সংস্কৃতির বন্ধনই বাংলাদেশ ভারতের প্রধান সেতুবন্ধ

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪১
ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ককে স্থায়ী ভিত্তি দিতে সাংস্কৃতিক বন্ধনকে দৃঢ় করাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করেন দেশের শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা। তারা বলছেন, রাজনৈতিক সমঝোতা খুব জরুরি তবে মানুষে- মানুষে সম্পর্ক আরো বেশি প্রয়োজন। কেননা, ভারত-বাংলাদেশের মাঝে প্রধান সেতুবন্ধ রচনা করে চলেছে দু’ দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক বন্ধন। সংস্কৃতিজনরা বলছেন, দু’ দেশের মানুষের মাঝে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে ভারতের জনগণ বুঝতে পারবে বাংলাদেশের নদীগুলো শুকিয়ে গেলে এদেশের মানুষের কী পরিমাণ দুঃখ-কষ্ট পোহাতে হয়। রাজনৈতিক বিরোধ থাকলে এই উপলব্ধি করানো কঠিন। বরং সমপ্রীতি, সহমর্মিতা থাকলেই এটা সম্ভব। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বন্ধু হিসাবে পাশে দাঁড়ানোয় বাংলাদেশের জনগণের কাছে ভারত রাষ্ট্র পরম মিত্র হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে সবসময়। তবে ভারত ও বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকা এবং না থাকা নিয়ে রাজনীতি হয়ে এসেছে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। এরপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ রাজনীতি নতুন মাত্রায় শুরু হয়। কিন্তু রাজনৈতিক এসব কূটচালের বাইরে গিয়ে দুই দেশের সরকার প্রতিবেশী দেশের মানুষের মাঝে সম্পর্ক সৃষ্টিতে সবসময় সচেষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রথম সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিতে উল্লেখ ছিল দু’ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পকলা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে দু’ দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমপ্রীতি বজায় রাখা হবে এবং পারস্পরিক উন্নয়নে দু’ দেশেই সমভাবে সহযোগিতামূলক আচরণ করবে। সেইসাথে দু’ দেশের শিক্ষক, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, শিল্পী ও কলাকুশলী আদান প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে নিয়মিতভাবে। দুই দেশের সরকার নিয়মিতভাবেই পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে এই কার্যক্রম চালিয়ে আসছে গত ৪২ বছর ধরে। এর আওতায় দুই দেশের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, শিক্ষা সফরসহ নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা হয়ে আসছে। বাংলাদেশে ভারত সরকার ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে শুরু থেকেই এসব কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বাইরেও সাংস্কৃতিক দলগুলো এ সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ দুই রাজ্যের বাইরে ভারতবর্ষের মানুষের বাংলাদেশ সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। সেই জায়গায় আমাদের অনেক কাজ করবার রয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মত কলকাতা, লন্ডন ও নিউইয়র্কে খুব দ্রুতই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চালু করতে যাচ্ছে। প্রতিটি দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, সেটা হয় সেদেশের বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য। সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থাকলে সেই দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তিনি জানান, রবীন্দ্র সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীর পরে সরকারিভাবে তেমন কোন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়নি। তবে বেশকিছু কার্যক্রম পরিকল্পনায় রয়েছে। এদিকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাস ‘ভারত বিচিত্রা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে আসছে। এ পত্রিকায় দু’ দেশের কবি-সাহিত্যিকদের লেখা প্রকাশের মাধ্যমে যেমন শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সেতুবন্ধ সৃষ্টির প্রয়াস রয়েছে, তেমনি দু’টি দেশের মানুষ, ভূ-প্রকৃতি, দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা তুলে ধরার মাধ্যমে মানুষের মাঝে দু’টি দেশকে পরিচিত করে তুলবার চেষ্টাও রয়েছে। কবি বেলাল চৌধুরী যখন এ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন সে সময় ‘ভারত-বিচিত্রা’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমান সম্পাদক নান্টু রায় পত্রিকাটিকে আরো দৃষ্টিনন্দন ও বিষয়-বৈচিত্র্যে সাজিয়ে তুলেছেন। পত্রিকাটি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। যার প্রচার সংখ্যা ২০ হাজার। সম্প্রতি পত্রিকাটির অনলাইন ভার্সনও চালু করা হয়েছে। এছাড়া ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মাধ্যমেও বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাস দু’ দেশের শিল্পীদের কনসার্টের আয়োজন করে চলেছে নিয়মিতভাবে। এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি শিল্পীরাই বেশি প্রধান্য পেয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় দূতাবাসের কাউন্সিলর (পলিটিক্যাল ও ইনফরমেশন) সুজিত ঘোষ বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মৈত্রীর বন্ধনকে দৃঢ় করতে আমাদের এই সব উদ্যোগ একেকটি প্লাটফর্ম। যা দু’টি দেশের মানুষের মাঝে বন্ধুত্বের বন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমে সুন্দর ভবিষ্যতের পথ রচনা করবে। এ কথা সবারই জানা, বর্তমানের বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান এক সময় অবিভক্ত ভারতের অংশ ছিল। গত ৬৭ বছরে এই উপমহাদেশ রাজনৈতিক নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে পাল্টে গেছে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান, সীমানা। মানচিত্র বদলে গেলেও মানুষের জীবন যাত্রা ও তার সংস্কৃতি এত দ্রুত পাল্টায় না। কেননা একই প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি বা কয়েকটি জাতির সংস্কৃতি, রীতি-নীতি গড়ে ওঠে শত শত বছর ধরে। তার মধ্যে মিলও থাকে প্রচুর। তাই রাষ্ট্রের সীমানা নতুনভাবে গঠিত হলেও সংস্কৃতির বদল হয় না। তা প্রবহমান থাকে যুগ যুগ ধরে। বাংলাদেশ ও ভারত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা প্রযোজ্য। এ দু’দেশের রাজনৈতিক ও ভৌগলিক সীমানা আলাদা হলেও দুইদেশের মানুষের যে সাংস্কৃতিক বন্ধন তা বদলায়নি। বাংলাদেশের মানুষের মতই পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরার মানুষেরাও বাংলা ভাষাতেই কথা বলেন। ১৯৪৭ সালে ধর্মকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হয়ে যায়। পাকিস্তানও দু’টি অংশে বিভক্ত ছিল। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থ্যাত্ বাংলাদেশের মানুষদের ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরের বছর থেকেই নিজেদের ভূখণ্ডের মানুষদের অধিকার ও সংস্কৃতি সমুন্নত রাখার সংগ্রামে নামতে হয়। এরই পথ ধরে আসে ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের পরম বন্ধু হিসাবে পাশে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গে এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া, মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সর্বাত্মক সহায়তা, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনায় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান এবং মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে ভারতীয় সৈন্যদের সহায়তা যুদ্ধে জয়লাভকে ত্বরান্বিত করেছিল। প্রফেসর এমিরেটাস আনিসুজ্জামান বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিরাজমান সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পূর্ণতা লাভের আশা প্রকাশ করে বলেন, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা ক্ষেত্রে ভারত যতটুকু অগ্রসর হয়েছে বাংলাদেশ এখনো তা করতে পারেনি। আশা করি, দু’দেশের নানামুখী তত্পরতার মধ্যে দিয়ে সম্পর্ক দৃঢ়তর হবে এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় আরো পরিণতি লাভ করবে। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বললেন, সরকারের মধ্যে সম্পর্কের পাশাপাশি মানুষে মানুষে সম্পর্কের বন্ধন জরুরি। সংস্কৃতির শক্তিই পারে সে বন্ধনকে দৃঢ় করতে। ভারতীয় দূতাবাস এ বিষয়ে সবসময় সহযোগিতা করে চলেছে। বাংলাদেশ সরকারকেও বিদেশি শিল্পীদের আনার বিষয়ে নিয়মের বেড়াজাল শিথিল করার দাবি জানান তিনি। রামেন্দু মজুমদার বলেন, ভারত সরকার বাংলাদেশে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে ‘ভারত বিচিত্রা’ প্রকাশ, ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মাধ্যমে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশ সরকারও ভারতে এ ধরনের কার্যক্রম হাতে নিলে তা ভারতের মানুষের মাঝে বাংলাদেশকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন প্রাবন্ধিক হায়াত্ মামুদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারত মানে তো পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা। অর্থাত্ ভারতে বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষেরা যেখানে বাস করে সেইসব স্থান সম্পর্কেই আগ্রহ। দিল্লিতে কি হলো এ নিয়ে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। সুতরাং এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে সুসম্পর্ককে বাড়াতে হবে। দেশভাগ মানে তো সীমারেখার ভাগ, মানুষে মানুষে সম্পর্কের ভাগ নয়। এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে সম্পর্ক সবসময় ছিল। তবে নতুন প্রজন্মের মাঝে সেই সম্পর্কটাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। সেইখানে একটা চ্যালেঞ্জ রয়েই যায়। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, দু’দেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারা থাকলেও পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরেও এই দূরত্বকে রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করে, রাজনীতিবিদরা তা উস্কে দিয়ে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করেছেন। এই যে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি, তা অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। তবে এখন সে অবস্থা কাটতে শুরু করেছে। মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বেড়েছে। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানও বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, দু’দেশের মধ্যে বাধাহীন উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক যোগাযোগ স্থাপিত না হলে দু’দেশের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে যে অস্থিরতা ও অবিশ্বাস বিরাজ করছে তা দূর হবে না। দু’দেশের মধ্যে অবিশ্বাস দূর করে সমপ্রীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সংস্কৃতিই একমাত্র মাধ্যম। সরকারকে এ ব্যাপারে বিশেষভাবে উদ্যোগী হবার আহ্বান জানান তিনি। ভারতে বাংলাদেশের লেখকদের পুস্তক পাওয়া না পাওয়া সম্পর্কে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ভারতীয় পুস্তক বিক্রেতারা বাংলাদেশের বই সেখানে আমদানি করেন না। বাংলাদেশের পুস্তক বিক্রেতারা প্রচুর সংখ্যায় ভারতীয় বই আমদানি করেন। আবার বাংলাদেশে পুস্তক তস্করতাও অনেক হয়, যা ভারতে হয় না। এসব ক্ষেত্রে একটি সুস্থ বিনিময় ব্যবস্থা কাম্য। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন আরো বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বলয়টাকে উদার ও স্বচ্ছ করতে হবে। বাংলাদেশিরা অনেক উদারভাবে ভারতীয় লেখক শিল্পীদের গ্রহণ করে। পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের বইয়ের অনেক পাঠক এদেশে রয়েছে। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশের বই পাওয়া না যাওয়ায় বা কোন উদ্যোগ না নেয়ায় এক ধরনের দূরত্ব তো সৃষ্টি হয়েছেই। এই দূরত্ব কমাতে দুই দেশের সরকারি উদ্যোগে বই, চলচ্চিত্র প্রভৃতির আদান-প্রদানের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। ভারতের চ্যানেলগুলো যেমন বাংলাদেশে দেখা যায় তেমনিভাবে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোও ভারতে উন্মুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।