ঘাতকদের বিচার চাই

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৪, ২৩:২১
‘যা হারিয়েছি তা আর ফিরে পাব না। তবে মৃত্যুর আগে হলেও ঘাতকদের বিচার দেখে যেতে চাই’ এটাই এখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহতদের একমাত্র চাওয়া। আহতদের অনেকেই জীবন কাটাচ্ছেন হুইল চেয়ার কিংবা ক্র্যাচে ভর করে। শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রেনেডের বিষাক্ত স্প্লিন্টার। এখনও ভুলতে পারেননি সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনের সেই বারুদ আর রক্তের মাখামাখি দৃশ্য। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত হয়েছিলেন মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী বেগম আইভী রহমানসহ ২৪ জন। আহত হয়েছিলেন সাধারণ মানুষসহ ৪ শতাধিক নেতা-কর্মী। সেদিনের সেই আহতদের একজন পুরনো ঢাকার ৮১ নম্বর গেন্ডারিয়া ইউনিটের সভাপতি শরীফ হোসেন খোকন। ক্র্যাচে ভর করে বেঁচে থেকেও আঁকড়ে ধরে আছেন রাজনীতি। সেদিনের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সেদিনের কথা মনে হলে এখনও সারা শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে রাতে ঘুমাতে পারি না। তবে মৃত্যুর আগে হলেও ঘাতকদের উপযুক্ত বিচার দেখে যেতে চাই। আহতদের আর একজন রাজধানীর থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি দৌলতুন্নাহার। বোমা হামলায় সেদিন তিনি বাম চোখ হারান। ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল ডান পা-ও। সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, জীবদ্দশায় ঘাতকদের বিচার দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম। স্টাফ রিপোর্টার (সাভার) জানান, ঘটনার দিন মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানের পাশে যে তিনজন মহিলা কর্মী ছিন্নভিন্ন হয়ে ঘটনাস্থলে পড়ে ছিলেন তাদের একজন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা সাভারের মাহবুবা পারভীন। শরীরে এখনও স্প্লিন্টার নিয়ে বেেঁচ থাকা মাহাবুবা এখন চলাফেরা করেন অন্যের সহযোগিতা নিয়ে। তার বাম পাশটা প্রায় অচল হয়ে গেছে। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য তাকে একবারও দেখতে আসেননি। স্থানীয় অন্যান্য নেতারাও তার কোন খোঁজ-খবর রাখেন না। ঘাতকদের বিচারের প্রত্যাশা নিয়ে এখনো বেঁচে আছি। রংপুর অফিস জানায়, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত রংপুরের রেজিয়ার পিতা আফাজ উদ্দিন শেখ গ্রেনেড হামলার বিচার দেখে যেতে পারলো না। মেয়ের হত্যার বিচার বুকে নিয়ে গত ১৩ জুলাই তিনি মারা যান। কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গঙ্গানারায়ণ গ্রামের দরিদ্র কৃষক আফাজ উদ্দিনের ৪ মেয়ের মধ্যে রেজিয়া খাতুনের উপার্জনেই তাদের সংসার চলতো। বোনদের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। ২ পুত্র সন্তানের জন্মের পর স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেলে ঢাকায় গিয়ে চেষ্টা করেন অভাব-অনটন দূর করতে। এক সময় ঢাকার বাড্ডা এলাকায় স্থায়ী বসবাস শুরু করে। তার রোজগারেই চলতো বৃদ্ধ পিতা-মাতা ও ২ সন্তানের ভরণ-পোষণ। ঘটনার দিন আরো ২০ নারীকে নিয়ে গিয়েছিলেন জনসভায়। গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই মারা যান রেজিয়া খাতুন। ২২ আগস্ট স্বজনরা ঢাকায় গিয়ে তার লাশ সনাক্ত করে। চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, গ্রেনেড হামলায় নিহত কাঠ মিস্ত্রি আতিকুল ইসলাম ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আ. কুদ্দুছের পরিবারের লোকজন এখনো তাদের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সেদিনে ঘটনায় নিহত হন মতলব উপজেলার ৭নং মোহনপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের উত্তর পাঁচানী গ্রামের আতিকুল। তিনি পেশায় দিনমজুর ছিলেন। ঢাকায় ঢালাই শ্রমিকের কাজ করতেন। অন্যান্য নেতা-কর্মীদের মতো আতিকও সেদিন কাজকর্ম রেখে যোগ দিয়েছিলেন জনসভায়। গ্রেনেড হামলায় আতিক মারা যাওয়ায় সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করার চেষ্টায় লাইভী বেগম এখন দিশেহারা। পরিবারের সদস্যরা জানান, ১০ বছরেও কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি। এমনকি মৃত্যুবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোন মিলাদ বা স্মরণসভার আয়োজন করা হয় না। স্বজন হারানোর ব্যথা এবং অর্থনৈতিক সংকট তাদের জীবনকে করে তুলছে বিষাদময়। তাদের একটাই দাবি, খুনিদের যেন উপযুক্ত বিচার হয়। বিচারের প্রত্যাশা নিয়ে বেঁচে আছেন হাইমচর উপজেলা সদরের পূর্ব চরকৃষ্ণপুর গ্রামের কুদ্দুছ পাটোয়ারীর পরিবারের সদস্যরা। সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে দশ বছর ধরে চোখের পানি ঝরিয়ে অবশেষে এ বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি মারা যান কুদ্দুসের মা।