শ্রেণীকক্ষে অনুপস্থিত থাকা, দেরিতে উপস্থিত হওয়া কিংবা শ্রেণীকক্ষে উপস্থিত হয়ে ছুটি নিয়ে বের হয়ে গেলে দিনশেষে এ তথ্য কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে অভিভাবকের মুঠোফোনে ক্ষুদেবার্তা আকারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মাসিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরও অভিভাবকের জানিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া বাছাইকৃত মেধাবী শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতনতা, কলেজের কঠোর নিয়ম-কানুনই রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ধারাবাহিক সাফল্যের নেপথ্য কারণ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজউক কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে এসব জানা গেছে।
১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত উত্তরার ৬ নং সেক্টর আজমপুরে অবস্থিত এই কলেজে প্রথমদিকে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে অভিভাকগণ ছিলেন অনাগ্রহী। সঠিক শিক্ষাপদ্ধতি আর কঠোর নিয়ম-কানুন পালনের কারণে প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরেই অবস্থান করে নেয় সেরা বিশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। অভিভাবক ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের কৌতূহল ও আগ্রহ বাড়তে থাকে। শিক্ষাবোর্ড ফলাফলের দিক দিয়ে সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে সাজিয়ে নির্ধারণ করে দেয় পাঁচটি মানদন্ড। এগুলো হলো-নিবন্ধিত প্রার্থীদের মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থীর শতকরা হার, শতকরা পাসের হার, মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও প্রতিষ্ঠানের গড় জিপিএ। এ মানদন্ড বিচারে ২০১১ সালে রাজউক কলেজ সারাদেশে প্রথম স্থান অধিকার করে। এরপর ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রেখেছে উত্তরার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।
শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান
শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত পাঁচটি মানদন্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করতে কলেজ কর্তৃপক্ষ শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করে থাকে। কলেজের (ইংরেজি মাধ্যম) একাদশ শ্রেণীর বাংলা বিভাগের শিক্ষক আছিয়া খানম বললেন, আমরা শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করে থাকি। কোন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে-অনুপস্থিতির কারণ জানতে চেয়ে অভিভাবকদের কলেজে সাক্ষাতের জন্য ডাকা হয়। শিক্ষার্থীরা কিভাবে পড়তে চায়, কিভাবে পড়ালে তারা উপকৃত হবে তা আমরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ জেনে নিয়ে পাঠদান দিয়ে থাকি।
শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করেই আমি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে পাঠদান শুরু করি, জানালেন হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আফরোজা আ্ক্তার। তিনি বলেন, আমি শ্রেণীকক্ষে ৭০ শতাংশ পড়া শেষ করি। ক্লাস শেষ হওয়ার ১০ মিনিট পূর্বে তারা পড়া বুঝেছে কিনা তা সবার কাছে জানতে চাই এবং প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন আদায় করি। মাসিক পরীক্ষাশেষে কম নম্বর প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদেরকে বাছাই করে তাদের জন্য পরবর্তীতে আলাদা বিশেষ ক্লাস নেয়া হয়ে থাকে বলে তিনি জানান। শ্রেণীকক্ষে প্রবেশের পূর্বে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিটি শিক্ষক ক্লাস নিয়ে থাকেন।
বাছাইকৃত মেধাবী শিক্ষার্থী
ফাহাদ বিন ফয়েজ ও এসএম মজিবুর রহমান সায়মন দু’জনেই রাজউক কলেজের শিক্ষার্থী। ওরা এবার অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এসএসসি পরীক্ষাতেও ওরা জিপিএ-৫ পেয়েছিল। কলেজে মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাই করে সুষ্ঠু ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়ে থাকে। ফাহাদ ও সায়মন বললো, আমাদের প্রত্যেককে ক্লাসের পড়া পড়ে আসতে হয়। শিক্ষক সবাইকে পড়া ধরেন। পড়া না পারলে আমাদের অভিভাকদের কাছে অভিযোগ দেয়া হয় বলে তারা জানায়।
অভিভাবকদের সচেতনতা
সাফল্যের ধারাবাহিকতার অন্যতম কারণ রাজউক কলেজে অভিভাবক-শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ত্রিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা। সন্তান কলেজে কেমন পড়াশোনা করছে তা ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে জানানোর কারণে অভিভাবকগণ সচেতন থাকেন। কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে একবার অভিভাবক-শিক্ষক মতবিনিময় সভা ডাকা হয়। সভায় দুবর্্ল শিক্ষার্থীদের জন্য বাসায় ঠিকমত পরিচর্যা নেয়া হয়ে থাকে কিনা, দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা আলোচনা করা হয়, দেয়া হয় পরামর্শ। মুঠোফোনে সন্তানের পড়ালেখার অবস্থা জানতে পেরে বাড়িতে তাদের যত্ন নেয়া আমাদের জন্য অনেকটা সহজ হয় বলে জানান অভিভাবক এমএম আকাশ। তিনি বলেন, আমার মেয়ে বৃষ্টি এবার বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে যদি কখনও ক্লাসে দেরিতে উপস্থিত হ’ত বা কোন বিষয়ে কম নম্বর পেত সাথে সাথে আমার মোবাইলে এসএমএস চলে আসত।
কলেজের তৃতীয় তলার পশ্চিম কর্নারে রয়েছে স্মার্ট এডু ডট ইনফো নামে একটি বিভাগ। এখান থেকেই শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সাথে মুঠোফোনে ত্রিমুখী যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিভাগের নারী কর্মকর্তা শর্মী ইসলাম জানান, প্রতিদিন ক্লাস চলাকালে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা চলে আসে। দিনশেষে আমি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তথ্য তাদের অভিভাকগণের নিকট পাঠিয়ে থাকি। কলেজের যেকোন বিজ্ঞপ্তি মুঠোফোনে ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে জানানো হয়ে থাকে।
কলেজ প্রধানের তত্পরতা
কলেজে প্রতিটি শ্রেণীকক্ষে পাঠদান হচ্ছে কিনা, শিক্ষক ঠিকমত পৌঁছেছেন কিনা, শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে কতটুকু মনোযোগ এসব বিষয় নিজ চোখে দেখতে দিনে দু’বার পুরো কলেজ প্রদক্ষিণ করেন অত্র প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার ইমামুল হুদা। আবার কোনদিন হঠাত্ করেই কোন শ্রেণীকক্ষে ঢুকে পড়েন শিক্ষার্থীদের অবস্থা জানতে। পর পর চারবার দেশসেরা এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইমামুল হুদা জানান, আমি চেয়ারে বসে থাকবো আর শিক্ষক শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে অবস্থান করবে এটি হতে পারে না। শ্রেণীকক্ষ পরিদর্শন এটি আমার কাজেরই একটি অংশ। তিনি আরো বলেন, এবার ৯৫ ভাগ জিপিএ-৫ পেয়ে সারাদেশে প্রথম হয়েছে। আগামীতে কিভাবে শতভাগ জিপিএ-৫ দেশসেরা হওয়া যায় তার জন্য শিক্ষকদেরকে নির্দেশনা আর শিক্ষার্থীদেরকে উত্সাহ দেয়া হয়েছে।
