উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট বা অপসারণ) ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার বিধান রেখে ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) আইন-২০১৪’-এর খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ায় আইনের খসড়াটি এখন বিল আকারে সংসদে তোলা হবে। বিলটি সংসদের অনুমোদন লাভের পর আরেকটি আইন করা হবে। এ আইনে বিচারকদের অসামর্থ্য, অসদাচরণ ও অভিযোগ সম্পর্কে কিভাবে তদন্ত হবে, সংসদ কীভাবে প্রস্তাব নেবে এবং রাষ্ট্রপতি কোন্ প্রক্রিয়ায় তা অনুমোদন করবেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের অনুমোদনের ভিত্তিতে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের যে বিধান ছিল, সংবিধান সংশোধন করে সেটিই আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। একইসঙ্গে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক অপসারণের বিধানটি বাতিল হচ্ছে। তিনি বলেন, খসড়াটি আইনে পরিণত হওয়ার পর সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য কোন বিচারপতিকে অপসারণের প্রস্তাব দিলে এবং রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ওই বিচারপতিকে অপসারণ করা যাবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নতুন এই আইনের ফলে একদিকে যেমন স্বাধীন বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে, তেমনি জনপ্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহিতা সমুন্নত হবে। বাহাত্তরের সংবিধানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মহান আদর্শের প্রতিফলনে ১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান হলো জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ উল্লিখিত আইনের খসড়া প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করে। এতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের যে বিধান বর্তমান সংবিধানে রয়েছে তা ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। সাত নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ।
প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের পদের মেয়াদ নির্ধারণ ও তাদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলেও পরে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এক সামরিক ফরমানে ওই অনুচ্ছেদ বাতিল করেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘বিচারকদের পদের মেয়াদ’ শীর্ষক ৯৬ অনুচ্ছেদের ২ দফায় বলা রয়েছে, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাবে না। ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, এই অনুচ্ছেদের ২ দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। আর ৯৬ (৪) অনুচ্ছেদে বলা রয়েছে, কোনো বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন।
নতুন সংশোধনীতে যা থাকছে
নতুন ষোড়শ সংশোধনীর খসড়ায় বলা হয়েছে, এই আইন ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) আইন, ২০১৪’ নামে অভিহিত হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নরূপ ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপিত হবে। যথা: ‘৯৬। বিচারকদের পদের মেয়াদ।-(১) এই অনুচ্ছেদের বিধানাবলী-সাপেক্ষে কোনো বিচারক ৬৭ (সাতষট্টি) বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। (২) প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারণ করা যাবে না। (৩) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। (৪) কোনো বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারবেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সামরিক ফরমান বলে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। সংশোধন করে এই ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে অর্পণ করা হয়। এটি করা হয়েছিল ১৯৭৮ সালে, তখন জাতীয় সংসদ ছিল অনুপস্থিত। ১৯৭২ সালের সংবিধান সম্পর্কে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রের যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগের চূড়ান্ত জবাবদিহিতা, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদের কাছে ন্যস্ত ছিলো। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনের ফলে তা আবার পুনর্বহাল করা হচ্ছে।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, একজন অভিযুক্ত বিচারক ও কাউন্সিলের সদস্য একই প্রতিষ্ঠানে অনেকদিন কাজ করার কারণে তারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন তার যথার্থতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাছাড়া সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের বিধান রয়েছে। সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যায়। সংবিধানের ৭৪ (গ) অনুচ্ছেদে স্পিকারকে অপসারণ করার বিধান রয়েছে। এছাড়া ৫৭ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব গ্রহণেরও বিধান রয়েছে। মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা বলেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকার বিষয়টি আইন মন্ত্রনালয়ের প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি আইন কমিশনও বিচারপতিদের অপসারণ সংক্রান্ত বাহাত্তরের মূল বিধানটি পুনর্বহালের পক্ষে মত দিয়েছে।
আইনের খসড়া প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়ার আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অন্যান্য দেশের নজির নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতে পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য অনুমোদন দিলে রাষ্ট্রপতি সংশ্লিষ্ট বিচারপতিকে অপসারণের আদেশ দিতে পারেন। যুক্তরাজ্যের নিয়ম হলো, পার্লামেন্টের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তাব পাস হতে হবে, তারপর রাণী তাতে অনুমোদন দেবেন। বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে দেয়া আছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানেও। এছাড়া কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলংকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে এ নিয়ম চালু আছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায়ও একই নিয়মে এক বিচারপতিকে অপসারণ করা হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে না:আইনমন্ত্রী
গতকাল সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার জন্যই বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া উচিত্। সংসদের হাতে এই ক্ষমতা দিলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে না; বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় জনগণের যে সুফল লাভ সেটাই এই সংশোধনীর মারফত আরো পাকাপোক্ত হবে।
তিনি জানান, আগামী ১ সেপ্টেম্বর শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনেই ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) আইন-২০১৪’-এর খসড়া সংক্রান্ত বিলটি পাস হবে। বিল পাসের তিন মাসের মধ্যে কোন পদ্ধতিতে বিচারককে অপসারণ করা যাবে তার বিশদ ব্যাখাসহ একটি আইন করা হবে। সকল পক্ষই যাতে সুস্পষ্টভাবে তাদের বক্তব্য বলতে পারেন এবং কোনো পক্ষের যাতে ডিফেন্স অধিকার ক্ষুণ্ন না হয় সে বিষয়টি আইন থাকবে। অভিযোগকারী ও যার বিরুদ্ধে অভিযোগ- সবার অধিকারই আইনে রক্ষা করা হবে।
বিচারপতিদের অপসারণরে পুরো প্রক্রিয়া কেমন হবে- এ প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে গবেষণা করে আইনে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা রাখা হবে।
প্রসঙ্গত, উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে আওয়ামী লীগের গত সরকারের মেয়াদে। ২০১২ সালে তত্কালীন স্পিকার ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের একটি রুলিংকে কেন্দ্র করে কয়েকজন সংসদ সদস্য হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে অপসারণের দাবি তোলেন। সে সময়ই বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনার দাবি জোরালো হয়। গত ২৬ জুলাই গণভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
চিংড়ি নীতিমালা অনুমোদন
এদিকে চিংড়ি খাতের উন্নয়নে বেসরকারি উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণীত ‘জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা-২০১৪’র খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ নীতিমালা অনুযায়ী চিংড়িখাতে মূল ভূমিকা পালন করবে বেসরকারি খাত এবং সরকার এখানে ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে।
এছাড়া গত ২১-২৩ জুলাই যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম ‘গার্ল সামিট’ এ প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ, গত ২৮-২৯ মে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলনের ১৭তম অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগদান এবং ৯-১৩ জুলাই রোমে কফি (কমিটি অব ফিশারিজ)’র ৩১তম সম্মেলনে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর যোগদান বিষয়ে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়।
