ভ্রমণ

সূর্যোদয়ের দেশে

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ২০:০৪

জ্ঞানবুদ্ধির ধোঁয়াশাচ্ছন্ন সুদূর শৈশবে আকাশে উড়ে যেতে দেখতাম পাখির ঝাঁকের মতো উড়োজাহাজের ঝাঁক। সবাই বলত জাপানি প্লেন যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। তখন ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল। একদিন দেখা গেল একটা জাহাজ একদম নিচ দিয়ে, ঘরের ওপর দিয়ে, গাছপালার মাথা ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে। সবাই বলল, প্লেনের কল খারাপ হয়েছে; পড়ে যাচ্ছে। লোকজন প্লেনের পিছনে পিছনে দৌড়ানো শুরু করল। সত্যিই প্লেন মাইল তিনেক দূরে মাটিতে আছড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হলো। প্লেনের যাত্রী ক’জন মারা পড়ল। আমিও বড় ভাইয়ের কাঁধে চড়ে দেখতে গিয়েছিলাম। লোকজন বলাবলি করল, মৃত ব্যক্তিরা জাপানি, বিমান বাহিনীর সৈনিক। ভিড়ের মধ্যে বিধ্বস্ত বিমানের তেমন কিছু ভালোভাবে দেখতে পেলাম না বা বুঝতে পারলাম না। বাড়ি ফেরার পর মা জিজ্ঞাসা করলেন, উড়োজাহাজ দেখতে কেমন! আমি দু হাত চক্রাকার করে দেখিয়ে বললাম, সাদা রঙের এই রকম একটা জিনিস। বিবরণটা অন্ধের হাতি দেখার সমতুল্য। মাসখানেকের ব্যবধানে সাত-আট মাইল দূরে আবার চারখানা প্লেন মাটিতে পড়ে বিধ্বস্ত হলো। দুজন আরোহী গাছের ডালে আটকে বেঁচে যায়। নিচে নেমে তারা স্থানীয়দের কাছে আভাসে ইঙ্গিতে খাবার চায়। শুনতে পেলাম তারাও ছিল জাপানি। জাপান নামটা তত্কালেই মনে গেঁথে যায়। শিশুমনে তখনই প্রশ্ন জাগত, আচ্ছা জাপান এখান থেকে কতদূরে! সেখানে কি যাওয়া যায়!

জাপানের জাইকার (JICA) আমন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে যোগদানের জন্য আপনি আমন্ত্রিত হয়েছেন। চিঠিটা এখান থেকেই নিয়ে যান, অফিসিয়ালি পৌঁছাতে দেরি হবে। হাতে সময় কম; আপনাকে অনেক কাজ করতে হবে। বিদেশ যাওয়ার প্রসেসিং-এ অনেক সময় লাগবে। শুরু হলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দৌড়াদৌড়ি। রোজার মাস হওয়ায় কষ্টটা বেশিই হলো। দশ দিনের মাথায় চূড়ান্ত আদেশ হাতে এল। এবার পাসপোর্ট। তত্কালে বেইলি রোডে অল্প পরিসরে একটা অফিস ছিল। অফিসারের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতে আমার সময়ের স্বল্পতা এবং জরুরিত্ব বোঝাতে সক্ষম হলাম এবং একদিনেই পাসপোর্ট পেয়ে গেলাম। পরদিনই যাত্রা। জাইকার সঙ্গে যোগাযোগ করায় ওরা জানাল, তুমি বিমানযাত্রার জন্য একদম প্রস্তুত হয়ে আমাদের অফিসে উপস্থিত হলে আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে ভিসার (Visa) ব্যবস্থা করে দেবো।

দুপুরের কিছু পরেই বিমানযাত্রা। দশটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম জাইকা অফিসে। টিকেট আগেই প্রস্তুত ছিল। প্রত্যাশিত সময়ের আগেই ভিসা হয়ে গেল। দীর্ঘকাল পর বিমানারোহন; তাও আবার সম্পূর্ণ অপরিচিত দেশে যাত্রা। আনন্দঘন উত্তেজনার মাত্রা একটু বেশিই। আড়াই-তিন ঘণ্টায় ব্যাংকক পৌঁছে লম্বা সময় যাত্রাবিরতি। থাইল্যান্ডের ভিসা না থাকায় বিমানবন্দরের বাইরে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। কাচের জানালার ভেতর দিয়ে কাছে দূরে দৃষ্টির সীমানায় নিদর্শনসমূহ দর্শনে থাইল্যান্ড-ব্যাংকক দেখার আকাঙ্ক্ষা মেটাতে হলো।

জাপান এয়ারলাইন্সের বিমানে নৈশভ্রমণ আধাঘুমে আধা জাগরণে পার হয়ে গেল। সূর্যোদয়ের পূর্বাহ্নে টোকিও বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলাম। আমার নামের প্ল্যাকার্ডধারী ভদ্রলোক আশাতিরিক্ত ভদ্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। বাইরে জাইকার গাড়ি প্রস্তুতই ছিল। গাড়িতে চেপে টোকিও শহর দেখতে দেখতে আমরা ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে পৌঁছালাম। রুমে পৌঁছে দিয়ে আনুষঙ্গিক নানা তথ্য জানিয়ে ভদ্রলোক বিদায় নিলেন।

প্রাতঃরাশ সেরে অবসাদ ক্লান্তি দূর করতে দ্রুত শয্যাগ্রহণ করলাম। দুপুরের খাবারের জন্য খাবার ঘরে গিয়ে ধাঁধায় পড়ে গেলাম। কী খাওয়া যায়। লম্বা চালের ঝরঝরে ভাত, মাছ, মুরগি সবই আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম ভাতের সঙ্গে মাছ নেওয়ার। ভাত সুস্বাদু, কিন্তু মসলা ছাড়া অর্ধসিদ্ধ মাছ খাওয়ার সময় কাচা মাছের স্বাদ অনুভূত হলো। ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য বাধ্য হয়ে গলধঃকরণ করতে হবে। পরিবেশনে কিছু চাটনির সরবরাহ ছিল, তাই রক্ষে।

আমাদের কনফারেন্স কিয়োটা শহরে। এখান থেকে বিভিন্ন রুটে দূরত্ব ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার। পরশু যেতে হবে দ্রুতগামী বুলেট ট্রেনে। টোকিওতে অবস্থান দু দিনের। এই সময়ের মধ্যে আশপাশের যতটুকু দেখে নেওয়া যায়।

সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে বিবর্ণ বিকেলে যখন একাকীত্বের বিষণ্নতায় পেয়ে বসার উপক্রম তখন আকস্মিকভাবে কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এঁরা এসেছেন জাপানের দূরদূরান্তের বিভিন্ন শহরে স্বল্পকালীন ট্রেনিং, কনফারেন্স ইত্যাদিতে যোগদানের জন্য। অধ্যাপক খালেক এসেছেন শালনার পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব অ্যাগ্রিকালচার থেকে। ময়মনসিংহ যাতায়াতের পথে শালনার জঙ্গলে কিছু বিল্ডিং চোখে পড়ত। কৌতূহল হতো, এই বিরান মুল্লুকে অট্টালিকাগুলোয় কারা থাকে, কী কাজে লিপ্ত তারা! তাঁর কাছ থেকে জানলাম ওখানে অনেক গবেষণা হয়, পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেওয়া হয়, এমনকি পিএইচডি ডিগ্রিও। চর্ম বিশেষজ্ঞ আগা মাসুদ চৌধুরী ফিরে এসেছেন ‘হাটাকেয়া’ শহরে স্বল্পকালীন ট্রেনিং নিয়ে। অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির মানুষ। তাঁর কাছ থেকে জাপান সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করলাম। দু-একটি জাপানি শব্দও শেখা হলো, যেমন—‘আরিকাতা’ অর্থ ধন্যবাদ। তিনি কিয়োটেতে বসবারত জনাব মাহতাবউদ্দীনের বাসার ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর দিলেন, যা পরে অনেক কাজে লেগেছিল। আরো জানলাম, কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদে কর্মরত আছেন ডা. মহিউদ্দিন।

ইতিমধ্যে সম্মেলনে আসা কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হলো। সন্ধ্যার পর গাইড এসে আমাদের সঙ্গে পরিচিত হলেন। বললেন, আমার নাম অনেক লম্বা, তবে তোমরা আমার ডাকনাম ‘আইমি’ বলে ডাকলেই চলবে। সকালে তোমাদের ভাতার (Allowance) চেকগুলো দিয়ে দেবো এবং মেশিনে চেক ভাঙানোর পদ্ধতি দেখানোর জন্য হোটেল থেকে কিছু দূরে নিয়ে যাব।

পরদিন সকালে বিভিন্ন দেশের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা হোটেলের লবিতে একত্রিত হলাম। আইমি আমাদের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ করা হয়েছে। মঙ্গলিয়া থেকে এসেছেন অধ্যাপক চাঙ্ঘতাই স্কাটের মতো দেখতে এক বিচিত্র পোশাক (জাতীয় পোশাক) পরে। এসেছেন নেপাল থেকে মেডিসিনের অধ্যাপক আচারিয়া, পাকিস্তানের মুলতান থেকে নূর মোহাম্মদ নূর শেরওয়ানি পাজামা পরে, পাঞ্জাব থেকে আব্দুল মালেক, ভারত থকে চন্দ্রগোপাল, শ্রীলংকার রামচন্দ্রন এবং মালয়েশিয়ার দাতুক মিশেল। আরো এসেছেন—ইন্দেনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনের অধ্যাপকেরা।

পরদিন বুলেট ট্রেনে যাত্রা। দ্রুতগতির এই ট্রেনের নাম শুনেছি। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম। সুসজ্জিত আধুনিক ট্রেন, আরামদায়ক সিট। ট্রেন চলতে শুরু করল। গাছপালা, বাড়িঘর, নদীপর্বত বিদ্যুতগতিতে পেছনে চলে যাচ্ছে। আমরা গতির আনন্দে আত্মহারা। প্লেন চলে আকাশে, ভূপৃষ্ঠের কিছু দেখা যায় না। বুলেট ট্রেন চলে মাটিতে, চারপাশের সবকিছু দৃষ্টিসীমানায় চলে আসে। ট্রেনেই দুপুরের খাবার সরবরাহ করা হলো। দু ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম কিয়োটো শহরে। স্টেশন থেকে গাড়িতে রিজার্ভকৃত হোটেলে আসা হলো। বলা হলো, তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী একক রুম অথবা দুজনে শেয়ার করা ডবল রুম বেছে নিতে পার। ডবলরুমে থাকলে ভাড়ায় কিছু সাশ্রয় হবে। শ্রীলংকার রামচন্দ্রনের সঙ্গে ডবল রুমে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বিবেচনায় একক রুমই গ্রহণ করলাম। তুলনামূলক খরচ তেমন বেশি নয়। প্রাতঃরাশের ব্যবস্থা হোটেলে। বাকি খাবারের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। কিন্তু সেটার বেশি প্রয়োজন পড়েনি। প্রতিদিন নানা প্রোগ্রাম থাকায় উদ্যোক্তোরাই সে আয়োজন করেছে। মাঝেমধ্যে নৈশভোজের প্রয়োজন পড়লে নিকটস্থ ফাস্টফুডের দোকান থেকে এগ স্যান্ডুইস বা চিজ স্যান্ডুইস নিয়ে আসতাম। ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ করে আমাদের পরবর্তী দিনগুলোর প্রোগ্রাম জানিয়ে বিদায়ের আগে আইমি কিয়োটো সম্পর্কে কিছু পূর্বধারণা দিলেন। হানশু দ্বীপের কিয়োটো অনেক প্রাচীন শহর, হাজার বছরের বেশি সময় (৭৯৪-১৮৬৯) ধরে জাপানের রাজধানীরূপে সমগ্র কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল। অসংখ্য জাদুঘর, বৌদ্ধমন্দির, শিন্তো উপাসনালয়, মনোরম উদ্যান, প্রাচীন রাজপ্রাসাদ, ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ি, মুখরোচক খাদ্যের রেস্তেরাঁ এবং গেইশাদের জন্য বিখ্যাত। এখানে আজো ১৬০০ বুদ্ধমন্দির এবং ৪০০ শিন্তো উপাসনালয় বিদ্যমান। বিখ্যাত ‘কিমোনো’ পরিচ্ছদ বয়নের একটি প্রধান কেন্দ্র কিয়োটো। কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় জাপানে দ্বিতীয় এবং বিশ্বমানে ২৫তম।

প্রথম দিনে কিছু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয় দেখতে গেলাম। প্রথমে শিন্তো মন্দির দৃষ্টিনন্দন ‘কিনকাকুজি’ দেখে মুগ্ধ হলাম। চারতলা বিশিষ্ট মন্দিরটি শিল্পসৌকর্যে মাধুর্যমণ্ডিত। ছাদগুলো জাপানি ‘ল্যাকার’ বৃক্ষের কাঠে তৈরি, যার উপরিতল সোনার পাতে মোড়া। সামনে অনেক ক্ষুদ্রাকৃতির কৃত্রিম দ্বীপসহ বিশাল পুকুরঘাটে মন্দিরের ছবি প্রতিবিম্বিত হয়ে মন্দিরের মনোহারিত্ব আরো বাড়িয়েছে। মন্দিরের তিনদিকে বিশেষ পরিকল্পনায় তৈরি উদ্যান শৈল্পিক ব্যঞ্জনার প্রকাশ।

পরে দেখা হলো ‘সানজুসানজেনডো’ বৌদ্ধমন্দির, ৩১০ ফুট দৈর্ঘ্যে এবং ৫৪ ফুট প্রস্থে। অনেক স্তরের কাঠের ফালি দ্বারা তৈরি করা হয়েছে স্থাপনার চাল বা ছাদ। কাঠ দীর্ঘস্থায়ী করার কৌশল ও প্রযুক্তি সুপ্রাচীন কাল থেকে জাপানিদের আয়ত্তে। এসব কাঠে ঘুণ ধরে না, কালের প্রবাহে বা আবহাওয়ার প্রভাবে সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। মন্দিরের অভ্যন্তরের কেন্দ্রে ১১ ফুট উচ্চতার ১১ মুখ এবং হাজার হাত বিশিষ্ট বৃহদাকার বুদ্ধমূর্তি (১টা বড় মুখ ২টি বড় হাত) অন্য মুখ ও হাতগুলো ক্ষুদ্রাকৃতির। দু পাশে সারিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত আরো এক হাজার ছোট ছোট এবং পিছনে ১১টি মাঝারি আকারের বুদ্ধমূর্তি। সীমাহীন পার্থিব-অপার্থিব ক্ষমতার প্রতীকস্বরূপ এই  সৃষ্টি।

কিয়োটোর মন্দির এবং এর পারিপার্শ্বিকতায় এক নান্দনিক সৌন্দর্যের সমাবেশ। অতীতে ধর্মগুরুরা প্রকৃতির সঙ্গে মানবজীবনের  যোগসূত্র ঘটার কথা বলেছেন। মানবজীবনের ভালোমন্দ, পাপপুণ্য, নীতি-দুর্নীতি নিজেদেরই উপলব্ধি করতে হবে।

পরে দেখা হলো প্রাচীন রাজপ্রাসাদ, ক্ষুয়িষ্ণু প্রাসাদ—পরিচর্যায় দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীর জন্য প্রদর্শনযোগ্য করে রাখা। দেখা হলো রাজসিংহাসন (তাকামিতুরা), রাজার পরিচ্ছদ (গছোকুটাই) ইত্যাদি। রাজপ্রাসাদের দেয়াল ছাদ সবই কাঠের তৈরি। ছাদ তৈরি হয়েছে অনেক স্তরের গাছের বাকল দিয়ে। সূক্ষ্ম বাঁশের পেরেক দিয়ে আটকানো।

কিয়োটোয় বসবাসকারী মাহতাবউদ্দিনের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় আমন্ত্রণ। সময়মতোই পৌঁছে গেলাম। অমায়িক ভদ্রলোক এবং তাঁর স্ত্রী আমাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন। অল্পসময়ের মধ্যে তাঁদের ৫ বছরের কন্যার সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে উঠল। পদে ও প্রাচুর্য্যে নৈশভোজের আয়োজন ব্যাপক। বেশ ক’দিন পর তৃপ্তিদায়ক বাংলাদেশি খাদ্য আস্বাদন করা গেল। গল্পে গল্পে অনেক রাত হলো। হোটেলে ফিরতে হবে। তবে এখানে নিরাপত্তার একদম কোনো সমস্যা নেই।

আরো একদিন মাহতাব সাহেবকে নিয়ে শপিং সেন্টার গেলাম। ‘ক্যানন’ ক্যামেরা কিনলাম এবং তাঁর পরামর্শে স্ত্রী-কন্যাদের জন্য জাপানের বিখ্যাত ‘মিকিমটো’ পার্ল নেওয়া হলো। পরবর্তী সময়ে আমরা ‘কোবে’ যাচ্ছি জেনে উনি ‘কোবে শাড়ি’র কথা বলে দিলেন এবং কোন রাস্তা থেকে কীভাবে কিনতে হবে তা-ও জানালেন। 

পরদিন দুপুরে জাপানি প্রথায় ও পরিবেশে জাপানি খাদ্য গ্রহণের ব্যবস্থা। পায়াছাড়া চেয়ার, চেয়ারের আসন ভূমিতলে। আসন গেড়ে বা পা ছড়িয়ে বসতে হবে। হেলান দেওয়ার ব্যবস্থা সাধারণ চেয়ারের মতো। খাদ্যের মধ্যে একটা ছিল গ্লাসে পানির মধ্যে ছোট ছোট জীবন্ত মাছ (কিছুটা বাংলাদেশের মলা মাছের মতো), পাত্রের মধ্যে ডুবসাঁতারে রত, স্পর্শে পলায়নপর। আমি জীবিত কাঁচা মাছ খাওয়ার সাহস করলাম না। পাশে বসা রামচন্দ্রন বললেন, আমি পাত্রের পানি ফেলে দেবো। মাছ মরে গেলে খেয়ে ফেলব। অন্যান্য খাদ্য সস চাটনিসহ গ্রহণ করা গেল। তবে তৃপ্তি সহকারে খেলাম—বলা যাবে না।

বিকেলে আমরা জাপানের বিশিষ্ট চা-চক্র বা চা অনুষ্ঠানে যোগদান করলাম। জাপানের এই আনুষ্ঠানিক চা পরিবেশন বিশেষভাবে উপভোগ্য। অনুষ্ঠানের নাম ‘চানোইড’। পরিবেশন করা হবে সবুজ চা (Green Tea)। উল্লেখ্য, পৃথিবীর সেরা সবুজ চা উত্পাদন করেন কিয়োটোর নিকটবর্তী ‘উজি’ এলাকার চাষিরা। পরিবেশনের রীতি বিশদভাবে পালন করা হয়। ঘরের ফ্লোর ‘টাটানি’ (একপ্রকার তৃণনির্মিত টেকসই ম্যাট) আচ্ছাদিত। বসার ব্যবস্থাতেও বৈচিত্র্য। চায়ের সরঞ্জাম—সবুজ চা পাতা রাখার বড় পাত্র (Jar), ছোট পাত্র, সরঞ্জাম পরিষ্কারের কাপড় (চাকিন), চায়ের পাতা উত্তোলনের জন্য বাঁশ, কাঠ বা হাতির দাঁতের তৈরি চামচ। চায়ের গুঁড়া মেশানোর ঘুঁটনি ইত্যাদি। পানি গরম করা হয় কয়লার আগুনে। চায়ের ঘরে প্রবেশ করতে হয় একে একে। হাতমুখ ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে বসতে হয়। সবশেষে পরিবেশনে উজ্জ্বল বর্ণিল পরিচ্ছদে ধীরপদে প্রবেশ করেন হূদকাঁপানো লাবণ্যেভরা সুন্দরী ‘গেইশা’ কন্যা। তারপর রীতিমাফিক চায়ের পাতা উত্তোলন। গরম পানিতে মিশ্রণ। ঘুঁটনি দ্বারা ঘোঁটানো এবং সবশেষে পরিবেশন। সবকিছু চলে অত্যন্ত শৈল্পিক পদ্ধতিতে। ব্যাপক চা অনুষ্ঠান উদ্যাপনের আরো অনেক রীতি আছে। অতিথিরা প্রথম ধাপে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য গ্রহণ করে ঘরের বাইরে চলে যান। দ্বিতীবার প্রবেশ করে মিষ্ঠান্নসহ চা পান করেন।

পরের দিন বৈজ্ঞানিক সম্মেলন। সারাদিনের প্রোগ্রাম। আগেই আমাদের সবার কাছ থেকে Presentation Paper নিয়ে নিয়েছে। জাপানি ভাষায় অনুবাদের জন্য। সব লেখাই ইংরেজিতে। উপস্থাপনার বিষয়বস্তু প্রধানত গবেষণা। বিভিন্ন দেশে গবেষণার বিষয়, পরিবেশ পরিস্থিতি, লজিস্টিক সাপোর্ট, অর্থজোগান এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এবং সমস্যা উত্তরণের উপায়। যেহেতু জাইকা এই সম্মেলনের উদ্যোক্তা, তারা কোন পর্যায়ে কীভাবে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারে তারও সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব ও অনুরোধ অবশ্যম্ভাবীভাবে স্থান পেয়েছে। হলভর্তি শ্রোতা। সবাই জাপানি। আমরা একে একে মঞ্চে গিয়ে মাইকে পেপার উপস্থাপন করছি। জাপানি অনুবাদ ওরা শুনছে হেডফোনে। মাঝে মধ্যে এবং সর্বশেষে একবার তুমুল করতালি পড়ছে। এতে মনে হলো ওরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে এবং বুঝতে পারছে।

পরের দিন সবাই মিলে গাড়িতে করে কোবে শহরে পৌঁছালাম দুপুরের কিছু আগে। কোবে হানসুদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত জাপানের ষষ্ঠ শহর, জাপানের আগ্নেয়গিরিময় অঞ্চলে অবস্থানের জন্য মাঝে মধ্যে ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পের কবলে পড়তে হয়। বড় ভূমিকম্প এবং সুনামিতে কোবে শহর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। ১৯৯৫ সালের হ্যানশিন ভূমিকম্পে (Great Han Shin Earthquake) এবং ২০১১ সালের সুনামি (Psunami) তে ব্যাপক প্রাণহানি এবং সম্পাদনাশের ঘটনা ঘটে কোবে শহরে। আমাদের গন্তব্য কোবে সমুদ্রতীরে অবস্থিত রোক্কো দ্বীপ। ওসাকা উপসাগরে সম্পূর্ণ মুনষ্যনির্মিত ৩.৪২ কিলোমিটার আয়তনের রোক্কো দ্বীপ। পাহাড় কেটে সমুদ্রে ফেলে দ্বীপটি তৈরি করতে সময় লাগে ২০ বছর। এখানে আছে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং স্কুল, খেলার মাঠ এবং দ্বীপের চতুর্দিক দিয়ে গাছপালা পরিবেষ্টিত মনোরম হাঁটার পথ। আরো আছে একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল। হাসপাতালের কাজকর্ম অধিকাংশই কম্পিউটারাইজড। ওয়ার্ডের রোগীর জন্য ওষুধ প্রয়োজন। প্রেসক্রিপশন লিখে কনভেয়রের সকেটে ফেলে দাও। কিছুক্ষণের মধ্যেই  ফার্মেসি থেকে ওয়ার্ডে এসে হাজির হবে লাইনের মাধ্যমে কোনোপ্রকার মনুষ্যশ্রম ছাড়াই। খাবার সরবরাহ, রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্যাম্পল রিপোর্ট আদানপ্রদান এভাবেই চলছে। এখানে অধীত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা এবং ব্যক্তিবিবেচনার বিশেষ প্রয়োজন। মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন কোবের মূল ভূখণ্ডে। পরিবেশনে ছিল কোবের বিশ্বখ্যাত কোবে স্টেক (Kobe Steaks)। যেসব গরু থেকে এই স্টেকের মাংস সংগ্রহ করা হয় সেই গরুকে দীর্ঘকাল ধরে বিশেষ পদ্ধতিতে পরিচর্যা এবং আহার করানো হয়। ফেরার পথে কোবে শাাড়ি’র দোকান। আইমিকে আগেই বলা ছিল। বন্ধুদের অনুরোধ করে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে শাড়ি সংগ্রহ করলাম। এবং গাড়িতে দ্রুতই ফিরে এলাম।

পরদিন প্রথমে শহর ভ্রমণ। আবাসিক এলাকায় বহুতল বিশিষ্ট আকাশচুম্বী অট্টালিকাপুঞ্জের সমাহার নেই, নিরিবিলি পরিবেশে একতলা দোতলা বাড়ি, শৈল্পিক স্থাপত্যে তৈরি। প্রতিটি বাড়ির দু-তিন পাশে ফলদ বৃক্ষ, সাজানো ফুলের বাগান। সর্বত্র জাপানিদের সৌন্দর্যবুদ্ধির পরাকাষ্ঠা বিরাজমান। জাপানিরা কাজপাগল জাতি। অহেতুক গল্প করে, আড্ডা দিয়ে সময়ের অপচয় এদের অভিধানে নেই। ছুটির দিনে স্বীয় সামর্থ্যে ঘরের কাজে, গাছের যত্নে এবং বাগান পরিচর্যায় সময় অতিবাহিত করে। বাইরের পেশাজীবী এনে কাজ করানোয় তাদের আগ্রহ ও আস্থা একদম নেই।

দুপুরে চাইনিজ খাবার। অনেক পদের সমাহার; তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—কচ্ছপের স্যুপ এবং কাঁকড়া ভাজি। টেবিলের বিপরীত দিকে বসে পাকিস্তানের নূর মোহাম্মদ নূর এবং আব্দুল মালেক অতি তৃপ্তি সহকারে কচ্ছপের স্যুপ এবং কাঁকড়া ভাজি খেলেন।

বিকেলে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে ফুটন্ত চেরী ফুলের বর্ণিল সমারোহ (Cherry Blossom) দেখতে গেলাম। মনোমুগ্ধকর শুভ্র-লোহিত বর্ণশোভিত চেরী ফুলের সমারোহকে বলা হয় ‘সাকুরা’ (Sakura)। জীবনের অর্থপূর্ণতা চেরী প্রস্ফুটনের সমধর্মী মনে করে জাপানিরা। বছরের এই চেরী প্রস্ফুটন সময়টাকে তাই জাপানিরা অনেক আনন্দউল্লাসে উদ্যাপন করে। পথের ধারে, বাগানে, পার্কে চেরী গাছ ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। সাদার সঙ্গে গোলাপি রঙের মিথস্ত্রিয়ায় অনন্য সুষমার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের বিনোদনের জন্য রাতে চেরী গেইশা নৃত্য (Cherry Blossom Geisha Dance)। গেইশা শব্দের সঠিক আভিধানিক পরিভাষা পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় নেই। জাপানি ভাষায় যা বলা হয় তা মোটামুটি ‘শিল্পী’ বা সুকুমার বৃত্তির সমার্থক। ভিনদেশিদের ধারণা গেইশারা যৌনকর্মী যা সম্পূর্ণ ভুল। বহুদিনের প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে একজন গেইশা সৃষ্টি হয়। ‘ওকিয়া’ নামক গেইশা-গৃহে বিভিন্ন পর্যায়ের নিপুণ প্রশিক্ষণ চলে কয়েক বছর ধরে। অল্প বয়সের কিশোরী ও তরুণীরা শিক্ষা গ্রহণ করতে আসে। প্রথম ‘পর্যবেক্ষণ’ পর্যায়ে তারা প্রতিষ্ঠিত গেইশাদের কার্যকলাপ দেখে এবং তাদের ফাইফরমাস পালন করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে নৃত্যশিল্প। পরে একে একে শৈল্পিকভাবে চলাফেরা, কথোপকথন, ঐতিহ্যবাহী সংগীত এবং যন্ত্রসংগীত বাজানো প্রভৃতি ললিতকলা চারুকলার প্রশিক্ষণ দান করা হয়। কবিতা ও সাহিত্যে তাদের কিছু দখল থাকতে হয়। গেইশাদের পরিচ্ছদ বৈচিত্র্যপূর্ণ থাকতে হয়। গেইশাদের পরিচ্ছদ বৈচিত্র্যপূর্ণ বর্ণিল কিমোনো—যার কলার হবে টকটকে লাল রঙের। পাঁচ প্রকার কেশবিন্যাস সৌকুমার্যে ভরপুর। হেয়ার ড্রেসারের কাছ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কেশবিন্যাস করানো হয়। একবার হয়ে গেলে অনেক সময় ধরে বা কয়েকদিন ও একই অবস্থায় রাখা হয়। তখন শোবার সময় গহ্বর যুক্ত বালিশ ব্যবহার করতে হয়।

অনেক সময় যৌনকর্মীরা মর্যাদাশালী হওয়ার জন্য নিজেদের গেইশাকন্যা বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু তাদের পোশাক এবং আচার-আচরণে তফাত্টা ঠিকই ধরা পড়ে অভিজ্ঞ চোখে।

বিরাট হলঘরে বিস্তীর্ণ স্টেজে নৃত্যের আয়োজন। নানা রঙের আলো-আঁধারিতে শুরু হলো সংগীতের মূর্চ্ছনায় গেইশাদের নৃত্য। এককভাবে, যুগলে এবং দলবেঁধে অনেক নৃত্য পরিবেশিত হলো। নৃত্যের তাল লয় আমার জ্ঞানের বাইরে। ছন্দের তালে তালে অপ্সরাকন্যাদের পদবিন্যাস, হস্তসঞ্চালন, দেহ ভঙ্গিমায় এবং মুখের অভিব্যক্তি উপভোগে তাতে কোনো বাধার সৃষ্টি হলো না। আলো-আঁধারিতে চলমান ফ্লাশ লাইটের মধ্যে ফটো তোলা বিশেষ কলাকৌশল জানা না থাকায় নৃত্যরতাদের ক্যামেরাবন্দি করা ব্যর্থ হয়েছে; জানা গেল ছবি প্রিন্টের পর।

শেষের দিন সকালে দেখতে গেলাম জাপানে তৈরি সর্বাধুনিক মেডিকেল ইনস্ট্রুমেন্ট। ডিজিটাল এক্সরে, সিটিস্ক্যান, সিটি এঞ্জিওগ্রাম, এম আর আই-সহ আরো অনেককিছু। এর মধ্যে শকওয়েভ লিথোট্রিপসি (Shockwave Lithotripsy) মেশিনই আমাদের কাছে (১৯৯১ সাল) সম্পূর্ণ নতুন। অপারেশন ছাড়াই কিডনির পাথর শকওয়েভ দিয়ে ভেঙে গুঁড়া করে মূত্রের মাধ্যমে বের করার পদ্ধতি। জিজ্ঞাসা করলাম, মেশিনের দাম। যা বলল, তা বাংলাদেশি টাকায় চার কোটি। তবে বলল, ট্যাক্সের হেরফেরে তোমাদের দেশে কিছু কমও হতে পারে।

রাতে জাইকার প্রতিনিধি  এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আমাদের সর্বশেষ সাক্ষাত্ এবং সে উপলক্ষে ভোজনের Banquet আয়োজন। খাদ্যের সমাহার প্রাচুর্যে, বৈচিত্র্যে এবং সংখ্যায় চোখ ধাঁধানো। উপস্থিত আছেন জাইকার কিছু কর্মকর্তা, নাগাসাকি ও কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিয়োটো মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের অধ্যাপকসহ আরো অনেকে। আহারপর্ব শেষে তাঁরা আমাদের উদ্দেশে কিছু বললেন। আমাদের তরফ থেকে নেপালের অধ্যাপক আচারিয়া স্বপ্রণোদিত হয়ে উঠে প্রথমে বক্তৃতা দিলেন। তার পরপরই আমি বক্তৃতা শুরু করলাম। সাহিত্যে, বিজ্ঞানে, চিকিত্সাশাস্ত্রে, প্রযুক্তিতে জাপানের উত্কর্ষ এবং অবদান, জাপানিদের আচার-আচরণে নম্রতা, ভদ্রতা, সৌজন্য ও শিষ্টাচার, জাপানিদের আথিতেয়তা, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে, অবকাঠামো নির্মাণে উন্নয়নশীল দেশে জাইকার সাহায্য-সহযোগিতা এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাপানের ভূমিকার কথা বললাম। বক্তৃতাটা বোধহয় বেশ ভালো হয়েছিল। দীর্ঘক্ষণ ধরে হলঘর করতালিতে মুখর ছিল। পাকিস্তান ও শ্রীলংকার অধ্যাপকেরা সিট থেকে উঠে এসে আমাকে অভিনন্দন জানালেন।

পরদিন ভোরে গাড়িতে করে ওসাকা বিমানবন্দরে পৌঁছালাম। ওসাকা জাপানের তৃতীয় শহর। বুলেট ট্রেনে টোকিও থেকে কিয়োটো আসার সময় পথে ইয়োহকাহামা পার হয়েছিলাম। যেটা জাপানের দ্বিতীয় শহর। স্বল্পভ্রমণে জাপানের প্রথম পাঁচটি শহর স্পর্শ  করা হলো। বিমানবন্দরের করমুক্ত অঞ্চল থেকে ১টা টিছট (Tissot) ঘড়ি কিনে প্লেনে উঠলাম। এবার বিরতি হংকং-এ। কিন্তু এবার বিমান থেকে নামারও অনুমতি নেই শুধু এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে যাওয়ার সময়টুকু ছাড়া। বাংলাদেশ বিমানে ওঠার কিছুক্ষণ পর আমাকে প্রথম শ্রেণির সিটে নিয়ে বসাল। আপ্যায়নও হলো প্রথম শ্রেণির। কারণ জানতে পারলাম না। আমার ধারণা হলো, প্রথম শ্রেণির একজনও যাত্রী না থাকায় আমার ভিআইপি অবস্থা বিবেচনায় কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত।

জাপানিরা দৈর্ঘ্যে খাটো, চোখ ছোট, কর্মচঞ্চলতায় ক্ষিপ্র এবং বিনয়ে ভদ্রতায় তুলনাহীন। বাহ্যিকভাবে ভদ্র আচরণের খ্যাতি দীর্ঘকাল ধরে ব্রিটিশ জাতির। যদিও তাদেরকে নাকউঁচু এবং ভণ্ডও বলা হয় (Snobish, Hypocrite। কিন্তু শিষ্টাচারে জাপানিদের সমকক্ষ বোধ হয় আর নেই। তত্কালে ভেবেছিলাম এসব উঁচু মর্যাদাবানদের সঙ্গে তাদের আচরণ এরকম। কিন্তু পরে অনেক জাপানফেরত শ্রমজীবী বাংলাদেশিদের কাছেও তাদের আচরণের অনেক সুখ্যাতি শুনেছি।

মানচিত্রে জাপান মহাসাগরবেষ্টিত নগণ্য দ্বীপসমষ্টি। কিন্তু গুরুত্বে একদম শিখরস্পর্শী। প্রশান্ত মহাসাগরবেষ্টিত প্রায় সাত হাজার দ্বীপ। দেশের চারটি বড় দ্বীপ হনসু, হোক্কাইডো, কিমসু ও শিকোকু ভূখণ্ডের ৯৭ ভাগ। ১,৪৬,০০০ বর্গমাইল আয়তনের ৭৩ শতাংশ পর্বতময় বনভূমি; কৃষিকাজ, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং বাসভূমির অনুপযোগী। পৌনে তেরো কোটি মানুষ সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে সঘন বসবাস করে। জনসংখ্যায় বিশ্বের দশম, অর্থনৈতিক বিবেচনায় তৃতীয় এবং সামরিক সামর্থ্যে অষ্টম। সমরায়োজন আত্মরক্ষা এবং শান্তিরক্ষার জন্য ভিনদেশে আগ্রাসী আক্রমণের আনুষ্ঠানিক বিধিনিষেধ আছে, ঘোষণা রয়েছে। একশ ভাগ শিক্ষিত মানুষের দেশে উচ্চশিক্ষার হার পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উত্কর্ষের জন্য তাদের অর্থনেতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। জীবনমান উন্নত হওয়ায় দীর্ঘজীবীর সংখ্যা অনেক বেশি।

জাপানের ৫২ শতাংশ মানুষ শিন্তো ধর্মাচরণে এবং ৩৫ ভাগ বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী। জাপানের ইতিহাস-ঐতিহ্যে কোনো মহাপুরুষ নেই। কোনো ধর্মগুরুর জন্ম হয়নি এদেশে। বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ভারতীয়। পর্যটক ও দূরদেশগামী ভিক্ষুদের মাধ্যমে জাপানে বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই জাপানে বীরপূজা নেই, ধর্মীয় আচার-আচরণে বাধ্যবাধকতা নেই। জাপানিদের প্রাত্যহিক জীবনে ধর্মের ভূমিকা নগণ্য। সাধারণত নববর্ষ, বৈবাহিক অনুষ্ঠান, শেষ বিদায়ের দিনে কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। শিন্তো ধর্ম কোনো সমন্বিত বিধিবিধানের ধর্ম নয়। ধর্মের কোনো প্রতিষ্ঠাতা নেই; ধর্মগ্রন্থও নেই। কিছু আচার-অনুষ্ঠান, কিছু বিশ্বাস এবং কিছু ধর্মশালা আছে শিন্তো বিশ্বাসীদের জন্য। শিন্তো মতে কেউ পাপ পূণ্যের ঊর্ধ্বে নিখুঁত নয় এবং পরিপূর্ণভাবে অভ্রান্ত বা ভ্রান্ত বলে কিছু নেই। পাপমুক্তির জন্য, সার্থকতার জন্য, উত্কর্ষের জন্য তারা পবিত্র আত্মা (Sacred Spirit) ‘কামি’র কাছে প্রার্থনা করে। ‘কামি’ সর্বত্র; সাগরে, পাহাড়ে, ঝরনার কল্লোলে, নদীর স্রোতে। v