আমি ফুলের মতো পবিত্র চরিত্রের অধিকারী নই। ফুলের চরিত্র যদি খুব ভালো হতো শত পতঙ্গ আকৃষ্ট করত না। মহুয়া কেমন সে নিজেই ভালো জানে।
আমাদের দাম্পত্য কলহের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কলহের শেষ পর্যায়ে উপসংহারের কাছাকাছি এসে তা আবার নতুন করে শুরু হয়।
আরো একটি বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করার মতো নয়, কলহের মাঝখানে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন বিরতির মতো অনিবার্য কোনো বিরতি। সে বিরতির সময় এমনও হয় যে, মহুয়া হেসেও উঠে। আমার সঙ্গে নয়, কলহের মাঝখানে আমাদের ব্যস্ততার কথা না জেনে যারা ফোন করে তাদের কারো সঙ্গে। ফোন অধিকাংশই মহুয়ার, দু-একদিন আমারও এসেছে।
বিরতি থেকে ফিরে এসে ‘যা বলছিলাম’ বলে মহুয়া বিরতির আগের শেষ বাক্যটি থেকে শুরু করে। আমার সমস্যা ভুলে যাওয়ার; বিরতির আগে আমার পক্ষে যেসব যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলাম তার প্রায় সবগুলোই ভুলে যাই এবং এক পর্যায়ে কলহ থেকে বেরোনোর জন্য কণ্ঠস্বর ও মাথা কিছুটা নিচু করে বলেই ফেলি, ‘সব দোষ আমার।’
মহুয়া তখনই ছেড়ে দেবে মনে করার কারণ নেই। আমার স্বীকারোক্তির পিঠে আবারও প্রশ্ন করবে। ‘তোমার নয় তো কার?’
—বললামই তো আমার।
—বলবেই তো, কারণ দোষটা তোমার।
আমি বলি, ‘ঠিক।’
—ঠিক মানে? তুমি আমার সাথে বিটলামি করছ?
—বিটলামি মানে?
—বিটলামি মানে জানো না।
—জানি বিটলস নামের বিখ্যাত পপগ্রুপের সিঙ্গাররা যা করত, তাই তো বিটলামি। নাকি ভুল বললাম?
মহুয়াকে আমার এই বিটল ব্যাখ্যা সারাদিনই চটিয়ে রাখবে। আমার দিকে ছুঁড়ে মারার মতো হাতের কাছে নতুন কেনা নিজের মোবাইল ফোনটা ছাড়া তেমন কিছু না থাকায় এবং আমি খবরের কাগজটা নিয়ে দ্রুত বাথরুমে ঢুকে পড়ায় একটি দাম্পত্য কলহ খুব বেশিদূর এগুতে পারল না। মহুয়ার ভালো দিকটা স্বীকার করতেই হবে, দামি কোনো কিছু ভাঙে না। ছুড়েও মারে না। তার বড় কারণ খাট, ওয়ারড্রোব, সোফাসেট, ডাইনিং টেবিল—বড় বড় প্রায় সব জিনিসই আমার কেনা, ছুড়তে হলে ছোটগুলো ভালো, যার প্রায় সবই মহুয়ার কেনা। নিজের জিনিসের ওপর ঝুঁকিটা নিতে চায় না।
ঘণ্টা তিনেকের একটি সংক্ষিপ্ত সফরে মহুয়ার ছোটবোন ড্যাফোডিল আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ করছে। যাওয়ার সময় মহুয়া নাকি স্পষ্ট দেখেছে সিএনজি অটোতে উঠতে উঠতে ড্যাফোডিল আমার দিকে একটি ফ্লাইং কিস ছুড়ে মেরেছে।
মহুয়া এবার খুবই ঠাণ্ডা মাথায় বলল, ‘আচ্ছা, এক হাতে কি তালি বাজে?’
হাত ও তালির উপমাটির গন্তব্য তখনো ধরতে পারিনি।
মহুয়া বলল, ‘তুমি আস্কারা না দিলে ড্যাফোডিল তোমাকে ফ্লাইং কিস দেবার সাহস পায় কেমন করে?’
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে বলি, ‘তাই দিয়েছে নাকি? আমি তো কিছুই টের পেলাম না।’
মহুয়া বলল, ‘একচুয়ালি ফ্লাইং কিস দিলে কিছু টের পাবার কথা নয়। তার মানে তুমি টের পেতে চাচ্ছিলে, ফ্লাইংয়ে তোমার পোষায়নি, তুমি রিয়েল কিস চাচ্ছ।’
—আমি তো সেরকম কিছু বলিনি।
—তোমার বলতে হবে কেন, আমি তো ওই হারামজাদি আসার পর থেকেই চোখকান খোলা রেখেছি।
আমি বললাম, ‘মহুয়া এসব কী বলছ, ড্যাফোডিল তোমার আপন বোন!’
—আমার বোনকে আমি বলেছি, তাতে তোমার এত জ্বলছে কেন? কেইসটা আমি ঠিকই ধরেছি।
—বেশ তোমার স্টকে আরো খারাপ কোনো গালি থাকলে ওটাই দাও, ভালো করে দাও, একবারের জায়গায় সাতবার দাও। আমার কী, তোমার বোনকেই তো দেবে! দাও।
মহুয়া বলল, ‘যাই হোক, তুমি কিন্তু ধরা পড়ে গেলে। আমি শুধু তোমার রিঅ্যাকশন টেস্ট করলাম। রেজাল্ট পজেটিভ। আমি আজই জানিয়ে দিচ্ছি এ বাড়িতে ড্যাফোডিল অবাঞ্ছিত ঘোষিত হয়েছে। সে কখনো আর এই অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে পারবে না। আই উইল নট অ্যালাউ হার। তোমার একশ গজের ভেতর আসতে পারবে না।
মহুয়ার কাছ থেকে অন্তত একশ গজ দূরে, মহুয়ার বাবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর মিলাদ মাহফিলের সামিয়ানার বাইরে ড্যাফোডিলকে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কি সত্য তুমি আমাকে ফ্লাইং কিস দিয়েছিলে, যা আমি দেখিনি কিন্তু মহুয়া দেখে ফেলেছে?’
ড্যাফোডিল বলল, ‘প্র্যাকটিস করছিলাম, অনেককেই দিয়েছি, আপনাকেও দিয়ে থাকতে পারি। সিএনজি ড্রাইভারকেও দিয়েছি। আবরার বলল আমার ফ্লাইং কিসটা তেমন স্মার্ট হয় না। গ্রাম্য মেয়েদের ফ্লাইং কিসের মতো। তারপর আমাকে দেখিয়ে দিল এবং সারাদিন প্র্যাকটিস করতে বলল।’
—আবরারটা কে?
—কে সেটা হয়তো বলা যাবে, একজন রিটায়ার্ড এয়ার কমোডোর ফকরুল হাসানের ওয়াইফের ছেলে। মানে ওয়াইফের আগে বিয়ে হয়েছিল সেই ঘরের ছেলে। এতে বরং আবরারের লাভই হয়েছে। দুই বাবার প্রপার্টিই পাবে। ফ্লাইং শিখছে পাইলট হবে। আপনি আসলে জানতে চাচ্ছেন আমার সাথে আবরারের কী সম্পর্ক? আপাতত বন্ধুর, তবে যে দিকে মোড় নিচ্ছে, আমরা এখনো ফ্লাইং কিস স্টেজে আছি, আর একটু এগোলেই নিউজটা ব্রেক করব। মা কিছু বলবে না কিন্তু মহুয়া আপু একটা না একটা ঝামেলা পাকাবেই। আপনি তো আপনার স্ত্রীকে ভালো করেই চেনেন। আবরার যদি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সুইপার হতো কিংবা বাসে ট্রেনে দাদ ও চুলকানির মলম বিক্রি করত, তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। মা না মানলেও মহুয়া মেনে নিত। কিন্তু তার বরের চেয়ে বড় কেউ, মানে যোগ্য কেউ আমার বর হলে মহুয়া তাকে ঠেকানোর জন্য যা কিছু করা দরকার সবই করবে।
ড্যাফোডিল যাই বলুক, এমনকি যদি তা সত্যিও হয়, স্বামী হিসেবে আমি এটাকে মহুয়ার গুণ বলেই বিবেচনা করব। নিজের স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক যত কলহেরই হোক তার শীর্ষ অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে যে নারী উদ্যোগী, সেই না যথার্থ স্ত্রী।
ড্যাফোডিল অধ্যায়টি খুবই সংক্ষিপ্ত। আবরার শেষে পর্যন্ত তাকে প্রত্যাখ্যান করায় মহুয়া বলল, ‘আমি জানতাম এটাই হবে।’
অতঃপর ড্যাফোডিল অস্ট্রেলীয় সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করতে ক্যানবারা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায় এবং বৃত্তির সময় হওয়ার পর গাফ হুইটলাম জুনিয়ার নামের এক সাদা অস্ট্রেলিয়ানকে বিয়ে করে সেখানেই রয়ে যায়। মহুয়ার অজান্তে আমাকে জানায়, তার স্বামী সাবেক প্রধনামন্ত্রী গাফ হুইটনামের দৌহিত্র। ড্যাফোডিলের পরামর্শেই মহুয়াকে বলি, ‘নাম শুনলেই তো মনে হয় ওখানকার সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ির হেলপার কি ড্রাইভার।’
মহুয়া জানাল, অস্ট্রেলিয়ার সাদারা নাকি নিয়মিত গোসলও করে না। ওয়াক থু!
এরকম সংক্ষিপ্ত দু-একটি এপিসোড হিসেবের মধ্যেই আনিনি।
মহুয়ার সঙ্গে আমার দাম্পত্য কলহের আশি ভাগ জুড়ে রয়েছে মমতাজ মহল, কুড়ি ভাগ জুড়ে মোনালিসা দোমিঙ্গোস। একদিন বা দুদিনের কলহের আশি কিংবা কুড়িভাগ নয়, মহুয়ার সঙ্গে একত্রিশ বছরের দাম্পত্য কলহের আশি ভাগ মমতাজ মহলকে নিয়ে এবং শেষে ষোল বছরের কলহের কুড়িভাগ পর্তুগিজ তরুণী মোনালিসা দোমিঙ্গোসকে নিয়ে।
আমাদের ঝগড়াটা যেভাবেই শুরু হোক, উপসংহারে মমতাজ মহল এসেই যাবে, যদি মমতাজ না হয় তবে মোনালিসা দোমিঙ্গোস।
দুই.
আমাদের বিয়ের তারিখটা ৩১ মার্চ।
আমরা ফার্স্ট হ্যাপি অ্যানিভার্সারি করে চাইনিজ রেস্তোরাঁয় খেয়ে হাসতে হাসতে হাত ধরাধরি করে বাড়ি ফিরে আসি। ঘরে ঢোকার এক মিনিটের কম সময় আগে মহুয়া বলল, ‘আমার বান্ধবী কনক প্রেগন্যান্ট, সামিয়া টুইন বেবির মা হয়েছে, নুরুন্নিসা খানমের ডেলিভারি দু-একদিনের মধ্যেই। আর দেরি নয় আনিস, নো মোর পিলস, নো মোর কনডমস, নো মোর অ্যানি আদার প্রোটেকশন, এবার বেবি নেবই।’
আমি বললাম, ‘ওয়ান্ডারফুল!’
মহুয়া বলল, ‘এটা আমার অ্যানিভার্সারি রেজ্যুলুশন। বেবিসহ সেকেন্ড অ্যানির্ভাসারি সেলিব্রেট করব।’
আমি বললাম, ‘দ্য আইডিয়া!’
মহুয়া বলল, ‘আজই।’
আমি উল্লাসিত ঘোড়ার মতো পা তুলে লাফিয়ে উঠে বলি, ‘ইয়েস।’
মহুয়া বলল, ‘তাহলে তোমাকেও একটা রেজ্যুলুশন নিতে হবে, নো মোর স্মোকিং।’
—গ্র্যাজুয়ালি কমিয়ে আনব।
—নো, র্যাডিক্যালি। আজ থেকেই। যখন ইচ্ছে করবে একটা করে চকোলেট খাবে। ব্ল্যাক চকোলেট হার্টের জন্যও ভালো।
—তাহলে শেষ সিগারেটটা খেয়ে আসি?
—মনে রেখো এটাই শেষ।
সিগারেট খেতে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তার শেষ মাথার কর্নার শপে চলে আসি। দিনে দু-তিনটের বেশি কখনো খাইনি। রাতের বেলা এখানে এসে একটা সিগারেট আর এক কাপ দুধচা খাওয়া আমার রুটিন খাবারেরই অংশ। কাল থেকে যদি ছেড়েই দিতে হয় শুধু চা খাবার জন্য এখানে আসব না। এখনই যাওয়ার সময় কনডেন্সড মিল্ক নিয়ে যাব।
চা মহুয়াও খায়। তারটা গ্রিন টি। আমার খেতে একটুও ইচ্ছে করে না। স্বাদটা বাজে।
মহুয়া ঢাকা শহরের ফার্মগেট এলাকার মেয়ে। বটমলি হোমস স্কুলে পড়াশোনা করেছে, আইএসসি হলিক্রস কলেজ থেকে, তারপর সায়েন্স থেকে সরে গিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমিক্স পড়েছে। মহুয়া জন্মসূত্রে যেমন বেড়ে উঠাতেও পুরোপুরি নগরজীবনের মানুষ। আমার ষোল বছর পর্যন্ত পুরোপুরি গ্রামে, পরের দু বছর জেলা শহরের সরকারি কলেজে। ততদিনে একটি দুটি বয়েজ ওনলি কিংবা গার্লস ওনলি কলেজ বাদে সবগুলোতেই কোএডুকেশন চালু হয়ে গেছে। কোএডুকেশন আমার মতো পুরোপুরি গ্রাম থেকে আসা ছেলেদের স্মার্টনেস হঠাত্ করে বাড়িয়ে দেয়, আমরা তখন চুলের মাঝখানে সিঁথি করি, চুল নেমে আসে ঘাড়ের কাছে, কালো গগলসও চোখে দিই। রং নির্বাচনে গ্রাম্যতা থেকেই যায়। হয়তো সে কারণে গোলাপি রঙের ফুলপ্যান্ট বানাই।
দুই আড়াই বছর পর ঢাকায় এসে গ্রাম্যতা ঝেড়ে ফেলার জন্য শহুরে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে গিয়ে খেতাব পাই আবদুল। আমি একা নই, আরো ক’জন আবদুল শনাক্ত হয়।
পরের বছরগুলোতে আবদুল ভাবটা অনেকটাই ঝেড়ে ফেলতে সমর্থ হয়েছি নতুবা মহুয়ার মতো মেয়ে নিজে থেকে এগিয়ে এসে আমাকে বলার কথা নয়, ‘চলো বিয়ে করে ফেলি।’
আমি দোকানদারকে বলি, ‘এটাই আমার শেষ সিগারেট। কাল থেকে আমাকে আর পাবে না।’
দোকানদার বলল, ‘অন্য দোকান থেকে কিনবেন এই তো?’
—না এটার পর আর সিগারেট মুখে তুলব না।
দোকানদার হেসে ওঠে, ‘লজ্জার কিছু নেই। একমাত্র সিগারেটই বারবার ছেড়ে দেওয়া যায়। গিন্নির ভয়ে বুঝতে পেরেছি। একান্ন নম্বর বাড়ির তৈমুর সাহেব ঠিকই বলেছেন, পুরুষ মানুষ বউকে আগের চেয়ে বেশি ভয় পায়। তৈমুর সাহেব বউ ছেড়ে দিয়েছেন সিগারেট ছাড়েননি। ঠিক আছে, সপ্তাহ খানেক দেখেন পারেন কি না।’
আমি চায়েও শেষ চুমুক দিয়ে ঘরে ঢুকেই দেখি পুরনো দিনের গৃহসজ্জার অন্যতম রঙিন সুতোয় তৈরি কাঠের ফ্রেম ও কাচ ঘেরা তাজমহল দেয়াল থেকে নামিয়ে আছাড় মেরে ভেঙে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। সুতোর তাজমহলের নিচে ছিল সুতোয় লেখা নজরুলের পঙক্তিমালা :তাজমহলের পাথর দেখছে, দেখেছ কি তার প্রাণ/অন্তরে তার মমতাজ নারী বাহিরে শাহজাহান।
ভাঙা কাচ ঘরে ছড়িয়ে আছে। ফ্রেমের ভেতরের কাপড়টা কি পুড়িয়েছে নাকি? সন্তান উত্পাদনের প্রবল উত্সাহে ভাটা পড়ে যায়। জিজ্ঞেস করি, ‘এ কী! এ অবস্থা কেন?’
মহুয়া বলল, ‘এটা দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায় তাই।’
আমি মেনে নিই। মেজাজ খারাপ হলে তো কত কিছুই ঘটতে পারে। আরো যে খারাপ কিছু ঘটেনি এটাই ভাগ্য।
সে রাতটা আমাদের ভালো যায়নি। ইচ্ছে জাগেনি।
ভোরের দিকে মহুয়া জিজ্ঞেস করল, ‘মন খারাপ? মমতাজ মহলের জন্য মন খারাপ করে তুমি আজকের রাতটাই নষ্ট করে দিলে।’
আমাদের বিয়ের দ্বাদশ বছরের শুরুতে এক রাতে খাবার সময় আমার হেঁচকি উঠে। মহুয়া হেঁচকিটাকে খুব সিরিয়ালি নেয়।
আমি বললাম, ‘ও কিছু না, ডায়াফ্রামের ইরিটেশন দু-এক মিনিটের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।’
—তুমি আমার সাথে পণ্ডিতি করতে যেয়ো না। আমি খুব ভালো করেই জানি হেঁচকি কী?
আরো একটা হেঁচকি উঠতেই বললাম, ‘ছোটবেলায় এমন হলে মা জিজ্ঞেস করত কী চুরি করে খেয়েছিস?’
—আমার শাশুড়ি তার ছেলেকে ঠিকই চিনতে পেরেছিলেন সেজন্যই চুরির কথা জিজ্ঞেস করেছেন। চুরি তুমি তখনো করতে, এখনো করো। তুমি আমাকে সামনে রেখে চুরি করে অন্য মেয়ে মানুষের কথা ভাবো। এখন বলো মমতাজ মহলের কোন স্মৃতিটা হঠাত্ তোমার মনে পড়ে গেল আর অমনি হেঁচকি দিতে শুরু করলে?
আমি বলি, ‘কী আশ্চর্য! এখানে মমতাজ মহল আসবে কোত্থেকে খাবারের ছোট একটা পার্টিকেল শ্বাসনালীতে...’
—একদম চুপ! আমাকে রেস্পেরিটরি সিস্টেম শেখাতে যেয়ো না।
আমি বললাম, ‘একটু সায়েন্টিফিক্যালি চিন্তা করলেই পার। হেঁচকি তোমারও তো উঠতে পারে।’
মহুয়া তার সুন্দর টৌলপড়া গাল যতটা সম্ভব বিকৃত করে বলল, ‘বাব্বা! তুমি আমাকে সায়েন্স শেখাতে চেষ্টা করছ। বায়োলোজিক্যাল সায়েন্স? আমি তোমার এসএসসির মার্কসিট দেখেছি, বায়োলজিতে প্র্যাকটিক্যালসহ তুমি পেয়েছ ফিফটি ওয়ান, আর আমি এক নম্বরের জন্য লেটার পাইনি। গ্রামের স্কুল প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় পঁচিশে একশ পার্সেন্ট আদায় করে নিয়েছ, ঢাকায় যেকোনো স্কুলে পাঁচের বেশি পেতে না।’
আমি আলোচনার মোড় ঘুড়িয়ে দেওয়ার জন্য বললাম, ‘দেখলেই তো, সে জন্যই ইন্টারমিডিয়েট পড়েছি আর্টসে, সায়েন্স ধরে রাখলে আইএসসিতে নির্ঘাত্ ফেল।’
—তবুও ভালো সত্যটা স্বীকার করেছ। এবার সত্যি করে বলো মমতাজ মহলকে নিয়ে তোমার কোন স্মৃতিটা মনে পড়েছিল যে হেঁচকি উঠল। এড়িয়ে যাবে না কিন্তু।
মমতাজ মহল কেন, খাওয়ার শুরু থেকে হেঁচকি উঠা পর্যন্ত কোনো নারীর কথাই আমার মনে পড়েনি। কিন্তু মহুয়া যখন জোর করে তাকেই ঢুকিয়ে দিচ্ছে তার কথা ভাবতে সমস্যা কোথায়?
একটুখানি দেঁতো হাসি দিয়ে মহুয়া বলল, ‘ধরা পড়ে গেলে তাই না? দেখো আনিস, তুমি কখন মমতাজ মহলকে মনে করো আর কখন মোনালিসা দোমিঙ্গোসকে, আমি ঠিকই বুঝতে পারি। যখন তুমি চোখ বন্ধ করে ভাবো তখন মোনালিসা, আর যখন চোখ খোলা থাকে তখন মমতাজ মহল।’
প্রশংসা হয়তো কলহ এড়াতে সাহায্য করতে পারে, এমন একটা সম্ভাবনাকে সামনে রেখে বললাম, ‘দারুণ আবিষ্কার!’
—অবশ্যই আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের মেথডোলোজি হলো ক্লোজ অবজার্ভেশন। অধিকাংশ ম্যারেড মহিলাই নিজের হাজব্যান্ডকে ক্লোজলি অবজার্ভ করে না, এজন্যই সত্যটা বের করতে পারে না।
আমি বললাম, ‘তোমার এই অবজার্ভেশনটাও কারেক্ট। তবে আমার কিউরিসিটি চোখ খুলে ভাবা এবং চোখ বুঝে ভাবা নিয়ে তুমি ধরলে কেমন করে?’
—ইজি, ভেরি ইজি।
ডান হাতের কনুইটা টেবিলে রেখে তালুতে চিবুক ও চোয়াল রেখে আবার বলি, ‘ইন্টারেস্টিং ডিসকভারি।’
মহুয়া বলে, ‘মূল বিষয়টা হচ্ছে ডিসট্যান্স। কাছের মেয়ে মানুষকে নিয়ে ভাবতে তেমন ইমাজিনেশন লাগে না। কিন্তু দূরেরটাকে নিয়ে ভাবতে হলে আগে তো ডিসট্যান্স কাভার করতে হয় তারপর ফ্যান্টাসি। এতদূর খালি চোখে দেখেশুনে দূরত্ব অতিক্রম করতে বেশি সময় লেগে যায়। কিন্তু চোখ বন্ধ থাকলে সুপারসোনিক স্পিড ছাড়িয়েও যায়। তোমার ব্যাপারটা তাই।
এবার সত্যিই বিটলামি করার ইচ্ছে হলো। বললাম, ‘এই ডিসকাশনটা অন্য কারো সাথে কোরো না। তোমার এই ডিসকভারি চুরি করে সাথে দু-একটা এক্সপেরিমেন্ট লাগিয়ে অন্য কেউ নোবেল পুরস্কার নিয়ে ফিরে আসবে, তুমি আঙুল চুষবে। দেখলে না জগদীশ চন্দ্র বসু রেডিও আবিষ্কার করলেন আর পুরস্কার নিলেন মার্কনি। হোয়াট অ্যা ডেপ্রাইভাল।’
আমার প্রশংসায় মহুয়া বিগলিত হয়নি বরং তির্যক চাহনি ফেলে ধারালো স্বরে বলল, ‘আনিস, তুমি নিজেকে যতটা চালাক ভাবো তুমি ততটা চালাক হয়ে উঠতে পারনি। তোমার বিটলামি আমি বুঝতে পারি।’
***
আমাদের একত্রিশতম বিয়ে বার্ষিকীর উদযাপনটা পণ্ড হয়ে গেল। মহুয়া বলল, ‘এবার আমি একাই সেলিব্রেট করব। কেক কিনে চাইনিজ খাইয়ে পয়সা নষ্ট করতে যেয়ো না। তাতে তোমার তাজমহল নির্মাণের তহবিলে হাত পড়ে যাবে।’
—তুমি কী করবে?
—ভাবছি সমুদ্রে যাব।
—কক্সবাজার না কুয়াকাটা?
—তোমার কী দরকার? ভাবছি ওভারকোটের পকেটে অনেকগুলো ভারী পাথর নিয়ে ভার্জিনিয়া ওলফের মতো সমুদ্রে নেমে যাব।
—ভার্জিনিয়া ওলফ?
—ভালুক টালুক এমন কিছু নয়। ভার্জিনিয়া ওলফ অনেক বড় রাইটার। তুমি ও তোমার চৌদ্দগোষ্ঠীর কেউ তাঁর লেখা বই পড়া তো দূরের কথা ভার্জিনিয়া ওলফের নামও শোনোনি।
আমি বই নামিয়ে বলি, ‘আসলে গ্রামের স্কুলে পরীক্ষা পাসের জন্য এসব উদ্ভট নাম জানার দরকার হয় না।’
আমি বিড়বিড় করে বলি, ‘এই মহিলা ওভারকোটের পকেটে পাথর নিয়ে সমুদ্রে নেমেছে আর ওঠেনি এই তো?’
—হ্যাঁ, লাশ উঠেছে।
—কোন দেশের লেখক?
—গ্রেট ব্রিটেন।
—ওহ, বুঝতে পেরেছি ঠাণ্ডা দেশ। ঘরে ফ্যান থাকে না যে শাড়ি কি ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়বে। সরি, শাড়ি আর ওড়নাই বা পাবে কোথায়। ওভারকোট গলায় পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ার সুযোগ নেই। পকেটে পাথর নিয়ে সমুদ্রে নেমেছেন, ঠিকই করেছেন। নতুনত্ব আছে। সে জন্যই তো শেকসপিয়ার বলেছেন, নেমেসিটি ইজ দ্য মাদার অব ইনভেনশন।
মহুয়া বলল, ‘আবার পাণ্ডিত্য ফলাতে শুরু করলে? এরকম কথা শেকসপিয়ার কখনো বলেননি।’
আমি বললাম, ‘শেকসপিয়ার না বললে আমি শিখলাম কেমন করে? আমাদের গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টারের পক্ষেও এরকম গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা সম্ভব নয়।’
মহুয়া এবার অনেকটাই নমনীয় কণ্ঠে বলল, ‘তোমার মতো আবদুলদের নিয়ে এটাই সমস্যা। ইংরেজি কোনো কোটেশন মুখস্থ করতে পারলে মনে করে ওটা শেকসপিয়ারের লেখা। অবশ্য শেকসপিয়ার ছাড়া অন্য কারো নামও তো জানে না।’
আমি বললাম, ‘জানি, মিলটন।’
—ওই পর্যন্তই।
—ওই কথাটা প্ল্যাটোর। প্ল্যাটোর ডায়লগ-এ পাবে।
এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে নিয়ে আমাদের কলহের প্রাথমিক তীব্রতা কমে আসে।
তিন.
আমাদের বিয়ের দু বছর পূর্তি হলো। প্রথম বছরের পূর্তিতে মহুয়া সন্তানের মা হতে চাইলেও শেষ মুহূর্তে ভাবল সংসার টিকে কি না, সেটাই তো সন্দেহ। তার চেয়ে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করাই ভালো। সন্তান তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। তাছাড়া সন্তান উত্পাদানের প্রক্রিয়াটা তো দুজনেরই জানা। এরচেয়ে সহজ কোনো উত্পাদন প্রক্রিয়া নেই; ধনতান্ত্রিক দেশেও না, সমাজতান্ত্রিক দেশেও না। উত্পাদনের মিনস ও মোড একই।
দু’বছর পূর্তির সেলিব্রেশনটা পিছিয়ে দিলাম, হাতে আরো কিছু টাকা জমুক, জীবনে প্রথমবারের মতো বিদেশে যাব। আমাদের দুজনের জন্যই প্রথম। বিদেশ মানে সুইজারল্যান্ড কিংবা কানাডা এমন দূরের কোনো দেশ নয়। আমরা ইন্ডিয়া পছন্দ করলাম, কারণ, মানুষগুলো মোটামুটি আমাদেরই মতো, খরচ কম পড়বে, ট্রেনে বাসে পায়ে হেঁটে চলব, নেহায়েত বিপদে না পড়লে ট্যাক্সিতে উঠব না।
জীবনে প্রথম প্লেনেও চড়াতে হবে। প্লেনে আধঘণ্টা আকাশে থাকা যা, কুড়ি ঘণ্টাও তাই; বরং সময় বেশি হলে জার্নিটা বোরিং লাগে পায়ে রক্ত জমে যায়—এই রোগের নাম ডিভিটি—ডিপ ভেইন থ্রমবসিস। টাকা-পয়সা খরচ করে এরকম থ্রমবসিস চাই না। আমরা কেবল ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটে প্লেনে চড়ব, তারপর ইন্ডিয়ার ভেতরে সস্তার যেকোনো যানবাহনে। দিল্লি এক্সপ্রেস ধরব, ট্রেনের ভেতর হাঁটাহাঁটি করব, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভারত দেশটা কেমন দুজনেই দেখব।
ঢাকা থেকেই অভিজ্ঞ পর্যটকের পরামর্শ নিয়ে এসেছি। তাদের কথা মেনেই দিল্লি স্টেশনে নেমেই তিনদিনের প্যাকেজ ট্যুর বুক করে নিই। বুক নয়, পুরো টাকা দিয়ে টিকিটই নিয়ে নিই।
কলম্বাস এক্সপেডিশনের বাঙালি যুবকটি বলল, ‘দাদা, আগামী কালের তিন জোড়া টিকিট আছে, আধঘণ্টার মধ্যে কর্নটক মেইল পৌঁছালে হুড়মুড় করে এগুলো নিয়ে নেবে, বুকটুক না করে এখনই নিয়ে নিন, নতুবা দেখবেন একটা দিন নষ্ট হয়ে গেছে।’
মহুয়া তাকে বলল, ‘দাদা, ঠিকই বলেছেন।’ আমাকে বলল, ‘নিয়ে নাও।’
যুবক বলল, ‘দিদি, আমার নাম বিভূতিভূষণ। আমাদের আদি বাড়ি আপনাদের ওপারেই। মাদরিপুরের কালকিনি। যাইনি কখনো।’ মহুয়া বলল, ‘আপনি কি বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় না মুখোপাধ্যায়?’ যুবক বলল, ‘বিভূতিভূষণ বালো।’ মহুয়া এমন পদবি কখনো শোনেনি।
যুবক বলল, ‘শুধু ব্রাক্ষণ খুঁজে বেড়ালে হবে। পঁচানব্বই ভাগেরও বেশিই এর বাইরে।’
তারপর টিকিট মহুয়ার হাতে দিয়ে নিজেই বেরিয়ে এসে দেখিয়ে ছিল, ‘ঠিক এখান থেকে ছেড়ে যাবে কলম্বাস এক্সপেডিশন নামক ট্যুর অপারেটরের এয়ার কন্ডিশন্ড থার্টি সিক্স সিটার লাক্সারি বাস। ঠিক আটটায়, দিদি বরং পাঁচ-দশ মিনিট আগে আসুন। আটটার পর এক মিনিটও অপেক্ষা করবে না।’
আমরা বিভূতির পরামর্শমতো স্টেশন থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে একটি বোর্ডিং হাউসে উঠি। হোটেলই, সঙ্গে রেস্তোরাঁও আছে। বিভূতি পরামর্শ দিয়েছে, ‘হোটেলের রেস্তোরাঁয় খেতে যাবেন না, গর্দান কেটে দেবে। আশপাশের ছোট খাবার দোকানে ঢুকবেন ইচ্ছেমতো দেখেশুনে খাবেন, দু পয়সা সেইভ করতে পারলে আত্মীয়-স্বজনের জন্য এটা-ওটা কিনে নিয়ে যাবেন।’
তারও ইচ্ছে, একবার দুর্গাপূজার সময় তার বিধবা মাকে নিয়ে মাদারিপুরের কালকিনি দেখিয়ে আনবে।
বিভূতি আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিল, ‘বাথরুমের ঢুকে কাপড় খোলার আগে চারদিক ভালো করে দেখে নেবেন—কোথাও ফুটোটুটো নেই তো। ফুটো দিয়ে তোলা ছবি চড়াদামে বিকায় কিনা তাই।’
সুতরাং বোর্ডিং হাউসে আমাদের অ্যাটাচড বাথরুমে ফুটো আছে কি না আমরা দুজন অনেকভাবে পরীক্ষা করলাম। নেই।
নেই নিশ্চিত হওয়ার পরই মহুয়া বলল, ‘ফুটো থাকলেই বা কী, আমাদের সেরকম আকর্ষণীয় মনে করে ছবি তুলে দিল্লির দাদারা যদি কিছু বাড়তি কামাতে পারে মন্দ কী!’
প্রথম দিনটা আমাদের বেশ কাটল। মহুয়া বলেই ফেলল, ‘দারুণ লাগছে। দু-এক বছরের মধ্যে আমি কিন্তু আবার দিল্লি আসব।’
আমি বলি, ‘আরো কিছু টাকা জমুক।’
মহুয়া বলল, ‘তুমিও তো অনেক খাটাখাটনি করো, তোমারও তো একটু ব্রেক দরকার। তোমার কলিগরা তো ভ্যাকেশনে নেপাল-ভুটান-শ্রীলঙ্কা যায়।’
আমি বলি, ‘কী এমন খাটুনি! বাংলাদেশে সবচেয়ে আরামের চাকরি—কলেজে মাস্টারি।’
মহুয়া বলল, ‘তবুও ব্রেইনকে একটু রেস্ট দেওয়া ভালো।’
—দেব।
আমাদের ট্যুর প্যাকেজের প্রথম দিনই আগ্রার তাজমহল।
মহুয়া কলকাতায় নেমেই আমাকে বলেছে, ‘ইন্ডিয়াতে তোমার ফ্যামিলির মুরব্বিদের কারো সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বুঝতে পেরে দুটো প্যান্ট আর দুটো শার্ট সঙ্গে এনেছি।’
শার্ট মানে মেয়েদের শার্ট, বুকের কাছে দুদিক থেকে দুটো এক্সট্রা সেলাই। ক্যাপও এনেছে। একটা ফ্লাস্কও, চার কাপ চা ধরে এমন। সময়মতো চা না পেলে আমার মাথাব্যথা হয়। সেজন্য মহুয়ার এই প্রিকশন।
আমি বললাম, ‘থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আমিও নিয়েছি।’
মহুয়া হেসে ওঠে, ‘আমারটাও থ্রি কোয়ার্টার। হাঁটু নিচে পায়ের বাকিটা কেউ দেখলে কী এসে যায়!’
এখন থেকে স্টেশন বড় জোর বার মিনিট। একটু জোরে পা চালালে দশেই পৌঁছা সম্ভব।
আমরা সাড়ে সাতটার মধ্যে তৈরি। কড়া লাল ও কালোর বর্গাকার শার্ট পরেছে মহুয়া। ঘিয়ে রঙের থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। গগলস। মহুয়া জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন দেখাচ্ছে?’
আমি বললাম, ‘তোমাকে নিয়ে আবার শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।’
মহুয়া হেসে ওঠে।
আমরা আর তিন মিনিটের মধ্যে বেরোব। ফ্লাস্ক আমার হাতে রাস্তার পাশের দোকান থেকে চা নেব।
হিসু পাচ্ছে বলে মহুয়া বাথরুমে ঢুকল। সে আমলে ওয়াশরুম কথাটা চালু হয়নি।
তিন-চার মিনিট কেটে যাওয়ার পরও যখন বেরোচ্ছে না, দরজায় নক করি, বলি, ‘বিভূতি কিন্তু বলেছে আটটার পর এক মিনিটও দাঁড়াবে না।’
আরো এক দেড় মিনিট কাটিয়ে মহুয়া যখন বের হলো আমি অবাক হয়ে দেখি তার পরনে ম্যাক্সি, থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট এবং চেক শার্ট হাতে।
—কী ব্যাপার মহুয়া?
—তোমার তাজমহলে তুমি যাও, আমি যাব না। আমি এখন ঘুমোতে চাই। তুমি যাও। গাড়ি ছেড়ে দেবে।
—মানে?
—বোঝোনি? আমি যাচ্ছি না।
***
আমিও রয়ে যাই। সেদিনটা আমার জন্য খুব যন্ত্রণার ছিল।
তাজমহল আমার অদেখাই রয়ে যায়।
ট্যুর প্যাকেজের অংশ ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ ও আফটারনুন টি। সুতরাং আমরা জানতাম সাড়ে আটটায় গাড়িতেই আমাদের প্যাকেট ব্রেকফাস্ট সার্ভ করা হবে। গাড়িতে পৌঁছিনি বলে নাস্তাও পাইনি। দুপুরও গড়াচ্ছে। বারোটা থেকেই মাথাব্যথা শুরু হয়, পৌনে দুটোর দিকে আমি প্যারাসিটামল কেনার জন্য তো অবশ্যই, সম্ভবত কিছু খাবার কিনতেও যখন বেরোতে যাচ্ছি, মহুয়া খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’
—মাথা ধরেছে প্যারাসিটামলের জন্য বেরোচ্ছি আশপাশে ফার্মেসি থাকতে পারে।
মহুয়া বলল, ‘খালি পেটে প্যারাসিটামল খেলে স্টোমাক পার্ফোরেশন হবে। শোনো আমার কাছে দু পাতা প্যারাসিটামল আছে, বাসা থেকে নিয়ে এসেছি। তোমার লাগবে, আমি জানতাম। চলো, তার আগে কিছু খেয়ে নিই।’
এবার বেশ দ্রুতই সেই চেকশার্ট ও থ্রি কোয়ার্টার ট্রাউজার পরে মহুয়া রেডি। সঙ্গে প্যারাসিটামলও নিয়েছে।
প্রায় পনের মিনিট হেঁটে একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। নাম দ্য ইন্ডিয়ান স্যামন। স্যামন মাছের দাম বেশি, আমি চাইলাম গ্রিলকরা সি ফিশ, মহুয়া নিল ভ্যাজিটেরিয়ান ডিশ। আবার আমার মাছ থেকে খানিকটা কেটেও নিল। বলল, ‘রাতে সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার খাব।’
খাবার শেষ করে যখন রেস্তোরাঁ থেকে বেরোচ্ছি, মহুয়া বলল, ‘ফার্মেসি কোনদিকে?’
বললাম, ‘প্যারাসিটামল তো পেয়েছি।’
মহুয়া বলল, ‘সে তো তোমারটা। তোমারটা ব্যাগে ঠিকই ঢুকিয়েছি, কিন্তু আমারটা সম্ভবত বিছানার ওপরই ফেলে এসেছি।’
—তোমারটা?
—স্যানিটারি ন্যাপকিন। ইররেগুলার সাইকেল হলে যা হয়, দু-একদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যেতে পারে।’
আমরা আরো মিনিট দশেক হাঁটি, এবার বেশ ধীর কদমে।
প্যারাসিটামল কাজ শুরু করেছে, চিনচিনে ব্যথাটা এখন নেই। গত পরশু কলেজ থেকে বের হওয়ার সময় ইংরেজির নতুন লেকচারার সিলভিয়া মহিউদ্দিন দুটো পাঁচশ টাকার নোট হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছে যশোধারা ডালমিয়ার লেখা ‘অমৃতা শেরগিল’ বইটা তার জন্য নিয়ে আসতে হবে। একটা কাগজে প্রকাশকের নামও লিখে দিয়েছে, বলেছে, যেকোনো বড় বইয়ের দোকানে পাওয়া যাবে।
আমি জিজ্ঞেস করেছি, ‘অমৃতা শেরগিল কে? রাইটার নাকি?’
সিলভিয়া বলল, ‘পেইন্টার।’
—তুমি কি পেইন্টিংও পড়াতে শুরু করবে নাকি?
—আমাদের তো চারুকলা ডিপার্টমেন্ট নেই, থাকলে চেষ্টা করতাম। এই বইটা বাবাকে প্রেজেন্ট করব। বাবা অনেক আগে একবার স্টেডিয়ামের মারিয়েটাকে আনতে বলেছিল, কলকাতায় পায়নি।
সিলভিয়ার বাবা মহিউদ্দিন আহমেদ লে আর্কিটেক্ট। পেইন্টিংয়ের ভালো কালেকশন তার, বইপত্রও অনেক। আমি এ লাইনের মানুষ নই, এ কালের পেইন্টং সম্পর্কে আমার ধারণা অত্যন্ত খারাপ। সুযোগ পেয়ে সিলভিয়াকে ইমপ্রেস করার জন্য বিমূর্ত চিত্রকলা নিয়ে প্রচলিত গল্পটি শুনিয়ে দিলাম। কোনো এক জাদুঘরের গ্যালারিতে দুর্বোধ্য এক অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং ঝুলছিল। একজন দর্শক ছবির মাথামুণ্ডু কিছু বের করতে না পেরে বলল, ‘এ ছবি কেন ঝুলিয়ে রেখেছে?’
একই রকম ক্ষুব্ধ অন্য এক দর্শক প্রশ্নটি শুনে জবাব দিল, ‘শিল্পীকেই ঝোলানোর কথা, কিন্তু তাকে ধরতে পারেনি বলে এ ছবিটাকে ঝুলিয়েছে।’
হাঁটতে হাঁটতে আমি এদিক ওদিকও তাকাচ্ছি যদি বইয়ের দোকান চোখে পড়ে ঢুকে পড়ব। বইটা যে সিলভিয়া কিংবা অন্য যেকোনো নারীর জন্য এটা বলা যাবে না, বলব আমাদের প্রিন্সিপ্রাল সাহেবের জন্য।
বইয়ের দোকান সম্ভবত এদিকটাতে নেই। মহুয়ার চোখে পড়ল একটা থিয়েটার। নামটা ঠিক মনে পড়ছে না—গ্যালাক্সি বা মিল্কিওয়ে এ ধরনের নাম।
মহুয়া বলল, ‘চলো, দেখি কী চলছে?’
আমরা এগিয়ে যাই। আধঘণ্টার মধ্যে শো শুরু হতে যাচ্ছে। দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান।
মহুয়া বলল, ‘দেখব।’
সবচেয়ে কমদামি টিকিট একটিও নেই। মাঝারি দামেরটাই কিনলাম। মিনিট দশেক হাতে থাকতে মহুয়া বলল, ‘বাইরে কফি ও কুলফির ভ্যান আছে। তুমি এক কাপ কড়া কফি খেয়ে নাও, মাথা ধরাটা ছেড়ে দেবে। আমি নেব কুলফি।’
মাঝামাঝি রো-গুলোর একটির শেষ প্রান্তে আমরা দুজন। আমি জানি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে বসে থাকলে আরো একটু বেশি ভালো লাগবে।
আমি সম্ভবত ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। হঠাত্ ঠাণ্ডা ও সুগন্ধি একটি মালিশ এবং মহুয়ার হাতে ছোঁয়া আমাকে জাগিয়ে দেয়। মহুয়া বলল, ‘চাইনিজ বামের কৌটাটাও প্যারাসিটামলের সাথে ব্যাগে ঢুকিয়েছিলাম। তুমি চোখ বন্ধ করে রেখো মালিশ করে দিই। ভালো লাগবে।’
আমার ভালো লাগছে। মহুয়া ছাড়া অন্য কেউ কি বুঝত কোন সময় একটুখানি মালিশ কত বড় উপশম এনে দেবে?
আমাকে স্বীকার করতেই হবে মহুয়ার মালিশ তারই দেওয়া আঘাতকে সহজেই ভুলিয়ে দেয়। এটি মহুয়ার সহজাত গুণ।
শুধু মালিশই নয়, আমার মাথা টেনে তার কাঁধের ওপর এনে হাত বোলাতে থাকে। আলো-আঁধারে বিদেশি এই থিয়েটার হলে চুমোর চেয়ে বেশি এগোনো কেউই মাথা ঘামাবে না, টু শব্দটির করবে না। এই হলের একটি মানুষও আমার পরিচিত নয়। আমাদের লজ্জা পাওয়ারও তেমন কারণ নেই। অন্ধকার থিয়েটারে প্রেমিক যুগল এমন সুযোগ নিতেই পারে। স্বামী-স্ত্রীও পারে।
টিপু সুলতানের তরবারি দেখতে দেখতে আমি একটু ঘুমিয়েও নিয়েছি। মহুয়া বলল, ‘একটু নয়, নাক ডেকে ভালোই ঘুমিয়েছ। আমি যদি নাটক থেকে প্রশ্ন করতে শুরু করি তুমি আশিভাগ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে না।’
আমরা যখন থিয়েটার থেকে বেরোই, একটু মাথাব্যথাও নেই। আমার হাত দু বাহুতে আঁকড়ে ধরে মহুয়া যেভাবে হাঁটছে কেউই ভাববে না আগ্রার তাজমহল আজ সকালেই আমাদের জন্য ভয়ংকর যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
দিনটা বেশ উষ্ণ হলেও সন্ধ্যার পর থেকে দিল্লির উষ্ণতা অনেকটাই নেমে আসে, কারণ ঝাপটা ঝড়ো বাতাসও বয়ে যায়। আমরা দুজন আরো ঘণ্টাখানেক হাঁটাহাঁটি করে একটি শপিংমলে ঢুকি। মহুয়া গগলস ও কানের দুল কেনে। দিল্লি গেইট খুব দূরে নয়, হেঁটে হেঁটে চলে আসি, ওখান থেকে বের হয়ে আমাদের বোর্ডিং হাউসে আসার পথে রাস্তার পাশে খাবারের ভ্যানগাড়ির পেছন দিকটাতে ফুটপাতে পাতা টুলের ওপর বসে পড়ি। আগে খেয়াল করিনি, ভ্যানের ওপর লেখা ইতালিয়ান কুইজিন।
মহুয়া বলল, ‘এটাই ভালো। পিত্জা-পাসতার বাইরে ম্যাকারনি চিজ আর বিফ লাসানিয়ার কথা শুনেছি, খাইনি কখনো।’
ভ্যানের খাবার দাম যথেষ্ট সহনীয়। আমরা মিলিয়ে মিশিয়ে বেশ কয়েক পদ খাবার নিলাম ভাগাভাগি করে খাব, বেশি হয়ে গেলে কাগজের ঠোঙায় ভরে নিয়ে যাব।
চার.
সে রাতটা আমাদের খুব ভালো কেটেছে। বিয়ের ঠিক পরপর দিনগুলো যেমন কেটেছে ঠিক তেমনই। খুব উচ্ছ্বসিত ছিল মহুয়া। শেষরাতের দিকে বলল, ‘তাড়াতাড়ি দু-তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নাও, আটটার আগে আমাদের কলম্বাস এক্সপেডিশনের গাড়ি ধরতে হবে না।’
আমি বললাম, ‘যাবে সত্যি?’
মহুয়া বলল, ‘টাকা কি গাছে ধরে? তিনদিনের প্যাকেজ। একদিন যাইনি তো কী হয়েছে বাকি দুদিন যাব।’
—তাহলে আমাকে ঘুম থেকে ওঠানোর এবং আমাকে রেডি করার দায়িত্ব তোমার। তোমার সাথে এত বেশি শক্তি খরচ করে ফেলেছি যে, ক্রেইন দিয়ে বিছানা থেকে টেনে তুলতে হবে।
ক্লান্তি দ্রুত আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
বোর্ডিং হাউসের ধবধবে সাদা তোয়ালে গরম পানির ট্যাপ ছেড়ে ভিজিয়ে চিপে এর ওপর কয়েক ফোঁটা পারফিউম দিয়ে আমার ঘুমন্ত মুখের ওপর ছড়িয়ে দেয়। আমার ঘুম ভাঙে। মহুয়া বলে, ‘থাক খোকাবাবু, আর পাঁচ মিনিট ঘুমাও। তোমার শরীরটা স্পঞ্জ করে দিই, ভালো লাগবে।’
আমাকে প্রায় নির্বসন করে অনেকদিন পর মহুয়া আমার গোটা শরীর তোয়ালের সিক্ত উষ্ণতা দিয়ে চাঙ্গা করে তোলে। আমি উঠে পড়ি। মহুয়া সময় বেঁধে দেয়। দশ মিনিটের মধ্যে সব সেরে রেডি হয়ে বেরোতে হবে। আমি বেরিয়ে দেখি মহুয়াও রেডি, তবে লাল-কালোর চেক শার্টে নয়, সাদা-কালোতে।
আমরা ঠিক পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছি।
ট্যুর গাইড প্রথমে বলল, ‘আপনাদের টিকিট ল্যাপস হয়ে গেছে, সিট দুটো একটি চাইনিজ কাপলকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
মহুয়া ট্যুর গাইডকে ধমকের স্বরে বলল, ‘টাকা নাওনি? আমি না গেলে আমার সিট খালি যাবে।’
সে কিছু একটা বোঝাতে চেষ্টা করছিল, হঠাত্ মহুয়া গাইডের টাই ধরে হেঁচকা টান মেরে বলল, ‘ব্লাডি ইন্ডিয়ান ফ্রড, যতক্ষণ আমাদের ভালো সিট না দিচ্ছিস গাড়ি ছাড়তে দেব না। তোকে পুলিশে দেব।’
চড়া মেজাজে মহুয়া তাকে ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড বলে গাল দিল। আমাদের বয়স্ক একজন সহযাত্রী, ভারতীয়ই হবেন, বললেন, ‘আমি আপনাদের ব্যাপারটা দেখছি।’ তারপর মহুয়াকে বললেন, ‘ইয়াং লেডি, দিস চ্যাপ মে বি অ্যা বাস্টার্ড, বাট অল ইন্ডিয়ানস আর নট।’
তারপর তিনি কষিয়ে এক চড় বসিয়ে দিলেন ট্যুর গাইডের গালে এবং সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আমি দিল্লি পুলিশের জাস্ট রিটায়ার্ড অ্যাডিশনাল কমিশনার, এক্ষণ এই কাপলের সিট বের করে দে, তোদের জন্য ফরেনাররা আমাদের বলতে পারে ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড!’
মহুয়া সামলাতেও জানে, সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক লোকটিকে বলে, ‘সরি কমিশনার স্যার, আমি ঠিক আপনাদের মিন করিনি, ওকেই বলেছি। কষ্ট করে টাকা জমিয়ে দিল্লি দেখতে এসেছি। কাল হঠাত্ শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ায় আসতে পারিনি। তাই বলে আমার টিকিট ল্যাপস হয়ে যাবে?’
ততক্ষণে সাড়ে আটটা বেজে গেছে। ট্যুর অপারেশনের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, শার্টে নেইমট্যাগ—মালহোত্রা, এসে চাইনিজ দম্পতিকে নামিয়ে নিয়ে গেল, আমাদের সরি বলল।
রিটায়ার্ড পুলিশ কর্মকর্তা তবুও ছাড়লেন না, বললেন, ‘কালও বাস ফুল ছিল ছিল, তাহলে দুজনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছ।’ তিনি আরো বললেন, ‘তোমরা ডাবল টাকা নিতে পার না। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে টাকা এনে ফেরত দাও। নতুবা তোমাদের অপারেটিং লাইসেন্স ক্যান্সেল করার জন্য আমিই লিখব।’
মিশ্রিত হিন্দি ও ইংরেজিতে এসব কথোপকথন চলছিল।
ম্যানেজার তাত্ক্ষণিক একটি সমাধান দেয়, ‘স্যার, এই ক্যাপলকে কোম্পানির দিল্লি-আগ্রা-দিল্লি একদিনের একটা টিকিট এখনই দিচ্ছি, আগামী পরশুই তারা এই ট্রিপটা করতে পারেন।’
ট্যুর গাইড নিজেই দ্রুত অফিসে গিয়ে টিকিট বানিয়ে নিয়ে এসে পুলিশ কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করল, তিনি দিলেন মহুয়ার হাতে, মহুয়া তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘আমরা এত ভালো পুলিশ দেখতে অভ্যস্ত নই। ইউ আর অ্যান এক্সেপশন। আমাদের টিকিট লাগবে না, পরশু দিন আমরা দিল্লি ছেড়ে যাচ্ছি।’
মেয়ে মানুষ যে পুরুষের টাই ধরে টান মেরেছে, সে পুরুষ এমন এমন দুর্দান্ত মহিলার সামনে বিব্রত বোধ করবে না মনে করার কারণ নেই। কিন্তু সঞ্জয় নামের (শার্টে নেইমট্যাগ আছে) যুবকটি এমনভাবে তার দায়িত্ব পালন করে গেল যেন কিছুই ঘটেনি। এর নামই পেশাদারিত্ব।
আমরা পরদিনও একই গাড়িতে, সেই গতকালের ছত্রিশজন, সেই ট্যুর গাইড কিন্তু ভিন্ন ড্রাইভার। দিনশেষে হিসেব করে দেখলাম দুদিনে কম দেখিনি রেড ফোর্ট, ফিরোজশাহ কোটলা দুর্গ, বাংলাসাহেব গুরুদোয়ারা, যন্ত্রর মন্তর অবজাভেটরি, লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির, রাজঘাট, চাঁদনি চক এবং নিযামউদ্দিন আওলিয়ার দরগাহ শরিফ। প্যাকেজের খাবার বাদেও এখানে ড্রিঙ্ক ওখানে কফি, এখানে ডাম্পলিং, ওখানে ফ্রাইড ক্র্যাব আমরা যথেষ্ট খেয়েছি। চাঁদনি চক থেকে একটা টাই কিনেছে টকটকে লাল। আমাকে ভালোই দেখাবে, কিন্তু ফিরতি ট্রিপে আমরা যখন আমাদের যাত্রাপথের কাছাকাছি হঠাত্ মহুয়া উঠে দাঁড়িয়ে দু হাতে তালি দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আমাদের গাইড সঞ্জয়ের জন্য আমার একটা ছোট উপহার আছে।’ বলেই লাল টাইটা সঞ্চয়ের হাতে তুলে দিল। রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার বললেন, ‘বিগ হ্যান্ড ফর দিস ইয়াং লেডি।’
সবাই হাততালি দিল।
মহুয়া সুন্দর ঝরঝরে ইংরেজিতে যা বলল, তার মানে, ‘সঞ্জয়, আমি দুঃখিত যে তোমর টাই টেনে ধরতে হয়েছে। তবে এটাও ঠিক, টাই না টানলে আমাদের পুরো টাকাটাই গচ্চা যেত। তার মানে টাই টানলে কাজ হয়। নেক্সট টাইম তোমার টাই নয়, আমার হাজব্যান্ড আনিসের টাই টেনে ধরব।’
বাসে দশ-বারো জন নারী পর্যটকের সবাই হাততালি দিল এবং আফ্রিকার কোনো দেশের একটি কালো মেয়ে মুখে আঙুল ঢুকিয়ে শিস বাজাল। আমি আহত হতে পারি, সম্ভবত এই আশঙ্কায় মহুয়া আমাকে টেনে দাঁড় করিয়ে একটা বিগ হাগ ও একটা শর্ট কিস দিল।
বাস থেকে নামার আগেই পুলিশ অফিসার মহুয়াকে তার বিজনেস কার্ড দিয়ে বললেন, ‘তোমাদের আমি ডিনারে আমন্ত্রণ জানাতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু আমার ওয়াইফ এত বেশি সাসপিশাস ন্যাচারের মানুষ যে, আমার পাশে তোমার মতো ইয়াং ও সুন্দরী একজনকে দেখলে হয়তো তার হার্ট অ্যাটাকও হয়ে যেতে পারে। সুতরাং তা আর হচ্ছে না। গর্ড ব্লেস ইউ।’
মহুয়ার হাত থেকে কার্ডটি নিয়ে শুধু তার নামটি দেখলাম—কৃষ্ণমাচারি শ্রীহরিহর ধাওয়ান।
তার চেহারার সঙ্গে নামটি মিলে গেছে।
মহুয়া বলল, ‘দিল্লির সিনেমা হলে একটা মুভি দেখতে চাই।’
আমরা পিডিআর প্লাজা হলে আড়াই ঘণ্টার হিন্দি সিনেমা ‘ঘর সংসার’-এর নাইট শো দেখতে ঢুকলাম। প্রধান দুটি চরিত্রে শ্রীদেবী ও জিতেন্দ্র। আমাদের ভালো কেটেছে। হাতে আগ্রার টিকিট থাকলেও আমরা সেখান যাচ্ছি কি না এ নিয়ে আমরা কেউই কথা বলিনি। তার মানে যাচ্ছি না।
দিল্লি থেকে আমরা মুম্বাই এসেছি, সবশুদ্ধ চৌদ্দদিন ভারতের বিভিন্ন শহরে কাটিয়ে আবার কলকাতা হয়ে ঢাকা ফিরে আসি।
মহুয়ার কয়েকটি শখই অপূর্ণ রয়ে গেছে। একটি হলো দামোদর নদী দেখা, যে নদী পেরিয়ে শিশু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর মাকে দেখতে এসেছেন নদীটা কি আসলেই চওড়া? দ্বিতীয়টি হলো মুর্শিদাবাদে পলাশির আম্রকানন দেখা, যেখানে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত গিয়েছে এবং তৃতীয়টি হলো চুরুলিয়ার গ্রামে যে বাড়িতে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছেন, সে বাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখা।
আমার আর তাজমহল দেখা হয়নি, এ পর্যন্ত সে সুযোগ আর পাইনি। ঠিক বলিনি, একবার পেয়েছিলাম। দিল্লি থেকে মস্কোর একটি কানেন্টিং ফ্লাইট যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বাতিল হয়ে যায়। পরের ফ্লাইট ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর। অ্যারোফ্লোট এয়ারলাইন্স দিল্লি শহরে আমাদের হোটেল দিয়েছিল। খাবারদাবারও। আমার ইন্ডিয়ান ভিসাও ছিল। আটকে পড়া যাত্রীদের একটি দল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাজমহল দেখতে বেরিয়ে পড়ে। যাব যাব করে শেষ পর্যন্ত আমি তাদের দল থেকে বেরিয়ে আসি। মহুয়া ব্যাপারটা ভালোভাবে নেবে না। ইচ্ছে থাকার পরও এমনকি যাব সম্মতি দেওয়ার পরও আমি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিই। তাজমহল দেখতে হলে মহুয়াকে নিয়েই দেখব।
আমি যে তাজমহল দেখতে যাইনি, এটা বলাও ঠিক হবে না। কারণ মহুয়ার তাত্ক্ষণিক উত্তর হবে, ‘জীবনে একবার স্মৃতিসৌধে গিয়ে স্মরণ করে লাভটা কী? তারচেয়ে সারাক্ষণ অন্তরে থাকাটাই তো উত্তম। তুমি ঠিক কাজই করেছ বাদশাহ শাহজাহান।’
মহুয়া তাদের বাড়িতে ভাইবোন ও স্বজনদের বলেছে, ‘আমার হাজব্যান্ড বাদশাহ শাহজাহান। ওই যে তাজমহল বানিয়েছে, সেই শাহজাহান। বিশ হাজার শ্রমিক বাইশ বছর খেটে কিংবা বাইশ হাজার শ্রমিক বিশ বছর খেটে যে স্মৃতিসৌধ বানিয়েছে, সেই তাজমহল। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের এক নম্বর আশ্চর্য তাজমহল।’
মহুয়ার বড় বোন জিনিয়া তাকে বলেছে, ‘তোর তো দারুণ কপাল, একেবারে মোগল বাদশাহ পেয়ে গেছিস। আমারটা যদি সুবাদার-টুবাদার হতো তবুও একটা কথা ছিল। আমি বইপত্র ঘেটে দেখেছি, বাবর থেকে বাহাদুর শাহ পর্যন্ত রাজত্বকালে হোসেন আলী নামের কোনো চৌকিদার-দফাদার পর্যন্ত পাইনি। আমার এমনই কপাল!’
হোসেন আলী দুলাভাই আমার খুব পছন্দের মানুষ। পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে তিনি আন্তরিকভাবেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকেন। তার স্ত্রী জিনিয়া যে একসময় সুন্দরী প্রতিযোগিতায় (যদিও আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা কখনো হয়নি) সর্বজনস্বীকৃত মিস রোকেয়া হল ছিল এবং তার মতো পাঁচ ফুট সাড়ে সাত ইঞ্চি লম্বা ও আকর্ষণীয় নারীর পাশে পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা মোটা ও টাকসর্বস্ব মানুষটি যে নিতান্তই বেমানান, এটা তিনি কখনো আমলেই নেননি। জিনিয়ার সৌন্দর্য তার কাছে তুচ্ছ। হোসেন আলী বলেনও, পচনশীল জিনিসের সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী, দুর্গন্ধটা বরং বেশি ভয়াবহ! তিনি পচা গোলাপের গন্ধ শুকতে বলেন, সুন্দরী নারীও তাই, কঙ্কালের ওপর মাংসগুলো বড্ড পচনশীল।
বিয়ের প্রথম দিকেই আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে কানের কাছে মুখ এনে হোসেন আলী দুলাভাই বলেন, ‘ব্রাদার, আর কটা মাস যাক, তুমি নিজেই বুঝতে পারবে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দরী হচ্ছে নেইবার্স ওয়াইফ। তোমার নিজের স্ত্রীর কথা মনে হবে বিষবত্, প্রতিবেশীর স্ত্রীর কথা অমৃততুল্য। নিজের স্ত্রীর কান্না তোমার মেজাজ খারাপ করিয়ে দেবে, প্রতিবেশীর স্ত্রীর কান্না তোমার কানে পৌঁছালে দেখবে বুকটা ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। বিউটি ইজ জাস্ট বোগাস!’
আমি হা করে তার কথা শুনি।
ততদিনে হোসেন আলীর দাম্পত্যকাল কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। জিনিয়ার সঙ্গে কুড়ি নয়, সাড়ে সাত কি আট, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তের কি চৌদ্দ বছর। তিনি অভিজ্ঞ মানুষ, অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো তো দিতেই পারেন।
অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়া জিনিয়াই তাদের আর্ট ক্লাবের স্পন্সর এইচএ এন্টারপ্রাইজের মালিক হোসেন আলীর প্রেমে পড়ে। তাদের চিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন করতে এসে জিনিয়ার জলরঙে আঁকা সেলফ পোর্ট্রেট দেখে মুগ্ধ হওয়ার অভিনয় করেন। মুগ্ধ তাকে জিনিয়াই করেছে, কিন্তু এ বয়সে এটা কেমন করে বলেন এবং এক হাজার পাঁচশ টাকা ক্যাটালগ প্রাইসের এই ছবিটি কিনে তাকে পনের হাজার টাকার একটি চেক দেন।
জিনিয়া বারবার বলে, ‘আপনি চেকে ভুলে একটা শূন্য বেশি বসিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘ভুল তো মানুষই করে।’
জিনিয়া বলে, ‘তা হলে সংশোধন করে দিন।’
তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে কিছু কিছু ভুল থেকে যাওয়াই ভালো। এরপর তুমি আমার একটা পোর্ট্রেট করে দেবে, দেখি একটা কুিসত চেহারাকে তোমার সুন্দর চোখে কেমন করে ট্রিট করে। বাকি টাকাটা আমার পোর্ট্রেট করার অ্যাডভান্স।’
তিনি আরো বললেন, ‘মডেল হিসেবে শিল্পীর সামনে সিটিং দিতে পারলেই ভালো হতো। কিন্তু সময় নেই। আমার ছবি থেকে এঁকো।’
জিনিয়া জিজ্ঞেস করে, ‘ছবি পাব কোথায়?’
হোসেন আলী বিজনেস কার্ড দিয়ে বলেন, ‘এইচএ এন্টারপ্রাইজে চলে এসো।’
বেশ রটে যায়, জিনিয়া বড় দাও মেরেছে। চারুকলার ছেলেমেয়েরাও তাদের করা কোনো পোর্ট্রেট নিজের কিংবা অন্যের পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করার কথা ভাবতেও পারে না। তাও আবার ওয়াটার কালার। দুই-তিন হাজার পেলে সানন্দে দিয়ে দেয়। জিনিয়া পাচ্ছে পনের। ওহ মাই গড!
হোসেন আলীর নামও রটে—কনোসার অব আর্ট শিল্পের সমঝদার।
মাঝখানে একদিন গ্যাপ দিয়ে জিনিয়া হাজির হয় এইচএ এন্টারপ্রাইজে তার চিত্রকলার পেট্রন হোসেন আলীর কাছে।
হোসেন আলী শিল্পীর কদর বোঝেন। রং-তুলি, কাগজ-ক্যানভাস এসব কেনার জন্য আগাম দশ হাজার টাকা দেন। জিনিয়া বারবার বলে, ‘এত টাকার কী দরকার? আপনি তো টাকা দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘এখন না থাকতে পারে, কিন্তু পরে দরকার হবে, শিল্পীর একটা নিজস্ব স্টুডিও থাকতে হয়, পিকাসোর ছিল, সালভাদর দালির ছিল।’
হোসেন আলীর মুখে পিকাসো, দালি এসব নাম শুনে জিনিয়ার মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায়।
জিনিয়া বলে, ‘তাহলে আপনার একটি ছবি দিন।’
হোসেন আলী তার দামি ব্রিফকেস খুলে এই পকেট সেই পকেট হাতড়ে লাল কাতানপরা এক সুদর্শন তরুণীর একটি ছবি বের করে তার হাতে দিয়ে বলেন, ‘আমার পোর্ট্রেট থাক, এটা করে দাও, এটা বিয়ের দিনের ছবি।’
—কে?
—নায়লা, বিয়ের দিন নায়লা।
—নায়লা কে?
—পারলে ছবিতে যেমন আছে, তার চেয়ে সুন্দর করতে পার, আমি শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। এখন অবশ্য নায়লার এই চেহারা নেই। তবুও এটা করে দাও, আমি ওকে গিফট করব।
জিনিয়ার হতভম্ব দশা তিনি কাটিয়ে দেন। বলেন, ‘নায়লা এখন বেড-রিডেন। কোলোন ক্যান্সার ফোর্থস্টেজে পৌঁছে গেছে। খুব বেশিদিন আর টেকার কথা নয়। ছবিটা তার বেডরুমে টাঙিয়ে দেব ঠিক করেছি।’
জিনিয়া বলল, ‘আমি কি একবার তাকে দেখতে যেতে পারি?’
তিনি বললেন, ‘অবশ্যই। ছবিটা শেষ হওয়ার পর তুমি নিজেই ঘরে টাঙিয়ে দিয়ে এসো। এখনকার চেহারাটা একবার দেখলে এর একটা ভিন্ন ইম্প্রেশন, ভিন্ন এফেক্ট তোমার ওপর পড়তে পারে তাতে আমি যে ছবিটা চাচ্ছি তার ওপর এই ইম্প্রেশনের একটা প্রভাব পড়তে পারে।’
জিনিয়া তার হাতের ছবিটা বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করে, ‘তিনি এখন কোথায় থাকেন?’
—কিছুদিন হাসপাতালে কিছুদিন বাড়িতে। তুমি আসলে জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছ, আমার আগ্রহের কারণটা কী?
জিনিয়া বলল, ‘একজাক্টলি।’
এবার হোসেন আলী তার রিভলভিং চেয়ারটা খানিক পিছিয়ে নিয়ে দৃষ্টিটা স্প্লিট এয়ারকন্ডিশনারের দিকে রেখে বললেন, ‘নায়লা আমার ওয়াইফ। বছর খানেক আগে আমরা নিশ্চিত হই ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে। টাটা মেমোরিয়াল ক্যান্সার হসপিটাল ঘুরিয়ে এনেছি। এখনো ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট চলছে। কিন্তু আমি জানি শিগগিরই ডাক্তার একদিন বলবেন, থাক এসব ওষুধ দিয়ে ম্যাডামকে আর নির্যাতন করার দরকার নেই। এখন থেকে শুধু প্যালিয়েটিভ মেডিসিন।’
জিনিয়া বলল, ‘তাই! অ্যাম সরি স্যার।’
তিনি বললেন, ‘তাড়াতাড়ি ছবিটা ধরে ফেলো, যাতে নায়লা দেখে যেতে পারে। নায়লার কথা যা বলেছি, ছবি আঁকা শুরু করার আগে সব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলবে। বিষণ্ন শিল্পী, বিষণ্ন মডেল ছবিতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে না। তুমি কি জানো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যখন মোনালিসা আঁকছিলেন, তখন তার মডেলের মন প্রফুল্ল রাখার জন্য তিনি ব্যান্ডপার্টি নিয়োগ করেছিলেন। বাইরে বাজনা বাজছে, ভেতরে দা ভিঞ্চি মোনালিসা আঁকছেন।’
হোসেন আলী দুলাভাই খাবার টেবিলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মমতাজ মহল কি জীবিত?’
জবাবও তিনিই দিলেন, ‘জীবিত হওয়ার কোনো কারণই নেই। মরার পর পাঁচশ বছরে তো আসল ভূত হয়ে যাওয়ার কথা। একেবারে ‘এ’ ক্যাটাগরির ভূত।’
তখন কথা বলল ক্লাস এইট থেকে নাইনে ওঠা আমাদের সবচেয়ে ছোট শ্যালিকা ডেইজি, ‘আসলে পাঁচশ বছর এখনো হয়নি, চারশ বছরও হয়নি। ১৭ জুন ২০৩১ মমতাজ মহলের চারশতম মৃত্যুবার্ষিকী।’
হোসেন আলী বলেন, ‘মানে মানুষের ঘাড়ে চাপার যে প্রবণতা, এটা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ৫০০ বছর পুরো হলে একেবারেই থাকে না। তখন তারা মানুষ নিয়ে ঘাটায়ও না।’
জিনিয়া বলল, ‘আমার হাজব্যান্ড সবকিছুতেই এক্সপার্ট। ভূত প্রেতিনীবিদ্যাতেও। আমি মরার পর একবার যদি তার ঘাড়ে উঠতে পারি, আমাকে আর নামাতে পারবে না।’
হোসেন আলী বললেন, ‘তুমি যদি এখনো আমার ঘাড়ে না উঠে থাকো সে সুযোগ আর পাবে না। সব যদি ঠিকঠাক থাকে তাহলে আমি আর বছর সাতেক আছি।’
জিনিয়া ধমকে উঠে, ‘এসব বাজে কথা বলবে না। হায়াত, মউত, রিজিক এসব মানুষের হাতে নেই।’
হোসেন আলী কথা বলতে পছন্দ করেন। আবার মমতাজ মহলে ফিরে এসে বললেন, ‘নানুভাই উকিলের তাজমহল সিনেমাটা দেখে ফেলো। ১৯৪১ সালের ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট মমতাজের ভূমিকায় ছিল নায়িকা সুরাইয়া। সমস্যার শুরু সেখান থেকেই। সুরাইয়া যেহেতু সুন্দরী, সবাই ধরে নিল মমতাজও সুন্দরী। মমতাজ মহলের চেহারাটা যে বিচ্ছিরি, মহুয়ার সে ধারণাও নেই। রানি ভিক্টোরিয়ার মতো দেখতে। ১৬ নম্বর বাচ্চা হওয়ার সময় অতিরিক্ত ব্লিডিংয়ে বেচারি মারা যায়। এত কিছু যদি মহুয়া জানত, তাহলে আনিসকে অন্তত মমতাজ মহল নিয়ে কিছু বলত না। জাস্ট ইমাজিন ১৬ নম্বর বাচ্চা!’
ডেউজি ফিসফিস করে বলল, ‘দুলাভাই আপনার পার্সে কি মমতাজ মহলের কোনো ফটো আছে?’
—পার্সে থাকবে কেন?
ডেইজি বলল, ‘ছেলেরা তো মানিব্যাগেই গার্লফ্রেন্ডের ছবি রাখে। দেখি সুন্দর কি না?’
পাঁচ.
তাজমহল না দেখে ফিরে আসার এক বছরের মধ্যেই আমাদের জমজ সন্তান হলো। আইডেন্টিক্যাল টুইন। দুটোই ছেলে।
মহুয়া বলল, ‘ছেলেদের নাম ঠিক করেছ?’
—ঠিক করিনি, তবে দুটো নাম মাথায় ঘুরঘুর করছে। তুমিও চিন্তা করো।
—তোমার নাম দুটো কী শুনি।
আমি বললাম, ‘তোমার নাম তো ‘ম’ দিয়ে শুরু। সিজার করার পর যেটা আগে বেরিয়েছে, ওটা হতে পারে মন্ময়, সুন্দর নাম। আর মন্ময়ের সাথে মিল রেখে অন্যটাকে বলতে পার তন্ময়।’
সিজারের সেলাই দেওয়ার সুতো আর কেটে বের করতে হয় না, একসময় এমনিতেই শরীরের সঙ্গে মিশে যায়। মহুয়ার স্টিচ তখনো কাঁচা। তখনো তার নড়াচড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে। নদিয়া শান্তিপুরের টানে মহুয়া শুদ্ধ উচ্চারণে বলল, ‘দারুণ নাম রেখেছ দেখছি। কোথায় পেলে এমন চমত্কার নাম? বুঝতে পেরেছি তোমাকে কদিন খুব করে বাংলা ডিকশনারি ঘাটতে হয়েছে।’
আমি খুশিই হই। বলি, ‘ডিকশনারি ঘাটিনি। এমনিই ভাবছিলাম কী নাম হলে ভালো হয়—অবশ্যই শ্রুতিমধুর হতে হবে।’
মহুয়া বলল, ‘তার মানে তুমি অনেকদিন ধরেই ভাবছিলে? কোন দিন থেকে বলো তো, যে দিন সনোলজিস্ট বললেন টুইন বেবি, আর আমিও তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জেনে নিলাম দুটো বাবুই ছেলে, তখন থেকেই তাই না?’
মহুয়ার কথার ধরনই আমাকে বলে দিচ্ছে আমাদের আলোচনার ডিরেকশন দ্রুত পাল্টে যাবে। কথোপকথনের রশি আমার হাতে নয়, যে টেনে ধরলেই ঝড়ো বাতাসটা কেটে যাবে।
মহুয়া তিরিশ সেকেন্ড চুপ থেকে ভালো করে দম নিয়ে প্রায় চিত্কারের মতো করে বলল, ‘তুমি একটা আস্ত শয়তান! আমি তোমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত চিনি।’
আমি হতবাক হইনি, কারণ আকস্মিক স্বর পরিবর্তন মহুয়ার এটাই তো প্রথম নয়।
আবারও বলল, ‘তুমি একটা আস্ত শয়তান। ‘ম’টা আমার না, মমতাজ মহলের। ‘ম’ আর ‘ত’। মন্ময় আর তন্ময়। ‘ম’ আর ‘ত’—দুটোই নিয়েছ মমতাজ থেকে। ‘ম’ আর ‘ত’ ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোনো বর্ণ নেই। তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়ে পার পেয়ে যাবে?’
আমি বলি, ‘কী বলছ এসব!’
স্বর একেবারে নামিয়ে বলল, ‘এই সহজ কথাটাও বানান করে ভেঙে ভেঙে বোঝাতে হবে? তোমার ওপর মমতাজ মহল এমন ভাবেই ভর করেছে যে, সে নামের বোঝা আমার মাসুম বাচ্চা দুটোকেও বহন করতে হবে। তুমি কী ভেবেছ? তুমি ভেবেছ আমি আমার মায়ের মতো নির্বোধ? বাবা তার পিএকে বিয়ে করে ফেলল, মা পাঁচ বছর টেরই পায়নি। যখন টের পেল, তখন বলল, তাতে কী হয়েছে, জিনিয়ার বাবার সামর্থ্য থাকলে আরো একটা করুক। মনে রেখো আমি একেবারে উল্টো। শোনো তুমি যদি বাবুদের নাম চেঞ্জ না করো, এদের ফার্স্ট বার্থডের দিন গলাটিপে দুটোকেই মেরে ফেলব।’
আমি থতমত খেয়ে বলি, ‘আমি তো বাবুদের নাম রাখিনি। আমি একটা সাজেশন দিয়েছিলাম। বাবুদের নাম তুমি ঠিক করো, তুমি অনেক ফিকশন পড়েছ, কবিতা পড়েছ, বাবুদের সুন্দর নাম তুমিই বের করতে পারবে।
মহুয়া বলল, ‘অবশ্যই পারব, একশটা বাবু হলেও পারব। তোমার অন্তরে কী সেটা বের করার জন্যই তো তোমাকে নাম রাখার কথা বলেছিলাম। এখন বেরিয়ে গেল তোমার থলের বিড়াল। থলের মুখ বন্ধ রাখার মতো বুদ্ধিও তোমার নেই।’
***
মহুয়ার রাখা নামও আমার পছন্দ হয়েছে। আমাদের একটি ছেলের নাম আদনান একটি আফসান। দেখতে হুবহু একই রকম। যখন হাসে, একসাথে দুটোই হাসে, যখন ঘুম পায় হাই তোলে, তখনো একসাথেই করে। কোনটা যে আদনান, কোনটা আফসান—খুব কাছে থেকে কিছুদিন না দেখলে কেউই শনাক্ত করতে পারবে না।’
ছেলেদের জন্য আমি টুইন প্যারাম্বুলেটর কিনেছি, টুইন কট কিনেছি, কাপড়চোপড় ফিডার দোলনা সবই জোড়ায় জোড়ায় এবং দেখতে একই রকম। দেখতে দেখতে ছেলেরা বড় হয়ে গেল। প্যারাম্বুলেটর ছেড়ে ওয়াকার, ওয়াকার ছেড়ে দু পা, তারপর ট্রাইসাইকেল বাইসাইকেল করতে করতে দুজন ভালো রেজাল্টের জন্য যেমন এক্সট্রা একাডেমিক কারিকুলামের জন্যও তেমনি পরিচিত হয়ে উঠল। এ পর্যন্ত তিনবার তিনটি টিভি চ্যানেলের টুইন শোতে অংশগ্রহণ করেছে। গিটার বাজিয়ে দুজন গান গেয়েছে : আই ওয়ান্ট মাই টুইন টু টেইক মাই হ্যান্ড।’
‘এ’ লেভেল করার সময় আদনান ও আফসান কলেজ অডিটোরিয়ামে নাটক করেছে, ‘কমেডি অব এরর্স’। শেকসপিয়ারের ভ্রান্তিবিলাশ। তাদের সঙ্গে নাটকে যোগ দিয়েছে ভিন্ন একটি কলেজের আরো একজোড়া আইডেন্টিক্যাল টুইন—নুজহাত ও নুসরাত।
আমি ও মহুয়া ছেলেদের নাটক দেখতে যাই। অনেকদিন পর আমরা একসঙ্গে বেরিয়েছি। আজকাল মহুয়ার শরীরটা ভালো থাকছে না। এক ধরনের হরমোন ইমব্যালেন্সের কারণে একটু মোটা হয়ে যাচ্ছে। মহুয়া বলল, ‘হট ফ্লাশ হচ্ছে।’ জিনিয়া বলেছে, ‘ও কিছু নয়, আর্লি মেনোপোজ। শরীরে আরো ঝামেলা হবে, মেজাজ আরো খিটখিটে।’
অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্যারেন্টসদের জন্য সেকেন্ড রো রিজার্ভড। আমাদের পাশেই বসেন নুজহাত ও নুসরাতের মা। মহুয়া যথেষ্ট স্মার্ট, কিন্তু তিনি সম্ভবত তাকেও ছাড়িয়ে যাবেন। তিনি নিজে থেকে হাত বাড়িয়ে শেকহ্যান্ড করলেন। (আমি কি তখন বলতে পারি, ‘সরি আমার ওয়াইফ পাশে, এখন হাত মেলালে পর এরজন্য আমাকে অনেক খেসারত দিতে হবে।’)। আমাকে ও মহুয়াকে দুটো করে বিজনেস কার্ড দিলেন। একটিতে তিনি প্রোপাইটার—ম্যারিলিন মনরো হেয়ার শপ আর অন্যটিতে পার্টনার—অ্যা টু জেড ফিটনেস উমেনস এক্সক্লুসিভ জিম।
আমি বললাম, ‘সরি বিজনেস কার্ড সাথে নেই।’
তিনি বললেন, ‘ইটস ওকে। আমি লাঞ্চের আগে অ্যা টু জেড ফিটনেসে বসি আর লাঞ্চের পর হেয়ার শপে। সেপ্টেম্বরে আমার আর একটা শপ বারিধারায় ওপেন করতে যাচ্ছি। চুলের যত্নে আমরা বেস্ট ইন ঢাকা। আমরা ফেস আপলিফটও করি। আমরা যেসব প্রোডাক্ট ব্যবহার করি সব অর্গানিক। আর আমাদের জিমনেশিয়ামটা ওয়ান্ডারফুল। এমনসব মিউজিক চালানো হয়, এমনিতেই আপনার শরীর দুলতে থাকবে। সময় করে একদিন আসুন।’
কার্ডে তার নামটা দেখে একটু আঁতকে উঠি। তিনি আমার মোটেও চেনা নন। এমনকি মহুয়ার চেনা হওয়ার কারণ নেই। তার নাম অ্যানি মমতাজ খান। তার নামের একটি অংশ আমাদের অচেনা হওয়ার কারণ নেই। আমি মমতাজ নাম প্ররোচিত কলহ এড়াতে অনেক বছর ধরে মমতাজ ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরির পাউরুটি কিনি না। মমতাজ উদ্দিন আহমেদের নাটক দেখি না। মমতাজ নামের কোনো শিল্পীর গান শুনি না। আমার বোনের শ্বশুর মমতাজ আলী খানের নাম উচ্চারণ করি না। কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির নামও নিই না। আমার বন্ধু ক্যাপ্টেন তাজকেও ফোন করি না। দুর্ভাগ্যই বলতে হয়, বসেছি অ্যানি মমতাজ খানের একেবারে পাশে।
মহুয়া ঘাড় বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘মেয়েদের দেখতে খান সাহেব মানে আপনার হাজব্যান্ড এলেন না? খুব ব্যস্ত নাকি?’
তিনি বললেন, ‘খান সাহেব অ্যাকচুয়ালিয়া আমার বাবা ফতেহ আলী খান। নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। বিখ্যাত ফটোগ্রাফার। নুজহাত-নুসরাতের বাবা, মানে আমার এক্স হাজব্যান্ড রিটায়ার্ড কর্নেল খোরশেদ মোল্লা। ভাবুন তো, আমার নামের সাথে মোল্লা যোগ করলে কেমন শোনাত অ্যানি মমতাজ মোল্লা। থ্যাঙ্কস গড যে শেষ পর্যন্ত তার কাছ থেকে ডিভোর্সটা আদায় করতে পেরেছি। আমার মেয়েদের নামের সাথে আমারই নাম নুজহাত মমতাজ দুসরাত মমতাজ।’
আমি আসন্ন দুর্যোগ আঁচ করে মহুয়াকে বলি, ‘তুমি ম্যাডামের পাশে বসে গল্প কর আমি তোমার জায়গায় বসি।’
মহুয়া বলল, ‘সে কী কথা! তুমিই থাকো, কথা বলো। গিভ হার কোম্পানি।’
অ্যানি মমতাজ মহুয়াকে বলল, ‘সো থটফুল অব ইউ। মেয়েরা জেনারেলি এমন লিবারেল হয় না। থ্যাঙ্ক ইউ।’
***
নাটক শুরুর ঘণ্টা বাজল।
শুরুটা খুব বোরিং, সরাসরি নাটকে না গিয়ে ইংরেজির একজন শিক্ষক শেকসপিয়ারের কমেডি নিয়ে দশ মিনিটের একটি লেকচার ঝাড়লেন। আমার যখন হাই উঠছে, তখন মঞ্চে আবির্ভূত হয় অ্যান্টিফেলাস অব এফেসাস এবং অ্যান্টিফেলাস অব সিরাকিউস। প্রথম তরুণ আমাদের আদনান, দ্বিতীয় তরুণ আফসান। আমার অবস্থান যাই হোক, নাটকে আমার ছেলেদের রাজকুমার হতে বাধা নেই। মঞ্চে এসে যায় একটু মোটাসোটা মিষ্টি চেহারার আদ্রিয়ানা ও লুসিয়ানো। এরাও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করছে, এদের ইংলিশ উচ্চারণে আমার মতো বাংলার টান নেই।’
অ্যানি মমতাজ খান আঙুল তুলে দেখালেন, ‘ওই যে আদ্রিয়ানা এটা আমার নুজহাত আর লুসিয়ানো হচ্ছে আমার নুসরাত।’
কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘দারুণ মানিয়েছি তাই না? দেখি ওরা কেমন করে। যদি সব মিলিয়ে ভালো মনে হয় বলবেন, তাহলে ব্রিটিশ কাউন্সিল অডিটোরিয়ামে একটা শো করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। ব্রিটিশ হাইকমিশনের সেকেন্ড ম্যান মেল গিবসন আমার ফ্রেন্ড। ওকে বললে কথা শুনবে।’
নাটকের সিকি ভাগও শেষ হয়নি, মহুয়া জানাল অসুস্থ বোধ করছে। বমি হতে পারে।
—এক্সকিউজ মি আমার ওয়াইফ একটু অসুস্থ আমরা বেরোচ্ছি।
—সে কী! ছেলেদের নাটক দেখবেন না? খুব ভালো অভিনয় করছে।
তার কথার জবাব না দিয়ে বাধ্য স্বামীর মতো মহুয়াকে অনুসরণ করি।
বেরোতে বোরোতে মহুয়া বলল, ‘মমতাজ মহলের সাথে বেশ জমিয়ে ফেলেছ দেখছি। চুল কাটতে যাবে না কি?’
—কার কথা বলছ? মিসস খান? মানে মেয়ে দুটোর মা?
মহুয়া ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, ‘মিসেস খান আবার কী? মমতাজ নাম মুখে নিতে ভয় পাচ্ছ?’
—কী যা তা বলছ! মিসেস খানের সাথে তো জীবনে আমার এই প্রথম দেখা, তাও তোমার সামনেই।
আমার কথার প্রত্যাশিত জবাব হতে পারত, ‘তাতে কী?’ কিন্তু মহুয়া ভিন্ন ট্র্যাকে গিয়ে বলল, ‘আমি জানি তুমি চাচ্ছিলে তোমাদের এই দেখাটা আমার সামনে না হয়ে আড়ালে হোক। তাহলে বেশি জমত।’
আমি বলি, ‘মানে?’
—মানে খুব সহজ। তোমাকে দেওয়া বিজনেস কার্ডটা যত্ন করে রেখে দিও, বাংলাদেশে মহিলা নাপিত কিন্তু একেবারে হাতে গোনা কয়েকজন। যা যা কাটাতে চাও, সব করে দেবে।
মহুয়া তাকে দেওয়া বিজনেস কার্ডটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে রাস্তার পাশের ড্রেনের ওপর ছুড়ে মারল। নিক্ষেপে পর্যাপ্ত জোর ছিল না ফলে একটি টুকরোও ড্রেন পর্যন্ত পৌঁছেনি।
এবার আমি খানিকটা অসহিষ্ণু হয়ে বললাম, ‘ছেলেরা নাটক শেষ হলে আমাদের খুঁজবে। তোমার যেহেতু বমি হবে বাসায় চলে যাও, আমি নাটক শেষ হওয়ার পর ছেলেদের সাথে আসব।’
—কে বলল বমি হবে?
—তুমি বলেছে মাত্র ক’মিনিট আগে।
—বেশ যা হওয়ার হবে। আমি আসলে একটা অ্যাজাম্পশন টেস্ট করার জন্য বের হয়েছি। আমার বমিটমি কিছুই পাচ্ছে না। আমি শুধু এটাই দেখতে চেয়েছিলাম যে, আমাকে বিদায় করে দিয়ে ছেলেদের চোখের সামনে তুমি মমতাজ খানের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছ। তোমার কাছে আমার অসুস্থতার কোনো দাম নেই! তোমার কাছে ছেলেদের অভিনয়ের কোনো দাম নেই! তুমি থিয়েটারে এসেছ ওই প্রস্টিটিউটটার পাশে বসার জন্য।’
—তুমি কাকে প্রস্টিটিউট বলছ?
—কাকে মানে? তুমি এখনো বুঝতে পারোনি? আমি তোমার মমতাজ মহলকে প্রস্টিটিউট বলেছি।
—তার নাম মমতাজ মহল নয়। তাছাড়া এরকম কেউ এখানে এসে বসবে, এটা আমার আগে থেকে জানাও ছিল না।
—বুঝতে পেরেছি, জানা থাকলে আমাকে আনতে না এই তো?
আমি রেগে যাই, ‘বলি, শাট আপ আর একটি কথাও বলবে না।’
মহুয়া বলল, ‘ঠিক আছে চুপ হয়ে গেলাম। সত্য বললে গায়ে জ্বালা ধরবেই।’
আমি বললাম, ‘বেশ! আমি গিয়ে তাকে বলি যে তুমি তাকে নাপিত বলেছ। প্রস্টিটিউট বলেছ। তিনি তার মেয়েদের বলবেন। মেয়েরা তোমার ছেলেদের বলবে, তারপর তোমার কী পরিণতি হয় নিজেই দেখবে।’
আমি আবার অডিটোরিয়ামের দিকে পা বাড়াই।
মহুয়া বলল, ‘আমিও যাব। কিন্তু তুমি তাকে কিছু বলতে পারবে না। আমি চাই না আমার ছেলেরা ডিস্টার্বড হোক।
আমরা যখন ভেতরে ঢুকি আমাদের শূন্য চেয়ার দুটো আর শূন্য নেই। অ্যানি মমতাজ খানের পাশে বসেছে কুিসত ও দুর্বৃত্ত চেহারার একজন পুরুষ। আমরা পেছনে একেবারে শেষ রো-তে গিয়ে বসি।
করতালির মধ্য দিয়ে নাটক শেষ হয়। আমাদের আদনান নুজহাতের এবং আফসান নুসরাতের হাত ধরে মঞ্চের একেবারে সামনে এসে বাউ করে; আবারও হাততালি।
মহুয়া অনেকক্ষণ ধরে হাততালি দেয়।
তারপর মহুয়া বদলে যায়। আমার হাত চেপে ধরে বলে, ‘চলো না মেয়ে দুটোকে একটু সামনাসামনি গিয়ে দেখি?’
—কেন এখান থেকেই তো দেখা যাচ্ছে।
—এখান থেকে সুন্দরই লাগছে, আমাদের ছেলেরা যদি মেয়ে দুটোকে পছন্দ করে তা হলে না হয়...
এবার আমি বলি, ‘তুমি কি কিছুদিন জেল খাটতে চাও? তুমি জানো না বিয়ের জন্য ছেলেদের কমপক্ষে একুশ আর মেয়েদের আঠার বছর হতে হয়।
—তাহলে এনগেজমেন্ট করিয়েও তো রাখা যায়।
—তা যায়, কিন্তু যে মহিলা এই মেয়েদুটোর মাকে প্রস্টিটিউট মনে করে, তারা তার ছেলেদের কেন বিয়ে করবে?
মহুয়া বলল, ‘আমি শুধু বলেছি, কিন্তু প্রস্টিটিউট মিন করিনি।’
আমি বললাম, ‘দুই মেয়ে এবং মায়ের নামের সাথে যে মমতাজ আছে এটা তো জানো?’
মহুয়া বলল, ‘ধ্যাত্!’
ছয়.
আদনান, আফসান যখন চার অতিক্রম করল মহুয়া বেসরকারি কলেজে তুলনামূলকভাবে কম বেতনে চাকরিতে ঢুকল। আমি শিক্ষকতা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত বেশি বেতনে সিমেন্স বাংলাদেশে যোগ দিলাম। হেড অফিস জার্মানিতে।
আমার কাজ ছিল সিমেন্স উত্পাদিত দ্রব্য বাজারজাত করা। বড় টিমের আমি একজন সদস্য। সিমেন্স দলগত এবং ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যাচাই করত। প্রথম বছর শেষ হতেই আমি শ্রেষ্ঠ তিনজন কর্মীর একজন নির্বাচিত হই। এরজন্য খুব বড় রিওয়ার্ড জার্মানিসহ ইউরোপের আরো একটি দেশ ঘুরে দেখার জন্য কাপল এয়ার টিকিট, বিনে পয়সার থাকা খাওয়া এবং সামান্য হাতখরচও পেয়ে যাই।
সিমেন্সে যোগ দেওয়ার এক মাসের মধ্যেই আমার শ্বশুরবাড়ির দিককার আত্মীয় বাংলা একাডেমির প্রথম কর্মকর্তা নুরুল হুদা বললেন, ‘সিমেন্সের চাকরিতে যারা ভালো খাটাখাটনি করতে পারে, তাদের জন্য আছে হাইলি রিওয়ার্ডিং। আর সেজন্য নিজেকেও তো তৈরি করতে হয়। কালপরশু সন্ধ্যায় চলে এসো ধানমন্ডি দুনম্বরে জার্মান কালচারাল সেন্টারে। ওখানে জার্মান ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স করানো হয়, সপ্তাহ দুদিন ক্লাস সন্ধ্যার পর। আমি তোমার কোর্স ফি ফিফটি পার্সেন্ট কমিয়ে দিতে পারব।’
তিনি কেমন করে পারবেন, তা স্পষ্ট হলো পরের সপ্তাহেই। ভর্তি হতে গিয়ে দেখি তিনি তিনজন শিক্ষকের একজন, আরেক জন মফিজ দীন শেখ এবং তৃতীয় জন আমার চেয়ে কমবয়সী একজন জার্মান নারী নাস্তাসিয়া শিন্ডলার। কয়েকদিনের মধ্যেই গুটেন মার্গন, গুটেন টায়, গুটেন আবেন্ড, গুটেন নাখট ধরনের শব্দগুলো শিখে নেই। আমার নিজস্ব একাডেমিক বিষয়গুলোতে ভালো না করলেও নাস্তাসিয়া শিন্ডলারের টানে জার্মান ভাষাতে ভালোই করেছি। নিত্যদিনের ব্যবহার্য কিছু জার্মান শব্দজ্ঞান আমাকে বেশ এগিয়ে দিয়েছে। নাস্তাসিয়ার নাম কখনো মহুয়ার সামনে উচ্চারণ করিনি।
জার্মানি ও ইউরোপের অপর একটি দেশ—কোনটাতে যাব?
সিমেন্স কর্পোরেট হেডকোয়ার্টারের হিউম্যান রিসোর্স বিভাগে আমাদের সফর নিয়ে কথা বলার জন্য মিউনিখ প্রান্তে নিয়োজিত থাকছে মোনালিসা দোমিঙ্গোজ। যত ধরনের প্রশ্ন থাকে মোনালিসা সবগুলোর জবাব দেবে এবং ইউরোপে আমাদের কাজটাও সেও এগিয়ে রাখবে।
প্রথম যেদিন ফোন করলাম, বললাম, ‘আমার নাম আনিস, সিমেন্স বাংলাদেশ।’
মোনালিসা বলল, ‘আমি জানি, তুমি সিমেন্স বাংলাদেশের, কিন্তু তোমার নাম অ্যানিস নয় জিসাস।’
আমি বলি, ‘তুমি ভুল করছ, আমার পার্টিকুলার্স আবার চেক করে দেখো, কোথাও একটা ভুল হয়েছে।’
—তোমার সই করা কাগজের ফ্যাক্সকপি আমার সামনে—তুমি পাঁচ ফুট সাত, চশমা পরো, ব্লাডগ্রুপ এ পজেটিভ, তুমি পর্ক খাও না, অ্যালকোহল খাও না, তোমার প্রিয় পাস্টটাইম ঘুমোনো।’
আমি বলি, ‘ঠিকই আছে।’
—বাকিটা বলে নিই। তুমি ম্যারেড। তোমার ওয়াইফ মাহুয়া।
আমি বাধা দিয়ে বলি, ‘মাহুয়া নয়, মহুয়া। এটা একটা নার্কোটিক ফুল।’
—ইটস ওকে, মহুয়া। পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি, নো বেবি, কালো চোখ, মাছ খেতে পছন্দ করে, গল্পের বই পড়ে, ছবি আঁকে। দ্যাটস গ্রেট! আমি তোমার বউয়ের মডেল হবো, তাকে দিয়ে দ্বিতীয় মোনালিসা আঁকাব। সে যাই করুক, তুমি হলে জিসাস।
আমি বলি, ‘হাউ?’ আস্তে করে বাংলায় বলি, ‘পাগল নাকি?’
মোনালিসা দোমিঙ্গোজ বলল, ‘তোমার জন্ম ২৫ ডিসেম্বর।’
—তাতে কী?
—দ্যাটস ক্রিশমাস ডে। তাহলে তুমি অবশ্যই জিসাস।
এবার আমি বুঝতে পারি জিসাস রহস্য।
মোনালিসা বলল, ‘আমার দেশের মেয়েরা তোমাকে পেলে জিসাস ভেবে টুকরো টুকরো খেয়ে স্বর্গে চলে যাবে।’
—জার্মানির মেয়েরা এমন!
—না, আমার দেশ পর্তুগাল। পর্তুগিজ মেয়েরা সেক্সিয়েস্ট ইন দ্য ওয়েস্ট। ইজ মহুয়া সেক্সি?
সেক্স শব্দটা যে এমন অবলীলায় উচ্চারণ করা যায় কখনোই ভাবিনি। আমি চুপ করে থাকি।
মোনালিসা বলে, ‘ইটস ওকে জিসাস। আমার প্রশ্নের উত্তর পরে দিলেও চলবে। তুমি উইক এন্ডের দুদিন ভাবো, এখান থেকে কোন দেশে যেতে চাও, জানাবে, আমি বাকি ব্যবস্থা করব।’
রাতে বাড়ি ফিরে মহুয়াকে বলি, ‘সিমেন্স আমাদের দুদিন সময় দিয়েছে। জার্মানিতে তো থাকবই। দ্বিতীয় কোন দেশে যেতে চাই সোমবার জানাতে হবে।’
মহুয়া বলল, ‘আমি কি কখনো ইউরোপ গিয়েছি নাকি?’
—আমিও তো যাইনি। কিন্তু তুমি তো অনেক পড়াশোনা করেছ?
মহুয়া বলল, ‘বেশ কয়েকটি ইউরোপিয়ান কান্ট্রির নাম বলো।’
আমি বললাম, ‘ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, বুলগেরিয়া, ইতালি, গ্রিস... আরো আছে। কিন্তু সিমেন্স সব মিলিয়ে তিনদিন তিনরাতের খরচ দেবে।’
—তাহলে বলে দাও ফ্রান্স। মিউজিয়ামের টিকিটের দাম কি অনেক বেশি? বেশি হলেও পেইন্টিং দেখব, ল্যুভ মিউজিয়াম যাব।
সোমবার অফিসে গিয়ে খারাপ সংবাদ শুনি। আমাদের তিন শ্রেষ্ঠ কর্মীর প্রথম শ্রেষ্ঠ ওয়াসিউদ্দিন পাসপোর্ট করতে পারছেন না। ইমার্জেন্সি ফি দিয়ে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু স্পেশাল ব্রাঞ্চ থেকে রিপোর্ট দিয়েছে, তিনি নারী নির্যাতন মামলায় পলাতক আসামি। সুতরাং তার ও তার স্ত্রীর যাওয়া হচ্ছে না। এমনকি ব্যাপারটা অফিস পর্যন্ত গড়ালে তার চাকরিও চলে যেতে পারে। বিদেশি কোম্পানিগুলো এসব ঝামেলা নিতে যাবে না। কোম্পানির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিটিও তাদের কাছে অপরিহার্য নয়।
আমি ওয়াসিউদ্দিনের কাছে যাই, তিনি ভিন্ন একটি ইউনিটের প্রধান। আমিই বলি, ‘স্যার কী শুনছি. আপনার নাকি যাওয়া হবে না?’
তিনি বললেন, ‘কমই শুনেছ। কাল এই সময় হয়তো শুনবে আমি জেলে। তোমাদের বলি, জীবনে যদি বাঁচতে চাও বউ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মেয়ে মানুষের দিকে চোখ তুলে তাকাবে না।’
তিনি নিজের দুর্ভাগ্যের কথা যা বললেন, তার সারমর্ম হলো : সিমেন্সে আসার আগে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে এমন একটি এনজিওতে তিনি চাকরি করতেন। রুটিন ইন্সপেকশনে তাঁকে রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে যেতে হতো। সিরাজগঞ্জে সেই এনজিওর মাঠকর্মী সাফিনা তাঁকে একটু বেশি খাতির যত্ন করত। অফিসের তিনতলায় এক রুমের একটি রেস্টহাউস ছিল। রাতের বেলা খাবার নিয়ে সাফিনাই আসত। প্রতিবারই খাবারের দাম একটু বেশিই দিয়েছেন মেয়েটার হাতে। ভেবেছেন, যাক না দু-একশ টাকা বেশি! তারপর সাফিনার টানেই যেতে থাকেন। তারপর শয়তানের ওয়াসওয়াসায় মেয়েটিকে নিয়েই ঘুমোতে শুরু করলেন। সন্ধ্যার বাসে ঢাকা ফিরবেন কিন্তু তার মনে হলো আর একটা রাত থেকে গেলেই হয়। খুব ভোরে চলে যাবেন। স্ত্রীকে ফোন করে বললেন, উত্তরবঙ্গের বাস স্ট্রাইক, ফেরা হচ্ছে না। রাতের বেলা তিনি অবাক হলেন, যখন দেখলেন দরজা ঠেলে তিন যুবক ও একজন হুজুর ভেতরে ঢুকে তাঁদের মেয়ের ইজ্জত হরণের জন্য তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে তাত্ক্ষণিকভাবে সাফিনাকে পাঁচ লক্ষ টাকা কাবিনে বিয়ে করতে বাধ্য করেন। হুজুর হলেন সহকারী কাজী, খাতাপত্র রেজিস্টার সঙ্গে নিয়েই এসেছেন। ঠাণ্ডা মাথার মানুষ বলেই নিজের নাম ছাড়া বাকি সব—বাবা ও মায়ের নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা সবই ভুল লিখেছেন। তাঁরও পরিকল্পনা আছে। চারজনের দলটি বেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁর মনে পড়ল দরজা তিনি নিজ হাতে বন্ধ করেছিলেন নিশ্চয়ই সাফিনাই খুলে দিয়েছে। এই ষড়যন্ত্রে সেও একজন। মুষড়ে না পড়ে তিনিও সাফিনার সঙ্গে নাটক করে যেতে লাগলেন। বললেন, লোকগুলো তাঁর বিরাট উপকার করেছে। কারণ তিনি সাফিনাকে বিয়ের কথা বলার সাহস পাচ্ছিলেন না। আজই বউ নিয়ে ঢাকায় ফিরবেন। বিয়ের বাজারসদাই করবেন। কেনাকাটা শেষ করে পরদিনই আবার রেখে যাবেন। স্বর্ণালঙ্কারের স্বপ্ন সাফিনাকেও প্রলুব্ধ করল। অন্তত একসেট বাড়তি কাপড় আনতে সাফিনা বাড়ি গেল।
এই ফাঁকে অফিসের বুড়ো দারোয়ান বলল, ‘স্যার মেয়েটা খারাপ। এই রেস্টহাউসে এরকম ঘটনা আগেও ঘটিয়েছে। এটাই তার ও তার স্বামীর ব্যবসা।’
তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা লোকটা তার স্বামী। লম্বু কাশেম।
দু-একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেও সাফিনার সামনে এতটুকু অসন্তোষও প্রকাশ করেননি। বরং সে যখন কাপড় আনতে যাচ্ছে, তার হাতে হাজার টাকার একটি নোট দিয়ে বললেন, ‘মিষ্টি নিয়ে যাবে। আর বলবে আমি শিগগিরই ঢাকা থেকে টাকা নিয়ে আসছি সবাইকে বিয়ের খাবার খাওয়াব। এটা আমার জন্য বড্ড আনন্দের ব্যাপার!’
সিরাজগঞ্জ থেকে গাড়িতে এসে নামলেন হাটি কুমরুল। এখানে থেকে বগুড়ার গাড়িতে নগরবাড়ি হয়ে যখন গাবতলি পৌঁছান তখন রাত সাড়ে দশটা। খানিকটা হেঁটে রেস্তোরাঁয় কাচ্চি বিরিয়ানি খেয়ে মাজার রোডের একটি হোটেলে এসে উঠলেন। এখানে ঠিকানা তো ভুল লিখলেনই, নামও ভুল লিখলেন। স্ত্রীর নাম সঠিকই আছে।
খুব ভালো একটা রাত কাটল। কাগজ-কলম নিয়ে বিয়ের শপিংয়ের লম্বা তালিকা করলেন। তিনিই সাফিনাকে বললেন, ‘ঢাকার স্বর্ণে খাদ বেশি থাকে। আমি তোমাকে দুই লক্ষ টাকা দিয়ে দিচ্ছি তুমি সিরাজগঞ্জ থেকে পছন্দমতো বানিয়ে নিও।’ যতদিন তাকে স্থায়ীভাবে ঢাকার বাসায় তুলতে না পারছেন তাকে প্রতি মাসের প্রথম দিন পনের হাজার টাকা হাত খরচ দেওয়ার কথাও বললেন। নাস্তা করতে গেলে বেশি সময় লেগে যাবে তারচেয়ে তিনি মতিঝিলের ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে আসার সময় নাস্তাও আনবেন।
তিনি পকেট হাতড়ে টাকা গুনে বললেন, ‘তাহলে তো বাসে যেতে হবে। দেরি হয়ে যাবে, তাছাড়া দশ লাখ টাকা নিয়ে তো বাসে আসাও ঠিক হবে না।’ সাফিনা তাঁর দেওয়া মিষ্টি কেনার এক হাজার টাকা দিয়ে বলে আরো ভাঙতি টাকা আছে, তার ভ্যানেটিব্যাগ ঝেড়ে আরো দুশ পঞ্চাশ টাকা দিতে দিতে বলে, ‘সাবধানে যাবেন স্যার।’ অত্যন্ত আবেগময় একটি চুম্বন সেরে ওয়াসিউদ্দিন বেরিয়ে যান। সবার আগে মহাখালিতে নিজের অফিসে গিয়ে সেদিন থেকে কার্যকরী করার জন্য পদত্যাগপত্র দাখিল করে প্রশ্ন এড়াতে দ্রুত বেরিয়ে যান। হাজার টাকা খরচ করে চাইনিজ রেস্তোরাঁ থেকে স্ত্রী ও সন্তানের জন্য খাবার কিনে বাড়ি
চলে আসেন। একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে অনেকদিন পর দুপুরে একটা ঘুম দেন।
সাফিনার সঙ্গে তাঁর আর দেখা হয়নি। এটুকু বেশ মনে পড়ছে, সাফিনার সকালের নাস্তা করা হয়নি, হাতে কোনো টাকাও ছিল না। নিশ্চয়ই দীর্ঘ সময় দশ লক্ষ টাকার জন্য বসেছিল।
কিন্তু নারী নির্যাতনের একটি মামলা করার বৈধ অধিকার তার আছে। এটি কি তারই মামলা? কিন্তু ভিন্ন ঠিকানার এই ওয়াসিউদ্দিনই যে সেই ব্যক্তি তা কে জানে!
তিনি বললেন, ‘তাহলে ভাবতে দাও মহিলাটি না হলে অন্য কেউ করেছে কি না? কিন্তু কে?’
সাত.
সোহরাব যখনই মোনালিসা দোমিঙ্গোজকে ফোন করে, অ্যান্সারিং মেশিন বলে, ‘তোমার কোনো বার্তা থাকলে এই কথোপকথনের শেষে টুং শব্দ হওয়ার পর তোমার বার্তাটি বলবে। মোনালিসা ফিরে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’
বিকেল পাঁচটার দিকে জানা যায় সিমেন্স বাংলাদেশের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ কর্মী চিন্তাহরণ মল্লিকের জার্মানিতে যাওয়া অনিশ্চিত। গতরাতে জার্মানিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই স্ত্রীকে নিয়ে ইস্টার্ন প্লাজায় শপিং করতে গিয়েছিলেন, হাতভর্তি কেনাকাটা নিয়ে ফেরার সময় অধোগামী এস্কেলটরে হুমড়ি খেয়ে পড়েন তাঁর স্ত্রী, তারপর ব্লিডিং শুরু হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ইমার্জেন্সির ডিউটি ডাক্তার বলেন, ফিটাল অ্যাবরশন হয়ে গেছে, ফ্র্যাকচার আছে কি না দেখার জন্য এক্সরে করতে হবে। বাকি খবর এখনো জানা যায়নি। চিন্তাহরণ মল্লিক কাল রাত থেকেই হাসপাতালে। তাঁর স্ত্রীর নাম আরতি বালা। পুতুল পুতুল চেহারায় সুন্দর একজন নারী। আমাদের অ্যানুয়াল গেট টুগেদারে এসেছিলেন এবং হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শুনিয়েছেন, ‘আজি শুভদিনে পিতার ভবনে চল চল চল যাই।’
‘ওয়ান মোর ওয়ান মোর’ বলার পর আরো একটি গান শুনিয়েছেন :আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে।
মঙ্গলবার আরেক দফা কথা হয় মোনালিসা দোমিঙ্গোজের সঙ্গে। আমি বলি, আমার ইচ্ছে ছিল পর্তুগাল যাওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে মোনালিসা বলল, ‘টু মিট দ্য সেক্সিয়েস্ট গার্লস অব দ্য ওয়েস্ট? ওকে, আমি পর্তুগালের টিমটার সাথে যাব।’
আমি বললাম, ‘কিন্তু আমার উপায় নেই, আমার ওয়াইফ পছন্দ করেছে ফ্রান্স, প্যারিসে ল্যুভ মিউজিয়াম দেখবে।’
—তোমার বউ তো চাইলে বিনে পয়সায় লাইভ মোনালিসাই দেখতে পারে, মিউজিয়ামে গিয়ে টাকা খরচ করে ছবি দেখার কী দরকার!
আমি বুঝতে একটু দেরি করি, একটু পরেই বুঝতে পারি লাইভ মোনালিসা তো সে নিজেই।
এবার সিরিয়াস পরামর্শদাতার মতো বলতে থাকে আমাকে, ‘যদি অনেস্ট অপিনিয়ন দিতে হয় আমার এক নম্বর প্রেফারেন্স ইতালি, দু নম্বর গ্রিস, তিন নম্বর স্পেন। সিমেন্সে কাজ করলে ভবিষ্যতে তোমার ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এসব জায়গায় আসা হবে। কিন্তু কোম্পানির টাকায় ইতালি কি গ্রিস কি পতুর্গাল যাওয়ার সুযোগ পাবে না। বেশ, তোমারটা কনফার্ম করে দিচ্ছি জার্মানি আর ফ্রান্স।’
আমি বললাম, ‘মহুয়া চেয়েছে, কাজেই আমার কথা বলার সুযোগ নেই।’
—খুব অবিডিয়েন্ট হাজব্যান্ড দেখছি। তোমাদের দেশি এরকম একটা অবিডিয়েন্ট পুরুষ মানুষ আমার জন্য খুঁজে দিও তো।
পরদিন আমার ও মহুয়ার পাসপোর্ট, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের দু কপি করে পাসপোর্ট সাইজ ছবি, কেবল স্বাক্ষর করা আমাদের দুজনের ভিসা ফর্ম অফিসে জমা দিলাম। ভেতরে যা কিছু লেখার আমাদের প্রটোকল শাখা পাসপোর্ট দেখে লিখে দেবে। দূতাবাসের কনস্যুলার সেকশনে আমাদের যাওয়ার প্রয়োজনও হবে না।
পাসপোর্ট যার কাছে জমা দিলাম, সেই আয়ান রড্রিগস (মোটেও সাদা কেউ নন, ঢাকার ফার্মগেট এলাকার খ্রিস্টান) বললেন, ‘আপনিও শুনুন, স্ত্রীকেও বলবেন, বেশি বাইরে যাবেন না। একজন কারো হাত-পা মচকে গেলে বাংলাদেশ রিপ্রেজেন্ট করার কেউ থাকবে না। ওয়াসিউদ্দিন আর চিন্তাহরণ মল্লিকের যে যাওয়া হচ্ছে না, হেড অফিসকে জানিয়ে দিয়েছি।’
তিনি আরো বললেন, ‘যদি আরামের ট্যুর করতে চান তাহলে কেবল হাতব্যাগ নেবেন। বড় ব্যাগ একেবারেই বাদ। দেখা যাবে ব্যাগের কারণে বাসে উঠতে পারছেন না, ট্যাক্সি নিচ্ছেন তো বাড়তি খরচ পনের ডলার। শক্তি আর সময় তো লাগবেই, সপ্তাহ শেষ হলে দেখবেন এই ব্যাগ আপনার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে একশত পঞ্চাশ ডলার। লোক দেখানো স্যুট-টাই, কাতান-জামদানি এসব কিছু নেবেন না, কোনো খাবার নয়, নো ফুড, নো ড্রিঙ্ক, নো হাইহিল, দামি কোনো জুতো নেবেন না। এখনো মিউনিখে প্রচণ্ড শীত, থেমে থেমে বৃষ্টি আসে। সুতরাং দুজনের জন্য ভালো দুটো ছাতা নিন। ভেতরে বৃষ্টির পানি ঢুকবে না এমন হালকা জুতো কিনুন। আর বঙ্গবাজার থেকে কোয়ালিটি কন্ট্রোলে রিজেক্ট হওয়া ভারী ওভারকোট নিন। ওভারকোট কেনার সময় কোনটা লেডিস, কোনটা জেন্টস খুঁজতে যাবেন না। যেটা গায়ে ভালো ফিট হয়, সেটাই আপনার।’
আয়ান রড্রিগস ছ’ মাস হেড অফিসের ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন। তিনি নিশ্চয়ই ভালো জানেন। যতটা জানেন, কখনো কখনো তার চেয়ে কিছু বেশিও বলে থাকেন। কখনো কখনো মনে হতে পারে জার্মান থার্ড রাইখ তাঁরই পরিকল্পিত।
তিনিই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তখন তো জার্মানিতে মুসলমানও ছিল। কিন্তু মুসলমানদের গ্যাস চেম্বারে না ঢুকিয়ে হিটলার ইহুদিদের কেন ঢোকালেন? জবাব খুঁজে দেখুন। হিটলারকে আবার নতুন করে মূল্যায়ন করার সময় এসে গেছে।’
সিমেন্সে দুজন রড্রিগস কাজ করেন—আয়ান আর জোনাথান। দুজনই ফার্মগেটের, পরস্পর আত্মীয়ও। জোনাথান ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমের জঙ্গি সাপোর্টার আর আয়ান জার্মান ফুটবল টিমের। চাকরিতে দুজনই সমমর্যাদার। জোনাথান আগে যোগ দেওয়ার কারণে বেতন একটু বেশি পান। অফিস তাদের চেনে ইন্ডিয়ান রড্রিগস ও জার্মান রড্রিগস হিসেবে।
জার্মান রড্রিগস আরো কিছু পরামর্শ দিলেন, ‘পারতপক্ষে কোনো বাঙালির নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে তাঁর বাড়িতে যাবেন না। দেশের নিন্দা শুনতে হবে দুই ঘণ্টা। দেশের নিম্নমানের কোন কোন রাজনীতিবিদ, খেলোয়াড়, অভিনেতা-অভিনেত্রী তাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন, সেইসব ছবির অ্যালবাম দেখিয়ে আপনার সময় নষ্ট করবে আরো দু ঘণ্টা। তেলতেলে মাছের অস্বাস্থ্যকর পেটি খাইয়ে মাছ, শাকসবজি, দুধ আর পাউরুটির গুনগান করে মেরে দেবে আরো দুঘণ্টা। সুতরাং সাবধান বিদেশে স্বদেশি এড়িয়ে চলবেন। তারপরও আকস্মিকভাবে কোনো দেশির সামনে যদি পড়ে যান, ‘দেশের এখন কী অবস্থা’ এ ধরনের কোনো প্রশ্ন করলে যত তাড়াতাড়ি পারেন বাথরুমে যাওয়ার দোহাই দিয়ে কেটে পড়বেন। স্মার্টলি ডিল করতে পারলে আর একটা কাজ করতে পারেন, বলবেন আপনি শ্রীলঙ্কান।’
তার সর্বশেষ টিপস :বাংলাদেশে কাউকে ফোন করবেন না, কেউ ফোন করলে ধরবেনও না, আর নিজের স্ত্রীর সঙ্গে বিদেশের মাটিতে পারতপক্ষে কোনো কথা বলবেন না। কারণ আপনার কোন জবাবের পরিণতি কী হবে আপনি তা মোটেও জানেন না।
আট.
আমাদের উদ্বোধনী ও পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠানে সিমেন্স এশিয়া ও প্যাসিফিক বিজনেসের প্রধান হেইনেরিখ রিলকে বললেন, ‘তোমাদের কয়েকটা কাজ—রিলাক্স করা, মজা করা, তোমাদের বসদের প্রাণভরে গালিগালাজ করা, জার্মান ওয়াইন খাওয়া (আস্তাগফিরুল্লা মহুয়ার সামনে গ্লাস হাতে নিতে পারব না), ঘুরে ফিরে সিমেন্স প্লান্ট দেখা এবং সিমেন্স অ্যাম্বেসেডর হিসেবে আবার দেশে ফিরে যাওয়া। এশিয়ার একুশটি দেশ থেকে মোট তিরিশ জন এসেছ। তোমাদের স্বাগত। যারা পার্টনার নিয়ে এসেছ, তাদের জন্য এটাকে আমি বলব হানিমুন। যারা পার্টনার ছাড়া এসেছ, মিউনিখের মেয়েদের প্রতারণামূলক সৌন্দর্যের শিকার হয়ো না। যার সাথেই ঘুমোও সাথে কনডম রেখো।
পার্টনার ছাড়া একজন মাত্র মহিলা এসেছে ইন্ডিয়া থেকে শ্রীমতি দুর্গা কীর্তনিয়া। তার জন্য এক রাউন্ড হাততালি হয়ে যাক।’
হাততালির পর হেইনেরিখ রিলকে বললেন, ‘দুর্গা তুমি যদি ইয়াং কোনো পার্টনার জোগাড় করতে না পার এবং ঊনসত্তর বছর বয়সকে যদি বাধা মনে না করো তাহলে আমি তোমার জন্য মজুত আছি।’
ঠিক তখনই সবাইকে অবাক করে দিয়ে দুর্গা তার সিট থেকে উঠে দৌড়ে ডায়াসে চলে গেল এবং হেইনেরিখ রিলকেকে বেশ আবেগময় একটি আলিঙ্গন করল।
মহুয়া বলল, ‘অসভ্য, এতটা বাড়াবাড়ি ঠিক না।’
আমাদের সকলকে বড় বড় নেইমট্যাগ দেওয়া হলো—আনিস বাংলাদেশ, মহুয়া বাংলাদেশ, গুনাবর্ধন শ্রীলঙ্কা, শরিফ পাকিস্তান, মহেন্দ্র নেপাল, গিরি ইন্ডিয়া; যাতে দূর থেকেই চোখে পড়ে।
মিনিট পনের পর একজন স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান আমাদের সকলকে বেশ হাসাল, তার কমেডি প্রায় সবটাই অ্যাডাল্ট জোক, এমনকি সে অঙ্গভঙ্গি করেও ঊনসত্তর বছর বয়স্ক হেইনেরিখ রিলকে হানিমুনে কেমন করে হাঁপাবেন তা দেখিয়ে দিল।
তারপর কফি ব্রেক। কফির সময় খানিকটা এগিয়ে গিয়ে মহুয়া অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি রাইনার মারিয়া রিলকের কেউ হন?’
হেইনেরিখ জবাব দিলেন, ‘ইয়াং লেডি তুমি কি আমার মায়ের চরিত্র নিয়ে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করছ?’
মহুয়া ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে যায়। মহুয়া যে নাম বলেছে, এমন নাম আমি কখনো শুনিনি। মহুয়া বলল, ‘সরি, আমি বোধহয় আপনাকে বোঝাতে পারিনি। বাংলাদেশের কবিরাও রিলকের নাম জানে, তাই জানতে চাচ্ছিলাম।’
তিনি বললেন, ‘আমি তোমার সাথে মজা করছিলাম। আমাদের আদিবাড়ি অস্ট্রিয়ায়, কবি রিলকে আমার দাদার কাজিন। বোহেমিয়ান রিলকে বিংশ শতক শুরু হওয়ার আগেই অস্ট্রিয়া ছেড়ে চলে আসেন আর আমরা মাইগ্রেট করি প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ১৯১৮-তে। কবি রিলকে যখন মারা যান, আমার মা কোলের শিশু। থ্যাঙ্ক ইউ! এখানে তো এমনকি জার্মানরাও আমাকে জিজ্ঞেস করে না আমি সেই রিলকের কেউ হই কি না।’
আমরা তিন ভাগ হয়ে গেলাম। একভাগ দেখবে সিমেন্স হাইস্পিড ট্রেন, একভাগ দেখবে সিমেন্স পাওয়ার জেনারেশন, আর একভাগ যাবে সিমেন্স জাদুঘরে।
জাদুঘরের পোর্টিকোতে ‘ওহ মাই গড, ইটস মাই জিসাস’ বলে আমার চেয়েও অন্তত তিন ইঞ্চি লম্বা মাথাভর্তি কোঁকড়া চুলের যে তরুণী আমাকে আঁকড়ে ধরে এগালে ওগালে তার গাল লাগিয়ে আলিঙ্গন করল, তার নামই মোনালিসা দোমিঙ্গোজ। আমিও আবিষ্টের মতো ডেকে উঠলাম, ‘মোনালিসা!’
পরক্ষণেই বললাম, ‘মিট মাই ওয়াইফ।’
মোনালিসা তাকেও আলিঙ্গন করে বলল, ‘আমি জানি তুমি মাহুয়া। সরি মহুয়া। তোমার হাজব্যান্ড আমাকে কারেক্ট প্রোনানসিয়েশনটা শিখিয়ে দিয়েছে।’
—তাই নাকি? এত কিছু কখন করল?
তার প্রশ্নটা বুঝতে না পেরে মোনালিসা বলল, ‘তুমি খুব ভাগ্যবতী, তোমার ঘরেই জিসাস।’
মহুয়া মিষ্টি করে হাসল। কিন্তু তার কথা সম্ভবত বুঝতে পারেনি এমন একটা ধারণা থেকে মোনালিসা বলল, ‘তোমার লাকি ম্যান ২৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেছে, ক্রিসমাস ডে-তে।’
এবার মহুয়া সশব্দে হেসে উঠল, বলল, ‘বুঝতে পেরেছি।’
তৃতীয় দিন প্যারিসগামী দলের সবার হাতে মহুয়া প্যারিসের টিকিট তুলে দিল। দুদিন দু রাত থাকার পর যার যার গন্তব্যের টিকিটও একই সঙ্গে আছে। আমরা প্যারিস থেকে দুবাই হয়ে ঢাকা পৌঁছাব।
ফ্লুগাফেল মুনশেন মিউনিখ এয়ারপোর্ট থেকে প্যারিস চার্লস দ্য গল এয়ারপোর্ট উড়োজাহাজে মাত্র দেড় ঘণ্টার পথ। কোনো অভ্যন্তরীণ কারণে সে সময় ব্রিটেন ভিসা বন্ধ রাখায় সিমেন্স কর্মীদের অধিকাংশই চলে গেল মাদ্রিদ। মাত্র পাঁচজন প্যারিস।
মোনালিসা দোমিঙ্গাজের মিউনিখ এয়ারপোর্টে আসার কোনো কারণ ছিল না। তবুও প্রটোকলের কর্মচারীর সঙ্গে আমাদের সি অফ করতে এসেছে।
যখন ইমিগ্রেশন এলাকায় ঢুকতে যাচ্ছি, মোনালিসা বলল, ‘আমাকে হাগ না করেই চলে যাবে?’
মহুয়াকে সামনে রেখে আমি আগ বাড়িয়ে আলিঙ্গন করতে গেলে পরিণতি কী হবে আমি জানি, আমি থমকে দাঁড়াই কাজটা সেই করুক।
বলল, ‘ভেবেছিলাম, অন্য টিমের সাথে পর্তুগাল যাব। কিন্তু অফিস আমার নাম কেটে মালাইকা নূরকে পাঠাচ্ছে। তুর্কি মেয়ে মালাইকা কখনো পর্তুগাল যায়নি, সুতরাং তার যাওয়া উচিত।’
মোনালিসা প্যারিসগামী তিনজনের সঙ্গে (পাকিস্তানের ইশফাক ও তার স্ত্রী শেহেরজাদ এবং আফগানিস্তানের মুহাম্মদ আবদুল্লা গুল) হাগ করার পর মহুয়াকে জড়িয়ে ধরল এবং বলল, ‘তুমি কি আমাকে বাংলাদেশে ইনভাইট করবে না?’
মহুয়া বলল, ‘অবশ্যই, এখনই করছি।’
শেষ আলিঙ্গন আমাকে এবং একটু বেশি সময় ধরে ধরে ফিসফিস করে এটাও বলল, ‘তোমার ওয়াইফের জেলাসি একটু বাড়িয়ে দিচ্ছি। তাতে সে তোমার আরো বেশি টেইককেয়ার করবে।’
ইমিগ্রেশন পেরিয়ে ঘোরলাগা হাত নাড়ি।
মহুয়া জিজ্ঞেস করে, ‘কাকে হাত দেখাচ্ছ, সে তো অনেক আগেই চলে গেছে।’
আমি গম্ভীর স্বরে বলি, ‘ওহ আচ্ছা, তাই নাকি? হাতনাড়া একটা রুটিন ওয়ার্ক।’
***
লুফথানসার এয়ার বাস উড়োজাহাজ মিউনিখ থেকে টেক অফ করে সকাল আটটায় এবং পৌঁছে গেল সাড়ে নটার সামান্য পরে। কসভেয়র বেল্ট থেকে আমাদের চেকড ইন ব্যাগ তুলে নিয়ে ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে যখন বেরিয়ে আসি, তখন সোয়া দশটা। আমাদের পাঁচজনের নামের তালিকা নিয়ে যে দাঁড়িয়েছিল, সে হফনার।
হফনার একটি বড় ট্রলিতে সবার ব্যাগ তুলে নিয়ে ঠেলতে ঠেলতে বলল, ‘সরি, প্যারিসে আমাদের জনবল কম। একটু কষ্ট করে তোমাদের প্রায় ৪০০ মিটার হাঁটতে হবে। ওখানে পার্কিংয়ে গাড়ি রেখেছি।’ সবাই বললাম, ‘নো প্রোবলেম।’ আমি একটু বাড়িয়ে বলছিলাম, ‘তুমি যদি ট্রলির দায়িত্ব নাও, আমরা চার কিলোমিটার পর্যন্ত হাঁটতে পারব।’
হফনার মিনিবাস ধরনের গাড়ির নিচের দিকের ডালা উঠিয়ে ব্যাগগুলোকে ভেতরে পাঠিয়ে দিল। আমরা গাড়িতে বসলাম।
হফনার বলল, ‘তোমাদের যে হোটেলে তুলব, সেটার চেক ইন টাইম হচ্ছে সাড়ে বারটা। কখনো কোনো বোর্ডার বেরোতে দেরি করলে আরো কিছু বেশি সময়ও লেগে যেতে পারে। আমরা ঠিক করেছি একটা পর্যন্ত তোমাদের প্যারিসের সাইটসিইং করিয়ে সিন নদীর পারে কিছুক্ষণ হাঁটিয়ে ক্ষুধা বাড়ব। তারপর নদীর পাড়ে কোথাও লাঞ্চ করিয়ে দুটোর মধ্যে হোটেলে পৌঁছে দেব। কিছুক্ষণ রেস্ট করে ঠিক পাঁচটায় নেমে আসবে, আমি লাউঞ্জ থেকে তোমাদের নিয়ে যাব, তবে তখন পাবে একটা সেভেন সিটার মাইক্রোবাস। আইফেল টাওয়ার সন্ধ্যায়ই ভালো দেখায়।’
আমি ফরাসিদের মধ্যে তিন-চারজনের নাম জানি :সম্রাট নেপোলিয়ন এবং তাঁর স্ত্রী জোসেফিন, অক্সিজেন আবিষ্কারক ল্যাভয়সিয়ে, আর তাঁদের প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী চার্লস দ্য গল। লুই পাস্তরের নাম জানি, কিন্তু তিনি ফরাসি কি না নিশ্চিত নই।
আমি যখন একটা নাম বললাম, পাকিস্তান ইশফাক বলল, ‘আমি এর সাথে আরো চার-পাঁচটা যোগ করতে পারব।’ তার স্ত্রী শোহেরজাদ বলল, ‘আমি প্যারিসে আগেও একবার—সাত আট বছর আগে বাবার সাথে এসেছিলাম। আমি হয়তো কুড়ি থেকে পঁচিশটা নাম বলতে পারব।’ হফনার আফগানি আবদুল্লাহ গুলকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, ‘আমি একটা নামই জানি—এমিল লুই, ফ্রান্সের একজন সিরিয়াল কিলার।’
রাস্তার রাউন্ড অ্যাবাউট পেরিয়ে হফনার হয়তো মহুয়াকে জিজ্ঞেস করত, কিন্তু তার আগেই মহুয়া বলল, ‘আমি অন্তত ১০০ জনের নাম বলতে পারব। যেমন ধর পেইন্টারদের নামই বলি—ভিনসেন্ট ভ্যান গগ, ক্লদ মনে, পল গগ্যা, অরি মাতিসে, তুলজ লোত্রেক, এদগার দেগা, পিয়েরে অগাস্ত রেনোয়া, ইউজিন দেলক্রোয়া, ক্যামিই পিসারো, পল সেজান।’
হফনার বলল, ‘স্টপ লেডি, স্টপ! তুমি যদি প্যারিসের কোনো ইয়াং পেইন্টারকেও জিজ্ঞেস করো দশটার বেশি নাম বলতে পারবে না। তুমি হয় ভালো চিত্রশিল্পী নয় বাজে আর্ট ক্রিটিক।’
এবার মহুয়া বলে, ‘বাজে আর্টক্রিটিক হতে যাব কেন?’
—কারণ তাদের সমালোচনাকে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক নাম মুখস্থ রাখতে হয়।
আমি বলি, ‘চমত্কার ব্যাখ্যা, কিন্তু তুমি পেশাগতভাবে ড্রাইভার না অন্য কিছু?’
হফনার বলল, ‘আমি কি গাড়ি খারাপ চালাচ্ছি? তুমি কি ড্রাইভার হিসেবে আমার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন করছ?’
আমি হয়তো তাকে আহত করে থাকতে পারি, এই ভেবে বললাম, ‘আমি আসলে সেরকম কিছু মিন করিনি।’
আমার কথা শুনে হফনার হেসে উঠে বলল, ‘আর ইউ সিরিয়াস? আমি তোমাদের সাথে মজা করছিলাম।’ হফনার আরো বলল, ‘আমি আসলে বি ক্যাটাগরির পোর্ট্রেট পেইন্টার। হাতে কাজ খুব কম। সিমেন্সের মানবসম্পদ বিভাগে ড্রাইভার ও ট্যুর গাইড হিসেবে আমার নাম আছে। যখন ডাকে, চলে আসি। এরা হিটলারের বংশধর হলেও পয়সা দেওয়ার সময় ফ্রেঞ্চদের মতো কিপ্টেমি করে না।’
—তাহলে তুমি কোন দেশি?
—রোমানিয়ান, এখন ফ্রেঞ্চ সিটিজেন।
হঠাত্ মহুয়া চেঁচিয়ে উঠে, ‘আমি আইফেল টাওয়ার দেখতে পাচ্ছি! ওই যে ওই দেখ!’
হফনার বলল, ‘কিপ ইয়োর আইস ক্লোজড ম্যাডাম। আগে দেখে ফেললে সন্ধ্যার সারপ্রাইজটা কমে যাবে।’
এর পরের প্রশ্নটা মহুয়ার। কিন্তু জিজ্ঞেস করে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। হফনারকে বলে, ‘তুমি পোর্ট্রেট পেইন্টিংয়ের জন্য কত চার্জ করো?’
সে জবাব দেয়, ‘পুরুষ মানুষের বেলায় ফিক্সড ১০০ ইউরো, যেকোনো বয়সের পুরুষ। খোকা, বালক, যুবক, বুড়ো—এক রেট।’
তারপর সে ঘাড় ঘুরিয়ে শেহেরজাদ ও মহুয়াকে দেখে বলল, ‘আমি ফর্টি প্লাস মেয়েদের ছবি আঁকি না। যাদের আঁকি রেট ভেরি করে। যদি আমার সাথে ঘুমায়, তাহলে ফ্রিও হতে পারে। চুমোটুমো খেতে দিলে ৫০ ইউরো, অথবা সোজা একশ ইউরো। চয়েস ইজ ইয়োর্স।’
এরপর মহুয়া হঠাত্ চুপ হয়ে গেল।
সোয়া দুটায় যখন রুমে ঢুকি মহুয়া বলে ওঠে, ‘ড্রাইভারটা একটা আস্ত বদমাশ! খাটাশ!’
আমি পণ্ডিতদের মতো বলি, ‘ম্যান টু ম্যান ভেরি করে, কালচার টু কালচার ভেরি করে। এটা মেনে নেওয়াই ভালো।’
—তার মানে পোট্রের্ট আঁকাতে হলে আমাকে বদমাশটার সাথে শুতে হবে, এটাই তো কথা?
আমি বললাম, ‘এটাই কথা নয়, এটা একটা অপশন। সে তো আরো দুটো অপশন দিয়েছে, তোমার জন্য ভালো তিন নম্বর অপশনটা অথবা পোর্ট্রেটের ধার কাছে না যাওয়া।’
—তুমি কি জানো এদেশের প্রেসিডেন্ট-প্রাইম মিনিস্টার আর সবারই একটা দুটো কেপ্ট থাকে, সেখানে বাচ্চাকাচ্চাও হয়। এটা দোষের কিছু নয়, এটাই কালচর।’
‘তুমি আমাকে কালচার শেখাচ্ছ!’ বলে মহুয়া বাথরুমে ঢুকে যায়।
আমি নিজেকে সংযত করতে চেষ্টা করি। বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে এমন একটা কথাও বলব না।
ভারতীয় এক বৈদ্যের প্রেসক্রিপশনের কথা মনে পড়ল।
এক ভদ্রলোক বৈদ্যের কাছে গিয়ে বললেন, ‘স্ত্রীর সাথে কথাকাটাকটি হলে ভীষণ মাথা ধরে।’
বৈদ্য বললেন, ‘দয়া করে স্ত্রীর সাথে কথা কাটাকাটি করবেন না।’
স্বামী বললেন, ‘কিন্তু স্ত্রী এমনসব কথা বলে যে জবাব না নিয়ে উপায় থাকে না।’
বৈদ্য বললেন, ‘তাহলে আপনাকে জবাব দেওয়া বন্ধ করার ওষুধ দিতে হবে।’
—জি তাই দিন।
বৈদ্য বললেন, ‘আগে থেকেই এক গ্লাস পানি হাতের কাছে রাখবেন। স্ত্রী যখন কথা বলতে আসবেন, আপনি গ্লাস থেকে একটু একটু করে পানি মুখে নিয়ে গলগল করতে থাকবেন। কিন্তু গিলতে পারবেন না। ব্যস এটুকুই।’
দু সপ্তাহ পরে বৈদ্য নিজেই যেচে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এর মধ্যে কি মাথা ধরেছে?’
—জি না, মুখে পানি থাকার কারণে আমি জবাব দিতে পারিনি।
বৈদ্য বললেন, ‘তা হলে এই ওষুধটাই চলতে থাকুক।’
বৈদ্যের পরামর্শটা মনে করে মুচকি হাসি। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি, তা বলতে পারব না।
মহুয়া যখন আমার পিঠে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কী ব্যাপার আইফেল টাওয়ার দেখতে যাবে না?’ আমি চোখ কচলে বলে উঠি, ‘ওহ মাই গড! পৌনে পাঁচটা! কতোক্ষণ ঘুমালাম?’
মহুয়া বলল, ‘দু ঘণ্টারও বেশি, নাক ডেকে ঘুম। গরম পানি আছে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা গোসল দিয়ে এস, ভালো লাগবে। রুমে দেখছি ফ্রি চা কফি আছে। ফ্লাস্কও আছে। আমি কফি রেডি করছি। তাড়াতাড়ি করো।’
মহুয়ার ভালো মুড ফিরে আসায় আমিও স্বস্তি বোধ করি। আমি চাই সন্ধেটা আমাদের ভালো কাটুক।
মিউনিখেই শুনে এসেছি অন্তত ছয় ঘণ্টা হাতে না নিয়ে ল্যুভ মিউজিয়ামে ঢুকতে নেই। তাহলে আফসোস করতে হবে। প্যারিস এয়ারপোর্ট থেকে বেরোনোর সময়ই ট্যুর অপারেটরের জানালা থেকে ল্যুভ অ্যাট্রাকশন নামের একটি ফ্রি ব্রুশিয়ার মহুয়া হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়েছে। গাড়িতেই একটার পর একটা পাতা উল্টেছে। গোসল করতে ঢোকার সময় দেখি এটা। বিছানার পাশে কলমও আছে। তার মানে মহুয়া কী কী দেখবে তাতে দাগ দিয়েছে।
নয়.
আবহাওয়া বেশ ফুরফুরে ছিল। তবুও মহুয়ার ব্যাগে ছাতা ছিল। সে সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখায় পড়েছে ইউরোপের নারী এবং ইউরোপের আবহাওয়াতে বিশ্বাস রাখতে নেই।
টাওয়ারের যত কাছে আসছি, মহুয়ার চাঞ্চল্য তত বাড়ছে।
টাওয়ারের খুব কাছে এসে মহুয়া জিজ্ঞস করল, ‘ভিক্টর লাস্টিগের নাম শুনেছ?’
আমার শোনার কোনো কারণ নেই। আমাদের দলের অন্য তিনজনও হা করে মহুয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
মহুয়া বলল, ‘১৯২৫ সালে ভিক্টর লাস্টিগ নামের একজন হাঙ্গেরিয়ান প্যারিসে এসে শুনলেন প্রতিবছর এত টাকা খরচ করে টাওয়ারের রক্ষণাবেক্ষণের বিরোধিতা অনেকেই করছেন। এটা এমন আহামরি কিছু নয়। এটাকে এখন থেকে সরিয়ে ফেললে খরচ তো লাগবেই না, অনেক মূল্যবান ফাঁকা জায়গা বেরিয়ে আসবে। এই তথ্যকে পুঁজি করে ভিক্টর লাস্টিগ আইফেল টাওয়ার বিক্রি করার জন্য একটা অফিস খুলে বসলেন, এবং ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের ডাকলেন। তাদের সাথে আলাপ আলোচনার পর নিজেই ক্রেতা সাব্যস্ত করলেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীকে। আঁদ্রে পুশো নামের এই ব্যবসায়ী ভিক্টরকে বড় অঙ্কের টাকা আগাম দেন এবং ভেঙে নেওয়ার সময় বাকি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ভিক্টর টাকা নিয়ে কেটে পড়েন।’
ইশফাক জিজ্ঞেস করে, ‘তাই নাকি?’
—শুধু তাই নয়, ভিক্টর নিশ্চিত ছিলেন যে এরকম মস্ত একটা বোকামির ঘটনা তিনি চেপে যাবেন। নতুবা তার বুদ্ধিমত্তা ও মানসম্মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই হলো। কিছুদিন চুপচাপ থাকার পর ভিক্টর আবার এসে আইফেল টাওয়ার বিক্রির বিজ্ঞাপন দিলেন। সম্ভাব্য ক্রেতাদের ঔত্সুক্য এতটাই প্রবল যে পুলিশও টের পেয়ে গেল। বুদ্ধিমান ভিক্টর দ্রুত প্যারিস ত্যাগ করে নিউইয়র্কের জাহাজ ধরলেন।
আবদুল্লাহ গুল বলল, ‘ম্যাডাম, প্যারিসে আপনার এই প্রথম কিন্তু এত কিছু জানেন কেমন করে?’
‘শুধু বই পড়ে।’ এটুকু বলে মহুয়া হেসে ফেলল।
আবদুল্লাহ গুল বলল, ‘ওই একটা জিনিসই আমার পড়তে ইচ্ছে করে না।’
মহুয়া বলল, ‘এমন আরো অনেকেই আছে, আমার হাজব্যান্ড শেষ কবে বই পড়েছে তার মনেই নেই।’
আমরা ন’টায় গাড়িতে ফিরে আসি। হফনার আমাদের নিয়ে আরো প্রায় ঘণ্টাখানেক সিন নদীর পাশঘেঁষে রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে বলল, ‘ইউরোপিয়ানরা কিন্তু সাতটার মধ্যে ডিনার সেরে নেয়। তোমাদের হাবভাব বুঝতে পারছি না, এতক্ষণে ফ্রাইড চিকেন আর পিত্জাশপ ছাড়া সবই বন্ধ হয়ে গেছে।’
ইশফাক বলল, ‘লুক উই অল ফাইভ আর মুসলিমস। আমরা রোজা রাখতে জানি। এটা কোনো সমস্যা নয়।’
আমরা হোটেলের কাছাকাছি একটা ম্যাকডোনাল্ডসে ঢুকে সস্তার বার্গার, চিপস, কোক খেয়ে হেঁটে হেঁটে হোটেলে ফিরে আসি।
লাউজ পেরিয়ে লিফটের দিকে এগোনোর সময় রিসেপশনের একটি তরুণ দৌড়ে এসে বলল, ‘ল্যুভ থেকে তোমাদের চিঠি এসেছে।’
খুলে দেখি জাদুঘরের টিকিট দুটি নয়, চারটি। মোনালিসা দেখার জন্য আলাদা করে টিকিট নিতে হয়। দ্বিতীয় দিনই টিকিটের টাকা দিয়েছিলাম। ওখান থেকেই ব্যবস্থা করেছে। আমাদের হোটেলের ঠিকানাও মিউনিখ থেকেই জানিয়েছে।
ম্যাকডোনাল্ডসে নামিয়ে দেবার সময় হফনার বলেছে, ‘সকাল ন’টার মধ্যে সবাই লাউঞ্জে থাকবে।’
আমাকে ও মহুয়াকে সোয়া ন’টার মধ্যেই মিউজিয়ামের লায়ন’স গেটের সামনে নামিয়ে দেবে। তারপর ইশফাক ও শেহেরজাদকে সিন নদীতে রিভারক্রুজের জন্য নতরদেম গির্জার পাশে নামাবে। আর আবদুল্লাহ গুলকে নিয়ে চলে যাবে প্যারিসের আফগান দূতাবাসে। বাকি দিন হফনারের ছুটি। আমাদের ফিরতে হবে নিজেদের মতো করে। হফনার গিনি বিসাউর একজন মন্ত্রীর ফ্রেঞ্চ গার্লফ্রেন্ডের পোর্ট্রেট আঁকবে। ছবি পছন্দ হলে ভালো টিপসও পেয়ে যেতে পারে।
শেহেরদার মহুয়াকে বলল, ‘তোমরাই ভালো করেছ ল্যুভে ইচ্ছে করলে সন্ধে পর্যন্ত থাকতে পারবে। কিন্তু রিভার ক্রুজ তো মাত্র দু ঘণ্টা, তারপর কী করব?’
আবদুল্লাহ গুল খোলাখুলি বলল, ‘সিমেন্সকে তোমরা কেউ বলো না, আমারটা পলিটিক্যাল মিশন, আমরা এখনকার আফগান গর্ভনমেন্টকে ছুড়ে ফেলতে চাইছি। পাকিস্তান আমাদের সাথে আছে।’ বলেই জাপটে ধরে ইশফাকের গালে চুমো বসিয়ে দিল। তারপর আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মনে রেখো বিপ্লব কখনো মরে না, রক্ত কখনো বৃথা যায় না।’
রুমে ফেরার আধঘণ্টার মধ্যেই কলিংবেল বাজল। খুলে দেখি পাঠান পোশাকে ইশফাক। হাতে দুটি প্যাকেট। একটিতে পাকিস্তানি কিসমিস, অন্যটিতে আখরোট। আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘আসলে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ডেভিল ভুট্টো সাহেব। সে-ই দায়ী, তার আরো দশবার ফাঁসি হওয়া দরকার। আমরা পাঠান। মুজিব সাহেব শুধু বাঙালির জন্য ফাইট করেননি, পাঠানদের জন্যও করেছেন। আমরা তাকে স্যালুট করি।’
আবারও বেল বাজে। দরজা খুলে দেখি বেশ বয়স্ক এক মহিলা। যা বললেন, আমি যতটুকু বুঝলাম তার মানে, তিনি লন্ড্রিলেডি। সন্ধ্যায়ও একবার এসেছিলেন, পাননি। লন্ড্রিতে দেওয়ার মত কিছু থাকলে যেন তাঁকে দিই।
বলে দিলাম, ‘নেই।’
তারপর তিনি বললেন, ‘বুড়ো কাপলের মতো তোমরা ঘরে বসে কী করো? বাইরে বেরিয়ে দেখো আকাশে ফুলমুন—পূর্ণিমা। সুইমিংপুলের পাশে অনেক চেয়ার পাতা আছে, ওখানে বসে চাঁদ দেখো।’
মহুয়া বলল, ‘খুবই ভালো প্রস্তাব, চলো যাই।’ আমরা দ্রুত নেমে যাই, সুইমিং পুলের দুপাশে অন্তত কুড়ি জোড়া দম্পতি। সবাই চাঁদ দেখছে। আমরাও একদিকে দুটো কাঠের ফোল্ডিং চেয়ার নিয়ে বসে পড়ি, আকাশের দিকে তাকাই।
মহুয়া ফিক করে হেসে ফেলল, বলল, ‘এমন ঘটা করে চাঁদ দেখতে হয়—এমন কখনো শুনিনি।’
আলোটা বেশ মোহনীয়। হালকা মেঘের আড়ালে চাঁদটা ঢাকা পড়ে গেলে আলোর দ্যুতি কিছুক্ষণের জন্য কমে যায়। আবার চাঁদ বেরিয়ে আসে।
হঠাত্ মহুয়া বলল, ‘আসলেই তো সুন্দর, তাহলে আমরা বাংলাদেশে এমন করে চাঁদ দেখি না কেন?’
আমি বললাম, ‘এমন চাঁদ তো আমরা নিত্যই দেখি, কিংবা এমনও হতে পারে—‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা’ এই বয়সটা পেরিয়ে গেলে চাঁদের জন্য আমাদের আর কোনো টান থাকে না।’
মহুয়া বলল, ‘আরে একী আশ্চর্য। তুমি দেখছি মননশীল লেখকদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে শুরু করেছ। তোমার মাথা ঠিক আছে তো?’
আমি বললাম, ‘চিন্তা করো না। এটা হচ্ছে প্যারিসিয়ান এফেক্ট। এটা তো ইউরোপের কালচারাল ক্যাপিটাল, সে জন্য জায়গার প্রভাবে মুখ দিয়ে এসব কথা বেরোচ্ছে। গোলার্ধ পাল্টালেই দেখবে যে আনিস, সে আনিসই।’
মহুয়া বলল, ‘সত্যি করে বলো তো তোমার কী হয়েছে? তুমি কি গোপনে সাহিত্য-টাহিত্য করতে শুরু করেছ নাকি?’
আমি ঘাবড়ে যাচ্ছি সম্ভবত ভুল কিছু করে ফেলেছি। বললাম, ‘শীত লাগছে, চলো রুমে ফিরে যাই।’
মহুয়া বলল, ‘চলো।’
দিনের বেলা বাড়তি দু ঘণ্টা ঘুমের খেসারত আমাকে দিতে হলো। প্রথমত, শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম এলো না। দ্বিতীয়ত, বেশ সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেল। গত বিকেলের পাঁচ মিনিটের গোসলটা বেশ স্বস্তিকর ছিল। মহুয়ার উঠতে বেশ দেরি হবে। এই ফাঁকে বাথটাবে গরম পানি টইটম্বুর করে স্বস্তিকর একটা গোসল দিয়ে নিই। সারাদিন তো মিউজিয়ামেই কাটবে।
গোসল সেরে শরীর মুছে বাইরে যাওয়ার কাপড় পড়ছি, দেখি মহুয়া বিছানায় নেই। বাথরুমে কি? ঢুকল কখন? আমি তো এইমাত্র বেরোলাম। আমি আবার বাথরুম চেক করি। নেই। দরজা খুলে লম্বা করিডোরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত তাকাই। নেই। দরজা লক করে রিসেপশনে আসি, জিজ্ঞেস করি, ‘আমার স্ত্রী কি বেরিয়ে গেছে?’
এরকম ঘটনা হয়তো হোটেলে ঘটেই থাকে। রিসেপশনের তিনটি মেয়ের একটি জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি তার সাথে ঝগড়া করেছ?’
তখন বাকি দুজন ফিসফিস করে কথা বলে ফরাসি ভাষায়।
তারপর দুজনই হাসে। আমি তৃতীয় মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করি, ‘ওরা কী বলছে?’
—ওরা বলছে, তুমি সম্ভবত তোমার পার্টনারকে সেক্সুয়ালি স্যাটিসফাই করতে পারোনি সেজন্যই সে ভালো কোনো পার্টনার খুঁজতে বেরিয়েছে।
আমি বলি, ‘ইম্পসিবল!’
ফরাসি ভাষায় কথা বলা একটি মেয়ে আমাকে ইশারায় ডেকে বলল, ‘আমি পনের মিনিট রিউইন্ড করে দিচ্ছি, যদি এই গেট দিয়ে বেরিয়ে থাকে তুমি সিসিটিভিতেই দেখতে পাবে, আর যদি সোজা আকাশের দিকে গিয়ে থাকে, আই অ্যাম সরি, তার রেকর্ড দেখাতে পারব না।’
পুরো পনের মিনিট কেটে গেছে, না বের হয়নি। প্রথম মেয়েটি বলল, ‘সম্ভবত রুমে চলে গেছে।’ আমি বললাম, ‘রুম লক করা, চাবি আমার হাতে।’
‘দাঁড়াও দেখাচ্ছি’ বলে উপর থেকে নিচে সবকিছু স্ক্রিনে দেখতে শুরু করল। নেই। সবগুলো করিডোর—নেই, রেস্তোরাঁ—নেই, দুটি লাউঞ্জ—নেই, সুইমিং পুল দেখাতেই আমি চেঁচিয়ে উঠি, ‘ওই তো মহুয়া, সুইমিং পুলে!’
আমি ছুটলাম সুইমিং পুলে। মহুয়া আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। কিছু বলার আগেই বলল, ‘চল রুমে যাই।’
দরজা খুলি। বলি, ‘হাতে আর মাত্র দশ মিনিট। হফনার চলে আসবে রেডি হও।’
মহুয়া দ্রুত বিছানায় উঠে গায়ে লেপ টেনে দিল বলল, ‘আমি যাব না। তুমি দেখে এসে আমাকে বলো।’
—মহুয়া, এটা হয় না। ল্যুভের টিকিটের অনেক দাম।
মহুয়া বলল, ‘আমার দেখা হয়ে গেছে।’
—মানে কী দেখা হয়ে গেছে?
—রক্তমাংসের মোনালিসা। ছবিরটা আর দেখার দরকার নেই। তুমি দেখে এসো আমি সারাদিন ঘুমাব।
—এসব কী মহুয়া?
—বোঝোনি? এর নাম মোনালিসা এফেক্ট।
—মানে?
—মোনালিসার হাগটা খুব ভালো লেগেছে তাই না। খালি গায়ে জাপটে ধরলে আরো ভালো লাগত?
—প্লিজ চলো, প্যারিসে হয়তো জীবনে আর কখনো আসার সুযোগ পাব না। বহু লোক প্যারিসে আসার পরও টাকার অভাবে কিংবা সময়ের অভাবে, টিকিট না পাওয়ার কারণে, প্যারিসে বিক্ষোভ থাকার কারণে কিংবা মিউজিয়ামের মেরামত কাজ চলার কারণে ল্যুভে ঢুকতে পারেনি।
(আমি সতকর্তার সঙ্গে মোনালিসা ছবির কথাটা এড়িয়ে যাচ্ছি।)
মহুয়া ঘাড় উঁচিয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার, তুমিও দেখছি শিল্পের সমঝদার হয়ে উঠছ? ওই বেশ্যাটার সাথে সম্পর্ক কত দিনের? তারপরই দেখি তুমি বেশ স্মার্ট হয়ে উঠেছ। তোমার ইন্টালেকচুয়াল হাইট বেশ উপরে উঠে গেছে। আমার মোনালিসা দেখা হয়ে গেছে। আমার চেয়ে ফর্সা, আমার চেয়ে এক হাত লম্বা, চাপা ভাঙা, কোঁকড়া চুল—এই তো তোমার মোনালিসা।’
(বলা বাহুল্য মহুয়া তার অপছন্দের যেকোনো নারীকেই বেশ্যা বলে গাল দিতে পছন্দ করে। আবার মহুয়ার পছন্দের কোনো নারীর আমি যদি প্রশংসা করতে থাকি কিংবা কোনো কারণে সেই নারী আমার সম্পর্কে কিঞ্চিত্ আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে অচিরেই সেই নারী মহুয়ার পছন্দের তালিকা থেকে খারিজ হয়ে বেশ্যা খেতাবপ্রাপ্ত হয়।)
আমি বেশ বুঝতে পারছি ভারতীয় বৈদ্যের পরামর্শ অনুযায়ী আমার এখন কয়েক ঢোঁক পানি মুখে ঢুকিয়ে গলগল করা উচিত। গেলা নয়। তারপরও বললাম, ‘আমি তো ফ্রান্স আসতে চাইনি, আমি চেয়েছিলাম ইতালি যেতে। ইতালি অনেক ইন্টারেস্টিং।’
—একাই যেতে? মোনালিসাকে নিতে না?
—তুমি কি মিস দোমিঙ্গোজের কথা বলছ?
ভয়ংকর তেতো হাসি দিয়ে মহুয়া বলল, ‘তা কেন বলব, আমি মিস ম্যারিলিন মনরোর কথা বলছি। অনেক দূর এগিয়েছ দেখছি। মিস না মিসেস তাও জানো। আর কী জানো? ব্যাসিক স্ট্যাটিসটিক্স ৩৬-২৪-৩৬ এসব জানো না।’
—মহুয়া, তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলছ।
—বাড়াবাড়ির আর কী দেখলে, আগে দেশে ফিরে চলো, তোমাকে আমি জনমের মতো মোনালিসা দেখিয়ে ছাড়ব।
রিসেপশনে থেকে হফনার ইন্টারকমে ফোন করল বলল, ‘বাকি তিনজন গাড়িতে উঠে বসে আছে। গাড়ি আর দাঁড় করিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। যদি তিন মিনিটের মধ্যে না আসতে পার ট্যাক্সি ডেকে নিজেরা চলে যেয়ো।’
আমি জানি মহুয়াকে পুনরায় সাধার কোনো মানে নেই। তবুও বললাম, ‘ওরা গাড়িতে তোমার জন্য বসে আছে।’
—বলে দাও আমার ল্যুভ দেখা হয়ে গেছে।
আমি হফনারকে বললাম, ‘সরি, তোমরা চলে যাও। আমার ওয়াইফের হঠাত্ মাথা ধরেছে। একটু সেরে উঠলে নিজেরাই যাব।
বিছানা থেকে মহুয়া বলে উঠল, ‘মিথ্যুক!’
আমি কমবেশি উদ্ভিদবিদ্যা পড়েছি, মহুয়া যে বিষাক্ত একটা ফল, আমি তখনো জানতাম। এতে স্যাপোনিন ও ট্যানিনের উপাদান বেশি থাকায় বিষাক্ত হয়ে ওঠে। মহুয়ার তেল মানুষের ভোজ্য নয়।
বড় বড় শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখতে না পারার আফসোস আমার নেই। আমি দেখতে চাইওনি, এমনকি প্যারিস পৌঁছার পরও দেখার বাসনা জাগেনি। আমার আফসোস টিকিট কিনতে অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে গেল। এভাবে টাকা নষ্ট করার সামর্থ্য অন্তত আমার নেই।
আমি টাকার শোক ভুলে যেতে অনেকদিন পর আরো কিছু গাঁটের পয়সা খরচ করে মহুয়ার বোন ড্যাফোডিলকে ফোন করলাম এবং সংক্ষেপে মোনালিসা এপিসোডটি বললাম।
ড্যাফোডিল হাসতে হাসতে বলল, ‘মহুয়ার সামনে পারতপক্ষে আমার নামটিও উচ্চারণ করবেন না। তাহলে কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থকেও কবর থেকে টেনে তুলবে। তবে এই শাস্তি আপনার প্রাপ্য ছিল। আমি খুব খুশি।’
তারপরও আমরা হাসাহাসি করলাম। ড্যাফোডিল বলল, ‘থ্যাঙ্কস গড যে, ব্রিটেনে আসেননি।’
ড্যাফোডিল এখনো বিয়ে করেনি। এয়ার কমোডোরের ছেলে আবরার সটকে পড়ে এয়ার হোস্টেস বিয়ে করেছে। ইউনির্ভাসিটি অব সাসেক্সে জিওফ্রে উডের অধীনে পিএইচডি করছে।
ড্যাফোডিল বলল, ‘ভালো সময়ে ফোন করছেন, আধঘণ্টা আগে হলে ফোন ধরতে পারতাম না। পরে হলেও না। ক্যাফেটেরিয়া থেকে মাত্র রুমে এসেছি। আধঘণ্টা পর একটা সেমিনার করতে বাস ধরব।’
ড্যাফোডিল আমাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করল এবং বলল, ‘আমি অনেক দুঃখিত সেই ৩০ মার্চ আমি আপনার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছিলাম। সরি বলার সুযোগ পাইনি। আজ বলছি।’
সেই ৩০ মার্চের পরদিনই ঘরোয়া একটি অনুষ্ঠানে মহুয়াকে বিয়ে করি। তাদের ভীষণ একটি পারিবারিক দুর্যোগ চলছিল। সরকার বিরোধী বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে তাদের বাবা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর পকেটে বিস্ফোরক পাওয়া গেছে, এমন একটি মামলায় স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্টের আওতায় তাঁকে জেলে নেওয়া হয়। তিনিই মহুয়ার মাকে বলে দেন, ‘আট-দশ বছরের কারাদণ্ড যদি হয়, আর তোমরা যদি আমার উপস্থিতির জন্য বসে থাকো, তাহলে সবগুলো মেয়ের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাবে।’
শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরক আইনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। মোট চার মাস জেল খেটে তিনি বেরিয়ে এসে রাজনৈতিক বাম থেকে সরে এসে তবলিগে নেমে পড়লেন।
সেই ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় সাবলেট নেওয়া আমার এক রুমের বাসায় এসে ড্যাফোডিল বলল, ‘একটু হলুদ নিয়ে এসেছি অন্তত একটু হলুদ লাগিয়ে আপনার বিয়েতে অংশগ্রহণ করি। বাবা জেলে থাকার কারণে তো কোনো অনুষ্ঠানেই হচ্ছে না।’
ড্যাফোডিল তার ব্যাগ থেকে ছোট্ট কৌটা বের করে বলল, ‘মহুয়ার হলুদ থেকে একটুখানি তুলে এনেছি।’
আমার গালে ও কপালে একটুখানি লাগিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনি কি বর্ণবাদী?’
—মানে?
—তাহলে ইংরেজিতে বলি, র্যাসিস্ট।
—না তো।
হঠাত্ বদলে যাওয়া ড্যাফোডিল দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘লায়ার! ইউ আর অ্যা লায়ার। আমি জানি আপনি র্যাসিস্ট। আমার কাছে প্রমাণ আছে।’
—কিসের প্রমাণ।
—আমি নিজেই তার প্রমাণ। আমার গায়ের রঙটা কালো বলে আপনি মহুয়াকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রেম তো করলেন আমার সাথে। অথচ বললেন, আমি নাকি ভুলে ব্যাপারটাকে প্রেম মনে করেছি। বেশ, ফর্সা মহুয়ার সাথে সংসার করুন। গুড লাক।
আমি ড্যাফোডিলকে বলতে চেষ্টা করি, ‘গায়ের রং কালোতে কিছু এসে যায় না। তুমি মহুয়ার চেয়ে পড়াশোনায় ভালো। তুমি ইউনিভার্সিটির টিচার হবে। তোমার পিএইচডি ডিগ্রি হবে। তোমার হাজব্যান্ডকে হতে হবে তোমার সাথে মানানসই।’
ড্যাফোডিল জোরে হেসে ওঠে, ‘তার মানে তাকে মানানসই হওয়ার জন্য আমার চেয়েও বেশি কালো হতে হবে।’
পরক্ষণেই ড্যাফোডিল কাঁদতে শুরু করে। আমি যখন আদর করেই তার কান্না থামাতে যাই, আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘স্যার, প্লিজ আপনি আমাকে বিয়ে করেন। মহুয়া ফর্সা ও সুন্দর। তার জন্য পাত্রের কোনো অভাব নেই। কিন্তু আমাকে কেউ বিয়ে করবে না।’
ড্যাফোডিল একসময় আমাকে জড়িয়ে ধরা হাত ছেড়ে দেয়।
আমি বলি, ‘রাত হয়ে গেছে, তোমাকে দিয়ে আসি।’
ড্যাফোডিল বলল, ‘অনেক হয়েছে। আমার জন্য আপনাকে আর ভাবতে হবে না স্যার। আমি আজকের রাতটা এখানেই থাকব ভেবে কাউকে না বলে চলে এসেছি, কিন্তু থাকব না। থাকলে হয়তো একসময় আমি আপনাকে ভণ্ডও বলে ফেলতে পারি। এতটা বলা ঠিক হবে না। চললাম।
মহুয়া আইএসসি পরীক্ষা দেবে, ড্যাফোডিল কেবল আইএসসি ফার্স্ট ইয়ার, তাদের বাবা মুক্তাদির সাহেবই বললেন, ‘শোনো, কলেজ থেকে বেরোনোর পর এদিক ওদিক ঘুরোঘুরি না করে মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ আমার বাসায় চলে যাবে। চা-বিস্কুট খাবে, আমার মেয়েদের পড়াশোনায় একটু গাইড করবে। আমি স্ট্যান্ডার্ড রেটে না পারলেও যতটা পারি দেব।’
আমি বললাম, ‘টিউশনি? স্যার, আমরা তো টিউশনির বিরুদ্ধে, মানে জামান স্যারদের বিরুদ্ধে বলে যাচ্ছি।’
—আরে তাদেরটা ব্যবসা। বদরুজ্জামান ছাত্রছাত্রীদের সামনে না থাকলেও নাকি সমস্যা নেই। ক্যাসেট বাজতে থাকে। মাস শেষে আট ব্যাচ থেকে টাকা তোলেন।
আমি বলি, ‘স্যার, আপনার মেয়েরা ভালো কলেজের ছাত্রী। আমাদের মতো টিচার দিয়ে হবে না। তাছাড়া এই কলেজেই হান্নান স্যার, গীতাঞ্জলি দিদি, রায়হান উদ্দিন আমার চেয়ে ভালো টিচার।
মোক্তাদির স্যার আমাদের ভাইস প্রিন্সিপাল। রাজনীতি করেন বলে কমিটি তাকে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব দেয়নি। এতে তার আফসোসও নেই।’
স্যার বললেন, ‘হান্নান শুধু ফিজিক্স পড়াতে পারে, গীতাঞ্জলি কেমিস্ট্রি-অর্গানিক ইন অর্গানিক দুটোতেই ভালো, রায়হানের তো সব গণিত মুখস্থ। কিন্তু সবগুলো কমবেশি দেখাতে পারে তুমি ছাড়া আর কাউকে দেখছি না। আমি তোমাকে যতটা না পড়ানোর জন্য চাচ্ছি, তার চেয়ে বেশি চাচ্ছি তোমার কারণে ওরা পড়াশোনার একটা চাপ অনুভব করুক সে জন্য।’
—স্যার, আপনার মেয়েরা হলিক্রসের ছাত্রী। যদি আপনাকে এদের কেউ বলে বসে আনিস স্যার তো কিছু জানেন না, তখন কী করবেন? আমাকে তখন ‘না’ বলতে খুব অ্যামবারাসড হয়ে পড়বেন।
মুক্তাদির স্যার বললেন, ‘তুমি বড্ড বেশি তর্ক করো। তুমি এক-দু’মাস দেখো। ভালো না লাগলে যাওয়া বন্ধ করে দেবে। আমি তো তখন তোমাকে হাতি পাঠিয়ে তুলে নিয়ে যেতে পারব না।’
পরদিনই তিনি আমাকে বাসায় নিয়ে গেলেন। যাওয়ার পথে বললেন, ‘আগে তো লজিং মাস্টারের সিস্টেম ছিল। এখন তো শহরের বাড়িতে মাস্টারের জন্য বাড়তি কোনো রুম নেই। আমি ঢাকা আসার পর মুগদায় সোবহান হাজির বাড়িতে যদি লজিং মাস্টার না হতে পারতাম আমার পড়াশোনা হতো না, গ্রামে ফিরে গিয়ে লাঙ্গলই ঠেলতে হতো।’
দশ.
মহুয়া ছিল একটু চুপচাপ, কথাও কম বলত। ড্যাফোডিল ঠিক উল্টো। দ্বিতীয় দিক আমাকে বলল, ‘স্যার, আপনি কি মাথায় সর্ষের তেল মাখেন?’
—নাতো!
—এরকম একটা বাজে গন্ধ পাচ্ছি।
মহুয়া তাকে ধমক দেয়, ‘বাজে কথা বলিস কেন!’
তৃতীয় দিন আলাদা করে চা-বিস্কুট নয়, একটি বড় পেয়ালায় পেয়াজ মরিচ মেশানো মুড়ি ভাজা।
ড্যাফোডিল বলল, ‘স্যার, লজ্জা পাবেন না, যদি তাড়াতাড়ি নিজের ভাগেরটা তুলে না নেন, কিছুক্ষনের মধ্যে আমি খেয়ে শেষ করে ফেলব।’
আমার এই গৃহশিক্ষকতার তৃতীয় মাসেই পুলিশ মুক্তাদির স্যারকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেল। ড্যাফোডিল চলে এল আমাদের কলেজে। বলল, ‘একজন কেউ আমার সাথে থানায় চলুন।’
ক্লাস অসমাপ্ত রেখে আমাকেই চলে আসার নির্দেশ দেন প্রিন্সিপাল সাহেব। ড্যাফোডিলের সঙ্গে এক রিকশায় থানায় যাই। ওসির সঙ্গে দেখা করি এবং ফিসফিস করে বলি, ‘যা করার তাড়াতাড়ি করে করুন। স্টুডেন্টরা এখনো টের পায়নি। টের পাওয়া মাত্র থানা ঘেরাও করতে ছুটবে।’
কিন্তু আমার হুমকি ওসি সাহেব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘দুটো ফায়ার করলে থানার আশপাশে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্যারের যখন শরীরে তেল জমেছে, কিছুদিন শিকের ভেতর থাকলে তেল কমবে।’
তাঁকে একরাত হাজতে থাকতেই হয়। রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত ড্যাফোডিল আমার সঙ্গেই ছিল। মুক্তদির স্যার বললেন, ‘বাসা থেকে খাবার আনার ঝামেলা করতে যেয়ো না। থানার উল্টোদিকে তেহারি পাওয়া যায়, এক প্যাকেট দিয়ে যেয়ো।’
ড্যাফোডিলকে যখন বাসায় নামিয়ে দিই, হাত ধরে টেনে আবার ভেতরে নিয়ে আসে, ‘স্যার, আপনি তো খাননি। ভাত খেয়ে যান।’
বেরোবার সময় বললাম, ‘সকালে তোমাদের যাওয়ার দরকার নেই। আমি স্যারের সাথে দেখা করে নাস্তা দিয়ে ক্লাসে আসব।’
সকালে পৌঁছেই দেখলাম তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দুটি কাগজ তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল। তিনি একটি সই করেছেন, আর অন্যটি করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
যেটি সই করেছেন, তাতে লেখা—পুলিশ আমার সাথে ভালো ব্যবহার করেছে, কোনো রকম অত্যাচার করেনি।
যেটি সই করেননি, তাতে লেখা—আমি কোনো ধরনের সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করব না।
আমি মুক্তাদির স্যারকে পুলিশ হেফাজতে থেকে নিজ দায়িত্বে নিয়ে যাচ্ছি, এমন একটি বিবৃতি সই করে বেরিয়ে এলাম।
এভাবেই মহুয়াদের পরিবারটির সঙ্গে আমি সম্পর্কিত হয়ে পড়ি।
***
৩০ মার্চ রাতে আমার সেই একরুমের বাসা থেকে বেরিয়ে ড্যাফোডিল বাড়ি ফেরেনি। ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে, এমন আশঙ্কায় বিয়ের দিন আমিও এ কথাটি বলিনি যে, আগের রাতে নিরুদ্দিষ্ট মেয়েটি আমার কাছে এসেছিল।
সন্ধেবেলা আমাদের পৌঁছার কিছুক্ষণ আগে ড্যাফোডিল তার বান্ধবী নবনীতা হালদারের সঙ্গে পারসোনা বিউটি পার্লার থেকে খুব সেজেগুজে বাসায় হাজির হলো। সবাইকে শুনিয়েই বলল, ‘আমাকে তো আর কেউ বিয়ে করবে না যে সাজার সুযোগ পাব। মহুয়ার বিয়েতেই শখটা মিটিয়ে নিলাম।’
আমাদের গতরাতে সাক্ষাতই হয়নি, এমনই মনে হওয়ার কথা। ড্যাফোডিল হাসতে হাসতে বলল, ‘স্যার বিয়ে করে বউ পেলেন, কিন্তু একটা টিউশনি হারালেন।’
আমার একটু কাছে এসে বলল, ‘স্যার কি বিয়ে উপলক্ষে মাথায় সর্ষের তেল মেখেছেন নাকি?’
একটি যন্ত্রণা আড়াল করার জন্য ড্যাফোডিল একটার পর একটা মজার মজার কথা বলে যাচ্ছে।
ড্যাফোডিল বলল, ‘নেপোলিয়ন কী বলেছিলেন জানেন স্যার? বোকা লোকেরা একটা কাজই সাহসের সাথে করতে পারে, আর তা হলো বিয়ে।’
হঠাত্ মহুয়া ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘ড্যাফি, তুই এখান থেকে যাবি না গ্লাস ছুড়ে মারব।’
ড্যাফোডিল বলল, ‘সরি আপু! এটা আমি তোর হাজব্যান্ড সম্পর্কে বলিনি, আনিস স্যার কেন বোকা হতে যাবেন?’
শিল্পকলার রাজধানী শহর প্যারিসে ল্যুভ দেখার জন্য নির্দিষ্ট আমাদের সেই মোনালিসা দিবসে দুপুর পর্যন্ত না খেয়েই কেটেছে। তবে এবার আমার মাথা ধরেনি। তবুও দুপুরের দিকে মহুয়া বলল, ‘প্যারাসিটামল লাগবে?’
আমি চাইলেই তখন চিত্কার করে বলতে পারি, ‘ইউ শাট আপ লেডি! আমার সাথে কোনো কথা বলবে না।’ কিন্তু তাতে লাভটা কী? তারচেয়ে জোড়াতালি দিয়ে হলেও কিছুটা ভালো সময় কাটানো দরকার। আমি বললাম, ‘এখনই প্যারাসিটামল লাগবে না, কিন্তু আরো দু-তিন ঘণ্টা যদি না খেয়ে থাকতে হয় তাহলে জোড়া প্যারাসিটামলেও কাজ হবে না।’
মহুয়া বলল, ‘তাহলে এতক্ষণ ধরে শুয়ে আছ কেন? আমার তো সেই তখন থেকে পাকস্থলিই হজম হওয়ার অবস্থা। আমি রেডি আছি, উঠো, রেডি হও। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বেরোব।’
আমরা বেরোই। ইচ্ছে হলে চাবি রিসেপশনে রেখে যাওয়া যায়, ইচ্ছে হলেও সঙ্গেও রাখা যায়। হারালে কুড়ি ইউরো জরিমানা গুণতে হবে, এই ভয়ে রিসেপশনেই রেখে যাই। সকালে মহুয়ার নিরুদ্দিষ্ট হওয়া ও সুইমিং পুলের পাশে খুঁজে পাওয়া ঘটনাটি জানা রিসেপশনের মেয়েটি একটু দুষ্টুমি করেই বলল, ‘তোমার পার্টনারের দেখছি দারুণ হাসিমুখ। আমি নিশ্চিত তোমাদের একটা গ্রেট সেক্স সেশন হয়েছে।’
আমি কেমন করে না বলি? মিটিমিটি হেসে রাস্তায় নামি। মহুয়া বলল, ‘ম্যাকডোনাল্ডস খুঁজে বের করো। কোয়ার্টার পাউন্ডার খাব. সাথে ফিশ-ও-ফিলে, গার্লিক সস আর কোলস্লো।’
আমরা জানলাঘেঁষা একটা মুখোমুখি টুসিটার টেবিল নিই। তেমন ভিড় না থাকাতে উঠে পড়ার নৈতিক চাপ অনুভব করিনি। আমরা যখন টেবিল ছেড়ে উঠি, তখন সাড়ে পাঁচটা। আমরা আরো কিছুক্ষণ হাঁটতে চাচ্ছিলাম কিন্তু আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। ঝড় এসে যেতে পারে। মহুয়া বলল, ‘বৃষ্টিতে ভিজতে চাই না। তার চেয়ে চলো হোটেলে ফিরে যাই। বেশি করে চিজ দেওয়া একটা পিত্জা নিয়ে নাও, এটা দিয়ে রাত পার করে দেব।’
পিত্জা ও গোটা চারেক কোকের ক্যান নিয়ে আমরা যখন হোটেল চত্বরে ঢুকে পড়ি, তখনই ঝড়ো বৃষ্টির প্রথম ঝাপটা লাগে, দ্বিতীয় ঝাপটার আগেই আমরা লাউঞ্জে পৌঁছে যাই। চাবি নেওয়ার সময় হফনারের ম্যাসেজও আসে—কাল সকাল আটটা পর্যন্ত নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পার। ফ্লাইট দেড় ঘণ্টা ডিলেইড হচ্ছে। ৯টা ৫৫ মিনিটের মধ্যে চেক আউট করে লাউঞ্জে অপেক্ষা কোরো। ঠিক দশটায় তোমাদের নিয়ে এয়ারপোর্টের পথে নামব।
ইশফাক ও শেহেরজাদও আমাদের সাথে একই উড়োজাহাজে দুবাই পর্যন্ত, ওখান থেকে আমরা ঢাকার ফ্লাইট ধরব, ওরা লাহোরের ফ্লাইট।
তেমন খিদে ছিল না। পিত্জার অর্ধেক রাতে খেলাম, আর বাকিটা রেখে দিলাম সকালের জন্য। সিমেন্স যেহেতু আমাদের আলাদা করে হাত খরচ দিয়েছে। এ জন্য হোটেলের ভাড়াতে ব্রেকফাস্ট যোগ করেনি।
আমাদের যেমন করে রিসিভ করেছিল, হফনারকে আজ তার চেয়ে বেশি কিছু করতে হবে। লাগেজ চেক ইন করা বোর্ডিং পাস নেওয়া পর্যন্ত তো সঙ্গে আছেই, আমাদের ইমিগ্রেশন লাইন পার করিয়ে হফনার ফিরে যাবে।
লাগেজ নামানোর পর হফনার একটা গোলকার লম্বা চোঙ্গা মহুয়ার হাতে দিয়ে বলল, ‘এটা তোমার।’
—এটা কী? মিসাইল টিসাইল নয় তো?
—খুলেই দেখো।
দুপাশেই কৌটার মুখ দিয়ে আটকানো। মহুয়া একটি মুখ খোলে একটি মোটা কাগজের রোল বের করে খুলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওহ মাই গড। ইটস মি!’
তবে খুব হতাশা নিয়ে বলল, ‘সরি, আমাদের হাতে একশ কেন, এখন আর কুড়ি ইউরোও নেই। তুমি কেন এটা আঁকতে গেলে?’
হফনার বলল, ‘আমি জানি এটা তেমন ভালো হয়নি, একবার দুবার যখন ঘাড় ঘুড়িয়ে তোমাকে দেখেছি কিংবা গাড়ির মিররে তাকিয়েছি তোমার খুব মুড সুইং হচ্ছিল। তুমি তো পোর্ট্রেটের জন্য সিটিং দাওনি। আমাকে মেমরি থেকে আঁকতে হয়েছে। যেখানে আমি তোমাকে পেয়েছি সুইংগিং মুডে। কখনো ফানি, কখনো স্ক্যারিং, কখনো লাভিং কখনো...।’
মহুয়া বলল, ‘যাক, সব আর বলতে হবে না। আমাদের হাতে টাকা নেই। সরি এটা কিনতে পারব না। এটা আমাকে অবশ্যই বলতে হবে, তুমি খুব ভালো আঁকো।’
হফনার বলল, ‘আমি এটা তোমার কাছে টাকা নিয়ে বেচার জন্য কিংবা ফর এক্সচেঞ্জ অব সেক্স আঁকিনি। আমি এঁকেছি তোমার অ্যাপ্রিসিয়েশনের জন্য। থ্যাঙ্ক ইউ। তুমি বলেছ, আমি ভালো আঁকি।
কিন্তু আমার এক্স গার্লফ্রেন্ড বলেছে আমার পোর্ট্রেটে লাইফ থাকে না, তারপর সে আমার বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় যখন একবার ফিরে তাকাল আমি বললাম, গো টু হেল! যে ছবি বোঝে না সে আমার গার্লফ্রেন্ড হতে পারে না।’
আমি ফিসফিস করে মহুয়াকে বললাম, ‘তোমার হাতে বিশ পঁচিশ ইউরো যা আছে তা দিয়ে দাও।’
আমার বাংলা কথার কতটুকু হফনার বুঝল জানি না, মহুয়াকে বলল, ‘টাকার জন্য তোমাকে আঁকিনি, আমি এঁকেছি জাস্ট ফর অ্যা হাগ।’
এরপর মহুয়া কিংবা আমার জন্য বিব্রতকর কিছু একটা ঘটে যেতে পারে ভেবে আমি ট্রলি ঠেলে দ্রুত সামনে এগোই। পাকিস্তানি ইশফাক আরো একটু কাছে এসে বলল, ‘ব্রাদার আমি মিউজিশিয়ান আর্টিস, ম্যাজিশিয়ান এদের ভয় পাই। তারা চাইলে অল্পতেই কোনো নারীকে ভাগিয়ে নিতে পারে। কারণ নারী সহজে মুগ্ধ হয়।’
আমি বিব্রতকর প্রসঙ্গ এড়াতে বলি, ‘আমাদের শবনম তোমাদের সিনেমার বড় নায়িকা।’
তার উত্তর পাওয়ার আগেই ব্যাগেজ চেক করার জন্য বেল্টে তুলে দিই।
মহুয়াও এসে গেছে তার হাতে কেবল ছবির চোঙ্গা। কিভাবে হফনারের সঙ্গে মিটমাট করেছে জানি না। বিদেশির একটি কি দুটি আলিঙ্গন মহুয়ার তেমন কিছু হারানোর আছে বলে আমি মনে করি না। বরং হারানোর মতন এমন কিছু থাকলে মহুয়ার অজ্ঞাতে করা আমার আলিঙ্গনগুলো নিয়ে আমার যে অপরাধবোধ তা কিছুটা কমবে।
উড়োজাহাজ টেক অফ করার সঙ্গে সঙ্গেই মহুয়া বলল, ‘ওরা খাবার দেবে কখন? আমি খুব হাংরি।’
ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেস যখন খাবারের ট্রে এগিয়ে দিল, মহুয়া তখন গভীর ঘুমে।
স্টুয়ার্ডেস বলল, ‘ইটস ওকে। ঘুম ভাঙুক, আমি পরে আবার নিয়ে আসব।’
দুবাই থেকে নেওয়া কানেক্টিং ফ্লাইটে আমরা যখন ঢাকার আকাশে ক্যাপ্টেন আবু ওবায়দা আরবীয় স্বরের ইংরেজিতে বলল, ‘ঢাকা এয়ারপোর্ট বন্ধ, আমরা কলকাতায় ল্যান্ড করব।’
এগার.
হোসেন আলী দুলাভাই জিনিয়াকে ইমপ্রেস করার জন্য এক সময় কয়েকটি বিশ্বখ্যাত ছবির রিপ্রোডাকশন বাধাই করে উপহার দিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা তিশ্যানের ভেনাস অব উরবিনো, র্যাফায়েলের স্লিপিং ভেনাস ও সান্দ্রো বতিচেল্লির প্রাইমাভেরা। দুই ভেনাস এবং প্রাইমাভারা নগ্নতার কারণে জিনিয়া দেয়ালে টাঙাতে পারেনি, একমাত্র মোনালিসাই দেয়ালে ছিল।
বিয়ের পর তিশ্যান, র্যাফায়েল ও বতিচেল্লির ছবি তিনটি জিনিয়া নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। মোনালিসা নিয়ে আসে মহুয়া। আমাদের ইউরোপ সফরের পরপরই একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখি কাচের টুকরোর ছড়াছড়ি। আমার অনুমান মিথ্যে নয়। দেয়ালের মোনালিসা নেই।
মহুয়া সম্ভবত পুড়িয়েছে। ফ্রান্স ঘুরে আসার পর মোনালিসা দোমিঙ্গোজের কারণে এমন কিছু ঘটাটা আমার জন্য মোটেও অপ্রত্যাশিত কিছু ছিল না। আমি ভাঙা কাঁচ মাড়িয়ে বেডরুমে ঢুকি, ছোট্ট ডাইনিংয়ে রাতের খাবার খাই, ভাঙা কাচ নিয়ে টু শব্দটিও করিনি। মহুয়াও আমার সঙ্গে খায়, সেও নিশ্চুপ। রাতে আমাদের নতুন কেনা টিভিতে এইচবিও চ্যানেলে ‘দ্য টেন কমান্ডডেন্টস’ সিনেমা দেখি। চার্লটন হেস্টন ও ইউল ব্রাইনার আমাকে মুগ্ধ করে রাখে। সাড়ে তিন ঘণ্টার সিনেমা, মাঝামাঝি সময়ে মহুয়া ঘুমিয়ে পড়ে, আমি বিছানায় শুতে শুতে রাত তিনটা।
নাস্তা সেরে অফিসের জন্য তৈরি হয়ে যখন চায়ে চুমুক দিচ্ছি, পরিচিত হর্ন শুনি। অফিসের গাড়ি এসে গেছে। শুরু থেকেই পিক-আপ ড্রপ সুবিধা পাচ্ছি। বেরোনোর সময় মহুয়া বলল, ‘অফিস থেকে বাসায় না এসে আম্মুর বাসায় ড্রপ নিয়ো, আমি ওখানে থাকব। ডেইজির খুব খায়েশ হয়েছে আব্বুর বার্থ ডে করবে। ভুনা খিচুরি, ইলিশ আর বিফ করবে। আমাকে কেক নিয়ে যেতে বলেছে। ড্যাফি তো নেই-ই জিনিয়ার বুড়োটার সাথে চিররবন্দর গেছে।’
হোসেন আলী দুলাভাইয়ের পৈতৃক ভিটে দিনাজপুরের চিররবন্দর। ওখানে একটা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি বানিয়েছে।
জিজ্ঞেস করি, ‘আমি কি খালি হাতে আসব?’
মহুয়া বলল, ‘আমরা তো কেক নিচ্ছি। আমি নিলেই তো তোমার নেওয়া হলো।’
—ভাবছিলাম একটা পাঞ্জাবি-টাঞ্জাবি, ফেরার পথে কিনে নেব নাকি?
মহুয়া বলল, ‘একদমই না। মা বলেছে বাবার পাঞ্জাবি কমপক্ষে তেত্রিশটা। অন্তত কুড়িটার ভাঁজই ভাঙেনি।’
—বেশ, তাহলে টাকা বেঁচে গেল।
গাড়িতে ওঠার সময় পেছন ফিরে দেখি দরজায় দাঁড়ানো মহুয়া হাত নাড়ছে।
ক’মিনিট পর মনে হলো বেরোনোর সময় কোথাও কোনো কাচের টুকরো দেখিনি। মহুয়া ভাঙচুর করতে ও পরিষ্কার করতে সমান দক্ষ।
ফেরার পথে আমি বইয়ের দোকানে নেমে গাড়ি ছেড়ে দিলাম। বেশ বড় বড় নামের দুটো ইংরেজি বই কিনলাম। একটির অনূদিত নাম হতে পারে—সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজ দোষে ভেঙে টুকরো। অন্যটির নাম—মার্ক্সবাদের বিপর্যয় :বাম রাজনীতির ভবিষ্যত্ অন্ধকার।
অধ্যাপক মুক্তাদির আমার শ্বশুর জন্মদিনে আমার কাছ থেকে এরকম দুটো বই পেয়ে সম্ভবত সন্তুষ্ট হননি। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি পড়েছ?’
—না স্যার, এত মোটা বই আমি জীবনেও পড়ব না।
তিনি বললেন, ‘সমাজতন্ত্র যে শেষ সে তো আমি জানি, এই আফসোসই ফুরোতে চাচ্ছে না। এখন আরো বেশি করে জেনে কী লাভ?’
তাদের বাবাকে দিয়ে মহুয়া ও ডেইজি যখন কেক কাটাচ্ছে, তিনি বললেন, ‘কোনটা যে আমার জন্ম তারিখ, আমার বাবা-মা কারোই মনে ছিল না। স্কুলের মাস্টার যা লিখে দিয়েছে তাই চলছে।’
ডেইজি বলল, ‘সমস্যা নেই আব্বু, আমরা তো আর বছরে দু-তিনবার করে তোমার বার্থডে করব না, একবারই। কাজেই তারিখটা কোনো ব্যাপারই না।’
সাড়ে দশটার দিকে যখন ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছি, মহুয়া বলল, ‘চলো না আজকের রাতটা থেকে যাই, আমার রুমটাতে থাকতে ইচ্ছে করছে।’
আমি বললাম, ‘কাল আমার অফিস করতে হবে না?’
—করবে। আটটার আগেই বাসায় পৌছে যাব। তোমার গাড়ি তো আসবে ন’টায়।
আমার শাশুড়ি বললেন, ‘তাহলে তোমরা আমাদের রুমে থাকবা, ওখানে সিঙ্গেল খাট।’
মহুয়া বলল, ‘সমস্যা হবে না মা। আনিস স্যার হোসেন আলী দুলাভাইয়ের মতো দুশ কেজির বস্তা হলে এক কথা ছিল।’
মহুয়া অবলীলায় মা-বাবার সামনে বলে ফেলল আমাদের মনমেজাজ ভালো থাকলে দুজনের সিঙ্গেল খাটের চেয়ে বেশি স্পেস লাগবে না।
আমাদের আরো একটা ভালো রাত কাটল। অকারণে মহুয়ার একটা ফিটাল অ্যাবরশন হয়ে গেছে। মহুয়া বলল, ‘সতর্ক থাকব এবার। লেগে যাবে।’ হতে পারে সে রাত থেকেই আমাদের আদনান ও আফসানের যাত্রা শুরু।
সিমেন্স এশিয়া প্যাসিফিকের টেলিকম ডিভিশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলিনা ভিনিয়ার্ড পরিদর্শনে ঢাকায় এলেন। আমি বেশ স্যুট-টাই পরে তার সম্মানে দেওয়া ডিনারে অংশ নিয়ে যখন বাড়ি ফিরি মহুয়া প্রস্তুতই ছিল, বলল, ‘হাগটা কেমন ছিল?’
—কিসের হাগ?
—নরম বুকের?
—কার?
—কার আবার? মোনালিসার। তুমি ভেবেছ নাম বলবে অ্যাঞ্জেলিনা আর আমি চুপ হয়ে যাব?
—মিস মোনালিসা দোমিঙ্গোজ! তোমার কি ধারণা তিনি এলে কোম্পানি তাকে ফরমাল ডিনার দেবে আমাদের দাওয়াত খাওয়াতে? আমার স্ট্যাটাস আর মিস মোনলিসা দোমিঙ্গোজের স্ট্যাটাস আপাতত একই, কিন্তু আমি শিগগিরই তাকে ছাড়িয়ে যাব। তার পজিশন ব্লকড, আমারটাতে অনেক উপরে ওঠা যাবে।
পরের বছর ব্যাংককে আমাদের মোটিভেশনাল কনফারেন্স।’ মহুয়া বলল, ‘কী বললে?’
—মোনালিসা কনফারেন্স।
—বেশ যাও। ফিরে এসে আমার সাথে শুতে পারবে না। এই লম্বা বেশ্যাটার সাথে এটা ওটা করে তুমি আমার গা ছোঁবে, আমি তা হতে দেব না।
আমার পরবর্তী বিদেশ সফরগুলো মহুয়া দুর্বিষহ করে তুলল। শীতের রাতে কয়েন বক্সে পয়সা ফেলে ছেলেদের খোঁজ নেওয়ার জন্য ঢাকায় ফোন করি। ফোন তুলেই মহুয়া বলে, ‘তোমার বিছানায় শোয়া কোঁকড়া চুলের লম্বা মেয়েটা কে?’
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘কোন মেয়েটা কোন বিছানায়?’
মহুয়া বলল, ‘আনিস তুমি বড্ড বেড়ে গেছ। তুমি ভেবেছ মিউনিখের এই বদমাস মেয়েটাকে আমি চিনব না। তোমার ধারণা ভুল। আই নো দিস ইন্টারন্যাশনাল হৌর।’
মহুয়া যাই বলুক, মোনালিসা দোমিঙ্গোজ অ্যাট দ্য রেট অব ইয়াহু ডট কম আমার নিত্যকার ভার্চুয়াল গন্তব্য হয়ে উঠেছে। আমাদের সঙ্গে ৬ ঘণ্টা সময়ের তারতম্য। আমি আনিস এসেই মোনালিসার গুটেন মর্গেন বার্তা পাই, আফিস ছাড়ার সময় শেষ বার্তা দিই—গুটেন নাখট। শুভরাত্রি। মোনালিসার সঙ্গে সম্পর্কটি গড়াতে গড়াতে এমন এক জায়গায় পৌঁছে যেখানে বলতে বাধ্য হই, ‘আমার স্ত্রী মহুয়া শুধু তোমার কারণে আমাকে নিয়ে ল্যুভ জাদুঘর যায়নি, তোমার কারণে আমাদের বাড়ির দেয়ালে টাঙানো মোনালিসার ছবিটি ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে, তোমার কারণে আমি কোনো বিদেশি নারীর সাথে কথাও বলতে পারছি না।’ মোনালিসা বলল, ‘আমি আংশিক দুঃখিত এবং আংশিক আনন্দিত। কারণ সে আমাকে তোমার কাছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিদেশি নারী করে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।’
মোনালিসাকে বললাম, ‘তোমার পূর্বপুরুষ ভাস্কো-দা-গামা আমাদের কোনো কোনো পূর্বপূরুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে।’ মোনালিসা জানাল, সে নিজে এসে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমতা চেয়ে যাবে। আমাদের সেই মিউনিখ সফরের সপ্তম বছর এক সন্ধ্যায় তার বার্তা পেলাম—অফিস তাকে এক সপ্তাহ টোটাল রিলাক্স করার টাকা দিচ্ছে, সিমেন্স অপারেশন আছে, এমন যেকোনো দেশের রিটার্ন টিকিট ও অন্যান্য খরচও দিচ্ছে। কিন্তু সে কোথায় যাবে তার পরামর্শ আমার কাছে চাচ্ছে না, কারণ সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। সে চায় আমি তার জন্য ফাইভ ওয়ার্কিং ডেজ ছুটি নিই।
আমি বলি, ‘তুমি নিশ্চয়ই আমাকে ভুল বুঝবে না যদি তোমাকে আমার বাসায় খেতে না ডাকি? তুমি নিশ্চয়ই ভুল বুঝবে না যদি মহুয়া তোমার সাথে এসে সৌজন্য সাক্ষাত্ না করে? কিংবা আকস্মিকভাবে এসে তোমার ওপর চড়াও হয়।’
মোনালিসা বলল, ‘আমি বাংলাদেশে যে কদিন তোমার সাথে থাকব, আমি তোমাকে সারাদিন সারারাতের জন্য চাইব, আমি তোমার মুখে মহুয়া নাম একবারও শুনতে চাইব না। দেখি তুমি কিভাবে তোমার বউকে ম্যানেজ করো।’
মহুয়ার সঙ্গে আমার বিবাহোত্তর সবচেয়ে বড় প্রতারণা মোনালিসাকে নিয়েই। আমি ছুটি পেয়ে যাই। মহুয়াকে জানাই পার্বত্য এলাকায় বহনযোগ্য সিমেন্স টেলিকমিউনিশন নেটওয়ার্ক প্রমোশন করতে ছ-সাতদিনের জন্য তিন পার্বত্য জেলায় যাচ্ছি।
যথারীতি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাই। গুলশানের একটি রেস্টহাউসে দুটি রুম ভাড়া করি। রাত দশটার দিকে এয়ারপোর্টে মিস মোনালিসা দোমিঙ্গোজকে রিসিভ করি। এয়ারপোর্টেই মোনালিসা যে আবেগ নিয়ে আমাকে আলিঙ্গন করে, তাতে আশপাশের লোকজন থ হয়ে গেছে।
পরদিন ভোর থেকে ফতুল্লা সুন্দরবন পাঁচ দিনের রিভারক্রুজ। সুন্দরবন কিংবা নদীর আকর্ষণে নয়, মেইনল্যান্ড থেকে জনতার চোখের আড়ালে আমরা পাঁচদিন একসঙ্গে থাকব এই লোভে।
রুমে ঢুকেই মোনালিসা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার ব্যাগেজ কোথায়? আমি তোমাকে বাড়ি ফিরে গিয়ে ব্যাগ আনতে দেব না।’
—আমি ঠিক উল্টোদিকের রুমে।
—দুটো রুম নিয়েছ? আমি তো একরুমের ভাড়া দেব।
আমি বললাম, ‘একটু ক্যামোফ্লেজ করতে হচ্ছে তাই রুমটা থাকুক।’
—তুমি চাইলে তোমার সাথে থাকব।
মোনালিসা বলল, ‘তুমি কি আমার ভাষা বোঝো না। তোমার সাথে থাকার জন্যই তো এসেছি। তুমি থাকবে এক প্রভিন্সে আমি অন্যটাতে এমন নয়, এক বিছানাতেই এক বাথটাবেই ছিটকানি খোলা এক বাথরুমেই।’
শুধু গুড মর্নিং, আর গুড নাইট বার্তা থেকেই আমাদের এমন একটি সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে না আরো কিছু আছে?
অবিশ্বাস্য উত্তেজনা ও ভালোবাসার ক’টা দিন কেমন কেটেছে, সে বর্ণনা থাক। নদীও সাগরের একাংশ কেমন, একাদশী ও দ্বাদশীর রাত কেমন সে বর্ণনাও থাক।
ফেরার পথে শেষরাতের কাহিনি কিছুটা হলেও বলতেই হবে।
আমিই বললাম, ‘তোমার সাথে আমার এই দিন ও রাতের পরিণতিতে তুমি যদি কনসিভ করে যাও!’
মোনালিসা বলল, ‘আমি তো সেটাই চেয়েছি। কিন্তু ফাদার গড তো আমার সে স্বপ্ন পূরণ করবেন না।’
আমি বললাম, ‘না করলেই ভালো। আমিও চাই না একটা বেবি আনসার্টেইনিটির মধ্যে বেড়ে উঠুক।’
মোনালিসা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি ঘাবড়ে যাচ্ছ?’
—না তো।
আমি সম্ভবত মিথ্যে বলেছি, কারণ আমি ঘাবড়ে যাচ্ছিলাম।
মোনালিসা হেসে ফেলল বলল, ‘সে সম্ভাবনা একেবারেই নেই। আমার বয়স যখন উনিশ, তখনই কিছু ক্যান্সারাস অ্যাবনরমালিটির কারণে আমার ইউটেরাস রিমুভ করতে হয়। কাজেই তুমি আশ্বস্ত থেকো।’
আমি বললাম, ‘তুমি গত সাত বছরে একবারও বলোনি।’
মোনালিসা বলল, ‘গত সাত বছর তুমি আমার হূদয় একটু একটু করে টাচ করেছ। এই প্রথম আমার ইউরেটাস টাচ করতে যাচ্ছিলে সেজন্যই এতদিন পরে বলা।’
—না বলা এমন আরো কিছু কি আছে?
—আছে।
আমি আতঙ্কমেশানো আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকি।
মোনালিসা বলল, ‘আমার বাবা যে কে, আমার কোনো ধারণাই নেই। আমার বয়স যখন নয়, আমার মা মারা যায়। আমি একাধিক ফস্টার প্যারেন্টসের ঘরে বেড়ে উঠি। দোমিঙ্গোজ ফ্যামিলির সাথেই সবচেয়ে বেশি সময়। তাদের সাথে জার্মানিতে মাইগ্রেট করি। এরা আবার আমেরিকাতে মাইগ্রেট করে। কিন্তু তখন আমার একটা জার্মান বয়ফ্রেন্ড ছিল—কার্ল অগাস্তাস পপার। তার সাথে সংসার করব বলে মিউনিখে রয়ে যাই। যখন ইউটেরাসে ক্যান্সার ধরা পড়ে, কার্ল আমাকে ডেজার্ট করে চলে যায়। কার্লের কোনো দোষ নেই, আমারই কাছাকাছি বয়সী একটি স্মার্ট ছেলে একটি পেশেন্টের বোঝা বইবে কেন?
একসময় অনকোলিস্টরা ঘোষণা দেন, ক্যান্সারের উত্সকে মূলোত্পাটন করা হয়েছে। আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে প্রথমবছর কোয়ার্টারলি চেক করতে হবে, দ্বিতীয় বছর হাফ ইয়ার্লি, সব ঠিক থাকলে তৃতীয় বছর ইয়ার্লি চেক করাতে হবে। তারপর কিছু সিম্পটম দেখা দিলেই চেকের দরকার হবে, নতুবা আমার জীবন যেমন চলছে বেশ চলে যাবে।’
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি এখন ঠিক আছ তো?’
মোনালিসা বলল, ‘আমি কি আমার কিছু তোমার ঘাড়ে তুলে দিচ্ছি বলে তোমার মনে হচ্ছে।’
বললাম, ‘না তো, তবে তোমার জন্য আমার যে ফিলিংস তাতে নতুন একটা কিছু যোগ হয়েছে।’
—আশা করি সেটা করুণা নয়। করুণা হলে আমাদের সম্পর্কটা টিকবে না। অবশ্য টিকে থাকলেই আর কত দিন?
—মানে?
—গত চার বছর তেমন কোনো সিম্পটম দেখা দেয়নি। মাস তিনেক আগে এক্সেসিভ ব্লিডিং হওয়াটা অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় ক্লিনিকে যাই, ডাক্তার বারবার জিজ্ঞেস করেন কোথাও পেইন হচ্ছে? বললাম, না। এখন তোমাকেও বলছি, কোনো পেইন এখনো ফিল করছি না। কিন্তু ডাক্তার বললেন, মেটাস্ট্যাসিস হয়ে গেছে, ক্যান্সার শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বছর দেড়-দুয়েক টিকে থাকা সম্ভব। আমার চাকরিটা স্থায়ী হওয়ায় এবং সিমেন্সের সাথে ইন্সুরেন্স কোম্পানির ওয়াইডার কাভারেজ পলিসি থাকায়, চিকিত্সার টাকা-পয়সার সমস্যা হচ্ছে না। আমি ফিরে গিয়েই রেডিও এবং কেমোথেরাপি শুরু করব। তখন এতটা আনন্দময় সময় কাটানো সম্ভব হবে না। সেজন্য ভাবলাম কোম্পানির কাছে পাওনা একটি আনন্দ ভ্রমণ কেন তোমার সাথেই করি না।
বাকি রাত আমি মোনালিসাকে আঁকড়ে ধরে রাখলাম। বিড়বিড় করে বললাম, ‘আমি তোমাকে মরতে দিতে চাই না, কিন্তু আমি বোধহয় তোমার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারব না।’
আমার চোখই অশ্রুসিক্ত হয় মোনালিসা আমাকে গার্লিশ বয়, মেয়েলি খোকা বলে বকা দেয়, চোখও মুছে দেয়।
পরদিন সকালের ফ্লাইটে মিস মোনালিসা দোমিঙ্গোজকে উঠিয়ে দিয়ে আবারও রেস্ট হাউসে ফিরে তারই দেওয়া অনেকগুলো টাকার কিছুটা ভাঙ্গিয়ে সব পাওনা শোধ করে আমার ট্রলি ব্যাগ টানতে টানতে বাসায় ঢুকি। মহুয়া তখন কলেজে। সাড়ে তিনটায় যখন ফিরল, আমি তখন ঘুমিয়ে। আমার চুলের ভেতর হাত দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে ঘুম ভাঙিয়ে বলল, ‘এত কালো হয়ে গেলে কেমন করে? পাহাড়ে খুব ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। তাই না?’
আমাদের ঝগড়ার ফ্রিকোয়েন্সি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটাই নেমে গেছে। তবুও যখন ঝগড়া অনিবার্য হয়ে পড়ে কখনো মোনালিসা এবং প্রায়শ মমতাজ মহল উঠে আসে। বয়স আমাদের ক্রোধ ও সহিংসতাকেও অনেকটা হরণ করে নিয়েছে।
বার.
আমাদের আইডেন্টিক্যাল টুইন আদনান ও আফসান ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোনিয়া বার্কলেতে আন্ডারগ্রেড করতে চলে গেছে। অনেক খরচ। প্রাইম লোকশনে পঁচাত্তর লাখ টাকায় প্রায় তিন হাজার বর্গফুটের অ্যাপার্টমেন্টটি আড়াই কোটি টাকায় বেচে নিজেদের জন্য কিছু রেখে বাকিটা ছেলেদের কাছে ট্রান্সফার করার আয়োজন করেছি। ছেলেরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছে দেশে ফিরবে না।
আমি মহুয়ার সঙ্গে আরো একটি প্রতারণার উদ্দেশে বিক্রির টাকার পরিমাণ বলি সবশুদ্ধ দুই কোটি টাকা।
আমরা অভিজাত এলাকার বাইরে পঁচিশ হাজার টাকা ভাড়ার অ্যাপার্টমেন্টে উঠি। থাকার জন্য বিলটিলসহ খরচ হবে বত্রিশ হাজার।
ছেলেদের ভর্তির কাজ শেষ করে ভার্মিটরিতে উঠিয়ে আমাদের দ্রুতই ফিরতে হয়। আমরা থাকতে চাইলেও ছেলেরা আমাদের চায়নি। ছেলেরা বলেছে, ‘গপ্পোসপ্পো নিন্দামন্দ করতে হলে নিউ ইয়র্ক চলে যাও। অনেক বাঙালি পাবে। ঘনঘন আমাদের দেখতে এলে মামিস বয়স খেতাব জুটবে।’ আমরা চাই না ছেলেরা বিব্রত হোক। আমাদের এক মাসের পরিকল্পিত সফর এমনকি নিউ ইয়র্কে ঘোরার পরও ষোলো দিনে শেষ হয়ে গেল। সতরতম দিন মধ্যরাতে উড়োজাহাজে ঢাকা এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করি।
আমাদের ছেলেরা চৌকোশ, তারা গ্র্যাজুয়েট হয়েছে, চাকরিও পেয়েছে। তাদের কনভোকেশনে যাওয়ার জন্য ভিসাও নিয়েছিলাম। কিন্তু মহুয়া অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাদের নতুন করে ভাবতে হয়। অসুখের ধরনটি অদ্ভুত। স্বাভাবিক চলাফেরার মধ্যে মহুয়া হঠাত্ দাঁড়ানো কিংবা বসা অবস্থা থেকে পড়ে যাচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গেই অজ্ঞান। জ্ঞান ফিরে আসতে কখনো আধঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। জ্ঞান ফেরার পর মহুয়া উঠে বসে জিজ্ঞেস করছে, ‘আমার দিকে তোমরা এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?’ কিংবা বলছে, ‘আমাকে এখানে আনলে কেন?’ ডাক্তার বললেন, এক ধরনের এপিলেপটিক ফিট হতে পারে। এরকম অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা দু-চারদিন পর পর চলতেই লাগল। ডাক্তারই বললেন, এ সময় লম্বা ভ্রমণের ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না।
***
একজোড়া আইডেন্টিক্যাল টুইন মেয়ের জন্য আমাদের ছেলেরা বসেছিল। পেয়েছে, পছন্দ হয়নি, প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু ক্যারিবিয়ান একই রকম দুই জমজ বোন সামান্থা ও আমান্দা তাদেরই প্রত্যাখ্যান করতে পারে বলে আমাদের ছেলেরা আশঙ্কিত ছিল। বিয়ের সব চূড়ান্ত করেই ছেলেরা আমাদের আসতে বলেছে। দুটো মেয়েই সুন্দর, তবে একটু খাটো, দুজনেরই ডান গালে টোল দুজনের চুল কোঁকড়া।
বিয়েতে স্থানীয় মেয়র হাজির ছিলেন। পেরুর রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি সামান্থা ও আমান্দার মামা।
আমরা ঢাকায় ফিরেই শুনলাম একজন উকিল ক’দিন ধরে আমাদের খোঁজ করছেন। দুবার এসে গেছেন। খুব জরুরি।
বাড়ির কেয়ারটেকার দুটো ছোট টুকরা কাগজ দিল—একটি কাগজে একটি বিজনেস কার্ড স্ট্যাপল করা। অ্যাডভোকেট আহমেদ আতিকউল্লাহ এমএ এলএলবি। সংযুক্ত কাগজে বাড়ির ঠিকানা।
অন্য কাগজে এক লাইনের কেবল একটি চিঠি :আনিস সাহেব অতি জরুরিভিত্তিতে যোগাযোগ করুন। আহমদ আতিকউল্লাহ।
ফোন করলাম। উকিল সাহেব চেঁচিয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার বলুন তো? আমাদের ম্যাডাম মমতাজ মহলের সাথে আপনার কী সম্পর্ক?’
আমি শুধু বললাম, ‘আপনজন।’
মহুয়া চা বসিয়ে দিয়ে ড্রাইভার ও পোর্ট্রেট আর্টিস্ট এরিখ হফনারের দেওয়া ছবি রাখার সেই সিলিন্ডার আকারের কন্টেইনারটা কোত্থেকে যেন বের করে নিয়ে আসে। গত কুড়ি বছরে এটা কোথাও আমার চোখ পড়েনি।
মহুয়া মুখ খুলে প্রথমে একটা একটা করে ভেতর থেকে গোল করে পেঁচানো কাগজ বের করে। হফনারের আঁকা মহুয়ার সেই বিনে পয়সার পোর্ট্রেট। আমি একবার ছবির দিকে একবার মহুয়ার দিকে তাকাই। শরীর অনেকটাই ভেঙে গেছে। আমি কড়া স্বরে বলি, ‘ছবিটাকে আর নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেখ তুমি নিজের যত্ন নিচ্ছ না।’
তারপর মহুয়া টেনে বের করে একটা একটা কাপড়ের রোল। টেবিলে পেতে দেয়, এ কী, এতো সেই তাজমহল! জরি ও পুতিতে লেখা :অন্তরে যার মমতাজ নারী বাহিরে শাহজাহান। একসময় দেয়ালে টাঙানো ছিল।
তারপর মহুয়া বের করল দামি কাগজে রিপ্রোডাকশন :মোনালিসা। এটাও তা হলে নষ্ট করেনি, ভেঙেছে শুধু কাচ।
নিজে থেকেই বলল, ‘তোমার মিস মোনালিসা দোমিঙ্গোজ কি এখনো মিউনিখ অফিসে আছে?’
—আমরা ক বছর আগে মিউনিখ গিয়েছিলাম?
মহুয়া বলল, ‘আঠাশ হবে।’
—তাহলে প্রায় কুড়ি বছর আগে ক্যান্সারে মারা গেছে।
—তুমি সত্যি বলছ? এতদিন বলোনি কেন?
—মৃত্যু নিয়ে মিথ্যে তেমন একটা চলে না।
—একটা মৃত্যুসংবাদও কুড়ি বছর আমার কাছে গোপন রেখেছ? তুমি কি মানুষ না অন্য কিছু?
আমি প্রসঙ্গ থেকে দূরে যাওয়ার জন্য বললাম, ‘চায়ের পানি তো শুকিয়ে যাচ্ছে।’
—শুকিয়ে যাক।
জাদুকরের মতোই একই জায়গা থেকে মহুয়া আর একটা অসমাপ্ত ছবি বের করল। কোনো এক সুপুরুষের কিছুটা অসমাপ্ত ছবি। ছবির নিচে লেখা :প্রিয় আনিস, আমি যদি বড় শিল্পী হতাম ছবিতে তোমাকে আরো সুন্দর দেখাত। মহুয়া।
নামের পাশের তারিখটা পনের বছর আগেকার।
তের.
পরদিন ১০৭ নম্বর মহিপুরী পাড়ায় উকিল সাহেবের বাসায় হাজির হলাম।
তিনি আবারো জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী সম্পর্ক?’
একই কথা বললাম, ‘আপনজন।’
তিনি বললেন, ‘তাই তো হওয়ার কথা। নতুবা এমনিতে কেউ ছাই-ও দেয় না।’
পরদিন উকিলের চেম্বারে গেলাম।
তিনি একটি খামবন্ধ চিঠি দিলেন। আর এগিয়ে দিলেন একটি উইল। উত্তরায় কবি জসিমউদ্দীন রোডে প্লাজা রোজের অ্যাপার্টমেন্ট সিক্স ডি আনিসুর রহমান এবং সাবিকুন নাহার মহুয়াকে দানসূত্রে লিখে দিয়ে গেছেন।
উকিল জানালেন, বাসাটা খালি। ম্যাডাম মমতাজ মহল এই উইলটা তাকে দিয়েই করিয়েছেন। আর সিক্স বি, মুখোমুখি অ্যাপার্টমেন্টটি দিয়ে গেলেন তার একমাত্র মেয়ে, সেও প্রবাসী, সিডনিবাসী অন্তরা ইসলামকে। সিক্স বিতে টেনেন্ট আছে, ভাড়ার টাকাটা অন্তরার অ্যাকাউন্টে জমা হতে থাকবে। উকিল সাহেব বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন। তিনি বলে যাচ্ছেন, ‘ম্যাডাম উইল করেছেন একুশ দিন হলো, মারা গেলেন এগার দিন আগে। নিজের মৃত্যুর আগাম খবর পেয়েছিলেন নিশ্চয়ই। বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। বলেছে, প্রেগন্যান্সির শেষ স্টেজে, নড়াচড়া সম্ভব নয়।’
প্লাজা রোডের অ্যাপার্টমেন্ট লুকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া ফিফটি পার্সেন্ট মালিক তো মহুয়াও।
বাড়ি ফিরে আমি উইলটা মহুয়ার হাতে দিয়ে বলি, ‘পড়ো।’
মহুয়া কিছুক্ষণ থ হয়ে থেমে বলল,‘ মানে আমাকেও।’
—হ্যাঁ, সাবিকুন নাহার মহুয়াকে।
—তোমাকেও।
—কিন্তু আমাকে কেন? কত হবে ওই অ্যাপার্টমেন্টের দাম?
আমি চললাম, ‘আড়াই কোটির বেশিই হবে।’
মহুয়া বলল, ‘ওহ মাই গড! অর্ধেক মানে এক কোটি পঁচিশ লাখ আমাকে!’
***
সে রাতে মহুয়ার অজ্ঞাতে আমি মমতাজ মহলের চিঠিটি পড়ি।
প্রিয় আনিস,
অনেক দিন আগে অন্তরা যখন সিডনি থেকে ফোন করে বলল, তুমি তার অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশি পঞ্চাশ লক্ষ টাকার সমান অস্ট্রেলিয়ান ডলার পাঠিয়েছ, আনন্দে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল। আমি জানি, তোমার সম্পদের মধ্যে কেবল ওই একটাই অ্যাপার্টমেন্ট। বেচে দিয়েছ?
অন্তরা জিজ্ঞেস করেছে, মা এটা কি কখনো সম্ভব, এক-দেড় লাখ টাকা হলে একটা কথা পাঁচ মিলিয়ন টাকা কেউ কাউকে দেয়? তুমি আনিস আংকেলকে জিজ্ঞেস কোরো। বাবাও তো কখনো আমাকে এক হাজার টাকার বেশি দেয়নি। সব মিলিয়ে হয়তো অনেক হবে, কিন্তু একবারে এক হাজার একবারই, যখন হাজার টাকার নোট বের হয় তখন দিয়েছে।
নুরু নেই এগারো বছর। তোমার সঙ্গেও যোগাযোগ কমে গেছে। আমার ভেতর মৃত্যুভয় ঢুকেছে। মনে হচ্ছে যেকোনো দিন চলে যাব। খোঁজ নিয়েছি, তুমি নেই, ফোন বন্ধ। তুমি কি সব বেচে রাস্তায় নেমেছ?
আনিস, আমার দুটো অ্যাপার্টমেন্টের একটা তোমাকে আর মহুয়াকে দিচ্ছি, আমি এটাতেই থাকতাম। তুমি যে টাকা অন্তরাকে দিয়েছ, তাতে মহুয়ারও তো হক ছিল। অন্তরার হাজব্যান্ড ক্রিস্টোফার লেভিন অন্তরাকে বলেছে, তুমি হচ্ছ ‘গ্রেটেস্ট সান্তাক্লজ এভার’।
মহুয়ার ওপর রাগ কোরো না, তার জায়গায় আমি হলে হয়তো তোমার জীবন আরো দুর্বিষহ করে ফেলতাম।
অন্তরাকে সেই সত্যটি আমি যেমন জানাইনি, তুমিও গোপনই রেখো।
আদ্রিয়ান ও জুলিয়ানের জন্য আদর। ওরা বিয়েশাদি করবে না? তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে, তবুও মনে হয় আর দেখা না হওয়াই ভালো।
তোমার
মমতাজ মহল
আমাদের ফার্স্টবয় নুরুদ্দিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গির মিয়া পেছন দিকের আমি আর মাঝামাঝি পর্যায়ের মমতাজ মহল আমরা একটি কো-এডুকেশন স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছি। নুরু স্ট্যান্ড করেছে, মমতাজ মহল ফার্স্ট ডিভিশন, আমি সেকেন্ড ডিভিশন। পরীক্ষার এক্সামিনার আমার ওপর অবিচার করেছেন, এমন অভিযোগ কখনো করব না। মমতাজ মহলের বাঁ চোখ ভীষণ ট্যারা ছিল বলে স্কুলে সে ট্যারা মমতাজ নামেই পরিচিত ছিল।
নুরু মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং দুটোতেই চান্স পেয়ে শেষ পর্যন্ত পড়েছে পদার্থবিজ্ঞান, আইনস্টাইন ধরনের বিজ্ঞানী হবে। মমতাজ মহল রোকেয়া হলে থেকে সমাজবিজ্ঞান পড়ল। আমি ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাইনি। মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে বিএসসি করেছি। পরে এমএসসি।
নুরুদ্দিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গির মিয়া লেকচারার হিসেবে ইউনিভার্সিটিতে আজ জয়েন করে কি কাল কয়েন করে এমন একটি অবস্থায় আমাকে ডেকে বলল, ‘আনিস, তোকে সাক্ষী হতে হবে।’
—কিসের?
—বিয়ের, আমার বিয়ের।
—কবে?
—আজই।
—কাকে?
—তোর এতকিছু জানার কী দরকার?
—না জানলে কিসের সাক্ষী হবো!
মিনিট দশকের মধ্যে বোরকা পরা এক মহিলা এসে আমাদের সামনে পুরো বোরকাটাই খুলে ফেলল।
আমি বললাম, ‘ট্যারা মমতাজ তুমি? মানে তোমরা? প্রেমট্রেম কবে করলে? কিছুই টের পেলাম না।’
নুরু বলল, ‘তোকে টের পাইয়ে আমাদের সবকিছু করতে হবে নাকি?’
বিয়েটা হলো রায়েরবাজার কাজী অফিসে। আমি সাক্ষী, কাজি অফিসের অপরিচিত একজনও সাক্ষী হলেন। এক লাখ এক টাকা দেনমোহরে অর্ধেক উসুলে আমাদের বুককীট নুরু মিয়া ও ট্যারা মমতাজের বিয়ে হয়ে গেল। নুরু মাস তিনেকের মধ্যে ইউনির্ভাসিটিতে জয়েন করল। বছর দুয়েক পর কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পাবে, এটা নাকি নিশ্চিত। পিএইচডি করতে চলে যাবে ব্রিটেন কিংবা অস্ট্রেলিয়ায়।
কিন্তু ছমাসের মাথায় মমতাজই ফোন করে বলল, ‘তাড়াতাড়ি এসো, নুরুর অবস্থা খারাপ। নুরুর মাথা আউলে গেছে, উদ্ভট দুর্বোধ্য সব কথা বলছে। গায়ের কাপড়ও খুলে ফেলছে।’
ডাক্তার নাজিমউদ্দৌলা চৌধুরীর অধীনে হসপিটালে ভর্তি করা হলো। ডাক্তার বললেন, ঘুম হচ্ছে বড় ওষুধ। টানা তিন মাস হাসপাতালে থেকে বাড়ি ফিরে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার কী হয়েছিল?’
ট্যারা মমতাজ সচ্ছল পরিবারের মেয়ে হওয়ায় তার সঙ্গে হাসপাতালে ডিউটি করা দিনগুলোতে মমতাজ মহল পয়সাকড়ি দিয়ে আমাকেও চালিয়েছে। মাসতিনেক পর নুরু আবার আইনস্টাইন হয়ে গেল। আবার হাসপাতালে নিতে হলো। আমি তখন মিরপুর শেওড়াপাড়ার পাট চুকিয়ে নুরুর সোবহানবাগের বাসাতেই থাকতে শুরু করি। আমরা শিফটিং ডিউটি করি, কোনোদিন আমি রাতে, কোনোদিন মমতাজ মহল। হঠাত্ আবিষ্কার করি, সুযোগ পেলেই আমি মমতাজ মহলের দিকে তাকিয়ে থাকছি। মমতাজ চোখ নামিয়ে নিচ্ছে। তারপর সম্পর্কটা দ্রুত বদলাতে থাকে। প্রথম যেদিন আমাদের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেল, মমতাজ বলল, ‘তুমি যাও আমি একাই নুরুকে সামলাতে পারব।’ যাই যাই করেও প্রায় এক মাস কেটে গেল। ব্যাপারটা বারবার ঘটতে থাকল। ততদিনে আমি শুক্রাবাদ মেসে থাকতে শুরু করি, নুরু এবার বেশ সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাসেও যোগ দেয়। ছুটির দিন আমাকে ডাকে একসঙ্গে ভাত খাই।
নুরু ও মমাতজ মহলের মেয়ে হলে আমি সোনার চেইন নিয়ে দেখতে আসি। নুরু বলে, ‘আমি জানি তুই অনেক টাকা ধার করে এটা কিনেছিস। অন্তত কিছু টাকা নিয়ে যা।’
আমি বলি, ‘তোর মেয়ে তো আমারও মেয়ে।’
মমতাজ মহল বলল, ‘ট্যারা না হলেই হয়। মেয়ের জন্য তোমরা দুজন পাঁচটা করে নাম জমা দাও। আমার পছন্দমতো একটা রাখব।’
একটু দেরিতে হলেও নুরু ম্যানচেস্টার থেকে পিএইচডি করেছে। ইউনিভার্সিটিতে কোয়ার্টার পেয়েছে। লিয়েন নিয়ে প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটিতে পড়িয়ে ভালো টাকা কামিয়ে দুটো অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছে।
মেয়েটার নাম অন্তরা। ডক্টর নুরুদ্দিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গির মিয়া ও বেগম মমতাজ মহলের মেয়ে অন্তরা। নামটা আমারই দেওয়া। পাঁচটা নয়, আমি একটা নামই দিয়েছিলাম।
চৌদ্দ.
আমরা প্লাজা রোজের অ্যাপার্টমেন্ট সিক্স ডি-র দখল নিয়েছি। থাকব, না ভাড়া দেব ভাবছি।
মহুয়া বলল, ‘এবার দেড় হাজার ডলারের মতো বেঁচে গেছে। ছেলেরা আমাকে খরচ করতে দেয়নি। চলো না একটু কোথাও ঘুরে আসি।’
—কোথায়?
—ইন্ডিয়ায়, আগ্রা যাব। চলো তাজমহল দেখে আসি। আমার জন্য তোমার দেখা হয়নি।
মহুয়ার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকাই। মমতাজ মহলকে এবার ভালোবাসা জানিয়ে আসব। নিশ্চিত। মমতাজ মহলকে বনানীতে নয়, আগ্রায়।
আমরা বাসায় ফিরে আসি।
আমাদের মুখে তেমন কথা নেই।
আমি আমাদের গোলাকার ডাইনিং টেবিলের একপাশে চুপচাপ বসে থাকি। মহুয়া বলল, ‘মোনালিসা সত্যিই মারা গেছে?’
—কুড়ি বছর আগে।
মহুয়া বলল, ‘আমার জন্য তাহলে আর কেউই থাকল না।’
আমরা চুপ করে থাকি।
মহুয়া আবার বলে, ‘১৯১১ সালে যখন মোনালিসা চুরি হয়ে যায়, ল্যুভ মিউজিয়ামে মোনালিসার শূন্যস্থানটি দেখার জন্য প্যারিসে দেশি ও বিদেশি মানুষের ঢল নামে। মানুষ ভাবতে শুরু করে ছবি না থাকলেও মোনালিসার আত্মা তখনো সেখানে ঘুরঘুর করছে। মোনালিসার সাথে বিচ্ছেদ ফ্রান্স শোকে কাতর হয়ে ওঠে। প্রায় দু’বছর প্যারিস রয়ে যায় শোকের শহর।’
—তুমি অনেক খবর রাখো।
মহুয়া বলল, ‘চলো আবার ফ্রান্স যাব, আমি টাকা দেব। আমার জন্য তোমার তো মোনালিসাও দেখা হয়নি।’ v
