শিল্পে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনের অর্ধেক গ্যাসও পাচ্ছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। গ্যাসের চাপ না থাকায় উত্পাদন কমে গেছে। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের পণ্য বিদেশে সরবরাহ করতে পারছে না। আবার নতুন অনেক প্রতিষ্ঠান উত্পাদনে যেতে পারছে না। গত কিছুদিন ধরে চলা এ সমস্যা গতকাল সোমবার তীব্র আকার ধারণ করে। সাভার, আশুলিয়া, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, জয়দেবপুর, চন্দ্রাসহ বিভিন্ন এলাকার শিল্প-কারখানা ঘুরে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) আমিনবাজার গ্যাস স্টেশনে উন্নয়ন কাজ করলেও শিল্পে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও শিল্পে কমেছে। এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নওশাদ ইসলাম বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে সার কারখানাগুলো আবার চালু হয়েছে। সার কারখানায় সরবরাহ শুরু হওয়ায় শিল্পে গ্যাসের চাপ কিছুটা কমেছে। এছাড়া বিদ্যুত্ কেন্দ গুলোতেও আগের চেয়ে বেশি গ্যাস দিতে হচ্ছে। তবে গ্যাসের এ সংকট সাময়িক। খুব শিগগির সংকট কেটে যাবে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, সাভার-গাজীপুর এলাকায় ৪৮৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ২৫০টি সিএনজি স্টেশন, ২১৪টি বাণিজ্যিক শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। আবাসিক গ্রাহক রয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৬৭৩টি। এছাড়া শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেছে।
সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার তুহিন খান জানান, সাভার-আশুলিয়ায় শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহ একেবারেই কমে গেছে। সাভারের কাঠগড়া এলাকার ফ্যাশন ডট কম পোশাক কারখানার পরিচালক আজাহার উদ্দিন বলেন, কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানা ঠিকমতো চলে না।
আশুলিয়ার কবিরপুরস্থ তোহা টেক্সটাইল লিঃ এর ম্যানেজার আনিসুর রহমান অভিযোগ করেন, তাদের কারখানায় ৩৮ হাজার ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও পাচ্ছেন মাত্র ২ হাজার ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু মাস শেষে বিল আসে অতিমাত্রায়।
সাভারস্থ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আঞ্চলিক বিক্রয় কেন্দে র কর্মকর্তা জানান, গ্যাস সরবরাহ কম হওয়ায় কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস বিতরণ করা যাচ্ছে না। তিতাস গ্যাসের সাভার কার্যালয়সূত্রে জানা যায়, সাভার এলাকায় গ্যাসের চাহিদা প্রতি ঘণ্টায় ৯৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫৩ ঘনফুট। এর মধ্যে শিল্প কারখানায় চাহিদা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮২ লাখ ঘনফুট। শুধু ডিইপিজেডেই প্রতি ঘণ্টায় ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৮০৯ ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে গ্যাস পাওয়া যায় ২৫ থেকে ৩০ ভাগ। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্প কারখানাই দিনে গড়ে কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেট থেকে যে গ্যাস ঢাকা আসছে তার একটা অংশ এলেঙ্গা থেকে আলাদা হয়ে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু দিয়ে উত্তরাঞ্চলে চলে যাচ্ছে। বাকি অংশ আসছে সাভার হয়ে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত। এই বিভাজনের স্থান এলেঙ্গায় গ্যাস আলাদা করার কোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র নেই। এলেঙ্গায় কমপ্রেসার স্থাপন হলে এই বিভাজন সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হবে। তখন সাভার এলাকার শিল্পের জন্য গ্যাসের চাপ বাড়ানো যাবে। এছাড়া ধনুয়া দিয়েও অন্য একটি পাইপে গ্যাস আসছে নারায়ণগঞ্জ হয়ে।
অন্য একটি সূত্র জানায়, অব্যবস্থাপনার কারণে গ্যাসের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। গ্যাস ব্যবহার পথ নির্দেশনার খসড়ায় বলা হয়েছে, অনুত্পাদনশীল খাতের চেয়ে উত্পাদনশীল খাতকে গুরুত্ব দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার কারখানার একমাত্র কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা অত্যাবশ্যক। অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য দেশে বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়াতে গ্যাস সরবরাহ বিবেচনা করা আবশ্যক। আবাসিকে গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, এ খাতে গ্যাসের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে নিরুত্সাহিত করতে হবে। এছাড়া বিকল্প জ্বালানি হিসাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এলপিজির সরবরাহ বাড়ানো এবং সহনীয় দামে তা গ্রাহক পর্যায়ে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে বিদ্যুত্, সার ও অন্যান্য খাতে ২ হাজার ৯৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২ হাজার ২৬৮ মিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতি ৭১৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলোতে ১ হাজার ৩৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট, সার কারখানায় ২৮৯ মিলিয়ন ঘনফুট ও অন্যান্য খাতে ১ হাজার ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে।
গত ৫ বছরে গ্যাসের উত্পাদন বাড়লেও তা চাহিদার তুলনায় কম। গত ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৬৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে। তবে একই সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে ১৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন কমেছে। এই হিসাবে ৫ বছরে জাতীয় গ্রিডে নিট যোগ হয়েছে ৫১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
তবে সরকার দুই বছরের মধ্যে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ব্যবহারের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। ২০১৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হবে।
