গল্প

দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ১৯:৫৪

ম্যানেজিং ডিরেক্টর আসলাম সাহেবের কামরায় ঢোকার আগে কামাল একবার বিড়বিড় করে আল্লাহকে ডাকলেন। ‘আল্লাহ, সারা জীবন দ্বিতীয় হয়ে এসেছি। এবার যেন দ্বিতীয় না হই! হে অদ্বিতীয় স্রষ্টা, একটিবারের জন্য আমাকে প্রথম হবার সুযোগ দাও!’

আসলাম সাহেবের কামরাটা খুব সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালের নীল রং চোখ জুড়িয়ে দেয়। সারা ঘরে শীত শীত ভাব আর নীরবতা। কামাল তবু উত্তেজনায় টান টান হয়ে আসলাম সাহেবের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আসলাম সাহেব ল্যাপটপ কম্পিউটারের স্ক্রিনে কিছু একটা পড়ছেন। তাঁকে ইশারায় বসতে বললেন।

সতর্কভাবে চেয়ারে বসে কামাল সামনে তাকালেন। আসলাম সাহেবের বাম হাত টেবিলের ওপর রাখা, হাতের কাছেই ২০১৯ সালের ডেস্ক ক্যালেন্ডার। সে দিকে তাকিয়ে কামালের মনে পড়ে গেল, তাঁর বয়স এখন পঞ্চাশ। জীবনের অনেকটা পথ তিনি পার করে এসেছেন।

তাঁকে মিনিটখানেক অপেক্ষায় রেখে আসলাম সাহেব অবশেষে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে মুখ তুললেন। কামাল তাঁর মুখে দেখেই বুঝলেন, কোনো সুসংবাদ তিনি পাবেন না।

‘কামাল সাহেব, লন্ডন থেকে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। অনেক বিবেচনা করে ওঁরা ইন্তেখাব সাহেবকেই কাঠমান্ডু অফিসের দায়িত্ব দিয়েছে। আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে আপনাকে খবরটা জানানোর। গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর বললেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়নি। ইন্তেখাব সাহেব আর আপনার স্কোর প্রায় সমান সমান ছিল, তবে এর আগে দেশের বাইরে কাজ করার অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে ইন্তেখাব সাহেবকেই ওঁরা বেছে নিয়েছে।’

কামাল না চাইতেও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি এই আশঙ্কাই করেছিলেন। ইন্তেখাব প্রথম হয়েছেন। তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন। বরাবর যেমন হয়ে আসছে।

আসলাম সাহেব সহানুভূতির গলায় বললেন, ‘মন খারাপ করবেন না কামাল সাহেব। সামনে আরো অনেক সুযোগ আসবে। এইবার অল্পের জন্য হলো না। পরের বার হয়ে যাবে। তাছাড়া এখানে আপনি খারাপ তো নেই!’

কামাল শুকনো হাসি হাসলেন। না, খারাপ কোথায়? মেজর ইলেকট্রনিক্সের সেলস ডিরেক্টরের চাকরি অনেকের জন্যই খুব লোভনীয়। এই অফিসেই তো কত সিনিয়র ম্যানেজার ঈর্ষার দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন, কামাল জানেন। কথা সেটা নিয়ে নয়। কথা হলো প্রথম হতে না পারা নিয়ে। কাঠমান্ডুতে মেজর ইলেকট্রনিক্স তাদের একশ পঞ্চাশতম অফিস খুলছে। এই যাত্রায় মনোনীত হতে পারলে কামাল হতেন নেপালে মেজর ইলেকট্রনিক্সের প্রথম ম্যানেজিং ডিরেক্টর। তা আর হলো কই?

প্রথম হওয়ার ব্যাপারে কামালের বাড়াবাড়ি রকম আগ্রহ আছে। তাঁর বন্ধু সাজেদ এটাকে নাম দিয়েছেন ‘অবসেশন’। কিন্তু সাজেদ কামালের অতীত সম্পর্কে বেশি কিছু জানেন না। জীবনে যে বরাবর দ্বিতীয় হয়ে আসছে, প্রথম হওয়ার ব্যাপারে তার খুব তীব্র আগ্রহ তৈরি হতেই পারে। এই কথাটা কেউ বুঝতে চায় না। কামাল যাঁর কাছেই এ নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন, তিনিই এটাকে দুঃখবিলাস বা বাতিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাই আজকাল আর কামাল এ নিয়ে কারো কাছে মুখ খোলেন না।

কামাল আসলাম সাহেবকে বললেন, ‘জি স্যার, আমি ভালো আছি। মন খারাপ হয়নি, এটা বললে মিথ্যা বলা হবে। তবে আপনার কথাও ঠিক, সুযোগ আবার আসবে। আপনি অনুমতি দিলে আমি কয়েক দিনের ছুটি নিতে চাই!’

আসলাম সাহেব উদারভাবে অনুমতি দিলেন। ‘ছুটি নেন। ফ্যামিলির সঙ্গে কোথাও থেকে ঘুরে আসেন। দেখবেন, ভালো লাগবে! তবে মার্চের নয় তারিখে আমরা ইন্তেখাব সাহেবকে বিদায়-সংবর্ধনা দিচ্ছি। তার আগেই আপনি ফিরে এলে ভালো হয়। না হলে এই নিয়ে অফিসে নানা কথা হবে।’

মার্চের নয় তারিখ এখনো দুই সপ্তাহ দূরে। কামালের অত ছুটির দরকার নেই। তিনি আসলাম সাহেবকে আশ্বস্ত করে বেরিয়ে এলেন।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে চায়ের টেবিলে বসে কামাল তাঁর স্ত্রী নাফিসাকে খবরটা দিলেন। ‘কাঠমান্ডুর পজিশনটা আমি পাইনি। কোম্পানি ইন্তেখাবকেই দিল। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে! ছেলেমেয়েরা কাঠমান্ডুতে যেতে চায় না, আর একা গিয়ে আমিও নানা অসুবিধায় পড়ে যেতাম।’

নাফিসা একটু দুঃখিত গলায় বললেন, ‘ইন্তেখাব ভাইকেই দিল! তোমার এত ইচ্ছা ছিল ম্যানেজিং ডিরেক্টর হবে।’

মুখোমুখি বসে মাত্র দুই হাত দূর থেকে নাফিসাকে দেখতে দেখতে কামালের মনে হলো, নাফিসার দুঃখবোধটা আন্তরিক। তিনি চেয়েছিলেন কামাল কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী হয়ে উঠুক, নেপালে কিংবা অন্য যেকোনো দেশে হলেও। টাকা-পয়সা বা ক্ষমতার জন্য ততটা হয়তো নয়, সেসবের অভাব তাঁদের নেই। কিন্তু সব নারীই হয়তো তার নিজস্ব পুরুষটিকে কোনো একটি ক্ষেত্রে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে দেখতে চায়। কামাল কোনো চূড়ায় উঠতে পারেননি, বরাবর চূড়ার ঠিক নিচ পর্যন্ত এসেই তাঁকে বিদায় নিতে হচ্ছে।

সন্ধ্যার এই কথোপকথনের জের ধরেই কিনা কে জানে, রাতে বহুদিন পর নাফিসা নিজে থেকেই কামালকে শরীরের আহ্বান জানালেন। সে আহ্বানে সাড়া দিতে দিতে কামাল ভাবতে লাগলেন, এটা সান্ত্বনা পুরস্কার না বিশুদ্ধ করুণা? তাঁর আরো মনে পড়ে গেল, নাফিসার জীবনেও তিনি প্রথম পুরুষ হতে পারেননি। তাঁর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার আগে নাফিসা ভালোবেসেছিলেন এক সহপাঠীকে। সেই সহপাঠী সাহস করে নাফিসাকে নিয়ে সংসার শুরু করতে পারেনি। মা-বাবার চাপাচাপিতে নাফিসা কামালকে বিয়ে করেছেন, কামালের স্ত্রী এবং তাঁর দুই সন্তানের মা হিসেবে সব দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করেছেন। কিন্তু কামাল নানা ঘটনায় টের পেয়েছেন, প্রথম প্রেমিককে হারানোর দুঃখ নাফিসা মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি। তাঁর সন্দেহ, নাফিসার মনের গভীরতম প্রদেশে তিনি আজ পর্যন্ত একজন অনুপ্রবেশকারী—এক দ্বিতীয় পুরুষ।

দিন চারেক পরে, ছুটির প্রথম দিনে কামাল একটা অব্যবহূত নোটখাতা নিয়ে বসলেন। ক্রমাগত দ্বিতীয় হওয়ার বেদনা তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, জীবনে কতবার তিনি প্রথম হওয়া থেকে অল্পের জন্য বঞ্চিত হয়েছেন, তার একটা তালিকা বানাবেন।

বাড়ি আজকে ফাঁকা। নাফিসা দুই ছেলেমেয়ে নাহিন-নাদিয়াকে নিয়ে খালাতো বোনের মেয়ের গায়ে-হলুদের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে নাস্তার পরেই বেরিয়ে পড়েছেন। ড্রাইভার বারেক তাঁদের সঙ্গে গিয়েছে। কামাল নির্জন বাড়িতে ভলিউম বাড়িয়ে রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে দিলেন। বেহালার করুণ সুরের সঙ্গে সঙ্গে সুচিত্রা মিত্রের গলা ছড়িয়ে পড়ল সারা ঘরে, ‘তুমি মোর পাও নাই পাও নাই পরিচয়।’

হাতের কলমটা নোটখাতার ওপর বুলিয়ে কামাল লিখতে শুরু করলেন। প্রথমে লিখলেন একটা শিরোনাম ‘জন্ম’। নিচে লিখলেন ‘দ্বিতীয় পুত্র’। কামালের জন্মের তিন বছর আগে তাঁর বড় ভাই জহির জন্মেছিলেন। জহির মারা গেছেন বছর দুয়েক আগে। এক চাচার লাশ বহনকারী গাড়ির সঙ্গে সিলেট যাচ্ছিলেন। পথে দুর্ঘটনা ঘটল, চাচাকে কবর দিতে যাওয়া জহির নিজেও লাশ হয়ে ফিরে এলেন। মৃত্যুর পরেও তিনিই কামালের মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে বাড়ির ‘বড় ছেলে’ হয়ে আছেন। ছোট দুই ভাইবোন আলিম আর ফাতেমা এখনো কামালকে ‘মেজো ভাই’ বলেই ডাকেন। কামাল জানেন, এই আবেগ যুক্তিহীন, তবু মাঝে মাঝে তাঁর মনে হয়, বড় ভাই জহির আগে জন্ম নিয়ে জন্ম থেকেই তাঁকে দ্বিতীয় হওয়ার একটা প্যাঁচে ফেলে দিয়েছেন। দিনে দিনে সেই প্যাঁচ আরো জটিল হয়েছে।

কপালে ভাঁজ ফেলে কামাল আরেকটা শিরোনাম লিখলেন। ‘পড়াশোনা’। তার নিচে লিখলেন ‘আজীবন দ্বিতীয়’। ছোট শহরের জেলা স্কুলে কামাল পড়াশোনা করেছেন। ভালো ছাত্র হিসেবে সেখানে তাঁর সুনাম ছিল। কিন্তু কখনো ফার্স্ট হতে পারেননি। ক্লাসে সবসময় ফার্স্ট হয়েছে সমীরণ ঘোষ। সমীরণের সঙ্গে কামালের অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব ছিল। স্কুলে দুজন ছিলেন প্রায় হরিহর আত্মা, কিন্তু ক্লাস টেনে উঠে দুজনের বন্ধুত্ববিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। ক্লাস নাইনের ফাইনাল পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর, কামালের মনে পড়ল, প্রথমে ঘোষণা হয়েছিল, কামাল প্রথম হয়েছেন। কামাল খুব আনন্দিত হয়েছিলেন। সমীরণ গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, ‘হতেই পারে না। হিসাবে গোলমাল হয়েছে!’

শিক্ষকেরা সমীরণের আপত্তি শুনে একটু ক্ষুণ্নমনেই আবার নম্বর মিলিয়ে দেখেছিলেন। আশ্চর্য কাণ্ড! উচ্চতর গণিতের নম্বর হিসাব করার সময় কী যেন একটা গোলমাল হয়ে গিয়েছিল, আবার যাচাই করতে গিয়ে ধরা পড়ল। ভুল সংশোধন করার পর দেখা গেল সমীরণ-ই এক নম্বরের ব্যবধানে ফার্স্ট হয়েছেন। কামাল আবারও সেকেন্ড।

সেদিন সমীরণ কামালকে বলেছিলেন, ‘তুই হলি সেকেন্ড বয়। সেকেন্ড বয়দের কেউ মনে রাখে না!’

এই নিয়ে রাগারাগি, তার থেকে কথা বন্ধ, মাধ্যমিক পরীক্ষার পর থেকে মুখ দেখাদেখি, যোগাযোগ বন্ধ। কিন্তু সমীরণের ওই কথাটা কামালকে এখনো তাড়িয়ে ফেরে। ‘সেকেন্ড বয়দের কেউ মনে রাখে না!’

জেলা স্কুল থেকে এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে কামাল অকূল সাগরে পড়ে গিয়েছিলেন, ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়ার চিন্তাও করেননি আর। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর আবার তাঁর সামনে সেই সম্ভাবনা উঁকি দিল। ক্লাসের নিষ্ঠাবান, মনোযোগী ছাত্র কামাল অধ্যাপকদের প্রিয় ছিলেন, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাচ্ছিলেন। কিন্তু অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার মাসখানেক আগে দুর্ঘটনা ঘটল। বাড়ির গোসলখানায় পা পিছলে পড়ে গিয়ে কামাল হাত ভেঙে ফেললেন। পরীক্ষা দিতে বসলেন বটে, কিন্তু প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। তাঁর সহপাঠী ও প্রেমিকা মনিরা আমিন তাঁকে টপকে গেলেন। তিনি অনার্সেও প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হলেন, মাস্টার্সেও কামাল আর তাঁর সঙ্গে পেরে উঠলেন না। মনিরা উচ্চতর শিক্ষার জন্য মার্কিন দেশে পাড়ি জমালেন। মনিরা-কামালের প্রেম একসময় ক্যাম্পাসে সহপাঠীদের আলোচনা ও ঈর্ষার বস্তু ছিল। কিন্তু অনার্সের ফল বেরোনোর পর থেকেই কামাল হীনম্মন্যতায় ভুগছিলেন, মনিরাও কামালের কাছ থেকে একটু একটু করে দূরে সরে গেলেন। কামালের আত্মসম্মানবোধ তীব্র, তিনি মনিরার কাছে অনুনয় করেননি, তাঁর কাছে কৈফিয়ত দাবি করেননি। নিজেও সম্পর্ক থেকে সরে এসেছেন।

ছাব্বিশ বছর পরেও সেই সময়ের কথা মনে করে কামালের মন খারাপ হয়ে গেল। তাঁর মন বুঝতে পেরেই যেন সাগর সেন গাইছেন, ‘সেই ভালো সেই ভালো, আমারে না হয় না জানো, সেই ভালো সেই ভালো।’

কামাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার লিখলেন ‘চাকরিজীবন’।

কামালের প্রথম চাকরি ছিল বিখ্যাত বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ফ্রেঞ্চ-কানাডিয়ান টোব্যাকোতে। কর্পোরেট জগতের জাঁকজমক কামালকে খুব টানত। এফসিটি কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে তিনি খুব উল্লসিত হয়েছিলেন। স্বপ্ন দেখতেন, একদিন এই কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী হবেন। উদয়াস্ত খাটতেন, নিজেকে নিংড়ে দিতেন। সুনামগঞ্জ, রংপুর, পটুয়াখালিতে দিনের পর দিন ঘুরে বেড়িয়েছেন সিগারেটের বিক্রি বাড়ানোর নেশায়। এক-দুই করে পদোন্নতির ধাপ পেরিয়ে যখন সেলস ম্যানেজার পদের ঠিক নিচে এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর সামনে মাত্র আর একজন প্রতিদ্বন্দ্বী। মুরশেদ হাসনাইন। মুরশেদ তাঁরই মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, কাজে দক্ষ ছিলেন, আর বাড়তি যোগ্যতার মধ্যে ছিল তাঁর চেহারা। বাঙালি পুরুষদের মধ্যে অত রূপবান মানুষ সহজে দেখা যায় না। চূড়ান্ত বিচারের সময় দেখা গেল, মুরশেদ সেলস ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন, কামাল বাদ পড়েছেন।

তখন কামালের বয়স ছত্রিশ। আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে ফ্রেঞ্চ-কানাডিয়ান টোব্যাকো ছেড়ে তিনি চলে এলেন মেজর ইলেকট্রনিক্সে। সেখানেও গত চৌদ্দ বছর অনেক সাধনায় নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছেন, সেলস ডিরেক্টর পদ নিজের করে নিয়েছেন। কিন্তু এখানেও তাঁকে দ্বিতীয় হয়েই থাকতে হলো। আসলাম সাহেব সব সময়েই তাঁর ওপরে ছিলেন, তিনিই বাংলাদেশে এই বহুজাতিক কোম্পানির প্রথম ম্যানেজিং ডিরেক্টর হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। আর নেপালে যে একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, সেটাও চলে গেল তাঁর সমসাময়িক মার্কেটিং ডিরেক্টর ইন্তেখাবের হাতে।

‘চাকরিজীবন’ শিরোনামের নিচে কামাল লিখলেন, ‘কাছে তবু দূরে।’ লিখেই ভ্রু কুঁচকে লেখাটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁর বিষম বিরক্ত লাগছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এখন গাইছেন, ‘তোমায় গান শোনাব।’ এই প্রিয় গানটা শুনেও কামালের মন ভালো হলো না। তিনি গান বন্ধ করে দিলেন।

খালাতো বোনের মেয়ের বিয়ের ব্যস্ততা শেষ হওয়ার পর নাফিসা একদিন কামালের নোটখাতা আবিষ্কার করলেন। কামাল ততদিনে ছুটি শেষ করে অফিসে ফেরত গিয়েছেন। নাফিসা পাতা উলটে পড়লেন ‘দ্বিতীয় স্থান’ পাওয়া নিয়ে কামালের দুঃখবোধের কথা। যাবতীয় দ্বিতীয় স্থানের এক অদ্ভুত তালিকাও পাওয়া গেল।

খেলাধুলা :স্কুল দাবায় দ্বিতীয়। বিশ্ববিদ্যালয় আন্তঃবিভাগ ক্রিকেটে রানার্স আপ। অফিস টেবিল টেনিসে দ্বিতীয় স্থান।

পারিবারিক অবস্থান :মেজো সন্তান, মেজো জামাই।

ফ্ল্যাট বরাদ্দ :লটারিতে দ্বিতীয়।

প্রথম গাড়ি :সেকেন্ড-হ্যান্ড টয়োটা স্টেশন ওয়াগন।

নোটখাতা পড়া শেষে নাফিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। কামাল কি মধ্য বয়সের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন? এই কারণেই কি তাঁকে আজকাল এত বিমর্ষ লাগে? তিনি মানুষটাকে কিভাবে সাহায্য করবেন?

নাফিসা উঠে গিয়ে কম্পিউটারে বসলেন। অন্তর্জালে একটু খোঁজাখুঁজি করা দরকার। এই রকম সমস্যা আর কারো হয় কি না, হলে তাঁদের কিভাবে সাহায্য করা হয়, তা নিয়ে কিছু একটা পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই।

ইন্তেখাবের বিদায়-সংবর্ধনার দিন কামাল তাঁকে আন্তরিকভাবেই অভিনন্দন জানালেন। দীর্ঘদিনের সহকর্মী তাঁরা। মানুষ হিসেবে ইন্তেখাব অত্যন্ত সজ্জন। কামাল তাঁকে পছন্দ করেন।

ইন্তেখাব অন্যদের কান বাঁচিয়ে তাঁকে নিচু গলায় বললেন, ‘কামাল ভাই, আপনার মনে দুঃখ দিয়েছি। মাফ করে দিয়েন!’

কামাল বললেন, ‘কী যে বলেন! আপনি পেয়েছেন, এই জন্য আমি খুশি। কাঠমান্ডু অফিসের দায়িত্ব একজন যোগ্য লোকের হাতেই থাকল!’

ইন্তেখাব বললেন, ‘আমার ধারণা আপনি এর চেয়েও বড় সুযোগ পাবেন।’

কামাল হাসলেন, কিছু বললেন না।

ইন্তেখাবের বিদায়-সংবর্ধনার পরের দিন ছিল শুক্রবার। নাফিসার চাপাচাপিতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে কামালকে যেতে হলো গাজীপুরের ‘আরণ্যক’ রিসোর্টে। সেখানে নাফিসা ও কামালের আর সব ভাইবোন পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছেন। পারিবারিক বন্ধুরাও কেউ কেউ সপরিবারে এসেছেন। সেখানে সবার হইচই, আড্ডায় সময় মন্দ কাটছিল না। বিশেষ করে আট থেকে আঠারো বছর বয়সী ছেলেমেয়ে, ভাগ্নে-ভাগ্নি, ভাতিজা-ভাইঝিদের উচ্ছ্বসিত আনন্দ দেখে কামালের মনে হচ্ছিল, সবাইকে এখানে নিয়ে এসে নাফিসা খুব ভালো কাজ করেছেন। তবে ভিড় কামাল বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারেন না। একসময় তিনি বেরিয়ে এসে রিসোর্টের কফি কর্নারে ঢুকলেন। কড়া এক কাপ কফি দরকার।

কামাল কফিতে চুমুক দিতে না দিতেই রাকিব রায়হান নামের এক ভদ্রলোক এসে কফি কর্নারে ঢুকলেন। রাকিবের সঙ্গে কামালের আজই পরিচয় হয়েছে। ভদ্রলোকের শক্ত-পোক্ত চেহারা, মাথা নিখুঁতভাবে কামানো। ইনি কিভাবে যেন তাঁর সম্বন্ধীর সঙ্গে পরিচিত। পেশায় একজন মোটিভেশনাল স্পিকার। আজকের এই প্রায়-পারিবারিক জমায়েতে একাই এসেছেন এবং দ্রুতই সকলের সঙ্গে পরিচিত হয়ে এমন ভাবে আড্ডায় মিশে গিয়েছেন, যেন তিনি সবার বহুদিনের পূর্ব-পরিচিত। তাঁকে দেখে নিজের অজান্তেই কামালের ভ্রু একটু কুঁচকে গেল। মোটিভেশনাল স্পিকারদের সম্পর্কে কামালের তেমন উচ্চ ধারণা নেই। তাঁর মনে হয়, মানুষের ভেতরকার অহমকে বাড়িয়ে তোলা ছাড়া, কিছু অযোগ্য লোককে নিজের সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী করে তোলা ছাড়া এঁরা তেমন কিছু করেন না।

রাকিব কাছে এসে বললেন, ‘ব্ল্যাক কফি খাচ্ছেন? ব্ল্যাক কফি আমারও খুব প্রিয়!’

কামাল ভদ্রতা করে বললেন, ‘বসে পড়েন!’ ওয়েটারের দিকে হাত-ইশারা করলেন, ‘এই যে ভাই, ওনাকেও এক কাপ ব্ল্যাক কফি দেন!’

রাকিব একটুও আপত্তি না করে কামালের মুখোমুখি বসে পড়লেন। তাঁর সঙ্গে কফির ইতিহাস নিয়ে গল্প শুরু করলেন। শেখ ওমর নামের এক ইয়েমেনি চিকিত্সক নাকি প্রায় এক হাজার বছর আগে ঘটনাক্রমে কফি আবিষ্কার করেন। তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। নির্বাসিত অবস্থায় খিদের জ্বালায় তিনি তেতো কফি বীজ চিবিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করেন, না পেরে আগুনে ঝলসে নেন। ঝলসানো কফি বীজ শক্ত হয়ে গিয়েছিল, সেটা পানিতে সিদ্ধ করে নরম করতে গিয়ে এর গন্ধ শেখ ওমরকে মুগ্ধ করে ফেলে। সিদ্ধ পানিটুকু খেয়ে অনাহারক্লিষ্ট শেখ ওমর শক্তি-উদ্যম ফিরে পান এবং কফির ঔষধি গুণ বুঝতে পেরে এই বীজ নিয়ে আবার স্বদেশে ফিরে যান। দাবি করেন, তিনি এক প্রাকৃতিক ওষুধ আবিষ্কার করেছেন, যা ক্লান্তি-রোগের দাওয়াই। তাঁর নির্বাসন দণ্ড প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, তিনি ইয়েমেনে কফির ব্যবহার ছড়িয়ে দেন। ক্রমেই সারা পৃথিবী কফিতে আসক্ত হয়ে পড়ে। শেখ ওমরের জীবনের একটি সংকট সারা পৃথিবীর সংকট-মোচনের একটি উপায় হয়ে ওঠে।

রাকিবের গল্প বলার ভঙ্গি খুব আকর্ষণীয়। কামাল মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। এর পর কখন যে তিনি রাকিবের সঙ্গে মন খুলে গল্প করতে শুরু করেছেন, কখন যে ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আলাপ করতে শুরু করেছেন, টেরই পাননি।

সারা জীবন দ্বিতীয় হওয়া নিয়ে কামালের যে দুঃখবোধ, সেটা রাকিব খুব সহানুভূতি নিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, ‘আপনার সঙ্গে যা ঘটেছে, তাতে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। মানুষের মধ্যে একটা আদিম সত্তা আছে। সেই সত্তা প্রতিযোগিতায় বিশ্বাস করে এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে চায়। বারবার পরাজিত হলে ভেতরকার সেই সত্তা আহত হতেই পারে।’

শুনে কামাল স্বস্তি বোধ করলেন। যাক, পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ আছেন, যিনি তাঁর দুঃখ বুঝবেন।

আলোচনাটা দীর্ঘ হলো। জুম্মার নামাজের পর দুপুরের খাবার টেবিল, এমনকি বিকেলের চায়ের আসরেও গড়াল। কামাল মন উজাড় করে তাঁর যাবতীয় তিক্ততা, হতাশার কথা বললেন। রাকিব মন দিয়ে শুনলেন। এক পর্যায়ে বললেন, ‘তিক্ততা ও হতাশা বিষের মতো। মনের ভেতর জমা হয়ে থাকলে শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এগুলো ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে দেখুন!’

কামাল বললেন, ‘ব্যাপারটা তো অভিশাপের মতো আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে! ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলেই পারছি কোথায়?’

রাকিব বললেন, ‘দ্বিতীয় হওয়াটাকে মেনে নিন। বহু লোকে জীবনে একবারও দ্বিতীয় হতে পারেনি। তারা হয়তো একবার দ্বিতীয় হওয়ার জন্য আকুল হয়ে প্রার্থনা করছে। আপনাকে আল্লাহ অনেক ক্ষেত্রে সফল করেছেন। প্রথম হতে না পারলেও, নানা দিকে আপনার সার্বিক সাফল্য কিন্তু খুব ঈর্ষণীয়!’

কামাল প্রায় শিশুর মতো জেদ ধরে বললেন, ‘তাই বলে কি আমি কখনোই প্রথম হতে পারব না? এটা তো স্রষ্টার অবিচার!’

রাকিব হাসলেন। শিশুকে বোঝানোর মতো করেই বললেন, ‘কোনটা ন্যায়বিচার আর কোনটা অবিচার, সেটা বোঝা কি এতই সহজ? এমন তো হতে পারে, আপনার এই যে দ্বিতীয় হওয়া, এর মধ্যেও ভালো কোনো ব্যাপার আছে?’

কামাল মানতে পারলেন না। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর রাকিবের সঙ্গে আরো গল্প হলো। হতাশা কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে রাকিব তাঁকে যে সব পরামর্শ দিলেন, সে সব কামালের পছন্দ হলো না। ব্যায়াম করে, নিজের সাফল্যের কথা খাতায় লিখে তিনি আজীবন দ্বিতীয় হওয়ার দুঃখ ভুলে যাবেন, এ কথা কামাল বিশ্বাস করেন না। কিন্তু রাকিবের সঙ্গে এই দীর্ঘ আলাপচারিতার পর নিজেকে তাঁর অনেক হালকা মনে হচ্ছে। রাকিব তাঁর হাতে একটা ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। বলে গিয়েছেন, বিমর্ষ লাগলে ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে। কার্ডটা কামাল যত্ন করে মানিব্যাগে রেখে দিয়েছেন।

বাড়ি ফেরার পথে কামালকে ফুরফুরে মেজাজে দেখে নাফিসা খুব আনন্দ পেলেন। বড় ভাইয়ের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে রাকিব আহসানকে পারিবারিক সম্মিলনের মধ্যে টেনে আনার এবং কামালের সঙ্গে তাঁকে আলাপ করিয়ে দেওয়ার আইডিয়াটা নাফিসার-ই। এর জন্য বেশ কিছু টাকা খরচ করতে হলো, কিন্তু তাতে নাফিসার দুঃখ নেই। দীর্ঘদিন সংসার করে নাফিসা এটা জানেন, কামাল একজন খাঁটি মানুষ। একজন খাঁটি মানুষকে একা একা কষ্ট পেতে দেওয়া যায় না।

এর দুই দিন পরে, রবিবারের বিকেলে কামাল অফিসের মিটিং রুমে বসে কোম্পানির সেলস এক্সিকিউটিভদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। আসলাম সাহেব তাঁকে জরুরি তলব করে পাঠালেন।

আসলাম সাহেবের ঘরে ঢুকে কামাল দেখলেন, তিনি পাংশু মুখে বসে আছেন। কামাল অবাক হয়ে বললেন, ‘স্যার, কী হয়েছে?’

‘ঢাকা-কাঠমান্ডু ফ্লাইট ল্যান্ডিংয়ের সময় ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে ক্রাশ করেছে। হতাহত অনেক। টিভিতে নাকি খবর দেখাচ্ছে!’

কামালের ধরতে একটু সময় লাগল। আসলাম সাহেব এত ভেঙে পড়েছেন কেন? আপনজন কেউ ছিল নাকি ওই ফ্লাইটে?

‘আমাদের ইন্তেখাব ওই ফ্লাইটে কাঠমান্ডু যাচ্ছিল।’

কামাল ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। তাই তো, তিনি ভুলে গিয়েছেন কেন? আজ রবিবার, আজই তো ইন্তেখাবের ফ্লাইট ছিল। আহা, বেচারা!

ইন্তেখাবের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা অনেক চেষ্টা করেও মেজর ইলেকট্রনিক্সের কর্তাব্যক্তিরা তত্ক্ষণাত্ জানতে পারলেন না। ভয়াবহ খবরটা পাওয়া গেল চব্বিশ ঘণ্টা পরে। দুর্ঘটনায় নিহত বাহান্ন জন যাত্রীর মধ্যে ইন্তেখাব আছেন, আছেন তাঁর স্ত্রী ও সন্তান।

ইন্তেখাবের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু সবাইকেই নাড়া দিল, কিন্তু কামাল যতটা কষ্ট পেলেন, অন্য কোনো সহকর্মী ততটা পেয়েছেন কি না সন্দেহ। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে সপ্তাহখানেক পরে নাফিসা মুখ ফসকে বলে বসলেন, ‘শোনো, যা হয় ভালোর জন্যই হয়। ওই ফ্লাইটে তুমিও তো থাকতে পারতে! আমরাও থাকতে পারতাম!’

কথাটা কামালকে সাংঘাতিক ধাক্কা দিল। সত্যিই তো। তিনিও ওই ফ্লাইটে থাকতে পারতেন। সে দিন রাকিব আহসানও এ রকম কী একটা বলছিলেন, ‘এই যে দ্বিতীয় হওয়া, এর মধ্যে ভালো কিছুও থাকতে পারে?’

কামালের সে রাতে ভালো ঘুম হলো না। একটা চিন্তা তাঁর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। সকালবেলায় উঠেই তিনি ফোন আর পুরনো একটা নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বর লেখার ডায়েরি নিয়ে বসলেন। তিনি জানতে চান, এই যে তিনি প্রতিবার দ্বিতীয় হয়েছেন এবং তা নিয়ে মন খারাপ করেছেন—যাঁরা প্রথম হয়েছেন, তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছে? তাঁরা কি সুখী হয়েছেন? সে সুখ কতদিন টিকেছে?

ইন্তেখাবের ঘটনা ছাড়াও অন্তত আরেকটা ঘটনায় প্রথম না হওয়া যে তাঁর জন্য সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছে, তা কামালের মনে পড়েছে। চাচার মৃত্যুর পর চাচার লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে কে সিলেট যাবেন, তা নিয়ে বড় ভাই জহিরের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। সে সময় চাচাতো ভাই কাদের বলেছিলেন, ‘জহির ভাই বংশের বড় ছেলে, সিলেটে তাঁর যাওয়াই ভালো হবে।’ সে বার বাড়ির বড় ছেলে না হয়ে মেজো ছেলে হওয়ার কারণেই তিনি বেঁচে গিয়েছেন, বড় ভাইয়ের বদলে তিনি সিলেট গেলে দুর্ঘটনায় তিনিও মারা যেতে পারতেন।

তা বাদেও আর তিন জন মানুষের খোঁজ নেওয়ার জন্যে কামালের কৌতূহল প্রবল হলো। স্কুলের ফার্স্ট বয় সমীরণ ঘোষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট গার্ল মনিরা কামাল, আর কর্মজীবনের বিজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বী মুরশেদ হাসনাইন।

সমীরণ ঘোষ ও মুরশেদ হাসনাইন, এই দুইজনের খোঁজ পেতে কামালের বেশি সময় লাগল না। তিনি অন্তর্মুখী মানুষ, পুরনো বন্ধু-সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন না, না হলে অনেক আগেই এঁদের খবর পেতেন।

কামাল খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, সমীরণের সঙ্গে তাঁর আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আজ থেকে একুশ বছর আগে, বিয়ের ঠিক পর পর আত্মীয়-বন্ধুদের নিয়ে লঞ্চে করে নৌ-বিহার করার সময় মেঘনা নদীতে লঞ্চডুবি হয়ে সমীরণ ঘোষ এমন দেশে চলে গিয়েছেন, যেখানে এখনো ফোন বা ইন্টারনেট যায়নি। ওই দুর্ঘটনায় মোট তিরিশ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। সমীরণের প্রায় পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। কামালের আবছা আবছা মনে পড়ছে, এ রকম একটা খবর তিনি তখন পত্রিকায় দেখেছিলেন। বিস্তারিত পড়লে হয়তো সমীরণের নাম তাঁর চোখে পড়ত। ততদিনে সমীরণের সঙ্গে বা ফেলে আসা জেলা শহরের বন্ধুদের কারো সঙ্গে তাঁর আর যোগাযোগ ছিল না, তাই এত বড় দুঃসংবাদ কেউ তাঁকে জানাতে পারেনি। কিন্তু যদি ক্লাস নাইনে তিনি ফার্স্ট হতেন? এমন তো হতে পারত, সমীরণের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব টিকে যেত! বিয়ের পর নৌবিহারে সমীরণ তাঁকে যেতে বলতেন, হয়তো তিনিও রাজি হয়ে যেতেন!

কামাল জানেন এর মধ্যে অনেক যদি-কিন্তু-তাহলে আছে। তবু তাঁর খুব তীব্রভাবে মনে হলো, রাকিব ঠিক বলেছেন। তিনি যতই দুঃখ করুন না কেন, দ্বিতীয় হওয়াটা হয়তো তাঁকে অনেক দুর্ভাগ্য থেকে বাঁচিয়েছে।

মুরশেদ হাসনাইনের খবর দিলেন ফ্রেঞ্চ-কানাডিয়ান টোব্যাকোতে এখনো কাজ করতে থাকা কামালের এক প্রাক্তন সহকর্মী। মুরশেদ বেঁচে আছেন। দেশে আর থাকেন না, কানাডার টরন্টো শহরে থিতু হয়েছেন। দেশে মুরশেদ খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। ফ্রেঞ্চ-কানাডিয়ান টোব্যাকোতে চাকরি করতে থাকা অবস্থাতেই একটা আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে যায়, পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। প্রাক্তন সহকর্মীর ধারণা, মুরশেদকে ফাঁসানো হয়েছিল। যা হোক, এফসিটি ছাড়ার পর মুরশেদ এখানে-সেখানে চাকরির চেষ্টা করেছেন, কিন্তু আর্থিক কেলেঙ্কারির দুর্নাম তাঁর ভালো চাকরি খুঁজে পাওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষে কানাডায় অভিবাসন নিতে বাধ্য হন। প্রাক্তন সহকর্মী জানালেন, সেখানেও মুরশেদ খুব ভালো নেই। নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাননি। জীবনটা এমন হয়ে গেল কেন, এই নিয়ে প্রায়ই পুরনো পরিচিতদের কাছে হা-হুতাশ করেন।

মনিরা আমিনের খবর পাওয়া গেল না। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেই, কামাল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের যে দুই-চারজন সহপাঠীকে খুঁজে বের করতে পারলেন, তাঁরাও কেউ তাঁর সঙ্গে সংযুক্ত নন। কিন্তু কামালের কাছে সে খবরের প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

রাকিব আহসানের ভিজিটিং কার্ড খুঁজে বের করে কামাল তাঁকে ফোন করলেন। রাকিব ঢাকায় ছিলেন না, বক্তৃতা দিতে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। কামাল নিজের পরিচয় দিয়ে উত্তেজিত ভাবে তাঁকে বললেন, দ্বিতীয় হওয়া বিষয়ে তাঁর আর কোনো আক্ষেপ নেই। রাকিব ঠিক বলেছেন। এই দ্বিতীয় হওয়াই তাঁকে নানা বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

রাকিব মন দিয়ে সব কথা শুনলেন, তার পর বললেন, ‘আমি অবশ্য ঠিক এ রকম সম্ভাবনার কথা ভেবে বলিনি। তবে জীবনে সব সম্ভাবনারই কিছু ভালো, কিছু খারাপ দিক থাকে। সে যাক, আপনার হতাশা কেটে গিয়েছে, সেটাই আসল কথা। এবার নতুন উদ্যমে জীবনকে আঁকড়ে ধরুন। দেখছেন তো, কত ক্ষণস্থায়ী এই জীবন! হতাশায় নষ্ট করার মতো কোনো সময় আমাদের কারোর হাতে নেই!’

কামাল এর পর থেকে দ্বিতীয় হওয়ার হতাশা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠলেন ঠিকই, কিন্তু একটা নতুন অভ্যাস তাঁকে পেয়ে বসল। দ্বিতীয়-ভীতির বদলে এখন তাঁর মধ্যে এসেছে দ্বিতীয়-প্রেম। তাঁর মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে, সব জায়গায় দ্বিতীয় স্থানে থাকাই তাঁর পক্ষে ভালো। যেকোনো জায়গায় লাইনে দাঁড়াতে হলে সবার আগে তিনি দাঁড়াতে চান না, কোনো একজনকে সামনে এগিয়ে দেন। কাঠমান্ডু অফিসে ইন্তেখাবের স্থান পূরণ করার আবেদন তিনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি আর শীর্ষ নির্বাহী হতে চান না। এমনকি অফিসের পিকনিকে লটারিতে প্রথম হয়ে টেলিভিশন উপহার পেয়ে সে উপহারও তিনি নিলেন না, আয়োজকের পুরস্কার নেওয়া চলে না এই অজুহাতে ফিরিয়ে দিলেন। তবে তিনি কেন এমন করেন, সে কথা ভুলেও অন্য কাউকে বলেন না। বাইরের লোকে না বুঝলেও নাফিসা জানেন কামালের এই আচরণের কারণ কী। তিনি মুখ টিপে হাসলেন। এই রাশভারী মানুষটার মধ্যে কতখানি ছেলেমানুষী আছে, তিনি ছাড়া কেউ জানবে না।

দ্বিতীয়-ভীতি দূর হওয়ার পর প্রায় বছরখানেক পার হয়ে গিয়েছে। কামাল মেজর ইলেকট্রনিক্সের অফিসে গুরুত্বপূর্ণ উইকলি মিটিং করছেন। ম্যানেজিং ডিরেক্টর আসলাম সাহেব দেশের বাইরে আছেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে কামালকেই মিটিং পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়েছে।

মিটিংয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় আলোচনা হচ্ছে, এমন সময়ে ফায়ার অ্যালার্ম বেজে উঠল। কামাল মিটিং বন্ধ করে উঠতে গেলেন, মার্কেটিং ম্যানেজার সেলিম বললেন, ‘ব্যস্ত হবেন না স্যার। আবার ফলস অ্যালার্ম দিচ্ছে মনে হয়!’

মিটিংয়ে উপস্থিত প্রায় সবাই কথাটায় সায় দিলেন। গত মাসে তিন বার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই বহুতল ভবনে ফায়ার অ্যালার্ম বেজেছে। সবাই হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গিয়েছেন, তারপর কিছু হয়নি বুঝতে পেরে আবার ওপরে উঠে এসেছেন। পনেরো তলার ওপরের এই অফিসে বিনা কারণে ওঠা-নামা করতে কারই বা ভালো লাগে?

মিটিং চলতে থাকল, কিন্তু কামাল অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। আজকে ফায়ার অ্যালার্ম বেজেই চলেছে।

দশ মিনিট বাদে মিটিং রুমের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লেন অফিসের দীর্ঘদিনের রিসেপশনিস্ট শামসাদ খানম। ‘স্যার, আগুন লেগেছে!’

তড়িঘড়ি মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে অফিসের সবাইকে তত্ক্ষণাত্ কাজ বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বললেন কামাল। নিজেই সবাইকে জড়ো করলেন, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুদূর নামার পরেই দেখা গেল, ঘন কালো ধোঁয়া সিঁড়ি অন্ধকার করে ফেলেছে। এর মধ্যে দিয়ে নিচে নামা অসম্ভব। কামাল চিত্কার করে বললেন, ‘ওপরে চলো। ছাদের দিকে যাও!’

ছাদে ওঠার জন্য অনেকটা সিঁড়ি ভাঙতে হলো। নিচ থেকে গলগল করে ওপরে উঠে আসছে কালো ধোঁয়া। সে ধোঁয়ায় শ্বাস আটকে আসে। কামাল বুঝলেন, আগুন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।

ছাদে উঠে কামাল দেখলেন, অন্তত শ খানেক মানুষ ছাদে জড়ো হয়েছে। নিচে দমকল বাহিনীর সাইরেন শোনা যাচ্ছে। আশপাশের দালানের ছাদ থেকে উদ্বিগ্ন মুখে মানুষ তাকিয়ে আছে এই দালানের নিচের তলাগুলোর দিকে। দমকল বাহিনী কি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে? ধোঁয়া এখন ছাদ পর্যন্ত উঠতে শুরু করেছে। আগুনের তাপও উঠে আসছে। মেজর ইলেকট্রনিক্সের পঁচিশ-তিরিশজন কর্মীর দল কামালকে ঘিরে দাঁড়াল। কারো কারো চোখে পানি। রোকেয়া নামের একটি মেয়ে মাত্র দুই মাস আগে কাজে যোগ দিয়েছে। সে অসহায় ভাবে জানতে চাইল, ‘স্যার, আমরা কি মারা যাচ্ছি?’

কামাল তাকে বললেন, ‘না রোকেয়া। আমরা তো ছাদে চলে এসেছি, এখান থেকে আমাদের উদ্ধার করার কোনো একটা ব্যবস্থা কেউ নিশ্চয়ই করবে!’

মার্কেটিং ম্যানেজার সেলিম তাঁর ফোন থেকে স্ত্রীকে ফোন করেছেন। তিনি ভাঙা গলায় বললেন, ‘হুসনা, আমাদের অফিসে আগুন লেগেছে। আমি ছাদে উঠে এসেছি। বাঁচব কি না জানি না। আমার জন্য দোয়া করো। আর আমার কিছু হলে বাচ্চাদের দেখে রেখো।’

তিনি ফোন রাখা মাত্র অনেকের ফোন বাজতে লাগল। টেলিভিশনে আগুনের খবর দেখানো শুরু হয়েছে। দশ মিনিট পরে নাফিসাও ফোন করলেন। তিনি অনেক কষ্টে গলা শান্ত রেখেছেন, কামাল তাঁর কথা শুনে বুঝলেন।

‘তুমি কোথায়?’

‘আমি ছাদে উঠে এসেছি। দুশ্চিন্তা কোরো না।’

‘সাবধানে থেকো। আমি চলে আসছি।’

‘নাফিসা, আমার কথা শোনো। তুমি বাড়িতে থাকো। এখানে এসো না। এখানে এসে কিছু করতে পারবে না। নাদিয়া-নাহিন কোথায়?’ নাফিসা কিছু বলার আগেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কামাল ফোনের স্ক্রিনে দেখলেন, সেলফোনের নেটওয়ার্ক শক্তি হারিয়েছে।

ডান দিকের রেলিংয়ে ঝুঁকে পড়ে নিচের অবস্থা দেখতে থাকা কয়েকজন জানালেন, পাশের দালানেও আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

দুর্বিষহ একটা ঘণ্টা কাটালেন সবাই। ছাদের সিঁড়িঘরের দরজা এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তবু ফাঁক-ফোকর দিয়ে গলগল করে কালো ধোঁয়া আসছে। এই খোলা ছাদেও শ্বাস নেওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার মাথার ওপর চক্কর দিয়ে উড়তে শুরু করেছে। কিন্তু ছাদে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করার কোনো প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। দমকল বাহিনী কি নিচের আগুন নিভাতে বেশি ব্যস্ত?

মরিয়া হয়ে কেউ কেউ যখন এই দালানের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে বামদিকের দালানের ছাদে যাওয়া যায় কি না চিন্তা করছিলেন, তখন দমকল কর্মীদের একটা দল দেবদূতের মতো সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। পাশের দালানের ছাদ থেকে একটা মই তাঁরা উঠিয়ে লাগালেন এই দালানের ছাদ পর্যন্ত। একটা দড়িও ছুঁড়ে দিলেন। দড়ি ধরে সাবধানে মই বেয়ে নেমে যেতে হবে পাশের ছাদে। কাজটায় ঝুঁকি আছে, কিন্তু আগুনের ভয়ের চেয়ে সেই ভয় বেশি মারাত্মক নয়। আগে মইয়ে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি লেগে গেল। দমকল কর্মীরা হেঁকে বললেন, ‘সাবধান! একজন একজন করে আসেন!’ তাঁদের কথা শোনার মতো মানসিক অবস্থা এখন প্রায় কারোর নেই। ধাক্কাধাক্কি করে মইয়ে উঠতে গিয়ে আরেকটু হলে পা ফসকে নিচে পড়ে যেতেন একজন। আরেকজন পেছন থেকে তাঁকে টেনে ধরে বাঁচালেন। এই নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল।

কামালের কী হলো, কে জানে, তিনি নিতান্ত স্বভাববিরুদ্ধভাবে ভিড় ঠেলে সামনে গেলেন। এই দালানের অনেকেই তাঁকে চেনেন। তাঁরা কামালকে সামনে এগিয়ে যেতে দিলেন। এই বিপর্যয়ের মধ্যেও তাঁর এক তরুণ সহকর্মী বললেন, ‘এই যে, স্যারকে আগে যেতে দেন। স্যার, আপনি যান!’

কামাল মইয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ‘বিপদের সময় মাথা গরম করতে নাই। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। আপনারা সবাই সুযোগ পাবেন। ভয় নাই। আগে মেয়েদের যেতে দেন!’

কামালের কথায় কেউ কেউ প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বাকিরা সমর্থন করলেন। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আগে মেয়েদেরকে পাঠান!’

এক এক করে মহিলারা দড়ি ধরে, মই বেয়ে নেমে গেলেন। দমকল কর্মীরা নিচ থেকে তাঁদের ধরে নামালেন। এবার পুরুষেরা যাবেন। ধোঁয়ায় আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। নাক-চোখ জ্বলছে। আর একটু পরেই ভয়াবহ অবস্থা হবে, কামাল টের পেলেন।

কামালের সহকর্মীরা আবার বললেন, ‘স্যার, এবার আপনি যান!’

কামাল প্রবল বেগে মাথা নাড়লেন। ‘না, আপনারা আগে যান। আপনারা তরুণ, আপনাদের সামনে জীবন পড়ে আছে।’

তর্ক করার সময় নেই। এখনো ষাট-বাষট্টি জনকে পার হতে হবে। সহকর্মীরা কামালের কথা মেনে নিলেন।

পাশ থেকে একজন একজন করে চলে যাচ্ছেন। কামাল অপেক্ষা করছেন। গাঢ় ধোঁয়া গাঢ়তর হচ্ছে। মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে। কামাল তবু বুঝলেন, তাঁর ভেতরে কোথাও গভীর আনন্দ হচ্ছে। তিনি সুখ অনুভব করছেন। আজ মনে হচ্ছে, কোনো কোনো দিন শেষতম ব্যক্তি হতে পারার মধ্যেও জীবনের সার্থকতা নির্ভর করে। একসময় তিনি ভাবতেন দ্বিতীয় হয়ে তিনি জীবনটা অপচয় করছেন, আসলে জীবনের অনেকটা সময় তাঁর অপচয় হয়েছে শুধু প্রথম আর দ্বিতীয় স্থান নিয়ে অনর্থক দুর্ভাবনা করে। আজ, এই বিপর্যয়ের দিনে এসে তিনি জানলেন, প্রতিযোগিতায় বিজয়ীর জীবনটাও বড় জোর দ্বিতীয়-শ্রেষ্ঠ, সহযোগিতার জীবনের পরিপূর্ণতার সঙ্গে তার তুলনা চলে না।

আর বেশি লোক বাকি নেই। ফুসফুসে প্রায়-ফুরিয়ে-আসা অক্সিজেনটুকু বাঁচিয়ে অল্প শ্বাস নিতে নিতে কামাল ভাবতে থাকেন, তাঁকে বেঁচে থাকতে হবে। তিনি যা জেনেছেন, ছেলেমেয়েদের তা জানিয়ে যেতে হবে।

নিচে থেকে দমকল-কর্মীরা মই বেয়ে পার হতে থাকা মানুষদের তাড়া লাগান। ‘জলদি করেন। জলদি করেন। আরো মানুষ আছে। সবাইকে পার হতে হবে! কেউ যেন বাদ না যায়! কেউ যেন বাদ না যায়!’ v