পাঁচ বছর পরও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত পলাতক অজানা চার আসামির অবস্থান। আর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অবস্থানকারী দুই খুনির অবস্থান নিশ্চিত হলেও আইনি জটিলতায় আটকে আছে তাদের দেশে আনার প্রক্রিয়া।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ৫ জনের রায় কার্যকর হয়েছে। জিম্বাবুয়েতে পলাতক অবস্থায় মারা যায় একজন। পলাতক রয়েছেন ৬ জন। তারা হলেন- লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) এম এইচ বি নূর চৌধুরী, কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশিদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম, ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন। এদের মধ্যে কানাডায় অবস্থান করছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এম এইচ বি নূর চৌধুরী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে আছেন কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ঐ দুই দেশের সক্রিয় কূটনৈতিক সাড়া মেলেনি।
বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনতে ২০০৯ সালে আইন মন্ত্রীকে প্রধান করে গঠন করা হয় আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স। পলাতক খুনিদের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়। জারি করা হয় ইন্টারপোলের রেড এলার্ট। পাশপাশি বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয় খুনিদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের; কিন্তু কোন চেষ্টাই সফল হয়নি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ছয় আসামির মধ্যে চার জনের অবস্থান পাঁচ বছরেও জানতে পারেনি আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স।
এ দিকে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা সংক্রান্ত অগ্রগতি সম্পর্কে টাস্কফোর্স প্রধান আইন মন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
টাস্কফোর্স সূত্র জানায়, অবস্থান নিশ্চিত হওয়া কানাডায় অবস্থানকারী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এম এইচ বি নূর চৌধুরী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে থাকা কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে এখনো সক্রিয় কূটনৈতিক সারা মেলেনি। তাছাড়া কানাডায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকায় নূর চৌধুরীকে হস্তান্তরে দেশটি আগ্রহী নয়। এ নিয়ে আইনি লড়াই চলছে। অপর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্দী বিনিময় চুক্তি না থাকায় রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে সমস্যা হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, পলাতক অপর চারজনের মধ্যে আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন ভারতে অবস্থান করছে বলে শোনা গিয়েছিল। এ নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধানও চালানো হয়। বহু চেষ্টা করেও তাদের অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিদেশে অবস্থানরত ছয় খুনিকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কূটনৈতিক উদ্যোগে কোন শৈথিল্য নেই। পুরো প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চলছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ ইতিমধ্যে অনেক কাজ হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। পরবর্তীতে ইনডেমনিটি আইনের মাধ্যমে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর ওই বছরের ২ অক্টোবর সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দায়ে ২৩ জনকে আসামি করে ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করা হয়। সরকার ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার দায়রা জজ গোলাম রসুল বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ে ১৫ জনকে ফাঁসির আদেশ দেন। ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে থাকা ৫ আসামি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর আপিল বিভাগের রায়ে নাকচ হয়ে যায় আসামিদের আপিল। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি রায়ের রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে ওইদিন রাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৫ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়। যে পাঁচ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তারা হলেন- লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) মহিউদ্দিন (আর্টিলারি) এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ। আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে পলাতক অবস্থায় মারা যান আজিজ পাশা।
