নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সারা বছর বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ ধরার ট্রলারসহ (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলার) বিভিন্ন ধরনের ট্রলার মাত্রাতিরিক্ত মাছ শিকার অব্যাহত রাখায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত এবং মাছের মজুদ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাণিজ্যিক ট্রলার, যান্ত্রিক নৌ-যান ও অযান্ত্রিক মাছ ধরার নৌ-যানগুলো সারা বছর বঙ্গোপসাগরের উপকূল মধ্যবর্তী এলাকা এবং গভীর সমুদ্র এলাকায় মাছ ধরার কারণে আহরিত বিভিন্ন ধরনের মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে বলেও গত কবছর ধরে তথ্য মিলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এখানে মাছ আহরণের ক্ষেত্রে ১৯৮৩ সালের সামুদ্রিক মাছ আহরণ সংক্রান্ত অর্ডিন্যান্স এবং পরবর্তী সময়ের নিয়মবিধিতে মাছের মজুদ-উত্পাদনবৃদ্ধি, মাছের প্রজাতি সুরক্ষায় বিস্তারিত দিকনির্দেশনা না থাকায় মাত্রাতিরিক্ত মাছধরা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এদিকে মাত্রাতিরিক্ত মাছ শিকারে বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুদের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তাও জানা যাচ্ছে না গত ত্রিশ বছরে এখানে কোনো জরিপ পরিচালিত না হওয়ায়।
বঙ্গোপসাগরে যে পরিমাণ ট্রলার মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিয়োজিত থাকার কথা তার চেয়ে বেশি ট্রলার প্রতিদিন মাছ ধরছে। এসব ট্রলারে মাছ শিকারীরা সাগরে মাছের প্রজনন মৌসুম এবং সাগরের পোনামাছ বৃদ্ধির নির্ধারিত সময়সীমার তোয়াক্কা করছেন না। ফলে পূর্ণবয়স্ক মাছের পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পোনা। এই ধ্বংসযজ্ঞ উপকূলীয় ও গভীর সমুদ্র এলাকা এবং চারটি মত্স্যক্ষেত্রে সমান তালে চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সামুদ্রিক মত্স্য দপ্তরের পরিচালক নাসিরউদ্দিন মো. হুমায়ুন বঙ্গোপসাগরে মাত্রাতিরিক্ত মাছ শিকারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণকারী ২৫টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারসহ মোট ২২৫টি ট্রলারকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার জন্য অনুমতি দেয়া আছে। তার বাইরেও মাছধরার ট্রলার হিসাবে পরিচিত মাত্রাতিরিক্ত মাছ ধরার যান্ত্রিক নৌ-যান এবং অযান্ত্রিক মাছ ধরার নৌকা সাগরে মাছ ধরার তত্পরতায় নিয়োজিত আছে। তিনি জানান, এক হিসাব মতে প্রায় ৩০ হাজার অযান্ত্রিক নৌকা বঙ্গোপসাগরে সারাবছর মাছ শিকার করে চলেছে। এগুলো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যান্ত্রিক পদ্ধতি এবং ধ্বংসাত্মক ‘গিয়ার’ ব্যবহার করায় সময়ে-অসময়ে সাগরের বিপুল পরিমাণ মত্স্যসম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রায় তিন দশক আগে জাতিসংঙ্ঘের ফাও ও ইউএনডিপির অর্থায়নে বঙ্গোপসাগরে ব্যাপক জরিপ চালিয়ে মাছের একটি মজুদচিত্র পাওয়া গিয়ে ছিল; কিন্তু সাগরের তল দেশে মাছের মজুদ এবং ফিশিং গ্রাউন্ডগুলোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এখন নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। তিনি জানান, তার কাছে থাকা একটি উপাত্ত অনুসারে তিনি জানতে পারেন, বর্তমানে বঙ্গোপসাগর থেকে ২৫/৩০ প্রজাতির মাছ বাণিজ্যিকভাবে আহরিত হচ্ছে। এখানে মোট ৪৭৫ প্রজাতির মাছ রয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে বঙ্গোপসাগর থেকে আহরিত হয়েছে ৭৩ হাজার টন মাছ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস এন্ড ফিসারিজ-এর সাবেক পরিচালক ড. মো. রাশেদ-উন-নবী ইত্তেফাককে বলেন, বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৩১ বছর আগে জরিপ হয়েছিলো। কাজেই গবেষণার জন্য নতুন কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। সাগরের মাছের মজুদ সংক্রান্ত গবেষকের সংখ্যা বাংলাদেশে হাতেগোনা। যারা ছিলেন তাদের অনেকেই অবসরে গেছেন। তিন দশক ধরে কোন জরিপ-গবেষণা জাহাজও নেই। কাজেই ওভারফিশিংয়ের কারণে ইতিমধ্যে বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুদের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তিনি বলেন, ওভারফিশিংয়ে সাগরের মত্স্য সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।
উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এক শ্রেণীর চিংড়ি চাষীর সহায়তায় বেহুন্দি জাল দিয়ে চিংড়ি পোনা সংগ্রহের সময় বিপুল পরিমাণ অন্যান্য প্রজাতির মাছের পোনা ধ্বংস করা হয় বলে বিশেষজ্ঞরা ইতিপূর্বে উদ্বেগ প্রকাশ করে ছিলেন।
