মিসরের সাবেক প্রেসডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে উত্খাতের পর বিক্ষোভ ঠেকাতে দেশটির সেনা সরকার ‘পরিকল্পিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড’ চালিয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটির পক্ষ থেকে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ১৯৫ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে ‘প্রায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো’ বলা হয়েছে।
গত বছর জুলাইয়ে মিসরের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির পদত্যাগের দাবিতে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। এক পর্যায়ে মুরসিকে উত্খাত করে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এরপর রাজপথে অবিরাম বিক্ষোভ শুরু করে মুরসির দল মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকরা। বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তখন একাধিক অভিযান চালিয়েছিল। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৪ আগস্ট দেশটির রাবা আল-আদাবিয়া মসজিদ প্রাঙ্গণে অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়ার অভিযানে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে যাতে সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে এ হত্যাকাণ্ডকে সামপ্রতিককালে একদিনে ঘটা পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ’র নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রোথ বলেন, ‘ওটা ছিল বিশ্বে সামপ্রতিককালে একদিনে সবচেয়ে বৃহত্ হত্যাকাণ্ডগুলোর অন্যতম’। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘মিসরের পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিক্ষোভ স্থলের ভিড় লক্ষ্য করে পদ্ধতিগতভাবে সরাসরি গুলি চালিয়েছে। প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে তারা।’ কেনেথ বলেন, ‘এটা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বা দুর্বল প্রশিক্ষণের ঘটনা নয়। এটা ছিল সহিংসভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার যা মিসর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছিল। ওই কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনও দেশটির ক্ষমতায় রয়েছেন। তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’ উল্লেখ্য, মুরসির পতনের পর মিসরের সেনানিয়ন্ত্রিত সরকার পরিচালনা করছিলেন সেনাপ্রধান সিসি। গত মে মাসে অনুষ্ঠিত একতরফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন তিনি।
এদিকে, বিক্ষোভকারীদের হামলায় ওইদিন নিরাপত্তা বাহিনীর ৪৩ সদস্য নিহত হওয়ার দাবি করেছিল মিসর সরকার। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, সেদিন খুব কমসংখ্যক বিক্ষোভকারীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল এবং তারা বেশ দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তারক্ষীদের লক্ষ্য করে প্রধানত ইট-পাটকেল ছুঁড়েছে। উল্লেখ্য, প্রতিবেদনটি তৈরিতে দুইশরও বেশি প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদেনটি নিয়ে এখন পর্যন্ত মিসর সরকার কোনো মন্তব্য করেনি। তবে আগের দিন সোমবার এইচআরডব্লিউ’র নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রোথ ও সংগঠনটির মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক সারাহ লেহ হুইটসনকে মিসরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। তারা রাজধানী কায়রোতে এসে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তাদেরকে ১২ ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসিয়ে রেখে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। পরে এক বিবৃতিতে এই প্রথম এইচআরডব্লিউ’র কর্মকর্তারা মিসরে প্রবেশে বাধা পেলেন বলে জানায় সংস্থাটি। এমনকী সাবেক স্বৈরশাসক হুসনি মুবারকের সময়ও এমনটি হয়নি বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
