গল্প

এই তো জীবন

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ২০:০১

রাজিয়া বানু আজ অনেকদিন পর আবার তাঁর প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। এতদিন তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। আর্জেন্টিনায় একটা মানসিক ব্যাধির ওপরে সেমিনার ছিল, সেখানে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন। দেশে ফেরার পথে লন্ডন হয়ে ফিরেছেন। সেখানে তাঁর মেয়ে থাকে বর্তমানে।

দেশে এসে জেটল্যাগে ভুগলেন ক’দিন। তারপর এখন আবার প্র্যাকটিসে বসেছেন।

আজ তাঁর প্রথম দিন। বেশ কয়েকটি রোগী দেখার পর যখন তাঁর চেম্বার বন্ধের দিকে, ঝড়ের বেগে একটি মেয়ে প্রবেশ করে রাজিয়ার হাতে তার কেনা টিকিটটি জমা দিল।

রাজিয়া বানু অনেক চিন্তাভাবনা করে তাঁর ক্লিনিকের নাম দিয়েছেন ‘ড্রপ ইন ক্লিনিক’। কেন? তার কারণ, নাহলে রোগীরা ‘সিরিয়াল’-এর জন্য তাঁর মাথা খেয়ে ফেলে। রাজিয়া অল্প রোগী দেখেন, সারাটা জীবন এভাবেই দেখে এসেছেন। তাঁর রোগীর সংখ্যা সীমিত। তাই তাঁর ক্লিনিকের নাম হয়েছে ড্রপ ইন ক্লিনিক, অর্থাত্ ক্লিনিকে আসো, নাম লেখো, পয়সা খরচ করে টিকিট কেনো, তারপর মনোবিশেষজ্ঞের কাছে সমস্যার কথা বলো, পরামর্শ নাও এবং বিদায় গ্রহণ করো।

তবে ব্যাপারটা যত সহজে বলা যায়, ততটা সহজ নয়। অনেক রোগী টিকিট হাতে পাওয়ার পর আবার সিরিয়াল চায়। সেটা ম্যানেজ করতে হয় এই বলে যে, যিনি আগে আসবেন, তাঁকে আগে দেখা হবে, যিনি পরে আসবেন, তিনি পরে। তবে ইমার্জেন্সির সময় এসব কিছু মানা হবে না। তখন বেশি অসুস্থকে আগে দেখতে হবে। এটাই পৃথিবীজুড়ে নিয়ম।

তারপরও বলতে হয়, সাধারণত এভাবে রোগী বা ক্লায়েন্টরা রাজিয়ার চেম্বারে প্রবেশ করেন না। তাঁরা রাজিয়ার সাহায্যকারীর মাধ্যমে প্রবেশ করেন। তিনি এসে জানান, রোগী নতুন না পুরনো। তারপর রোগীর হাতে ব্লাডপ্রেসার যন্ত্র বেঁধে অপেক্ষা করেন, কারণ প্রেসারটা রাজিয়া নিজেই দেখেন, যতটা না প্রয়োজনে তারচেয়ে বেশি রোগীর সঙ্গে ফর্মালিটি কমিয়ে আনতে।

কিন্তু এখানে সাহায্যকারী রাজিয়ার সঙ্গে রোগীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগেই মেয়েটি এসে হাজির হলো। রাজিয়ার এই বয়সে সব রকমের অভিজ্ঞতাই হয়ে সেরেছে, সুতরাং এটা তাঁর কাছে নতুন কোনো ব্যাপার না।

রাজিয়া একটু জিজ্ঞাসু হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকালেন। এই ফাঁকে তিনি মেয়েটির অবয়ব দেখে সেরেছেন। বয়স বড় জোর বিশ-একুশ হবে। সাধারণ বাঙালি চেহারা। রং শ্যামলা। রোগার দিকে শরীরের ধাত। সে এসে রাজিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বসতে পারি, ম্যাডাম?’

রাজিয়া বললেন, ‘অবশ্যই। এই জন্যই তো চেয়ার রাখা হয়েছে।’

মেয়েটি সরাসরি রোগীর চেয়ারে না বসে রাজিয়া বানুর মুখোমুখি বসল। তারপর মুখে একটা কাঠিন্য ধরে বলল, ‘আমি কিন্তু রোগী না, আমি আপনার কাছে একটা পরামর্শ চাইবার জন্য এসেছি।’

রাজিয়া সেটা মনে মনে জানতেন। আসলে কথাটা তো ঠিক। অধিকাংশ ক্লায়েন্টই তো মানসিক রোগী নয়। পরিবারিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত নানাপ্রকারের জটিলতা তাদের জীবনকে যখন বিস্রস্ত করে ফেলে; তখনই তো তাঁরা এসে তাঁর চেম্বারে হাজির হয়। অনেক ক্লায়েন্টর মতে, আত্মীয়-স্বজনের কাছে পরামর্শ করার চেয়ে একজন অচেনা কিন্তু মানুষের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন, তেমন কারো কাছে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করাটা অনেক ভালো। তাঁরা যে পরামর্শ দেবে, তা হবে আবেগবর্জিত বাস্তব পরামর্শ। আর এ কারণেই আজকাল বহু মানুষ মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের কাছে ধর্না দেয় এবং একথাও সকলে আজকাল জানে যে, যেকোনো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে কাউন্সেলিংও সমস্যা সমাধানের একটি সহজাত প্রক্রিয়া।

রাজিয়া বানু অপেক্ষা করতে লাগলেন। মেয়েটি বলল, ‘আমি একটু তাড়াহুড়ো করে আপনার চেম্বারে ঢুকলাম বলে মাফ চাইছি। আসলে ম্যাডাম, আমি চাইনে কেউ আমাকে দেখুক যে আপনার চেম্বারের সামনে বসে আছি। এজন্য আর দশজন সাধারণ রোগীর মতো ভেতরে বসেছিলাম। যাতে মানুষ মনে করে, আমি কোনো ফিজিশিয়ানের পরামর্শ চাইতে এসেছি! আজকাল এই একটা কাজ ভালো হয়েছে যে, মানসিক ব্যাধির বিশারদেরা আর দশজন স্পেশালিস্ট ডাক্তারের সঙ্গে বসে থাকে। ফলে অনেকেই দেখে বুঝতে পারে না যে, লোকটি কিসের জন্য এই চেম্বারে এসেছে!’

মেয়েটির কথা শুনে মনে মনে রাজিয়া বানু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তা টের পেলেই বা কী হবে বলেন তো? মানুষের তো শুধু শরীরের সমস্যা হয় না, মনেরও অনেক সমস্যা হয়। আর তারও আছে বৈজ্ঞানিক পরামর্শ বা কখনো কখনো আছে ওষুধও। যেসব ওষুধ মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারে তার স্বাভাবিক জীবন। সুতরাং কোনটি যে শারীরিক আর কোনটি যে মানসিক, তা কে বিচার করবে বলুন তো?’

রাজিয়া বানু সারাটা জীবন ইচ্ছে করেই তাঁর ক্লায়েন্টদের ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেন, যদিও বয়সে তারা তাঁর চেয়ে অনেক ছোট। এসব ব্যাপারে রাজিয়া বানুর নিজস্ব কিছু ফিলোসফি আছে। আর তা হলো, বাঙালি এ পৃথিবীতে বড় হয়ে বাঁচতে চায় না, সে ছোট হয়ে বাঁচতে চায়! যে কারণে চেম্বারে ঢোকার পর থেকেই রোগীরা রাজিয়া বানুকে জোর-জবরদস্তি করতে থাকে তাদের ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতে। আর তা না করা পর্যন্ত তাঁরা ক্ষান্ত হয় না। এ এক আশ্চর্য মানসিকতা—এই ছোট থাকার প্রবণতা, বাঁটকু থাকার প্রবণতা! মানুষ হিসেবে তা সে যত ক্ষুদ্র হোক, আরেক মানুষের সমকক্ষ হয়ে বেঁচে থাকার ইচ্ছে বা শখ অধিকাংশ বাঙালির ভেতরে নেই! আর এ সত্য রাজিয়া বানু যত দিন যাচ্ছে, তত ভয়াবহভাবে আবিষ্কার করছেন। তবে ব্যত্যয় যে নেই, তা বলা যাবে না। দু-একজন হাতে গোনা রোগী বা ক্লায়েন্ট তিনি পেয়েছেন, যারা ছোট হলেও রাজিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে সাহসের সঙ্গে কথা বলে। তাদের ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করলে তারা খুশি হয়। তারা সমকক্ষের মতো কথা বলে। যদিও তাদের জীবন-অভিজ্ঞতা কম, তবু তারা চেষ্টা করে নিজেদের কথা গুছিয়ে বলতে। এই ক্লায়েন্টদের রাজিয়া সমীহ করেন। তবে তারা হাতে গোনা ক’জন মাত্র।

বাঙালি জাতির সাইকিক প্যাটার্নের ভেতরে আত্মমর্যাদাবোধ প্রবিষ্ট হতে হবে।

রাজিয়া বানু মাঝে মাঝে ভেবে অবাক হয়ে যান যে, এই আত্মমর্যাদাবোধ বঙ্গবন্ধুর ভেতরে কী আশ্চর্য মাত্রায় ঘনীভূত ছিল, সমগ্র বাঙালির আপামর জনসাধারণের মধ্যে সেই বোধ কবে জাগ্রত হবে?

মেয়েটি তাঁর কথা শুনে একটু যেন থমকে গেল। হাজার হোক ছোট মানুষ, মনে মনে ভাবলেন রাজিয়া। তারপর নরম গলায় বলে উঠলেন, ‘বাইরে কি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে?’

মেয়েটি বলল, ‘না, তবে আমি আজ সকাল থেকে বমি করছি। এখানে এসেও একবার বমি করেছি। আমার স্টমাকে কিছু নেই, তবু ওয়াক আসছে বারবার। আমি যদি হঠাত্ আপনার এখান থেকে উঠে যাই, তাহলে কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম।’

‘না, কেন মনে করব?’ বললেন রাজিয়া। তারপর অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিনি ব্যস্ত মানুষ, তবু প্রত্যেক ক্লায়েন্টের সম্মুখে তাঁকে দেখাতে হয়, তাঁর হাতে অঢেল সময়!

মেয়েটি বলল, ‘আমি মুনিরা আহমেদ। আমাকে মনি বলে সকলে ডাকে। আমার বাবা আমি যখন খুব ছোট, তখন ব্রেনস্ট্রোকে মারা যান। আমরা তখন তিন ভাইবোন ছিলাম। কিন্তু আমার মেজো ভাইটি একটু বড় হবার পর মেনিনজাইটিস রোগে মারা যায়। থাকলাম এবার মাত্র দু ভাইবোন। কিন্তু কী বলব ম্যাডাম, আমার বড় ভাই আমাকে এত আদর করতেন, এত ভালোবাসতেন সেই ছেলেবেলা থেকে যে, আমি কোনোদিন আমার বাবার অভাব বোধ করিনি। শুধু কি তাই, আমার মাকেও আমার বড়ভাই কোনোদিন কষ্ট দেননি। ছেলেবেলা থেকে তিনি মায়ের পায়ে পায়ে ঘুরতেন। তাঁর লেখাপড়ার জন্যও আমার মাকে কোনোদিন কষ্ট করতে হয়নি, ক্লাসে সর্বদাই ফার্স্ট হতেন। স্কলারশিপ পেতেন। মা তাঁর জন্য টাকা খরচ করবেন কি, উল্টো মায়ের হাতে তিনি টাকা এনে দিতেন। আমার মা এজন্য যে কত সুখী একজন মানুষ, তা আপনি কল্পনাও করতে পারবে না ম্যাডাম। তারপর আমার লেখাপড়ার দিকেও ভাইয়া খেয়াল করতেন। আমি পড়াশোনায় ভাইয়ার মতো ভালো না হলেও কোনোদিন পরীক্ষায় ফেল করিনি। লেখাপড়া শেষ করে আমার ভাইয়া বড় একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়ে গেলেন। ভাইয়া একটি মেয়েকে ভালোবাসতেন। সেই মেয়েটিও লেখাপড়ায় খুব ভালো। ভালো ফ্যামিলি। লেখাপড়া শেষ হবার সাথে সাথে একটা নামকরা ব্যাংকে চাকরি পেয়েছেন।

আমার মা সেকথা জানতে পেরে সেই মেয়েটির সঙ্গে ভাইয়ার বিয়ে দিলেন। বিয়েতে আমাদের যত আত্মীয়-স্বজন ছিলেন সবাই এসেছিলেন। ক’টা দিন যেন আমাদের সংসারে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।

আর কী কপাল আমাদের যে, এই মেয়েটি যিনি ভাবি হয়ে আমাদের সংসারে এসেছেন, তিনিও যে কত ভালো আপনাকে কী আর বলব! আমি ভাইয়ার চেয়ে সাত-আট বছরের ছোট। বিয়ের পর পর ভাইয়া যখন একটা বাড়ি ভাড়া করলেন, তখন আমাকেও তিনি ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। এখানকার ইডেন কলেজে আমি ভর্তি হয়ে গেলাম। ভাবি এজন্য কোনো মন খারাপ তো করলেনই না, বরং আমাকে তাঁর ছোট বোনের মতো দেখাশোনা করতে লাগলেন। ভাবি বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে, খুব আদরে মানুষ, এই ধরনের মানুষেরা শুনেছি রাগী হয়, একগুঁয়ে হয়, জেদি হয়, অথচ আমার এই ভাবির ভেতরে এসব কিছু নেই। এখনো বন্ধের দিন তিনি আমার চুল বেঁধে দেন, মাথায় তেল দিয়ে দেন। ম্যাডাম, আমার ভাবি যেন এ পৃথিবীর মানুষ না, যেন তিনি স্বর্গ থেকে আমাদের গরিব সংসারে নেমে এসেছেন, এমনি মনে হয় আমার। আমার বড় ভাই আমার জীবনে বলতে গেলে সব। তিনি আমার বাবা, আমার ভাই, আমার অভিভাবক, আমার মেন্টর, আমার সবকিছু। আবার ভাবিও এরকম।

তাহলে আমার মতো সুখী মানুষ আর কে হতে পারে, বলেন তো ম্যাডাম?’

এই পর্যন্ত বলার পর মেয়েটি হঠাত্ উঠে দাঁড়াল। মুখে বলল, ‘বমি...’

বলতে বলতে দ্রুতবেগে ঘর ছেড়ে চলে গেল।

রাজিয়া বানু এরকম ক্লায়েন্ট দেখে অভ্যস্ত। সে ঘর ছেড়ে চলে গেলে তিনি তাঁর সহকারীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কজন রোগী অপেক্ষা করছেন?’ সহকারী জানাল, আর কেউ নেই।

কথাটা শুনে নিশ্চিন্ত হলেন রাজিয়া। কারণ তাঁর মনে হলো এই ক্লায়েন্ট আরো কিছুটা সময় নেবে। তবে সমস্যাটা যে কোনদিকে গড়াবে, তিনি ধারণা করতে পারছেন না। এই মেয়েটির জীবনে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সবকিছু ভালো। ভালো, ভালো, ভালো; তাহলে মন্দটা কোথায়? নাকি বয়ফ্রেন্ড নিয়ে সমস্যা? যা বর্তমানে একটা সাধারণ সমস্যা অবিবাহিত মেয়েদের জীবনে।

রাজিয়া অবিবাহিত বলেন মেয়েদের আজকাল, কুমারি আর বলেন না। কারণ কুমারি মেয়ে ক্রমশই অপ্রতুল হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে!

অবশ্য এটি একটি খারাপ চিন্তা। এরকম ভাবা ঠিক না। এই বলে নিজের মনকে শাসালেন রাজিয়া বানু। তিনি জানেন, সাইকোথেরাপিস্টদেরও কাউন্সেলিং প্রয়োজন হয়।

তাঁর এইসব চিন্তাভাবনার ভেতরেই মেয়েটি আবার ঘরে ঢুকল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন চোখমুখ লাল। মনে হয় কিছুক্ষণ কেঁদেও এসেছে। রাজিয়া এ ব্যাপারে একেবারে নিশ্চুপ থাকলেন।

এসব নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করা ঠিক নয়, তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

মেয়েটি এবার ক্লায়েন্টের চেয়ারে এসে বসল। সেটা লক্ষ্য করলেন রাজিয়া বানু। কিন্তু কিছু আর বললেন না। মানুষ যখন নিজের মনের অজান্তে জায়গা পাল্টায়, সেটি তার মনের অজান্তে ঘটলেও তার অবচেতন মনের একটি সায় থাকে। অর্থাত্ এবার মেয়েটি যে সমস্যা জর্জরিত একজন মানুষ, সেটা সে স্বীকার করে নিচ্ছে।

মেয়েটি বলল, ‘আমার ডাকনাম মনি, আপনাকে আগেই বলেছি। এবার যখন আমাদের গরমের বন্ধ পড়ল, তখন আমার আপন মামাতো বোন লাইলি একদিন ময়মনসিংহ থেকে ফোন করে বলল, মনি আপা, আমি তোমাদের ওখানে যেতে চাই। আমাকে কোচিং করতে হবে। ঢাকায় তো তোমরা ছাড়া আর কাউকে আমি চিনি নে।’

আমার একটাই মামাতো বোন। আমার চেয়ে বয়সে দু বছরের ছোট।

আমি তার কথা শুনে বললাম, ‘তাহলে ভাইয়াকে বল।’

আমার কথা শুনে লাইলি বলল, ‘আমার মা গতকাল দীপু ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলেছে, ভাবির সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। মাস তিনেকের মামলা। তাঁরা দুজনই রাজি হয়েছে। ভাবি তো খুব খুশি। ভাবি বলল, ‘তুমি চলে আসো, তাহলে মনি একজন কথা বলার সঙ্গী পাবে।’

লাইলি বলল, ‘আমাদের এই ভাবিটা খুব ভালো হয়েছে রে মনি আপা!’

আমি লাইলির কথা শুনে বললাম, ‘আর আমাদের ভাইয়া? সে কী খারাপ?’

আমার কথা শুনে লাইলি হেসে উঠল। বলল, ‘ভাইয়া ভালো বলেই তো আমাদের ভাবিও ভালো, বুঝলে না?’

এর ক’দিন বাদেই লাইলি চলে এল ঢাকায়। গ্রিন রোডের একটা ভালো কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে গেল। প্রায় সারাদিন সেখানে কটিয়ে যখন সন্ধের আগে আগে বাসায় ফিরে আসত, আমরা দুজনে অনেক গল্প করতাম। বই নিয়ে আলোচনা করতাম। লাইলির ইচ্ছে, সে আর্কিটেকচারে ভর্তি হবে। সে আমার মামার মতো আর্কিটেক্ট হতে চায়। এজন্য সে মন দিয়ে কোচিং করছে। যদি সেখানে ভর্তি হতে না পারে তো অন্য কোথাও ভর্তি হতে চেষ্টা করবে। এইসব নানা আলোচনা। রাতে খাবার খেয়ে আমরা বিল্ডিংয়ের ছাদে চলে যেতাম, সেখানে বসে অনেক গল্প করতাম। আমরা একই বিছানায় ঘুমাতাম। বন্ধের দিন অনেক রাত অব্দি আমরা গল্প করতাম। আবার ভাবি ব্যাংক থেকে ফেরার আগে আগে আমরা রান্নাঘরে গিয়ে সবকিছু গুছিয়ে ফেলতাম। যেন ভাই- ভাবি বাসায় ফিরে এসে সবকিছু গোছানো টিপটপ দেখতে পায়। লাইলির অবার ঘর গোছানোর বাতিক আছে। সে সুযোগ পেলেই ডাইনিং টেবিল থেকে শোবার বিছানা পর্যন্ত গুছিয়ে ফেলতে চায়। বিছানার চাদর একটু এদিক ওদিক হতে পারবে না। সব টান টান হতে হবে। লাইলি মাঝে মাঝে কাজ করতে করতে বলে, ‘দেখিস নে, টিভিতে বিদেশের যে ছবি দেখি, তারা কেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে! এসব দেখে আমার ইচ্ছে হয় এরকম পরিষ্কার হয়ে থাকি।’ লাইলি আসার পর আমাদের বাথরুমগুলোও অনেক ঝকঝকে হয়ে থাকে। কাজের মেয়ে এসে রোজ সবকিছু করে দিয়ে যায়, কিন্তু লাইলির সেটা পছন্দ হয় না।

আমি একদিন বললাম, ‘লাইলি, তুই কি ওসিডিতে ভুগিস?’

লাইলি আমার কথা শুনে অবাক হয়ে বলল, ‘ওসিডি মানে কী আপু?’

আমি বললাম, ‘শুচিবাই।’

লাইলি আমার কথা শুনে হেসে আকুল হলো। বলল, ‘তাহলে বিদেশিরা সকলেই শুচিবাই! জানিস আব্বুর কাছে মাঝে মাঝে বিদেশিরা আসে। তারা আমাদের বাড়ির গেস্টরুমে এসেও মাঝে মাঝে রাত কাটায়। তখন তাদের দেখেছি, তারা খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মাত্র একরাত বা দু রাতের জন্য থাকবে, তবু সবকিছু গুছিয়ে থাকবে। সুটকেস খুলে হ্যাঙ্গারে জামাকাপড় ঝুলিয়ে রাখবে, টেবিলের ওপরে সবকিছু গুছিয়ে রাখবে, জুতা-মোজা সব পরিষ্কার ঝকঝকে করে রাখবে। সেসব তাকিয়ে দেখার মতো। আমারও খুব পরিষ্কার থাকতে ভালো লাগে মনিপু।’

আমাদের ভাবিও লাইলিকে পেয়ে খুব খুশি। মাঝে মাঝে বলত, ‘এত কাজ করার দরকার নেই রে লালি, এতে তোর লেখাপড়ার ক্ষতি হবে।’

তো উত্তরে লাইলি বলত, ‘মোটেও না। আমি কোচিং থেকে বাড়ি ফিরেই আবার সবকিছু ঝালিয়ে নিই, তুমি জানো? বিশ্বাস না হলে শুনে দেখো মনিপুর কাছে।’

তো এই ভাবে মাস দেড়েক চলার পর একদিন আমি বাড়ি ফিরে পোশাক পাল্টাবার জন্য আমাদের ঘরে ঢুকে দেখি বিছানা, মেঝে, আলনা সব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, কিন্তু লাইলির সুটকেসটা নেই, লাইলির বালিশ বিছানা থেকে উধাও, লাইলির কোনো জামাকাপড়ও আলনায় ঝুলছে না!

দেখে তো আমি হতবাক। তখন বাসায় কেউ ছিল না।

কাকে জিজ্ঞেস করব? আজ সকালেও লাইলির সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমি আজ সকাল করেই বাসা ছেড়েছিলাম। লাইলি তখন বাসায় ছিল। ভাবি কাজে চলে গিয়েছিল সবার আগে। তাঁর অফিস সেই পুরনো ঢাকায়। তাঁকে সবার আগে বাসা ছেড়ে বেরোতে হয়। ভাইয়া তখনো বাসায় ছিল, এটুকু মনে আছে।

আমার মন আনচান করে উঠল।

আমি কিছু বুঝতে না পেরে লাইলিকে মোবাইল করলাম। মোবাইল বেজে চলল। সে ধরল না। বারবার মোবাইল করলাম, সে ধরল না। তখন আমি ভাইয়াকে ফোন করার সাহস না পেয়ে ভাবিকে ফোন করলাম। ভাবি ফোন ধরে বলল, ‘কী ব্যাপার, ফোন করেছ কেন?’

আমি ব্যাকুল হয়ে বললাম, ‘ভাবি, লাইলি কোথায়?’

ভাবি নির্বিকার কণ্ঠে বলল, ‘সে তো বাড়ি ফিরে গেছে। এসব মেয়ে কি ঢাকায় এসে ম্যানেজ করতে পারে? তুই এ নিয়ে চিন্তা করিস নে।’

ব্যস, এটুকু বলেই ভাবি ফোন রেখে দিল।

আমি তো ম্যাডাম, ভাবির কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম!

এসব মেয়ে, কথাটার মানে কী? লাইলি কী করেছে? সে তো অতিশয় সরল একজন মানুষ। আমি তাকে ছেলেবেলা থেকে চিনি, জানি। তার মনের স্বপ্নের কথা, বাসনার কথা, উচ্চশিক্ষার জন্য মনের প্রস্তুতি, এসব কথা আমি জানি, তার কোনো বয়ফ্রেন্ড এখন পর্যন্ত হয়নি। আমারও কোনো বয়ফ্রেন্ড এখন পর্যন্ত হয়নি। আমি বা লাইলি এসব দিকে মনোযোগ দিয়েছি কম, তার মানে এই নয় যে, আমরা কাউকে ভালোবাসব না বা বিয়েথাওয়া করব না। সেসব যখন হবে, তখন দেখা যাবে।

কিন্তু ভাবির নির্বিকার কণ্ঠ শুনে আমার মাথার ভেতরে সব যেন কেমন ঘোলাটে হয়ে গেল।

কী করব, কাকে বলব, কিভাবে বলব, কিছু বুঝতে পারলাম না।

সেদিন রাতের বেলা ভাবি বাসায় ফিরে এসে প্রথমে তার ঘরে ঢুকে কীসব করতে লাগল। তারপর বাইরে বেরিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোর মন খারাপ? মন খারাপ করিস নে। এসব মানুষ যত কম আসে আমাদের বাড়িতে, ততই ভালো!’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘লাইলি কী দোষ করেছে ভাবি?’

ভাবি আমার কথার সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলল, ‘আমরা, আমি বা তোর ভাই, তোর ভাইকে তো চিনিস, দেবতার মতো একজন মানুষ, আমাদের কথা না শুনে সে নিজের ইচ্ছেয় এখান থেকে চলে গেছে। যাবার সময় এটুকু ভদ্রতা পর্যন্ত নেই যে আমাদের একবার বলে যাবে!’

তার কথা শুনে আমার এত ভয় হলো মনে যে, আমি সাহস করে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। ভাবির বাসায় ফিরে আসার আরো কিছুক্ষণ বাদে ভাই বাসায় ফিরল। আমাকে ঘরে ঢুকে দেখেও না দেখার ভান করে ভাবির উদ্দেশে বলল, ‘ডেইজি, খেতে দাও। খিদে পেয়েছে।’

ভাইয়ের ভঙ্গি দেখে মনে হলো যেন তিনি সবকিছুই জানেন। ভাবির সঙ্গে তাঁর কথাও হয়েছে বাসায় ফেরার আগে।

সব দেখে শুনে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি রাতে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদলাম। জীবনে বোধকরি এই প্রথম এভাবে কাঁদলাম।

ম্যাডাম, গল্পের বইতে পড়ি, এ মানব জীবন দুঃখের জীবন, হতাশার জীবন, বঞ্চনার জীবন, বিশ্বাসঘাতকতার জীবন, আশাভঙ্গের জীবন, স্বপ্নভঙ্গের জীবন, কিন্তু আমার এই বয়স পর্যন্ত তো আমি সেই জীবনের কিছুই দেখিনি, এখন এই বয়সে আমার ঘাড়ে সব এসে হুড়মুড় করে কেন পড়ল? এখন আমি কী করব?’

রাজিয়া বানু এবার আন্দাজ করতে পেরেছেন সমস্যাটা কোথায়। কিন্তু চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলেন।

চোখ মুছে একবার বমির ভাব হাত দিয়ে চেপে এবার দাঁত চেপে কথা বলতে লাগল মনি। তার গলা দিয়ে বিকৃত একটি স্বর বেরোল তখন। মনি বলল, ‘তার পরদিন গভীর রাতে আমার মোবাইল বেজে উঠল। রাতে শোবার সময় আমি মোবাইলের টোন খুব নিচু করে রাখি। আমার বালিশের পেছনেই মোবাইল থাকে। আমার ঘুম এমনিতে পাতলা। ভেঙে গেল। ধড়ফড় করে মোবাইল তুলে দেখি লাইলি ফোন করেছে।

আমি তার ফোন পেয়ে কেঁদে ফেললাম। চাপা গলায় বললাম, ‘তুই আমাকে না বলে এভাবে চলে গেলি কেন লালি?’

আমার কথা শুনে ওদিকে লাইলিও কেঁদে ফেলল। সে বলল, ‘মনিপু, কেঁদো না, মাথা ঠাণ্ডা রেখে শোন। আবার বলছি, মাথা ঠাণ্ডা রেখে শোন। আমি বাসা ছেড়েছি হঠাত্ করেই। না ছেড়ে উপায় ছিল না। ভাইয়া, তোমরা বাসা থেকে বেরিয়ে গেলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে এককাপ চা করে দাও তো লালি। চা-টা খেয়ে বেরোব।’ তো আমি রান্নাঘরে ঢুকে চা করতে গেলাম। তখন কাজের মেয়ে বাথরুম ধুচ্ছে। আমি রান্নাঘরে ঢুকে কেতলি গ্যাসের চুলোয় বসিয়েছি, চায়ের জোগাড় করছি, এমন সময় ভাইয়া রান্নাঘরে ঢুকে পেছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার বুকের ওপরে দু হাত রেখে ঘাড়ের ওপরে মুখ চেপে ধরে চাপা স্বরে বলে উঠল, ‘এ দুটো দেখতে খুব সুন্দর হয়েছে। আমাকে একদিন আদর করতে দেবে?’

লাইলি কথা শেষ করতে পারল না। আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। বললাম, ‘এ তুই কী বলছিস লালি? এ সত্যি নয়। হতে পারে না। এ অসম্ভব!’

লালি কেঁদে ফেলে বলল, ‘সব সত্যি, আপুমনি। আমরা আমাদের বাড়ির মানুষের কাছেই নিরাপদ নই। আমরা আমাদের রক্তের সম্পর্কের কাছেও নিরাপদ নই। আমরা এ পৃথিবীর কোথাও নিরাপদ নই! আমরা কোথাও নিরাপদ নই, মনিপু!’’

কথা শেষ করে মনি এবার বিরাট একটা ঢেঁকুর তুলল।

রাজিয়া বানু জানেন এবার শুরু হবে আসল ড্রামা। তিনিও মনে মনে প্রস্তুত। তবে তাঁর প্রশিক্ষণ তাকে এই শিক্ষা দিয়েছে যে, কখনো কোনো অবস্থাতেও ক্লায়েন্টের দুঃখের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের অনুভবকে না জড়াতে, তাহলে দু পক্ষেরই ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

তিনি মনে মনে প্রস্তুত হলেন। মনি এবার চিত্কার করে উঠল, ‘তারপর থেকে আমি সেই লোকটির মুখের দিকে আর তাকাতে পারছি নে। আমি তাকে আর ভাই বলে স্বীকার করতেও চাইনে। তার সঙ্গে আমি এক বাসায় থাকতে চাইনে। খাওয়ার সময় আমি তার মুখের দিকে তাকাতে পারি নে, তাকাইও না। ভাবিকে সে মিথ্যা বলে বুঝিয়েছে। ভাবি মনে করছে যে লালি খারাপ। আসলে লালি খারাপ নয়, আমার ভাই, যাকে আমি বাবার চেয়েও উপরে স্থান দিতাম, আল্লাহর পরে যাকে আমি বিশ্বাস করতাম, আমার সেই দেবতা ভাই-ই আসলে স্বভাব নষ্ট এক রাক্ষস! সে একজন যৌনকাতর পুরুষ। সে আমার মামাতো বোনের লেখাপড়ার ক্ষতি করেছে, তার মনের ভেতরে মানুষের প্রতি অবিশ্বাস ঢুকিয়েছে, তাকে কষ্ট দিয়েছে, তার পবিত্র দেহকে নোংরা হাত দিয়ে ছুঁয়ে তাকে অপবিত্র করেছে। এইসব মানুষেরা বেশ্যাবাড়িতে যায় না, কারণ এরা বাড়ির ভেতরেই বেশ্যাখানা বসিয়ে রাখতে চায়!

আমি সরি ম্যাডাম। আমি সরি। আমি এবার বমি করব। আমি আপনার কাছে এই পরামর্শ নিতে এসেছি যে, আজ রাতের বেলা, সে আর ভাবি যখন খেতে বসবে আমি সরাসরি লালির কথা তাদের সামনে বলে দেব। তারপর আমিও ওই বাসা ত্যাগ করব। আমিও আমার মায়ের কাছে ফিরে যাব। বা হোস্টেলে উঠে যাব। আমি ওই বাসায় আর থাকব না! না, থাকব না। আপনি বলুন, আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেই সিদ্ধান্ত আমার ঠিক আছে কী না। বলুন, আমার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে কী না, যদি আপনি না বলেন, তাহলে আমি আত্মহত্যা করব, আমি আত্মহননের পথ বেছে নেব। এই বিশ্বাসঘাতক পৃথিবীতে আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না!’

রাজিয়া খাতুন এরকম বিপাকে আগে পড়েছেন কীনা বুঝতে পারলেন না। তার তখন গা ঘামতে শুরু করেছে। ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত বোধ করছেন, কিন্তু মুখের চেহারা রেখেছেন শসার মতো।

তিনি বেল বাজিয়ে তার সহকারীকে ডেকে খুব মধুর স্বরে বললেন, ‘কুদ্দুস মিয়া, আমাদের দুজনের জন্য দু কাপ চা এনে দাও। আমরা একটু রিলাক্স হতে চাই!’

সহকারী বাইরে বেরিয়ে গেলে, তিনি হাসিমুখে ক্লায়েন্টের দিকে ফিরে বললেন, ‘এ পৃথিবীতে সুস্থ মনে বেঁচে থাকা কি চাট্টিখানি কথা?’

এই কথা যখন রাজিয়া ক্লায়েন্টের সামনে বলছেন, তখন তাঁর মনের ভেতরে বিবেকের চিত্কার শুরু হয়েছে। সেই বিবেক রাজিয়াকে বলছে, রাজু, মেয়েটিকে না বলো। বলো না, না, না না! সব সত্য কথা পৃথিবীতে বলতে হয় না রাজু। সব সত্য সুন্দর হয় না। সব সত্য বললে এ পৃথিবী অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে!

রাজিয়া সেই কথাটা বলার মোক্ষম সময় খুঁজতে লাগলেন। এর জন্য যদি বাড়ি ফিরে যেতে দেরি হয় তো হোক! v