গত কয়েক মাস ধরেই সাংবাদিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলছিলেন না। আড্ডা বা অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা চলবে; লেখার জন্য কিছু নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ রওনা দেয়ার একদিন আগে দলবদল করে অনেকটা বাধ্য হয়েই সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন। কথা শুরু করার ঠিক আগে এক সিনিয়র সাংবাদিককে ডেকে মুখটা করুণ করেই অনুরোধ করলেন, ‘সবাইকে একটু বলে দেবেন, ইন্টারন্যাশনাল পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন না করতে? আমি কথা দিচ্ছি, কিছু করতে পারলেই সবার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলবো।’
হ্যা, এই ‘কিছু করতে পারা’র চ্যালেঞ্জটা খুব নিয়েছেন তামিম ইকবাল খান। যদিও কাগজ-কলমের পরিসংখ্যান দেখে বোঝা কঠিন যে, তামিম ঠিক ছন্দে নেই। রেকর্ড বলছে, টেস্টে মাত্র চার ইনিংস আগেই জোড়া ফিফটি করেছেন; তার একটি ৯৫ রানের ইনিংস। রেকর্ড বলছে, ওয়ানডেতে মাত্র দু’ম্যাচ আগেই ফিফটি আর সাত ম্যাচ আগেই সেঞ্চুরি করেছেন। কিন্তু এসব রেকর্ড বোঝাতে পারছে না যে, আসলে সেই চিরচেনা তামিম ইকবাল মাঠে নেই অনেক দিন হল। সেই লর্ডস, ম্যানচেস্টার, বুলাওয়ে কিংবা পোর্ট অব স্পেনের সেই বিধ্বংসী তামিম ইকবাল যেন হারিয়েই গিয়েছিলেন। কোথায় সেই উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে আসা, কোথায় সেই বেপরোয়া ছক্কা, কোথায় সেই উদ্যত-দুর্বিনীত তামিম। এই তামিমকে বাংলাদেশ খুঁজছিল, খুঁজছিলেন তামিম নিজেও। অবশেষে সেই তামিমের প্রত্যাবর্তনের গন্ধটা অন্তত পাওয়া যাচ্ছে। দেশে থাকতে একমাত্র একদিনের অনুশীলন ম্যাচেই তাণ্ডব করা এক ইনিংস খেলে সুবাসটা ছড়িয়েছিলেন। আর পরশু, রবিবার গ্রেনাডার বিপক্ষে অনুশীলন ম্যাচে রীতিমতো ঝড় তুলে তামিম ফিরিয়ে আনলেন যেন সেই ২০০৭ কিংবা ২০০৯ সালের তামিম ইকবালকে।
তামিমের কাছে এই ব্যাটিংটা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু প্রত্যাশাকে হার মানিয়ে চোখ চড়কগাছ করে দিয়েছেন এই প্রস্তুতি ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ। ‘রিয়াদ’-এর ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। ২০১২-১৩ মৌসুমে লেট মিডল অর্ডারে বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানও ছিলেন। কিন্তু দানবীয় ব্যাটিং বলতে যা বোঝায়, সেই মারকাটারি শট কখনোই তার কাছ থেকে আশা করা হয় না। সেই আশার ওপরে গিয়েই রিয়াদ এই অনুশীলন ম্যাচে যেন নিজেকে চেনালেন। আর তামিমের এই ফেরার আভাস ও রিয়াদের নতুন চেহারায় ফেরাটাই হতে পারে গ্রেনাডার বিপক্ষে বাংলাদেশের একমাত্র অনুশীলন ম্যাচটির প্রাপ্তি। এর বাইরে মাশরাফি, আল আমিন, রাজ্জাকদের ব্যাটিংটাও নিতান্ত কম পাওয়া হয়নি।
এসব সুতো মিলে গিয়েই প্রথম অনুশীলন ম্যাচে গ্রেনাডার বিপক্ষে ৯৫ রানের বিশাল জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে ছয় উইকেটে ৩২২ রান তোলে মুশফিকুর রহিমের দল। জবাবে ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে ২২৭ রানে আটকে যায় স্বাগতিকদের ইনিংস। প্রোগ্রেস পার্কে দিনের শুরুটা ছিল তামিমেরই। তার ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে শুরু থেকেই বড় ইনিংসের স্বপ্ন দেখতে থাকে বাংলাদেশ। ৮৬ বলে তিনি করেন ৯১ রান। ৫৬ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙে বিজয় ২৪ রানে ফিরে আসায়। এরপর নতুন পজেশনে নামা ইমরুল কায়েস অবশ্য ব্যর্থই হন; মাত্র ১ রান করে ফিরে আসেন। তবে বাংলাদেশকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দেন চার নম্বরে নামা আরেক ওপেনার সামসুর রহমান শুভ ও তামিম। দু’জনে যোগ করেন ৮৮ রান। তামিম ও শুভ ১৭ রানের ব্যবধানে ফিরে আসেন। তামিমের ৯১ রানের ইনিংসে ১২টি চার ও দুটি ছক্কা ছিল।
এরপর হাল ধরেন মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। দু’জনের ৫০ রানের জুটি বাংলাদেশের পুঁজিকে আরও বড় করে। তবে পুঁজিটাকে ফুলিয়ে তোলে রিয়াদ ও নাসিরের বিধ্বংসী এক জুটি। মাত্র ৮.২ ওভারে এই দু’জন স্কোরবোর্ডে ১০১ রান যোগ করেন! এই বিশাল রান পাড়ি দিতে গিয়ে কখনোই স্বচ্ছন্দ ছিল না গ্রেনাডার ব্যাটসম্যানরা। দলীয় মাত্র ৫ রানে ডেভন স্মিথকে ফিরিয়ে সোহাগ ধসটা নামান। ভেতরে দু’টি করে উইকেট নেন রাজ্জাক ও আল আমিন। আর মাশরাফি শেষ বেলায় গ্রেনাডার লেজ ছেঁটে দেয়ার পথে নেন দুই উইকেট, শুরুতে একটি।
সবমিলিয়ে যে ছন্দটা তামিম, রিয়াদ, মাশরাফিরা পেলেন; এটা এখন ধরে রাখার পালা।
গ্রেনাডা-বাংলাদেশ অনুশীলন ম্যাচ
ভেন্যু: প্রোগ্রেস পার্ক, সেন্ট অ্যান্ড্রুস
টস: বাংলাদেশ (ব্যাটিং)
তারিখ: ১৭ আগস্ট, ২০১৪
বাংলাদেশ রান বল ৪ ৬
তামিম ইকবাল ব থমাস ৯১ ৮৬ ১২ ২
বিজয় ক ক্যাম্পবেল ব থমাস ২৪ ৪৮ ২ ১
ইমরুল কায়েস ক ও ব জর্জ ১ ৭ ৪ ০
শুভ ক এটিয়েনে ব ম্যাকসুইন ৩২ ৪৬ ৩ ০
মুশফিকুর এলবিডব্লিউ প্যাসকাল ৪৪ ৪১ ৪ ১
মাহমুদউল্লাহ ক পল ব প্যাসকাল ৭৮ ৬১ ৭ ৩
নাসির হোসেন নট আউট ২২ ২৪ ২ ০
অতিরিক্ত (লেবা-১, নো-১৯) ২০
মোট (৫০ ওভারে) ৩২২/৬
বোলিং: প্যাসকাল ১০-০-৭৬-২, ম্যাকসুইন ১০-০-৭০-১, থমাস ৮-০-৫৪-২, পল ৪-০-২১-০, জর্জ ৮-০-২৭-১, অ্যালেক্সিস ৩-০-২৬-০, এটিয়েনে ৬-০-২৯-০, আলেক্সান্ডার ১-০-১৮-০
গ্রেনাডা
ডেভন স্মিথ ব সোহাগ ৪ ৮ ১ ০
ক্যাম্পবেল ব আল আমিন ২৩ ৩৩ ৩ ০
জর্জ ক ইমরুল ব রাজ্জাক ৬২ ৮৯ ৬ ১
ফ্লেচার ব মাশরাফি ২৯ ৩৭ ২ ২
এটিয়েনে ক মুশফিক ব তাসকিন ৩১ ৩০ ৪ ১
পল ক নাসির ব রাজ্জাক ১৯ ৩৫ ২ ০
জর্জ ব আল আমিন ০ ৩ ০ ০
হিলাইরে ক আল আমিন ব মাশরাফি ২ ৫ ০ ০
অ্যালেক্সিস ব মাশরাফি ১ ৯ ০ ০
ম্যাকসুইন নটআউট ১৪ ১৭ ০ ০
ডেনিস জর্জ ২৫ ৩১ ২ ০
অতিরিক্ত (বা-৬, লেবা-১, ও-১০) ১৭
মোট (৫০ ওভারে) ২২৭/৯
বোলিং: মাশরাফি ৮-১-৪৪-৩, সোহাগ ৭-০-২২-১, আল আমিন ৮-১-৩৪-২, রাজ্জাক ১০-১-৩৫-২. তাসকিন ৭-০-৩২-১, মাহমুদউল্লাহ ২-০-১৩-০, নাসির ৬-০-৩০-০, সামসুর ২-০-১০-০।
ফল: বাংলাদেশ ৯৫ রানে জয়ী
