শাহাপুর গ্রামের লোকজন তাদের জন্মের পর থেকে অদ্যাবধি এমন জৌলুস ও জাঁক করা বিয়ের অনুষ্ঠান আগে কখনো দেখেছে কি না সন্দেহ। শাহাপুর তো শাহাপুর গত কয়েকদিন ধরে জীবননগর কিংবা সমস্ত চুয়াডাঙ্গা জেলার গণ্যমান্য মানুষের মুখে মুখে ফেরে একটি আপ্তবাক্য— তামাক ব্যবসায়ী মোন্তাজ উদ্দিন শেখ নাকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ও তার একমাত্র পুত্র আকিমুল উদ্দিনের বিয়ে উপলক্ষে টাকা ঢালছে নদীর স্রোতের মতো। গায়ে হলুদ, বরযাত্রা, বৌভাত সব মিলিয়ে চার-পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান উপলক্ষে মোন্তাজ শেখের বাড়িতে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বর্ণনাতীত মহাযজ্ঞ।
জীবননগর উপজেলার ইউএনও, সাব-রেজিস্টার চুয়াডাঙ্গার ডিসি-এসপি, হাকিম, মোক্তার অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও দু চার গ্রামের মানুষ মিলিয়ে কয়েক সহস্র অতিথিকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। একমাত্র পুত্রের বিয়েতে কোনো কিছুরই কমতি রাখতে চান না মোন্তাজ শেখ।
তার ওপর আরোপিত বহুকালের দুর্নাম এবার ভেঙে খান খান করবেন তিনি। ‘মুঠো মোন্তাজের’ নাম এবার দু চার গ্রামের মানুষ শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করবে। তখন এই ‘মুঠো মোন্তাজ’ হয়ে উঠবে জাতে ওঠা একজন পুরোদস্তুর মোন্তাজ উদ্দিন শেখ।
হতে পারে মোন্তাজ শেখ অশিক্ষিত, গাঁওয়ার, হাড়কিপটে কিন্তু তার সন্তানরা সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় বড় পাশ দিয়ে বিয়ে-থা করে সুখে আছে। মেয়ে দুটির বিয়ে হয়েছে শিক্ষিত ঘরে। বড় মেয়ে রাহেলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করেছে। বিয়ে হয়েছে কলেজের এক অধ্যাপকের সঙ্গে। ছোট মেয়ে শায়লা দেখতে অনেক সুশ্রী বলে এমএ টাও আর শেষ করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ অনার্স শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় বুয়েট থেকে পাশ করা ব্রিলিয়ান্ট এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। একমাত্র ছোট ছেলে আকিমুলও পড়াশোনা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে।
মোন্তাজ শেখ তো আর এমনি এমনি মুঠো মোন্তাজ হয়ে ওঠেনি। এ সমাজে একদিনে কেউ মুঠো মোন্তাজ হয়ে ওঠে না। হামাগুড়ি দেওয়ার বয়সে পিতৃহারা হয়ে তাকে নিরন্তর সংগ্রাম ও পরিশ্রম করে এ পর্যন্ত আসতে হয়েছে আজ। মোন্তাজ উদ্দিন শেখের পিতা ওয়াজ উদ্দিন শেখ ছিলেন বিয়ের ঘটক। গ্রাম-গঞ্জে ঘটকালিটাকে আদৌ কোনো পেশার মধ্যে ফেলা যায় কিনা সন্দেহ। অজপাড়াগাঁয়ে বিয়ে জুটিয়ে ক-পয়সাই বা আয় রোজগার হয়। কিন্তু ওয়াজ উদ্দিন শেখের কাছে ঘটকালিটা ছিল আসলে একটা নেশা। মানুষের বিয়ে জুটিয়ে কেউ যে এত আনন্দ পেতে পারে সেটা বোধকরি ওয়াজ উদ্দিন শেখের সঙ্গে যাদের পরিচয় ছিল একমাত্র সেসব মানুষ ব্যতীত অন্য কেউ বুঝতে পারবে না।
তো হয়েছে কী বহু বছর আগে এক বোশেখে শাহাপুরের পাশের গ্রাম নন্দিপুরে ওয়াজ উদ্দিন শেখ গিয়েছে কথিত সুন্দরী এক পাত্রীর খোঁজে। শাহাপুর থেকে নন্দিপুর যেতে হয় বিস্তীর্ণ ও অবারিত ফসলের খেত ডিঙ্গিয়ে। ফেরার পথে আসন্ন কাল বৈশাখীর কবলে পড়ে ওয়াজ উদ্দিন মিয়া আশ্রয় নিয়েছিল ধানখেতের মাঝখানে নিঃসঙ্গভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাবলা গাছের নিচে। ওয়াজ উদ্দিন শেখের কপালে আশ্রয় লেখা থাকলে তবেই তো সে আশ্রয় পাবে। গুড়ুম শব্দে ভয়ানক এক বজ পাতে মারা গেলেন ওয়াজ উদ্দিন। সুনসান মাঠের মধ্যে কেউ জানতেও পারল না তার মৃত্যু সংবাদ। লাশ পড়ে রইল গাছের নিচে। পরদিন সকালে শুধু পোশাক-পরিচ্ছদ দেখেই বোঝা গেল বিদ্যুত্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে ওয়াজ উদ্দিন শেখ। বিশেষ করে মোটরগাড়িতে ব্যবহূত টায়ার কাটা রাবারের স্যান্ডেল জোড়া দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল যে এটা ওয়াজ উদ্দিন। হাড়, মাথার খুলিতে লেগে থাকা আগুনে ঝলসানো কিছু চুল ও শরীরের কিছু অংশ বাদে সবটুকুই খেয়ে নিয়েছে বন্য শেয়ালের পাল।
বাবা মারা যাবার পর মা ও অর্ধ ডজন ভাইবোন নিয়ে সমস্ত সংসারটি যেন দরিদ্রতার সাগরে হাবুডুবু খেতে লাগল। কীভাবে সংসার চলবে এ নিয়ে মোন্তাজ শেখের মা আক্তারী বেগমও দু চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। সর্বকনিষ্ঠ হয়েও একসময় মোন্তাজ শেখকেই সমস্ত সংসারের দায়ভার তুলে নিতে হয়েছিল নিজ স্কন্ধে। জীবনসংসারের কঠিন কষাঘাতই তাকে শিখিয়েছে জীবনে কীভাবে সাশ্রয়ী হতে হয়। কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করতে হয়েছে বহু সতর্কতার সঙ্গে।
অনেকে আড়ালে হাসি মস্করা করে বলত—ঐ দেখো মোন্তাজ শেখ, শুয়ে থাকে টাকার পালঙ্কে। বিস্তর জমি জিরাত। তবুও এক পয়সা খরচ করে না। একটি ফুটো কড়িও দু আঙুলের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় নেই। কিন্তু পৃথিবীর কেউ বুঝতে চায় না অনাহারে থাকার কী কষ্ট। অন্নহীন পেটের কী জ্বালা। অর্থকড়ি জোগাতে কী পরিমাণ শ্রম ঘাম ঝরাতে হয়েছে শরীর থেকে। জীবিকার নানা চোরা অলিগলি, অন্ধিসন্ধি ঘুরে তবেই আজ দু পয়সা এসেছে তার হাতে।
টাকা-পয়সা খরচের কথা ভেবে মেয়ে দুটির বিয়ে সেরকম ঘটা করে দিতে পারেনি মোন্তাজ শেখ। কিন্তু এখন সেসব কথা মনে হলে কিছুটা দুঃখই হয় তার। কিছু অর্থকড়ি খরচ করলে এমন কোনো ক্ষতি হতো না। হ্রাস পেত না তার রাজকোষ। সে যাক, এবার আর সেরকম কোনো ভুল করতে চান না তিনি। আকিমুল তার একমাত্র পুত্র ও শেষ আত্মজ। এবার তিনি সমস্ত জীবননগরবাসীদের দেখিয়ে দেবেন কতটা উদার ও মুক্তহস্ত মানুষ তিনি।
ঢাকা থেকে বিখ্যাত গায়ক দল আনা হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে। গায়ে হলুদের দিন থেকে শুরু করে বৌভাত পর্যন্ত তিন-চারদিন ধরে অভ্যাগতদের গান গেয়ে শোনাবে দলটি। গ্রামের দেহাতি মানুষদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে বাই-নর্তকী ও খেমটা নাচ। বিশাল চাঁদোয়া-শামিয়ানা খাটিয়ে খাবার-দাবারের আয়োজন বাড়ির পেছন দিককার ফাঁকা জায়গায়। সদর রাস্তা থেকে শুরু করে মূল ফটক, খাবার-দাবারের জায়গা ও সমস্ত বাড়ি সজ্জিত করা হয়েছে নানা রঙের আলোক বাতিতে। বাড়িতে প্রবেশের মূল ফটকে আলোকসজ্জায় সজ্জিত প্রধান তোড়নটিতে লাল, নীল বাতি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দুটো শুকপাখি। পাখি দুটো তাদের জোড়া হাতে ধরে আছে ‘শুভ বিবাহ’ লেখাটি। টিপটিপ করে যখন আলোগুলো ক্রমান্বয়ে জ্বলে-নিভে, দূর থেকে মনে হয় পাখি দুটো শুভ বিবাহ লেখাটি নিয়ে এই বুঝি উড়ে যাবে আকাশে।
চারুকলার ছাত্র আকিমুল। সে নিজেও কিছু সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছে। সাদা রঙের শোলার মধ্যে নানাপদের রং মেখে কেটে কেটে তৈরি করেছে হরেক রকমের বিচিত্র সব বৃক্ষ। বৃক্ষ সাদৃশ্য ছবিগুলো সব এঁটে দেওয়া আছে চাঁদোয়া টাঙানোর জন্য ব্যবহূত বাঁশের খুঁটিগুলোর সঙ্গে। আম গাছটি এমনভাবে আঁকা যেন গাছটি থেকে থোকা থোকা পাকা আম এক্ষুণি পড়বে মাটিতে। কলা গাছে ঝুলে আছে কাঁদি কাঁদি পাকা কলা। খানিক দূর থেকে সত্যিকারের কলা ভেবে ভ্রম হয়। তাল গাছটিতে এমনভাবে তাল ধরেছে যেন আকাশছোঁয়া গাছটি অনেকটাই এখন হাতের নাগালের মধ্যে এবং সেই সঙ্গে তালগুলোকেও পেরে আনা যায় অনায়াসে। এরূপ কাঁঠাল, পেঁপেসহ আরো মনোমুগ্ধকর সব ফলজ গাছের চিত্রিত ছবি দেখে সমস্ত জীবননগরের মানুষজন বলাবলি করে—নাহ্ জীবনে অনেক বিয়ে-শাদি তারা দেখেছে বটে কিন্তু মোন্তাজ শেখ আকিমুলের বিয়েতে যা দেখাল অতীতে তো নয়ই ভবিষ্যতে অন্য কেউ দেখাতে পারবে কি না সন্দেহ।
ব্যান্ডের দল একটির পর একটি গান শুনিয়ে যাচ্ছে। একটানা দশ-পনেরোটা গান শোনানোর পর যখন তারা কিছু সময়ের জন্য বিশ্রামে যাচ্ছেন তখনই স্টেজে উঠছে খেমটা নাচের দল। গ্রামের দেহাতি মানুষের কাছে গান-বাজনার চেয়ে খেমটা নাচের কদরই যেন বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। দু চার গ্রাম ভেঙে মানুষ আসছে এসব তামাশা দেখতে।
হুলুস্থূল ভিড়াভিড়ির মধ্যে মিনহাজও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল এত্ত সব কাণ্ড-কারখানা। দীর্ঘদিনের ইয়ার আবেদও রয়েছে সঙ্গে। নাচ-গান দেখার আদৌ কোনো ইচ্ছে ছিল না মিনহাজের। আবেদই তাকে এক প্রকার ধরে-বেঁধে নিয়ে এসেছে এখানে। মিনহাজের বাবা নিজাম চৌধুরী জীবননগর উচ্চ বিদ্যালয়ে ইংরেজির শিক্ষক। কাল পরিক্রমায় মধ্যবিত্ত পরিবারভুক্ত হলেও নিজাম চৌধুরীর শরীরে বইছে অভিজাত ও বনেদি রক্ত। এখনো আত্মসম্মান বোধটি তার অতি টনটনে। মিনহাজকে নিয়ে প্রায়ই তিনি বেশ ভাবেন, ছেলেটি এতটা সাধারণ ও হাবাগোবা ধরনের হলো কী করে! জীবনসংসারে সে যে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবে সেটাই নিজাম চৌধুরীর প্রধান ভাবনা।
আবেদরা তো বটেই নিজাম চৌধুরীও মোন্তাজ উদ্দিন শেখের প্রতিবেশী। তিন থেকে চারটি বাড়ি পেরুলেই নজরে পরে মিনহাজ ও আবেদদের সাদাসিধে আবাস। বিয়েতে আবেদদের দাওয়াত করলেও নিজাম চৌধুরীকে দাওয়াত করেনি মোন্তাজ উদ্দিন। মোন্তাজ উদ্দিনের বড় ভাই রেহান উদ্দিন পাড়া ঘুরে সবাইকে নিমন্ত্রণ করে গেছে সপ্তাহ খানেক আগে। একটু দূরের ও স্বল্প পরিচয় যাদের সঙ্গে তাদের দেওয়া হয়েছে ‘এককেয়ারি জিয়াফত’ অর্থাত্ দাওয়াত শুধুমাত্র পরিবারের প্রধান কর্তার জন্য। এর পরের ধাপ ‘মেজমানি’ এতে খানাপিনার সুযোগ পাবে বাড়ির সমস্ত পুরুষ। মোন্তাজ উদ্দিনের পরিবারের সঙ্গে গ্রামের যাদের যাদের বেশ সখ্যতা আছে তাদের প্রত্যেককে ‘মেজমানি’ দাওয়াত করা হয়েছে। ‘মেজমানি-মেহমানি’ করা মানেই হলো বাড়ির সমস্ত পুরুষতো বটেই সে বাড়িতে যদি আচমকা কোনো পুরুষ কুটুমও এসে পড়ে তাহলে তারাও বিয়েবাড়ির খানাপিনাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। সবচেয়ে বড় জিয়াফত হচ্ছে ‘হাঁড়িবারণ’। রেহান উদ্দিন স্বয়ং নিজে ঘুরে ঘুরে ‘হাঁড়িবারণ জিয়াফত’ করে গেছেন নিকটতম প্রতিবেশীদের। আবেদদেরও হাঁড়িবারণ দাওয়াত। সেজন্যই বিগত দু তিন দিন হাঁড়ি চড়েনি আবেদদের উনুনে অথচ নিজাম চৌধুরীও মোন্তাজ উদ্দিনের নিকটতম প্রতিবেশী। হাঁড়িবারণ তো দূরের কথা ‘এক কেয়ারি’ দাওয়াতও করা হয়নি তাদের। নিজাম চৌধুরী খুব ভালো করেই জানেন এর পেছনের কারণ। কিন্তু একথা তিনি কাউকে কোনোদিন বলেননি। আর বলবেনও না। শুধু তার স্ত্রী আলেয়া জানে সবকিছু। ছোটলোকেরও কিছু সীমা-পরিসীমা থাকে। মোন্তাজ উদ্দিন যেন সেটারও বাইরে। নিজাম চৌধুরী চাপা এক অস্বস্তি দীর্ঘদিন ধরে পুষে রেখেছেন নিজের ভেতর।
শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি বলে বাড়িতেই ছিল মিনহাজ। দুপুর নাগাদ আবেদই এল মিনহাজকে ডাকতে।
—তুই ঘরে বসে আছিস মিনহাজ। ওদিকে কি হুলুস্থূল কাণ্ড হচ্ছে দেখ। গান, বাজনা, নাচ কত রকমের আনন্দ। চল আমার সঙ্গে। ঘরে বসে কাজ কী?
—আমাদের নিমন্ত্রণ নেই। তোদের দাওয়াত করেছে তোরা যা। মুখ অবয়ব ঈষত্ কালো করে বলল মিনহাজ।
—ঠিক আছে খাওয়া লাগবে না। নাচ-গান দেখতে তো আর অসুবিধা নেই। কী সুন্দর করে সাজিয়েছে সবকিছু। দেখবি আয়।
মিনহাজেরও যে ইচ্ছে করে না এ সব কাণ্ড-কারখানা দেখতে তা তো নয়। বাড়ির কাছেই এমন একটি জমকালো অনুষ্ঠান হচ্ছে। আশেপাশের দু চার গ্রামের মানুষ উপচে পড়ছে নাচ-গান দেখতে, তারও তো মন ছুটে যায় সেখানে। কিন্তু উপায় কী, বাবা-মা রাগ করবে অনাহুত অতিথি হয়ে সেখানে গেলে।
আবেদের পীড়াপীড়িতে মিনহাজ মনে মনে ভাবে, ঠিক আছে খাওয়ার টেবিলে না বসলেও তো হয়, দূর থেকে না হয় একটু গান-বাজনা দেখে চলে আসা যাবে। এই ভেবেই মিনহাজ আবেদের সঙ্গী হতে রাজি হয়। স্টেজ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে চিত্তাকর্ষক অনুষ্ঠানটি উপভোগ করছিল মিনহাজ আর আবেদ। বরকে নিয়ে মহা হইচই, ব্যান্ড বাদ্য, দৌড়াদৌড়ি, হুলুস্থূল চারিদিকে সব ধুন্ধুমার ব্যাপার-স্যাপার। রোস্ট, রেজালা, পোলাও, কমলান্ন প্রভৃতি সুরেশ অন্নের ঘ্রাণে মিনহাজের খিদে যেন তিন-চার গুণ বেড়ে গেল। এ কথা মানতেই হয় এধরনের মহাযজ্ঞ অজপাড়াগাঁয়ে খুব কমই চোখে পড়ে। শেরোয়ানি চোপকান গায়ে চাপিয়ে, শুঁড় তোলা নাগড়া পায়ে লোক-লস্করসমেত হল্লা করে পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল আকিমুল। মিনহাজদের দেখে কিছু সময়ের জন্য থমকে দাঁড়াতে হলো তাকে। ওদের দিকে মুখ ফিরিয়ে আকিমুল জিজ্ঞেস করল—কিরে মিনহাজ আবেদ এখানে কী করছিস। খাওয়া-দাওয়া সেরেছিস তো ঠিকঠাক মতো। আবেদ মাথা নাড়ে—না খাওয়া হয়নি এখনো। আকিমুল চোখ কপালে তুলে বলে—একী কথা! এখনো খাসনি কেন। পরেতো কিছুই পাবি না। বাঁধভাঙা স্রোতের মতো যেভাবে লোকজন আসছে একসময় ডেগের তলানিতে কিছু থাকবে কি না সন্দেহ। যা ভাগ, তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। আকিমুলের কণ্ঠে এক প্রকার স্নেহমিশ্রিত কপট রাগ উপচে পড়ে যেন। পাড়ার ছেলে বলেই আকিমুল ওদের স্নেহ করে যথেষ্ট। তাছাড়া মিনহাজের বাবা নিজাম চৌধুরী তো কলেজে আকিমুলের শিক্ষক ছিলেন। আকিমুল হয়তো এটি স্বপ্নেও ভাবেনি যে মিনহাজদের দাওয়াত করা হয়নি তার বিয়েতে।
আকিমুলের বাবা মোন্তাজ উদ্দিন চুয়াডাঙ্গা সদর থেকে আগত বড় বড় সব অতিথি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হাকিম, মোক্তার, ডিসি, ম্যাজিস্ট্রেট একে একে সব এসে হাজির হচ্ছেন বিয়েতে। চুয়াডাঙ্গার এসপি আমিনুল ইসলাম এখনো এসে পৌঁছাননি অনুষ্ঠানে। চিন্তার বলিরেখা ফুটে ওঠে মোন্তাজ উদ্দিনের প্রশস্ত কপালে—এসপি সাহেবের আসতে এত দেরি হওয়ার তো কথা নয়। ঠিক এমন সময় অভ্যাগতদের মধ্য থেকে কেউ একজন মোন্তাজ উদ্দিনের কানের কাছে মৃদু স্বরে বলল—এসপি সাহেব এসে গেছেন। প্রচণ্ড ভিড়ের কবলে পড়ে প্রবেশ করতে পারছেন না মূল ফটক দিয়ে। মোন্তাজ উদ্দিন হৈ হৈ করে উঠলেন—এই, কে কই আছিস। জলদি এদিক আয়। আরে কোথায় গেলি সব। জেলার সবচেয়ে বড় কোটাল বলে কথা। মোন্তাজ উদ্দিনের মাথায় রক্ত তো উঠবেই। মোন্তাজ উদ্দিন এবার নিজেই পই পই করে দৌড় লাগালেন সদর রাস্তার দিকে। দু চারজন পুলিশ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাচ-গান দেখায় মশগুল ছিল। মোন্তাজ উদ্দিন তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন—ওরে তোরা কী এত নাচ-গান দেখায় মত্ত হয়ে আছিস। তোদের সাহেবের তো ধাক্কাধাক্কিতে জান যাবার জোগাড়, জলদি ওখান থেকে উনাকে উদ্ধার কর। মোন্তাজ উদ্দিনের হইচইয়ে কনস্টেবলগুলোর হুঁশ ফিরে এল। তারা দৌড়ে গিয়ে ভিড় খেদিয়ে এসপি আমিনুল সাহেবকে ওখান থেকে উদ্ধার করে আনলেন। এসপি সাহেবের মুখে ঈষত্ বিরক্তির ছাপ—এই যে মোন্তাজ উদ্দিন আপনার ছেলের বিয়েতে এসে তো দেখছি আমার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। এতগুলো লোক আমার পা মাড়িয়ে চলে গেল। ফরেন কোম্পানির নতুন জুতো। দেখুন কী হাল করেছে অসভ্যগুলো। মোন্তাজ উদ্দিন বোকার মতো একপাটি দাঁত বের করে শুধু হাসল একটু—সরি স্যার, নরমাল পোশাকে ওরা আপনাকে চিনতে পারে নাই। চলুন চলুন আপনাদের জন্য খাওয়া-দাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে অন্দরমহলে।
এসপি আমিনুল বললেন—তা মোন্তাজ মিয়া খুব তো ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন। ওদিকে ঢাকার খোঁজ-খবর রাখছেন কিছু?
কেন স্যার কী হয়েছে ঢাকায়?
পত্রিকা-টত্রিকা কিছু পড়েন না নাকি। রেডিও, টিভি দেখেন কিছু। রাষ্ট্রপতি এরশাদের বিরুদ্ধে চরম আন্দোলন চলছে ঢাকায়। মিলন নামে একজন ডাক্তারও নাকি মারা গেছে। যে কোন সময় গনেশ উল্টে যেতে পারে কিন্তু।
—কী যে বলেন স্যার, গনেশ উল্টালে আমার কী? আমি মফস্বল শহরের ছাপোষা ব্যবসায়ী। ডেকোরেটরদের থালা-বাসন, হাঁড়িকুড়ি ধোয়া-মোছার পানিতে কর্দমাক্ত একচিলতে জমি লাফ দিয়ে ডিঙ্গাতে ডিঙ্গাতে এসপি আমিনুল তার বর্তুল চোখ দুটো বড় বড় করে মোন্তাজ উদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বললেন—কী বলছেন মোন্তাজ? গনেশ উল্টালে আপনার কী মানে? আপনি কি ভেবেছেন নতুন গভর্নমেন্ট এলে আমাকে রাখবে এখানে? আপনার এসব অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য কে সামলামে তখন?
তরমুজের বিচির মতো দন্তপাটি দেখানো হাসি দিয়ে মোন্তাজ শেখ বলল— আপনি কিচ্ছু চিন্তা করবেন না স্যার। ও আমি সব সামলে নেব।
প্যান্ডেলের এক পাশে আলাদা করে টেবিল সাজানো হয়েছে। গণ্যমান্য সব অতিথিদের জন্য। সেখানে রোস্ট-রেজালা, মাংস-পোলাও ছাড়াও রয়েছে হরেকরকম ব্যঞ্জন। তাদের সবাইকে টেবিলে বসিয়ে মোন্তাজ উদ্দিনের স্বয়ং নিজ ছেলে আকিমুলকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, মেহমানদের যত্ন-আত্মীর যেন কোনো কমতি না থাকে।
মোন্তাজ শেখ তার ভাই রেহানকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত অতিথিদের খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য খুঁটিনাটি নিজে বেরুলেন তদারকিতে। বিভিন্ন টেবিল ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন আর হাত তুলে অতিথিদের অভিবাদন জানাচ্ছিলেন। মোন্তাজ উদ্দিনের অঙ্গভঙ্গিতে এমন একটি ভাব যেন এসব অতিথিদের আগমনে তিনি খুবই কৃতার্থ ও আনন্দিত। পাশ থেকে রেহান শেখ প্রতিটি পঙিক্ততে কতজন করে খাচ্ছে সেই হিসেব কষছিলেন।
ভোজনপর্ব শুরু হওয়ার পূর্বেই কয়েকটি ভলান্টিয়ার বাহিনী চারদিকে লাগিয়ে দিয়েছেন রেহান শেখ। যাতে করে কেউ ফাও খেয়ে যেতে না পারে। ভলান্টিয়ারের সদস্যরা সবকিছু তদারকি করছিলেন সতর্কিত তক্ষকের মতো। রেহান শেখ একটি টেবিলের সামনে এসে জনৈক এক যুবককে উদ্দেশে বললেন—তুমি শুকুর মেম্বারের ছেলে না? যুবকটি বলল— জি না চাচা আমি আবুল মুন্সীর ছেলে। ও, হ্যাঁ চিনেছি চিনেছি। তোমাদের তো হাঁড়িবরণ। খাও বাবা খাও, পেট ভরে খাও। পাশের আরেকটি অল্পবয়স্ক ছেলের দিকে তাকিয়ে তাকে রেহান শেখ জিজ্ঞেস করল—এই তোর বাপের নাম যেন কী?
—আমি মহির খাঁর ছেলে চাচা।
—তোদের তো এক কেয়ারি জিয়াফত ছিল। একটু আগেতো দেখলাম তোর বাপ বসে খেয়ে গেল। তোরা কি সব গুষ্টিশুদ্ধ খাবি নাকি আজ। এখন উচিত কী জানিস। কানে ধরে তোকে এখান থেকে তুলে দেওয়া। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মন্তাজ শেখ বলল— না... না... থাক... থাক... তোকে উঠতে হবে না। বসেছিস যখন খাওয়া শেষ করে যা।
আরেকটি টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে মোন্তাজ শেখ মিনহাজের উদ্দেশে বলল—এই যে জমিদারের পুত। আপানাদের কি দাওয়াত করা হয়েছিল বিয়েতে। দিব্যি আরামে বসে ভালোই তো টানছেন দেখছি।
সবে মাত্র খাওয়া শুরু করেছিল মিনহাজ। দু চারনলার বেশি হয়তো ভাত মুখেই তোলা হয়নি তখনো। অমনি মোন্তাজ শেখের হুঙ্কার শুনে চুপসে গেল সে। তেমন কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে অস্ফুট কণ্ঠে শুধু বলল— আমি তো আসতে চাইনি।
—তা তোমাকে কি জিন-পরী গিয়ে নিয়ে এসেছে এখানে। তাদের মধ্যে যখন কথোপকথন চলছিল ঠিক তখন আশেপাশের টেবিলগুলো থেকে দু চারজন তাড়াহুড়ো করে এঁটো হাতে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল প্যান্ডেল থেকে। তারপর টিনের ড্রাম ফুটো করে হাত পক্ষালনের জন্য যেখানে পানির কলগুলো লাগানো হয়েছে, সেখানে গিয়ে কসকো সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে যে যার মতো সটকে পড়ল কাউকে কিছু না বলে। মোন্তাজ শেখ আড় চেখে এসব দৃশ্য দেখেও না দেখার ভান করে রইলেন। তার সমস্ত আক্রোশ মিনহাজের ওপর। পাশ থেকে আবেদ দাঁড়িয়ে একবার শুধু বলবার চেষ্টা করল—মোন্তাজ চাচা আমিই মিনহাজকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। সম্পূর্ণ বাক্য অবশ্য শেষ করতে পারল না আবেদ। তাকে জোরে একটি রাম ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল রেহান শেখ। চোখ দুটি পাকিয়ে বলল—চোরের সাক্ষী হয়েছে গাঁটকাটা। তোদের তো হাঁড়িবরণ জিয়াফত। তুই বসে খা। অন্যের পক্ষে ওকালতি করছিস কেন।
মিনহাজ উঠে দাঁড়িয়ে বলল—আমার ভুল হয়েছে, আমি চলে যাচ্ছি এখনি। মোন্তাজ শেখ বলল—চলে যাচ্ছি মানে। ধরা পড়ার পর এখন বলা হচ্ছে কি না চলে যাচ্ছি। চোরের আবার বড় গলা। বিনা দাওয়াতে খাওয়ার মজা দেখাচ্ছি তোকে। এই কে আছিস বলে মোন্তাজ শেখ চারপাশে ভালো করে দেখেশুনে ভলান্টিয়ারের একটি দলকে আঙুল তুলে ওখানে আসার নির্দেশ করলেন। এই ওকে তুলে নিয়ে পুকুরে গলা পানিতে নামিয়ে দে। তারপর হাতে প্লেট দিয়ে খাবার দে ইচ্ছেমতো। দেখব কত খেতে পারে ও। ভলান্টিয়ার দলটি মিনহাজের শার্টের কলার চেপে হুড়হুড় করে টেনে নিয়ে গেল প্যান্ডেলের পাশে বাড়ির বড় পুস্করনির কাছে। তারপর তাকে ঠেলে ধাক্কিয়ে নামিয়ে দিল গলা পানিতে। কেউ একজন প্লেট উঁচু করে খাবার নিয়ে এল। প্লেট উপচে পড়ছিল ভাত-মাংস-ডাল। যদিও গরম গরম ভাত তরকারি থেকে তখনো ধোয়া উঠছিল। কিন্তু মিনহাজের শরীর যেন জমে যাচ্ছিল হিমে। শীতের বিকেলে পুকুরের পানি ভয়ানক রকম ঠাণ্ডা। পুকুরের শীতল জল মিনহাজের শরীরে সুচের মতো হুল ফোটাচ্ছিল। যেন এক ঝাঁক ভিমরুল ছেকে ধরছে তাকে।
ইতোমধ্যে পুকুরের চারপাশে শত লোকের ভিড় জমে গেছে। সবাই হৈ হৈ শুরু করে দিয়েছে। চারদিকে গুঞ্জন—একী তামাশা শুরু হলো আবার। বেশিরভাগ লোকেই বলতে লাগল এটা কিন্তু মোন্তাজ শেখের বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছু নয়। ভিড়ের মধ্য থেকে একজন আবার বলল—বিনা দাওয়াতে জিয়াফত খাওয়ার মজা এবার বুঝুক ব্যাটা। মিনহাজ শুধু অল্প একটু তাকিয়ে দেখল। শত শত চোখ নিবন্ধিত হয়েছে তার দিকে। এমন সার্কাস দেখার সুযোগ মানুষের জীবনে ক বার আসে। মিনহাজের মনে হলো এর চেয়ে যদি তার মৃত্যুও হতো তবুও আফসোস থাকত না। কোন পাপের ফল যে সে ভোগ করছে আল্লাহ জানে।
নোনা অশ্রু ধারায় ঝাপসা হয়ে এসেছে তার দু চোখ। সমস্ত শরীর অসাড়। মোন্তাজ শেখ পাড়ে দাঁড়িয়ে চিত্কার করে উঠলেন—কী হলো খাচ্ছিস না কেন। খা, এবার মন ভরে খা। দেখি কত খেতে পারিস। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মিনহাজের মাথাটা বেশ হাল্কা বোধ হলো। মনে হলো শরীরটাকে শূন্য করে সবকিছু মিশে যাচ্ছে বাতাসে। এরপর আর কিছু মনে নেই।
যখন চোখ খুলল তখন মিনহাজ নিজেকে আবিস্কার করল নিজ ঘরের বিছানায়। লেপ মোড়ানো শরীর। গায়ে খানিকটা জ্বর। চেতনা ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আনুপূর্বিক ঘটনাগুলো মানসপটে ভেসে উঠে মিনহাজের। খাবারের থালা হাতে গলা পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। পাড় থেকে অজস্র মানুষ তার দিকে তাকিয়ে তামাশা দেখছে। হাসাহাসি, গুঞ্জন।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে মিনহাজ। মিনহাজের মা আলেয়া বেগম আলতো করে হাতটি চাপিয়ে দেন মিনহাজের শরীরের ওপর। ভয় নেই, কাঁদিস না বাবা। আমরা সবাই আছি তো পাশে। এই যে, এদিকে তাকিয়ে দেখ, তোর বাবাও আছে পাশে। আলেয়া বেগম স্বামীকে উদ্দেশে বলল— ওরা কেন এমন করল আমার এই নিষ্পাপ ছেলেটির সঙ্গে। ওরা কি মানুষ না পশু। ওর কি দোষী? কোন কালে কোন পূর্বপুরুষ ওদের সঙ্গে কী করেছে। সে সবের প্রতিশোধ কি ওরা এখন আমার এই নাদান ছেলের ওপর নেবে? ঈষত্ গোঙানির স্বরে মিনহাজ বলল—মা তুমি কী বলছ? কোন পূর্বপুরুষ? কী হয়েছিল? নিজাম চৌধুরী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল— আমারই ভুল হয়েছে বাপজান। অনেক আগেই তোদের সবাইকে খুলে বলা উচিত ছিল সবকিছু। তোদের তো একথা নিশ্চয়ই জানা আছে যে আমাদের আদি নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার ফুলিয়া অঞ্চলে। আমার দাদা আজিম চৌধুরী ছিলেন সেই ফুলিয়া অঞ্চলের প্রতাপশালী জমিদার। আর অন্যদিকে মোন্তাজ উদ্দিনের দাদা ফয়েজ উদ্দিন ছিলেন আমার দাদার গোমস্তা। আজিম চৌধুরী অসম্ভব বিশ্বাস করতেন ফয়েজ উদ্দিনকে। কিন্তু সে বিশ্বাসের প্রতিদান ফয়েজ উদ্দিন দিতে পারেনি। সে একবার কোষাগার থেকে বিপুল পরিমান অর্থ সম্পদ চুরি করে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। অর্থাত্ আজিম চৌধুরীও ছিলেন দুর্দান্ত লোক। তিনি তার লোক-লস্কর পাঠালেন দিগিবদিক। নানা জায়গা খুঁজে অবশেষে তাকে ধরে আনা হলো রাজস্থান থেকে। তাকে কী শাস্তি দেওয়া যায় এই নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। কেউ বলল— ফয়েজ চোরকে হাতির পায়ের নিচে পিষে মারা হোক। কেউ বলল—হাত কেটে নেওয়া হোক। কেউ আবার বলল—চোখ উপড়ে ফেলা হোক ইত্যাদি। আজিম চৌধুরী ছিলেন দয়ার্দ্র হূদয়ের মানুষ। উপরন্ত ফয়েজকে তিনি অসম্ভব ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন। তাই তিনি তার জন্য একটি লঘু শাস্তির ব্যবস্থা করলেন। মাথা ন্যাড়া করে হাত পা বেঁধে মাথায় ঘোল ঢেলে তাকে সমস্ত ফুলিয়া অঞ্চল চক্কর দেওয়ানো হলো। শুধু এতটুকুই ছিল তার শাস্তি। চোরের খেতাব নিয়ে ফয়েজ উদ্দিন শেখ ও তার পরিবারের তো আর ফুলিয়ায় থাকা সম্ভব ছিল না। ফলে পরবর্তীকালে তারা ফুলিয়া ত্যাগ করে জীবননগরে এসে শুরু করে নতুন বসতি। কালের বিবর্তনের ধারায় আজিম চৌধুরীর আর্থিক অবস্থাও সঙ্গীন হতে থাকে। মৃত্যুর আগে আজিম চৌধুরীর সম্পদ রেখে যান যত্সামান্যই। কিন্তু তার ছিল আট দশজন পোষ্য। ফলে তার মৃত্যুর পর এতগুলো ভাইবোনের মধ্যে সম্পদের ভাগ হওয়ায় প্রত্যেকের ভাগ্যে যা জোটে তা বলাই বাহুল্য। সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় আমার বাবা, নাজিম চৌধুরীও তার যেটুকু সম্পত্তি অবশিষ্ট ছিল সেটুকু বিক্রি করে চলে এলেন এখানে।
তারপর থেকে আমরা দুটো পরিবার এই জীবননগরেই আছি কয়েক পুরুষ ধরে। কিন্তু মোন্তাজ উদ্দিন কিংবা ওর বাবা ওয়াজ উদ্দিন কেউই ভোলেনি পুরোনো আমলের কথা। নানাভাবে তারা আমাদের হেয় করার চেষ্টা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। নিজাম চৌধুরী দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলল—আমার বোন অর্থাত্ তোর ফুফু আনজুমের ভালো কোনো ঘর থেকে সম্বন্ধ এলে মন্তাজের বাবা গোপনে পাত্রের সমস্ত খবরাখবর সংগ্রহ করে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতেন। তারপর আনজুমের নামে নানা আকথা-কুকথা বলে সে বিয়ে ভেঙে দিতেন ওয়াজ উদ্দিন শেখ। আনজুমের তো আর বিয়ে হয় না। পরে আমার মামা বাড়ি রংপুরে আনজুমকে রেখে ওখান থেকেই ওর বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
নিজাম উদ্দিন চৌধুরী বলল—আমি ভেবে সত্যি বেশ অবাক হচ্ছি আজও মন্তাজ শেখ শত্রুতা করে যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে। মানুষ কতটা নিচ, সংকীর্ণ ও পথভ্রষ্ট হলে খাওয়া-দাওয়ার মতো এমন একটি লঘু বিষয় নিয়ে এমন কাণ্ড ঘটাতে পারে, এত চিন্তারও বাইরে। নিজাম চৌধুরী ছেলের পাশে এসে বসলেন। বললেন—সব ঠিক হয়ে যাবে বাবা। চিন্তা করিস না। এতগুলো মানুষের সামনে তুই ছোট হসনি মোন্তাজ শেখই ছোট হয়েছে। মিনহাজ মনে মনে ভাবে, সবকিছু ঠিক তো হতেই হবে। নিশ্চিতভাবে বলা যায় আকিমুল উদ্দিন তার বাবার মতো হয়নি। সেদিন আকিমুল ওখানে উপস্থিত থাকলে নিশ্চয়ই ওকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করত। সেইসঙ্গে বাবা মোন্তাজ উদ্দিন শেখকেও তিরস্কার করত নিশ্চয়ই।
এত বিশাল একটি আয়োজন করে ‘মুঠো মোন্তাজের’ যে কতটুকু লাভ হলো তা সঠিক করে বোঝা গেল না। কারণ পাড়াগাঁ থেকে ছুটে আসা শত শত খাইয়ের দল যখন রাস্তা ধরে চলছিল তখন যদি কোন হাটুরে, পথচারী কিংবা গাছের ছায়ায় বিশ্রামাশ্রিত মানুষ তাদের শুধাত—তা ভায়া দল ধরে সবার যাওয়া হচ্ছে কোন গ্রামে।
—কেন জানেন না বুঝি ভালো মানুষের পো। ‘মুঠো মোন্তাজের’ ছেলের আজ বিয়ে। যাচ্ছি সেখানে দাওয়াত খেতে।
অন্যদিকে শেষ বেলায় অজস্র মানুষ খাবার না পেয়ে উষ্মা ও অসন্তোষ নিয়ে যখন ফিরে যাচ্ছিল সব নিজভূমে। কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করল—তা ভাই সাহেব ফিরলেন কোত্থেকে।
—আর বলবেন না! দাওয়াত ছিল মুঠো মোন্তাজের বাড়ি। নামই যার ‘মুঠো মোন্তাজ’ সে আর কী খাওয়াবে বলুন দেখি। বরঞ্চ যে টাকায় উপহার কিনেছি সে টাকা দিয়ে বাড়িতে বসে মোরগ-পোলাও খাওয়া যেত। কী আর বলব ভাই সবই কপাল। মুঠো মোন্তাজ সারাজীবন মুঠো মোন্তাজই রয়ে গেল। তার মুঠি আর খুলবে না কখনো। এই বলে অতিথিরা সব যে যার মতো রাস্তা ধরে সামনের দিকে এগুতে লাগল। v
