চট্টগ্রামে ম্যালেরিয়া মহামারী

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৭
চট্টগ্রাম এবং তিন পার্বত্য জেলায় ম্যালেরিয়া মহামারী রূপে ছড়িয়ে পড়েছে। গত সাত মাসে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে প্রায় ৫৭ জন মারা গেছে। আর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ২৩ হাজার ৯২৮ জন। হঠাত্ করে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন পার্বত্য এলাকাসহ সমগ্র চট্টগ্রামবাসী। চিকিত্সকরা জানান, বিরূপ আবহাওয়ায় কীটনাশকযুক্ত মশারির কার্যকারিতা হ্রাস ও সময়মত রোগ নির্ণয় এবং চিকিত্সা নিতে বিলম্বের কারণে ম্যালেরিয়ার বিস্তার ও মৃত্যু হচ্ছে। জ্বর হওয়ার সাথে সাথে রক্ত পরীক্ষা ও দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে পরামর্শ দিয়েছেন তারা। সিভিল সার্জন অফিস জানায়, গত কয়েক বছর যাবত্ ম্যালেরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণে ছিল। আক্রান্তের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। মৃত্যুর সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো নয়। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল থেকে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ও তিন পার্বত্য এলাকাতে হঠাত্ করে ম্যালেরিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সমপ্রতি এটা মহামারীতে রূপ নিয়েছে। আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী হাসপাতাল ও চিকিত্সকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে করণীয় নির্ধারণ করছেন। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে উন্নত চিকিত্সার একমাত্র সরকারি চিকিত্সাকেন্দ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। অন্যান্য হাসপাতালে বা চিকিত্সকের কাছে ব্যর্থ হয়ে এই হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসেন রোগীরা। চিকিত্সকরা জানান, রোগীরা যখন মেডিক্যালে চিকিত্সা নিতে আসেন তখন রোগীকে চিকিত্সা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যালে গত সাত মাসে ৯০ জন ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে শিশুসহ মারা গেছে ১৫ জন। চিকিত্সা নিতে আসা ৯০ জনের মধ্যে ৪৫ জন মারাত্মক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যালে চিকিত্সা নিতে আসা ৮০ শতাংশ রোগী ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পার্বত্য এলাকা থেকে এসেছে। চিকিত্সকরা জানান, ম্যালেরিয়া যখন মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে তখন রোগীর কিডনির সমস্যা, ফুসফুসে জটিলতা ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, অজ্ঞান হয়ে পড়ে এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। ফলে এসব রোগীকে আইসিইউ অথবা এইচডিইউতে রেখে চিকিত্সা দিতে হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম মেডিক্যালে আইসিইউতে মাত্র ৯টি বেড রয়েছে। ফলে মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ডে রেখে এসব জটিল রোগীকে চিকিত্সা দিতে হচ্ছে। যার কারণে রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. আমির হোসেন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, ‘পার্বত্য ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের উচিত জ্বর হলেই রক্ত পরীক্ষা করা। যদি ম্যালেরিয়া ধরা পড়ে তাহলে খুব দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। ম্যালেরিয়া রোগীদের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ, আইসিইউ, এইচডিইউ ও কিডনি বিভাগে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চিকিত্সা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’ চিকিত্সকরা জানান, ম্যালেরিয়ার ওষুধ সরকারিভাবে আমদানি করা হয়। আক্রান্ত রোগীকে প্রতিদিন দুই ডোজ করে তিনদিন ওষুধ খেতে হয়। পাশাপাশি ইনজেকশনসহ অন্যান্য ওষুধও খেতে হয়। তিনদিনের ৬ ডোজের ওষুধের মূল্য পড়ে প্রায় ৬০০ টাকা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল ও সিভিল সার্জন জানায়, তাদের কাছে ম্যালেরিয়া রোগের ওষুধ মজুদ রয়েছে। তবে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলে ওষুধের সংকট দেখা দিতে পারে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) প্রফেসর ডা. বেনজীর আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বর্তমানে মজুদ ওষুধ দিয়ে চলবে। আরো ওষুধ আনার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা চলছে। তিন পার্বত্য এলাকায় সাড়ে ৭ লাখ কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ করা হবে।’ ম্যালেরিয়া রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলার সিভিল সার্জন ডা. নারায়ণ চন্দ দাস ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, ‘সীমান্তবর্তী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ম্যালেরিয়া ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। যার কারণে পার্বত্য এলাকার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে লক্ষ্মীছড়ি, মানিকছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি ও জুড়াছড়ি উপজেলায় ম্যালেরিয়া মহামারীতে রূপ নিয়েছে। এসব এলাকা থেকে অন্য উপজেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। পার্বত্য এলাকায় চিকিত্সকরা জানান, এই বছর থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। আবার অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে মানুষ মশারি না টাঙিয়ে ঘুমাচ্ছে। পাহাড়ি এলাকার বেশিরভাগ মানুষ জুমচাষ করেন। এই সময় তারা জঙ্গলে মশারি না টাঙিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। গরমের সময় মশার প্রজনন বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ইতিপূর্বে কীটনাশকযুক্ত যেসব মশারি সরবরাহ করা হয়েছে তা নির্ধারিত মেয়াদের আগেই কার্যকারিতা কমে যাওয়া ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে পার্বত্য এলাকার চিকিত্সকরা জানান। ম্যালেরিয়া রোগ নির্ণয়ের জন্য বর্তমানে সহজ মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। র্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট (আরডিটি) নামের যন্ত্রের মাধ্যমে ৩/৪ মিনিটের মধ্যে ম্যালেরিয়া রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। এসব মেশিন পার্বত্য এলাকাগুলোতে রয়েছে। গত সাত মাসে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ও মৃতদের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় (মহানগরীসহ) আক্রান্ত ৪৬৪ জন। এর মধ্যে মারা গেছে ৩৬ জন। তিন পার্বত্য এলাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ২৩ হাজার ৪৬৪ জন এবং মারা গেছে ২১ জন।