পূর্বরাগ
এক : মহাপূর্ণিমার খোঁজে
হুট করে এই নদীর পাড়ে এসে চিন্তায় পড়ে যায় ছেলেটি। এই শহরে তার কোনো পরিচিতজন নেই। রাতে থাকার মতো নিশ্চয়ই কোনো হোটেল পাওয়া যাবে—এমনটা মনে করেই বিকেলবেলা সে চলে এসেছে এখানে। সুনামগঞ্জেই যে আসবে এমন তার পরিকল্পনাও আগে থেকে ছিল না। শাহ্ আবদুল করিমের কবর দেখে দিরাইতে ফেরত এসে সে সিলেটের বাসেই উঠেছিল। ২০-২৫ কিলোমিটার যেতেই সিলেট সুনামগঞ্জ রোডের ইন্টার সেকশনে বাস থামলে তার চোখে পড়ে সুনামগঞ্জের সাইনবোর্ড। মাত্র ৭ কিলোমিটার পথই যদি হয় সুনামগঞ্জ তবে তার সেখানে যেতে সমস্যা কেন? করিম সাহেবের আগের পুরুষ হাছন রাজা। না হয় তাঁর বাড়িটা দেখেই আসুক।
এই জায়গাটিতে নানা রকমের বাস আর অটোরিকশা আসা যাওয়া করে। সে প্রথমে সিলেটগামী বাস থেকে নেমে পড়ল এবং মিনিটখানেকের মধ্যেই সিলেট থেকে আসা আরেকটা বাস যখন কিছু যাত্রী নামানোর জন্য একটু কড়া করে ব্রেক ধরল, তখনই সে প্রায় বাদুড়ঝোলা হয়ে বাসের ভেতর ঢুকে পড়ে।
এবার সে ঠিক কোথায় যাচ্ছে, একেবারেই জানতে চাইছে না। কিছুদূর যেতেই একটা কালভার্টের কাছে এসে রাস্তার দুই পাশে দুই দোতারা টাঙানো গেট দেখে বুঝে গেল, হাছন রাজার দেশে সে চলে যাচ্ছে। এই পথ মিনিট দশেকের মাথায় শেষ হলো। বাসটি তাকে নামিয়ে দিল পুরনো বাসস্ট্যান্ডে। কিন্তু এখন সে যাবে কোথায়?
বাসস্ট্যান্ডের ঠিক উল্টাদিকে কতগুলো খাবারের দোকান। আস্ত ছাগল, মুরগি আর বোয়াল মাছের ছবি দেওয়া সাইনবোর্ড। সে একটার ভেতরে চলে গেল। পানির দেশে তাজা মাছ নিশ্চয় থাকবে। বোয়াল মাছের অর্ডার করল। সঙ্গে ডাল। বোয়াল মাছ এল সঙ্গে আলু আর টমেটো। খারাপ না, এ অঞ্চলের লোকেরা কি ভুনা কম খায়? পাতলা ঝোলের তরকারিতে ভরপেট খেয়ে সে বেরিয়ে এল। এখন কী করবে?
সেলফোনের ঘড়িতে সময় দেখল। বিকেল পাঁচটা বাইশ মিনিট। এপ্রিল মাসে আকাশ মেঘলা থাকায় ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে তার কত দেরি হবে। সময়টা হিসেব করে ভাবল—সন্ধ্যা হতে যখন ঘণ্টাদেড়েক আছে, তখন সুরমা নদীর পাড়ে কিছুটা সময় না হয় কাটিয়ে ফেরা যাক শহরে।
বাস থেকে যতটা সে দেখেছে এই শহর, তাতে তার খুব ভালো লেগে গেছে। ঢাকা থেকে বেরিয়ে যে শহরেই যাক না কেন, ভালো লাগে। ছবি তোলার কাজে ফুরসত পেলেই সে শহর থেকে বেরিয়ে যায়। পলাশী থেকে হেঁটে হেঁটে শাহবাগ, সেখান থেকে মহাখালী এসে ময়মনসিংহের বাসে উঠে মাঝখানে কোথাও নেমে যায়। গাঁও-গেরাম ঘুরে ঘুরে ছবি তোলে। কেউ জিগ্যেস করলে নানারকম উত্তর দেয়। কারো কাছেই তার আসল পরিচয় জানায় না। যার কাছে যে পরিচয় দিতে হয়, সেটাই দিয়ে থাকে। কেউ জানে সে সাংবাদিক, কেউ জানে ফটোগ্রাফার। কেউ কেউ জানে সে জমির দালাল, কাউকে বলে সে তার এক আত্মীয়ের জন্য জমি দেখতে এসেছে।
আজ এই সুনামগঞ্জে নেমেই তার মনে হলো, এখানে দু-চার দিন থাকা যায় অনায়াসে। দিরাইতে শাহ্ আবদুল করিমের বাড়িতেও তার থাকার ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু কেউ রাখেনি। দুদিন আগে ভোরবেলা সিলেট নেমেই জগন্নাথপুরের কেশবপুর গ্রামে গিয়েছিল রাধারমণের বাড়িতে। সারাদিন রাধারমণের মন্দিরের পাশে পুকুরপাড়ে বসেছিল। সন্ধ্যা হলে চলে আসে আসিম শাহ্-র মাজারে। সেখানে সারারাত গানবাজনার মধ্যে থেকে, শেষরাতের দিকে মাজারের পাশের বড় ঘরটির এক কোনায় ফ্লোরের ওপর হ্যাভারসেক রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চলে আসে দিরাই। সারাবেলা নৌকা নিয়ে কালনী নদী ঘুরে ক্লান্ত হয়ে দিরাই বাজারের এক হোটেলে তিন শ টাকায় রুম ভাড়া করে রাত কাটিয়ে গিয়েছিল উজানধল গ্রামে। শাহ্ করিমের কবরের পাশে কিছুক্ষণ বসেছিল। তার বসাবসি আবার খুব নিশ্চুপ থাকে না। সে ক্যামেরা ছাড়া নড়তে পারে না। আগে শুধুই স্টিল ক্যামেরা তার সঙ্গী থাকত, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ভিডিও ক্যামেরা। এই দুই ক্যামেরা বাদ দিয়ে নতুন একটা ডিএসএলআর নিয়েছে। এতে দুই ক্যামেরার কাজ হয় তার। পকেটে আছে ভয়েস রেকর্ডার। আর আছে ছোট্ট ক্লিপ মাইক্রোফোন। সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিলেটের হাওর-বাওরে সে এক মাস ঘুরে বেড়াবে। সিলেটের এই ভাটি অঞ্চলে কী করে বা কেন এত আউল-বাউলের জন্ম হলো, তা সে উদ্ঘাটন করেই ছাড়বে।
কিন্তু এই শেষ বিকেলে এই লোকালয়ে এসে কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। তার কাঁধে যে ব্যাগ এটা একটা বিশেষ ডিজাইনের। নতুন এসেছে বাজারে। এর এক পাশে চমত্কারভাবে তার ম্যাকবুকটা রাখা। ভেতরে অনেকগুলো খোপ আছে। বড় খোপটা ক্যামেরার, বাকি খোপগুলো নানারকমের ল্যান্স, হুড, চার্জার, এসবের জন্য। তার একটি মাত্র ল্যান্স ১৮-২০০ মিলিমিটার। আর কিছু নাই। আছে তিনটা চার্জার। ম্যাকবুক, ফোন আর ক্যামেরার। এসব রাখার পর আরো তিনটা ছোট খুপরি পড়ে থাকে ব্যাগের ভেতর। একটিতে টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, আর একটা ছোট্ট ডিওডোরেন্ট। আগে শেভিং কিটস্ নিয়ে বেড়াত ব্যাগে। এখন প্রয়োজন হচ্ছে না। এটা তার এখন লাগে না। গোঁফ-দাড়ি নিজের মতো একটু বাড়ছে। তাতে অবশ্য মাঝে মাঝে সমস্যা হয়। ছোকরা টাইপের ছেলেরা তার কাছে এসে জিগ্যেস করে—শুকনা কোথায় পাওয়া যায়? সে প্রথমে বুঝেনি। পরে ভদ্র ভাষায় জবাব দিয়েছে, না ভাই, গাঁজা আমি খাই না। সিগারেটও না।
তার ব্যাগের অপর দুই খুপরিতে আরো দুটো জামা আছে। একটা ইলাস্টিক দিয়ে বানানো ঢিলাঢালা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। আরেকটা সুতির পাতলা টি-শার্ট। এগুলো সে কখনো কখনো ঘুমানোর সময় ব্যবহার করে, আবার কখনো এই ঘুমের পোশাক পরেই ছবি তুলতে বেরিয়ে যায়।
ব্যাগের সাইড পকেটে ছোট্ট একটা নোটবুক। এখানে কতগুলো তারিখ, জায়গা আর কিছু মানুষের নাম লেখা। মাঝে মাঝে খুব সংক্ষেপে, তার নিজের বোঝার মতো কিছু শব্দ লেখা থাকে। তার ইচ্ছে, পরবর্তী সময়ে তার ফটোবুক যখন প্রকাশিত হবে, সেখানে সে এখান থেকে তথ্য নেবে। ব্যাগের ভেতর তার সবচেয়ে আদরের জিনিসটা, তার ক্যামেরা। ক্যামেরাটা সে নিজের টাকায় কিনেছে। তার এক টিচারের পুরস্কারজয়ী একটা আর্কিটেকচারাল প্রজেক্টের ওপর ৫ মিনিটের একটা ডকুমেন্টারি বানিয়ে দিয়েছিল তিন দিনের মধ্যে। ভালো টাকা পেয়েছিল। আগের স্টিল ক্যামেরাটা সস্তায় বিক্রি করে আরো কিছু ভরে কিনে ফেলেছে এই ক্যামেরা। ছোট্ট একটা ম্যাকবুক তার সঙ্গে থাকে। খুব জরুরি কিছু হলে এই ম্যাকবুকেই এডিটের কাজটি সেরে ফেলে। সুতরাং তার কাজের জন্য বসার কোনো জায়গার দরকার হয় না।
ছেলেটি পড়ছে বুয়েটে আর্কিটেকচার নিয়ে। ৫ বছরের কোর্স। এর মধ্যে ৭ বছর তার হয়ে গেছে। এখনো ক্রেডিট শেষ হচ্ছে না। ধারণা করা যাচ্ছে আরো বছর দুই তার লাগতে পারে। গত টার্মে সে ওয়ার্কিং ড্রয়িংয়ে ফেল করেছে। পরের টার্মে এটা রিপিট করে সে ফোর ওয়ানে উঠে যেতে পারত। কিন্তু নেবে না। সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে ইয়ার রিপিট করবে। ডিজাইনে একজেম্পশন পেয়েছে। থিয়োরি ক্লাস তার করা লাগে না। থিয়োরি দুইটাতেও ভালো নাম্বার আছে। বাকিগুলো পরীক্ষার আগে একটু দেখে নিলেই পারবে। এক সপ্তাহ আগে ওয়ার্কিং ড্রয়িং শেষ অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়ে দিয়েছে। সুতরাং মাস দেড়েক সময় পুরাপুরি এখন তার হাতে। এই সময়টা সে ঘুরে বেড়ানোর জন্য বেরিয়ে গিয়েছিল তিন দিন আগে। আর কতদিন থাকবে, কেউ জানি না। ঢাকা থেকে বেরোনোর সময় ৭ হাজার টাকা তার পকেটে ছিল। এখনো ৪ হাজারের ওপরে তার পকেটে আছে। সুতরাং তার কোনো চিন্তা নাই।
টানা ৬ দিন বৃষ্টি হয়েছে এখানে। বৈশাখ মাস আসতে এখনো কয়েকদিন বাকি। এই সময়ে বৃষ্টি হবার কথা ছিল না। কিন্তু হয়ে গেল। এত বৃষ্টির পানি আটকানোর জন্য যে বাঁধ বানানোর কথা ছিল, সেই বাঁধের কাজ আগে শেষ করেনি তার ঠিকাদার। করবেই বা কেন? শুকনো মৌসুমে বাঁধের কাজ শেষ করলে মাঝে চোরামি করা যায় না। অপেক্ষা বর্ষার। পানির তলে বাঁধ চলে যাবার পর ইচ্ছেমতো মাপ নিয়ে প্রজেক্টের লোকদের খুশি রেখে নিজের খুশিমতো বিল ওঠানো যায়। সুতরাং ধীরে চলুক বাঁধের কাজ। এই সুযোগে মেঘালয় থেকে গড়িয়ে আসা বাদলির পানি এসে অসময়ে ডুবিয়ে দিয়ে যায় ধানের খেত। ধানের বীজ তখনো দুধেল নরম। সপ্তাহ দুই সময় পেলে এই দুধেল ধানে বীজ গজাত, চাল হয়ে যেত, তারও সুযোগ ছিল না। সব ধান পানির তলায় চলে যাবার পর সবুজ খেত এখন ভেটভেটা বর্ষার রূপ নিয়ে আছে।
ছয়দিন পর আজ রোদ উঠেছে। মানুষজন এখন ঘর থেকে বেরিয়েছে। নদীর পাড়ে অনেক মানুষের জটলা।
ছেলেটি একটা রিকশা নেয়। এই শহরের রিকশাগুলোও মজার, ব্যাটারিতে চলে। চালকের খাটনি কম, ঝাঁকিঝুঁকিও লাগে না। এই ঝাঁকি না লাগার কারণে রিকশায় বসে বসে শহরের কতগুলো ট্র্যাকশট নিয়ে নেয়। সামনে বেশ উঁচু একটা ব্রিজ, সেখানে অনেক মানুষের ভিড়। সে রিকশা নিয়ে ব্রিজের তলা দিয়ে গিয়ে নদীর ঘাটে গিয়ে রিকশা ছেড়ে দেয়।
নদীর পাড় ঘেঁষে কংক্রিটের পায়ে হাঁটা পথ। জায়গায় পৌঁছে মনে হলো, নৌকা বা স্টিমার বানানোর একটা কারখানা এটা। বেশ কটা বড় বড় নৌকা পেট উল্টে শুয়ে আছে মেরামতের অপেক্ষায়। তার একপাশে কিছু দোকানপাটও আছে। সামনে কতগুলো স্টিমার ভিড়ানো। কোনো কোনোটি ছইওয়ালা নৌকার মতো। ইঞ্জিন আছে। কিছু আছে একেবারেই সাধারণ নৌকা, মানুষ পারাপারের জন্য তার ব্যবহার। সে সবেও ইঞ্জিন লাগানো। একটি মাত্র নৌকা এতক্ষণ একাকী নদীর হালকা স্রোতে দোল খাচ্ছিল, কিন্তু প্রায় সত্তর বছর বয়সী এক লোক পাড় থেকে নোঙর ছাড়িয়ে যেই না তার নৌকায় উঠতে যাবে, এমন সময় ছেলেটি তার সঙ্গে কথা বলে।
চাচা, এই নদীটার নাম কি সুরমা?
অয় বা
আমি এই নদীতে এক ঘণ্টা ঘুরব। কত নেবেন?
আমরা মাছ ধরি বাজান। আফনে সাববাড়ির ঘাটো যাউক্কাগি। হিকানো খেওয়া আছে, নাও আছে, মাঝিও আছে। ঘণ্টা চুক্তিতে যায় তারা। দুই-তিনশো টাকা ঘণ্টা নেয়।
চাচা, আমি আপনার নৌকায় কিছুক্ষণ বসি। একসময় আমি নেমে যাব। যতক্ষণ থাকব, তার জন্য পয়সা দেব আপনাকে।
নামবায় খই?
আপনি যেখানে নামাবেন, নেমে যাব।
চিন্তায় পড়ে যায় নৌকার মাঝি। এমন কিসিমের লোক সে আগে দেখেনি। ধারণা করছে ঢাকা থেকে আসা কোনো সাংবাদিক বা এরকম কেউ হবে। সে যেই হোক, ছেলেটির আবেদনের মধ্যে যে সারল্য আছে, তাতে মুগ্ধ হয়ে মাঝি নৌকায় উঠিয়ে নিলে ছেলেটি নৌকার গলুইতে গিয়ে বসে। ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে। মাঝি খানিকটা চমকায়। কিছুটা ভয়ও তার মধ্যে এসে গেছে। একটু হাসি মাখিয়ে বলল—আফনে সম্পাদিক? ঐ চুরগুলারে নিয়ে বালাখরি রিফোর্ট খরইন।
হাসে ছেলেটি। বলে, না চাচা। এমনি—আমি ফটো তুলি। আমি স্টুডেন্ট। বুয়েটে পড়ি।
মাঝি তার কিছু বুঝল বলে মনে হলো না। আবার প্রশ্ন করে—তা, বাজান, কুন বিষয়ের রিফোর্ট করবা?
ছেলেটি এবার আর জবাব দেয় না। নদীর পশ্চিম পাড়ের গ্রামের আড়ালে চলে গেছে সূর্য। তারা নদী পার হয়ে উত্তর দিকের হাওরের দিকে নৌকা বাইতে শুরু করে। একসময় নদীর পশ্চিম পাশ দিয়ে ছোট্ট একটা খাল গিয়ে হাওরে মিশে যায়। ছেলেটির মন ফুরফুরা হয়ে ওঠে। সামনে আর লোকালয় নেই। অনেক দূরে উত্তর পাশে মেঘালয়ের পাহাড়। সন্ধ্যা হয়ে আসে। হাওরে কতগুলো বাতি জ্বলছে। নৌকার গলুইয়ে রাখা হারিকেনের বাতি জ্বলছে। এগুলো সব জেলেদের নাও। সারারাত জেগে জেগে তারা জাল পাহারা দেবে।
মাঝি বলে, রাইত কুয়াই থাখবা বা?
ছেলেটি বলে, ঐ নৌকায়।
খার নৌকায়?
যে কোনো জেলের নৌকায়।
মজা পেয়ে যায় মাঝি। বলে—গান হুনবাইন? ই মাঝিরা সারারাইত ইনো গান খরে।
কিসের গান? হাছন রাজার?
শুধু হাছন নায়, আরো বউতর গান অয় ইনো। করিমর গান বেশি চলে, ধামাইলও গায়।
হাছন রাজার গান হয় না?
হাছন রাজা তো মাঝে মাঝে নিজেউ আইয়া ফড়ইন।
মানে?
মাইনষের মুখে হুনছি বাজান। হাছা-মিছা জানি না বা। ভরা বারিষার চান্নি রাইত মাজে মাজেই খাংলার আওর বা হ বাজুর ঔ দেখার আওর দিয়া তান নৌকা আয়। তাইন নিজেও গান গাইন, সঙ্গীসাথীরাও গায়।
বলেন কী!
ঘটনা হাছা। বহুত মাইনষে দেখছে। দুই-চাইর জনের লগে খতাও অইছে তার।
কী কথা?
ইতা জানি না। একবার এক মাজি তারে দেখিয়া ফিট অইয়া ফড়ি গেল নৌকা তাকি। আর উঠলো না। মারা গেল। এরফর তাকি তার নৌকা দেখলে লোকজন হরি যায়। খেউ খাছে যায় না, মাতেও না।
আর কেউ দেখছে তারে?
আমার বাজানে একবার দেখছইন তানরে। খাংলার আওরো কুড়া শিকার খরতে। বাজানোর নাম ধরি ডাখও দিছোইন। বাজানোর লগে ফরিচয় আছিল তান।
তারপর?
বাজান ডাক হুনি খান্দাত গিয়া দেখোইন, তান কুড়া আছে, ছাত্তি আছে, তাইন নাই, মিলাই গেছোইন।
ছেলেটি বোঝে, নিতান্তই তৈরি হওয়া একটা মিথ এটা। এমন মিথ পীর ফকির শ্রেণির নানা লোক সম্পর্কে শোনা যায়। হাছনও তো কিংবদন্তি চরিত্র। তাঁকে নিয়ে এমন গল্পগাথা তৈরি হবে, এটা খুবই স্বাভাবিক।
ছেলেটি আকাশের দিকে মুখ করে নৌকার গলুইতে শুয়ে পড়ে। ছবি তোলার কাজ না থাকলে আকাশ দেখাকে বড় কাজ মনে করে সে। রাতের আলোয় ছবি হয় না, যা হয় তা নিয়ে তার কোনো উত্সাহও নাই। সে আকাশের তারা গোনার চেষ্টা করে। কিন্তু খুব অমাবস্যা না থাকায় তারা গুনতে সুবিধা হচ্ছে না। সে দেখে তারাগুলো স্থির আছে। শুধু আকারে কোনোটা বড়, কোনোটা ছোট। একটি মাত্র তারা ফড়িংয়ের মতো ওড়াউড়ি করছে। যেন আঁকাবাঁকা পথ ধরে ছুটছে। একবার ভাবল, এটা হয়তো কোনো স্যাটেলাইট। অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে, বা সেখানে যাচ্ছে। পরে মনে হলো, না সেটা হতেই পারে না। স্যাটেলাইট তো সোজাসুজি যাবে। এটা তবে অন্য কিছু? কী হতে পারে? আকাশের তারার দিকে তাকালে সবসময় তার মনে এমন কিছু প্রশ্ন আসে—যার জবাব সে জানে না। এসবের জবাব যেসব পুস্তকে লেখা আছে, সেগুলো নিয়েও তার অনেক সন্দেহ। কী আছে ওখানে? মানুষ মরে গেলে কি ওইসব তারার রাজ্যে চলে যায়? নাকি কখনো কখনো সেই তারার রাজ্য থেকে আবার ফেরত আসে পৃথিবী গ্রহে? হাছনও কি তেমন করে আসতে পারে?
ছেলেটি নাওয়ের গলুই থেকে উঠে দাঁড়ায়।
পুবের আকাশে খুব বড় একটা চাঁদ উঠেছে আজ। কিন্তু এই চাঁদের আলো খুব একটা আসছে না। দুই দিন পর বড় চাঁদ উঠবে। এমন ভরাবর্ষার ফকফকে জ্যোত্স্নারাতে পানির কী রূপ হয় সে আসলে খুব একটা অনুমান করতে পারছে না। বড় বড় লেখকদের লেখায় হাওরের পানি, চাঁদ, জ্যোত্স্না—এসব নিয়ে অনেক কাব্যকথা পড়েছে সে, কিন্তু এমন কিছু দেখেনি। সে মাঝিকে জিগ্যেস করে—আচ্ছা পরশু তো ব্লু মুন, তা-ই না চাচা?
মাঝি কথা বলে না। মনে হয় বোঝে নাই।
ছেলেটি আবার বলে, পরশু তো পূর্ণিমা?
অয়, বাজান। পরশু চান্নি রাইত।
পরশু রাতে কিন্তু অনেক বড় পূর্ণিমা হবে। গত ৮০ বছরে চাঁদ এত বড় হয়নি। পরশু কি হাছন রাজার নাও আসতে পারে এই হাওরে?
মাঝি বলে, এর কোনো ঠায়ঠিকানা নাই। সব চান্নি রাইতে তার নাও আয় না। তবে দুই-তিন বছর পরপর তাইন আইনই। ই খতা হুনা যায়। গত বছর খেউ দেখসে না। ইবার আইতা ফারইন। মাঝে মাঝে সাববাড়ির ঘাটর গেসে আইয়া আবার যাইন গিয়া।
ছেলেটি ব্যাগ থেকে তার ফোনটি বের করে। আজ সারাদিন ফোন খোলা হয়নি। সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছিল, যতদিন এই অঞ্চলে থাকবে, ফোন খুলবে না। ফোন থাকা, ফেসবুক থাকা—মানে বিশাল যন্ত্রণা।
কিন্তু এখন তার ফোন বের করতে ইচ্ছে হচ্ছে। ফোনে চার্জ আছে পঁয়ষট্টি পারসেন্ট। বাহ্। মোবাইল ডাটা অন করল। দেখে—এখানে পুরো ফোর-জি নেটওয়ার্ক। ফেসবুক অন করতেই দশ-বারোটা নোটিফিকেশন চলে এল। সে কোনোদিকে খেয়াল না করে একটা স্ট্যাটাস লিখে পোস্ট করে দিল।
স্ট্যাটাস পোস্ট করেই একধরনের রোমাঞ্চ বোধ করে সে। কিন্তু তার ফলাফলের জন্য আর অপেক্ষা করে না।
আকাশটা বেশ মেঘলা। মেঘের আড়াল হয়ে গেছে সন্ধ্যা রাতের চাঁদ। আজ আর বেশিক্ষণ থাকবে না এখানে। ফোনটা বন্ধ করে ব্যাগের মধ্যে রেখে দিয়ে মাঝিকে বলল, আপনি আমাকে নদীর পাড়ে কোথাও নামিয়ে দেন চাচা। না হয় আপনার বাড়ি নিয়ে যান, আপনার সাথে ঘুমাই। আগামী পরশুর জন্য তৈরি হতে হবে আমার।
দুই : জল জ্যোত্স্নার শহরে
বেলা সাড়ে তিনটায় ঢাকা-সুনামগঞ্জের শ্যামলী বাস থেকে নেমেই রিকশা নিয়ে সাহেববাড়ির ঘাটের দিকে যেতে যেতেই চারু একটা ঘোষণা শুনতে পায়। এক লোক রিকশায় বসে আছে মাইক হাতে। রিকশার সামনে-পেছনে দুটো চোঙাওয়ালা মাইকের স্পিকার। কিছুদূর গিয়ে রিকশাটি থামে। লোকটি বিশাল একটা ঘোষণা পড়ে শোনায়। ঘোষণা হচ্ছে—সম্মানিত এলাকাবাসী, আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাইতেছে যে, আজ সন্ধ্যা ৭টা থেকে শহরের রাস্তার সব বাতি নেভানো থাকিবে। শুধু ঘরের ভেতর আলো থাকিবে, আর কোথাও আলো পাইবে না রাত তিনটা পর্যন্ত। সম্মানিত এলাকাবাসী, আপনাদের অনুরোধ করা যাইতেছে যে, আপনারা ঘরের বাতি নিভাইয়া রাখুন, কিংবা অল্প আলোতে রাখুন যাহাতে আলো ঘরের বাহিরে আসিতে না পারে। সম্মানিত এলাকাবাসী, আপনাদের নিরাপত্তার জন্য শহরে বিশেষ পুলিশের ব্যবস্থা রাখা হইয়াছে। আপনারা দলে দলে জ্যোত্স্না দেখিবার জন্য রিভারভিউ ঘাট কিংবা নদীর পাড়ের যে কোনো ঘাটেই নিরাপদে চলাচল করিতে পারিবেন। আদেশক্রমে, মাননীয় মেয়র, সুনামগঞ্জ পৌরসভা।
শহর পেরিয়ে আধা মাইলের মতো পথ পাড়ি দিয়ে দেখে একটা নদীর পাড় দিয়ে তার রিকশা চলতে শুরু করেছে। চলতে চলতে এক জায়গায় তাকে নামিয়ে দেয়। রিকশাওয়ালা বলে, এটাই সাহেববাড়ির ঘাট। চারু তার ব্যাগের ভেতর থেকে পার্স বের করে। সে আসলে জানে না, ভাড়া কত হতে পারে। সে বিশ টাকার একটা নোট বের করবে বলে হাতে ধরে রেখে রিকশাওয়ালাকে জিগ্যেস করে, কত ভাড়া?
দশ টাকা।
চারু একটা লাল রঙের দশ টাকার নোট খুঁজে বের করে তার হাতে দিতে দিতেই বুঝে ফেলল—এই অঞ্চলের মানুষেরা এখনো যথেষ্ট গরিব আছে। খরচও কম তাদের। ঢাকায় হলে এই ভাড়া পঞ্চাশ টাকা চাইত রিকশাওয়ালা। জমিদার সাহেবের বাড়ির ঘাট যেমন হবে ভেবেছিল, সে রকম কিছু নাই। চারু দেখে, অনেকগুলো বালু ও পাথরের ট্রলার দূরে। কাছে কিছু ছোট ছোট নৌকা। রাস্তাটির একপাশে কোনো কোনো বাড়ির সীমানা বরাবর কিছু দোকান। দোকানে চিপস-চানাচুর ঝোলানো। অপর পাশে নদী। নদীর ওপর কয়েকটা খ্ুঁটিতে ভর করে টিনশেডের এক মাচা। দেখেই বুঝে ফেলে—এটা চায়ের দোকান। সে দোকানের একটা জানালার পাশের বেঞ্চের ওপর গিয়ে বসে পড়ে।
দোকানদার চারুকে দেখে চমকাল না। কারণ সাহেববাড়ির ঘাটে এমন অনেক কাস্টমার সে রোজই দেখে। হাছনরাজার বাড়ি ও জাদুঘর দেখা শেষ করে এখানে এসে শহরের ছেলেমেয়েরা জটলা পাকিয়ে চা-বিস্কুট খায়, কেউ কেউ এখান থেকে নৌকা ভাড়া করে সুরমা নদীতে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এই মেয়েটি এসেছে একা। তার পরনে একটা কালো রঙের ট্রাউজার, সঙ্গে ঢিলেঢালা নীল রঙের টপস। আর কিছু নেই। সে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে কাঠের পাটাতনের ওপর রাখতে গিয়ে তক্তার ফাঁক দিয়ে দেখে নিল যথেষ্ট ঘোলাপানি প্রবাহিত হচ্ছে এবং বেশ স্রোতও আছে। চোখ থেকে চশমা নামিয়ে রাখে সামনের টেবিলে এবং প্রায় পরিচিত দোকানদারকে যেমন করে বলে, সে রকম স্বরেই বলল, মামা এক কাপ রং চা, চিনি ছাড়া, শুধু লিকার।
এটুকু বলেই দোকানের সামনে রাখা কতগুলো বৈয়ামের একটি থেকে একটা কেক বের করে নিল। পাশে আছে এক কাদি কলা। দুইটা কলা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে বলল, মামা, খাবার পানি কোনটা?
দোকানি এমন কাস্টমার আগে পায়নি কখনো। সে প্রথমে ভেবেছিল এটা সম্ভবত একটা ছেলে। কাছে আসার পর ভালো করে কথা শোনার পর এবং চুলের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এটা ছেলে নয়, মেয়েই।
চারু মাথা থেকে টুপি খুলে পাশের বেঞ্চিতে নয়, একটু দূরে গিয়ে একটা বড় পাথরের ওপর বসে সিগারেটে আগুন ধরাল। এর মধ্যে তার পাশে চা চলে এসেছে। সারাদিন তেমন কিছু তার খাওয়া হয়নি। এখানে রাতে কোনো হোটেলও ঠিক করেনি। নৌকায় রাত কাটানোর কথা। কিন্তু নৌকা কোথায়? কাউকে কোথাও পাচ্ছে না।
চারু ব্যাগ থেকে ফোন বের করে সুইচ অন করে। ভালো চার্জ আছে ফোনে। ষাট পার্সেন্ট। খারাপ না। পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে আছে ফুল চার্জ দেওয়া। চিন্তা নাই। সে ফোনে মোবাইল ডাটা অন করে। সে নিশ্চিত, ফেসবুকে গেলেই খবর পেয়ে যাবে।
আকাশ বালকের টাইমলাইনে যায়। দেখে একটা ইভেন্ট এর মধ্যে খুলে রেখেছে ছেলেটা—জ্যোত্স্না বিহার উইথ হাছন রাজা। সাহেববাড়ির ঘাটে রিপোর্টিং ৪টায়।
আকাশ বালকের সঙ্গে কথা বলা দরকার। সে ইনবক্সে জানায়, এসে গেছে।
আকাশ বালক সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়—বিকেল ছয়টায় রিভার ভিউতে থাকবো। আসতে পারেন।
চারু ঠিক বুঝতে পারছে না, তার এখন কী করা উচিত। আকাশ বালক কারো নাম হতে পারে? নিশ্চিত ফেক আইডি। প্রোফাইলে তার যে ছবি আছে, এটা একটা ছায়ার। কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে পাথরের ওপর ছায়া পড়েছে। এমন ছবিতে কারো চেহারা চেনা যায় না। আবার অ্যাবাউট-এ গিয়ে দেখেছে, স্টাডিড—বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি। এর মানে কী—সে এখনো স্টুডেন্ট, নাকি পাস করে বেরিয়েছে। পাস করে যদি বেরিয়েই যাবে, তবে পলাশী এলাকায় থাকবে কেন? সে পাল্টা একটা ম্যাসেজ পাঠায় ইনবক্সে।
আপনারা কোথায়?
আমি সুনামগঞ্জ, আপনি?
আমিও সুনামগঞ্জ।
কোথায় উঠেছেন?
সাহেববাড়ির ঘাটে।
আমিও তো এখানে। আপনি কোথায়?
টংয়ের পেছনে একটা বালুর ট্রলার দেখেন। তার ছাদের ওপর আমি শুয়ে আছি। এখানে অনেক জায়গা আসতে পারেন।
আমি স্টিমারে যেতে পারব না। আমি টংয়ের কাছেই, নদীর পাড়ে। আপনি আসেন।
চারু দোকানে চায়ের বিল মিটিয়ে ডানে বামে তাকিয়ে, নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়ানো কয়েকটা বালুর স্টিমার দেখতে পায় এবং একসময় লক্ষ করে যে, একটা ছোট্ট নৌকা করে এক তরুণ নদীর পাড়ের দিকে আসছে। নৌকাটি কাছে এলে সে তরুণটিকে সরাসরি প্রশ্ন করে—আপনি একা? আর কেউ নেই?
আরো কয়েকজন আসার কথা। আপনি প্রথম এলেন।
আমি কি এই নৌকায় উঠবো?
উঠে পড়ুন।
আমরা যাবো কোথায়?
আপাতত এখানে থাকবো। এই নৌকা দিয়ে যাবো রিভার ভিউতে। একটা বড় নৌকা আসবে রিভার ভিউতে। ওখানে ৬টায় আসতে বলেছি সবাইকে। আমরা সন্ধ্যার পরপরই রওয়ানা দেবো। খাওয়াদাওয়া হয়েছে?
না। আপনার?
না।
চলেন, খাই কিছু।
এই বলে তারা আবার সেই টং দোকানের কাছে নৌকা ভিড়ায় এবং মাঝিকে দিয়ে চা-বিস্কুট-বনরুটি-আনিয়ে নৌকায় বসে বসে খায়।
এই যুগের ছেলেমেয়েরা অনেক স্মার্ট। তারা অপরিচিত কারো সঙ্গে পরিচিত হতে সময় নেয় কম। পাঁচ মিনিটের মাথায় এই তরুণ-তরুণী দুজন একই শহরের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসিন্দা হিসেবে নিজেদের আবিষ্কৃত করে ফেলে। মেয়েটি থার্ড ইয়ারে, ছেলেটি ফোর্থ ইয়ারে। একজনের বিষয় এনথ্রোপলজি, আরেকজনের আর্কিটেকচার। মেয়েটি কবি, ছেলেটি ডকুফিল্ম মেকার। তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই একে অপরকে তুমি বলে সম্বোধন করা শুরু করে দিল।
তোমার কবিতার বিষয় কী?
প্রেম।
প্রেম করেছো?
হুঁ।
কয়টা?
অসংখ্য।
বাহ! কতদিন ধরে কবিতা লিখো?
হিসেব করিনি। প্রতিদিনই লিখি।
এ পর্যন্ত কতগুলো লিখেছো?
গুনিনি।
বই কয়টা বেরিয়েছে?
একটাও না।
ছাপা হয়েছে কতগুলো?
একটাও না।
ছাপাওনি কেন?
কেউ ছাপতে চায়নি।
তুমি দিয়েছো কোথাও?
না।
কেন?
আমি তো সবাইকে পড়ানোর জন্য লিখি না। সবার পড়ার জন্য কত কবিতা আছে। সেগুলো পড়বে। আমি লিখি আমার জন্য। তা তুমি কী নিয়ে ডকু বানাও?
মানুষ নিয়ে।
মানে?
হিউম্যান ডকুমেন্টারি।
কতগুলো বানালে?
বেশকিছু রাশ নিয়ে রেখেছি। মাথায় আছে অনেক কিছু। বসলেই হয়ে যাবে। এখনো বানাইনি।
কতদিন ধরে বানাচ্ছো?
বেশি না। দুই মাস হলো এই ডিএসএলআর পেলাম। আমার কোনো স্পেয়ার হার্ডডিস্ক নাই। ফুটেজ নিয়ে ল্যাপটপে ঢেলে রাখি। কম কম ছবি তুলি। ডিস্ক খালি হলে চিন্তায় পড়ে যাই।
এখানে কতদিন হলো?
পরশু এসেছি। এই দুই দিনে ওস্তাদের লক্ষ্মণশ্রীর যাবতীয় কিছু শ্যুট করলাম। তাঁর বাড়ি, তাঁর শত্রু গোবিন্দ শর্মার বাড়ি, তাঁর বাড়ির পাশের লাগোয়া গার্লফ্রেন্ড দিলারামের বাড়ি, তাঁর কবর, মায়ের কবর, বউয়ের স্কুল, তাঁর যা যা আছে এসব। কথাও বলেছি অনেকের সঙ্গে। তাঁর পঞ্চম পুরুষের যাকে যাকে পেলাম, তাঁদের সঙ্গেও বসেছি, তাঁর এক গার্লফ্রেন্ডের নাতিকেও পেয়েছি।
গার্লফ্রেন্ডের নাতি-পুতির খোঁজ কেমনে পাইলা?
আরে তিনি যে সকল মহিলাদের সঙ্গ নিয়েছেন, তাদের অনেককেই ঘরবাড়ি বানিয়ে দিয়েছেন। কাউকে দূরে, কাউকে একদম কাছে। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গিনী ছিল দিলারাম। তাঁকে তিনি বিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর এক নায়েবের সাথে। তাঁদের বংশধরেরাও আছে, খুব সম্মানের সাথে।
ইন্টারেস্টিং! আচ্ছা, এই উত্তরপুরুষেরা কি তাঁদের পূর্বপুরুষদের কীর্তিকলাপ নিয়ে কিছু বলে?
একদম না। মজার ব্যাপার পেয়েছি হাছনের শত্রুর বাড়িতে গিয়ে।
কী?
যে জমিদারের সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বেশি শত্রুতা ছিল, সেই জমিদারের পুতি এই শহরের সবচেয়ে ভালো হাছন রাজার গানের শিল্পী। নিজেই শুধু গায় না, শেখায়ও। আমি গিয়েছিলাম তাদের বাড়ি।
বাহ্, মজা তো! কী বললো তারা?
পরে বলছি। বেশি মজা পেয়েছি হাছন রাজার এক প্রতিদ্বন্দ্বী জমিদারের নাতির সাথে কথা বলে।
মল্লিকপুরের জমিদার?
হুঁ। তুমি জানো কেমনে?
পড়েছি। হাছন তো জেল খেটেছিলেন এই জমিদারের মামলায়। ডিটেইল্স কিছু পেয়েছো?
তেমন না। শুধু বলেছে যে তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে হাছন ঘোড়া চালিয়ে যেতে পারত না।
কেন?
আরে জানো না, আগের দিনের জামিদারদের বাড়ির পাশ দিয়ে কোনো সাধারণ লোককে জুতা পায়ে হাঁটতে দিত না। ছাতি মাথায়ও যেতে পারত না।
কিন্তু হাছন তো জমিদার ছিল। তাকে দেবে না কেন?
বড় জমিদার, ছোট জমিদার নানা কিসিমের ব্যাপার ছিল। শত্রুতা ছিল।
কী নিয়ে শত্রুতা?
পৃথিবীতে সকল শত্রুতা দুই বিষয় নিয়ে মাত্র। হয় মাটি, নয় মাইয়া মানুষ। এর কোনো একটা নিয়েই হবে নিশ্চয়। আমি ডিটেল্স ভিডিও করেছি উনার কথা। পরে শোনাবো। এখন দেখা যাক। আজ যদি সত্যি সত্যি ওস্তাদকে পেয়ে যাই, এ জীবনে আর কিছু না বানালেও হবে। দিনের বেলা চিপস খালি করে, ব্যাটারি ফুল চার্জ দিয়ে রেখেছি।
চারু বলে, লোকটাকে নিয়ে আমার অনেক কৌতূহল। কিন্তু বেশি কিছু জানি না। তোমার স্ট্যাটাস দেখেই তাড়াতাড়ি আজিজ থেকে দুটো বই কিনেছি তার ওপর। বাসে বসে পড়েছি কিছু । বেশি পড়াও হয়নি। তোমার স্ট্যাটাসটা পড়ে মনে হলো আসি এখানে। আর কিছু না হলে তার ঘর-বাড়িতো দেখা যাবে। আর হাওরে যদি একরাত কাটানোই যায়, মন্দ কী?
আমিও বেশি কিছু জানতাম না। আজ আর কাল এই দুইদিন পুরো সুনামগঞ্জ শহর একা একা ঘুরেছি, ছবি তুলেছি, এই যা। আর হাছন দর্শনের বিষয়টা কিন্তু একেবারেই মিথ পর্যায়ের। কিছু না পেলে আমাকে দোষা যাবে না।
তারা মাঝিকে নিয়ে উজানের দিকে নৌকা বাইতে বাইতে প্রায় এক মাইলের নদীপথ পার হয়ে দেখে রিভার ভিউ ঘাটে এসে গেছে।
অনেক ভিড় আজ। এমনিতে মাঝে মাঝে ভরা পূর্ণিমা রাতে এখানে বেশ জটলা হয়। কিন্তু আজ সে রকম কিছু নাই। শুধু কিছু ঢাকাইয়া লোকের আগমন ঘটেছে। তার কারণ, আকাশ বালক নামক ফেসবুক আইডি থেকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিল। এটা ১২০টা শেয়ার হয়েছে প্রথম ঘণ্টায়। বেশিরভাগই এই ফেক আইডির তরুণটিকে নিয়ে গালমন্দ করেছে। ট্রল করেছে প্রায় সবাই। কিন্তু বেশ কয়েকজন কমেন্ট বক্সে অনেক কিছু জানতে চেয়েছিল। সে কাউকেই জবাব দেয়নি। এর মধ্যে যে কয়জন তার সঙ্গে ইনবক্স-এ যোগাযোগ করেছিল তাদেরকেই সে জবাব দিয়েছে, কেউ কেউ তার ফোন নাম্বার চেয়েছিল। কাউকে নাম্বার দেয়নি।
আকাশ বালক ঘাটে গিয়ে দেখে তার সাথে যোগাযোগ করা সবাই চলে এসেছে। আরো দুইটা নৌকা নিয়ে দশ-বারোজনের দুই দল চলে গেছে হাওরে। এরা সবাই এই সুনামগঞ্জের। বাউল উঠেছে দুইজন। হারমোনিয়াম, তবলা নিয়ে চলে গেছে, তারা গান গাওয়া শুরু করে দিয়েছে। লন্ডন থেকে মিউজিক নিয়ে পড়ে আসা একজন এসেছে। তার সঙ্গে এক তরুণীও।
ডিটিভির হেনা এসেছে, সঙ্গে তাদের ক্যামেরাম্যান ফরিদ। হেনা দাঁড়িয়ে আছে নৌকার পাশে, তার হাতে ক্যামেরার বুম আর ট্রাইপয়েড। ট্রাইপয়েডটা যথেষ্ট ভারী। কিন্তু তার অভ্যাস হয়ে গেছে। ভারী ট্রাইপয়েড হাতে এক শুকনাশাকনা তরুণীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নদীর পাড়ে ভিড় লেগে যায়। সে ক্যামেরাম্যানের দিকে তাকিয়ে বলে, ফরিদ ভাই, এখানে ধরেন, আমি ঐ গুলুইটাতে বসে একটা পিটিসি দিয়ে রাখি। পরে কাজে লাগতে পারে। আর এই নদীর পাড়ের ক্রাউডের সঙ্গে আমি কিছু কথা বলবো। আপনি ধরেন।
হেনা ক্যামেরার বুম মাইক হাতে নিয়ে শুরু করে কথা বলা-আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি সুনামগঞ্জ শহরের সুরমা নদীর পাড়ের রিভার ভিউ ঘাট এলাকায়। বিকেলের পর থেকেই বেশ কিছু মানুষের সমাগম হয়েছে এখানে। মধ্যরাত পর্যন্ত এই জনসমাগম থাকবে। কারণ, আজ সেই মহাপূর্ণিমা। গত আশি বছরে এত বড় চাঁদ কখনো আকাশে ওঠেনি। আগামী ত্রিশ বছরেও এমন চাঁদ আর উঠবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। আর এই মহাপূর্ণিমা উদ্যাপনের জন্য এই শহরে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরের সব সড়কবাতি নিভিয়ে ফেলা হবে। শহরের মানুষেরা ঘর থেকে বেরিয়ে খোলা মাঠে বা নদীর পাড়ে এসে সারারাত ধরে জ্যোত্স্না উপভোগ করবেন। আর এই আয়োজনের উদ্যোক্তা এই শহরেরই প্রশাসক, যিনি মরমি সাধক কবি হাছন রাজারই প্রপৌত্র।
হেনা মাইক নিয়ে একটু হেঁটে প্রায় আশি বছর বয়সী, লুঙ্গিপরা এক লোকের মুখের সামনে মাইক ধরে তাকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা, আজ কি হাছন রাজা এই হাওরে তার নৌকার বহর নিয়ে আসবেন বলে আপনি মনে করছেন?
লোকটি ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। কী বলবে বুঝতে পারে না। সে বলে, ইতা তো হুনাহুনী খতা আছে। খেউ খেউ দেখছইন তানরে।
আপনি নিজে দেখেছেন?
না গো মাই
হেনা লোকটিকে বাদ দিয়ে প্রায় গোল হয়ে থাকা দর্শকদের উদ্দেশে প্রশ্ন করে, কেউ কি দেখেছেন?
বউতেউ দেখছইন, ইতা বউত আগে—একজন পেছন থেকে বলে ওঠে।
ক্যামেরা তাকে ধরতে পারে না। হেনা ফরিদকে বলে, ফরিদ ভাই, কাটেন। পরে আবার ট্রাই করবো।
হেনার সঙ্গেও এই প্রথম দেখা আকাশের। মাঝে মধ্যে টেলিভিশনে দেখেছে তাকে। সম্ভবত খবর পড়ত মেয়েটি। যথেষ্ট ফর্সা মনে হতো তাকে স্ক্রিনে। কিন্তু এখন দেখে, মেয়েটি প্রায় কুচকুচে কালো। কেন যে কালো মেয়েরা ফর্সা হবার জন্য এত মরিয়া থাকে বুঝে না। কালো মেয়েদের সৌন্দর্যই তো আলাদা। কিন্তু এটা বাংলাদেশের মেয়েরা মানে না। তারা বলে—এই অঞ্চলের পুরুষেরা সবাই বর্ণবাদী। তারা নিজেরা কালো হলেও কালো মেয়ে বিয়ে করতে চায় না। না জানি পরে যদি তার ঘরে একটা কালো রঙের মেয়ে হয়!
আকাশ এগিয়ে আসে কথা বলার জন্য। সে তার নাম জেনে গেছে, সুতরাং সম্বোধনে সমস্যা নাই। প্রায় পরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলার সময় যেমন আচরণ করে, এমন একটা ভাব ধরে বলল—হেনা, আপনি কি রিপোর্টিং-এ না, প্রেজেন্টেশনে?
দুইটাই করি ভাইয়া। যখন যেটা দেয়। আমাদের অ্যাপায়েন্টমেন্ট নিউজ রিপোর্টার হিসেবে। আমাদের স্টেশনে নিউজ প্রেজেন্টারের আলাদা কোনো পোস্ট নাই। খালি গেট-আপ বদল হয়। মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে স্পট থেকে নিউজরুমে বসিয়ে দিলে আরেক রকম। আপনার স্ট্যাটাসটা পড়ে আমি খুবই বিলা হয়ে আছি। ইনচার্জ বাতিন ভাইকে বললাম এই আইটেমটা করতে চাই। বাতিন ভাই বলল—তুমি নিজে যাবা? বললাম, যাবো না কেন? ব্যস, ফরিদকে নিয়ে ভোর বেলা বেরিয়ে দশটার ফ্লাইটে উঠে পড়লাম। এগারোটায় সিলেট নেমে অফিসের গাড়ি পাওয়া গেল। কিছুক্ষণ আগে এখানে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে সিলেট। কাল সকালে আবার এসে নিয়ে যাবে। আড়াইটার ফ্লাইটে ব্যাক করবো ঢাকায়।
আপনাদের ব্যাগ, লাগেজ এসব কোথায়?
আমার এই হ্যাভারসেকে যা যা আছে, চলবে। ফরিদের কিছুই লাগে না। আমি ২/৩ দিন এক কাপড়ে থাকতে পারি, সমস্যা নাই। আজ রাত তো আমরা হাওরে আছি, তাই না? দেখা যাক। উনাকে যদি সত্যি সত্যি পেয়েই যাই তাইলে তো কথাই নাই। না পাওয়ার চান্সই বেশি। আর না পেলেও এই শহরের মানুষ এই ব্লু মুনের রাতে কী করছে, হাছন রাজা থাকলে কী করতেন, তার নাতি-পোতি-প্রপোতিরা কী করছে, এসব নিয়ে আমার স্টোরি হয়ে যাবে। আমরা দুই-তিন ঘণ্টা অনেক শ্যুট করেছি। এবার চলেন, নাওয়ে উঠি। কোন নাওটা আমাদের?
রিভার ভিউ ঘাটে একটা ইঞ্জিন নৌকা লাগানো। আকাশ বলে—এটাই আমাদের বজরা। হাছনরাজার আমলে ইঞ্জিন ছিল না, বাকি সবকিছু এমনই ছিল। আমাদের সময় ইঞ্জিন লেগে গেছে। এটার ভেতরটায় ৮ জন লম্বা হয়ে চিত্ হয়ে শুতে পারে, ১২ জন কাইত হয়ে। সমস্যা নেই, আমরা কেউই এখানে শুবো না, আমরা থাকবো ছাদের ওপর। চিন্তা নেই, ছাদের চারপাশে রেলিং দেওয়া আছে। সাঁতার না জানা কেউ নিতান্ত আত্মহত্যা করতে না চাইলে এখান থেকে পড়ে মরবে না। সাঁতার জানা কেউ কিন্তু ওভার স্মার্টনেস দেখানোর জন্য ড্রাইভ দেবার চেষ্টা করবে না খবরদার। তবে কতগুলো লাইফ জ্যাকেট আমি নিয়ে এসেছি ভিন্ন কিছু চিন্তা করে। বাইচান্স ঝড়ইবা যদি চলেই আসে, তখন এর ব্যবহার হবে, নইলে না। আর নিচতলায় একটা ছোট্ট ঘরও আছে। ইমার্জেন্সি আউটলেট ওখানেই দেওয়া যাবে। কেউ চাইলে ভেতরে গিয়ে দেখেও আসতে পারো। অবাক হবে দেখে যে, এখানে পিওর সুনামগঞ্জী মডেলের হাছনী হাই কমোড আছে। আরে, হাসছো কেন? গিয়ে দেখো— প্লাস্টিকের চেয়ারে বসার জায়গাটা গোল করে কাটা। পানির সাপ্লাই ঐ জাগয়ায় নেই। দুই লিটারি বোতল ভরা আছে ৪টা। ইন এডিশন টু দ্যাট—তোমাদের জন্য টিস্যু পেপারও আছে। সুতরাং চিন্তা নেই। ব্যাগ বোচকা নিচে রেখে, ঐ কাঠের মই দিয়ে ধীরে ধীরে ছাদের ওপর উঠে যাবা। সারারাতের জন্য এর ভাড়া চার হাজার ঠিক করেছি। আমাকে বাদ দিয়ে বাকি সবাই ভাগভাগি করে দিয়ে দিবা। আমার অবস্থা কেরোসিন। এটা ঠিক করে দিয়েছি বলে আমি মাগনা যাবো, এটা আমার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সার্ভিস চার্জ। কারো আপত্তি আছে?
আকাশের দীর্ঘ বক্তৃতা সবাই খুব মন দিয়ে শুনল এবং যথারীতি খুবই উত্ফুল্ল হয়ে উঠল। ঘাট ছেড়ে তারা নৌকায় গিয়ে দেখে—গলুইয়ের কাছে দুইটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ চিনে ফেলে। বলে, তোমরা তো রত্না আর শিফা, তা-ই না?
শ্যামলা রঙের মেয়েটা বলে, বলেন তো আমার নাম কী?
রত্না।
বুঝলেন কেমনে?
নোটবুক বের করে কী কী লিখছো, কিছুক্ষণ পর, আর ঘড়ি দেখছো। তোমাদের পোর্টালে কিছু আপ হয়েছে কি?
না, এখনো দেইনি। তবে একটা স্কুপ ছেড়ে দিয়েছি। লিড-এ আছে এটা—মহাপূর্ণিমায় হাছন রাজা, সুনামগঞ্জে তোলপাড়, রাতে বাতি জ্বলবে না শহরে।
বাহ্।
আর ও নিশ্চয়ই শিফা। তোমার রুমমেট।
রুমমেট না। ভাইয়া, ফ্লাটমেট। আমরা একই ফ্লাটে থাকি, চারজন, চার রুমে। শিফা আমার ঘনিষ্ঠতম ফ্লাটমেট। আমরা দুজনই সেকেন্ড ইয়ার, আইইউবিতে। পড়ছি বিজনেস স্টান্ডিজ, করছি সাংবাদিকতা। পার্টটাইম ভাইয়া। আমি এন্টারটেইনমেন্টে রিপোর্টিং, ও ফটোগ্রাফার। আমরা দুইজন একটা ওয়াশ রুম ব্যবহার করি, আমাদের দুজনের খাবার এক হাঁড়িতে রান্না হয়, দুজনের একটাই মানিব্যাগ। আমরা বিল করে যা যা পাই, এক মানিব্যাগে সব রাখি। এখান থেকে খরচ করি।
বাহ্, মজার তো? আর কী কী এক সাথে করো? আমরা এক সাথে একই টিভি চ্যানেল দেখি। আমাদের যে কোনো একজনের হাতে রিমোট থাকে। ও জানে আমি কী পছন্দ করি। ও যখন রিমোট টেপে—তখন আমার পছন্দের চ্যানেল দিয়ে রাখে, আমি যখন রিমোট নিই তখন ওর চ্যানেল দিয়ে দিই।
তোমাদের ঝগড়াঝাঁটি হয় না?
আমাদের দুইজনের পছন্দের রং সাদা, প্রিয় নায়ক, আমাদের কমন, ক্রাশও একজন। আমাদের দুজনের প্রিয় শিল্পী, প্রিয় গান, প্রিয় বই একই।
আর তোমাদের বয়ফ্রেন্ড?
এখনো হয়নি ভাইয়া। আমরা আশা করি আমাদের দুই জনের একই বয়ফ্রেন্ড থাকবে, তাই নারে?
এবার সবাই মিলে হো হো করে হেসে ওঠে।
হাসি থামলে শিফা বলে, বাট উই আর ভেরি আনলাকি। আমাদের কোনো ছেলেই পছন্দ হয় না। আমাদের কোনো বয়ফ্রেন্ড নাই। থাকলে আমরা দুইজন মিলেই তার সঙ্গে প্রেম করতাম। হা হা হা হা।
এর মধ্যে নৌকা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে উজানে, উত্তরের দিকে। আকাশ বালক দলনেতা হয়েই গেছে। তাকে কেউ নেতা বানায়নি। কিন্তু তার কথায় সবাই উঠছে বসছে। সে যা বলছে, মাঝি তাই শুনছে। একবার দাঁড়িয়ে গেল আকাশ। বক্তৃতা শুরু করল আকাশ। তার বক্তৃতা শুনে মনে হচ্ছে, সে যেন কোনো টেলিভিশনের লাইভ ব্রডকাস্টিং-এর বিবরণ দিচ্ছে। তফাত্ হচ্ছে, টেলিভিশনের লাইভ ব্রডকাস্টাররা সবাই দর্শকের মতো ক্যামেরা গুটিয়ে বসে আছে আকাশের দিকে। হা করে। বক্তৃতা শুনছে তার। আকাশ বলছে, বন্ধুরা মিনিট বিশেক হলো, আমরা সুনামগঞ্জের রিভারভিউ ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করেছি। আমাদের ডান দিকে হরিনা মাটি ঘাট। এটা দিয়ে সোজা উজানে গেলে আমরা পৌঁছে যেতে পারতাম একেবারে আসামের করিমগঞ্জে। সেখানে গিয়ে এই নদীকে পেতাম, কিন্তু ডাকতাম বরাক নামে। সমস্যা নাই, আমরা আসাম যাচ্ছি না, যাচ্ছি মেঘালয়ের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বিরামপুরের খালের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করবো। যদিও এখন আমাদের কাছে খাল-নদী-হাওর একই হয়ে আছে, শীতের মৌসুমে এলে তিনটাকে আলাদা পেতাম, এখন সব একই। আমরা হাওর বিলাসে নেমেছি। আধা ঘণ্টা পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাবে। আর নৌকটি নোঙর করে দেবো কোনোভাবে, তারপর এভরিথিং ফ্রি। আমরা তখন কে কী করবো সেটা তখনই ঠিক করা হবে।
হাত তোলে চারু।
আকাশের মনে হলো, সে কোনো কথা বলার জন্য পারমিশন চায়। তার দিকে তাকিয়ে আকাশ বলে, একটু অপেক্ষা করো, আমার বক্তৃতা শেষ হলে আমার নেতাগিরিও শেষ হয়ে যাবে। তারপর এই বহরে কেউ নেতা থাকবে না। যার যা মনে হয় সে তা বলতে পারবে।
চারু বলে, আমার যদি ইচ্ছা করে আলাদা কোনো জেলে নৌকায় চলে যেতে, আমি কি যেতে পারি?
তুমি কী পারবা না, তা তুমিই ঠিক করবা, আমি কে?
ঠিক হলো, সামনের কাংলার হাওরে গিয়ে নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাবে। তারা ছাদের উপর উঠে বসে থাকবে। আর কী কী করবে, এখনো ঠিক হয়নি। তবে আগে যে নৌকাটি ছেড়ে গেছে, সেখানে লোকাল দুজন বাউল শিল্পী উঠেছেন। তারা হারমোনিয়াম আর মন্দিরা নিয়েছেন। ঢোল একজন নিতে চেয়েছিল, শব্দ বেশি হবে—এই বিবেচনায় ঢোল বাদ পড়েছে। আছে বাঁশি। কাংলার হাওরের নৌকা পৌঁছার পর সবাই নেতা। সবাই যা ইচ্ছা করতে পারবে। কেউ কাউকে বাধা দেবে না।
তিন : ছাড়িলাম হাছনের নাওরে
সুনামগঞ্জের রিভার ভিউ ঘাট থেকে দুটো বড় নৌকা ছাড়াও সাহেব বাড়ির ঘাট, হরিনামাটি ঘাট আর আমবাড়ি ঘাট থেকেও আজ বেশ কয়েকটা নৌকা এসেছে। সব নৌকা যে গায়ে গায়ে লাগানো, এমনটা একেবারেই না। সবাই নিজেদের মতো করে আছে, একটু দূরে দূরে। এক নৌকা থেকে অন্য নৌকার কোনো কথাবার্তা শোনা যায় না। দেখা যায়। তবে চাঁদের আলোয় নৌকাগুলোর কালচে অবয়ব ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। নৌকায় কেউ আলো জ্বালছে না, বাতি নাই। বাতি জ্বাললে দুটো অসুবিধা হয়—প্রথম অসুবিধায় পড়ে নৌকার মাঝি। তারা অন্ধকারে ভালো দেখে, নিশানা ঠিক থাকে। আলোতে সমস্যা। আর দ্বিতীয় সমস্যা—পানির ওপর অনেক ধরনের পোকা থাকে। তারা সুইসাইড করার জন্য কুপি বাতির দিকে চলে আসে। আগুন নিয়ে খেলতে খেলতে সব মারা যায়। কিন্তু সব সময় আগুনের নাগাল পায় না। টর্চের বাল্ব বা অন্য আলোকেও আসল আগুন মনে করে সেখানে ঝাঁপাঝাঁপি করতে করতে মানুষের চোখে, মুখে, মাথায় চুলে বসে খোঁচাখুঁচি করে। এই বিড়ম্বনা থেকে বাঁচার জন্য বন্ধ রাখা হয় বাতি।
কিন্তু দূরে, বেশ কতগুলো সারি সারি বাতি দেখা যায়। বাতিগুলো বেশ বড়। সেগুলো দুইটা করে আছে। একটা নিচে, একটা ওপরে। এর রহস্য বের করতে মাঝির সাহায্য দরকার হলো। মাঝি বলেন, ওটাই মেঘালয়ের পাহাড়। সামনেই ইন্ডিয়ার আসাম। বাতিগুলো আসামের পাহাড়ের ওপর বিএসএফ-এর ঘাঁটি আছে। তা থেকে জ্বলছে ওপরের বাতি। নিচেরটা পানিতে তার রিফ্লেকশন। আরো কিছুদূর আলাপ করে বেরোলো যেটা, এটা এখান থেকে মাত্র ৪-৫ কিলোমিটার দূরে। এর কাছেই একটা বাজার আছে। এর নাম বাংলাবাজার। শুকনো মৌসুমে এ বাজারে অনেক ইন্ডিয়ান জিনিস পাওয়া যায়। এটা ছাড়াও আমাদের ডান দিকে আরো কিছু কালো কালো গাছের ছায়া দেখা যাচ্ছে। সেখানেও বাতি জ্বলল, সেটা মঙ্গল খাটা বাজার। আমরা সেখানে যাব না।
কাংলার হাওরে যতটা নীরবতা থাকার কথা ছিল, আজ তা নেই। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ যদিও একেবারে প্রায় মাথার ওপর, এটা মাঝে মাঝেই কালো মেঘের ভেতর ঢুকে যায়। মাথা কাত করে চাঁদ দেখা বড় বিড়ম্বনার কাজ। রত্না বুদ্ধি বের করল। সে শিফার হেভারসেক দিয়ে বালিশ বানিয়ে শুয়ে পড়ে। আরেক পাশে শিফা মাথা রাখে। দুই বান্ধবীর এখন এক বালিশ। তাদের শুয়ে পড়া দেখে দলের আরো তিনজনও চিত্ হয়ে শুয়ে পড়ে। দলের লোকেরা কেউ তেমন কথা বলে না। নীরবে চাঁদ দেখাই যেন তাদের এখনকার কাজ। এর মধ্যে হঠাত্ রত্না বলে ওঠে, জানিস, আমার সঙ্গে একবার হাছন রাজার দেখা হয়েছিল?
পাগলামি ছাড়। শিফা পাত্তা দেয় না তার কথায়।
বিশ্বাস হচ্ছে না?
না।
তোদের ধর্মে তো পুনর্জন্ম বিশ্বাস করিস না। তোরা বুঝবি কেমনে?
তোর কি আগে জন্ম হয়েছিল একবার?
আমার মনে হয় হয়েছিল। এবং আমার বাস ছিল সিলেটের বিশ্বনাথের রামপাশায়। ওখানে আরেকটা নদী আছে, এই সুরমার চেয়ে একটু ছোট। ওটা কাপনা নদী।
এই নদীর নাম শুনেছি। হাছন রাজার গানে আছে এই নদীর কথা।
যদি আজ দেখাই হয়ে যায়, জিজ্ঞেস করবো, চেনে কি না। না চেনার চান্স বেশি। শালাতো লুইচ্চা দি গ্রেট ছিল, কখন কারে ধরে টানছে তার কি আর এখন মনে আছে?
মিস রত্না চক্রবর্তী
বলুন মিস শেফালী হাসান
মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ। হাছনকে নিয়ে বাজে কথা বলার আগে তাকে জেনে নাও ভালো করে।
ঠিক আছে। জানবোইতো। কিন্তু কথা হচ্ছে, সত্যি সত্যি যদি তারে আজ পেয়েই যাই আমি কিন্তু ছাড়বো না।
পাশের নৌকায় গান বাজনা হচ্ছে বেশি। এই নৌকার লোকেরা চুপ। তারা সবাই চিত্ হয়ে আছে আকাশের দিকে চেয়ে। পাশের নৌকা এখন গান ধরেছে—ছাড়িলাম হাছনের নাওরে, আরে বৈঠা না ফালাইতে নারে শূন্যে করে উড়ারে, ছাড়িলাম হাছনের নাওরে।
আকাশ বালক খুব চুপচাপ। তাকে দেখে মনে হচ্ছে—হঠাত্ করে এমন একটা স্ট্যাটাস দিয়ে এই ছেলে মেয়েগুলোকে নিয়ে এসে বিপদেই পড়ল কি না।
সে চারুকে জিগ্যেস করে—হাও ইজ লাইফ?
চারু সিগারেটের শেষ টান দিয়ে নৌকার ছাদ থেকে হাওরের পানিতে সিগারেটের খোসা ফেলতে ফেলতে বলল—লাইফ ইজ অলওয়েজ বিউটিফুল। আজ রাজা এলে ভালো, না এলে আরো ভালো।
মানে?
গল্পটা জানো না?
কী গল্প?
এক রাজার অনেকগুলো রানী। এক রানীর আলাদা বয়ফ্রেন্ড ছিল। রাজা এই রানীর ঘরে মাসে এক দুই রাত আসতেন। সিডিউল জেনে সেই বয়ফ্রেন্ড মাঝে মাঝেই দেয়াল টপকে রাতের বেলা রানীর ঘরে এসে পড়ত। একদিন সেই বয়ফ্রেন্ড এসে জানতে পারে, আজ তার শিডিউল। কিন্তু রাজা প্রায়ই শিডিউল রক্ষা করেন না। তিনি আসেন না। এটা জানার পর বয়ফ্রেন্ড রানীকে জিগ্যেস করেছিল—রাজা যদি আসেন, কী হবে? রানির তখন এই জবাব ছিল—রাজা এলে ভালো, না এলে আরো ভালো।
হঠাত্ করে হাসির রোল পড়ে গেল পুরো নৌকা জুড়ে। এদের হাসির শব্দে একটু দূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নৌকার ছাদের ওপর যে পরিমাণ গান বাজনা ছিল, তা হঠাত্ করে বন্ধ হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণের জন্য বেশ নীরবতা নেমে আসে এই হাওরে। নীরবতার কারণ অবশ্য ভিন্ন। তারা লক্ষ করে দূরে একটা পাল তোলা নাও এদিকে আসছে। কিন্তু খানিক পরেই সবাই বুঝতে পারে, নৌকা আসলে একটা নয়, অনেকগুলো। সামনের নৌকাটাই শুধু পাল তোলা। তার পেছনে অনেকগুলো ভাওয়ালি নাও। তাদের সাথে দুই পাশে দুইটা করে চারটা ডিঙ্গি নৌকাও। ডিঙ্গি নৌকা কেন সঙ্গে থাকবে বুঝতে পারছে না আকাশ।
আকাশ বালক মাঝির কাছে যায়। আস্তে করে বলে— চাচা, দেখেনতো নাওটার কী অবস্থা?
মাঝি তাকায় নৌকার দিকে। ভট ভট শব্দ শোনা যাচ্ছে। মাঝি বলে, হাছনের নাওয়ে ইঞ্জিন নাই বাজান, তবে পাল থাকে।
এখানে তো পালও আছে, ইঞ্জিনও আছে।
চুপ থাকেন আপনারা। একদম চুপ। মানুষের নিশানা দেখলে তার নাও মিলাই যায়, কেউ দেখে না। তিনি চলে যান।
চুপ মানে একেবারেই চুপ। বাতাসের শোঁ শোঁ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই এই দুই নৌকায়। তারা স্পষ্ট শুনতে পায়, ঐ নৌকার মধ্যে রীতিমতো নাচ-গান হচ্ছে। বজরার ছাদের ওপর একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ। তার চারপাশে কয়েকজন মহিলা মাত্র। তারা যে গানটি গাইছে, সেটাও বেশ পরিচিত—নিশা লাগিরো রে, বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলোরে । এই গানটি তাদেরও মুখস্ত। পাশের নৌকা থেকে এই গান গাওয়া হয়েছে অনেকবার। সেই নৌকায় একটা ইয়াং ছেলে আছে। তুহিন। লন্ডন থেকে ফোক মিউজিকের ওপর তার পড়াশোনা। বাংলাদেশের লালন, রাধারমন, হাছন রাজা, আবদুল করিম এদের অনেক গান সে ফিউশনও করেছে। কিছু ইংরেজি বাংলা মিলিয়েও গেয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে সে এই গান গেয়েও ছিল। এবার এই গান আসছে সামনের নৌকা থেকে।
দূর থেকে আসা গান-বাজনার নৌকার বহর খুব দ্রুতই তাদের কাছাকাছি এসে গেল এবং কিছুক্ষণ পরই তারা সবাই নিশ্চিত হয়ে গেল এটা হাছন রাজার নাও নয়। এটা কোনো ফিল্ম ইউনিটের বহর। সেই বহরের নৌকাটি আসলে তাদেরকে লক্ষ্য করেই এদিকে আসছে।
শ্যুটিং ইউনিটের চারটি বড় নৌকা। এক নৌকায় বোধহয় সবাই গুরুত্বপূর্ণ আর্টিস্ট। নায়িকাসহ পরিচালক হয়তো এখানেই থাকবে এবং এই নৌকাটিতে বাহারি রঙের কাপড় দিয়ে বানানো পাল। এমন কাপড়ের পাল সচরাচর চোখে পড়ে না। নতুন কাপড় দিয়ে বানানো হয়েছে, বোঝা যাচ্ছে। আরেক নৌকায় লাইট, জেনারেটর, জিবআর্ম এসব। সঙ্গে তাদের ক্রু। আরেকটি নৌকা খানিক দূরে। ঐ নৌকায় খাবার দাবারের সরঞ্জাম। রান্না হচ্ছে বজরার পেছনে।
চতুর্থ নৌকাটি সবচেয়ে শান্ত। সম্ভবত এখানে কিছু সিনিয়র আর্টিস্ট থাকবেন। মা-খালা চরিত্রের নারী বা দাদা চরিত্রের পুরুষেরা থাকবেন সেখানে। খুব কাছে আসার পর শ্যুটিং ইউনিটের প্রথম নৌকাটা গান-বাজনার নৌকার পাশে এসে দাঁড়ায়। বুঝতে পারে একটা ফিল্মি ইউনিট এটা। সারাদিন হাওরে শ্যুট করে এখন ফিরছে।
কাছে এসে ওই বহরের নৌকাগুলো থেমে যায়। এদের একজন বলেন, হাছন রাজার ওপর একটা সিনেমা হচ্ছে। সিলেটের এক ভদ্রলোক একটা নাটক লিখেছিল— হাছনজানের রাজা। সেটা নিয়েই ঐ নাটকের দলের পরিচালক একটা শ্যুটিং করছেন। নাটকের ফাঁকে ফাঁকে দর্শকেরা কিছু ভিজুয়াল দেখবেন। এটা পরিচালকের নতুন আইডিয়া। নাটকের শুরুতে এক জ্যোত্স্নারাতে হাছন রাজা নৌকার বহর নিয়ে হাওর থেকে মঞ্চে নেমে আসবে। হাওরের অংশটুকু তারা শ্যুট করেছে শেষ বিকেলে, সূর্য ডুবে যাবার পর। ডে ফর নাইট মোডে শ্যুট করা। এই শ্যুটিং-এর জন্য খাটাখাটনির শেষ নাই পরিচালকের। তিনি মাসের পর মাস সুনামগঞ্জ আর বিশ্বনাথ ঘুরে ঘুরে আর নানা লোকের সাথে কথা বলে চরিত্র সাজিয়েছেন। প্রত্যেক চরিত্রকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে তাদের চরিত্র বুঝিয়েছেন। বারবার বলেছেন, চরিত্রের কোন অংশে তুমি এক্ট করছ এটা নির্ভর করবে চরিত্রের পুরা জীবনটা জানার পর। সবার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন নানা রকমের বই। বলেন, এগুলো পড়ে নিজের চরিত্র বুঝে নাও। পুরা নাটকের ইউনিট এখানে এসেছে, বাইশজন পারফর্মার। আর ষোলজন ক্রু।
মাঝখানের লোকটি সম্ভবত হাছন রাজা। কোটের চারদিকে জরির কাজ। এই জোত্স্নার রূপোলি আলোতে চিক চিক করছে তার কাপড়। তাকে ঘিরে ধরে সবাই।
ভাই, আপনার নাম?
রামিজ রাজা।
কন কী? এটা কি অরিজিনাল, না ফেইক নাম আপনার?
ধরেন অরিজিনালই। শিল্পকলায় আইসেন, সামনের শুক্রবার ঈর্ষা আছে। দেখবেন।
আপনি হাছন রাজা?
হ
এজন্য নাম নিসেন রামিজ রাজা?
ভাই, আসল নাম আমার রমিজ রাজা। এই নামে এক কুলাঙ্গার আছে। আাামার নামের বানান ইংরেজিতে লিখি আর এ দিয়ে। নাটকের দল নিয়ে যখন আমরা বিদেশ যাই, সবাই ডাকে রামিজ বলে। আমি ভাবলাম—এই সুযোগ, পাকিস্তানি খেলোয়াড়ের নামে নাম বদলানো উচিত। তাই বানিয়ে দিলাম রামিজ। আর রাজা আগেই ছিল।
এটা রাজা-বাদশাহ টাইপের কিছু না তো?
আরে নাহ্। হাছনের যেমন, রেজা ছিল, নিজে করসে রাজা, এই রকম কিছু। রমিজ রাজা, রেজোয়ান রাজা, এরকম। আমার বড় ভাইর নামের শেষে বাদশাহ, আমার নামের শেষে রাজা।
আপনাদের ডিরেকটার কই?
এই নাটকের পরিচালক যদিও অন্য একজন, তবে শ্যুটিং-এর এই কোরিওগ্রাফিটা পরিচালনা করেছেন অনন্ত নুনা। তিনি এই ফিল্মে হাছন রাজার খাস পিয়ারী দিলারামের চরিত্রেও আছেন।
তিনি কোথায়?
পেছনে। খুব টায়ার্ড। শুয়ে আছেন।
চারু সেই নৌকার পেছন দিকে চলে যায়। শুয়ে থাকা মহিলাকে সে জাগায় না। দেখে তার পাশে প্রায় পঁচিশ-তিরিশ বছর বয়সী এক তরুণী গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। তাকে দেখে একবার মনে হয় তরুণী, আরেকবার মনে হয় মধ্য বয়স্কা মহিলা। চাঁদের আলোয় মানুষের চেহারা ভালো করে বোঝা যায় না। তার পরনে একটা আলখেল্লা। বোরখাপরা মহিলারা যেমন থাকেন, অনেকটা সে রকমই। এই মহিলা একটা ঘাঘরা পরেছেন কোমর পর্যন্ত। সম্ভবত নীল রঙের এই ঘাঘরা, কিন্তু চাঁদের আলোয় এর রংটা ঠিকমতো বোঝা গেল না। সেটা কালো রঙের মনে হচ্ছে। মাথায় কাওবয় টুপি। টুপির ফাঁক দিয়ে তার লম্বা চুল দেখা না গেলে বোঝা যেত না, তিনি পুরুষ না মহিলা।
চারু তার কাছে গিয়ে বসে। পরিচিত হবার জন্য প্রথমেই বলে—আমার নাম চারু।
মহিলা কথা বলেন না।
চারু বলে, আমি একটু বসি এখানে?
মহিলা তার জায়গা থেকে খানিকটা সরে এসে বসে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন, এখানে বসতে পারো।
বসে পড়ে চারু। এবার সে নিজে থেকেই প্রশ্ন করে। কী নাম আপনার?
আমি ছহিফা বানু। হাছনের বড় বোন। অবশ্য আপন না, সত্ বোন।
আপনার আসল নাম কী?
ইউনিটে আমাদেরকে কেউ আসল নাম ধরে ডাকে না। যার যে চরিত্র, সেই চরিত্রের নামে ডাকা হয়। আমাকে তুমি ছহিফা বলেও ডাকতে পারো। আসল ছহিফার বয়স কুড়ি থেকে ষাট। নকল ছহিফার বয়স তেত্রিশ। আমি এখনো মেকআপ তুলি নাই বলে তুমি আমারে চিনতে পারছো না।
আমার আসল নাম ছিল সিতারা পারভিন। ডাক নাম চারু। আমি কবিতা লেখা শুরু করে নাম দিলাম চারুলতা চন্দ্রিকা। এই নামেই আমার ফেসবুক আইডি। ব্লগে আমি এই নামেই লিখি।
আমার নাম লিপি আখতার। ঢাকায় একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আমি পড়াই। বাচ্চাদের স্কুল। আমি ওদের নাচ শেখাই। নিজেও নাচি। কিন্তু এই ছবিতে আমার নাচের দৃশ্য নাই। আমি খালি ঝগড়া করি। নেগেটিভ চরিত্র।
কার সঙ্গে ঝগড়া করেন?
ওর সঙ্গে বলে—রামিজ রাজার দিকে আঙুল দেখায়।
কেন?
আমি ওর বড় বোন। কিন্তু সে আমাকে সারাজীবন ঠকিয়েছে।
বলেন কী!
বসো এখানে। তার হিস্টোরি বলি। আমি যা বলবো, সব সত্য মনে করবা। এর মাঝে ঝামেলার কিছু নাই। নানা লোকে নানা কথা লিখেছে। অনেক মনগড়া কথা। আসল খবর সবাই জানে না। তুমি জানতে চাইছো, তাই তোমাকেই বলছি—আমার বাবা বিশ্বনাথের রামপাশার জমিদার দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী পাঁচ বিয়া করেছিলেন। সে সময় এটাই রীতি ছিল। ধন সম্পদ বেশি থাকলে বউও বেশি থাকত। বাবার প্রথম বউ-এর সন্তান ছিল না। দ্বিতীয় বউ-র ঘরে আমাদের বড় ভাই উবেদুর-এর জন্ম। বাবার সাথে জমিদারি তিনিই দেখতেন রামপাশায়। তিন নম্বর বিয়া করেন আমার মা নুর বিবিকে। এ বিয়ের প্রধান কারণ ছিল, আমার মায়ের সম্পদ। মা-র আগে আরেকটা বিয়া হয়েছিল। তাঁর স্বামী মারা গেলে বাবা দেখেন অঢেল সম্পদ নিয়ে এই মহিলা একা আছেন। সুতরাং তাকে বিয়ে করা দরকার। এই মায়ের ঘরে আমাদের দুই ভাই-বোনের জন্ম। আমি বড়, আমার দুবছর পর আসে মুজাফ্ফর। এই মাকে বিয়ে করে বাবা অনেকটা ঘরজামাই ছিলেন। কারণ, মা তাঁর বাড়ি ছেড়ে সতীনের সাথে ঘর করতে রামপাশায় যেতে রাজি হননি। তাই সিলেটের কুয়ারপাড়েই থাকতেন। আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা আর জীবনযাপনও এখানে। কিন্তু মা আমার বেশি দিন বাঁচেন না। তিনি অঢেল সমপত্তি রেখে মারা যান। মা-র সম্পত্তি দুই তরফের ছিল। আমার নানাও ছিলেন বড়লোক। তাঁর কোনো ছেলেসন্তান ছিল না। আমার মা আর খালা এই দুইজন ছিলেন তাঁর উত্তরাধিকারী। নানার মৃত্যুর পর অর্ধেক সমপত্তি মা পান, বাকি অর্ধেক ছিল আমার খালা জরিনা বেগমের। কিন্তু এই খালার কপাল ভালো ছিল না। যুবতী বয়সে তাঁর স্বামী মারা যান। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। আমার মা মারা যাওয়ার পর বাবা এই সদ্য বিধবা খালাকে ঘরে তুলে আনেন তাঁর চার নম্বর স্ত্রী হিসাবে
বাহ। দিদি, আপনার পিতাজির তো রাজ কপাল ছিল। একেকজন সমপদশালী মারা যান আর তাঁর বিধবারা আপনার বাবার ঘরে আসেন। রাজকন্যাসহ অর্ধেক না, পুরা রাজত্ব নিয়ে। বাহ।
ঠিক বলেছো চারু। কথা মিথ্যা না। আর আমার রাজকপালী পিতাজীর কাহিনি এখনো শুরু হয়নি। আরো আছে।
কিন্তু সিক্রেট কী ছিল দিদি? ওয়াজ হি টু হ্যান্ডসাম?
ইয়েস, হি ওয়াজ ইন্ডিড। শোন, আমরা সিলেট শহর আর রামপাশাতেই বড় হই। আমার মায়ের অভাব পুরণ করেন আমার খালা। আমরা দুই ভাই-বোন এক সাথেই হেসে খেলে বড় হই। আমার খালার ঘরে কোনো সন্তান নেই। সে কারণে আমরা আরো বেশি আদর-যত্ন নিয়ে বড় হই। এর মধ্যে সবচেয় মজার ঘটনাটি ঘটে আমার শৈশবে। আমার বয়স যখন নয় কি দশ, তখন আমার এক সত্ ভাই সুনামগঞ্জ থেকে আমাদের সিলেটের বাসায় আসে। তাঁর নাম হাছন। সে আমার তিন বছরের ছোট।
মানে? আপনার বাবা আরেক বিয়ে করেন? পঞ্চম বিয়ে?
হু। সেটাই আসল কাহিনি। সেখানেও বাবা ঘর জামাই ছিলেন। সেখানেও রাজকন্যার সাথে পুরা রাজত্ব।
ইন্টারেস্টিং। এই কাহিনি কার কাছ থেকে পাব?
ছহিফা পেছনের একটা ভাওয়ালি নৌকার দিকে হাত ইশারা করে। বলে ওখানে আমির বক্স আর আলী রাজা বসে আছেন। এরা এই নাটকের সাইড রোলে আছে। খুব বেশি ডায়লগ নাই তাদের। ইউনিটেও পাত্তা নাই। আমির বক্স মারা না গেলে তোমরা আলী রাজা পাইতা না । আর আলী রাজা না মরলে হাছন রাজাও পাইতা।
দিদি, বসেন আপনি একটু। আমি ওদিকটা হয়ে আসি।
চার: রাজার রাজা আমির বক্স
আকাশ বালকের দল যে নৌকাটির ছাদ দখল করে আছে, তাতে অনেক হৈ চৈ। সবাই রামিজ রাজাকে নিয়ে মশগুল। চারু দেখল এর পেছনে আরেকটি ভাওয়ালী নৌকা। সে নৌকার সাজসজ্জা একেবারেই সাধারণ। সেখানে ছাদের ওপর কেউ বসে নেই। কিন্তু সামনের গলুইয়ের কাছে যে পাটাতন সেখানে চাদর গায়ে দুজন বসে আছে। কিন্তু তারা কেউ কারো সঙ্গে কোনো কথা বলছে না। দেখে মনে হয় নিতান্ত অনিচ্ছায় তারা এই শ্যুটিং দলে এসেছে। কোনোমতে কামটা শেষ হলেই বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নেবে।
চারু কাছে যায়। জিগ্যেস করে, চাচা, আপনি কে হন?
চাচা কথা বলেন না।
পেছনের গলুই থেকে মাঝি বলে—তাইন মাতইননা খাউরো লগে। সারাদিন মন খারাপ করি থাখইন।
কারণ?
ই ফিলিমা তার কোনো ডায়লাগউ নাই। খালি এখবার তার চেরা দেখাইন, বিবির লগে। ওউ শেষ।
চারু জিগ্যেস করে, নাম কী উনার।
মাঝি বলে, আসল নাম যে কিতা গো মাই, জানি না। তয়, ই ফিলিমো তাইন আমির বখস ছদরি।
আমির বক্স দি গ্রেট জামিন্দার! বাহ আপনার কথা অনেক শুনেছি। তবে বেশি কোনো তথ্য পাইনি। আমি হাছন রাজার পরিবারের লোকের লেখা দুটো বই সুনামগঞ্জ আসার পথে বাসে বসে বসে কিছুটা পড়েছি। অনেক জায়গায় আপনার নামটিই আছে চাচা, তেমন ডিটেইল্স কিছু নাই। যতটুকু পড়েছি, তাতে মনে হয়েছে যে, লক্ষণশ্রীর জমিদারির সবই আপনার ছিল। এখন থাকেন কোথায়?
গাঙের ঐপারে। ঐপারে আমাদের পরিবারের কবরস্থান। আমার বাপ-দাদাও ওখানে আছেন।
আপনারাও কি হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছিলেন?
হিন্দু মুসলমান মিলে আমাদের রক্ত।
কেমনে?
আমার দাদার দিক থেকে আমরা হিন্দু। গৌরারঙ্গ চৌধুরী ছিলেন আমাদের বংশের প্রথম জমিদার। আমার নানা ছিলেন খাসিয়া রাজার এক সময়কার সীমন্ত রক্ষক। তিনি নবীর কোরাইশ বংশের আওলাদ, নাম ছিল ওয়েজ উদ-দীন চৌধুরী। হাছনের বাপ আলী রাজার দাদা বীরেন্দ্র সিংহ যখন মুসলমান হয়ে বাবুখান নাম ধারণ করলেন, তখন আমার এই নানার বোনের সাথে তার বিয়ে হয়। লক্ষণশ্রীর তেঘরিয়া থেকে আমার নানার বোন নও-মুসলিম বাবু খানের সংসার করতে চলে যান রামপাশা। আর তখনই রামপাশায় হিন্দু-মুসলিম দুই রক্ত মিলিত হয়ে বাবু খানের বংশ বিস্তার লাভ করে। এই রক্ত চালাচালি আরো বাড়তে থাকে। আমার সেই নানী তার বড় ছেলে আনোয়ার খানের জন্য নিয়ে আসেন নিজের ভাই ওয়েজ উদ-দীনের বড় মেয়েকে। তাদের দুই ছেলে হয়। একজন আলীরজা, আকেজন আলমরজা। এই রজা থেকে পরে রেজা হয় আর পরে তাদের নামের সঙ্গেও রাজা লাগিয়ে দেওয়া হয়। যাহা রাজা, তার আদি নাম ছিল রজা বা রেজা। সেই হিসাবেই রামপাশার দুই জমিদার আলী রেজা আর আলম রেজা ছিল আমার আপন খালাতো ভাই। আমার মা ছিলেন আলী রেজার বড় খালা।
বাহ। খুব ইন্টারেস্টিং। আমার কিন্তু এতটা জানা ছিল না। হাছন রাজার বাবার সাথে আপনার আগেই পরিচয় ছিল।
বললাম তো, আমার আপান খালাতো ভাই। হিন্দু-মুসলিম রক্তে মিশানো সমপর্ক। এখন তোমরা হাছন রাজার যে জমিদারির কাহিনি শুনো সেই রামপাশা-তেঘরিয়ায় দুই পৃথক জমিদারি তখন দুই জমিদারের ছিল। এবং তার সূচনা করেছিলেন আমারই নানাজানের বাবা। হাছন রাজার দাদার বাবা বাবু খান বিয়ে করে তেঘরিয়া থেকেই আমার নানার বাবার কাছ থেকে সম্পদ উপহার পেয়ে রামপাশায় জমিদারি শুরু করেছিলেন। অথচ আল্লাহর কী খেলা, গাঙের ঢেউ এর মতো, একবার সেটা বিশ্বনাথ, আরেকবার সেটা সুনামগঞ্জের দিকে এসে আছড়ে পড়ে। খোদা তায়ালা কারে কখন কী দিবেন বোঝা যায় না। তিনি এক দিকে নিয়ে যান, অপর দিকে ভরিয়ে দেন।
পাশে বসে ছিলেন আরেক ভদ্রলোক। এবার তিনি আস্তে করে কথা বলে ওঠেন। বলেন—ঘটনা সত্য।
চারু তাকায় তাঁর দিকে।
তিনি বলেন, আমিই সেই আলী রাজা।
এবার আরেকটু চমকায় চারু। বলে, বাহ্, তাহলে আপনার কাছ থেকে শুনি।
আলী রাজা পাটাতনের ওপর পা মেলে বসেন। পকেট থেকে সিগারেট বের করেন একটা। কিন্তু ম্যাচ খুঁজে পান না। চারু বলে, আমার কাছে আছে।
এই বলে সে ব্যাগ থেকে তাঁর নিজের সিগারেট প্যাকেট আর লাইটার বের করে।
আমার বড় ভাই আলম রেজা বাবার জমিদারি দেখতেন। তিনি নিজেও বিশাল জমিদারী করেছিলেন। প্রায় ৮ লাখ বিঘার জমির দখলদার ছিলেন তিনি। কিন্তু তেত্রিশ বছর বয়সে কোনো উত্তরাধিকার না রেখে তিনি যখন মারা যান, তখন আমার বাবার ভাগে চলে যায় সকল জমি। আমি বাপের তখন একমাত্র ছেলে। আমার বয়স আঠারো ঊনিশ। আমি বাবার জমিদারি দেখার কাজ করি। এর মধ্যে আমার বড় চাচা কিশোয়ার খান মারা গেলে তার সম্পত্তি পেয়ে যান আমার চাচাত ভাই কামদার খান। কিন্তু তিনিও চল্লিশ বছর বয়সে নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তার সম্পত্তি বাবার কাছে চলে আসে। বড় ভাই আলম রেজার মৃত্যুর ৬ বছর পর আমার বাবা আনোয়ার খান ইন্তেকাল করলে বাবা, চাচা, চাচাতো ভাই, নিজের ভাই সবার জমি আমার ভাগে এসে পড়ে।
রাজ পরিবারে মৃত্যুটা তাহলে জীবিতদের জন্য আশীর্বাদ, তাই না চাচা?
জগত্টা এমনইরে মা। যে যায়, সে যায়ই। আর যে বাঁচে সে নাচে। আমি বেঁচে রইলাম প্রায় ছিয়াত্তর বছর। বেঁচে থেকে জগতের এইসব নাচানাচি দেখে গেলাম। আমার নানা ওয়েজ-উদ-দীনের জমিদারি খুব বেশি ছিল না। ছিল আরেক লোকের। তার নাম মুরাগ বেগ। তিনি আমার নানার জায়গার চাকরি পেয়ে নিজে তালুক কিনেন। কিন্তু পরে তিনি মুর্শিদাবাদ চলে গেলে আমার মামা গোলাম আলীকে বিষয় সম্পত্তি বুঝিয়ে দিয়ে যান। তিনি একেবারে দিয়ে গিয়েছিলেন, না বিক্রি করে গিয়েছিলেন, সেটা আমরা জানি না। কিন্তু মুরাদ বেগ মুর্শিদাবাদে ভালো সুবিধা পেয়ে সেখানেই থেকে গেলে এই তালুকটি আমার মামার দখলে চলে আসে। এবারও আমাদের কপাল খুলে যায়। মামা মারা গেলে তার একমাত্র বোন, আমার মা সরবজানের কাছে চলে আসে। দেখাশোনা করেন আমাদের বাবা লায়েক চৌধুরী। এটা দেখি আমি আর আমার দুই ভাই। একে একে মামা, বাবা, মা দুই ভাই মারা গেলে সম্পত্তি চলে আসে একা আমার কাছে। আর আমি চলে যাবার পর যায় হুরমতের হাত দিয়ে ওর কাছে।
কার কাছে?
আলী রাজার দিকে আঙুল দেখান আমির বখস্।
আচ্ছা চাচারা, একটা কথা বলেনতো দেখি, এইসব জমিজমার হিসাব, যা আমার একদমই মাথায় আসে না— এসবকে আপনারা সবাই আপনাদের আপনাদের বলে যে হাপিত্যেস করছেন—
হাপিত্যেস কোথায় করলাম? আলী রাজা বলেন।
করছেন তো। বখস্ চাচা বললেন না—যে সবই তার ছিল, এখন তার নাম নাই।
আমির বখস্ বলেন—না, মনের দুঃখে বলিরে মা। আসলে জগতে থাকার সময় এই মাটি মনে হতো আমার সম্পদ। এই জগত্ ছেড়ে আসার পর মনে হয়েছে—মাটি থেকে আসার পর মাটিতে মেশার আগ পর্যন্ত কেউ কেউ কিছু মাটির পাহারা দেবার সুযোগ পায়। এই সুযোগ পেয়ে তারা তাকে তার চিরস্থায়ী সম্পদ ভেবে সবচেয়ে বড় ভুলটা করে। গতকাল যে এই মাটির পাহারা দিয়েছে, আজ দিচ্ছে অন্যজন, আগামীকাল তার হাত বদল হলে যাবে আরেকজনের কাছে। মাটির জায়গায় মাটিটা থেকে যায়, শুধু পাহারাদারের শিফট বদল হয়, এই যা এটা জগতের মানুষ কেউ বুঝে না। এ জগতে আসার পর সবাই টের পায়। তারপর এই নিয়ে হাসাহাসি করি, এই যা। তুমি কি কখনো তোমার ছোটবেলার পুতুল হারানোর কথা মনে করোনি?
করেছি তো।
এজন্য মন খারাপ করোনি?
তখন করতাম।
এখন?
এখন এটা ভেবে হাসি পায়। কিন্তু চাচা, আপনাদেরকে আপনাদের সৃষ্টিকর্তা আচানক এক বড় কপাল দিয়ে পাঠিয়েছিলেন এ দুনিয়ায়। আপনারা সেখানে ছাই মনে করে হাত দিয়েছেন, তুলে দেখেন সোনা হয়ে গেছে। আপনাদের নিজের কিছু করতে হয়নি। সবই আপনা আপনি এসে গেছে। তাই না, চাচা?
কপাল কি একলা আমারই ছিল? আমিরের ছিল না?
আমির বখস্ ঘাপটি মেরে থাকেন। কথা বলেন না। খালাতো ভাইয়ের টিপ্পনিতে কাজ হলো। আস্তে আস্তে এবার কথা বেরোচ্ছে তার মুখ থেকে। বলেন—হ্যাঁ, এরকমই আরো কয়েকটা মৃত্যু আমাকেও বড় জমিদার বানিয়ে দিয়েছিল।
চারু বলে, বুঝেছি। এই কারণেই রাজপরিবারের কাহিনি মানেই পরিবারের মধ্যে কলহ। আর এই কলহ মানে ঝগড়া করে কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া না। একেবারেই ডাইরেক্ট হিট, সেন্ড টু হ্যাভেন। কল্লা কেটে দিয়ে ছোট ভাই বড় ভাইয়ের সম্পদ নিয়ে ফুর্তি মস্করা করে জীবন কাটাবে। তবে আপনাদের দুইজনেরই কপাল ভালো ছিল। খুনাখুনিতে যেতে হয়নি আপনাদের। এমনি এমনি এসে গেছে। তাই না বখস্ চাচা?
হ্যাঁ, নানার আর দাদার কাছ থেকে পাওয়া দুই জমিদারি এক সময় আমার মা হয়ে আমার কাছে চলে আসে পুরোই। আমার আরো দুই ভাই ছিল, পীর বক্স আর খোদা বক্স। তারা দুই জনই মারা গেলে একা আমিই বিষয়-সম্পত্তি পেয়ে যাই। আমার মনে হয়েছে যে মানুষের কাছে সম্পদ দেওয়া নেওয়া নিয়ে আমাদের সৃষ্টিকর্তা আমাদের নিয়ে লাই খেলেন। লাই খেলা কী জিনিস জানো?
না।
পানির মধ্যে ডুবে ডুবে ছুঁইয়ে দেখা। ডুবে যাকে ছোঁয়া হবে সে লাই হবে। সে যতক্ষণ না আরেকজনকে ছুঁবে ততক্ষণ সে সাঁতরাবে বা ডুবে ডুবে কাউকে ধরতে যাবে। কাকে কখন ধরবে কেউ বুঝতে পারে না। যাকে লাই ছুঁতে পারে না, সে পানির ওপর ভেসে বেড়ায়। তার অনেক ফুর্তি। যাকে ছোঁয়া হয়, সে পড়ে বিপদে। এই ডুবু ডুবু খেলায় কেউ জিতে না কেউ হারেও না। পালাক্রমে একবার হয়রানি পেতে হয়। যে যত কম হয়রানি পায় সে তত ভাগ্যবান। আমি ভাগ্যবানও যেমন ছিলাম ভাগ্যহারাও তেমনি হয়েছি। হুরমতের কাছে সব জমা রেখে আমিই বিদায় নিলাম।
হুরমতের সাথে বিয়েটা কেমনে হলো আপনার?
আমার যখন একুশ-বাইশ বছর বয়স, তখন আমার জন্য মেয়ে দেখা হলো। শোনা গেল নেত্রকোনার খালিয়াজুড়িতে এক অনিন্দ্য সুন্দরী মেয়ে আছে, তাজা গোলাপের মতো তার চেহারা, ১৬-১৭ বছর বয়স। আমার সাথে মহা উত্সব করে তার বিয়ে হয়ে যায়। ১৮ বছরের সংসার ছিল আমাদের। তিন পুত্র এক কন্যা। আমার বছর চল্লিশ যখন বয়স, একে একে আমার ভাগাড় খালি হতে থাকে। আর আমি চেয়ে চেয়ে আমার শূন্যতাটুকু কেবল দেখি।
এবার নৌকার পাটাতনে নেমে আসে মাঝরাতের হাওরি শূন্যতা। শুধু শো শো শব্দ করা বাতাসের ধ্বনি ছাড়া আর কিছু নাই। অনেকক্ষণ পরে পাশের ভদ্রলোক কথা বলেন।
আমির বকস্ যা কইছে, সবাই হাছা। আমার চেয়ে ভালো কেউ তারে চেনে না। ওর কপাল খারাপ। অসময়ে মারা না গেলে এই সুনামগঞ্জের জমিদারি আমার হতো না। হাছনও হতো না। সবাই হতো, শুধু হাছনের জমিদারিটা পেতো না। আসল কথা শুনতে চাইলে নিশাতের কাছে যাও।
নিশাত কে? কোথায় উনি?
সে এসব হৈচৈ এর মধ্যে নেই। ছইয়ের ভেতর চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। হুরমত জাহান বানুর পার্ট করছে নিশাত। যদি তার মন ভালো থাকে, সব হিস্টোরি তার কাছ থেকে পাইবা।
পাঁচ :রাজমাতা হুরমত
আমাদের পূর্বপুরুষও হিন্দু, ক্ষত্রীয়বংশের জমিদার ছিলেন। তারা এখানে এসেছিলেন ভারতের রাজস্থান থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে। তাদের পঞ্চম উত্তর পুরুষের নাম লেম্বুধর রায় সিং। লেম্বুধর সিং-এর পূর্বপুরুষেরা ঈশা খাঁর পক্ষের লোক হয়ে বারো ভূঁইয়াদের সাথে মিশে মুঘল সম্রাট খান জাহানকে প্রতিহত করার কারণে তারা ঈশা খাঁর কাছ থেকে দেওয়ানি পান। সেখান থেকেই শুরু। আর সেই লেম্বুধর রায় সিংহ মুসলমান হয়ে নাম নেন বক্তার খাঁ। তার অপর ভাই অদ্বিনাথ হিন্দুই থেকে যান। তার উত্তর পুরুষেরা এখনো খালিয়াজুরি আছেন, হিন্দু হিসাবেই। এই বক্তার খাঁ ছিলেন আমার দাদা। দাদার জমিদারি এক সময় চলে আসে বাবার কাছে। আমার বড় ভাই তুরন মিয়া জমিদার হলেন। তার কাছে গেল সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীর জমিদার আমির বক্সের সাথে আমার বিয়ের আলাপ। মহা ধুমধামে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের সময় দুইটা দাসী দেওয়া হলো আমার সাথে। তারা খেদমত করবে আমার, আমার স্বামীর।
আমি জমিদারি বুঝি না। সবাই বলে আমি নাকি দিলদরিয়া মহিলা। আমার কাছে যে কারো চলে আসা মানেই তার খাজনা মাফ। সঙ্গে অনেক কিছু নিয়ে যাওয়া। এ কারণে আমার বাপের বাড়িতে কেউ আমার সাথে কোনো প্রজার দেখা-সাক্ষাত্ করতে দিতো না।
আবার এই লক্ষণশ্রীতে এসেও দেখি এই অবস্থা। সাহেব বলেন, তুমি শুধু রান্নাবাড়া দেখিয়া দিও, আর কুনো খাম নাই।
আমি কাজের লোকের হাতের রান্না খাই না। নিজে রাঁধি। আমার পাকঘরে ৪ জন মহিলা আমাকে সাহায্য করে। তারা মসলার বাটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি নিজের হাতে ডেকচির ভেতর মসলা ঢালি আর আমার চার বাচ্চারে খাওয়াই।
আমাদের বাড়িতে নানারকম পীর ফকির আর সন্যাসীদের আনাগোনা ছিল। তাদের অনেকে হিন্দুস্থান থেকেও আসতো। এরা খাওয়া-দাওয়া করতো, বখশিস চাইতো, হাত ভরে দিয়ে দিতাম। এদের একজনের মুরিদ ছিলেন আমার সাহেব।
একবার সাগরেদসহ সেই হিন্দুস্থানি ফকির আমাদের বাড়ি এসে কয়েকদিন থাকলেন। যাবার দিন দুপুরবেলা ভরপেটে খাওয়ার পর দেখি আর উঠান থেকে সরেন না। তাদেরকে জিগ্যেস করা হলো, তারা যাচ্ছে না কেন?
সাহেব গেলেন তার পীরের সাথে কথা বলতে। সন্যাসী বলে, সে আমাদের লাল ঘোড়াটি চায়।
বলে কী! এই লাল ঘোড়াটা আমার বড় ছেলে সিকান্দারের। তার বয়স ষোল হয়েছে, সে ঘোড়া চালায় এবং এই ঘোড়াটি ছাড়া সে আর কোনো ঘোড়ায় চড়ে না।
সাহেব তাদেরকে বলেন, ঠিক আছে, আমার ঘোড়াশালে আরো কয়েকটি ঘোড়া আছে, তোমাদের পছন্দমতো একটি নিয়া যাও।
ফকির মানে না।
সাহেব এলেন আমার কাছে। বলেন—এখন কী করি?
আমি বললাম, আপনি এই ফকিরের মুরিদ হয়েছেন, তাঁকে নাখোশ করলে, তার অভিশাপ লাগতে পারে। আপনি তাঁকে কিছু টাকা দিয়ে দেন, তিনি এ রকম একটা লাল ঘোড়া কিনে নিবেন।
সাহেব বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখেন, ফকির ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে অনুমতি চায়। অনুমতি পেলে এই ঘোড়া নিয়ে তারা দুজন চলে যাবে।
সাহেব জানিয়ে দিলেন, এই ঘোড়া দেওয়া যাবে না। এটা আমার ছেলের ঘোড়া। তার বিনিময়ে টাকা নিয়ে যাও।
ফকির হাত থেকে লাগামের রশি সাহেবের মুখের ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেল, টাকাও নিল না।
যেতে যেতে সে বলল, তোর পোলার শখ মিটাবার জন্য তুই আমারে ঘোড়া দিলি না, তুই নির্বংশ হবি।
এই ঘটনার কয়েকদিন পর আমার বড় ছেলের গুটি বসন্ত দেখা দিল। বসন্ত রোগে গ্রাম ছেয়ে গেছে। ঘরে ঘরে এই রোগী। একজনের কাছ থেকে আরেকজনের শরীরে চলে যায়। সবাই বলল এটা আল্লার গজব হিসেবে বালা এসেছে গ্রামে। মসজিদে কোরান খতম হচ্ছে, জিকির হচ্ছে প্রতিদিন। মাগরেবের নামাজের পর মশাল হাতে নিয়ে নারায়ে তাকবীর, আল্লাহ আকবার আর জাল্লাল্লাহু জাল্লাল্লাহু বলে জিকির দিতে দিতে সারা গ্রাম মুসল্লিরা ঘুরতেন, বালা তাড়াবার জন্য। সেই বালা আর যায় না। আমি কী করবো, কার কাছে যাবো, উপায় বুদ্ধি পাই না। কবিরাজের পর কবিরাজ আসছেন, কত গাছের বাকল, পাতা নিজের হাতে পিষে পিষে খাওয়াইলাম, কাজ হয় না। প্রথমে মারা গেল বড় ছেলে সিকান্দার। এরপর একে একে রেজোয়ান, সৈয়দ আর দুধের কন্যা সওয়ারি আমার চোখের সামনে মারা গেল।
এই ঘটনার পর সাহেব দুনিয়াদারি ছেড়ে দেবার কথা ভাবেন আর খালি আল্লাহর জিকির দেন। একদিন আমাদের বাড়ির ঘাটে হারুলিয়ার পীর সাহেব তার নৌকা ভেড়ালেন। এই পীর সাহেব আমাদের পূর্ব পরিচিত। অনেকটা আমাদের পরিবারের লোকের মতো তিনি থাকেন। কিন্তু তার সমস্যা হচ্ছে, তিনি হিন্দস্থানি পীরদের পছন্দ করেন না। এদেরকে যেন বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়া হয় এমন কথা তিনি আগে বলে যান। অথচ এবার ঘাটে নাও লাগিয়েই তিনি খবর পান যে, কিছুদিন আগে এই বাড়িতে সেই হিন্দুস্থানি পীর এসে গেছেন এবং সাহেব এই পীরের মুরিদ হয়েছেন, তখন তিনি সাংঘাতিক ক্ষীপ্ত হয়ে যান এবং সাথে সাথে ঘাট থেকে নৌকায় দড়ি খুলে তিনি ফেরত যাবার প্রস্তুতি নেন।
পীর সাহেব জোরে জোরে চিত্কার করে মাঝিকে বলেন, ঐ আটকুড়া চৌধুরীর ঘাট থেকে যেন তাড়াতাড়ি নৌকা সরানো হয়।
লোকজনের চিত্কার চেঁচামেচি শুনে সাহেব ঘাটে এসে শুনেন হারুলিয়ার পীর সাহেব তাকে ‘আটকুরা’ গালি দিয়ে চলে গেছেন। ‘আটকুরা’ মানে হলো যে নির্বংশ হবে।
সাহেবের মনে খুব কষ্ট লাগলো। তিনি বললেন, আমার এতগুলো সন্তান মারা যাবার পর যে আমারে অনুশোচনা না জানিয়ে গালি দিয়ে চলে গেল, সেও যেন নির্বংশ হয়।
খোদা তায়ালা দুইজনের কথাই সম্ভবত শুনেছিলেন। এই ঘটনার কিছুদিন পর গুটি বসন্তে ধরলো আমার সাহেবকে। আমাকে সুরমা গাঙে না ভাসাইয়া এই সংসার গাঙে একাকী ফেলে রেখে তিনি চলে গেলেন। হারুলিয়ার পীর সাব ও কোনো সন্তান না রেখে কিছুদিন পর মারা গেলেন।
আমি ঘরের ভেতর একটা চৌকির ওপর দিন রাইত শুয়ে শুয়ে বিছানা বালিশ ভিজিয়ে শুধু কাঁদি আর কাঁদি। আমি দিনের আলো দেখি না, রাইতের চাঁদও না। আমি ঘরের ভেতর বসে বসে শুধু আল্লাহরে ডাকি।
এমন সময় একদিন আমারে দেখতে আসেন সাহেবের আপন খালাতো ভাই। তিনি রামপাশার জমিদার। নাম আলী রেজা দেওয়ান। আমি তাঁকে চিনি। কিন্তু এবার আমি তার সঙ্গে আমি দেখা করতে বাহির ঘরে যাই না। তাকে খাসি জবাই করে খাইয়ে বিদায় হতে বলি। তিনি খবর পাঠান, সামান্য কথা বলে বিদায় হবেন।
তাকে আমাদের ভেতরের ঘরে আসতে দেওয়া হলো। আমি পর্দার আড়ালে, তিনি চেয়ারে বসা। আমাকে বললেন, জমিদারির সব কায়দা-কানুন তার জানা আছে। আমি যদি তাকে সুযোগ দেই, তিনি আমার হয়ে হিসাবপত্র বুঝে নেবেন। তিনি এসেছেন তার খালাতো ভাইয়ের জন্য সাহায্যের হাত নিয়ে।
আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি চলে যান।
এর কয়েকদিন পর শুনি প্রজারা কেউ খাজনা দেবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবার আমাদের বেশ কিছু জমিজমা অনেক লোক দখল করে নিয়ে কেউ ঘর তুলছে, কেউ নিজের মতো খেত করছে। এই খবর পেয়ে আলী রেজা সাহেব নিজে চলে আসেন, সঙ্গে বারোজন লাঠিয়াল। সবার হাতে লাঠি, জাটা। তিনি নিজে দুইদিন থেকে সব দখলমুক্ত করে দিয়ে, তার বারোজন লাঠিয়াল রেখে চলে যান। আমাদের লাঠিয়ালদের সঙ্গে তার লাঠিয়ালরাও সম্পত্তি পাহারা দিতে থাকে।
কিছুদিন পর এক লোক আমার কাছে একটা পত্র নিয়ে আসে। লিখেছেন আলী রেজা দেওয়ান। পত্র পড়ে আমি থ । তিনি আরো অনেক কিছু আমার জন্য করতে চান, তিনি আমার বাকি জীবন আমার সঙ্গে কাটাতে চান।
এ চিঠির আমি জবাব দেই না। মাসখানেক পরে আরেক লোক চিঠি নিয়ে আসে। আমি সেই চিঠিরও জবাব দেই না। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই, এই জীবনে আর বিয়াসাদী করবো না। বাকি জীবনটা মানুষের খেদমত আর আল্লাহর জিকির করে কাটিয়ে দেব।
কিছুদিন পর বিকেল বেলা এক বৈষ্ণবী দোতারা বাজাতে বাজাতে আমার বাড়ির অন্দরমহলে চলে এলো। তাকে বাহিরে আটকানো গেল না। সে সবাইকে বলে যে, সে বেগম সাহেবের কাছেই এসেছে, বেগম সাহেবকে গান শোনাবে।
বৈষ্ণবীর মতলব বোঝা গেল রাতের বেলা। অনেক গান শোনানোর পর সে আমার খুব কাছে এসে বলে, সুগন্ধি ফুলের লতার যেমন বড় গাছের আশ্রয় লাগে, তেমনি গুণবতী নারীর প্রয়োজন বলিষ্ঠ পুরুষের আশ্রয়। একথা সেকথার পর বলেন, রামপাশার জমিদার তাকে পাঠিয়েছে, আমার কাছ থেকে যে কোনোভাবেই বিয়ের সম্মতি নিয়ে যেতে। রাতে সে উঠানে নিজের হাতে নিজের জন্য ডাল-ভাত রান্না করে খেয়ে বারান্দায় ঘুমাবে। আর এই সারারাত্রিতে আমি যেনো চিন্তা-ভাবনা করে কাল সকালে তাকে আমার মতামত জানাই।
পরদিন ভোরবেলা বৈষ্ণবী বাড়ির পাশের সুরমা গাঙে স্নান করে এসে আমার পায়ের কাছে বসে থাকে।
আমি বৈষ্ণবীকে বলি, যাও তোমাদের দেওয়ানকে বলে দাও, আমি রাজি। তবে শর্ত আছে।
কী শর্ত মা-জননী?
আমার পক্ষে সম্ভব নয় সতীনের ঘর করা। রামপাশায় উনার জমিদারি আছে, স্ত্রী-পুত্র আছে। তারা সেখানেই থাকবে, তাঁর জমিদারিও সেখানে থাকবে। আমি থাকবো এই লক্ষণশ্রীতে তোমাদের দেওয়ান যদি এখানে এসে সারাজীবন থাকতে পারে, তবে আমি বিয়ে করতে রাজি।
ছয় :আলীরাজ কাহিনি
লক্ষণশ্রী থেকে আমার দূত ফেরত আসে। তার সঙ্গে একমণ রসগোল্লা। লক্ষণশ্রীর চৌধুরাণী এটা পাঠিয়েছেন। আমি বুঝে যাই, খবর ভালো। আল্লাহপাক আমার মনের আশা পূরণ করেছেন। এমনিতে আমার আগের যেসকল জমির বন্দোবস্ত নেওয়া আছে, সেগুলো আসলে খুব বেশি না। অন্য অঞ্চলগুলোর জমিদারির তুলনায় তা অনেক কম। তাছাড়া নতুন কিছু তালুক কেনার জন্য লোক লাগিয়েছি। নগদ টাকারও খুব দরকার।
এমনিতে আমার তিন নম্বর সাদী আমার কপাল খুলে দিয়েছিল। নুুরু বিবির স্বামী অঢেল সম্পত্তি রেখে মারা যাবার পর যখন আমাার বউ হলো তখন, তার সম্পত্তি যোগ করে আমার জমিদারি বাড়ালাম। পরে নুরু বিবির ছোট বোন জরিনারে বিয়ে করে তার বাপের সম্পত্তিও পেলাম। এসব সয়সম্পত্তি আমাকে অনেক ইজ্জ্বত দিয়ে দিয়েছে। করিম বখস্ সুনামগঞ্জে অঢেল সম্পত্তি রেখে গেছে, সব আমার জানা। করিম বখেসর বন্দোবস্ত এখন সব হুরমতের নামে। হুরমত আমার বউ হলে সেই সম্পত্তিও আমার হবে। সবাই এখানে চৌধুরী আছে, আমিও চৌধুরী। এবার এই সম্পত্তি আমার হলে আমি দেওয়ান হবো। নামের সাথে একটা দেওয়ান যুক্ত হওয়া মন্দ কিছু না। সিলেটের কোনো জমিদারের নামের আগে পিছে দেওয়ান আর চৌধুরী আছে? আমি ঘোড়াশাল থেকে দশটা ঘোড়া একসাথে বের করে আনি। ডানে বামে যারেই দেখি, তার হাতে একটা লাগাম ধরিয়ে বলি, আও আইজ ঘুড়া দৌড়াইতাম।
আমার এই ফুর্তির মানে সবাই বুঝে না। আমি সারা বিকাল রামপাশার মাঠে দশবার ঘোড়া দৌড়ানো শেষ করে বাড়ি এসে আমার সবচেয়ে প্রিয় কুড়া পাখিটাকে খাঁচার ভেতর থেকে বের করে হাতে ধরি। তারে বলি, তুই কিতা চাস?
কুড়ায় বলে, আইজ আফনার খুব ফুর্তির দিন। আইজ আফনের মনের অবস্থা ভালা। আফনে নতুন বিবি ফাইবা, লগে পাঁচ লাখ বিঘার জমিদারি।
তুই জানস খেমনে?
আমি হখলতা জানি।
আর কিতা জানস?
আফনার এমন এখ আওলাদ অইবো, যে আওলাদ আফনার নাম ভুলাইব।
আর?
হেই আওলাদের লাগি আফনার নাম বাচি থাকবো।
আর আমি এমনি বাচতামনায়? ওতো জমি, ওতো সম্পদ, ইতা আমার নাম নিতো নায়নি?
কুড়া পাখি কথা বলে না। সে চি চি চি শব্দ করে চারদিকে ঘুরতে থাকে। দেখে মনে হয় তার মনেও অনেক আনন্দ।
কুড়া বলে, যে নাই হে নাই, যে বাচে হে নাচে। বলেই আবার হি হি করে চারদিকে ঘুরতে থাকে।
আমি আমার এই প্রিয় পাখিটাকে বলি, আজ তুই কি চাস বল? যা চাইবি, তাই দিবো।
সে বলে—তুমি যেমন নিজের মানুষ পাইবায়, আমিও আমার বন্ধুর লগে মিলিত অইতাম চাই। আমারে ছাড়ি দেও।
আমি হাত উঁচু করে কুড়া পাখিটারে ছেড়ে দেই। সে আমার মাথার ওপর চারপাশ কয়েকটা চক্কর দিয়ে আমার ঘরের টিনের চালের ওপর গিয়ে আমার দিকে মুখ করে বসে থাকলো।
আমি ইশারা করি— যা, তুই চলে যা।
পাখিটা উড়ে চলে গেল।
তার খানিক পর উবেদুর এসে আমার কাছে দাঁড়ায়। এই ছেলেটাই তখন আমার ভরসা। বয়স তার বাইশ-তেইশ। আমার সবকিছু সে-ই দেখে। একমাত্র পুত্র আমার। আমার বয়স ষাট এর কাছাকাছি তখন। আর কতদিনই বা আছি। আমার পর সব জমিদারি সে একাই দেখবে। আমার সাথে তার খুব ভাব। আমরা বাপ-বেটা একসাথে ঘোড়া দৌড়াই, কুড়া শিকার করি। কিন্তু আজ তার কী হয়েছে জানি না, বিকাল থেকেই তার খুব মন খারাপ। গম্ভীর হয়ে আছে। সবাইকে নিয়ে যখন আমি ঘোড়দৌড়ে গেলাম, সে গেল না। পুকুর পাড়ে বসে থাকলো।
সন্ধ্যার পর আমি লণ্ঠন জ্বালিয়ে আমার ঘরে শুয়ে আছি। তার মা নাফিজা আমার জন্য সুপারি কেটে নিয়ে এসেছে। আজ তারও দেখি মন খারাপ। বুঝলাম, সবাই জেনে গেছে যে আমি আবার সাদী করতে যাচ্ছি।
আমি নাফিজাকে বললাম—তুমিতো রামপাশা আছো, রামপাশাত তুমি তাখবায়। আমার আরোখ বউ নুরজাহান আছে, হে আছে তার বাফর বাড়ি, সিলেটর কুয়ার পার। ই-বউও তুমার গেছে আইতো নায়। ডরাইও না, তুমার খান্দাত হতিন বওয়াইতাম নায়।
নাফিজা কোনো কথা বলেন না। তিনি পানের বাটা রেখে চলে যান। তার পেছন পেছন উবেদুর এসেছিল। সে আর যায় না, সে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি বলি—বাজান, তুমার কুনো সমইস্যা?
ছেলেটা বেয়াদব আমার। মুখের ওপর বলে বসে, বুড়া বয়সো তুমার আবার বিয়া খরার দরখার অইলো খেনে? যেতা সয়-সম্পত্তি আমি ফালিয়ার, দুইদিন বাদে সুনামগঞ্জি ফুয়া এগু আইয়া আমার ভাগিদার অইবো। তুমি তো আর তাখতায় নায়, হখল জামেলা আমা লাগি তইয়া যাইবায়।
আমি অনেকক্ষণ কথা বলি না। হুকাটা টেনে আনি। নিজেই চিলিম ধরাই। তারপর টানতে টানতে গিয়ে তাকে বলি—বাজান, ই বুজ আমারও আছে। ই বুড়াবেটিরে আমি বিয়া খরিয়ার তুমার খতা চিন্তা খরি। ই বেটির বয়স এখন পঁয়ত্রিশের ওপর। ই বেটির ঘরো আমার কুনো হুরতা মুরুতা অইতা নায়। বেটিরে বিয়া খরমু, তার সম্পত্তি ফাইমু। আর আমার সম্পত্তি ওয়া মানিতো তুমার সম্পত্তি ওয়া। আইজ বাদে খাইল আমি মরি গেলে ইতা হখলতা তো তোর বেটা।
উবেদ আমার যুক্তি মেনে নিল। সে কিছু না বলে চলে গেল আর আমি ধুমধাম করে বিয়া করলাম হুরমতকে। চলে এলাম লক্ষণশ্রী। আমি থাকি লক্ষণশ্রী আর জমিদারি দেখি রামপাশা আর লক্ষণশ্রীতে। লক্ষণশ্রী থেকে রামপাশা প্রায় ৩০ মাইল পথ। নৌকা করেই আসতে হয় বেশিরভাগ পথ। রাস্তা দিয়ে যাওয়া যায় না। মাঝখানে ৫ বার নদী পড়ে। নদীতে খেওয়া থাকে না। পালকিতে গেলে দুই দিনের পথ। নৌকায় গেলে ফজরে রওয়ানা দিলে আসরের সময় পৌঁছা যায়। রামপাশার জমিদারি পুরাটাই উবেদুরের ওপর ছেড়ে দেওয়া। আমি মাঝে মাঝে যাই। আমার মনোযোগ লক্ষণশ্রীতেই বেশি। এখানে জমির পরিমাণ বেশি, আর ঝামেলাও বেশি। আশপাশে বেশিরভাগ হিন্দু পরিবার। অন্য পরগণার হিন্দু জমিদারেরা ওত পেতে থাকে, কখন কীভাবে কিছু জমি নিয়ে নেওয়া যায় কি না। কালেক্টর অফিস থেকে আমার জমিদারের ব্যাপার চিঠি আসে। সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী পরগণার বিভিন্ন গ্রামের দখলদার হিসাবে চিঠির ওপর লেখা হয় নাম— হুরমত জাহান বেগম, পতি দেওয়ান আলীরজা। আমি এতেই খুশি।
কিন্তু আমার এই খুশি খুব বেশিদিন স্থায়ী হলো না। পোলা একটা জন্ম দিলো। মার কাছে সে সাত রাজার ধন। হুরমত তার আগের চার বাচ্চার কষ্ট ভুলে গেল তারে পেয়ে। সে আমাকেও পুছে না। তার কাছে হাছনই সব। হাছন যদি এমন বলতো, আম্মাজান, তুমি সুরমা গাঙ হিছাইয়া হুকনা খরি দাও— তার মা হয়তো সব লোক লাগিয়ে সুরমা নদী সেচতে শুরু করে দিত।
আমি তার মায়ের ওপর কথা বলি না। পোলা বেয়াড়া, বেয়াদব। যা বলে তাই করে। তার কথায় তার মা উঠে বসে। আমি তার মাকে খুশি রাখার জন্য চুপ করে থাকি। বারো তেরো বছর বয়সে সে ঘোড়া চালাতে শিখে ফেলে। তার অসংখ্য বন্ধু। দলবেঁধে গুড্ডি ওড়ায়। নদীতে সাঁতার কাটে। বন্ধুদের সবাই তার পিছে পিছে দৌড়ায়। মাঝে মাঝে কাউকে মেরে আসে। নানাজন নানারকম নালিশ করে। গাংপারের মেয়েরা গোসল করতে নামলে নাকি সে তাদের কাপড়-চোপড় নিয়ে আসে। আমি তার মা-র কাছে নালিশওয়ালাকে পাঠাই, মা চুপ করে থাকেন। মার কাছে কেউ নালিশ নিয়ে গেলে সে বখশিস নিয়ে ফেরত যায়। বখশিসের বিনিময়ে ছেলে মাফ পেয়ে যায়।
হাছনের যখন পনেরো—ষোলো বয়স তখন টের পেলাম, জমিজমার হিসাব কিতাব নিয়ে উবেদুরের বড় চিন্তা। এরমধ্যে তার বিয়ে হয়েছে দুইটা। প্রথম বউ বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময় মারা গেল। কিন্তু বাচ্চাটা বেঁচে গেল। তার নাম রাখা হলো আবুল হাছন, আমরা ডাকতাম হুছেন। হুছেনের বয়স যখন ৬ তখন তার ঘরে সত্ মা আসে, উবেদকে আবার বিয়ে দেই সাজিদার সাথে। সাজিদার ঘরে একটা ছেলে হয়, আজিজুর। ওদিকে সিলেটের ঘরে আমার আরো দুই ছেলে-মেয়ে ছইফা আর মুজফ্ফর। ছইফার মা মরে গেলে তার ছোট বোন জরিনারে ঘরে আনি। তারা থাকে সিলেটের কুয়ারপার। সুনামগঞ্জে আমির বক্সের জমিজিরাত সব হুরমতের নামে, কিন্তু আমিই চালাই। এগুলোর কিছু উবেদ পাবে কি না, এমন কিছু আমাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করে। এই নিয়ে তার মহা চিন্তা।
আমি একদিন উকিল ডেকে সব জমি ভাগাভাগি করে দিলাম। আমার তখন বয়স হয়েছে। সত্তরের ওপর বয়স। জমিদারি আর ভালো লাগে না। আমি শান্তি চাই। শান্তি খরিদ করতে গিয়ে আমি লক্ষণশ্রীর পুরো জমি হাছনের নামে লিখে দেই। এই জমি তার মা-র কাছ থেকে এসেছে, তার সত্ পিতার সম্পত্তি, সুতরাং হাছনের সত্ ভাইবোন তা পাবে কেন? আর সিলেটের সম্পত্তি যেহেতু আমার নিজের করা না, আমার বউদের, তাই সেই সম্পত্তিতেও আমি হাত দেই না। এটা আমার সেই তরফের পুত্র কন্যা ছহিফা আর মুজাফ্ফরের নামেই থাকে। রামপাশার সম্পত্তি আমি করেছি, আমি এটা আমার দুই পুত্র উবেদ আর হাছনকে ভাগ করে লিখে দেই।
দলিলপত্রে সই-সাবুদ করে যখন এটা আমার উকিল পড়ে শোনালেন, তখন দেখি রাগে উবেদের চোখ লাল হয়ে গেছে। তার তখন সাঁইত্রিশ বা আটত্রিশ বছর বয়স। সে আমাকে বলে, তুমি ঘাটে ঘাটে বিয়া খরবায় আর বছর বছর বাইচ্চা বিয়াইবায়। আর খানোর কিগুু আইয়া আমার লগে শরিকদারি খরবো—ইকান আমি আগেউ বুঝছিলাম। আমার খতা তুমি হুনলায় না, বুড়া বেটিরে বিয়া খরি আমার লগে শরিকদার আনি বওয়াইছে। আমি তুমার ই খাগজফত্র মানি না।
এই কথা বলে উকিলের হাত থেকে দলিলখানা নিয়ে আমাদের সবার সামনে সে ছিঁড়ে ফেলে।
আমার খুব মনোকষ্ট হয়। আমি তারে বলি, তোর যেন এমন মরণ হয় যে তোর আওলাদ যেন আমার সম্পদ ভোগ করতে না পারে।
আসলে রামপাশায় আমার তখন খেলার সাথী আমার দুই নাতি, উবেদুরের দুই ছেলে। আমি যতটুকু উবেদুরের জন্য দিয়ে গিয়েছিলাম তা তার দুই পুত্র দুই-তিন পুরুষ ধরে বসে বসে খেয়ে শেষ করতে পারতো না। কিন্তু অতিরিক্ত সম্পদে ছিল তার লোভ। এই লোভের কারণে আমি তাকে সেটা বলি।
পুত্রকে অভিশাপ দেওয়ার পরপরই আমি টের পেলাম, আমার চোখজুড়ে পানি আসছে। আল্লাহ কি এটা কবুল করে ফেললেন? আমি এশার নামাজ শেষে চলে যাই বাড়ি থেকে আধা মাইল পশ্চিমের কাপনা নদীতে। তখন ঘন অমাবস্যা। শীতের রাত। কুয়াশা পড়েছে অনেক। সামনে পেছনে কিছুই দেখা যায় না। আমি নিজেকে কষ্ট দেওয়ার জন্য গায়ের চাদর খুলি, পাঞ্জাবী খুলি, গেঞ্জি খুলি। গায়ের ধুতি পরে আস্তে আস্তে নদীতে নামি। নামতে নামতে বুকপানি পর্যন্ত গিয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলাম, হে আল্লাহ, রাগের মাথায় আমার এই অবুঝ শিশুটিকে আমি অভিশাপ দিয়েছি, তুমি এই বদদোয়াটা কোনোভাবেই কবুল করিও না। আমার ছেলে এমনিতে খুব ভালো, মাঝে মাঝে মাথা গরম করে ফেলে। হে আল্লাহপাক রাব্বুল আলামীন, আমার পুত্র আমার সঙ্গে যে বেয়াদবি করেছিল, আমি তা মাফ করে দিলাম, তুমিও মাফ করে দিও।
কিন্তু আল্লাহ আমার কোন কথা রাখলেন আর কোনটা না, আমি বুঝতে পারিনি। এর কয়েকদিন পর উবেদ গেলো হাতি নিয়ে শিকারে। একসময় একটা বিষধর সাপ তাকে কামড় দেয়। আমি পুরো রাজ্য তছনছ করে ওঝা আনালাম, কবিরাজ আনালাম, বেদে আনালাম। কাজ হলো না। কয়েকদিন পর সে দুনিয়া আন্ধাইর করে চলে গেল। তখন মনে হলো, আমার কিয়ামত এসে গেছে। মাটির জমিদারি বাড়াবার জন্য হা-হুতাশ করতে করতে এক সময় তার ঠিকানা হলো মাত্র সাড়ে তিন হাতের ভেতর।
তবে কিসের জন্য এই দুনিয়া? আওলাদের জন্য? আওলাদ কি তার বাপদাদার কথা মনে রাখে? নাকি আমি রাখি বাবু খাঁ-র নাম? আমার আওলাদ কি আমাকে মনে রাখবে? আমার সবকিছু আমার আওলাদের জন্য। এখন আছে এক হাছন। ও ছাড়া দুনিয়াতে আমার তো আর কিছু নাই। এই দুনিয়ারে আমিও আর চাই না।
সাত :রাজাকাহিনি
চারুর সাথে বসে দুই চাচা যখন গল্পে মশগুল, রামিজ রাজাকে নিয়ে তখন আরেকদল ফুর্তিতে মজে আছে। এরমধ্যে ফেসবুকে দু-তিনটা সেলফি পোস্ট করে দিয়েছে রত্না। হাছন রাজার গেটআপে এমন ভাব—এটা যে অন্য কেউ তা বোঝা যাচ্ছে না। রামিজ রাজার গলা জড়িয়ে ছবি তুলে পোস্ট দিয়েছে, লিখেছে উইথ মাই পেয়ারা হাছন রাজা। চেক-ইন দিয়েছে, কাংলার হাওর ইন সুনামগঞ্জ।
কিছুক্ষণ পরপর রত্না ফেসবুক দেখে। দশ মিনিটে লাইক পড়েছে ১৬২ টি। এত লাইক তার ছবিতে পড়ে না। শেয়ার করেছে ২১ জন। শেয়ারে ক্লিক করে বুঝতে পারে, বেশিরভাগই তাকে ট্রল করছে। হাছন রাজা নিয়ে পাগলামি বন্ধ করতে অনুরোধ করেছে কেউ কেউ। কেউ লিখেছে হি ইজ জাস্ট এ মডারেট এক্টর, নট হাছন। আরেকজন ফটো কমেন্টে রামিজ রাজুর সাথে তার ছবি দিয়ে লিখেছে, আজ সন্ধ্যায় শিল্পকলায় আমার সাথে রামিজ।
রত্না খুব মজা পায় ছবি আর কমেন্টগুলো পড়ে। এখন তার ফেসবুকিং-এর সময় নয়। সে সেলফোন পুরাপুরি বন্ধ করে দেয়।
সেলফোন এয়ারপ্লেন মোড-এ নিয়ে শুধু ভয়েস রেকর্ডার অন করে রাখে শিফা। ডিটিভির হেনা ভাবল, একটা আপডেট এখন দিয়ে দিতে পারে। রাত মাত্র সাড়ে নয়টা। দশটার খবরে ধরানো যায় কি না এটা জানার জন্য শিফট ইনচার্জ বাতেনকে ফোন করে।
হ্যালো, বাতেন ভাই। আর বইলেন না। বিষয়টা আসলে ভুয়া। হাছন ফাছন নাই। তবে একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস পাইছি। হাছনজানের রাজা ফিল্মের পুরা টিমটা এখন আমাদের সঙ্গে।....হ্যাঁ, হ্যাঁ কাল আসছি, তাইলে লাইভ বাদ। আমরা রেকর্ড করে আনি। লোকাল করেসপন্ডেন্ট কিছু স্টক ফুটেজও দেবে। কাল বিকেলে ঢাকা পৌঁছে বানিয়ে দেবো। ওকে, না, না কোনো সমস্যা নাই। আপনি থাকলে অনেক মজা হতো। মিস ইউ টু।
হেনা তার ক্যামেরাম্যান ফরিদকে ডাকে।
ফরিদ ভাই, আপনি জাস্ট ধরে রাখেন। মাইকের কানেকশনটা দিয়ে রাখেন। আমি কথা বলছি। ক্যামেরা নাড়ানোর দরকার নাই।
ফরিদ ক্যামেরার সাথে লাগানো ব্যাটারি সানগান জ্বালায়।
সাথে সাথে রাজার আপত্তি। না না। বাতি জ্বলবে না। আসমানের দিকে তাকিয়ে বলে, ঐ বাতি থাকতে এই বাতির দরকার নাই। আপনি বাতি নেভান।
ফরিদ বাতি নিভিয়ে ফেলে।
বান্নার সঙ্গের বাকিরা সবাই বসে আছে বজরার ছাদের এক কোনায়। তাদের কারো কোনো আগ্রহ নাই এদের আড্ডায়। মাঝখানে বান্নাকে রেখে প্রায় গোল হয়ে বসে আছে আকাশ, শিখা, রত্না আর হেনা। একটু দূরে ট্রাইপয়েডে ক্যামেরা বসিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফরিদ।
আলাপ শুরু করে আকাশ।
রামিজ ভাই—
এটুকু বলতেই রামিজ বেশ গম্ভীর স্বরে বলে বসেন, আমাকে রামিজ রামিজ করবা না। বুঝছো?
তাইলে কী বলবো?
আমরা সবাই কস্টিউমে আছি। যতক্ষণ কস্টিউম পরা আছি আমরা কেউ আর কেউ নাই। আমি হাছন। তোমাদের হাছন রাজা।
বাহ, বাহ ! বেশতো। ঠিক আছে হাছন দা, শুরু করুন।
হাছন দা? আমি আবার হাছন দা হলাম কেমনে? আমি কি হিন্দু?
তাইলে কী? হাছন ভাই?
যা ইচ্ছা বলো। ভাই, চাচা, কাকা, দাদা, নানা— তোমাদের যেটাতে ফুর্তি লাগে।
ঠিক আছে ওস্তাদ। যখন যেটা মনে হয়, ডাকবো আপনারে।
রত্না আস্তে করে বলে—বস, আমি কিন্তু ওস্তাদ ফস্তাদে নাই। আমি হাছনই ডাকবো। হাছন মিনস্ বিউটিফুল। ইউ আর অলওয়েজ সো।
হাসে সবাই।
এদের মধ্যে আকাশই পাকনা কিছিমের ছেলে। সে প্রথম শুরু করে—আচ্ছা আমরা আগে পরিচিত হই, আমার নাম আকাশ বালক।
কী?
জি, আকাশ বালক। এটা আমার আসল নাম না। শুনে অবাক হচ্ছেন? অবাকের কিছু নাই। নাম একটা সংকেত মাত্র। যেটা দিকে ডাক দিলে আমি বুঝতে পারি যে আমাকে ডাকা হচ্ছে, ব্যস। আমার নিজের দেওয়া নাম। সার্টিফিকেটে আমার নাম আছে মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান। মোহাম্মদ আবার ম-ওকার বিসর্গ দিয়ে লেখা। সাদিকুর বানান দন্তস দিয়ে, আপনার মতো ছ দিয়ে নয়। বাট ফেসবুকে আমার অরিজিনাল আইডি হাইড করা। এখানে যারা আছে, যেটা আছে, সেটা এই আকাশ বালকের। এই মুহূর্তে আপনাদের সামনে যিনি আছেন, তিনিই আকাশ বালক। এবং এই আমি এখানকার সবাইকে নিয়ে এসেছি ফেসবুকের একটা স্টাটাস দিয়ে। সেখানে লেখা ছিল মহাপূর্ণিমার রাতে হাছনবিহার হবে সুনামগঞ্জে। হাছন রাজা স্বয়ং হাজির হবেন কাংলার হাওরে। এই কথা লিখে সবাইকে আমি ডেকে নিয়ে এসেছি। আপনার কী অবস্থা?
নাম কি তুমি একলাই বদলাইতে পারো? আমরাও পারি। আমার জন্মের পর আমার নাম ছিল অহিদুর রেজা। আমার এক ভাই ছিলেন, তার নাম উবেদুর রেজা। উবেদুরের সাথে মিল করে রাখা অহিদুর। কিন্তু আমার আম্মাজানের এই নাম পছন্দ ছিল না। তিনি বললেন—হাছন হবে আমার নাম। সিলেটের আদালতে কাজ করতেন এক নাজির। বাবার বন্ধু। তার নাম ছিল আব্দুল্লাহ। তিনি কোর্টে আমার নাম বদলাই দিলেন। বললেন—নাম হবে হাছন। আসলে হাছন বলে কোনো শব্দ নাই। শব্দটা আরবি। আমাদের নবীজির এক নাতির নাম ছিল হাসান, আরেকজন হোসেন। কিন্তু আমাদের সিলেটিরা ছ-এর উচ্চারণে ছ লিখে আর আকার উকার কমায়। যার নাম হাসান, তাকে ডাকে হাসন, যিনি হোসেন, তিনি হয়ে যান হুসেন। আমাদের নাগরীলিপিতেও স নাই, ছ আছে। আমার নাম লিখা হতো ছ দিয়ে হাছন, আমার বইনের নাম ছ দিয়ে ছইফা। এখন শুনি বুদ্ধিজীবীরা নাকি আমার নাম হাসন করে দিসে, ছইফারে সহিফা। নামের বানান বদলাইলো, আকিকা করছে নাকি? করলে তো তোমরা দাওয়াত পাইতা, পাইতা না?
আপনার বাড়িতে যে যাদুঘর আছে, সেখানে আপনার ‘হাছন-উদাস’ বইয়ের কভার দেখেছি। সেটাও ‘ছ’ দিয়ে। বইয়ের নিচে আপনার নাম আছে লেখা ‘দেওয়ান হাছনরজা চৌধুরী’। সবই ‘ছ’ দিয়ে, অথচ আপনার বাড়ির নাম ‘হাসন রাজার বাড়ি, যাদুঘরের নাম ‘হাসন রাজার যাদুঘর’। এত বড় বেয়াদবি আপনার নামের সাথে!
হাছন রাজা কথা বলেন না। তিনি আকাশ বালকের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এক সময় বলেন, কোন বুদ্ধিজীবী নাকি বদলেছে।
আকাশ বলে, ওস্তাদ আমরা আপনার লগে আছি। বুদ্ধিজীবীর লগে নাই, আপনার পরিবারের লগেও নাই, যিনি আপনার নামের বানান বদলান। কাল সারাদিন আপনার বাড়ি, মিউজিয়াম, কবর এসব দেখলাম। হাসনই বেশি, হাছন নাই। এমনকি আপনার কবরেও আপনার নাম শুদ্ধ করে লেখা হাসন। কিন্তু আপনি ছাড়াও বাংলাদেশ বহু বিজ্ঞ লোকের নাম হাছান, হাছন আছে। কপাল আপনার, কী আর করবেন?
চারু নেট ব্রাউজিং করছে। অনেকটুকু খুব মন দিয়ে পড়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই বলে—কিন্তু আমারও খটকা আরো আছে বস। আপনি রজা, না রেজা, না রাজা? কয়েক জায়গায় কয়েকরকম দেখছি। দেওয়ান ছিলেন আপনি জানি, রাজা কোন দেশের? নাকি সুন্দরীদের মনের রাজা?
ঠা ঠা করে হেসে ওঠেন হাছন। হাসি থামতে থামতে বলেন, সুন্দরীদের মনের রাজাতো ছিলামই, আর রাজার বংশও ছিল, সে অনেক আগে, যখন আমরা হিন্দু ছিলাম। সেটার সাথে এই জমিদারির সম্পর্ক নাই। কিন্তু এই আমলের রাজা ছিলাম আমি নামের জোরে, গায়ের জোরে।
কেমনে?
পূর্ব পুরুষেরা অনেকেই এই অঞ্চলের কোনো সমপ্রদায়ের রাজা ছিলেন। তাঁরা হিন্দু ছিলেন। তাদের নামের আগে রাজা লেখা হতো, যেমন রাজা বীরেন্দ্র সিংহদেব। রাজার পুত্র প্রথমে রাজকুমার লিখতেন,পরে তিনি রাজা হতেন।
তাইলে আপনি?
আমার নামের পরে রাজা মানে এটা রাজা-বাদশাহর রাজা নয়। এটা আমি করে নেই, আমার শান-শওকত বুঝানোর জন্য। আমি তো জমিদার ছিলাম, চৌধুরী ছিলাম। জমিদার, চৌধুরী অনেকেই ছিল। রাজা কেউ ছিল না।
আপনি আপনার রাজা?
হ। যেমন কেউ শাহ লিখে বাদশা বোঝায়, সম্রাট বোঝায়, আমিও হাছন রাজা। আমার পরের পুরুষেরাও কেউ রাজা ছিল না। আমাদের হিন্দু রাজাদের রাজাগিরি বহু আগে শেষ হয়ে গেছে। তারপরও তারা আমার মতো রাজা রাজা লিখে বোঝায় যে তারা আমার বংশ। এটা খুব বড় কোনো বিষয় না। বরং এটা তো আমার জন্য আনন্দের। এক সময় পাগল ছাগল বলে যারা আমারে অবজ্ঞা করেছিল, আজ তাদের বংশধরেরা আমার নাম তাদের নামের সাথে রেখে গর্ববোধ করছে, সেটা কম কথা নয়। রেজা-রাজার আগে আমরা ছিলাম খাঁ। আমার দাদার নাম আনোয়ার খান। তার বাবার নাম ছিল বাবু খান। বাবু খান তার নাম ছিল না, নাম ছিল রাজা দেওয়ান বীরেন্দ্র রাম সিংহ দেব।
তিনিই বাবু খান?
আগের দিনের খান্দানি হিন্দুদের বাবু বলা হতো। বীরেন্দ্র সিংহ দেব-এর বাবা ছিলেন বানারসী রাম। এই বানারসী রাম দেখলেন, তার ছেলে মুসলমানদের সাথে ওঠাবসা করছে। মুসলমান ধর্মের অনেক প্রশংসা করে। বড় বড় ওলেমাদের সাথে কাটায়। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, ছেলেটা হিন্দু ধর্ম ছেড়েও দিতে পারে। তিনি যখন বুঝতে পারলেন, লাভ নাই, ছেলে মুসলমান হবেই, তখন সিলেটের ফৌজদারের কাছে আর্জি করেন ছেলেকে যেন কোনো সম্ভ্রান্ত ঘরে বিয়ে দেওয়া হয়। কথা রেখেছিলেন সিলেটের মৌলভী ফৌজদার। বাবু খানের সাথে এক জমিদার কন্যার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলো। তিনি আরব থেকে আসা কোরাইস বংশের লোক। সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীতে তাদের জমিদারি আছে। সুন্দরী জমিদার কন্যার সঙ্গে যুক্ত হয় অর্ধেক রাজত্ব। কোড়িয়া পরগণার রামপাশার মৌজার বিশাল জমির বন্দোবস্ত দেওয়া হয়ে যায় নও মুসলিম বাবু খানকে। তার নাম থেকে সিংহদেব উপাধি খসে পড়ে। সিংহদেব উপাধী ছিল খাসিয়া সম্প্রদায়ের। সেটা বারানসী রামের উত্তর পুরুষদের কাছে রয়ে যায়। বাবু খানের দুই পুত্রের জন্ম হলে তাদের একজনের নাম হয় আনোয়ার খান, অপরজন কিশোয়ার খান। এই আনোয়ার খানই ছিলেন আমার দাদা।
তার মানে খাসিয়া-আরব মিলে আপনাদের রক্ত?
খাসিয়া রাজাদের কেউ আমাদের বংশে ছিল, তবে তাদের রক্ত পুরোপুরি আসেনি। এরমধ্যে আরবের কোরাইশ বংশীয় রক্ত এসে যুক্ত হয় খানের আমল থেকে । খান যদিও কোনো নাম না, এক ধরনের উপাধি, আগে মঙ্গোলীর সেনাপতিদের খান নামে ঢাকা হতো—অনেকটা সেনাপতি, সেনাবাহিনী প্রধান টাইপের উপাধি ছিল সেটা। বোঝতো, নাম একটা নামে কাউকে ডাকলেই হয়, যেটা দিয়ে কাউকে ডাক দিলে পাওয়া যায়। অচেনা মানুষের কাছে কাউরে তাঁর নাম দিয়া প্রথমে চেনা যায়। তার পেশাটা জানা যায়। আগের দিনে তো মানুষের নিজের পরিচয় তেমন থাকত না। বংশ পরমপরায় মুচির ছেলে মুচি, দর্জির ছেলে দর্জি, মাইমালের ছেলে মাইমাল হইতো। তখন তার পেশার পদবিটাও একই থাকত। কিন্তু পাবলিকের কাছে নিজেকে আলাদা আর বড় কিছু বোঝানোর জন্য নানারকমের নাম নিতে হয়। এখন বাপের পেশায় পুত্র থাকে না, কন্যা থাকে না। আগের দিনে কন্যাদেরতো আর পেশাও ছিল না। কিলিয়ার?
হ অন্তত।
তোমাদের কার কী নাম?
আমি মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান, অথবা আকাশ বালক
আমি হেনা জোবায়েদা, আমাকে হেনা নামেই ডাকে সবাই
আমি ফরিদ আহমেদ। ফরিদ
আমি রত্না চক্রবর্তী।
আমি শেফালি হাসান। আমাকে শেফা, শিফু এসব নামেও ডাকা হয়।
আর চারু আছে ঐ নায়ে, দুইজনের সাথে গল্প করছে। ও চারুলতা চন্দ্রিকা নামে কবিতা লেখে, আসল নাম সিতারা পারভীন।
এই দেখো তোমাদের যে নামই হোক, সেটা তোমার চেয়ে বড় না। তোমারে চিনাবে তোমার নাম। আর আমাদের নাম চেনায় আমাদের নামের শেষের পদবি। আমাদের আমলের যে কোনো জনের চেয়ে তোমরা এখন অনেক বড়। চারুর কবিতা যদি ভালো হয় সে চারুলতা নামে লিখলো না পারুলতা নামে লিখলে সেটা বড় হবে না। তার নামকে টানবে তার কাম। ঠিক না?
কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে তিন রকমের রেজা-রজা-রাজা হলো কেন? এটা কি প্রিন্টিং মিসটেক?
আমার হাছন উদাস যখন বেরোয়, ছিফারা, কায়দার আকারে, এমনকি বইয়ের শেষ পাতা থেকে উলটা দিকে কবিতা সাজিয়ে, সেটাতে আমার শিক্ষিত মুহুরীরা আরবি পুস্তকের কায়দাকে অনুসরণ করেছিল। বাংলায় জ্ঞান আমার ভালো ছিল না। কোনোমতে নাম দস্তখত করতে পারতাম, একটু একটু লিখতামও। বেশিরভাগ লেখাই আমার মুহুরীরা লিখে দিতো। ছাপাখানায় তারাই নিয়ে যেত। সেসব কারণে আমার নাম লিখেছিল দেওয়ান হাছনরজা চৌধুরী। অনেক দলিলে আমার আব্বাজানের নামও ছিল দেওয়ান আলীরজা চৌধুরী।
আপনার মৃত্যুর পর আপনার বড় ছেলে হাছন-উদাস এর পরিবর্ধিত সংস্করণ যখন বের করলেন, প্রকাশক হিসেবে তাঁর নামও লিখলেন—দেওয়ান গণিউররজা চৌধুরী। এটা কেন?
আসলে ছিল রজা বা রেজাই। পরে আমি রাজা লিখি। সবাই রাজা হয়ে যাই। তুমি আসল ঘটনা না জানলে আমার নাম শুনেই মনে করতা আমি রাজা বাদশাহ টাইপের কেউ, এই আর কী! বিষয় হচ্ছে, আমার আব্বাজানের নাম ছিল আলী রেজা। তিনিও দেওয়ান এবং চৌধুরী ছিলেন। আমার বড় ভাইয়ের নাম ছিল উবেদুর রেজা। বাবা আর বড় ভাই মারা যাবার পর জমিদারি যখন একলা আমার হাতে চলে যায়, তখন আর আমি হাছন রেজায় থাকি না। আমি হাছন রাজা, দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী।
আর আমাদের নামের আগে দেওয়ান কেমনে যুক্ত হলো, জানো নাকি?
না, তো। দেওয়ান কী? দেওয়ানি মামলার কথা জানি। জমিজিরাত নিয়া যেসব মামলা হয়, সেসব দেওয়ানি কি?
রত্না বলে—আমি জানি।
কী?
যারা দিওয়ানা মাস্তানা থাকে, তাদেরকে দেওয়ান বলে।
হাছন চোখ গোল করে তাকান পাশের দিকে। মেয়েটা ফাজিল টাইপের। তিনি ধরে ফেলেছেন। কাছে ডাকেন তারে। সে আসে না।
বলে, আপনার মতলব ভালো না। চোখও ভালো না। এখন আপনার সেই সময় নাই। এখন বিপদ আছে, সাবধানে থাকুন। হাতে ধরে টান মারলেও যৌন নির্যাতন মামলায় ফেঁসে যাবেন। আপনার সেই ক্ষমতা, সেই ধন আর নাই যে, কোর্ট-কাছারি, উকিল মোক্তার কিনে আপনি বেরিয়ে আসবেন।
হাছন তাকান আকাশের দিকে। কথা বলেন না। আকাশ বলে, আপনাদের দেওয়ানা হবার গল্প বলেন।
আমার দাদার দাদা রাজা বানারসী রাম সিংহ দেব ছিলেন প্রথম দেওয়ান। বাংলার শেষ নবাবী শেষ হবার দু-বছর আগে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর দু-বছর পর সিরাজউদ্দৌলা মারা গিয়েছিলেন। জানো তো, সিরাজের ক্ষমতা হারানোর পর ধীরে ধীরে ইংরেজের হাতে এই পুরো ভারতবর্ষ চলে আসে। তখন আমাদের এই পূর্ব পুরুষেরা ইংরেজের কাছে জমির খাজনা পৌঁছে দেবার দায়িত্ব নেন। আমার দাদা আনোয়ার খানকে সিলেটের এক পরগণার খাজনা আদায়কারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। যারা খাজনা সংগ্রহ করতো তারা টুএন্টি ফাইভ পার্সেন্ট কমিশন পেতো। এই টুয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট মানে চার আনা, ষোলো আনার চার আনা, এক চতুর্থাংশধারীদেরকে চৌ-ধারী বা চৌধুরী বলা হতো। এই খাজনা আদায়ের কাজ বংশপরমপরায় চলতো বলে বংশপরমপরা জুড়ে সবাই নিজের নামের শেষে চৌধুরী লিখতেন। যিনি চৌধুরী, তার ছেলে চৌধুরী তার নাতি চৌধুরী, তার চৌদ্দ গোষ্ঠী চৌধুরী। এ রকম, যিনি জমিদারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে তালুকের খাজনা আদায় করতেন, তিনি হতেন তালুকদার। আবার বড় পরগণার খাজনা আদায়ের বন্দোবস্ত যিনি করতেন তাকে দেওয়ান বলা হতো। ইংরেজ আমলের প্রথমে কয়েকজনকে চৌধুরী খেতাব দেওয়া হলেও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা দশসনা বন্দোবস্তের পর এই খেতাব দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে যারা বছরে পাঁচশত টাকার বেশি খাজনা সরকারের তহবিলে জমা দিতে পারতেন তাদেরকে বলা হতো জমিদার। আর পঞ্চাশ টাকার বেশি যারা দিতেন তারা হতেন মিরাশদার। এর নিচে যারা খাজনা দিতেন, তারা তাপাদার, তালুকদার, এমন ছিলেন। সুতরাং যার অধীনে যত বেশি জমির লিজ নেওয়া, সে তত বেশি খাজনা নিতে পারে আর তার অংশ সরকারের তহবিলে দিতে পারে। যে যত বেশি দেবে, সে সরকারের তত প্রিয়ভাজন। তার জন্য যত রকমের সম্মান, পদবি দেওয়া যায়, ব্রিটিশ সরকার তা দিয়ে দিত। কারণ এইসব সামন্ত প্রভূদের হাতে রাখতে পারলেই তারা রাজকোষাগার বড় করতে পারত। আর তখন এক টাকারও অনেক মান। ৪ কৌড়িতে হতো সান্তা, ৪ গ্লায় ১ পয়সা, ২০ পয়সায় ১ আনা, ১৬ আনায় ১ টাকা বা কাহন। এসব খাজনা জমা পড়ত সব ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনারের অফিসে। হাছনের জন্মের সময় ডেপুটি কমিশনার ছিলেন মিস্টার মজি।
আপনার পিতাজী নাকি গোস্বা করেছিলেন ইংরেজ কালেক্টরের কাছে? তিনি নাকি খালি চৌধুরীতে সন্তুষ্ট ছিলেন না?
আলী রেজা আগে চৌধুরী লিখতেন। পরে ব্রিটিশ কালেক্টরের কাছে আর্জি জানালেন যে, অনেক চৌধুরীর চেয়ে তার বন্দোবস্তে জমির পরিমাণ অনেক বেশি। তাকে শুধু চৌধুরী বললে মানায় না, আর কিছু চান তিনি। তখন বলা হলো, ঠিক আছে, আপনি দেওয়ান এবং চৌধুরী দুইটাই। যদিও দুইটা শব্দের একই মানে এবং একই কাজ, তারপরেও ফুটানি মারার জন্য এমনটা তখন চাওয়াই হয়েছিল।
আচ্ছা, এই দেওয়ান, চৌধুরী, এসবের স্ত্রীলিঙ্গ নাই? মহিলারা কেউ এই পদবি পেত না? প্রশ্ন করে রত্না।
মজার ব্যাপার, মহিলারা কেউ কিন্তু তখন এই উপাধি লিখতেন না। না আমার মা, কোনো স্ত্রী বা কন্যা।
কিন্তু এখন তো লিখছেন।
সেসবে শেষ হয়েছে তো বহু আগে।
এখন তবে দেওয়ান-চৌধুরী কেন?
তোমার বাবা কী করেন?
আমার বাবা আর্কিটেক্ট।
তিনি কি নামের সাথে এটা লিখেন?
জি
তুমি কী লিখো তোমার নাম?
মো. সাইদুর রহমান
কেন? আর্কিটেক্ট মো. সাইদুর রহমান কেন লিখো না?
আমি ত আর আর্কিটেক্ট না।
তাহলে যারা দেওয়ান লিখে তাদের গিয়ে জিগ্যেস করো, তারা কিসের দেওয়ানি করে, কার দেওয়ান তারা?
আচ্ছা, ওস্তাদ, একটা জিনিস কন তো দেখি। আপনার এই রাজাগিরির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদানটা কার?
হাছন কথা বলেন না। তিনি চুপ করে থাকেন। এক সময় পাশের একটা নৌকার পেছনের গলুই দেখিয়ে এক লোকের দিকে আঙুল ইশারা করেন। বলেন—উনার সাথে কথা বলো, সব খবর পাবা।
আট :ছহিফাকথন
চারু ভিড়বাট্টা দেখে আর হাছনের নৌকায় যায় না। সে ফেরত আসে ছইফার কাছে। এই কবির কাছ থেকে তার অনেক কিছু জানার আছে । পাশে এসে বসে। সাংবাদিকের মতো প্রশ্ন করে—দিদি আমরাতো আপনাকে কবি হিসেবে জানি। ১৮৫১ সালের আগে আর কোন বাঙালি মুসলমান কবি ছিলেন নাকি?
সে আমি জানি না। কবিতা লেখা আমাদের পরিবারের চর্চা ছিল। আমাদের বড় ভাই উবেদুর উর্দু, আরবি, ফার্সি জানতেন। তিনিও বাংলা, উর্দু, ফার্সিতে কবিতা লিখেছেন। আমাদের বাবাও কবিতা লিখতেন। দেখাদেখি আমিও লিখতাম। আমার বই ছিল তিনখানা। বাংলায় দুইটা, উর্দুতে একটা। বাংলা কবিতার বইয়ের নাম ছিল ‘ছহিফা সংগীত’ আর ‘ছাহেবানের জারি’ আর ‘ইয়াদগারে ছহিফা’ ছিল আমার উর্দু ভাষার কবিতার বই। আমি নাগরী জানতাম। কিছু ইংরেজিও। রানি ভিক্টোরিয়াকে আমি একবার চিঠি লিখেছিলাম। চিঠির সঙ্গে সিলেটের একটা শীতল পাটিও পাঠিয়েছিলাম। রানি আমার চিঠির জবাব দিয়েছিলেন।
বাহ! কিন্তু হাছনের সাথে আপনার সমস্যা কী ছিল?
সমস্যা কিছু না। ওরে আমি খুব আদরও করতাম। ছোটবেলা একসাথে খেলতাম। আমারে বুবুজান বুবুজান কইয়া ডাকত। কিন্তু শেষ বয়সে এসে সম্পত্তির কারণে সে আমার কাছে অন্যরকম হয়ে যায়। এইজন্য তারে নিয়া কবিতাও লিখেছিলাম আমি হাছন রাজানে এয়সা জুলম কিয়া, এতিমকো ফুসকে লোগ আতশ মে ডাল দিয়া
উর্দুতে কেন লিখেছিলেন?
তোমরা রাগ করলে যেমন ইংরেজি বলো। বলো না?
হু
আমিও রেগে গিয়ে উর্দুতে লিখেছিলাম।
কার কারণে ছিল এই রাগ?
ওর পোলা। একলিম রেজার জন্য।
উনি কি আছেন এখানে?
না। তার চরিত্র এই নাটকে নাই। সে রামপাশায় বাবার পাশে শুয়ে আছে। এই ফিল্মে তার ক্যারেক্টার আসেনি।
আসেনি কেন?
হাছন পরিবারের সবাইকে আনা হয়নি। আমি একটু এসেছি, তার বউ-বান্ধবীরা বেশি। এজন্য সবার সাথে তোমাদের দেখা হবে না।
আচ্ছা দিদি, আপনার সাথে যে বিষয়টা নিয়ে গ্লগোল তার পেছনে কী কারণ ছিল।
কারণ পৃথিবীতে তো একটাই।
নারী ও জমি? তা-ই না!
ঠিক।
এখানে কী ছিল?
দুইটাই।
একটু খুলে বলুন।
মনিপুরের এক মহারাজা ছিলেন, নাম—টিকেন্দ্রজিত্। তিনি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। ব্রিটিশ তার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা দিয়ে দিল। অবস্থা খারাপ দেখে সে সময় তার বোন আর কন্যাকে পাঠিয়ে দেন সিলেট। কন্যা রাজকুমারী নন্দিতা রায়। অপরূপ সুন্দরী। এই দুই মেয়ে সিলেট এসে আমার সাথে থাকে। আমার বাসায় তাদের রাখি। এক সময় তার বাবা টিকেন্দ্রজিত্ ব্রিটিশের হাতে মারা গেলে তারা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়ে। হিন্দু খান্দানী বংশের মেয়ে। আদব কায়দা, লেহাজ তমিজ সব ভালো। একসময় টের পেলাম, আমার ছোটভাই মুজাফ্ফরকে সে খুব সম্মান করে। খাই খেদমত করতে চায়। মুজাফ্ফরও বলে, সে তাকে পছন্দ করে। আমি নন্দিতাকে বললাম, তুমি কি আমার ভাইকে বিয়া করবা?
সে মাথা নাড়ে।
বলি, তাহলে তো তোমাকে মুসলমান হতে হবে।
সে রাজি হয়ে যায়। আমি এই মেয়েটিকে মুসলমান বানিয়ে আমার ভাই মুজাফ্ফর-এর সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেই। তার নাম বদল করে রাখি সবুরা খাতুন। তাদের ঘরে ফুটফুটে দুই রাজকন্যার জন্ম হয়। একটার নাম রাখি নুরুন্নেছা, আরেকটা মনিরুন্নেসা।
আমাদের আরেক সত্ ভাই ছিল। আমাদের মায়ের প্রথম স্বামী রহমান খানের ঔরসে তার জন্ম। তার নাম সুলতান খান। সেই সুলতান খানের পুত্র সুবা খানের সাথে নুরুন্নেছার বিয়ে হয়।
আপনাদের বিয়েসাদী বেশিরভাগ নিজেদের আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে, তাই না দিদি?
হ্যাঁ।
এটা কেন?
এর দুই কারণ। এক—সমান খান্দান পাওয়া। আর আরেকটা বড়ো কারণ—সয়সমপত্তি নিজেদের মধ্যে রাখা। তো এই কারণেই আমার ছোট ভাইয়ের মেয়েকে আমার বৈপিত্রীয় সত্ ভাইয়ের ছেলের সাথে বিয়ে দেই, যাতে আমার মায়ের আগের ঘরের স্বামীর সমপত্তি বেহাত না হয়। বিয়ের পর তাদের এক সন্তান হয়েছিল। কিন্তু ছোটবেলায় সে মারা যায়। শুধু তাই নয়, কিছুদিন পর নুরুন্নেছা আর সুবা খান দুজনই মারা গেলে সুলতান খানের আর কোনো ভরসা থাকে না। তার সম্পত্তি আছে, কিন্তু খাওয়ার কেউ নাই। তিনি ভাবেন, এত সহায় সম্পত্তি দিয়ে কী হবে জগতে? শহরে ও গ্রামে কিছু জায়গা জমি রেখে বাকি সম্পদ ওয়াক্ফ করে তার মোতওয়ালী করে যান আমাকে। আমার বৈপিত্রীয় ভাইয়ের সমস্ত সম্পদও আমার কাছে চলে আসে। এক সময় সুলতান খানও মারা যান। মনিরুন্নেছা যখন ৭ বছরের নাবালিকা তখন আমার ছোটভাই মুজাফ্ফরও মারা যায়। এদিক থেকে অনেকগুলো সম্পত্তির মালিকানা এসে যায় আমার কাছে। আর এই সময় হাছনের চোখ পড়ে মনিরুন্নেছার ওপর। সে তার পুত্র একলিমুরের জন্য প্রস্তাব দিয়ে রাখে। আমি তখন বুঝি, মনিরুন্নেছা নয়, তার সম্পত্তির দিকেই চোখ ছিল হাছনের।
চারু বলে, সহায় সম্পত্তিতো আপনারও কম ছিল না। আপনি জমিদারি করেননি?
মেয়েরা জমিদারি করবে? এ কেমন কথা।
তাহলে পরে কী করেছে?
না তো! কোন মহিলা জমিদারের নাম বলতে পারো?
কিন্তু আপনাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেক মহিলাই তো নামের আগে দেওয়ান, নামের পরে রাজা, চৌধুরী এসব লিখেন। আপনাদের জেনারেশনের কোনো মহিলার নামের আগে এসব ছিল না। আপনারা বানু, বিবি এসব লাগাতেন কেন?
এসব মুসলমানি নাম। বানু বিবি, জান বা জাহান, এসবই ছিল। পরে কে কেন এসব লাগিয়েছে, আমরা বলতে পারি না। কারো কাজে তাকে না চেনা গেলে নাম দিয়ে তার কাজ বা পেশা বোঝানো হতো। এখনতো এসব অন্যভাবে আছে। নামের সাথে পেশাও। কিন্তু বাপের পেশা তো কন্যার ওপর বর্তায় না।
আর বাবার নামের সাথে রাজা থাকলে কন্যা কি রাজা হয়?
এসবও আছে নাকি!
আছে। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখেন। আমাদের সময় এসব ছিল না, মেয়েরা ঘরেই থাকত আর বাচ্চা পালতো। তোমাদের যখন হাইস্কুলের যাবার বয়স সে বয়সে আমাদের সময় মেয়েরা স্বামীর ঘরে চলে যেতো। তাদের বাস হতো অন্দরমহলে। তারা রান্নাবাড়া দেখবে, দাসীবাদীর খেদমত নেবে আর বাচ্চা পালবে। বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময় অনেক মহিলাই মারা যেতো। যারা মারা যেতো না তারা পরের বছর আবার মা হতো। বয়স তিরিশ হয়ে গেলে পয়সাওয়ালা স্বামীরা আর তাদের খুব কাছে আসতেন না। তারা তখন আরেক কিশোরী বিয়ে করে সতীন আনতেন তার জন্য।
সতীনদের নিয়ে কি এক ঘরে থাকতেন?
না। যার বেশি জমিজিরাত, সে আলাদা জায়গায় আলাদা আলাদা বউ রাখতো। যেমন আমাদের আব্বাজান। তিনি সিলেট শহর, বিশ্বনাথের রামপাশা, সুনাগঞ্জের লক্ষণশ্রী, তিন জায়াগায়ই তিন বিবি রেখে দিয়েছিলেন। আর যারা একটু কম পয়সাওয়ালা তারা রাখতো আলাদা বাড়িতে। তারচেয়ে কম পয়সা যাদের তারা একই বাড়িতে রাখতো একই বাড়িতে আলাদা ঘরে।
ছইফা দি, জিনিসগুলোতো এখনো আছে একইভাবে। শুধু জায়গাটা বদলেছে। আমার এমনও বান্ধবী আছে, এই বয়সে বারিধায় ফ্লাট নিয়ে একা থাকে। শুনেছি, এক ভদ্রলোক ফ্লাটটা তাকে উপহার দিয়েছে। তিনি মাঝে মাঝে ঐ ফ্লাটে গিয়ে তার কাছে থাকেন।
বিয়ে করেছে তারা?
না দিদি। করেনি। তবে সে বলছে করলে করতেও পারে। না করার চান্স বেশি। কারণ ঐ লোক বিবাহিত। বিয়ে করতে হলে আগের বউ-এর লিখিত পারমিশন লাগে। না হলে মামলা হলে এই লোক ফেঁসে যাবে।
আমি তোমাদের এই সময়ের ঘটনা জানি না।
আচ্ছা হাছনের কী এমন ছিল?
ওর তো নয়টা বউ ছিল কাবিন করা। আর কোথায় কী ছিল তার কিছু শুনছি। কিন্তু দেখেনি। তবে একটা কথা কী জানো যে, আমাদের সবচেয়ে বড় ভাই অল্প বয়সে মারা না গেলে এই পরিবারের কাহিনি অন্যরকম হতো। কিংবা তিনি নিজেই একটা লিজেন্ড হয়ে যেতেন।
তাঁর কথা বলুন দিদি।
তাঁর নাম ছিল উবেদুর। তিনি আমার থেকে কুড়ি বছরের বড়। আমার বয়স যখন ঊনিশ, তখন তিনি অল্প বয়সে মারা যান।
কত ছিল বয়স?
মাত্র ঊনচল্লিশ বছর।
সেই বয়সেই তো তাঁর আসল কাজ দেখানোর সময় ছিল। সে বাবার জমিদারি দেখতো।
আপনার বাবার জমিদারিতো রামপাশায়?
কিন্তু আমি আর আমার ছোট ভাই কিন্তু রামপাশায় থাকতাম না। আমরা থাকতাম সিলেট শহরে শেখঘাটের কুয়ার পারে। এ জায়গাটা আমার মা নুরু বিবির ছিল। সেখানে আমাদের বাস। আমাদের শহরের বাড়িতে তখন বড় ভাই উবেদুর আসতেন, থাকতেন। তিনি কবিতা লিখতে পারতেন উর্দু আর ফার্সিতে। মুখে মুখে কবিতা বানাতেন। গানও গাইতেন। নাচ-গানের আসর করতেন। তার সঙ্গে খাতির ছিল ঢাকার নবাবের।
তিনি কি আপনার বাবার প্রথম ঘরের ছেলে?
না। আমার বাবার প্রথম স্ত্রীর ঘরে কোনো সন্তান হয়নি। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আমাদের বড় মা মারা যাবার পর বাবা পণ করেছিলেন আর বিয়ে করবেন না। তিনি তখন পাগলের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকেন। এ সময় ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়ে তিনি এক ফকিরের মুরিদ হয়ে যান। সেই ফকির যেখানে যায়, তিনিও সেখানে। ফকির যেখানে ঘুমায়, বাবাও সেখানে ঘুমান। জমিদারি, দেওয়ানি এসবের কোনো কিছুতেই তার মন নেই। কখনো বাজারে, কখনো গাছতলায়, কখনো রাস্তার ধারে, নদীর কিনারে বাবাকে দেখা যায়। একদিন তার পীর সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাবাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করেন। বলেন, ব্যাটা, তুই ইনো কিতা লাগি। তুই তোর বাড়িত যা। আমি খাবো দেখছি, তোর আওলাদে দুনিয়া ভরি যার। তুই বাড়ি যা। বিয়া কর।
বাহ! পীরের কথায় বিয়ে!
এই ঘটনার পর বাবা ফেরত আসেন রামপাশায় তার বাড়িতে। বিয়েতে মত দিলে আরেক দেওয়ান কন্যা নফিজা বানুকে বিয়ে করেন। আমাদের দুই নম্বর মাতাজী নফিজা বানুর ঘরে জন্ম হয় আমাদের সবচেয়ে বড় ভাই উবেদুর। এই মার ঘরে আর কোনো সন্তান নাই। বাবা এরপর তিন নম্বরে যে মাকে ঘরে আনেন তার গর্ভে জন্ম আমার আর মুজাফ্ফরের।
আপনারা রামপাশার জমিদারি দেখতেন না? আপনি বা আপনার ভাই?
আমি আর আমার ছোট ভাই কিন্তু রামপাশায় থাকতাম না। আমরা থাকতাম সিলেট শহরে শেখঘাটের কুয়ার পারে। এ জায়গাটা আমার মা নুরু বিবির ছিল। সেখানে আমাদের বাস। আমাদের শহরের বাড়িতে তখন বড় ভাই উবেদুর আসতেন, থাকতেন। তিনি কবিতা লিখতে পারতেন উর্দু আর ফার্সিতে। মুখে মুখে কবিতা বানাতেন। গানও গাইতেন। নাচ-গানের আসর করতেন। তার সঙ্গে খাতির ছিল ঢাকার নবাব আব্দুল গণির। তিনি গণি সাহেবের কাছে যেতেন ফুর্তিফার্তা করতে।
তার মানে, আগের দিনের সুলতান, বাদশাহ, জমিদার এদের চিরত্রের যা যা কিছু থাকার, তার সবই তার স্কেলে তার মধ্যে ছিল। সঙ্গে ছিল ভেতরে এক ধরনের মরমিবাদ। তাই না?
গান, কবিতা লিখতেন। তবে মরমিবাদ তেমন ছিল না। নানা বিষয়েই লিখতেন। হাছনও সে রকম লিখতো, খুব বড় চিন্তা নিয়ে সেসব লেখা ছিল না। কিন্তু ছন্দ মিলিয়ে লিখে ফেলতে পারতো। সেগুলো আসলে আমাদের পরিবার থেকে শেখা। পরে অবশ্য তার গানে গভীরতা অনেক বেড়ে যায়।
আরো সময় পেলে কি তিনি বড় হাছন হতেন?
হাছন রাজাকে তোমরা যেভাবে জানো, তার সব কিছুরই আরো উন্নত সংস্করণ ছিলেন আমাদের এই বড় ভাই। তিনিও বড় শিকারি ছিলেন। নিজের হাতে বাজপাখি রেখে পাখি শিকার করতে পারতেন। তিনি অনেকগুলো হাতি, ঘোড়া পুষতেন। তার পোষা হাতির নাম ছিল চম্পা। এই হাতি চড়ে তিনি বনে জঙ্গলে শিকারে বেরোতেন। সেই হাতি তার সব ইশারা এবং শব্দ বুঝতো। অন্যকারো কথায় হাতি নড়তো না।
গল্প শুনে মনে হচ্ছে দিদি, আপনাদের এই ভাই আর হাছন যখন যেভাবে বড় হয়েছিলেন, সে সময় কলকাতা জোড়াসাঁকোতে বড় হচ্ছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথ। তাদের দুই ভাইয়ের যে বয়সের তফাত্ উবেদুর আর হাছনের সম্পর্কও তাই। হাছনের চেয়ে উবেদ ছিলেন ২২-২৩ বছরের বড়, আর জোতিরিন্দ্রের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ ১২ বছরের বড়। অবশ্য বয়সে ঐ দুজন এই দুজনের চেয়ে ছোট। হাছনের ৭ বছর পর রবীন্দ্রনাথের জন্ম।
এত হিসাব আমার জানা নাই। তবে উবেদুর আর অহিদুর গলায় গলায় মিল। অহিদুর কে?
হাছনের আগের নাম ছিল অহিদুর। বড় ভাই উবেদুরের তার নিজের নামের সাথে মিল রেখে এই নাম রেখেছিলেন। তবে বয়সের পার্থক্য অনেক ছিল। হাছনের দশ-বারো বছর বয়স থেকে দুই ভাই একসাথে ঘোড়া চড়তো, শিকার করতে যেতো। বড় ভাই গান গাইতো, গান লিখতো, ছোটভাই তা দেখতো। সেও দুই চার লাইন বানাতো মুখে মুখে।
জ্যোতিরিন্দ্র আর রবীন্দ্রনাথ যেমন।
কিন্তু ওদের নিশ্চয়ই ওতো বিয়া ছিল না। কারণ হিন্দু ধর্মে একের বেশি বিয়া নাই। তবে তোমার কথা শুনে আমার এইমাত্র মনে হলো—ঐ দুই ভাইয়ের সাথে এই দুই ভাইয়েরও কাকতালীয় অনেক মিল আছে। রবীন্দ্রনাথের সাথে মধুর সম্পর্ক ছিল তার বৌদির। কিন্তু হাছনের সাথে এসব কিছুই ছিল না তার ভাবীর। রবীন্দ্রনাথের দুই বছরের বড় ছিলেন তাঁর বৌদি কাদম্বরী। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন বিয়ে করেন তাঁর কিছুদিন পর বৌদি আত্মহত্যা করেন।
হাছনের বয়সে বড় ছিল সাজিদা, উবেদের বউ। এক সময় সাজিদাকে হাছন বিয়া করে।
তাই!
কিন্তু এটা আবার প্রেম-পিরীতির জন্য না, আমার মনে হয়েছিল ঐ সমপত্তির জন্যই।
উবেদুরের কয় বিয়া?
উবেদুর ভাইয়ের দুই বিয়া। প্রথম স্ত্রী সন্তান প্রসবের পর মারা যান। দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে বিয়ে করেন সাজিদা বানুকে। তার গর্ভে এক সন্তান হয়। সন্তানের আড়াই বছরের মাথায় উবেদুর মারা যান। তখন তার বয়স চল্লিশও হয় না।
উবেদুর মারা যাবার পর তার বউ সাজিদাকে বিয়ে করে হাছন। সাজিদার গর্ভেই একলিমের জন্ম। তবে বড় ভাই উবেদুরের মৃত্যুটাই এই পরিবারের গল্প অন্যদিকে নিয়ে গেল। অনেকে বলে থাকেন, বাবার বড় একটা অভিশাপ লেগেছিল তার ওপর। এই অভিশাপই আলী রাজা আর উবেদুর রাজার কাহিনি ভুলিয়ে দিয়ে হাছন রাজার কাহিনির সূচনা করে। v
