১৯৯২! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সম্মান প্রথম ব্যাচ! একঝাঁক তরুণ প্রাণ স্বপ্ন দেখেছিল... শিল্পী হবার। দু’চোখে তখন কেবলই স্বপ্নের দুরন্ত মায়াজাল... রঙের বর্ণাঢ্য উত্সরণ। শেষ হলো চারুপাঠ। সকলেই মালা হতে খসে পড়ল... কর্মের নিজস্ব ভুবনে, জীবনের নিয়মে, জীবনের গতিপথে। এভাবেই ছড়িয়ে যায় একটি ব্যাচ। অনেকদিন বাদে সহপাঠী বন্ধুরা যেন একই বৃন্তে মিলিত হলো সেই স্বপ্রাণ ঐশ্বর্যে যেখানে বিম্বিত শিল্পের বর্ণমালা। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর গ্যালারি-২-এ ‘প্রাণের মাঝে আয়’ শীর্ষক এক অনবদ্য প্রদর্শনী হয়ে গেল। ১৯৯২... অর্থাত্ ২১ বছর আগের সেই ফিরে দেখা দর্পণ যেন আবারও শিল্পের সূত্রে গাঁথল বন্ধুদের! এবারের প্রদর্শনীতে ৩৫ জন শিল্পী অংশ নিলেন, অনেকেই পেশাগত কারণে দেশের বাইরে আছেন। এই ব্যাচের অনেকেই স্বনামধন্য হয়েছেন শিল্পী হিসেবে, আবার অনেকেই শিল্পের নানা শাখায় স্বনামধন্য হয়েছেন, বলা যায় শিল্পের দর্শন ছড়িয়ে আছে জীবনের নানা আঙ্গিকে। আবার অনেকেই ছবি আঁঁকেন না, ব্যস্ত হয়ে গেছেন পেশাগত দায়িত্বে চারুকলার পাঠ কি তাদের মধ্যে বড়ো ধরনের পরিবর্তন আনেনি? শিল্পদর্শন, জীবনদর্শন... অথবা অন্তর্জগতে কতটা প্রভাব ফেলেছে? অথবা পাল্টে যাওয়া জীবনে শিল্পের নৈকট্য বা দূরত্বটাই বা কতটা? এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রদর্শনীটিতে। প্রদর্শনীটি উত্সর্গ করা হয়েছে অকাল প্রয়াত সহপাঠী বন্ধু ইমরানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।
অজস বৈচিত্র্যময় শিল্প ভাণ্ডারে খুঁজে পাওয়া গেল গভীর আবেগ ও রঙের সুর। আর সেই ছন্দে ছন্দ মেলালো আরেকটি প্রজন্ম। ১৯৯২ ব্যাচের বন্ধুদের সন্তানদের মধ্যে উত্সারিত শিল্পবোধ। সন্তানদের আঁকা ছবিগুলো যেন প্রদর্শনীতে এক বিশেষ মাত্রা ও প্রাণ সঞ্চার করেছে। প্রত্যেক শিল্পীর কাজেই ছিল নিজস্ব বিশেষত্ব। শিল্পী তাহসিনা শাহিন... স্বনামখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার তিনি। একান্ত জগতে তিনি নিমগ্ন থাকেন তার শিল্পচর্চায়। শিল্পী সত্তায় তাহসিনা শাহিন স্বাধীনতাপ্রিয়। তার পেইন্টিং-এর ভাষায় যুক্ত হয় রবীন্দ্রনাথের গান, বিমূর্ততা ও স্মৃতিকাতরতা। শিল্পী নাজিয়া আন্দালিব প্রিমার পেইন্টিং বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিল রঙের উচ্চকিত ব্যবহার ও ফর্মের প্রকাশে। নতুনত্ব ছিল, স্টেপিং মুডের জুতার প্রেজেন্টেশন। সময়ের অগ্রগামী শিল্পী যাত্রী রনি আহমেদ। তার পেইন্টিং-এর নিজস্ব ভাষার বলিষ্ঠতা ছিল স্বতন্ত্র-সত্তায় মুখর! নজর কেড়েছে সৌমিক দাসের ‘জিজ্ঞাসা’। তার ইন্সটলেশন ছিল এক বিশেষ প্রাপ্তি।
এছাড়াও তার ফটোগ্রাফি পেজেন্টেশন ছিল অনবদ্য। ধর্ম ও মানবতাবোধ নিয়ে তার জিজ্ঞাসা... সকলেরই অন্তর বোধে নাড়া দিয়ে যায়। সালমা বেগমের পটারী, রশীদ হাসানের উড কাট প্রিন্ট, নাজমুল আহসানের আই এ্যাম ইউ, নাসিমা আক্তারের ট্র্যাপেস্ট্রি... ‘ফ্লাওয়ার’, মোঃ আতিকুল ইসলামের পোর্ট্রেট স্টাডি, মোঃ আব্বাসউদ্দিনের ‘নৃত্যাগ্নি’। মেহেদি হাসানের ব্লু-নেট, মাসুমা সুলতানার নেচার, মাসুদ মিজানের ওয়াটার ফলসহ অন্যান্য শিল্পীর কাজগুলো ছিল অনবদ্য। শিল্পী বিবেকানন্দ রায়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পোর্ট্রেটটির মাধ্যম ছিল মাটির চাড়া। আর বিন্যাসটি ছিল অসাধারণ। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, আবেগ, শিল্প, স্মৃতিকাতরতার সম্মিলনে একটি প্রজন্মের শিল্পসত্তাকে খুঁজে পাওয়া গেল এক ভিন্ন প্রকাশে, রবীন্দ্রনাথের গানের ভিতর...‘আয় আরেকটিবার আয়রে সখা প্রাণের মাঝে আয়, পুরানো সেই দিনের কথা কি ভোলা যায়?’
