যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিএনপির নেতা মুজিবুর রহমানের অপহরণ এবং মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি এখনো রহস্যে ঘেরা। পুলিশ কর্মকর্তারাও এব্যাপারে কিছুই বলতে পারছেন না। মুজিবুর রহমানও এলোমেলো কথা বলছেন। কারা তাকে অপহরণ করেছিল সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না তিনি। তবে তার অভিযোগ, কোন প্রশিক্ষিত বাহিনীই তাকে নিয়ে গিয়েছিল। তারাই তাকে ছেড়ে দিয়েছে। তার ধারণা, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে তথ্য নিতেই তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। মুজিবুর রহমান বলেছেন, তারেক রহমান সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
এদিকে মুজিবুর রহমানের গাড়িচালক রেজাউল হক সোহেলের খোঁজ পেয়েছে পুলিশ। গতকাল বুধবার তাকে রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। চালকসহ মুজিবুরকে গতকাল সুনামগঞ্জ নিয়ে গেছে সেখানকার পুলিশ। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হেমায়েতুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় বলেছেন, ‘আমরা সকালের দিকে গুলশান এলাকা থেকে রেজাউলকে উদ্ধার করেছি। দু’জনকে নিয়ে সুনামগঞ্জ যাচ্ছি। আশা করছি, আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) আদালতে দু’জনেই তাদের অপহূত হওয়া ও মুক্তি পাওয়ার বিষয়ে জবানবন্দি দেবেন।’
রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার মুজিবুর রহমান কথা বলেন সাংবাদিকের সঙ্গে। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, অপহরণকারীরা তার কাছে বিএনপি সভানেত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের রাজনীতি নিয়ে ভাবনা ও কোথা থেকে তিনি টাকা পান, এসব ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করেছেন। তার ভাষ্যমতে, অপহরণকারীরা অত্যন্ত পেশাদার ও চতুর। তারা তাকে শারীরিক নির্যাতন করেছে। একই সঙ্গে তার কাছে ১২ কোটি টাকা মুক্তিপণও দাবি করেছে। তবে মুক্তিপণের দাবি মূল কারণ বলে মনে হয়নি তার। তিনি বলেন, অপহরণকারীরা তার কাছে জানতে চেয়েছে, তারেক রহমানকে কারা লন্ডনে নিয়ে যায়, কারা তাকে রিসিভ করেছিল, তারেক রহমানের টাকা কোথায় রয়েছে, তারেক রহমান কীভাবে টাকা পাচার করেছেন, তারেক রহমানের কোথায় কোথায় বাড়ি আছে, লন্ডনে তারেক রহমান কাদের কাছে চাঁদাবাজি করে, লন্ডনে ও সিঙ্গাপুরে তারেকের কয়টি বাড়ি আছে ইত্যাদি । এসব প্রশ্নের জবাবে মুজিব বলেন, ‘আমি বলেছি, তারেক রহমান আমার নেতা। লন্ডনে তিনি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। টাকা পাচার করেছেন বলে আমার জানা নেই।’
গত ৪ মে বিকালে সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গুম-খুনের প্রতিবাদে দলীয় অনশন কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে টুকেরবাজার এলাকা থেকে পুলিশ পরিচয়ে মুজিব ও তার গাড়িচালক সোহেলকে অপহরণ করা হয়। প্রসঙ্গতঃ একই স্টাইলে অপহরণের পর মুক্তি মিলেছে বেলার নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের তালিকাভুক্ত ঠিকাদার আবুল হাসনাত পলিনের। এখন পর্যন্ত আবু বকর ও পলিন ফিরে এলেও তাদের অপহরণ ও মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি রহস্যাবৃত্ত। মুজিবের ক্ষেত্রেও তাই হবে কি-না আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
মুজিবুর জানান, অপহরণকারীরা নির্ভুল ইংরেজি ও শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন। অপহরণের পর গাড়িচালক সোহেলের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। তবে দু’জনকে ফেলে যাওয়ার পর চোখ খুলে তারা একে অন্যকে দেখতে পান। চোখ বন্ধ থাকায় একই গাড়িতে আনা হয়েছে কি-না, তা নিয়েও স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি মুজিব। তিনি বলেন, প্রথম দিন থেকেই মাঝে মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই অপহরণকারীরা আমাকে মারধর করেছে। রাবার জাতীয় কোনো লাঠি দিয়ে তারা আঘাত করে। এর ফলে প্রচণ্ড আঘাত লাগলেও ত্বক কেটে যায়নি বা হাড় ভাঙেনি। কিন্তু দুই বা তিন দিন পর আমার বাম হাতের নখ প্লায়ার্স জাতীয় কিছু দিয়ে তুলে ফেলা হয়। তখন প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছে। তবে রমজান মাসে তারা ভালো ব্যবহার করেছে। আঘাতের স্থানগুলোয় মলম লাগিয়ে দিয়েছে। তারা পানির সঙ্গে নেশাজাতীয় কিছু মিশিয়ে খাওয়াত। মাঝে মধ্যে কী যেন একটা ইনজেকশন দিত। পুরো সময় নেশাগ্রস্তের মতো লাগত। এর ফলে ঘুমিয়েই কেটে যেত অধিকাংশ সময়।
