দুঃস্বপ্নের সেই রাত

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৪, ২২:০৪
একটি দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বুকের ভিতর ঢিব ঢিব করছে। কিছুতেই ঘুম আসছে না। বেড সুইচ অন করে মশারির ভিতর থেকে বের হলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় সাড়ে চার। হ্যাংগার থেকে ড্রেসিং গাউনটা নামিয়ে গায়ে চেপে একটি সিগারেট ধরালাম। দরজা খুলে বারান্দায় বের হতেই অল্প দূরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরী (সৈনিক) ঠুক করে স্যালুট করলো। আমি বারান্দায় পায়চারী করছি আর ভয়ংকর এই স্বপ্নের বিষয়টি ভাবছি। স্বপ্নে দেখলাম, আমার কোর্সমেট লিডার (অবসরপ্রাপ্ত মেজর) কামালকে দুষ্কৃতকারীরা গুলি করে হত্যা করেছে। বিষয়টি আমাদের জোনাল এডজুট্যান্ট লিডার (মেজর) মোজাফ্ফরকে জানানোর জন্য তাঁকে খুঁজছি এবং খুঁজতে খুঁজতে তাঁর এক আত্মীয়ের বাসায় গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি এক লোক পিছনে দু’হাত রেখে জমিদারী কায়দায় পায়চারী করছেন। কিন্তু তার পায়ের গিড়ার নীচ থেকে কাটা অর্থাত্ গিড়ার নীচে পা দুটি নেই এবং সে মেঝে থেকে একটু উপরে শূন্যে হাঁটাহাঁটি করছে। আমি লোকটির পিছনে এসে দাঁড়ালাম-লিডার মোজাফ্ফর এর কথা জিজ্ঞেস করতেই ঘাড় ফিরিয়ে কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে বিরক্তি ও ধমকের সুরে বললো—“নেই।” অকল্পনীয় বীভত্স চেহারার ঐ লোকটির চোখ দুটো বেশ বড় এবং লাল টকটকে। আগুনের ফুলকির মত লাল চোখ দুটি দেখে মনে হচ্ছিল যেন আমার দিকে তেড়ে আসছে। আমি ভয় পেয়ে চলে এলাম। অনেক জায়গায় খোঁজ করে মোজাফ্ফরকে না পেয়ে পুনরায় আমি সেই বাড়িতে যাই এবং একই লোকের মুখোমুখি হই। মোজাফ্ফর এর কথা জিজ্ঞেস করতেই একই ভঙ্গিমায় তার উত্তর—“নেই।” ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। চলে এলাম বারান্দায়। খুট করে একটা শব্দ হতেই তাকিয়ে দেখি দরজা খুলে নিজ কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসছেন লিডার (অবসরপ্রাপ্ত লেঃ কর্নেল) বেলায়েত হোসেন। মেজর মোজাফ্ফর এবং তিনি একই কোর্সের অর্থাত্ জাতীয় রক্ষী বাহিনীর প্রথম ব্যাচের অফিসার। একই ব্যাচের আরেকজন অফিসার লিডার নীতিভূষণ সাহা ছিলেন আমাদের সাথে। লিডার বেলায়েত বারান্দায় বের হয়ে আমাকে দেখে যেন চমকে উঠলেন। চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলেন—“কি ব্যাপার রেজা এ সময় তুমি বারান্দায়?” “ আমি তখন তাঁকে আমার স্বপ্নের কথাটা বলি। আশ্চর্য হয়ে তিনি বললেন, “আরে আমিও তো একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছি”। তিনি তার স্বপ্নের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। লিডার বেলায়েত স্বপ্নে দেখেছেন যে, তাঁর ভাতিজাকে তাদের গ্রামের দুষ্কৃতকারীদের একটা দল টেটা, বল্লম নিয়ে ধাওয়া করছে এবং সে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিত্কার করছে এবং ছুটতে ছুটতে হঠাত্ একটি গর্তের ভিতর পড়ে যায় এবং দুষ্কৃতকারীদের দলটি বেলায়েতের ভাতিজাকে টেটা, বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা হরে। তারও ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং এক অজানা আশংকায় দুরু দুরু বুকে তিনি কক্ষ থেকে বের হয়ে বারান্দায় এলেন। অতঃপর বেলায়েত বললেন, “ঠিক আছে রুমে যেয়ে শুয়ে পড়-স্বপ্ন স্বপ্নই।” আমি তখন আমার রুমে ঢুকে কাত হয়ে দরজার দিকে পিছন ফিরে বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করছি। ভোর হতে বেশি দেরি নেই। হঠাত্ দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন লিডার মোজাফ্ফর। “রেজা তাড়াতাড়ি উঠো”। ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে দেখি মোজাফ্ফর ওর গালের একপাশে শেভিং ক্রিমের ফেনা এবং হাতে ধরা শেভিং ব্রাশ। জিজ্ঞেস করলাম— “কি ব্যাপার স্যার?”— উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন “রেডিও অন কর, বঙ্গবন্ধুকে নাকি ওরা মেরে ফেলেছে।” আমি একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে রেডিও অন করতেই ভেসে আসলো ডালিমের কণ্ঠস্বর— “আমি মেজর ডালিম বলছি— শেখ মুজিবকে হত্যা.....।” লিডার মোজাফ্ফর বললেন, সকাল সকাল তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভোর হতে বেশি দেরি নেই। পিটি’র জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। টয়লেটের কাজ সেরে শেভিং প্রস্তুতি। গালের একপাশে শেভিং ব্রাশ চালাতেই ঢাকা হেডকোয়ার্টার থেকে ফোন পেয়ে রেডিও অন করেন। শুনলেন ডালিমের কণ্ঠ। ছুটে এলেন আমার রুমে। তাড়াতাড়ি ট্রুপস ফল-ইন করানোর নির্দেশ দিয়ে লিডার মোজাফ্ফর তাঁর রুমে চলে গেলেন। আমি রুমের বাইরে এসে একজন এসিস্ট্যান্ট লিডার (সার্জেন্ট) এর মাধ্যমে ব্যারাকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে পোশাক পরে মাঠের দিকে গেলাম। মাঠে পৌঁছে দেখি সকলের চোখ ছলছল—লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে ওরা নির্দেশের জন্য। লিডার মোজাফ্ফরসহ সকল অফিসার মাঠে উপস্থিত হলেন। ঐ সময়ে আমরা সবাই ছিলাম বাংলাদেশ জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ৬ষ্ঠ ব্যাটালিয়নের অফিসার এবং আমাদের অবস্থান ছিল খুলনা জোনে। গিলাতলায় ছিল খুলনা জোনাল হেডকোয়ার্টার। লিডার মোজাফ্ফর ছিলেন জোনাল এডজুট্যান্ট, লিডার বেলায়েত ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাষ্টার। কোম্পানী কমান্ডার এর দায়িত্বে ছিলেন লিডার নীতিভূষণ সাহা, লিডার কামাল, লিডার হাফিজ (যিনি প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টে থাকাকালীন ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা দায়িত্ব পালনকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে (জিয়াউর রহমানের সাথে নিহত হয়) এবং স্বয়ং আমি। লিডার নীতিভূষণ সাহা সুন্দরবনে শরণখোলা এবং লিডার হাফিজ ছিলেন বাগেরহাট। আমি প্রায় ১০ মাস সুন্দরবনে চাঁদপাই ফরেস্ট রেঞ্জ (মংলা পোর্টের কাছে), নলিয়ানালা এবং বুড়িগোয়ালীনি অঞ্চলে দায়িত্ব পালন শেষে জোনাল হেডকোয়ার্টার খুলনায় আমার কোম্পানী সমেত ফিরে আসি। লিডার শাহাদাত (পরবর্তীতে মেজর হিসাবে অবসরপ্রাপ্ত) আমাকে রি-প্লেইস করেন। অপরদিকে লিডার আনোয়ারের নেতৃত্বে রক্ষীবাহিনীর ১৪ ব্যাটালিয়নও খুলনা জোনে আমাদের সাথে যোগ দেয়। একটি উঁচু টুলের উপর দাঁড়িয়ে সৈনিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখার সময় দেখেছি অনেকে চোখ মুছছেন এবং অনেকেই সটান সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সৈনিকদের যখন জিজ্ঞাসা করলাম— “যে দেশে জাতির জনককে হত্যা করা হয়, সে দেশে আমাদের কি বেঁচে থাকার কোন অধিকার আছে?” পুরো মাঠ যেন একসাথে গর্জে উঠলো— “না।” “তোমরা কি মরতে প্রস্তুত?” অত্যন্ত স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ কণ্ঠে সকলের সমস্বঃর উত্তর— “প্রস্তুত স্যার।” অতঃপর সেনাদের মাঝে অস্ত্র বণ্টন করে প্রথমত আমাদের এরিয়ার নিরাপত্তা জোরদার করি এবং WIRELESS-এর মাধ্যমে অন্যান্য স্থানে যোগাযোগের চেষ্টা করি। আমাদের মূল টার্গেট ঢাকা অভিমুখে মার্চ করা। অনেক চেষ্টার পর ঢাকার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো। ঢাকা থেকে বলা হলো— “বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন— But who is the next leader? আমরা তো এমন কোন নেতা খুঁজে পাচ্ছি না যার নেতৃত্বে আমরা মাঠে নামবো।” যাহোক ঢাকা হেডকোয়ার্টারকে আমরা আমাদের প্রস্তুতির কথা জানালাম। তখন আমাদেরকে বলা হলো— “ঠিক আছে প্রস্তুতি নিয়ে রাখ। But আমাদের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত হুট করে কোন সিদ্ধান্ত নিবে না। আর Continuously ঢাকা বেতার শুনতে থাক।” লিডার মোজাফ্ফর কিছুসংখ্যক ট্রুপসসহ শহরের পরিস্থিতি দেখার জন্য বের হয়। যাওয়ার পূর্বে আমাকে কয়েকটা বিপদ সংকেত বুঝিয়ে দিয়ে যায় এবং সংকেত মোতাবেক যেখানেই তিনি যাচ্ছেন সেখান থেকেই আমাকে ফোন করছেন। খুলনা শহরে খোঁজ করে কোথাও স্থানীয় কোন সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। সংসদ সদস্য জনাব বাবর আলীকে ঐ সময়ে অনেকেই খুলনা অঞ্চলে বঙ্গবন্ধুর ডান হাত বলে মনে করতেন। সুন্দরবন এবং সুন্দরবনের আশ পাশ অঞ্চলে দুষ্কৃতকারী নির্মূল অভিযানের সময় জনাব বাবর আলী, এম, পি সাহেবের কয়েকজন ক্যাডারকে সন্দেহবশত গ্রেফতার করার পর্যায়ে তার (বাবর আলী) সাথে আমার পরিচয় হয়; কিন্তু ১৫ আগস্টের সেই দুর্দিনে তাকেও আমরা খুঁজে পাইনি। পরবর্তীতে (প্রায় ৮/৯ বছর পর) কারাগার থেকে জেনেছিলাম জনাব বাবর আলী জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেছেন। আমরা সর্বপ্রথম খুলনা বেতার কেন্দ্রে আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করি এবং বাগেরহাটে লিডার হাফিজ, সুন্দরবনে লিডার নীতিভূষণ সাহাকে WIRELESS-এর মাধ্যমে মংলা পোর্টসহ সুন্দরবন এলাকা এবং বাগেরহাট ইত্যাদি যেকোন মুহূর্তে নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য Stand by থাকতে Massage প্রেরণ ও কনফার্ম করি। এতদ্ব্যতীত, কুষ্টিয়া থেকে ফরিদপুর, বরিশাল পর্যন্ত রক্ষীবাহিনীর সব ব্যাটালিয়ন ঢাকা অভিমুখে মার্চ করার জন্য হেড কোয়ার্টারের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। লিডার মোজাফ্ফর যখন বাহিরে ঠিক তখনি যশোর ব্রিগেডের তত্কালীন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী বীর উত্তম (অবসর প্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল) ফোন করেন। আমি ফোন রিসিভ করি। তিনি প্রথমে মোজাফ্ফরকে খুঁজলেন। আমি বললাম সে বাহিরে। আমরা কি করছি জিজ্ঞেস করতেই আমি বললাম আমাদের প্রস্তুতির কথা। সাথে এও বললাম যে, বাহির থেকে কেউ আমাদের এরিয়াতে ঢুকতে চেষ্টা করলে আমরা গুলি করবো। ব্রিগেডিয়ার শওকত তখন বললেন— “ঠিক আছে, আমি আমার সেনাদের ওদিকে পাঠাচ্ছি না। তবে এই সুযোগে Miscreant রা আর্মির ইউনিফর্ম পড়ে তোমাদের ওখানে হামলা করে একটা গোলমাল বাঁধানোর চেষ্টা করতে পারে। তোমরা অবশ্যই তখন গুলি করবে।” তিনি এও বললেন যে, তারাও নাকি কিছুই বুঝতে পারছেন না। তবে সেনাসদরের নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন। লিডার মোজাফ্ফর ক্যাম্পে ফিরে এলো। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হলো এভাবে— আমরা খুলনা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে ঘোষণা দেব যে, আমরা ঢাকার দিকে মার্চ করছি এবং সকল অনুগত বাহিনীকে ঢাকার দিকে মার্চ করার আহ্বান জানিয়ে আমরা সরাসরি ঢাকা অভিমুখে রওয়ানা হবো। প্রস্তুতি নিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি হেড কোয়ার্টারের নির্দেশের জন্য। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে; কিন্তু কোন নির্দেশ পাচ্ছি না। মোজাফ্ফর আমাকে বললেন— “যদি ঢাকার নির্দেশ না পাওয়া যায় তাহলে চলো আমাদের ২টি ব্যাটালিয়ন (৬ এবং ১৪ রক্ষী ব্যাটালিয়ন) নিয়ে আমরা সুন্দরবনে চলে যাই এবং আরো একটি মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনে ’৭১-এর মতো পুনরায় ভারতে চলে যাব।” আমি তার প্রস্তাবে সম্মতি দিলাম। ঢাকা হেড কোয়ার্টার থেকে তখনো বলা হচ্ছে প্রস্তুত থাক, নির্দেশ আসবে, রেডিও শুনো ইত্যাদি। মোজাফ্ফর আবারো বাইরে বের হলো। আমি Defence লাইন চেক করে অফিসার মেসে টেলিফোনের পাশে বসে আছি। রেডিও একটু ঘোরাতেই (এতদিন পর ঠিক মনে করতে পারছি না) সম্ভবত আকাশবাণী কলকাতা অথবা আগরতলা রেডিও স্টেশন থেকে শ্যামল মিত্রের গাওয়া “তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ভরা— কে বলে আজ তুমি নেই— তুমি আছ মন বলে তাই— ” গানটি বেজে উঠলো। সাথে সাথে বুক ফেটে কান্না এলো। হঠাত্ টেলিফোন বেজে উঠলে রিসিভার তুলতেই মোজাফফর এর কণ্ঠ। সে ঐ মুহূর্তে খুলনা শহরে অবস্থানরত সেনবাহিনীর একমাত্র ক্যাম্পে বসে ওদের সাথে আলোচনা করছে। নতুন কোন ম্যাসেজ আছে কিনা জানতে চাইলো। আসলে এসব ছিল আমাদের দু’জনার মধ্যে সংকেত বিনিময়। যখনই কোন বিপদ আসবে তখনই সে ম্যাসেজ দিবে যে আমি এখানে আছি এবং খুব ভাল আছি, Dont worry অর্থাত্ সে ভাল নেই বিপদে আছে— সাথে সাথে আমরা ঐ স্থানে hit করব তাকে rescue করতে। আর কোন সমস্যা না হলে অন্যান্য কথা বলে তার অবস্থানের খবর জানাবে। টেলিফোন ছেড়ে চোখ বুঁজে বসে আছি— মনে পড়ে গেল আগরতলা মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দিনের ঘটনা। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের লাশ নিয়ে যেদিন মিছিল করেছিলাম সেদিন থেকে প্রায় প্রতিদিন সকাল বিকাল মিছিল, মিটিং, কারফিউ ইত্যাদি লেগেই ছিল। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দিনেও সকালে মিছিল করেছি। মিছিল শেষে বাসায় ফিরে দুপুরে ভাত খেতে বসেছি তখন বাবা ফিরলেন অফিস থেকে। আমাদের বাসা তখন ছিল আগারগাঁও (বর্তমান বিজ্ঞান যাদুঘরের পাশে)। বাবা ঘরে ঢুকে আমাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন— “কি ব্যাপার তুই এখন বাসায়?” মা বললেন— “এই সময়ে বাসায় থাকবে না তো কোথায় থাকবে?” বাবা তখন হেসে বললেন— “শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়েছে, সমস্ত মানুষ এখন তার বাড়ির দিকে ছুটছে আর আমার রাজপথের ছেলে কিনা এখনো ঘরে।” আনন্দ যেন আমার আর ধরে না। খাবার বাদ দিয়ে উঠে গেলাম। মা বললেন— “খাবার শেষ করে যা।” আমি হাত ধুয়ে ছুট দিলাম। ৩২ নম্বরের মাথায় বাস থেকে নেমে পড়লাম। প্রচুর ভিড়, সামনে যাওয়ার রাস্তা নেই। অনেক কষ্ট করে ভিড় ঠেলে ঠেলে এগুচ্ছি নেতার কাছে যেতেই হবে। গেইটের কাছাকাছি আসতেই আমার পরিচিত একটি ফ্যামিলিকে দেখলাম বঙ্গবন্ধুর দোতলায়। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। কারণ এরা সবসময় আমাদের বিরোধী শিবিরে কাজ করেছে। ফাতেমা জিন্নাহ এবং আইয়ুব খানের নির্বাচনে আমাদের পাড়ার মাত্র ২টি ফ্যামিলি ব্যতীত সবাই আইয়ুবের বিরুদ্ধে ফাতেমা জিন্নাহর হারিকেন মার্কাকে সমর্থন করলেও এরা আইয়ুব খানের গোলাপ ফুল মার্কাকে সমর্থন করেছিল। ঐ দুই ফ্যামিলির একটিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে দেখে চমকে উঠেছিলাম সেদিন। গেট বন্ধ— ভিতরে যেতে পারছিনা। ঠিক সে সময় কয়েকজন ছাত্র নেতাকে নিয়ে একটি পিক-আপ গাড়ি হর্ন বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসে। আমাকে দেখে ছাত্র নেতা রেজা শাহজাহান হাত বাড়িয়ে দিতেই আমি ওর হাত ধরে এক লাফে পিক-আপে উঠে পড়লাম। গাড়িটি গেটে আসতেই গেট খুলে গেল এবং ভিতরে ঢুকার পর আমি গাড়ি থেকে একলাফে নেমেই সিঁড়ি বেয়ে দু’তলার দিকে ছুট দেই। সিঁড়িপথে দেখা হলো তত্কালীন ছাত্র নেতা সিরাজ-উল-আলম খানের সাথে। সিরাজ ভাই আমায় জিজ্ঞেস করলেন— “মুজিব ভাই এর সাথে দেখা হয়েছে?” আমি বললাম, “না”। সাথে সাথে তিনি আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন উপরে একেবারে বঙ্গবন্ধুর সামনে। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন—“আমাদের একজন ত্যাগী ও সাহসী young কর্মী।” উল্লেখ্য, যদিও আমি তখন ডিগ্রীর ছাত্র ছিলাম কিন্তু সে তুলনায় আমার বয়স অনেক কম দেখাতো। বঙ্গবন্ধু এক হেঁচকা টানে আমাকে তার মহাসমুদ্রের মত বক্ষে তুলে নিলেন। সে কি নরম ও তুলতুলে তাঁর বুক- আজো আমি ভুলতে পারি না। মনে হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর ঐ বক্ষে রয়েছে বাঙালি জাতির পরম নির্ভরশীল একমাত্র আশ্রয়। মোজাফ্ফর এর ডাকে সম্বিত্ ফিরে পেলাম। কখন থেকে যে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিল বলতে পারবো না। চোখ মুছে মোজাফ্ফর এর দিকে ফিরলাম। বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে তাকে। হেডকোয়ার্টার থেকে কোন নির্দেশ পাচ্ছি না। কোন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সংগঠনকেও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে হত্যাকারীদের নির্মূল করার অভিপ্রায়ে কোন বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। বরং খুনি মুশতাকের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রী পরিষদ গঠন এবং আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতার ঐ মন্ত্রী পরিষদের যোগদান পুরো জাতিকে হতাশ করলো। সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী প্রধানগণ একে একে ঐ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলো। এরপর পুলিশ, বিডিআর, আনসার এবং সর্বশেষে রক্ষীবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক জনাব হাসান সাহেবও মুশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেয়া হলো না। ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান দেশে ফিরলেন। সেনাবাহিনীর সাথে একীভূত করা হলো আমাদেরকে। ইউনিফর্ম পরিবর্তন এবং নতুন শপথ— “আমি আমার দেশ, জাতি ও সরকারের প্রতি অনুগত থাকব।”