চন্দরপলের একাল-সেকাল

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২২:০৩
তার অবদান প্রায় সব সময়ই ঢাকা পড়ে যায় অন্য কারও ছায়ায়। ব্যাটিং টেকনিক নিয়েও অনেক হাস্যরস চালু আছে। কিন্তু তার রান সংগ্রহের ক্ষমতা নিয়ে কারও কোন কালেই প্রশ্ন ছিল না, এখনও নেই। কেবল এই এক দক্ষতা দিয়েই তিনি বছরের পর বছর ধরে শাসন করে যাচ্ছেন ক্রিকেট বিশ্ব, হতাশ করে যাচ্ছেন প্রতিপক্ষের বোলারদের। গত দু’দশকের ব্যাটিং বিপ্লবে তিনি হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তী। ২০ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের এখন শেষ অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই শিবনারায়ণ চন্দরপল। স্বল্প দৈর্ঘ্যর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সালের পর থেকে তাকে আর না দেখা গেলেও দাপটের সাথে খেলে যাচ্ছেন বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ। আগামী মাসে বাংলাদেশের বিপক্ষে দুটি টেস্টেও তাকে দেখা যাবে। এর আগেই অবশ্য দারুণ মাইলফলকে পা রাখলেন এই ব্যাটসম্যান। গত শনিবার ছিল তার ৪০তম জন্মদিন। তার আগে মাত্র আটজন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটসম্যানকেই চল্লিশ পেড়োনোর পরও টেস্ট খেলতে দেখা গেছে। সর্বশেষ এই কীর্তি গড়েছিলেন বার্বাডিয়ান কিংবদন্তী ও বাংলাদেশের সাবেক কোচ গর্ডন গ্রিনিজ। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যান্টিগা টেস্টে চল্লিশোর্ধ ক্রিকেটার হিসেবে খেলতে নামেন তিনি। এই তালিকায় ক্যারিবিয়ানদের সবচেয়ে বয়স্ক লোকটি হলেন জর্জ হেডলি। সেই ইতিহাসটিও আবার ৬০ বছরের পুরনো। ১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জ্যামাইকাতে যখন তিনি শেষ টেস্ট খেলতে নামেন তখন তার বয়স ৪৪ ছাড়িয়ে গেছে। চন্দরপল যখন গায়ানার জর্জ টাউনে ২০ বছরের কম বয়সে প্রথম টেস্ট খেলতে নামেন তখন তার সাথে সেই টেস্টেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ছিলেন ভিভ রিচার্ডস, ডেসমন্ড হেইন্স, জিমি অ্যাডামস, ব্রায়ান লারা, কোর্টনি ওয়ালস, কার্টলি অ্যামব্রোসের মত তারকারা। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে তার সাথে এখন আছেন ক্রিস গেইল, রবি রামপল, ড্যারেন ব্রাভো, ড্যারেন স্যামি কিংবা আরও নবীন সুনীল নারাইন কিংবা ক্রেইগ বার্থওয়াইটরা। সত্যি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের সাম্রাজ্য থেকে পতনমুখী যাত্রার সবটাই হয়েছে তার চোখের সামনে। টালমাতাল অবস্থাতে তিনি এখনও আছেন দলের স্তম্ভ হয়ে। তার ক্যারিয়ারের সময়টাতে ক্যারিবিয় ক্রিকেটে ঘটেছে অনেক উত্থান-পতন। দলের প্রতি খেলোয়াড়দের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তিনি সব সময়ই ছিলেন সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে। অন্ধকার মেঘের মাঝে এক চিলতে আলো হয়ে তিনি আলোকিত করে গেছেন ক্রিকেটকে, নিজের দলকে! ক্রিকেট বিশ্বকে তিনি বোঝাতে বাধ্য করেছেন যে টেকনিকই শেষ কথা নয়, ক্রিজে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকাটাই আসল ব্যাপার। নিজের মন্ত্রের যথার্থ প্রতিদানও তিনি পেয়েছেন। যদিও তার জন্য প্রথমটায় একটু বেশি সময়ই নিয়ে ফেলেছিলেন। প্রথম দিকটায়, ক্রিজে যেয়ে উইকেট ধরে রেখে খেলে ফেলতেন দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইনিংস। কিন্তু আসছিলো না সেঞ্চুরি। ১৯৯৪ সালের অভিষেক থেকে শুরু করে পরের সাত বছরে ২২টি হাফ সেঞ্চুরির বিপরীতে তার সেঞ্চুরির সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। অন্ধকারের পরেই যে আলো আসে সেই কথাটা নিজের ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে বেশ ভাল ভাবেই প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন চন্দরপল। ২০০২ সাল থেকে নিজের নিয়মেই হাফ সেঞ্চুরিগুলোকে নিয়ে যেতে থাকেন তিন অংকের ঘরে। আস্তে আস্তে নিজেকে বড় ম্যাচের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলতে থাকেন। ২০০২ সালকে বলা হয় চন্দরপলের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। তাকে নিয়ে সেবার অনেক ভুগতে হয়েছিল ভারতকে। দেশ ও দেশের বাইরে মিলিয়ে ভারতের বিপক্ষে আট টেস্টে করেছিলেন চারটি সেঞ্চুরি। সেই মৌসুমে ৬৬ গড়ে রান তোলার পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই ব্যাটসম্যানকে। এর পরের বছরই ভিন্ন এক চন্দরপলের সাক্ষাত্ পায় অস্ট্রেলিয়ান বোলাররা। গায়ানা টেস্টে মাত্র ৭২ বলে তিনি করেন ১০০ রান। সেটা ছিল ইতিহাসের চতুর্থ দ্রুততম টেস্ট সেঞ্চুরি। এরপর প্রতিটি মৌসুমে নিজেকে একটু একটু করে নিয়ে গেছেন গ্রেটনেসের দিকে। চূড়ায় উঠে যান ২০০৭ সালে এসে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে করেন দুটি সেঞ্চুরি। ব্যাটিং গড়টা ছিল ১৪৮.৬৬। অস্বাভাবিক বললেও কম বলা হবে! সাম্প্রতিক সময়েও একই রকমই আছে চন্দরপলের ব্যাট। সর্বশেষ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গত জুনেও তার উইকেটের জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বোলারদের। মূলত টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত হলেও ওয়ানডেতেও তার কীর্তির সংখ্যা খুব কম নয়। ইস্ট লন্ডনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৯৯৯ সালে তার ১৫০ রানের একটা ইনিংস আছে। তবে, তাকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করা হয় ২০০৮ সালে পোর্ট অব স্পেনে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬২ রানের এক ইনিংসের জন্য। লঙ্কানদের ২৩৫ রান তাড়া করতে নেমে শেষ ওভারের আগে উইন্ডিজ দলের রান ছিল নয় উইকেটে ২২৩ রান। মাত্র এক উইকেট হাতে নিয়ে শেষ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে করতে হবে ১৩ রান। সামনে চামিন্দা ভাস, নিজের করা আগের নয় ওভারে তিনি দিয়েছেন মাত্র ১৭ রান। শেষ দুই বলে দরকার ছিল ১০ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে কোন আশাই ছিল না বলা যায়। কিন্তু সব হিসাব নিকাশ পাল্টে দিলেন চন্দরপল। পঞ্চম বলে ফুলটস কাজে লাগিয়ে লং অফ দিয়ে বের করে নিলেন চার রান। শেষ বলে আরেকটি ফুলটস, মিড উইকেটের উপর দিয়ে ছক্কা। চন্দরপলের বীরত্বে জয় ছিনিয়ে আনলো ক্যারিবিয়ানরা। শিবনারায়ণ চন্দরপল প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটার হিসেবে করেছেন দেড়শ’র বেশি টেস্ট খেলার রেকড। আর ব্রায়ান লারার পর একমাত্র তারই আছে এগারো হাজারের বেশি রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটের উত্থান-পতন তিনি যেমন দেখেছেন; তেমনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাথেও তার পরিচয়টা বেশ পুরনো। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ আসরের মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচেই মুখোমুখি হয়েছিল চন্দরপলের। সেই ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে খেলা আকরাম খান, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, নাইমুর রহমান দুর্জয়, খালেদ মাসুদ পাইলট, খালেদ মাহমুদ সুজন, হাসিবুল হোসেন শান্তরা অনেক আগেই ক্রিকেট ছেড়ে জড়িয়ে গেছেন বোর্ড কিংবা কোচিংয়ের সাথে। ১৯৯৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশে দশবার অধিনায়ক পরিবর্তন করা হয়, ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ তো দূরের কথা, ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ খেলা একজন সদস্য মাত্র টিকে আছেন বাংলাদেশ দলে। তিনি হলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। আর এদিকে খেলে যাচ্ছেন চন্দরপল। তার ছেলে ট্যাগনারাইন চন্দরপল খেলে ফেলেছেন অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ। ‘টাইগার’ নামে এরই মধ্যে খ্যাতি পেয়ে যাওয়া এই ব্যাটসম্যানও বাবার মতই বাম হাতি। সম্প্রতি এই অঞ্চলটির সবচেয়ে প্রতিভাবান যুব খেলোয়াড়ের খেতাব জুটে গেছে তার। কে জানে হয়তো কোন এক দিন বাবা আর ছেলে এক সাথেই কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচে ব্যাট করবেন! বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচ রান গড় সেরা ১১ ৩৭৮ ৭৫.৬০ ৯২* টেস্ট ম্যাচ রান গড় সেরা ৮ ৬২৭ ১০৪.৫০ ২০৩*