দশ হাসপাতালের পাশে এবারও পশুর হাট

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫৬
বরাবরের মত এবারও রাজধানীর ১০ সরকারি হাসপাতালের আশপাশে বসছে পশুরহাট। গত বছর সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় পশুরহাট বসানোর অনুমতি দেয়া হবে না। কিন্তু কর্মকর্তারা কথা রাখেননি। ইতিমধ্যে ইজারা দেয়া হয়েছে কোরবানির পশুরহাটের। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম গত ৩ আগস্ট হাসপাতালের আশপাশে পশুরহাট না বসাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেয়ার জন্য দুই সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। কিন্তু সিটি করপোরেশন বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালের আশপাশে পশুরহাট বসানোর ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ও যানবাহন যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক রোগী অ্যাম্বুলেন্স কিংবা যানবাহনেই মারা যান। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রোগীদেরও নানা ভোগান্তি পোহাতে হয় এসময়। রোগীদের স্বার্থে পশুরহাট হাসপাতালের আশপাশে কিংবা রোগী যাতায়াতের পথে না বসানোর জন্য প্রতি বছরই সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের কাছে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। অথচ তারা একে আমলেই নেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকার দলীয় নেতাদের দাপট ও মোটা অংকের ঘুষ পেয়ে কর্মকর্তারা হাসপাতালের কাছে পশুরহাট বসানোর অনুমতি দেন। দেখা যায়, পশুরহাটের জন্য নির্ধারিত এলাকা পেরিয়েও হাট বসে। দখল হয়ে যায় হাসপাতালে প্রবেশের পথ। বাঁশ দিয়ে ইজারাদাররা যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেয়। এ প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ৩ আগস্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে এক চিঠিতে বলেন, শেরে বাংলা নগর (আগারগাঁও) ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের মাধ্যমে চিকিত্সাসেবা কার্যক্রম শুরু করে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। বিশেষায়িত এই হাসপাতালে ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে প্রতিদিন প্রচুর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, মেরুদণ্ডের জটিলতা, মাথায় টিউমার ও মেরুদণ্ডে গুরুতর জটিলতা নিয়েও ঘটনা-দুর্ঘটনায় আহতরা আসছেন। অথচ এই হাসপাতালের সামনের রাস্তায় বসানো হয় পশুরহাট। এ কারণে হাসপাতালে রোগীরা ওই সময় আসা যাওয়া করতে পারে না। পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল ও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সামনের সড়ক দখলে নিয়ে বসে পশুরহাট। এ অবস্থায় নিউরোসায়েন্সস হাসপাতালে চিকিত্সা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। চিকিত্সক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হয়ে পড়েন বন্দি। সংকট দেখা দেয় পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, কিডনি ইনস্টিটিউট, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও। রোগীদের জীবন রক্ষা ও চিকিত্সাসেবা পাওয়ার লক্ষ্যে নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের সামনে কোরবানির পশুরহাট না বসানোর অনুরোধ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ চিঠি পাওয়ার এলজিআরডি মন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার জন্য দুই সিটি কর্পোরেশনকে চিঠি দেন। অথচ চিঠির ব্যাপারে করপোরেশনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি পরিবেশ অধিদফতরের পাঠানো চিঠিও আমলে নেয়নি সিটি করপোরেশন। সিটি কর্পোরেশন (উত্তর) রাজধানীর ৮টি স্থানে এবার কোরবানির পশুরহাট বসানোর অনুমতি দিয়েছে। এরমধ্যে একটি হলো নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের কাছে আগারগাঁও বস্তির খালি জায়গা। বস্তি উচ্ছেদ করে নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে খালি ছোট প্লট রয়েছে। যা পশুরহাট বসানোর মত জায়গা নয় বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানান। নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ জানান, পশুরহাট বসলে অতীতের ন্যায় এবারও হাসপাতালে রোগীরা চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। এ বিষয়টি তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (উত্তর) প্রধান নির্বাহীকে ৩১ জুলাই চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন। ১৬ জুলাই নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের পক্ষে অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম অনুরূপ কথা উল্লেখ করে সিটি কর্পোরেশনের (উত্তর) আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে (অঞ্চল-৫) চিঠি দিয়েছেন। ঢাকা সিটি করপোরেশন (দক্ষিণ) ১২টি স্থানে এবার কোরবানির পশুরহাট বসানোর অনুমতি দিয়েছে। এরমধ্যে একটি পুরাতন ঢাকার আরমানিটোলা খেলার মাঠ। এ মাঠের জায়গায় একটি কোরবানির হাট বসানো সম্ভব নয়। এ হাট সম্প্রসারিত হবে নয়াবাজার ব্রিজের উঠার পথে মিটফোর্ড হাসপাতালে যাতায়াতের রাস্তায়। সিটি কর্পোরেশনের মহানগর হাসপাতাল এবং মিটফোর্ড হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ও যানবাহন যেতে পারে না এ কারণে। সরকারি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষরা বলেন, অতীতের মত রাজধানীর ২০টি পশুরহাটের মধ্যে ২টিই ১০টি হাসপাতালের চিকিত্সাসেবা জিম্মি করে ফেলবে। নগরবাসীর জন্য কোরবানির পশুরহাট প্রয়োজন। কিন্তু রোগীদেরও চিকিত্সাসেবা পাওয়ার অধিকার আছে। ২টি পশুরহাটের জন্য ১০টি হাসপাতালের শত শত রোগী ভোগান্তি পোহাতে পারে না। রাতে দুই সিটি কর্পোরেশনের দুই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, পশুরহাটের কারণে হাসপাতালে রোগীদের চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হবে-এটা মেনে নেয়া হবে না। এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।