শত অভাব দারিদ্র্য ওদের মেধা বিকাশের অন্তরায় হতে পারেনি। নানা প্রতিকূলতা ও দরিদ্রতা জয় করে ওরা পরেছে সাফল্যের জয়মালা। প্রতিবন্ধী, দিনমজুর ও ভ্যান চালকের ছেলে-মেয়েরা এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫। এসব দরিদ্র মেধাবী মুখের খবর তুলে ধরেছেন আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্বপ্নার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া
প্রতিবন্ধী বাবার পাপড় বিক্রির সামান্য আয়ে খেয়ে না খেয়ে চলে সাত জনের সংসার। এর ওপর রয়েছে পড়াশোনা, জামাকাপড় ও অন্যান্য খরচসহ পদে পদে প্রতিবন্ধকতা। সব মিলিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবে প্রতিবন্ধী বাবা আকুব্বর মোল্লার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কন্যা স্বপ্না আক্তার স্বপ্নচারী। তাই কোনো বাধা আর শেষ পর্যন্ত বাধা থাকেনি। জন্মান্ধ স্বপ্না রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে পেয়েছে জিপিএ-৫। এখন তার একটাই স্বপ্ন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে সরকারি কর্মকর্তা হওয়া।
শাহীন কবিরকে নিয়ে অভাবি বাবা-মার অনেক স্বপ্ন
অভাবি বাবা-মা শাহীন কবিরকে নিয়ে এবার বড় স্বপ্ন দেখছেন। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় রৌমারী ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে শাহীন কবির। এতে অভাবি বাবা-মার মুখ উজ্জ্বল হলেও ছেলের ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তিত তারা। ভাবছেন এখন কি ভাবে ছেলের লেখাপড়ার খরচ যোগাবেন। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা চরবন্দবেড় গ্রামের দিনমজুর এবং ভ্যান গাড়ি চালক হাসানুজ্জামানের পুত্র শাহীন কবির। বাড়ির ভিটেটুকু ছাড়া তাদের কোনো জায়গা-জমি নেই। সারাদিন ভ্যান গাড়ি চালিয়ে যা আয় হয় তা দিয়েই চলে ৪ সদস্যের সংসার। হাসানুজ্জামান জানান, ‘ছেলেকে নিয়া খুবই চিন্তা হয়। মাইনসে কয় শহরে থাইকা পড়ার মেলা ট্যাহা খরচ হয়। অত ট্যাহা তো দিবার পামু না।’
দৌলতপুরের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আব্দুল্লাহ পেয়েছে জিপিএ-৫
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর পিপলস কলেজ থেকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আব্দুল্লাহ আল শাইম জিপিএ-৫ পাওয়া একমাত্র ছাত্র। উপজেলার গোবরগাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক মনিরুল হক ও গৃহিণী চায়না বেগমের ছেলে আব্দুল্লাহ আল শাইম পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। এরপর থেকে সে চোখে কম দেখতে থাকে এবং এক পর্যায়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। কলেজের উপাধ্যক্ষ আজমল হোসেন জানান, সে কলেজে তার আত্মীয়ের সহায়তায় নিয়মিত ক্লাস করত। বাড়িতে মায়ের মুখে শুনে পড়া মুখস্থ করত এবং শ্রুতিলেখক নিয়ে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। আব্দুল্লাহ আল শাইম ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায়।
মেধাবী সীমার দুর্ভাবনার সীমা নেই
ময়মনসিংহের নান্দাইলের ভাটি সাভার গ্রামের দিনমজুর আব্দুল বারিকের মেধাবী মেয়ে সীমা আক্তার এবার এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার এই ফলাফলে পরিবারের সকলেই আনন্দিত হলেও সীমা পড়েছে দুর্ভাবনায়। দারিদ্র্যের কাছে হেরে যেতে বসেছে তার উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন। ২০১২ সালেও এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে সে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। লেখাপড়া শেষ করে সীমা প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে দেশের সেবা করতে চায়।
শিক্ষকতা করতে চায় মোসলেমা
দরিদ্র্যতা জয়ে সাফল্য এনেছে মোসলেমা। শিক্ষকের সহায়তা ও নিজের চেষ্টায় এবারে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী মহিলা ডিগ্রী কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিকে সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। উপজেলার তেলিয়ানীপাড়ের দিনমজুর বাবা মোস্তফা কামাল ও মা মমেনা বেগমের ঘরে জন্ম নেয়া এ মেধাবীর দিন কাটে অনাহার-অর্ধাহারে। উচ্চশিক্ষা নিয়ে শিক্ষকতা করতে চাইলেও তার এ স্বপ্নে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দরিদ্রতা।
