সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে গেল সোমার, সারা রাতই তার ঘুম হয়েছে ছাড়া ছাড়া। অফিসের চাপ, সিনিয়র অফিসারের নানা কারণে অগ্নিমূর্তি কিছুদিন হল তাকে ঘুমাতেও দিচ্ছে না। এদিকে তার মেয়ে তুলির পরীক্ষা চলছে। তুলি ক্লাস থ্রীতে পড়ে। ওকে সময় দিতে না পেরে প্রতিমুহূর্তে সে নিজের ভেতরে অপরাধবোধ অনুভব করছে। এসব সমস্যা ভুলতেই, ভোর পাঁচটায় বিছানা থেকে উঠে বাড়ির বারান্দায় গিয়ে বসল সোমা। চারদিক নিঝুম চুপচাপ। অফিসে দুই দিনের মধ্যে সোমাকে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। সেই কাজের প্রায় কিছুই করা হয়নি। সকাল ৯টা থেকে তার অফিস শুরু হয় । ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে যায়। বাড়ি এসে এরপর যদি সে সেই রিপোর্ট নিয়ে বসে তবে তার স্বামী-বাচ্চাসহ সবাই তার উপর খুব বিরক্ত ও রাগ হবে। বাবা ব্যস্ত সেটা তুলি জানে, কিন্তু অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে মার প্রতিটি সময়ই তার, সেটিই তুলির বিশ্বাস। সেই সময়ে মা হিসেবে সোমাও ওকে সময় না দিয়ে অন্য কিছু করার কথা ভাবতেও পারে না। এদিকে রিপোর্ট জমা দিতে না পারলে তার সিনিয়র অফিসার যে কি করবে তা সে কল্পনাও করতে চায় না। অফিসের মাসিক মিটিংয়ে সবাইকেই তাদের মাসিক কাজের রিপোর্ট দিতে হয়। মিটিংয়ে ম্যানেজার, ডেপুটি ম্যানেজারসহ সবাই উপস্থিত থাকে। সোমা তার রিপোর্ট তৈরী করতে পারেনি দেখে মিটিং এ সবার সামনে তাকে অপমানিত হতে হচ্ছে এবং ম্যানেজার সাহেব বলছে যে, এজন্যই মেয়েদের আমি চাকরি দিতে চাই না— এই স্বপ্ন দেখতে দেখতেই সোমার ঘুম এই কাকডাকা ভোরে ভেঙ্গে গিয়েছে।
সোমা চায় না তার এই দুঃস্বপ্ন সত্য হোক, কিন্তু সে কী করবে? তুলিকে পড়ানো, রান্নাবান্না করা, স্কুল থেকে আনা-নেয়া এসবই তার দায়িত্ব, সাথে সাথে ব্যাংকের চাকরি। তার স্বামীও চাকরিজীবী। ব্যাংকেরই কর্মকর্তা। তার জীবনে একটিই দায়িত্ব, সেটি হল নিজের চাকরি। বাড়ি এসেও তার চাকরিজীবন চলতে থাকে। তার মনের কথা স্বামীকে খুলে বলতে চাইলে স্বামীর পক্ষ থেকে দেখতে হয় নেতিবাচক মনোভাব। কখনও শুনতে হয়, এত খারাপ লাগলে ছেড়ে দাও চাকরি। কিন্তু অনার্স-মাস্টার্স করে সে নিজেকে এক গৃহে বন্দী করে রাখতে চায় না। পারিবারিক কাজের জন্য অফিসের কাজ যেন কখনও ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটিই সোমার চাওয়া। সোমা সবসময়ই চায় যেন তার কর্মক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় সে ভাল কর্মদক্ষতা দেখাতে পারে। কেননা তার কাজে সামান্য দুর্বলতা পেলে তার জন্য সম্পূর্ণ নারী জাতিকেই দোষারোপ করা হবে অফিসে। বলা হবে নারীরা কিছুই পারে না। যদিও কোন পুরুষ তার কাজ সম্পূর্ণ না করলে সে জন্য পুরুষজাতিকে দোষারোপ করা হয় না। তাই এই ভোররাতেই সোমা লেখা শুরু করে তার অফিসের প্রতিবেদন যখন সবাই ঘুমে। সকলের থেকে লুকিয়ে। মনে হতে থাকে যেন তার কাজ করাটাও এক অপরাধ।
শুধু সোমা নয় এধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয় কর্মজীবী প্রায় সকল নারীকেই। পরিবারে ও অফিস সব ক্ষেত্রে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে হলে প্রয়োজন স্বল্পসময়ে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা। চাকরি ও পারিবারিক জীবনকে স্বার্থক করতে মূলত যা করণীয় তা হল—
১. শুধুমাত্র গতানুগতিক কাজ না করে, উদ্ভাবনীমূলক চিন্তা করতে হবে ও তা বাস্তবায়নের লক্ষ্য থাকতে হবে। সব কাজকে কীভাবে আরও সহজ, সুন্দরভাবে করা যায়, কী কী নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে, সে বিষয়ে ভাবতে হবে । কোন ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা যেতে পারে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য, চিন্তা করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। পারিবারিক জীবনেও নতুন নতুন পরিকল্পনা করার মধ্য দিয়ে সন্তানকে ও পরিবারকে খুশি রাখা সম্ভব।
২. দলগত কাজে বিশ্বাস রাখতে হবে। সকল সহকর্মীকে প্রতিযোগী মনে না করে সকলে মিলে ভাল কাজ করার মধ্যদিয়ে কাজ সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করতে হবে। তবেই সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। সহকর্মীদের সমস্যায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে নিজের সমস্যায়ও সকলের সহযোগিতা পাওয়া যাবে। পারিবারিক জীবনেও সকল প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। সকলে মিলেমিশে থাকলে সন্তানের একাকীত্বও দূর হবে। ঈদ, জন্মদিনসহ নানা অনুষ্ঠানে সকলে মিলে আনন্দের মধ্যদিয়ে যান্ত্রিকতার বাইরে আনন্দময় সুরধারা প্রবেশের সুযোগ হবে। বিপদেও সকলের সহযোগিতা পাওয়া যাবে।
৩. যেমন পরিবার তেমনই প্রতিষ্ঠান। সবাই সব বিষয়ে দক্ষ নয়, তাই যে যে বিষয়ে দক্ষ সেক্ষেত্রে তার আগ্রহ প্রকাশ করতে হবে। আগ্রহের বিষয়ে কাজ করার মধ্যদিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। সবসময় ভাল পারদর্শিতা প্রদর্শনের জন্য সহকর্মীর প্রশংসা করতে হবে, যা কাজে উত্সাহ বৃদ্ধি করবে ও দলগত সাফল্য এনে দিবে।
৪. সবসময় নতুনকে আপন করে নিতে হবে। যে কোন প্রতিবেদন বা রিপোর্টের জন্য যথেষ্ট পড়াশোনা করতে হবে। কোন জ্ঞানই বৃথা যায় না। সব বিষয়ের জ্ঞান, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার পারদর্শিতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
৫. কর্মক্ষেত্রের সব ঘটনা ও সাফল্য-এর সাথে পরিবারকে সংযুক্ত করতে হবে। অফিসের নানা সমস্যা ও নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবারের সবার পরামর্শ ও নানা ক্ষেত্রে তাদের মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে। অফিসের সাথে পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে কর্মক্ষেত্রের সাথে পরিবারের একটি সম্পর্ক গড়ে উঠবে, যা কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারিবারিক সহযোগিতা নিশ্চিত করবে।
ছবি:সাইফুল ইসলাম ও সাফায়াত খান সাফু
