আরেক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে পাকিস্তান। এবার জঙ্গিদের হামলা বা হুমকি নয় বরং প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে বিরোধী দলগুলো। বিশেষ করে তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান ২০১৩ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত দেশটির সাধারণ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ যতক্ষণ না পদত্যাগ করবেন ততক্ষণ তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ১৪ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিন পাঞ্জাবের লাহোর থেকে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে ‘আজাদি মার্চ’ শুরু করেন ইমরান খান। শুক্রবার তাদের গাড়িবহর গুজরানওয়ালা শহরে পৌঁছলে সেখানে ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) নেতা-কর্মীরা আজাদি মার্চে জুতা ও ইটপাটকেল ছুঁড়ে মারেন। অভিযোগ উঠেছে, ইমরান খানের গাড়িবহরে গুলি চালানোর।
পরে তিনি অন্য রাস্তায় বুলেট প্রুফ গাড়িতে করে ইসলামাবাদের পথে যাত্রা করেন। সরকারের পদত্যাগের দাবিতে লাহোর থেকে রাজধানী অভিমুখে ‘ইনকিলাব মার্চ’ নামে একই ধরনের মার্চ করছে আধ্যাত্মিক নেতা তাহির-উল কাদরির পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক (পিএটি) দল। যার দল সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে জোট করেছে। কাদরি কানাডা থেকে পাকিস্তানে এসেছেন তার ইনকিলাব মার্চের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য। আজাদি মার্চ ও ইনকিলাব মার্চকে কেন্দ্র্র করে দুই দিন ধরে রাজধানী ইসলামাবাদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কিছু কিছু গণমাধ্যম ইমরান খানের পক্ষে জনমত তৈরিতে কাজ করছে। যে কারণে পাকিস্তানের জনমত এখন দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
লং মার্চের ডাক দেয়ার পর সরকারের মধ্যে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার হয়েছে। সড়ক, রেল যোগাযোগে অবরোধ তৈরি করেছে তারা। মোবাইল ফোনের সেবাও সীমিত করে দেয়া হয়েছে যাতে করে জনগণ এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে না পারে। শরীফ সরকার কারচুপির অভিযোগ তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে বলে জানালেও পদত্যাগে তাদের আগ্রহ নেই।
বলা হচ্ছে, কয়েকটি ইস্যুতে দেশটির সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে তিক্ততার জন্ম হওয়ার প্রেক্ষিতে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে বিশ্বাস ঘাতকতার অভিযোগ বিচার শুরু অন্যতম একটি কারণ। সরকার, বিচার বিভাগ ও সুশীল সমাজের মতো বেসামরিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সাবেক জেনারেলদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতার দাবি তোলায় সেনাবাহিনী নতুন করে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মোশাররফকে কয়েকবারই দেশ ছাড়ার বিষয়ে নওয়াজ শরীফ রাজি হলেও তার সরকারের সদস্যরা বিষয়টি স্বচ্ছ ও স্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। যে কারণে পারভেজ মোশাররফকে মুক্তি দেয়া এখন আরো অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে সরকারের জন্য। অনেকের মত হলো, এটি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এখন যে সরকার বিরোধী আন্দোলনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে সেনাবাহিনীর সমর্থন থাকতে পারে। এছাড়া তালেবানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযান ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে সরকারের অবস্থানের কারণে সরকার-সেনাবাহিনী সম্পর্কে শীতল অবস্থা বিরাজ করছে। আর এখন রাজনৈতিক মতবিরোধ বাড়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য সেনাবাহিনীর দিকে ঝুঁকে গেছে।
উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সরকারি বাহিনীর অভিযান শুরুর পর গত ১ আগস্ট থেকে রাজধানী ইসলামাবাদের নিরাপত্তা হুমকি কমিয়ে আনতে দায়িত্ব পালন করছে সেনা সদস্যরা। এর অর্থ হলো সরকার বিরোধী আন্দোলন বৃদ্ধি পেলে রাজধানীতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সেনারা একমাত্র সম্বল হবে সরকারের। আর যতক্ষণ না সরকার-সেনা বিরোধ মিটছে ততক্ষণ সেনাবাহিনী সরকারের পক্ষ নেবে কি-না তা নিয়ে অনেক শঙ্কার জন্ম হচ্ছে।
সম্প্রতি নওয়াজ শরীফ জাতীয় নিরাপত্তা সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে রাজনৈতিক শরিকদের বাইরে সেনা ও গোয়েন্দা বিভাগের কর্মাকর্তাদের আমন্ত্রণ জানান। এর মাধ্যমে মূলত তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি ঐক্যমতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। এর একদিন পর ফিল্ড কমান্ডারদের একটি সম্মেলনের আয়োজন করে সেনাবাহিনী। সেখানে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এরপর এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
আল জাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এ অবস্থায় অবশ্যই শরীফের সরকারকে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। সরকার বিরোধী আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যদিও এখন পর্যন্ত তার কৌশল ছিলো দমনমূলক। এ কৌশল কোনো ফল বয়ে আনবে না। লাহোরে সহিংসতায় হত্যার ঘটনা সরকারের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা নিলে হয়তো শরীফ তার প্রধানমন্ত্রীত্ব রক্ষা করতে পারবেন কিন্তু সে সরকার হবে দুর্বলতম। প্রশাসন হয়ে পড়বে সেনাবাহিনীর মুখাপেক্ষী।
তবে পাকিস্তানে অনেকেই ভবিষ্যত্ বাণী করছে যে, সহিংসতার মাত্রা বাড়লে সেনাবাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে ক্ষমতা নিতে চাইছে না সেনাবাহিনী। কারণ দেশের উত্তপ্ত উত্তর ও দক্ষিণে জঙ্গি দমনে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ নিয়োজিত রয়েছে। একইসঙ্গে সেনাবাহিনী মনে করছে আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো সেনা সরিয়ে নেয়া হলে পাকিস্তানি তালেবানরা আবারো সংগঠিত হয়ে পাকিস্তানে হামলা চালাতে পারে। এক্ষেত্রে অতীতের ধরনের ক্যু যথাযথ হবে না।
আবার পেশাজীবীদের নিয়ে একটি টেকনোক্র্যাট সরকার গঠনেরও সম্ভাবনার কথা বলছে কেউ কেউ। যে সরকার সেনা সমর্থনে থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ত্রুটি সারিয়ে সকল দলের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে আরেকটি নির্বাচন দেবে। ইমরান খানও এই ধরনের একটি প্রক্রিয়া চান। যাহোক, পাকিস্তানের রাজনীতিতে এ ধরনের পরিস্থিতি নতুন নয়। এখন দেখার বিষয় পাকিস্তানের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়। তবে এটা নিশ্চিত যে সেনাবাহিনী তাদের ট্রাম কার্ডটি ছাড়তে চাইবে এবং শেষ সালিশকারীর ভূমিকা নেবে।
বর্তমানে পাকিস্তানে অনেক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ থেমে আছে, শেয়ার বাজারের পতন অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। এদিকে, ইমরান খানের জনপ্রিয় কিছু কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে বাড়ছে। সরকারও জনবিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। আর চূড়ান্তভাবে, জেনারেল মোশাররফের পতনের ক্ষেত্রে শহুরে আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। এ কারণে বিগত পিপিপি সরকার তাদের মেয়াদের পাঁচ বছর পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছে। এসব ঘটনা বলে দিচ্ছিলো পাকিস্তানে বেসামরিক শক্তির ক্ষমতায় থাকার বিষয়ে মানুষের সমর্থন বাড়ছিলো। কিন্তু বিগত কয়েক মাসে মনে হচ্ছে, সেনারা তাদের হারানো স্থান ফিরে পেতে শুরু করেছে এবং কেন্দ্রীয় প্লেয়ার হিসেবে প্রত্যাবর্তন করছে।
