৫ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়েছে সখিনার। সংসারে যেতে না যেতেইে কোলে এসেছে সন্তান। লেখা-পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল। পদ্মার ওপারে অবস্থিত রাজশাহী মহানগরীর বড় বড় দালান আর অফিস-আদালত তাকে কাছে টানে।
স্বপ্নপূরণে সন্তানদের শিক্ষিত করবে তারও কোন উপায় নেই। জ্বর-ব্যাধিতেও খুব কষ্ট হয়। ১০ টাকার ওষুধ কিনতে পদ্মার ওপারে শহরে যেতে ৫০ টাকা নৌকা ভাড়া লাগে। গরীব মানুষ তাই ওষুধ না খেয়েই থেকে যায়। চরে জন্ম নেয়ায় এক ধরনের অভিশাপ। কথাগুলো আক্ষেপের সাথে বললেন পবার চরমাঝারদিয়াড় গ্রামের সখিনা নামের এক গৃহবধূ। নিজে লেখাপড়া না করতে পারলেও সন্তানদের পড়ানোর প্রবল ইচ্ছা তার। যখন শুনলেন চরে স্থায়ী একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও মাধ্যমিক ভবন তৈরি হবে তখন তিনি আনন্দে ফেটে পড়েন।
সাথে সাথেই প্রতিজ্ঞা করে বলেন, আমার দু’টি সন্তানকেই এসএসসি পাস করাব। চরে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় আমার মত অনেকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পড়তে পারে না। কিন্তু এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে। ভাল লাগছে। এখন অনেকেই শিক্ষিত হবে। এখানে নিম্ন-মাধ্যমিক স্কুল হলেও ভবনের অভাবে শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসেনি। পাশাপাশি এখনো বাল্যবিয়ে হচ্ছে চর এলাকায়। স্কুল থাকলে বাল্যবিয়ে কমে যাবে। একই গ্রামের ৮ সন্তানের জনক মহিউদ্দিন বলেন, যাদের আর্থিক অবস্থা ভাল, তাদের ছেলে-মেয়েকে পদ্মার ওপারে রাজশাহী মহানগরীতে রেখে পড়ায়। অন্য সবাই ৫ম শ্রেণী পাস করেই ঝরে যায়। প্রায় ১২ হাজার জনসংখ্যার এই জনপদে একটি মাধ্যমিক স্কুল এবং একটি কলেজ খুবই জরুরি। শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবেই ছেলেরা বিপথগামী ও মেয়েদের শিশুতেই বিয়ে দিতে হচ্ছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার বিচ্ছিন্ন, অবহেলিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদের নাম চর মাঝাড়দিয়ার, খানপুর ও খিদিরপুর। বাংলাদেশের সীমারেখা বুকে বিভাগীয় শহরের মাত্র ৫ কি.মি উত্তরে পদ্মার চরে এই জনপদের অবস্থান। পবার তিনটি চর আছে বলেই পদ্মার ওপারে বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকে আছে। অথচ শুধুমাত্র বেঁচে থাকার লড়াইয়ে প্রতিনিয়তই চরের জনগণের নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হচ্ছে।
পবার হরিপুর ইউনিয়নের চর মাঝাড়দিয়ার জনপদে বাস করে প্রায় ১২ হাজার মানুষ। আর খানপুর ও খিদিরপুরে বাস করে প্রায় ৬ হাজার। চর মাঝারদিয়ার হরিপুরের হলেও চরখানপুর ও চর খিদিরপুর হরিয়ান ইউনিয়নের অংশ।
গতবছর পদ্মার ভাঙনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে চরখানপুর ও চর খিদিরপুরের। এখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও ছিল না মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ২০১২ সালের শেষের দিকে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।
