার কথা।’
‘খবর দেওয়ার পর তো চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেল!’ রাজা বলল।
‘হ্যাঁ। দপ্তরের ফাইল মানুষের জরুরি অবস্থা বোঝে না!’
পলকে গুডনাইট জানিয়ে ভ্যানে উঠল ছেলেরা।
রাজার অনুরোধে পথে একটা স্ন্যাকবারে থামল রুশো।
বার্গার চিবাতে চিবাতে আলোচনা চলল।
‘ফ্যানের সুইচটা যখন পেলাম,’ ডানা জানাল, ‘পাগল হয়ে উঠেছে তখন অ্যালার্ম। দৌড়ে আসছে গার্ডেরা...’
‘তিরিশ জনের কম না,’ বলল শেরখান।
‘দূর, খালি বেশি কথা বল!’ ভাইকে ধমক লাগাল ডানা। ‘তিরিশ জন দেখলে কোথায়? তিন জন।...শেরখান ওদেরকে কী বলল জান? রাতে জানোয়ারেরা কী করে ঘুমায় তাই দেখতে নাকি গিয়েছি। স্কুলের জন্যে রিপোর্ট তৈরি করব।’
রাজা হাসল। ‘বিশ্বাস করেছে ওরা?’
‘আরি দূর,’ বাতাসে থাবা মারল শেরখান। ‘তা-ই কি করে নাকি? আমাদের আটকে রেখে সোজা গিয়ে পুলিশকে ফোন করল। কয়েক মিনিট পরেই এসে হাজির পল নিউম্যান। আমাদের দেখে ওর চেহারা যা হয়েছিল না, যদি দেখতে।’
চিন্তিত ভঙ্গিতে খাবারে কামড় বসাল রাজা। ‘ফ্যানটা চালু হলো কী করে হঠাত্? সুইচটা কোথায় ছিল?’
রুশো বলল, ‘অটোমেটিক সিস্টেমে চলে হয়তো, বিরতি দিয়ে দিয়ে, যদি মেইন ব্রেকার বক্স থেকে কেউ চালু করে না দিয়ে থাকে। সন্দেহ বাড়ছে এখন আমার, ডক্টর রিচারের ব্যাপারটা আদৌ দুর্ঘটনা কি না!’
‘হ্যাঁ,’ ডানা বলল, ‘চুরিটা হওয়ার সময় মনে হচ্ছে একা ছিলেন না অফিসে। বললেই তো আবার জোসেফের ঘাড়ে...’
আপেল পাই নিয়ে এল ওয়েট্রেস। ঠিক এই সময় বলে উঠল কেউ, ‘আরে, আরে, আমাদের জোসেফ খানের বন্ধুরা না?’
ফিরে তাকাল ছেলেরা। রাজা বলল, ‘মিস্টার মরগান!’
হ্যাঁ, আমিই,’ নিজেই চেয়ার টেনে বসে পড়ল রিপোর্টার। রুশোর প্লেট থেকে একটুকরো আলুভাজা তুলে নিল।
এত আন্তরিকতা পছন্দ হলো না রুশোর, কড়া কিছু বলতে ইচ্ছে হলো, বলল না।
‘কী চাই?’ ঝাঁঝাল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল রাজা। ‘বানিয়েবুনিয়ে লিখে এমনিতেই তো একজনের সর্বনাশ করে দিয়েছেন। আবার কী?’
‘আমি আমার কাজ করেছি। তোমাদের বন্ধুকে কিছু লোক যদি পছন্দ করতে না পারে, সেটা কি আমার দোষ বলো?’
‘কেন, কার পাকা ধানে মই দিয়েছে জোসেফ?’
‘আপনি ওভাবে লিখতে গেলেন কেন, মিস্টার মরগান?’ শান্তকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল রুশো। ‘এমনভাবে লিখেছেন, যেন ওর ওপর আপনার রাগ আছে। মিথ্যে কথাও কিছু কম লেখেননি।’
নির্লজ্জের মতো হাসল রিপোর্টার। ‘মানুষকে সাবধান করা আমার দায়িত্ব। কেউ পারমাণবিক বর্জ্য ফেলে স্বাস্থ্যহানি ঘটাতে চাইলে যে কথা, কোনো উন্মাদ বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দিলেও একই কথা।’
জ্বলে উঠল ডানার চোখ। ‘মানুষকে খেপিয়ে তুলেছেন আপনি।’
‘নিশ্চয় কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে,’ যোগ করল শেরখান। ‘ন্যায়-অন্যায় নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই আপনার। আপনি চেয়েছেন একটা রোমাঞ্চকর গল্প দিতে, পত্রিকার কাটতি বাড়াতে।’
‘তোমাদের বন্ধুর কথা লেখাতেই এরকম রেগে যাচ্ছ,’ ঠাণ্ডা হাসল মরগান।
‘আপনি আসলে কী চান, বলুন তো, মিস্টার মরগান?’ প্রশ্ন করল রুশো।
‘প্রতিটি রিপোর্টার যা চায়। নাম। পত্রিকার কাটতি।’
‘আমি জানতে চাইছি, এখানে কী চান?’
‘জোসেফ খানের সঙ্গে দেখা করতে চাই। সে কোথায় তোমরা নিশ্চয় জান।’ ঘরের অন্যান্য টেবিলে চোখ বোলাল মরগান। ‘ভালো টাকা দেবো।’
জবাবে অস্বস্তিকর নীরবতা।
চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল মরগান। একটা কার্ড টেবিলে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘আমার ঠিকানা। মত বদলালে যোগাযোগ কোরো।’
লোকটা বেরিয়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল ওরা। পাইয়ের প্লেট ঠেলে সরিয়ে দিয়ে শেরখান বলল, ‘খিদেই নষ্ট করে দিয়ে গেল ব্যাটা!’
কয়েক মিনিট পর, ভ্যান স্টার্ট দিচ্ছে রুশো, এই সময় একটা স্পোর্টস কার পাশ দিয়ে শাঁ করে গিয়ে ঢুকল অন্য গাড়ির ভিড়ে।
‘পিলারিটা না?’ রুশো বলল। ‘চিড়িয়াখানায় যেটা দেখেছিলাম?’
‘হ্যাঁ,’ রাজা বলল চিন্তিত ভঙ্গিতে, ‘কার গাড়ি ওটা? এখানকার কেউ নয়। তাহলে আগে একবার হলেও আমার চোখে পড়তই।’
দ্রুত গাড়ি চালাল রুশো, স্পোর্টস কারের মালিক কে, দেখতে চায়। কিন্তু আর দেখতে পেলো না। চলে গেছে।
আধঘণ্টা পর নিজেদের বাড়ির ড্রাইভওয়েতে ঢুকল রাজা। ডানা আর শেরখানকে তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে এসেছে। আরেকটা গাড়ি চোখে পড়ল।
‘আরে!’ চেঁচিয়ে উঠল রাজা। ‘ড্রেক ডানকান!’
‘বাবার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন হয়তো,’ ক্লান্ত কণ্ঠে রুশো বলল। ‘কিংবা হয়তো জোসেফের খোঁজ জানতে এসেছেন আমাদের কাছে।’
ভ্যান থেকে নেমেই স্থির হয়ে গেল রাজা। বড় বড় হয়ে গেল চোখ।
গ্যারেজের পাশে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা মূর্তি। জোসেফ খান!
আট
বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আছে দুই ভাই।
অবশেষে রাজার মুখে কথা ফুটল। ‘জোসেফ, কোথায় ছিলে তুমি? আমরা এদিকে চিন্তায় বাঁচি না।’
খোঁড়াতে খোঁড়াতে ওদের দিকে এগিয়ে এল জোসেফ। ‘তোমাদের দেখে যা খুশি হয়েছি না!’
চোখ ডলল রুশো।
ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে জোসেফকে। কেমন বন্য হয়ে উঠেছে চেহারা।
‘তোমার জন্যে খুব ভাবছিলাম,’ রুশো বলল। তাকাল পুলিশের গাড়িটার দিকে। ‘পুলিশ তোমাকে খুঁজছে।’
‘জানি। মানে, আন্দাজ করেছি,’ জোসেফ বলল।
‘ওদের ধারণা, তুমি পালিয়েছ। জোসেফ, কোথায় গিয়েছিলে?’
‘পালাইনি,’ দ্বিধা করছে জোসেফ। ‘রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে বাস ধরে সোজা চলে গিয়েছিলাম ওশান বিচ। হেঁটেছি আর ভেবেছি, ভেবেছি আর হেঁটেছি। সময়ের খেয়াল ছিল না।’ বোকার মতো হাসল। ‘যখন খেয়াল হলো, দেখি, রাত। বাস বন্ধ। সারাটা পথ হেঁটে আসতে হয়েছে আমাকে।’
‘ষোলো মাইল হেঁটে এসেছ!’ চেঁচিয়ে উঠল রাজা।
‘সত্যি বলছি,’ শুকনো গলায় বলল জোসেফ। ‘বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক রাত। দেখি, বহু লোক জটলা করছে। দেখতে পেলে ধরে কী করত কে জানে! ভয়ে আর ঢুকলাম না। চলে গেলাম শহরতলিতে। একটা সিনেমায় ঢুকলাম। ইস্!’ গুঙিয়ে উঠল সে। ‘জুতা পায়ে এতদূর হেঁটেছ কখনো? ফোসকা পড়ে গেছে! সাংঘাতিক জ্বলে!’
হেসে উঠল দুই ভাই। পরমুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল আবার।
‘জোসেফ,’ শান্তকণ্ঠে বলল রুশো, ‘ব্যাংকে তোমার অ্যাকাউন্টে দশ হাজার ডলার পেয়েছে পুলিশ। আর তোমাদের বেসমেন্টে দুটো গোখরো সাপ।’
কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে যেন জোসেফের চোখ। ‘আমাদের বেসমেন্টে গোখরো সাপ! আমার অ্যাকাউন্টে দশ হাজার ডলার!’ রাগে কথা আটকে যাওয়ার অবস্থা হলো তার। ‘কীভাবে? আমি...আমি...!’ মুঠোবদ্ধ হয়ে গেল হাত। ‘আমাকে ফাঁসানোর জন্যে উঠেপড়ে লেগেছে কেউ।’
জোসেফের কাঁধে হাত রাখল রুশো। ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল জোসেফ। ‘কে? কে করছে এসব?’ চেঁচিয়ে উঠল সে। ‘তোমরা তো নিশ্চয় আমাকে চোর ভাবছ!’
‘শান্ত হও, জোসেফ,’ কোমল গলায় বলল রুশো। ‘আমরা তোমার বন্ধু, মনে রেখো।’
‘সাপগুলো কীভাবে বেসমেন্টে গেল, আন্দাজ করতে পারছ কিছু?’ রাজা জিজ্ঞেস করল।
‘না!’
‘তোমাকে বিশ্বাস করছি আমরা, জোসেফ। সাপ রেখেছে, টাকা জমা দিয়েছে তোমাকে অপরাধী দেখানোর জন্যেই।’
বাড়ির দিকে হাত তুলল রাজা। ‘এখন পুলিশ এসে বসে আছে। কী জন্যে?’
‘ড্রেক ডানকান,’ জোসেফ বলল। ‘আসতে দেখেছি আমি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। ‘আমি শিওর, আমাকেই খুঁজতে এসেছেন। কী যে করি!’
‘কিছু করার নেই, জোসেফ,’ রুশো বলল। ‘যা হয়, হবে। চলো দেখি, কী জন্যে এসেছেন।’
লিভিং রুমে ঢুকল তিন জনে। মিস্টার রাইসুল আসাদ ওদের দেখে বলে উঠলেন, ‘এই যে, ছেলেরা, বাইরে খুব ঠাণ্ডা, তা-ই না? অযথা এতক্ষণ ওখানে কষ্ট করছিলে।’
সোফায় বসে আছেন ডানকান। জোসেফের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
রাজার চোয়াল ঝুলে পড়ল। ‘বাবা, তুমি জানলে কী করে? জোসেফের কথা...’
হাসলেন মিস্টার রাইসুল আসাদ। ‘তোমাদের গাড়ির শব্দ শুনলাম। দেখলাম, গ্যারেজের ওপাশ থেকে কে যেন বেরিয়ে আসছে। দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে কি আর এমন কষ্ট হয়?’
এবার জোসেফের অবাক হওয়ার পালা। ‘আপনি জানতেন, আমি ওখানে লুকিয়েছিলাম? তাহলে কেন এসে আমাকে ধরলেন না? পুলিশকে নাকি আমাকে খোঁজার আদেশ দেয়া হয়েছে।’
‘অর্ডারটা ক্যান্সেল করে দেয়া হয়েছে দশ মিনিট আগে,’ বললেন চিফ। ‘ফিরোজের অনুরোধে করেছি।...জোসেফ, কয়েকটা প্রশ্ন করব তোমাকে। ঠিক ঠিক জবাব দিও। প্রথমেই বলো, এতক্ষণ ছিলে কোথায়?’
জবাব দিল জোসেফ।
আধঘণ্টা ধরে একের পর এক প্রশ্ন করে গেলেন ডানকান। জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেল জোসেফ। শেষে তিনি বললেন, ‘জোসেফ, তোমার অ্যালিবাই খুব দুর্বল। প্রমাণ বলছে, তুমি দোষী। কিন্তু আমার মন বলছে, ওরকম গাধামি করার মতো বোকা তুমি নও। ফিরোজ আর তার ছেলেদের ধারণা, তুমি নির্দোষ। পল নিউম্যানও তোমার পক্ষ নিয়ে তর্ক করছিল আমার সঙ্গে।’
উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ‘তোমাকে হাজতে ভরে রাখাই উচিত হতো। কিন্তু রাইসুল আসাদ মানা করছে। ও তোমার দায়িত্ব নিয়েছে।’ কঠিন হলো তাঁর চোখের দৃষ্টি, ‘শোন জোসেফ, আমরা সবাই তোমার ভালো চাইছি। সত্যি সত্যি যদি দোষী হয়ে থাক, মনে রেখো, আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না। ওদের মতো ভালো লোক,’ আসাদ সাহেব আর তাঁর দুই ছেলেকে দেখালেন চিফ, ‘হয় না। যদি ওদের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে থাক...’
‘নিচ্ছি না, চিফ! কসম খেয়ে বলছি, কিচ্ছু করিনি আমি। এখন প্রমাণ করতে পারব না, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি নির্দোষ।’ রাইসুল আসাদের দিকে ফিরল সে। ধরাগলায় শুধু বলল, ‘আঙ্কেল, ধন্যবাদ। অনেক করেছেন আমার জন্যে।’
‘বন্ধু-বান্ধব থাকেই সে-জন্যে, জোসেফ,’ বললেন মিস্টার রাইসুল আসাদ।
যাওয়ার জন্যে পা বাড়িয়েও থেমে গেলেন চিফ। রুশো আর রাজাকে বললেন, ‘দেখ, তোমারাও সাবধান। আমি আশা করব, চিড়িয়াখানার ব্যাপারে আর নাক গলাবে না। বিপদে পড়বে শেষে। যা করার পুলিশই করবে, তোমরা আর যাবে না।’
ডানকান চলে গেলে ছেলেদের বললেন মিস্টার রাইসুল আসাদ, ‘নিশ্চয় খুব ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে আজ।’
মাথা ঝাঁকাল রুশো। ‘হ্যাঁ।’ চাপা গুড়গুড় শোনা গেল, মেঘ জমছে আকাশে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল সে। ‘মনে হচ্ছে ভালোই নামবে। ভ্যানটা গ্যারেজে রেখে আসি।’ কি ভেবে জোসেফের দিকে তাকাল। ‘তুমি আজ এখানেই থাক।’
ছেলের সঙ্গে একমত হলেন মিস্টার রাইসুল আসাদ, ‘মন্দ বলনি।’
‘কিন্তু আমি আপনাদের বিরক্ত...’
‘আরি দূর,’ হাত নাড়ল রাজা, ‘কিসের বিরক্ত? থাক, থাক।’
‘এ বাড়িতে তুমি নিরাপদ,’ রুশো বলল।
‘তবে,’ হেসে বলল রাজা, ‘বিছানা পাবে না। কাউচেই কাটাতে হবে রাতটা। ভ্যানে স্লিপিং ব্যাগ আছে, একটা নিয়ে এলেই হলো।’
‘বেশ,’ হাত ওল্টাল জোসেফ। ‘সবাই যখন বলছ...আমি রুশোর সঙ্গে যাই। ব্যাগটা নিয়ে আসি।’
তিন জনেই বেরাল। বিদ্যুতের শিখা চিরে দিল যেন দক্ষিণের আকাশ। ভেসে এল মেঘের গুমগুম। ঝড় আসছে। বৃষ্টি শুরু হয় হয়।
‘এসে ভালোই হলো,’ রুশো বলল। ‘জানালা খুলে রেখে গিয়েছিলাম।’
‘প্যাসেঞ্জার ডোর লক করা,’ ভ্যানের কাছে পৌঁছে রাজা বলল। ‘দাদা, চাবিটা দাও তো।’
‘দিচ্ছি...আরে, চাবি কোথায় ফেললাম! পকেটে নেই তো!’
সাঁই সাঁই বইতে শুরু করল ঝড়ো বাতাস। প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল।
‘কোথায় ফেললে?’ জোরে বলল জোসেফ, আস্তে বললে বাতাসের জন্যে শোনা যায় না। ‘গাড়ির কাছে?’
ভ্যানের কাছে চত্বরে খুঁজতে লাগল ওরা।
বিদ্যুত্ চমকাল। বাজ পড়ল আবার।
‘নাহ্, কিচ্ছু দেখা যায় না,’ রাজা বলল, ‘এত অন্ধকার।’
হঠাত্ আকাশের এমাথা-ওমাথা চিরে দিল যেন বিদ্যুতের শিখা, ঝিলিক দিয়ে উঠল তীব্র নীলচে-শাদা আলো। আলোকিত করে দিল দশ দিক।
‘পেয়েছি! চেঁচিয়ে উঠল জোসেফ। তুলে নেয়ার জন্যে ঝুঁকল। ছট করে একটা বিচিত্র শব্দ হলো। খোলা জানালা দিয়ে উড়ে গিয়ে কী যেন বিঁধেছে ভ্যানের ড্রাইভিং সিটে।
‘কী ওটা?’ সোজা হয়ে জিজ্ঞেস করল জোসেফ।
‘বুঝলাম না!’ সতর্ক হয়ে উঠেছে রুশো। ‘শব্দ শুনে মনে হলো...’
আবার বিদ্যুত্ চমকাল। বজ্রপাতের শব্দ কানে আসার আগেই আবার শোনা গেল বিচিত্র ছট। পরক্ষণেই ঠঙ করে কী যেন লাগল ভ্যানের দরজায়, রাজার মাথার কয়েক ইঞ্চি তফাতে।
‘ডার্ট!’ চিত্কার করে উঠল সে। ‘ডার্ট ছুড়ছে!’
নয়
‘মাথা নামাও!’ চেঁচিয়ে নির্দেশ দিয়েই মাথা নিচু করে ফেলল রুশো, প্রায় ডাইভ দিয়ে পড়ল মাটিতে। চাবিটা নিতে পারেনি জোসেফ, খেয়াল করেছে সে। মাটিতে পড়েই আগে ওটা কুড়িয়ে নিল।
খটাং করে ভ্যানে আঘাত হানল আরেকটা ডার্ট। আধশোয়া হয়েই হাত বাড়িয়ে দরজার তালা খুলে ফেলল রুশো। মাথা নিচু রেখে শরীরটাকে মুচড়ে তুলে আনল ড্রাইভিং সিটে। প্রায় একইসঙ্গে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে জ্বেলে দিল হেডলাইট। রিভার্স করে পিছাতে শুরু করল। অন্ধকারের চাদর ফুঁড়ে দিল যেন হেডলাইট। পাতাবাহারের ঝাড়ের আড়ালে একটা মূর্তিকে নুয়ে পড়তে দেখল সে।
‘ওই যে, ব্যাটা!’ রাজাও দেখতে পেয়েছে। দৌড় দিল। জোসেফকে ডাকল, ‘জলদি এস! পালিয়ে যাবে!’
‘থাম, যেও না!’ হুঁশিয়ার করল রুশো।
কিন্তু রাজা শুনল না। হারিয়ে গেল ঝাড়ের ওপাশে।
লাফিয়ে গাড়ি থেকে নেমে রুশোও দৌড় দিল। তার আগেই ছুটেছে জোসেফ। রহস্যময় হামলাকারীকে তাড়া করল ওরা।
পিছু নিয়ে চলে এল এক অন্ধকার গলিপথে। বাতাসের শোঁ শোঁ আর বজ্রের চাপা গুমড়ানি ছাড়িয়ে শোনা গেল শাক্তিশালী ইঞ্জিনের ভারী গুঞ্জন।
থমকে দাঁড়াল রাজা। পাশে এসে দাঁড়াল রুশো আর জোসেফ। হাঁপাচ্ছে তিন জনেই। অন্ধকারে আবছামতো দেখা গেল গাড়িটাকে। হেডলাইট নিভানো। ছুটতে শুরু করেছে। চলে যাওয়ার আগেই বিদ্যুত্ চমকাল। ক্ষণিকের জন্যে স্পষ্ট চোখে পড়ল গাড়িটা।
‘স্পোর্টস কার!’ চেঁচিয়ে উঠল রাজা। ‘পিলারি!’
ওটাকে ধরার আর উপায় নেই। নিরাশ হয়ে ফিরল ওরা। ভ্যানের কাছে আসতে আসতে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
ড্রাইভিং সিটে উঠল আবার রুশো। পাশের জানালাটা তুলে দিতে যাবে, পিঠে কী যেন লাগল। গাড়ির ভেতরের আলো জ্বেলে দিয়ে ফিরে তাকাল, কী লাগছে দেখার জন্যে। সিটে বিঁধে রয়েছে একটা ডার্ট। লম্বা, সরু একটা টিউব, মাথায় ইনজেকশনের সুচের মতো সুচ। জিনিসটা দেখাল সঙ্গীদের।
‘ট্র্যাঙ্কুইলাইজার ডার্ট!’ চমকে গেল জোসেফ। ‘চিড়িয়াখানায় দেখেছি। বড় জানোয়ারের চিকিত্সা করার আগে এই ডার্ট ছুড়ে বেহুঁশ করে নেয়।’
‘এটার ভেতরে কী ওষুধ আছে আল্লাহই জানে!’ রাজা বলল।
‘যা-ই থাক,’ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল জোসেফ, ‘আমরা কোনোটাই শরীরে ঢোকাতে চাই না। অনেক দেরি হয়ে গেল। তবু, ডাক্তার বিগলকে একবার ফোন করা দরকার। ডার্টের ভেতরে কী আছে, তিনি বলতে পারবেন। ডক্টর রিচারের অবস্থা কেমন, তা-ও জানতে পারব।’
সব কথা মিস্টার রাইসুল আসাদকে জানাল ছেলেরা। হাসপাতালে ফোন করল। তারপর বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল ভ্যানে করে।
‘কেউ আমাদের ভয় দেখাতে চেয়েছে,’ রুশো বলল। ‘নিশ্চয় আমরা ঠিক পথে এগোচ্ছি...,’ জোরে মাথা ঝাঁকাল সে। ‘কী যেন খচখচ করছে মনে! ধরেও ধরতে পারছি না!’
মেডিক্যাল সেন্টারে পৌঁছে পার্কিং লটে গাড়ি রাখল রুশো।
ওদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন ডক্টর বিগল। ‘বোধহয় বাঁচাতে পারলাম না!’ ছেলেদের দেখেই বললেন তিনি, শান্তকণ্ঠ। চোখের চারপাশে কালিমা। ওদেরকে নিয়ে অফিসে চললেন।
জোসেফ জিজ্ঞেস করল, ‘অ্যান্টিভেনিন কাজ করছে না?’
চোখ মুদলেন ডাক্তার। ‘আসেইনি এখনো।’
‘কী?’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল রুশো। ‘কেন?’
ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললেন ডাক্তার। ‘কাগজপত্র রেডি করতে পারেনি।’ ফোন বাজল। তুলে নিলেন তিনি। নীরবে শুনলেন ওপাশের কথা, জিজ্ঞেস করলেন, ‘শিওর?...গুড...থ্যাংকস!’ রিসিভার রেখে দিলেন। চওড়া হাসি ফুটেছে মুখে। ‘এল অবশেষে। অ্যান্টিভেনিন এখন এয়ারপোর্টে। গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে গেছে লোক, কয়েক মিনিটেই এসে যাবে।’
রুশোর দিকে তাকালেন ডাক্তার। ‘ফোনে ডার্টের কথা কী যেন বলছিলে?’
ডার্টটা দিল রুশো।
হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন ডাক্তার। সতর্ক রইলেন, যাতে সুচ না ফুটে যায়। ‘পেলে কোথায়?’
‘আমাদের বিঁধতে চেয়েছিল একজন,’ জবাব দিল রাজা।
‘এতে কী আছে জানতে চাই,’ রুশো বলল।
‘হুম্ম্,’ বিড়বিড় করলেন ডাক্তার। ঘড়ি দেখলেন। ‘সিরাম আনতে আরো কয়েক মিনিট লাগবে। চলো, ততক্ষণে ল্যাবরেটরিতে গিয়ে কম্পিউটারে পরীক্ষা করে নিই।’
ডাক্তারকে অনুসরণ করে রিসার্চ ল্যাবে ঢুলল ছেলেরা।
ছোট একটা কাচের শিশিতে ডার্ট থেকে কয়েক ফোঁটা তরল ঢাললেন তিনি। বিশাল এক কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত একটা সিলিন্ডারে ঢুকিয়ে দিলেন শিশিটা। ‘যা যা করার কম্পিউটারই করবে এখন,’ ছেলেদের জানালেন।
সন্দেহ জাগল রাজার চোখে। ‘এতই যদি সহজ, ডক্টর রিচারের রক্ত পরীক্ষা করছেন না কেন? শিশিতে করে ঢুকিয়ে দিলেই তো হয়ে যায়।’
‘না, হয় না, রাজা। এখানে পিওর স্যাম্পল পাওয়া গেছে, তাই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাপের বিষ রক্তের সাথে মিশে গিয়ে বদলে যায়। তার ওপর, ডক্টর রিচারের শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা ব্যাপারটাকে আরো জটিল করে দিয়েছে। তবুও চেষ্টা করেছি, কাজ হয়নি।’
হঠাত্ কী মনে পড়ায় ব্যস্ত হয়ে উঠলেন তিনি। ‘হায় হায়, ডিউটি নার্সকে বলতে ভুলে গেছি, অ্যান্টিভেনিন আসছে। ডক্টর রিচারকে ইনজেকশন দেয়ার জন্যে তৈরি করা দরকার। রিসিভার তুলে ডায়াল করতে গিয়েই খটাস করে নামিয়ে রাখলেন আবার। ‘এহেহ, প্লাগ খোলা। ডক্টরের রুমের কানেকশন আমিই কেটে রাখতে বলেছিলাম।’
‘কেন?’ জোসেফ জিজ্ঞেস কররল।
‘কিছুক্ষণ থেকেই বিরক্ত করছে এক রিপোর্টার, ডক্টরের সঙ্গে কথা বলতে চায়। ফোন তুলতে তুলতে বিরক্ত হয়ে গেছে নার্স। আমিই বলেছি শেষে লাইন কেটে রাখতে। এই রিপোর্টারগুলোকে নিয়ে আর পারা যায় না, জোঁকের চেয়ে খারাপ...আমাকেই যেতে হবে এখন ডক্টরের কেবিনে!’
পরস্পরের দিকে তাকাল ছেলেরা।
‘মরগান!’ রাগে মুখ কালো করে ফেলেছে রাজা।
অবাক হলেন ডাক্তার। ‘হ্যাঁ, এই নামই তো বলল। এখন কম্পিউটারে কাজটা না সেরে যাই-ই কী করে, আবার না গেলেও নয়।’
‘আমরা কিছু করতে পারি?’
‘উঁ, তা পার। কেবিনে গিয়ে নার্সকে বলতে হবে, দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে সিরাম এসে যাবে।’
‘এখনি যাচ্ছি।’
‘আমিও আসছি,’ রাজাকে বলল রুশো। ‘তাড়াহুড়ো আর এই উত্তেজনায় মাথা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে। চাবিটা ফেলে এসেছি ভ্যানে। চুরি না হলেই এখন বাঁচি।’
বাড়িটার সামনের অংশে একটা হলঘর। সেখান থেকে একটা পথ চলে গেছে ওয়ার্ডের দিকে, আরেকটা বাইরে বেরোনোর পথ। হলে ঢুকতেই দেখল, তাড়াহুড়ো করে আসছে একজন লোক, অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার। ওকেই এয়ারপোর্টে পাঠান হয়েছিল।
‘অ্যান্টিভেনিন এনেছেন?’ জিজ্ঞেস করল রাজা। মাথা ঝাঁকাল লোকটা।
‘তাহলে এখনি গিয়ে নার্সকে জানাতে হয়,’ বলেই ওয়ার্ডের দিকে ছুটল রাজা।
পেছন থেকে ডেকে বলল লোকটা, ‘ফ্রিজে করে এসেছে জিনিসটা, এখনো ফ্রিজেই রাখা। এই অবস্থায় শরীরে ঢোকালে নির্ঘাত মারা যাবেন। কয়েক মিনিট বাইরে রেখে গরম করে নিতে হবে।’
ফিরে তাকাল না রাজা। চলতে চলতেই মাথা নেড়ে সায় জানাল।
রুশো ডেকে বলল, ‘চাবিটা নিয়েই আমি চলে আসছি, রাজা।’
মন দিয়ে রাজার কথা শুনল ডিউটি নার্স। বলল, ‘ডাক্তারকে গিয়ে চিন্তা করতে মানা করো, সব ঠিক করে ফেলছি আমি। গিয়ে বলো, পারলে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিক। আমিই সিরাম পুশ করতে পারব।’
তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরল রাজা।
রুশো এখনো আসেনি।
রিসার্চ ল্যাবের দরজা খুলেই চমকে গেল রাজা। নিথর হয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন ডক্টর বিগল। তাঁর ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে জোসেফ, দরজার দিকে পিঠ। ঝড় বয়ে গেছে যেন ল্যাবরেটরিতে, কম্পিউটারের পাশে একটা প্লেটে রাখা ছিল ডার্টটা, এখন নেই।
হঠাত্ এদিকে ফিরল জোসেফ। কপালের কাটা থেকে রক্ত ঝরছে। সর্বনাশ, এ কী চেহারা ওর! চুল এলোমেলো। চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি। হাতে একটা ভারি ইস্পাতের বোতল, ল্যাবরেটরিতে ব্যবহার হয় ওই জিনিস।
দশ
‘কী হয়েছে, জোসেফ?’ রাজা জিজ্ঞেস করল।
‘আ-আমি,’ হাতের বোতলটার দিকে চেয়ে থেমে গেল জোসেফ।
একটা পেপার টাওয়েল ডিসপেনসার থেকে কয়েকটা পাতা বের করে আনল রাজা। ‘নাও, ধরো, কপালের রক্ত মোছ।’
কাঁপা হাতে কাগজগুলো নিয়ে সিংকের দিকে এগোল জোসেফ।
হাঁটু গেড়ে রাজা বসল ডাক্তার বিগলের পাশে। হাত তুলে নাড়ি দেখল।
রক্ত ধুয়ে ফিরে এল জোসেফ। ‘রাজা, আমি আমি!’ মেঝেতে ফেলে রাখা বোতলটার দিকে চেয়ে কেঁপে উঠল সে। ‘সত্যি বলছি, আমি কিছু করিনি।’
‘সেসব কথা পরে হবে,’ শান্তকণ্ঠে বলল রাজা। ডাক্তারকে আলতো নাড়া দিয়ে বলল, ‘ডক্টর, শুনছেন? মিস বিগল?’
গুঙিয়ে উঠলেন ডাক্তার। চোখের পাতা কাঁপল। ‘কী? কী হয়েছে?’ উঠে বসার চেষ্টা করলেন। ‘ইস্, মাথায় এত ব্যথা কেন!’
ডাক্তারকে উঠতে সাহায্য করল রাজা। ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসাল। এক গেলাস পানি এনে দিল তাঁকে। তারপর ফিরল জোসেফের দিকে, ‘এবার বলো।’
‘ডেস্ক থেকে কয়েকটা কাগজ এনে দিতে বললেন ডাক্তার। হলে ঢুকতেই কে জানি বাড়ি মারল মাথায়। পিছলে এসে লাগল কপালে...,’ কাটা দাগটায় আঙুল ছোঁয়াল জোসেফ। ‘বেহুঁশ হয়ে গেলাম। হুঁশ ফিরলে দেখলাম, চোখ ভিজে গেছে রক্তে। তাড়াতাড়ি উঠে দৌড়ে এলাম এখানে। দেখি, মাটিতে পড়ে আছেন ডাক্তার।’ বোতলটা দেখাল। ‘ওটা পড়েছিল তাঁর পাশে। দেখার জন্যে তুলেছি, এই সময় তুমি ঢুকলে। ...যে আমাকে মেরেছে, সে-ই হয়তো ডাক্তারকেও মেরেছে। জানি না...।’ থেমে দম নিল। মৃদু হাঁপাচ্ছে। মুখে হাত বোলাল। ‘আর কিছু জানি না আমি, রাজা।’
ঘরে এসে ঢুকল রুশো। ‘কী হয়েছে?’
‘মাথায় বাড়ি মেরেছে,’ জোসেফ বলল। ‘আমাকেও। ডাক্তারকেও।’
‘ডার্টটাও নিয়ে গেছে,’ শূন্য প্লেটটা দেখাল রাজা।
‘নিয়ে গেছে?’ রক্ত ফিরে আসতে শুরু করেছে ডাক্তারের মুখে। ম্লান হাসলেন। ‘নিক। ওটা নিয়েই যদি মনে করে থাকে, যা লুকানোর লুকিয়ে ফেলেছে, ভুল করেছে। কম্পিউটারে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে নমুনা, আগেই। এতক্ষণে রিপোর্ট তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা...।’ তাঁর কথার সমর্থন জানাতেই যেন মৃদু বিপবিপ করে উঠল যন্ত্র। ক্যাটক্যাট করে চালু হয়ে গেল প্রিন্টার। থামল। কাগজটা ছিঁড়ে নিলেন ডাক্তার। দেখতে দেখতে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ল কপালে। ‘আশ্চর্য!’ বিড়বিড় করলেন। অজান্তে হাত চলে গেল মাথার পেছনে, গোল আলুর মতো ফুলে উঠেছে যেখানটায়।
‘কী আশ্চর্য!’ রাজা জানতে চাইল।
ভাঁজ আরো গভীর হলো। ‘গোখরোর বিষ আর খুব কড়া ট্র্যাংকুইলাইজারের মিশ্রণ!’
‘সাপের বিষের সঙ্গে ট্র্যাংকুইলাইজার!’ অবাক হয়ে বিড়বিড় করল জোসেফ। ‘মারাত্মক নিশ্চয়?’
‘সাংঘাতিক! রক্তে ঢুকিয়ে দিলে ধীরে ধীরে ঠেলে নিয়ে যায় মানুষকে মৃত্যুর দিকে...’
‘পেয়েছি!’ তুড়ি বাজাল রুশো। ‘এটাই খচখচ করছিল মনে, ধরেও ধরতে পারছিলাম না। ডার্টটা যেখানে বিঁধেছিল, গাড়ির সিটে একটা ছোট ছিদ্র হয়েছে, সাপের কামড়ের ফুটোর মতো। যদি সাপটার একটা দাঁত হয়। বুঝেছেন কিছু?’ জবাবের আশায় না থেকে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘ডক্টর রিচারকে সাপে কামড়ায়নি, মিস বিগল! ডার্ট ছোড়া হয়েছিল। ডেস্কের ওপরে ভেন্টে বসে, ডার্টগান দিয়ে।’
‘নিশ্চয়ই!’ নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে রাজার। ‘ঘাড়ের পেছনে এক ফুটোর এটাই ব্যাখ্যা...’
‘এবং সমস্ত লক্ষণ...!’ বাধা দিয়ে বললেন ডাক্তার। ‘সর্বনাশ!’
চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি।
‘কী? রুশো জানতে চাইল।
‘থামাতে হবে! এখনি!’ উঠে দাঁড়ালেন তিনি টলতে টলতে এগোলেন দরজার দিকে।
‘কে? কাকে থামাতে হবে?’ পেছন থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল রুশো।
দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন ডাক্তার। হাঁটার শক্তি নেই। হাঁপাতে লাগলেন। নার্স! ডক্টর রিচার!’ এইটুকু বলেই জিরিয়ে নিলেন, ‘অ্যান্টিভেনিন ইনজেকশন দেওয়া বন্ধ করতে হবে!’ ভীষণভাবে কেঁপে উঠল শরীর হাঁপানোর ফাঁকে ফাঁকে কাঁপা গলায় বললেন, ‘টাইগার স্নেকের অ্যান্টিভেনিন আনা হয়েছে। ইনজেকশন দিলেই মরবেন।’
‘রাজা,’ জরুরি কণ্ঠে বলল রুশো, ‘জলদি পুলিশকে ফোন কর। মিস বিগলকে দেখিস,’ বলেই ছুটে বেরোল ঘর থেকে পিছু নিল জোসেফ। তারও শরীর দুর্বল, আঘাতের ধাক্কা কাটাতে পারেনি এখনো পুরোপুরি। ফলে পিছিয়ে পড়ল সে।
অবাক হয়ে রুশোর দিকে তাকাচ্ছে হাসপাতালের কর্মীরা। পরোয়াই করল না রুশো। এক ধাক্কায় ডক্টর রিচারের কেবিনের দরজা খুলে ঢুকল। শাদা ডাক্তারি পোশাক আর মুখোশ পরা একজন রিচারের বাহুতে সুচ ঢোকাতে যাচ্ছে।
চেঁচিয়ে তাকে নিষেধ করল রুশো। ‘থামুন, থামুন!’
পাঁই করে ঘুরল শাদা পোশাক।
আরে, এ তো তখনকার সেই ডিউটি নার্স নয়! বুঝে ফেলল রুশো। জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি?’
ঘরের কোণ থেকে গোঙানি শোনা গেল। চোখের কোণ দিয়ে রুশো দেখল, মেঝেতে পড়ে আছে ডিউটি নার্স।
রিচারের বেডের পাশে রাখা একটা ভারী ট্রে তুলে ছুঁড়ে মারল লোকটা। ঝট করে মাথা নিচু করে ফেলল রুশো, কিন্তু কাঁধ বাঁচাতে পারল না। বেশ জোরে এসে লাগল ট্রে-টা। সামলে নেয়ার আগেই লাফ দিয়ে এসে পড়ল লোকটা। হাতের সিরিঞ্জটা ছুরির মতো ধরে ঘাই মেরে ঢোকানোর চেষ্টা করল রুশোর ঘাড়ে।
কাত হয়ে গেল রুশো। বুঝে গেছে, ওই সুই শরীরে ঢুকলে আর বাঁচতে হবে না। পা চালাল সে। কিন্তু বেকায়দাভাবে কাত হয়ে থেকে ঠিকমতো লাগাতে পারল না।
লাফিয়ে সরে গিয়ে স্যালইনের ব্যাগ ঝোলানোর একটা স্ট্যান্ড তুলে বাড়ি মারল লোকটা। লাগাতে পারল না। সরে গেছে রুশো। সরেই, পাশ কাটিয়ে এসে রদ্দা মারল লোকটার ঘাড়ে।
দরজার কাছে চলে এসেছে দুজনে। লোকটার সিরিঞ্জধরা হাতটা চেপে ধরে জোরে দরজার পাল্লায় বাড়ি মারল রুশো। ব্যথায় চিত্কার করে উঠল লোকটা, হাত থেকে ছেড়ে দিল সিরিঞ্জ।
লোকটাকে দরজার সঙ্গে চেপে ধরার চেষ্টা করছে এখন রুশো।
সজোরে পা উঠে এল লোকটার, হাঁটু দিয়ে গুঁতো মারল রুশোর তলপেটে। ককিয়ে উঠল রুশো। তীব্র ব্যথায় হাঁ হয়ে গেছে। শ্বাস টানতে পারছে না। এই সুযোগে ঝাঁকি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল লোকটা। একটানে পাল্লা খুলে বেরোতে গিয়ে ধাক্কা খেল জোসেফের গায়ে। ঠেলে ওকে দেয়ালে ফেলে দৌড় দিল বারান্দা ধরে।
কেবিনে ঢুকল জোসেফ। টলছে। ‘রুশো, কী হয়েছে?’
সামনের দিকে বাঁকা হয়ে আছে রুশো। পেট চেপে ধরেছে দু হাতে। ‘ধরতে গিয়েছিলাম ব্যাটাকে! পারলাম না...!’ কোলাব্যাঙের স্বর বেরোল গলা দিয়ে। ‘ডক্টর রিচারকে খুন করতে এসেছিল।’
আর শোনার অপেক্ষা করল না জোসেফ। ছুটে বেরিয়ে গেল।
মুহূর্ত পরে রাজার কাঁধে ভর দিয়ে ঘরে ঢুকলেন ডাক্তার বিগল। পেছনে হাসপাতালের তিন জন গার্ড। ওদের পেছনে আরেকজন ডাক্তার, বার বার বলছেন, মিস বিগলের চিকিত্সা দরকার। কানেই তুললেন না ডাক্তার বিগল। মেঝেতে পড়ে থাকা নার্সকে দেখেই অনুমান করে নিলেন অনেক কিছু। হঠাত্ যেন শক্তি ফিরে এল তাঁর দেহে। ছুটে গেলেন বিছানার কাছে। দ্রুত অথচ অভিজ্ঞ হাতে পরীক্ষা করলেন রিচারকে।
তখনো সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে রুশো। যন্ত্রণায় বিকৃত চোখ-মুখ। তাড়াতাড়ি জানাল, কী ঘটেছে।
‘আরেকটু হলেই মরেছিলেন ডক্টর!’ ডাক্তার বিগল বললেন। ‘অবস্থা এমনিতেই খুব খারাপ। ইনজেকশনটা দিলে এতক্ষণে শেষ হয়ে যেতেন।’ বিষণ্ন হাসলেন। ‘চিড়িয়াখানায় ফোন করতে হবে। একটা গোখরোর দুধ দুইয়ে নিয়ে আসুক। আমাদের ল্যাবরেটরিতেই অ্যান্টিভেনিন তৈরি করে নিতে পারব। বেশিক্ষণ লাগবে না। রোগ যখন ধরতে পেরেছি, আর অসুবিধে নেই।’ বিছানায় পড়ে থাকা ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকালেন। ‘ডক্টর বাঁচবেন।’
‘এ-ও ভালো হয়ে যাবে,’ বললেন আরেক ডাক্তার। নার্সকে ধরে দাঁড় করিয়েছেন।
ফিরে এল জোসেফ। হাঁপাচ্ছে। ‘ধরতে পারলাম না হারামজাদাকে। কী গাড়িতে এসেছে, আন্দাজ করতে পার?’
‘আগুনরঙা পিলারি!’ একসঙ্গে বলে উঠল দুই ভাই।
মাথা নাড়ল জোসেফ। ‘হয়নি। চিড়িয়াখানার একটা স্টাফ কার।’
‘বাহ্, তা-ই নাকি?’ রুশো বলল। ‘জোড়া লাগতে শুরু করেছে অবশেষে। প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল, চোরের সহকারী আছে। তাদের অন্তত একজন চিড়িয়াখানার লোক। ওখানেই ট্র্যাংকুইলাইজার গান জোগাড় করা সহজ। আর চিড়িয়াখানার স্টাফ আর ওখানকার লোকের পক্ষেই বের করা সহজ।’ ভ্রুকুটি করল সে। ‘কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, কাকে সন্দেহ করব? ছোট্ট একটামাত্র সূত্র আছে আমাদের হাতে। লোকটার বদভ্যাস জানি, ব্যস। কাগজ হাতে থাকলেই ভাঁজ করে।’
‘আরো একটা ব্যাপার এখন পরিষ্কার,’ রাজা বলল। কয়েক জোড়া আগ্রহী চোখ ঘুরে গেল তার দিকে। ‘ডক্টর রিচারকে খুনের চেষ্টা করার একটাই অর্থ। তিনি বেঁচে গেলে অসুবিধেয় পড়ে যাবে চোর। হয়তো তাকে চিনে ফেলেছেন তিনি।’
এক ঘণ্টার মধ্যেই রায় দিয়ে দিলেন ডক্টর বিগল, রিচারের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। ‘বিপদ কাটল!’ বলে হেলান দিলেন চেয়ারে। হাসপাতালের ক্যাফিটেরিয়ায় অপেক্ষা করছিল রুশো, রাজা আর জোসেফ, সেখানেই এসেছেন তিনি। ‘হুঁশ ফিরতে ক’দিন লাগে বলা যায় না। তবে ওষুধে সাড়া দিয়েছে শরীর।’ এক মুহূর্ত থেমে বললেন, ‘তোমরা তাঁর প্রাণ বাঁচালে।’
প্রশংসা এড়িয়ে গিয়ে রুশো জিজ্ঞেস করল, ‘গাড়িটার কী খবর? পুলিশ শনাক্ত করতে পেরেছে?’
‘পুলিশ খোঁজ নিয়েছে। সব ক’টা গাড়িই জায়গামতো আছে। তবে,’ মাথা ডললেন ডাক্তার বিগল, ‘হাসপাতাল থেকে চিড়িয়াখানা বেশি দূরে না। গিয়ে হয়তো আবার রেখে দিয়েছে গাড়িটা। কারো চোখে পড়েনি। অনেক গাড়িই ঢোকে-বেরোয়, দারোয়ানের অত মনে থাকার কথা না।’
এক কাপ গরম চকোলেট নিয়ে এল ওয়েট্রেস। তাতে চমক দিলেন ডাক্তার। কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন, ‘একটা কথা জোর নিয়ে বলা যায়, তোমাদের চোর সাপ বিশেষজ্ঞ।’ ছেলেদের বিস্মিত দৃষ্টি দেখে মুচকি হাসলেন। ‘সাপ নাড়াচাড়া খুব বিপজ্জনক। বিষের জন্যে যারা ওগুলোকে চুরি করতে পারে, তারা নিশ্চয় জানে কী করে সামলাতে হয়। টাইগার স্নেকের মতো সাপ ঘাঁটাঘাঁটি সহজ ব্যাপার নয়।...ভয়ঙ্কর লোকের বিরুদ্ধে লেগেছ তোমরা।’
চকোলেট শেষ করে উঠলেন ডাক্তার। ছেলেদের সঙ্গে এগোলেন। পার্কিং লটের কাছে এসে থেমে হুঁশিয়ার করলেন, ‘খুব সাবধানে থাকবে।’
ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠল ছেলেরা।
বাড়ি ফেরার পথে তৃতীয়বার ভাইকে জিজ্ঞেস করল রাজা, ‘লোকটাকে সত্যিই চিনতে পারনি?’
‘কী করে চিনব? গায়ে অ্যাপ্রন, মুখে মুখোশ।’ পেট ডলল রুশো, এখনো ব্যথা করছে। ‘তবে একটা কথা বলতে পারি, ব্যাটার গায়ে জোর আছে।’
‘তা তো নিশ্চয়। নইলে ভেন্টের ভেতর দিয়ে একা একা সাপের খাঁচা টেনে তোলে কী করে?’
‘মরুকগে, হারামজাদা!’ জোসেফ বলল। ‘তোমাদের খবর জানি না। কিন্তু আমার বড্ড ঘুম পেয়েছে।’
‘ঘুম?’ রাজা বলল। ‘এই অবস্থায় ঘুম পায় কী করে তোমার?’
‘জানি না,’ গুঙিয়ে উঠল জোসেফ। ‘শরীরে আর সইছে না আমার। ভেঙে পড়তে চাইছে।’
গ্যারেজের সামনে ভ্যান থামাল রুশো। পানি জমে আছে এখানে ওখানে।
সাবধানে থেকেও পানিতে পা দিয়ে ফেলল রাজা। ‘দূর, দিলাম ভিজিয়ে!’
‘একটা ভুল হয়ে গেল,’ জোসেফ বলল। ‘তখন লোকটার পায়ের ছাপ খোঁজা উচিত ছিল।’
কথাটায় গুরুত্ব দিল না রাজা। কিন্তু রুশো ড্রাইভারের সিট থেকে নামতে নামতে গম্ভীর হয়ে গেল। ড্রাইভওয়ের দিকে চেয়ে আনমনে বলল, ‘পাতাবাহারগুলো যথেষ্ট উঁচু, ঘন। সরাসরি বৃষ্টির ফোঁটা না পড়লে ছাপ থেকেও যেতে পারে।’
‘দেখবে নাকি?’ জিজ্ঞেস করল রাজা।
‘ক্ষতি কি?’
ভ্যানের পেছন থেকে একটা বড় টর্চ বের করল রাজা। ‘চলো।’
বেড়ার কাছে চলে এল তিন জনে। গ্যারেজের সামনের চেয়ে এখানে পানি আরো বেশি জমেছে। তবে জায়গাটা সমান নয়, কোথাও কোথাও দ্বীপের মতো জেগে রয়েছে উঁচু অংশগুলো।
‘নাহ্, ধুয়েই গেছে,’ হতাশ কণ্ঠে জোসেফ বলল।
‘ওই যে,’ দেখাল রুশো, ‘ডাল ভেঙে রয়েছে। নিশ্চয় ওখানেই লুকিয়েছিল।’
কয়েক পা এগিয়ে আলো ফেলেই চেঁচিয়ে উঠল রাজা, ‘কসম!’
এগারো
মাটিতে পড়ে রয়েছে এক টুকরো ভাঁজ করা কাগজ। ভেজা, কাদায় মাখামাখি। পাশে পায়ের ছাপ। চোখ মিটমিট করল রাজা। ‘এরকম জিন্দেগিতে দেখিনি!’
ছাপটা সত্যি অদ্ভুত। জুতোর আগাও নেই, গোড়ালিও নেই।
‘্পিপার পরেই চলে এসেছিল নাকি?’ রুশো বলল।
ঝুঁকে দাগগুলো দেখছে জোসেফ। ‘ক্লিন-রুম সোল!’
‘ক্লিন-রুম সোল? সেটা আবার কী?’ রাজা জিজ্ঞেস করল।
‘ল্যাবরেটরির একটা অংশকে বলা হয় ক্লিন-রুম, যেখানে সমস্ত জায়গা জীবাণু-নিরোধক করে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে।’ জুতোর ছাপ দেখাল জোসেফ। ‘ওই জুতোর ডিজাইনই করা হয়েছে ওভাবে বিশেষ কারণে। গোড়ালি নেই। কোনোরকম খাঁজ নেই, যাতে ময়লা আটকাতে পারে, জীবাণু থাকতে পারে।’
‘তার মানে আরেকটা সূত্র ফেলে গেল।’
রাজার হাত থেকে টর্চ নিয়ে আশপাশে আলো ফেলল রুশো।
আরো ছাপ দেখা গেল। বেশির ভাগই ধুয়ে গেছে বৃষ্টিতে, তবে এখনো যা রয়েছে, অনুসরণ করা চলে। ছাপ ধরে ধরে পাতাবাহারের বেড়া ঘুরে পেছনের রাস্তায় চলে এল ওরা, যেখানে স্পোর্টস কারটা দাঁড়িয়ে ছিল।
‘এই ব্যাটাকেই দরকার আমাদের,’ ফেরার পথে বলল রুশো।
প্রথম ছাপটার কাছে ফিরে এসে মাটি থেকে ভাঁজ করা কাগজটা তুলে নিল রাজা। ‘দেখি, আলো ফেল তো এর ওপর।’ ভেজা কাগজ, সাবধানে খুলতে হলো, নইলে ছিঁড়ে যায়। একটা রশিদ। ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে, রেপটাইল ল্যাবরেটরি। নিচে ঠিকানা, ১২১১ মিডোল্যান্ডস রোড, জারসি সিটি, নিউ জারসি। কতগুলো মেডিক্যাল সাপ্লাইয়ের বিল লেখা রয়েছে। সরবরাহ করা জিনিসের মধ্যে সাপের বিষও রয়েছে।
‘নিউ জারসি?’ ভুরু কোঁচকাল রুশো। ‘এক মিনিট। ফুটবল টিকেটটার কথা মনে আছে? ডক্টর রিচারের অফিসে যেটা পেয়েছিলাম? মিডোল্যান্ডস স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা ছিল সেদিন, তার টিকেট।’
রাজা বলল, ‘তাহলে দুটো জিনিস পেলাম আমরা। একটা ফুটবল খেলার টিকেট, আরেকটা বিষ সরবরাহের রশিদ। এবং দুটোই নিউ জারসির মিডোল্যান্ডে।’
মাথা ঝাঁকাল জোসেফ। ‘ক্লিন-রুমে ব্যবহারের জিনিসপত্র মেডিক্যাল সাপ্লাই ল্যাবরেটরিতেই পাওয়া যায়।’
‘তার মানে মিডোল্যান্ডে গেলে কিছু প্রশ্নের জবাব পাওয়াও যেতে পারে?’ ঘড়ি দেখল রুশো। ‘চল, গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। কাল সকালেই যাব।’
‘হয়তো,’ হঠাত্ গম্ভীর হয়ে গেছে জোসেফ, ওই হারামজাদাকেও ধরতে পারব! যে এত জ্বালান জ্বালাচ্ছে! ওর সঙ্গে পনের মিনিট একা কাটানোর ইচ্ছে আমার।’ হাত মুঠ করে ফেলল সে।
জোসেফের পেশিবহুল শক্তিশালী বাহুর দিকে চেয়ে হাসল রাজা। ‘হ্যাঁ, আমারও তা-ই ইচ্ছে। মানে তুমিই কাটাও আরকি। ব্যাটার কপালে খারাবি আছে তাহলে। কিন্তু ওকে খুঁজে বের করার আগে আরো কাজ আছে আমাদের।’ গ্যারেজে গিয়ে ঢুকল সে। বেরিয়ে এল এক কাপ শাদা পাউডার নিয়ে। ট্যাপের দিকে এগোল।
কল থেকে পানি ভরে আনল কাপে।
জোসেফ বলল, ‘প্লাস্টার?’
‘হ্যাঁ,’ জবাব দিল রাজা। ‘ছাপটার মডেল বানাব। ব্যাটার বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব প্রমাণ জোগাড় করা দরকার।’
পায়ের ছাপে তরল প্লাসটার ঢালল রাজা। ‘শুকাক। চল, আমরা গিয়ে ঘুমাই। সকালে তুলে নেয়া যাবে।’
দিন ভালো থাকলে বড়জোর দু ঘণ্টার পথ। কিন্তু সকালটা খারাপ। মেঘলা ভাব কাটেনি। থেকে থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। বাতাসও আছে। দশটার আগে কিছুতেই পৌঁছতে পারল না ওরা।
নিউ জারসিতে ঢোকার মুখে সাইনবোর্ড। ঘন কুয়াশা। আবছামতো দেখা গেল লেখাগুলো।
পথের পাশের একটা রেস্টুরেন্টে নাস্তা করতে ঢুকল ওরা। পিটপিট করে বৃষ্টিও পড়তে আরম্ভ করেছে। কুয়াশা তো আছেই। পার্কিং লটে আরেকটা বিশাল গাড়ি ঢুকতে দেখল, ছয় চাকার ট্রাক। গায়ে বড় বড় করে লেখা : রেপটাইল ল্যাবরেটরি, জারসি সিটি, নিউ জারসি।
নাস্তা সেরে আবার ভ্যানে চড়ল ওরা।
রাস্তায় এখন খানিক পরপরই কমলা রঙের সাইনবোর্ড, হুঁশিয়ারি (সামনে রাস্তার কাজ চলছে।
‘কী ভাবছ, রুশো?’ বাইরের কুয়াশার দিকে চেয়ে বলল জোসেফ। ‘ল্যাবরেটরিতে গিয়ে কী জিজ্ঞেস করবে? নিশ্চয় বলবে না, এই মিয়ারা, কে সাপ চুরি করেছ, কে রিচারকে খুন করতে গেছ?’
রুশো হাসল। ‘ওরকম জিজ্ঞেস করে জবাব পেলে তো ভালোই হতো। কিন্তু বলবে তো না।’ মলিন হয়ে এল হাসি। ‘ওখানে গিয়েও পাব কি না জানি না। সকালে ডাক্তার বিগলকে ফোন করেছিলাম। তিনি জানালেন, ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারও রেপটাইল ল্যাবের কাস্টমার। বিশেষ ধরনের ওষুধ কেনে ওদের কাছ থেকে।’ মাথা নাড়ল সে। ‘যদি বেআইনি কিছু করেও, জানা কঠিন হবে।’
‘আমি ভাবছিলাম...,’ বলতে গিয়ে থেমে গেল রাজা।
প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে ভ্যানের গায়ে।
‘দাদাআ!’ চেঁচিয়ে উঠল রাজা।
বিশাল এক দৈত্যের মতো ঘন কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল লরিটা। বিপজ্জনকভাবে সরে এসে আবার ধাক্কা মারল ভ্যানের গায়ে।
কন্ট্রোল ঠিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে রুশো। ধাক্কা লেগে পড়ে গেল একটা কমলা রোডসাইন। পাশে গভীর খাদ। সেদিকেই সরে যাচ্ছে ভ্যান। লরিটা আরেকবার ধাক্কা দিলেই...
কিন্তু আর দিল না।
লরির গায়ে নাম দেখে বড় বড় হয়ে গেল রাজার চোখ। ‘রেপটাইল ল্যাবরেটরি!’
দ্রুত চলে গেল লরিটা। হারিয়ে গেল কুয়াশায়। আবার পথে উঠে গতি বাড়িয়ে ওটার পিছু নিল রুশো। কিছুদূর এগোতে না এগোতেই কানে এল পুলিশের সাইরেন।
বারো
থামতে বাধ্য হলো রুশো। পথ আটকেছে পুলিশের গাড়ি।
ড্রাইভারের জানালার পাশে এসে দাঁড়াল পুলিশ অফিসার। বুকে লাগানো নেম ট্যাগ-এ নাম লেখা রয়েছে তার :বারক। তার সহকারীর নাম মিজার। এভাবে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণ জানতে চাইল অফিসার।
জানাল রুশো।
‘ধাক্কা দিয়ে ফেলতে চেয়েছিল?’ ভ্যানের গায়ে গভীর দাগ পরীক্ষা করছে মিজার, সেদিকে তাকিয়ে বলল বারক।
‘হ্যাঁ। আরেকটু হলেই মরতাম।’
‘লাইসেন্স নম্বর রাখতে পারনি নিশ্চয়?’
‘না,’ রাজা জবাব দিল। ‘তবে কাদের লরি, জানি। নিউ জারসির রেপটাইল ল্যাবরেটরি।’
অফিসারের পাশে এসে দাঁড়াল মিজার। বলল, ‘লরিটার দোষ।’
রেডিওতে কথা বলতে শুরু করল বারক।
ছেলেরা নেমে পড়েছে। দেখছে, কতটা ক্ষতি হয়েছে ভ্যানের।
রেডিওতে বলা শেষ করে জিজ্ঞেস করল বারক, ‘তোমাদের গাড়ি টেনে নেয়ার দরকার হবে?’
‘না,’ রাজা বলল। ‘বডির ক্ষতি হয়েছে শুধু। ইঞ্জিন ঠিক আছে। ভালোই চলছিল।’
‘বেশ। তোমাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করতে বলেছিলাম বেপোর্টে, ঠিকই আছে। অন্যায় যা করেছ, তাতে অন্তত আধডজন টিকেট পাওনা হয় তোমাদের,’ হাসল বারক। ‘তবে ইচ্ছে করে করনি, বোঝা যাচ্ছে। এবারকার মতো ছেড়ে দেওয়া গেল।’
চোয়াল ডলল মিজার। ‘সত্যি বলছ, রেপটাইল ল্যাবরেটরির ট্রাক?’
‘নাম তো তা-ই দেখলাম,’ বলল রাজা। ‘কেন?’
চিন্তিত দেখাল মিজারকে। ‘আমাদের ডিসপ্যাচার ওখানেও খোঁজ নিয়েছে। ওদের সমস্ত লরি নাকি কারখানাতেই রয়েছে। অন্য কোনো গাড়ি দেখনি তো? মানে, এতসব উত্তেজনা, কুয়াশার মাঝে ভুল দেখা...’
‘না, ঠিকই দেখেছি!’ দৃঢ়কণ্ঠে বলল রাজা।
শ্রাগ করল পুলিশ অফিসার। ‘ঠিক আছে, আরো ভালো মতো খোঁজখবর নেব।’ বারকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, চলে যাক, নাকি?’
মাথা নেড়ে জানাল বারক।
অস্বস্তি ফুটেছে আরামের চোখে। ‘খবরটা কাগজে উঠবে না তো?’ ভ্যান ছাড়ার পর বলল সে।
‘না,’ রুশো বলল। ‘রিপোর্টার-টিপোর্টার তো কেউ ছিল না। কে বলবে?...এই দাঁড়াও, দাঁড়াও!’
অবাক হয়ে রুশোর দিকে তাকাল অন্য দুজন।
‘জরুরি একটা কথা মনে পড়েনি আমাদের!’ রুশো বলল আবার। ‘বড় একটা সূত্র।’
‘সূত্র?’ রাজার প্রশ্ন।
বিষণ্ন হাসল রুশো। ‘জোসেফ, মনে আছে, তুমি বলেছিলে টাইগার স্নেক আনার খবরটা গোপন রাখা হয়েছে। তাহলে রিপোর্টার মরগান খবর পেল কীভাবে? পুলিশকে ফোন করেছে সিকিউরিটি, রেডিওতে খবর দেয়নি। তাহলে কি করে জানল মরগান?’
‘ঠিক বলেছ!’ চেঁচিয়ে উঠল জোসেফ। ‘জানার কোনো উপায় ছিল না, যদি না...’
‘...যদি না চিড়িয়াখানার কেউ খবর দিয়ে থাকে!’ কথাটা শেষ করে দিল রাজা।
মাথা ঝাঁকাল রুশো। ‘শুধু মরগানকেই খবর দিয়েছে, তা নয়। ওই ‘কেউটে’ চোরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজও করছে।’
‘এমনও তো হতে পারে,’ তর্কের খাতিরে বলল রাজা, ‘সাপটার কথা মুখ ফসকে বাইরের কাউকে বলে ফেলেছে কেউ?’
‘না, তা নয়। চোর কমপক্ষে দুজন। একজন ভেতরের, আরেকজন বাইরের।’ রাজার দিকে চেয়ে হাসল রুশো। ‘এটা তুইই প্রমাণ করেছিস। শ্যাফটে ঢুকে। বাইরে থেকে চোরকে শ্যাফটে ঢোকার উপায় করে দেওয়ার জন্যে নিশ্চয় কাউকে না কাউকে ফ্যান বন্ধ করতে হয়েছে। সে ভেতরের লোক। আরো একটা ব্যাপার, রিচারের অফিসে ঢুকতে হলে, একটা জিনিস অবশ্যই দরকার। সেটা ছাড়া অ্যালার্মকে ফাঁকি দিতেই পারবে না...’
‘পাস!’
‘হ্যাঁ, পাস,’ বলতে বলতে পকেট থেকে ব্রোঞ্জ রঙের কাউটা বের করল রুশো।
‘দাদা, আরেকটা সূত্র আছে। খেয়াল করিনি আমরা।’ জোসেফের দিকে তাকাল রাজা, ‘তোমার স্ক্রু-ড্রাইভার। কাজ যখন করতে না, ল্যাবরেটরিতেই থাকত ওটা, তা-ই না?’
মাথা ঝাঁকাল জোসেফ।
‘বেশ,’ রাজা বলল, ‘তুমি যখন বলছ, তুমি চোর নও, স্ক্রু-ড্রাইভারটাও নিশ্চয় তুমি ভেন্টে নিয়ে গিয়ে রাখনি। ওখানে তোমার যাওয়ার কথা নয়। আর আপনাআপনি ওটা ওখানে গিয়ে পড়েও থাকেনি।’
‘নিশ্চয়ই!’ বলে উঠল রুশো। ‘শ্যাফটের মুখের জালি লাগানো থাকে। স্ক্রু-ড্রাইভার ছাড়া কী করে খুলবে? স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়েই খুলেছে, তবে জোসেফেরটা দিয়ে নয়। তাহলে ওটা ফেলে গিয়ে বাইরে থেকে আবার জালি লাগাতে পারত না। ওকে ফাঁসনোর জন্যেই ওটা নিয়ে গিয়ে রেখে দিয়েছে ভেন্টের মুখের কাছে। আরেকটা কথা...,’ থামল সে। ‘ডাক্তার বিগলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রেপটাইল ল্যাবরেটরি থেকে কী কী কেনে তাঁদের হাসপাতাল। বিষ, অ্যান্টিভেনিন, এসব।’
জোসেফ ধরল কথাটা, ‘সাপ থেকে বিষ বের করে, অ্যান্টিভেনিন বানায়! তার মানে, বিষধর সাপ কেনে!’ তিক্ত হাসি ফুটল ঠোঁটে। ‘এটা আরেকটা সূত্র।’
‘বাঁয়ের রাস্তা,’ ম্যাপ দেখে বলে উঠল হঠাত্ রাজা। বাঁয়ে যেতে হবে।’
ল্যাবরেটরির ব্যক্তিগত পথ। দু ধারে কাঁটাতারের বেড়া। গতি কম রেখে গাড়ি চালাল রুশো। পথের শেষ মাথায় পৌঁছে কুয়াশার মধ্যেও চোখে পড়ল ছোট বড় কতগুলো বাড়ির সমষ্টি, আর পার্কিং লটে, লোডিং বে-তে নানারকম গাড়ি। প্রধান ফটকের ওপরে বড় করে লেখা :রেপটাইল ল্যাবরেটরি অ্যান্ড মেডিক্যাল সাপ্লাই কোম্পানি। একটা অফিস বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই আগুনরঙা পিলারি।
‘দেখেছি। ওটার মালিকের সঙ্গে কথা বলার সময় এসেছে।’
ল্যাবরেটরির সীমানার বাইরে একধারে গাড়ি থামাল রুশো। ফুটখানেক দূরে কাঁটাতারের বেড়া, সীমানা ঘিরে রাখা হয়েছে। ‘বললে তো অনুমতি দেবে না, চুরি করেই ঢুকতে হবে।’
হাসি ফুটল জোসেফের ঠোঁটে। ‘এমনিতেই তো চোর সন্দেহ করা হচ্ছে আমাকে। এখানে ধরা পড়লে কী জবাব দেবো?’ জবাবের অপেক্ষা করল না সে। রুশো আর রাজার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল ভ্যানের ছাদে। তারের বেড়া ডিঙিয়ে ওপাশে নামল তিন জনে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে ফিরে তাকাল একবার রাজা। তারপর আবার এগোল। ‘ঢুকলাম তো সহজেই,’ বলল সে। ‘কিন্তু বেড়া ডিঙিয়ে আবার ভ্যানের ছাদে চড়া কঠিন হবে।’
ল্যাবরেটরির পেছনে এসে দাঁড়াল ওরা। নানারকম যন্ত্রপাতির বিচিত্র শব্দ আসছে ভেতর থেকে। পেছনের কয়টা দরজা দেখল, কোনোটাই খোলা পেলো না। সাবধানে বাড়িটার এককোণে গিয়ে ওপাশে উঁকি দিল রাজা। জানাল, ‘একসারি ট্রাক। আর দুটো লোডিং বে। খালি। ওখান দিয়ে ঢোকা যাবে মনে হয়।’
‘দেখবে না কেউ?’ জোসেফের প্রশ্ন।
‘দেখতেও পারে,’ রুশো বলল। ‘তবে আমরা এখানকারই লোক ভাববে হয়তো। অনেক বড় কারখানা। সবাই সবাইকে চেনে বলে মনে হয় না।’
‘চল, ঢুকে পড়ি,’ বলেই হাঁটতে শুরু করল রাজা। চলে এল আরেক কোণে। ওপাশে বেরোতেই একটা লোকের প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়ল। লোকটা মোটা, গাঢ় রঙের জ্যাকেট পরা।
‘এই যে, ছেলে!’ ধমক দিল সে। দেখে চলতে পারো না?’ চোখে সন্দেহ। দেখল তিন জনকে। ‘এখানে কী করছ? পাস কই? সমস্ত অ্যালার্ম চালু করে দেবে তা!’
পকেট থেকে চিড়িয়াখানার পাসটা বের করল রুশো। আশা করছে, জোসেফেরটা চেয়ে বসবে না সিকিউরিটি গার্ড, ওরটা নিয়ে গেছে পুলিশ।
রাজা বের করল ওরটা।
রুশোকে অবাক করে দিয়ে জোসেফও পকেট থেকে কার্ড বের করল, হাসল বোকাটে হাসি।
ভ্রুকুটি করল মোটা লোকটা।
‘টিফিনের তো এখনো বিশ মিনিট বাকি,’ বলল সে। ‘ঠিক আছে, এবার ছেড়ে দিলাম। জলদি কাজে যাও। আরেকবার ধরতে পারলে সোজা বসের কাছে নিয়ে যাব।’
‘ইয়েস, স্যার,’ বোকা বোকা কণ্ঠে বলল রাজা। দ্রুত রওনা হয়ে গেল লোডিং এরিয়ার দিকে। পেছনে রুশো আর জোসেফ।
খানিকদূর এগিয়ে দলছাড়া হয়ে পড়ল রুশো। মোড় নিয়ে এগোল আগুনরঙা গাড়িটার দিকে। ওটার চারপাশে এক চক্কর ঘুরে, কাছে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখল, তারপর তাড়াতাড়ি আবার ফিরে এল অন্য দুজনের কাছে। ডকে উঠে পড়ল তিন জনে। নির্দ্বিধায় ঢুকে গেল ওয়্যারহাউসের ভেতরে।
অসংখ্য বাক্স ওখানে। সবাই কাজে ব্যস্ত। অপেক্ষমাণ ট্রাকে তোলা হচ্ছে ওসব বাক্স। আগে আগে চলছে রাজা। নির্জন একটা কোণে কতগুলো বাক্সের স্তূপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল ওরা।
‘জোসেফ,’ আড়ালে এসে জিজ্ঞেস করল রুশো, ‘ইলেকট্রনিকসের জিনিয়াস তুমি, জানি। কিন্তু ওই কার্ড দেখালে কী করে? ম্যাজিক?’
হেসে আবার কার্ডটা বের করল জোসেফ। নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, ‘প্ল্যাস্টিকের যুগে বাস করছি আমরা, বন্ধুগণ! সবখানেই প্ল্যাস্টিকের ছড়াছড়ি। এই নাও, দেখ।’
দেখল রুশো আর রাজা। বোপার্ট লাইব্রেরির কার্ড ওটা।
রাজা বলল,‘দাদা, কোথাও একটা ভুল হয়ে গেছে আমাদের। পল নিউম্যান বলল, একটা টাইগার স্নেক থেকে হপ্তায় এক আউন্স করে বিষ বের করা যায়। কিন্তু যে হারে বাক্স বোঝাই করতে দেখলাম, ওগুলো ভরতে অনেক শিশি দরকার। আর ওই শিশি ভরতে কত বিষ দরকার? কতকগুলো সাপ লাগবে? কোথায় সাপগুলো?
পকেট থেকে একটা রশিদ বের করল রুশো। তাতে এক জায়গায় বিজ্ঞাপন রয়েছে :ইওর কমপ্লিট মেডিক্যাল সোর্স। সেটা দেখিয়ে বলল, ‘বিষ ছাড়াও অনেক জিনিস সাপ্লাই দেয় ওরা। হাসপাতালে অনেক ওষুধ আর কেমিক্যাল লাগে। নিশ্চয় বিষ বের করার আলাদা ল্যাবরেটরি আছে। ওটা খুঁজে বের করতে হবে।’
‘এটা তো গুদাম। ল্যাবরেটরি কোনটা?’ নিজেকেই প্রশ্ন করল জোসেফ।
বাইরে বেরোল ওরা। বেরিয়েই আবার পড়ল সেই মোটা গার্ডের সামনে।
‘তোমরা? কী ব্যাপার, এরকম ঘুরঘুর করছ কেন? কে তোমরা? তীক্ষ চোখে তিন জনের আপাদমস্তক দেখল লোকটা। ‘এখানে আর দেখেছি বলে তো মনে হয় না। কোন ডিপার্টমেন্টে কাজ কর? এখানে কী? জবাব না পেয়ে সন্দেহ আরো বাড়ল তার। ‘চলো, বসের কাছে চলো।’
রাজার পাশ কাটিয়ে লোকটার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল রুশো।
‘মিস্টার মরগানের কাজ করি আমরা,’ জোরগলায় বলল সে। ‘তোমার ব্যবহার ভালো নয়, জানাব তাকে। বারবার আমাদের কাজে বাধা দিয়েছ শুনলে...’
চোখে ভয় দেখা দিল লোকটার। ‘এই এই, শোন, আমি জানতাম না! আমি ভেবেছি...যাকগে, কিছু মনে কোরো না। আসলে আমি আমার দায়িত্ব পালন করছিলাম। আমি...’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে,’ হাত তুলল রাজা। ‘মিস্টার মরগান এখন কোথায়, জানেন? রিপোর্ট করতে হবে তাঁর কাছে।’
‘নিশ্চয়,’ মোমের মতো গলে গেছে কঠোর সিকিউরিটি গার্ড। ‘কয়েক মিনিট আগে দেখলাম এলিভেটরে করে ল্যাবরেটরিতে গেলেন। ওখানেই পাবে।’
‘দেখুন, এখন আর আপনাকে বলতে অসুবিধে নেই, আমরা এখানে নতুন কাজ করছি। কোনদিকে যদি দেখিয়ে দেন...’
‘ওই যে, ওদিকে। এই গলির শেষ মাথায়।’
ঘড়ি দেখল জোসেফ। ‘ও, আপনার টিফিনের সময় হলো বোধহয়।’ তার কথা শেষ হতে না হতেই সাইরেন বেজে উঠল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে থেমে যেতে শুরু করল কারখানার ইঞ্জিনের শব্দ। কাজ থামিয়ে দিল কর্মীরা।
হাঁপ ছাড়ল গার্ড। ‘হ্যাঁ, সময় হলো। যাই। থ্যাংকস।’ তাড়াহুড়ো করে চলে গেল সে, পালিয়ে বাঁচল যেন।
ছেলেদের সামনে, নিচে একটা দরজা খুলে গেল, হাঁ হয়ে গেল যেন কারগো এলিভেটরের মুখ।
‘চলো, চলো, এইই সুযোগ,’ জোসেফ বলল। দ্রুত এগোল বারান্দা ধরে। ‘মরগানের নাম হঠাত্ মনে এল কেন তোমার, রুশো?’ হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল সে।
‘পিলারিটাকে তখন দেখতে গিয়েছিলাম, মনে আছে? গ্লোভ কম্পার্টমেন্টেই রয়েছে গাড়ির ব্লু বুক। তাতে মরগানের নাম। বাকিটা আন্দাজ করে নিলাম। সে-ই এখানকার বস।’
‘ধরা পড়লে মরেছি!’ রাজা বলল। ‘দারোয়ান ব্যাটাকে তো কোনোমতে ফাঁকি দিলাম...!’ বাকি কথাটা শেষ করল না সে।
এলিভেটরের সামনে চওড়া প্ল্যাটফর্মে উঠল ওরা। সাধারণত মাল ওঠানো-নামানোর কাজে ব্যবহার হয় ভারী এই এলিভেটরটা।
‘আরো সাবধানে থাকতে হবে,’ রুশো বলল। ‘নিচে নেমে আর কারো সামনে পড়া চলবে না। গুদামের গার্ডকে ধোঁকা দিতে পেরেছি বটে, আমার মনে হয় না ল্যাবরেটরিরগুলো এত বোকা হবে। এলিভেটর ছাড়া নামতে পারলে ভালো হয়।’
পথ খুঁজতে লাগল ওরা। খানিক পরে জোসেফ ডাকল। ওর কাছে গিয়ে রুশো আর রাজাও দেখল, প্ল্যাটফর্মের এক জায়গায় মেঝেতে ছোট একটা ট্র্যাপডোর। তাতে আঙটা লাগানো, ঢাকনাটা টেনে তোলার জন্যে। জোসেফ বলল, ‘ইনসপেকশন শ্যাফট। এলিভেটর খারাপ হলে কোথায় কী হয়েছে দেখার জন্যে এটা দিয়ে নামে।’
আঙটা ধরে টেনে ঢাকনাটা তুলে ফেলল জোসেফ। গর্তে নামল তিন জনে। কংক্রিটের দেয়ালে একটু পরপরই লোহার আঙটা লাগানো রয়েছে, ধরে নেমে-ওঠার জন্যে। কুয়ার তলায় নেমে পেয়ে গেল দরজা।
তেরো
সাবধানে পাল্লা ঠেলে উঁকি দিল রাজা। ‘কাউকে দেখছি না।’ ফিসফিসিয়ে বলল সে। ‘নিশ্চয় খেতে চলে গেছে। কিংবা বিশ্রাম নিচ্ছে।’
লম্বা, ঝকঝকে পরিষ্কার একটা বারান্দায় বেরিয়ে এল ওরা।
জোসেফ বলল, ‘ল্যাবরেটরিটা আশপাশেই আছে।’
শেষ মাথায় আরেকটা দরজা। ঠেলে খুলে ভেতরে ঢুকল ওরা। কংক্রিটের দেয়াল। কোমর সমান উঁচুতে জানালা, কাচ লাগানো। জানালার ভেতর দিয়ে ল্যাবরেটরি চোখে পড়ল। লোকেরা সিগারেট খাচ্ছে কেউ, কেউ কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে, কেউ বা পায়চারি করছে, কেউ কেউ আবার গোল হয়ে বসে জটলা করছে।
‘টিফিন আওয়ার শেষ হওয়ার আগেই লুকানোর জায়গা বের করতে হবে আমাদের,’ রুশো বলল।
করিডোর ধরে এগিয়ে গিয়ে একটা জানালার নিচে বসে পড়ল ওরা।
ইঙ্গিতে একটা পরিচিত যন্ত্র দেখাল রাজা। ্পট। দরজার নবের পাশে দেয়ালে ওটার ফোকর। বেপোর্টের চিড়িয়াখানার মতোই সিকিউরিটি সিস্টেম এখানেও। ্পট লাগানো ঘরগুলোয় ঢুকতে চাইলে পাস দরকার হবে।
‘তালা নেই, এমন একটা ঘর খুঁজে বের করতে হবে।’ ঘড়ি দেখল রুশো। ‘সময় বেশি নেই। এস।’
করিডোরের আরেক মাথার দিকে এগোল ওরা। ডানে মোড় নিয়ে চলে গেছে সুড়ঙ্গের মতো আরেকটা করিডোর।
কোণের কাছে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে সাইরেন শোনা গেল। খুলে যেতে আরম্ভ করল দরজা। লোকের কণ্ঠ কানে এল। পেছনে একটা দরজা খোলার শব্দ হতেই ঝট করে বসে পড়ল ওরা। কিন্তু ওদের দিকে তাকাল না লোকটা। ধীরে ধীরে সরে গেল পায়ের আওয়াজ।
‘ইস্, বাঁচলাম!’ নিঃশ্বাস ফেলতে যেন ভয় পাচ্ছে রাজা।
‘এভাবে ঘোরা উচিত হচ্ছে না,’ রুশো বলল। ‘ধরা পড়ে যাব। ওই যে, একটা দরজা। চলো, দেখি।’
পায়ে পায়ে দরজাটার কাছে এসে দাঁড়াল ওরা। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল জোসেফ। ইশারায় ডাকল অন্য দুজনকে।
ঘরের দেয়াল ঘেঁষে রাখা রাশি রাশি কাচের বাক্স। একজন ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান ওদের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাক্সের সামনে। কিছু করছে। যখন ঘুরল, দেখা গেল তার হাতে ধরা একটা সাপ কিলবিল করছে। কাচের দেয়ালও সাপটার লেজের রাগত খটখট শব্দ পুরপুরি ঠেকাতে পারল না।
‘টিমবার র্যাটেলার!’ ফিসফিস করে জানাল জোসেফ। ‘ওই সাপ আরো দেখেছি আমি।’
সাপটাকে পরীক্ষা করল লোকটা। তারপর আবার খাঁচায় ভরে রাখল। আরেক খাঁচা থেকে বের করল আরেকটা সাপ।
‘ডায়মন্ডব্যাক!’ বিড়বিড় করল জোসেফ।
অবাক হয়ে গেছে ছেলেরা।
সাপটাকে টেবিলের কাছে নিয়ে গেল টেকনেশিয়ান। মাথার পেছনে শক্ত করে চেপে ধরে হাঁ করা মুখের শ্বদন্ত দুটো ঢুকিয়ে দিল একটা জারের মুখে বাঁধা রবারের চাদরে। হলদেটে তরল বিষ ফোঁটা ঝরে পড়তে লাগল কাচের জারে।
‘দুধ দোয়াচ্ছে!’ রাজা বলল।
মাথা ঝাঁকাল রুশো। ‘হ্যাঁ। কিন্তু তাতে কিছু প্রমাণ হয় না। চিড়িয়াখানা থেকে র্যাটল স্নেক চুরি যায়নি। গিয়েছে গোখরা। তাছাড়া জেনেই এসেছি আমরা, রেপটাইল ল্যাবরেটরি সাপের বিষ বিক্রি করে।’
কাজ শেষ করে সাপটাকে এনে আবার খাঁচায় ভরল টেকনিশিয়ান। তারপর টেবিল থেকে জারটা তুলে নিয়ে ওপাশের একটা দরজা খুলে চলে গেল আরেক ঘরে।
‘এস,’ রুশো বলল, ‘এইই সুযোগ। দেখি কী কী সাপ আছে।’
দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকল ওরা। খুঁজতে শুরু করল।
‘দেখ, কী পেয়েছি?’ খানিক পরে বলল জোসেফ। হাতে একপাতা কাগজ।
‘কী?’
‘মালের ফরমাশ।’
‘ভাঁজ দেখেছ!’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল রাজা।
‘হ্যাঁ, সেটাই দেখাতে চাইছি,’ জোসেফ বলল। ‘দেখে যাও, সই কার!’
রুশো আর রাজাও পড়তে পারল জেমস ককের নাম। স্পষ্ট স্বাক্ষর।
‘রেপটাইল ল্যাবরেটরি থেকে মাল চায় কেন কক?’ জোসেফের প্রশ্ন। ‘সে কাজ করে চিড়িয়াখানায়।’
জ্বলজ্বল করছে রুশোর চোখ। ‘বোধহয় আন্দাজ করতে পারছি। ওরকম ভাঁজ আগেও দেখেছি আমরা, তা-ই না? মনে আছে, পল নিউম্যানের হাতে একটা কাগজ দিয়েছিল কক। ক’টা সাপ হারিয়েছে, তার লিস্ট। ওটাও এরকম ভাঁজ করা ছিল। তারপর, ফুটবল খেলার সেই টিকেটটা।’ জোসেফের হাতের কাগজটায় টোকা দিল সে। ‘আমার বিশ্বাস...’
‘কে জানি আসছে!’ জরুরি কণ্ঠে বলল জোসেফ।
দ্রুত আবার করিডরে ফিরে এল ছেলেরা। জানালার নিচে বসে মাথা বাড়িয়ে উঁকি দিল ঘরের ভেতর। সেই টেকনিশিয়ান ফিরে এসেছে।
‘এখন আমাদের প্রমাণ করতে হবে,’ ফিসফিস করে বলল রুশো, ‘এখানকার লোকেই চিড়িয়াখানার সাপ চুরি করেছে। করে থাকলে নিশ্চয় এখানেই আছে সাপগুলো। কোথায় খুঁজব?’ আনমনে মাথা নাড়ল সে।
হঠাত্ শোনা গেল পদশব্দ। এগিয়ে আসছে। কথাও শোনা যাচ্ছে।
উঠে গিয়ে এক-এক করে দরজা পরীক্ষা করতে শুরু করল তিন জনে। নব ধরে ঠেলে ঠেলে দেখছে। পাগল হয়ে উঠেছে যেন। ইস্, মাত্র একটা...যে কোনো একটা দরজা যদি খোলা যেত! অবশেষে একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল জোসেফ, ‘খোলা! জলদি এস!’
ওরাও ঢুকল, পায়ের শব্দও এসে থামল ওরা যে করিডোরে ছিল এতক্ষণ, সেটাতে।
তারপর শোনা গেল দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ।
‘যাক, ঢুকেছে,’ হাঁপ ছাড়ল রাজা। ‘আরেকটু হলেই ধরা পড়েছিলাম।’
আরেকটা দরজা দেখাল রুশো, ্পটের ফোকরের ওপর প্লাস্টিকের আচ্ছাদন। ‘ওরকম কেন? কার্ড ঢোকাবে কী করে?’
জবাব দিতে পারল না কেউ।
ঘরের ঠিক মাঝখানে ইস্পাতের ভারী একটা ল্যাবরেটরি টেবিল। এক কোণে লম্বা একটা বেঞ্চে রাখা কতগুলো বেল জার। জানালা নেই। তবে দ্বিতীয় দরজাটার পাশে দেয়ালের অনেকখানি জায়গা কেটে সেখানে খুব শক্ত কাচ লাগানো হয়েছে। অন্য পাশে পর্দা লাগানো, ফলে তার ওপাশে কী আছে দেখা যায় না।
পায়চারি করছে জোসেফ। আনমনে বিড়বিড় করল, ‘ঘরটা কেমন চেনা চেনা লাগছে!...এরকম কেন? কী...’
হঠাত্ খট করে আওয়াজ হলো দরজার, যেটা দিয়ে ঢুকেছে ওরা। ঠেলা দিয়ে দেখল রাজা। ‘আরে! খোলে না তো! ব্যাপারটা কী?’
মুহূর্ত পরেই জবাব মিলল। বিশাল পর্দা সরিয়ে উঁকি দিল একটা মুখ। হেনরি মরগান!
‘বাহ্, চমত্কার!’ শুকনো কণ্ঠে বলল সে, কথা শোনা গেল দেয়ালে বসানো গোপন স্পিকার থেকে। ‘সবাই বলে, রিপোর্টারদেরই নাকি শুধু আড়িপাতা স্বভাব। এখন দেখছি রোগটা সংক্রামক।’
‘মরগান,’ কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে রুশো, ‘আপনার জারিজুরি শেষ, খেল খতম। আমরা জেনে গেছি, আপনি আর আপনার এক সহকারী মিলে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন জোসেফ খানকে। চোরাই বিষ বিক্রি করছেন রেপটাইল ল্যাবরেটরির মাধ্যমে।’
‘বাহ্, বেশ চালাক তো। তবে তোমরাও কল্পনা করতে পারবে না আমার সহকারীটি কে।’
‘জেমস কক।’
হাঁ হয়ে গেল রিপোর্টার। হাসি মুছে গেল। সামলে নিতে সময় লাগল তার। কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল ছেলেদের দিকে।
‘ও ছাড়া আর কেউ না,’ রুশো বলতে লাগল। ‘টাইগার স্নেকের আনার খবর চিড়িয়াখানার বাইরের কারো জানার কথা নয়। ভেনটিলেশন ফ্যান বন্ধ করে দিয়ে তার পক্ষেই শ্যাফট দিয়ে বেরোনো সহজ। তাছাড়া বিষাক্ত সাপ চুরি করেছে।’ মরগানের পেছনে দেয়ালঘেঁষে রাখা একসারি কাচের বাক্সের দিকে হাত তুলল সে। ‘আনাড়ি লোক ওসব ঘাঁটতে সাহস করবে না। আমার বিশ্বাস, পুলিশ খোঁজ নিলেই জেনে যাবে, একটা বদঅভ্যাস আছে ককের। কাগজ হাতে থাকলেই ভাঁজ করতে শুরু করে। বাতিল কাগজ ফেলার আগে ভাঁজ করে, তারপর দলেমুচড়ে ছুড়ে ফেলে।’
ক্ষণিকের জন্যে ভয় দেখা দিল রিপোর্টারের চোখের তারায়। ‘বলে ভুল করলে। আর কিছু করার নেই এখন আমার। দুর্ঘটনায় পড়তে হবে তোমাদের।’
‘হাসপাতালে যেরকম চেষ্টা করেছ?’ দাঁতে দাঁত চাপল জোসেফ।
আরেকবার অবাক হবার পালা মরগানের। ‘যাক, সব তাহলে জান না। ওই লোকটা আমি ছিলাম না। ও আমার আরেক সহকারী। ককের মতো ওটাও আরেক গাধা। সেদিন চিড়িয়াখানায় সাপ চুরি করার সময়ও গণ্ডগোল করে ফেলেছিল। ওর সঙ্গে আরো লোক ছিল অবশ্য। তারপরেও ঠিকঠাকমতো পারেনি। হাত থেকে সাপের বাক্স ফেলে দিয়েছিল। ডালা খুলে সাপ ছুটে গেছে।’ জোসেফের দিকে চেয়ে চোখ সরু হয়ে এল তার। ‘চালাকই বলতে হবে তোমাদেরকে। পাস ছাড়া এতদূর চলে এসেছ। কিন্তু করিডোরের ছাদে যে টেলিভিশন ক্যামেরার চোখ রয়েছে, খেয়াল করোনি। বেপোর্ট চিড়িয়াখানার মতোই সিকিউরিটি সিস্টেম চালু করেছি আমরা এখানে।’
‘আমরা যে আসছি, সে তো জানতেনই,’ রাজা বলল। ‘আগেই ব্যবস্থা নেননি কেন?’
‘জানি?’
‘জানেন না? ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল আরেকটু হলেই। আপনাদেরই তো লরি।’
‘তা-ই নাকি? তাহলে ওটা নিছক দুর্ঘটনা। কুয়াশার জন্যে দেখেনি আরকি ড্রাইভার।’ মৃদু হাসি ফুটল মরগানের ঠোঁটে। ‘তবে অসুবিধে নেই। কিছুক্ষণ বেশি বাঁচলে, এই যা। কথা দিচ্ছি, করুণ এই দুর্ঘটনার খবর খুব ফেনিয়ে, রসিয়ে লিখব আমি। পাঠকরা কেঁদে ফেলবে।’
‘কী বলছেন?’ বুঝতে পারল না রাজা।
‘ক্লিন-রুম!’ হঠাত্ চেঁচিয়ে উঠল জোসেফ। ‘সেজন্যেই তখন ঘরটা চেনা চেনা লাগছিল। চিড়িয়াখানার মতো একইরকম। এসব করে পার পাবে না তুমি, শয়তান! খুনের অপরাধে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝোলাবে।’
মরগানের হাসি মুছল না। ‘আমার তা মনে হয় না। তুমিই বাঁচিয়ে দেবে। তোমার ক্রিমিন্যাল রেকর্ড আছে। দুর্ঘটনার পর পুলিশ এসে ধরেই নেবে, দুই সঙ্গীকে নিয়ে এখানেও সাপ চুরি করতে এসেছ। আহ্, তিন সাপ চোরের কাহিনি লিখতে কী যে মজা লাগবে না!’ হেসে উঠে পর্দা টেনে দিয়ে চলে গেল সে।
‘কী বলল ও, জোসেফ?’ জিজ্ঞেস করল রাজা। ‘কী ঘটতে যাচ্ছে?’
পাগলের মতো ঘরের চারপাশে তাকাচ্ছে জোসেফ। ‘এটা ক্লিন-রুম। স্টেরিলাইজড করার দুটো উপায়, আলট্রাভায়োলেট রে দিয়ে, কিংবা পানি ছেড়ে দিয়ে।’ ওর কথা শেষ হতে না হতেই তোড়ে পানি পড়ার শব্দ শোনা গেল। দেয়ালে লাগানো ছয় ইঞ্চি মোটা মোটা পাইপ দিয়ে পানি বেরোচ্ছে। ‘ভাসিয়ে দেবে সমস্ত ঘর...!’ বলল সে।
‘ভাসিয়ে দেবে?’ রুশো বলল। ইতিমধ্যেই পায়ের গোড়ালি ঘিরে নাচতে আরম্ভ করেছে পানি। ‘ছাত পর্যন্ত উঠবে নাকি?’
মাথা ঝাঁকাল জোসেফ। ‘তারপর পাম্পের সাহায্যে আবার টেনে নেবে। আমাদের ডুবিয়ে মারার ব্যবস্থা করেছে মরগান!’ এদিক ওদিক তাকাচ্ছে সে। বেরোনোর উপায় খুঁজছে।
দ্রুত উঠছে পানি। পাঁচ মিনিটেই হাঁটুর কাছে। দশ মিনিট পর ল্যাবরেটরি টেবিলটার কিনারা ছুঁল।
‘দাদা, কিছু একটা করা দরকার!’ চেঁচিয়ে বলল রাজা। জোরে জোরে ধাক্কা মারছে বদ্ধ দরজায়, কাঁধের ধাক্কায় ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে।
পেরিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান সময়। রুশোও বুদ্ধি বের করার চেষ্টা করছে। পানি গলার কাছে উঠে এসেছে, এই সময় বলে উঠল সে, ‘বেল জার!’ বলেই সাঁতার কেটে ছুটল সেদিকে।
জোসেফ আর রাজাও পিছু নিল।
একটা জার তুলে নিয়ে দেখাল রুশো। ‘হেলমেটের মতো করে মাথার ওপর বসিয়ে দেবে এভাবে।’ বসালো সে। ‘ভেতরে বাতাস আটকে থাকবে, তাতে কিছুক্ষণ হলেও দম নেয়া যাবে। জলদি তুলে নিয়ে চলে যাও টেবিলের কাছে।’
টেবিলে উঠে দাঁড়াল তিন জনে। নিচু ছাদ, মাথায় লাগে। বুকের কাছে যখন পানি উঠে এল, জারটা উপুড় করে ধরল রুশো। ‘এভাবে বাতাস ঢুকিয়ে নাও।’
‘এই বাতাসে আর কতক্ষণ!’ জোসেফ বলল।
‘যতক্ষণ বাঁচা যায়, ততক্ষণই লাভ...!’
‘এইই,’ চেঁচিয়ে উঠল রাজা, ‘মরগান না বলে গেল চিড়িয়াখানার মতোই সিকিউরিটি সিস্টেম এখানেও?’
মাথা ঝোঁকাল জোসেফ। ‘হ্যাঁ। তাতে কী? তোমাদের সিকিউরিটি পাস এখানে কাজ করবে না।’
‘কী জানি!’ রুশোও উত্তেজিত হয়ে উঠল। ‘সিস্টেম প্রোগ্রামিংয়ে অনেক খরচ। এত খরচ কেন করতে যাবে মরগান? সহজেই চিড়িয়াখানার কোড কাজে লাগাতে পারে!’ পকেট থেকে কার্ডটা বের করল সে। ‘ধর,’ জারটা বাড়িয়ে দিল সে।
লম্বা দম নিয়ে পানিতে ডুব দিল রুশো। সাঁতারে চলে গেল দরজার কাছে। পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে পানি, অস্থির, চঞ্চল, দরজা ভালো মতো চোখে পড়ে না। প্লাস্টিক লাগানো রয়েছে ্পটের ওপর। কিছুটা দেখে, কিছুটা অনুমানে ওই ফোকরে কার্ড ঢোকানোর চেষ্টা করতে লাগল সে।
কিন্তু পারছে না। পানির চাপের জন্যে ্পটের ওপরের প্লাস্টিক তোলাই সম্ভব হচ্ছে না। দম ফুরিয়ে এসেছে। বাতাসের জন্যে আকুলি বিকুলি করছে ফুসফুস। সাঁতরে ফিরে এল আবার টেবিলের কাছে।
মূল্যবান বাতাসভর্তি জারটা উঁচু করে ধরে রেখেছে রাজা। গলার কাছে পৌঁছে গেছে পানি। সময় আর বেশিক্ষণ নেই।
‘হলো না,’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রুশো। ‘প্লাস্টিক খুলতে পারলাম না।’ কার্ডটা তুলে দেখাল। ঢোকানোর চেষ্টা করতে গিয়ে নষ্ট করে ফেলেছে। বেঁকে, ছিঁড়ে গেছে।
জারের মধ্যে মাথা ঢোকাতে বাধ্য হলো ওরা। অক্সিজেন ফুরাতে সময় লাগবে না। এই সময়ের মধ্যে কিছু করতে না পারলে জিতে গেল মরগান। ওদের তিনটে লাশ পাওয়া যাবে। চুরি করে ক্লিন-রুমে ঢুকেছে ওরা, প্রমাণ করতে অসুবিধে হবে না তার। ক্লিন-রুমে পানি ছাড়ার আগে মানুষ আছে কি না দেখার দরকার মনে করেনি টেকনিশিয়ান, পুলিশকে একথাই বলবে, কারণ, স্টেরিলাইজড করার আগে নোটিশ দিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ল্যাবরেটরির কেউ আর ওখানে থাকে না।
নিজের পাসটা বের করল রাজা। আরেক পকেট থেকে ছুরি। শেষবারের মতো চেষ্টা করে দেখবে। লম্বা শ্বাস টেনে জারের ভেতরের প্রায় সমস্ত বাতাসটুকু ফুসফুসে টেনে নিল সে। তারপর ডুব দিল।
জারের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে অসাহায়ের মতো তাকিয়ে আছে রুশো আর জোসেফ। দেখছে, হাত-পা নেড়ে দরজার কাছে চলে যাচ্ছে রাজা।
কী করছে রাজা, দেখতে পাচ্ছে না ওরা। তবে ওরা পা নাড়ানো দেখেই বুঝতে পারছে, কিছু একটা নিয়ে জোরাজুরি করছে সে। তাতে ফুসফুসের অক্সিজেন আরো তাড়াতাড়ি ফুরাবে।
্পটের ফোকরে ছুরি ঢোকানোর চেষ্টা করছে রাজা। শক্ত প্লাস্টিক। কাটতেই চায় না। অবশেষে, দম যখন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, এই সময় কাটল প্লাস্টিক। ছুরি দিয়ে টান মেরে প্লাস্টিকের ওপর থেকে নিচে কেটে লম্বা ফাঁক করে ফেলল সে। মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে কার্ড ঢুকিয়ে দিল ভেতরে। কাজ হলে ভালো, না হলে সব চেষ্টার ইতি এখানেই।
দীর্ঘ এক মুহূর্ত কিছুই ঘটল না। তারপর ঝিলিক দিয়ে উঠল তীব্র নীল শিখা। ধাক্কা দিয়ে যেন দরজার কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো রাজাকে। তারপর আবার হ্যাঁচকা টান দিয়ে টেনে নিল পানির প্রচণ্ড স্রোত। খোলা দরজা দিয়ে হুড়মুড় করে বেরোতে শুরু করেছে পানি।
আতঙ্কিত হয়ে রুশো আর জোসেফ দেখল, রাজার দেহটা ভেসে যাচ্ছে। নড়ছে না সে। যেন লাশ হয়ে গেছে।
‘জোসেফ!’ চিত্কার করে উঠল রুশো। ‘ও ইলেকট্রিক শক খেয়েছে!’
চৌদ্দ
পানির ভেতর দিয়ে পাগলের মতো সাঁতরে এল জোসেফ আর রুশো।
উপুড় হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে রাজা। টেনে তাকে ল্যাবরেটরি টেবিলে এনে তুলল দুজনে মিলে।
কেশে উঠল রাজা। আস্তে চোখ মেলল। ঘোলাটে দৃষ্টি। ধীরে ধীরে আলো ফুটল চোখের তারায়। আরেকবার কেশে উঠে দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ঘটেছে?’
‘এখনো জানি না,’ রুশো বলল। ‘হয় পাসটা কাজ করেছে, নয়তো শর্ট-সার্কিট করে দিয়েছে। যা-ই করে থাকুক, আপাতত আমরা বাঁচলাম। তোর কী অবস্থা? কেমন লাগছে?’
‘জিভটা মনে হয় তামা হয়ে গেছে। তাছাড়া ভালোই...মরগানটা কোথায়?’ উঠে বসার চেষ্টা করল রাজা। ‘আমাদেরকে...’
জোর করে আবার তাকে শুইয়ে দিল রুশো। ‘শুয়ে থাক, শুয়ে থাক। উঠিস না, বাকিটা আমি আর জোসেফই সামলাতে পারব।’
‘তাড়াতাড়ি করতে হবে!’ জোসেফ বলল। ‘পালানো দরকার।’
ওপাশের ঘরের যে দরজা দিয়ে ঢুকেছিল মরগান, সেটা ফাঁক হয়ে আছে। ওটার কাছে এসে অন্যপাশে তাকিয়ে এক বিচিত্র দৃশ্য দেখতে পেলো জোসেফ আর রাজা। কাত হয়ে আছে টেবিল, ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ধাতব ট্রে। হাঁটুপানি ঘরে। আরো ঢুকছে। শর্ট-সার্কিটের কারণে সিলিঙের স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম অন হয়ে গেছে, অনবরত ঝরে পড়ছে পানি।
ক্লিন-রুমের পানির ধাক্কায় যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে আগেই। জিনিসপত্র তো উল্টে পড়েছেই, সাপের খাঁচাও পড়েছে। কোনোটা ভেঙেছে, কোনোটার ডালা খুলেছে। যেখানে সেখানে সাঁতরে বেড়াচ্ছে, কিলবিল করছে সাপ। এরকম দুর্ঘটনার জন্যে তৈরি ছিল না ল্যাবরেটরিতে যারা রয়েছে, তারা। কেউ আহত, কেউ গড়াগড়ি খাচ্ছে পানিতে। দুজন লোক গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছে ঘরের এক কোণে, সরতে পারছে না। সাংঘাতিক বিষধর বিশাল এক গোখরো ফণা মেলে রয়েছে ওদের সামনে। নড়লেই ছোবল মারবে।
জোসেফ আর রুশোকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল একজন। ধরার জন্যে দৌড়ে এল চার জন শক্তিশালী লোক।
‘ধর, ধর ওদের!’ আবার চেঁচিয়ে আদেশ দিল প্রথম লোকটা।
লাফ দিল রুশো। নিজেকে ছুড়ে মারল যেন লোকগুলোর ওপর। ভারী শরীরটা ধরে রাখতে পারল না ওরা, পা পিছলে গেল। রুশোকে নিয়ে গড়িয়ে পড়ল দুজন, পানিতে। অন্য দুজনের সঙ্গে লড়াই শুরু করল জোসেফ।
চার জনকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল আরো দুজন।
ইতিমধ্যে টেবিল থেকে উঠে এসেছে রাজা। চোখ টকটকে লাল। খুব দুর্বল, ওর টলায়মান অবস্থা দেখেই আন্দাজ করা যায়।
অন্যান্য ঘর থেকে ছোটাছুটি করে এল আরো লোক। দেখতে দেখতে কাবু করে ফেলল তিন জনকে। শক্ত করে চেপে ধরল।
হঠাত্ গোলমাল ছাপিয়ে শোনা গেল একটা ভারী কণ্ঠ, ‘এই, কী হচ্ছে কী এখানে?’
পুলিশ অফিসার। তার আশপাশ দিয়ে ছুটে ঢুকল দমকল বাহিনীর লোকেরা।
‘থামো! থামো সবাই!’ আবার ধমক দিল অফিসার।
চুপ হয়ে গেল ল্যাবরেটরির লোকেরা। ছেড়ে দিল তিন বন্দিকে। গোখরোটাকে ধরে সরিয়ে আনল গিয়ে এক টেকনিশিয়ান, দুজন লোককে ঘরের কোণে আটকে রেখেছিল যেটা।
এগিয়ে এল রুশো। সেই পুলিশ অফিসার, বারক, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর দায়ে ওদেরকে আটকেছিল যে। বলল, ‘আপনি এখানে এলেন কীভাবে? একেবারে ঠিক সময়ে?’
‘সিকিউরিটি সিস্টেমে শর্ট-সার্কিট হলেই আপনাআপনি খবর চলে যায় পুলিশ স্টেশন আর ফায়ার স্টেশনে,’ জানাল অফিসার। ‘লাইন রাখা হয়েছে। অ্যালার্ম বেজে উঠতেই ছুটে চলে এসেছি। ওয়্যারহাউসেই সাধারণত বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, প্রথমে ওখানেই গিয়েছিলাম। তারপর সন্দেহ করলাম নিচে কিছু হয়েছে।’ ভুরু কোঁচকাল বারক। ‘তোমরা এখানে কী করছ?’
সংক্ষেপে সব জানাল ছেলেরা।
‘নিঃসন্তান চাচার কাছ থেকে ল্যাবরেটরিটা পেয়েছে মরগান,’ বারক বলল। ‘তারপর থেকেই লস দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটা। তাছাড়া বেহিসেবি খরচ করে সে। নিশ্চয় অনেক ধার করে ফেলেছে। আর কোনো উপায় না দেখে এখন সাপ আর বিষ চুরি শুরু করেছে।’
‘রিপোর্টিং কি আগে থেকেই করত?’ রাজা জানতে চাইল।
‘হ্যাঁ। সেই কাজ এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। ল্যাবরেটরির ভার ছেড়ে দিয়েছে ম্যানেজারের ওপর। ওটা আরেক চোর। সন্দেহ করছি অনেকদিন থেকেই, প্রমাণের অভাবে ধরতে পারছিলাম না। যাক, এখন বোধহয় পারব,’ হাসল অফিসার। ‘আমার কাজ সহজ করে দিলে। চলো, ওপরে চলো।’
পুলিশ ঘিরে ফেলেছে সমস্ত এলাকা। কিন্তু ল্যাবরেটরির ভেতরে কোথাও পাওয়া গেল না মরগানকে।
‘পালাতে পারবে না,’ বারক বলল। ‘মেসেজ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আশপাশে সমস্ত রাস্তা ব্লক করে দিয়েছে পুলিশ এতক্ষণ। ফাঁকি দিয়ে একটা মাছিও পালাতে পারবে না।’
পনেরো
খাবারের সুগন্ধ ভুরভুর করছে বাতাসে। মেহমানদের বসার জায়গা করা হয়েছে রুশোদের বাড়ির বাগানে। অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশ চিফ ড্রেক ডানকান আর তাঁর সহকারী পল নিউম্যান। জোসেফ এসেছে। শেরখান আর ডানাও এসেছে।
রান্নাঘর থেকে খাবার আনতে মিসেস রাইসুল আসাদকে সাহায্য করছে ডানা।
খাবার পরিবেশন করছে রুশো আর রাজা।
পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে গল্প করছেন মিস্টার রাইসুল আসাদ। এই বিশেষ দাওয়াতের ব্যবস্থাটা তিনিই করেছেন। ছেলেরা জটিল এক রহস্যের সুষ্ঠু সমাধান করতে পারায় তিনি আনন্দিত।
ডক্টর নেলি বিগল এলেন। ঠেলতে ঠেলতে আনছেন হুইল চেয়ারে বসা ডক্টর রিচারকে।
জোসেফকে দেখেই ভুরু কোঁচকালেন রিচার। প্রায় গর্জে উঠলেন, ‘এই, খাওয়া শেষ করে তাড়াতাড়ি চিড়িয়াখানায় যাও। বেশ কয়েকটা খাঁচা বানাতে হবে। হারামজাদারা ভেঙে...’
‘আমি যাব?’ বাধা দিয়ে বলল জোসেফ। ‘আমার তো চাকরিই নেই।’
‘নেই কে বলল তোমাকে? চাকরি যে গেছে, চিঠি পেয়েছ?’
‘না। কিন্তু আপনি বললেন...’
‘তর্ক কোরো না, বেয়াদব ছেলে! খাওয়া শেষ হয়েছে? জলদি যাও চিড়িয়াখানায়।’
আর কিছু বলল না জোসেফ, কিংবা বলা ভালো, বলার সাহস হলো না। মিনমিন করে কী বলল সে-ই জানে।
মুচকি হাসল রুশো আর রাজা।
মস্ত এক মাংসের টুকরা প্লেটে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে জোসেফ। ছুরি দিয়ে কেটে কাঁটাচামচে গাঁথছে ঠিকই, কিন্তু খেতে সাহস করছে না। করুণ চোখে তাকাচ্ছে খাবারগুলোর দিকে। রিচারকে নিয়ে মিস বিগল সরে যেতেই জোসেফকে ওরা বলল, ‘যাও, চাকরি এবার পাক্কা! তোমার কম্পিউটার কেনা আর ঠেকায় কে?’
‘সব তোমাদের জন্যে,’ চোখ ছলছল করে উঠল জোসেফের। ‘তোমরা সাহায্য না করলে...’
‘আরে, গরু নাকি ছেলেটা?’ মুরুব্বিয়ানা ঢঙে বলল শেরখান। ‘বলে কি? বন্ধুর জন্যে বন্ধু জান দিয়ে দেয়, আর আমরা তো সামান্য সাপের কামড় খেতে গেছি...’
হেসে উঠল ডানা। হাতে খাবারের ডিশ। মিসেস রাইসুল আসাদও হাসলেন। নিডের কথা তাঁর কানেও গেছে।
হাত নেড়ে ডাকলেন ডানকান, ‘এই রুশো, শুনে যাও।’
রুশো কাছে গেলে বললেন, ‘বসো। মরগান আর কককে তো ধরিয়ে দিলে। কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও দেখি এবার।’
‘বলুন,’ বসতে বসতে বলল রুশো।
ছুরি দিয়ে একটুকরো মাংস কেটে চামচে গাঁথতে গাঁথতে জিজ্ঞেস করলেন চিফ, ‘সাপগুলো ল্যাবরেটরি থেকে বের করল কীভাবে কক? বুঝেছ?’
‘সহজেই,’ রুশো বলল। ‘ডক্টর রিচারের অফিসে ছিল তখন জেমস কক। মরগান ছিল ভেন্টের শ্যাফটে। ওখান থেকেই ট্র্যাংকুইলাইজার গান দিয়ে ডার্ট ছোড়ে সে।’ রিচার আর ডাক্তার বিগলের দিকে তাকাল। ‘হাসপাতালেও আরেকবার আপনাকে খুন করতে চেয়েছে ওরা, ডক্টর। ডার্টটা যখন মেডিক্যাল সেন্টারে নিয়ে গেলাম, ভয় পেয়ে গেল কক। ও বুঝল, ভেতরে কী আছে জেনে যাবেন ডাক্তার বিগল। বুঝে ফেলবেন, ডক্টর রিচারের শরীরে কী ঢোকানো হয়েছে।’
‘রুশোরা তখন ওখানে থাকাতেই বেঁচে গেছেন, ডক্টর,’ খেতে খেতে বলল পল নিউম্যান।
‘যা-ই হোক,’ আসল কথায় ফিরে এলেন আবার ডানকান, ডক্টরকে বেহুঁশ করার পর ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিল কক। মূল খাঁচা থেকে বের করে টাইগার স্নেকটাকে আরেকটা খাঁচায় ভরল...’
‘লোকগুলো মহাশয়তান,’ মাঝখানে বলে উঠলেন রিচার।
‘হ্যাঁ!’ ডক্টরের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারলেন ডানকান। ‘নিচে থেকে খাঁচাটা মরগানের হাতে দিল কক। সেটা শ্যাফটে রেখে, দুজনেই পাইপ বেয়ে নিচে নামল। পাইপের ভেতর দিয়ে দিয়েই গিয়ে ঢুকল যেখানে বিষ রাখা হয় সে ঘরে। এবারও ভেন্টের মুখ দিয়ে নিচে নামল কক। বিষ আর অ্যান্টিভেনিনের শিশি, জারগুলো এনে তুলে দিল মরগানের হাতে। তারপর সমস্ত বাক্স দড়ি দিয়ে ছাতে টেনে তুলল ওদের সহকারীরা।’
চিফ থামলে খেই ধরল পল নিউম্যান, ‘ততক্ষণে সিকিউরিটি গার্ডেরা ধাক্কাধাক্কি শুরু করছে ডক্টর রিচারের অফিসে, এখন স্পষ্ট হচ্ছে সব। দরজা খোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই সুযোগে স্টোররুম থেকে বেরিয়ে ল্যাবের পেছন দিকে চলে গেল কক, যেখানে রাখা থাকে দামি সাপগুলো। ভেন্টের ভেতর দিয়ে এক-এক করে আরো কয়েকটা খাঁচা তুলে দিল ওপরে। তাড়াহুড়োয় খেয়াল রাখতে পারেনি, বড় ডরির খাঁচাটাও তুলে দিল। শ্যাফট দিয়ে ছাদে বেরিয়ে মরগান দেখল, হাত থেকে কয়েকটা খাঁচা ফেলে দিয়েছে তার সহকারীরা।’ হাসল পুলিশ অফিসার। ‘নিশ্চয় দেখার মতো ঘটনা ঘটছিল ছাতের ওপর তখন। বাক্স থেকে বেরিয়ে পড়েছে বিষাক্ত সাপ। যত তাড়াতাড়ি পারল, বাকি খাঁচাগুলো নিচে চালান করে দিল ওরা। নিয়ে গিয়ে তুলল গাড়িতে। চিড়িয়াখানার গাড়ি। বাইরে বের করতে কোনো অসুবিধে হলো না। ওই দুই ব্যাটাও চিড়িয়াখানারই লোক তো। যা হোক, বাইরে নিয়ে এক ফাঁকে দুটো সাপ রেখে এল জোসেফদের বাড়ির বেসমেন্টে।’
‘হ্যাঁ, তা-ই করেছে,’ ডানকান বললেন। ‘ও, আরেকটা ব্যাপার খোঁজ নিয়ে জেনেছি আমরা। ভেন্টের ফ্যানের ব্রেকার সুইচের বাক্সটা রয়েছে সাপগুলো যে ঘরে রাখা হয়, সে ঘরে। ফলে পাওয়ার অফ করে দিয়ে ফ্যান বন্ধ করতে অসুবিধে হয়নি ককের। চুরি চলার সময় বন্ধ করে রেখেছিল, তারপর বন্ধুরা বেরিয়ে যেতেই আবার চালু করে দেয়।’
‘ডক্টর রিচার,’ রুশো বলল, ‘কয়েকটা কথা জানতে চাই আপনার কাছে।’
‘কী কথা?’
‘আপনাকে খুন করতে চাইল কেন ওরা?’
‘আমি বেঁচে থাকলে ওরা চুরি করে সারতে পারত না, তাই। কিছুদিন থেকে এমনিতেই কককে সন্দেহ করতে আরম্ভ করেছিলাম আমি। মরগানের সঙ্গে ওর চলাফেরা, আচার-আচরণ ভালো লাগেনি আমার। আর ওই রিপোর্টারকে দু চোখে দেখতে পারি না আমি। ভীষণ পাজি লোক। ওরা জানত, চুরি হলে, ওদেরকে সন্দেহ করছি একথা পুলিশকে বলে দেবো।’
‘হুঁ,’ মাথা দোলাল রুশো। ‘আমার বিশ্বাস জোসেফের স্ক্রু-ড্রাইভার চুম্বকিত করে রেখেছিল ককই। যাতে পাসের কোড গোলমাল হয়ে যায়। বেচারার ওপর আগে থেকেই লোকের কুনজর পড়তে আরম্ভ করেছিল। ঠিকই বলেছেন, লোকটা মহা শয়তান।’
‘একেবারে পাজির পা ঝাড়া। তবে সাপ সামলাতে পারত। তবে আরেকজন জোগাড় করা মুশকিল!’
‘এক কাজ করুন না,’ প্রস্তাবটা দিয়েই ফেলল রুশো, ‘জোসেফকে শিখিয়ে নিন। আর যা-ই করুক, আপনাকে খুন করে সাপ চুরি করার চেষ্টা করবে না সে।’
‘হুঁ, মন্দ বলোনি,’ ক্ষণিকের জন্যে একচিলতে হাসি ফুটল গোমড়ামুখ বিজ্ঞানীর মুখে। জোসেফের দিকে তাকিয়ে ভুরু কোঁচকালেন। ধমক লাগালেন বাজখাঁই কণ্ঠে, ‘এই, তোমার খাওয়া হয়নি এখনো? জলদি যাও! আমি আসছি কয়েক মিনিটের মধ্যেই।’
কাঁচুমাচু হয়ে গেল বেচারা জোসেফের মুখ।
হাসি চাপতে কষ্ট হলো উপস্থিত সকলের।
