বাবলুর জন্য নতুন জামা

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৪, ১৯:১৯
গায়ে তার ময়লা জীর্ণ ছেঁড়া একটা শার্ট আর কালো রং লাগানো ময়লা একটা হাফ প্যান্ট। বড় গাছটায় ছায়ার নিচে বসে তার প্রিয় সঙ্গী বস্তাটা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসগুলো একটা একটা করে বের করছে, আর নেড়েচেড়ে দেখছে। হঠাত্ করে কে যেন পিঠে গুতো দিল। গুতো খেয়ে নীলা জানালা থেকে চোখ সরিয়ে পেছনে তাকাল। গুতো দিলি কেন? কী হয়েছে? সায়মা বলল, এত মনোযোগ দিয়ে কী দেখছিস? ম্যাডাম এসেছে টের পেয়েছিস? নীলা আর কিছু বলল না, আবার জানালা দিয়ে তাকিয়ে রাস্তার ওপাড়ে বসে থাকা ৭-৮ বছর বয়সী ছেলেটাকে দেখলো। তারপর ছোট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে অংক করা শুরু করে দিল। নীলা ক্লাস এইটে পড়ে। তার ক্লাসের জানালা থেকে সে প্রায় সময় রাস্তার ওপাড়ে বসে থাকা ছেলেটাকে লক্ষ্য করে। কখনো তার কাণ্ড দেখে হাসে, কখনো আবার চুপচাপ বসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। স্কুল ছুটির ঘণ্টা পড়েছে। নীলা চুপচাপ তার ব্যাগ গুছিয়ে নিল। আজ সে তেমন কোন শোরগোল করল না বরং সবাইকে অবাক করে অগ্রিম ঈদ মোবারক জানিয়ে চলে গেলো। এই পর্যন্ত যতবার ঈদের ছুটি দিয়েছে ততবার সে ক্লাসে চিত্কার চেঁচামেচি করে সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে। স্কুল ছুটির পর তারা সবাই আড্ডায় মেতে উঠত। মাঝে মাঝে সেই আড্ডায় দাঁড়োয়ান চাচাও এসে যোগ দিত। নীলাকে স্কুল গেটে থামাল দারোয়ান চাচা। কী মামনি, আজকে এত তাড়াতাড়ি বাসায় যাইতাছেন কেন? আজকে মজা করবেন না? নীলা হালকা হাসি দিয়ে বলল, না চাচা আজকে একটু কাজ আছে, তাই যেতে হবে। চাচাকে অগ্রিম ঈদ মোবারক জানিয়ে সে বের হয়ে পড়ল। নীলা ঠিক করল আজকে ছেলেটির সাথে কথা বলবে। তাই সে আজ রাস্তা পার হয়ে সেই ছেলেটির সাথে দেখা করতে গেলো। বাবলু হঠাত্ একটা ছায়া দেখে চমকে উঠল। সে মুখ তুলে দেখলো একটা ১২-১৩ বছর বয়সী মেয়ে তার দিকে হাসি দিয়ে তাকিয়ে আছে। নীলা নিচু হয়ে বসে বলল, আমার নাম নীলা। তোমার নাম কী? বাবলু চুপচাপ তার কাজ করে চলল। নীলা আবার জিজ্ঞেস করল। বাবলু এবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার নামটা বলল। নীলা এবার বাবলুকে একটার পর একটা প্রশ্ন করতে লাগলো। বাবলু কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলো আবার কিছুর দিলো না বরং বিরক্তি প্রকাশ করল। নীলা যখন জানালো যে সে তার স্কুলের জানালা থেকে প্রতিদিন তাকে দেখে তখন বাবলুর নীলার প্রতি একটু কৌতূহল সৃষ্টি হলো। তারপর সে আর বিরক্ত হলো না বরং নীলার সাথে তার কথা-বার্তা জমে উঠলো। নীলা সেদিন বাবলুর সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে বাসায় চলে গেলো। দুই দিন পর নীলা তার ঈদের নতুন জামা কিনতে মার্কেটে গেলো। সে একটা দামি জামা পছন্দ করল; কিন্তু কেনার সময় তার বাবলুর কথা মনে পড়ল। নীলা তার মাকে বলল, মা, আমি এত দামি জামা নেব না। আমি আরেকটু কম দামি জানা কিনব; কিন্তু তোমাকে আমার জামার পুরো টাকাটা দিতে হবে। ওখান থেকে আমি আমার জামা কিনব আর বাকি টাকা দিয়ে একটা কাজ করব। মা জিজ্ঞেস করলেন, কেন? তুমি বাকি টাকা দিয়ে কী করবে? নীলা চিন্তা করেছে সে বাবলুর জন্য কিছু একটা করবে। তাই সে তার মাকে বাবলুর কথা জানাল। মা জেনে অনেক খুশি হলেন। তিনি বললেন, তুমি অনেক ভালো কাজ করছ। এভাবে যদি সবাই পথশিশুদের জন্য কিছু করে তবে অনেক ভালো হবে। নীলা বাবলুর জন্য বড় কিছু করতে চেয়েছিলো; কিন্তু সে তেমন কিছু করতে পারল না। তাই সে বাবলুর জন্য একটা নতন শার্ট আর প্যান্ট কিনল। এরপর দিন নীলা নতুন জামা আর প্যান্ট একটা প্যাকেটে নিয়ে তার স্কুলের সামনে গেলো বাবলুকে দেয়ার জন্য; কিন্তু বাবলুকে সে পেল না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে চলে আসল। তার মনটা অনেক খারাপ হয়ে গেলো। বাসায় আসার পর মা কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে সে তার মাকে সব বলল। মা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আহা! মন খারাপ করতে হয় না, আজকে দিতে পার নি তো কী হয়েছে? তুমি কাল গিয়ে বাবলুকে দিয়ে এসো। নীলা দুইদিন যাবত্ বাবলুকে খুঁজছে; কিন্তু তাকে আর সেই বড় গাছটার নিচে খুঁজে পাচ্ছে না। সে বাবলুর জন্য বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো। তৃতীয় দিন নীলা আবারও সেই গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাত্ সে দেখতে পেল বাবলু কাঁধে তার বস্তা ঝুলিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে এদিকে আসছে। নীলা দৌড়ে গিয়ে বাবলুকে জিজ্ঞেস করল, কোথায় ছিলে তুমি এতদিন? তুমি জান আমি তোমাকে কত খুঁজেছি? বাবলু একটু হতবাক হয়ে নীলার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নীলা জামার প্যাকেটটা বাবলুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এটা তোমার জন্য। দেখ তো কেমন হয়েছে? বাবলু প্যাকেট থেকে বের করে দেখলো তার সমান একটা নতুন জামা আর একটা প্যান্ট। সে খুশিতে নতুন জামা বলে চিত্কার দিয়ে উঠল। তারপর সে নীলার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল। নীলার চোখেও পানি চলে এলো। সে বাবলুকে আদর করে বলল, আহা! ভাইয়া তুমি না ভালো ছেলে? ভালো ছেলেরা কখনো কাঁদে না। বাবলু আনন্দে নীলাকে জড়িয়ে ধরে আরো জোরে কাঁদতে লাগল। আজকাল প্রায়ই নীলা আর বাবলু হাত নেড়ে ইশারায় কথা বলে। একজন জানালার পাশে বসে থাকে আরেকজন ঐ বড় গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। তারা দুইজন এখন অনেক ভালো বন্ধু। স্কুল ছুটি হলে বাবলু নীলার জন্য স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকে তার দেয়া সেই জামা আর প্যান্ট পরে।