নদ-নদী উত্তাল, নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫১
পদ্মা, যমুনা, তিস্তাসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে পানি বাড়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। কয়েকটি জেলায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, শুধুমাত্র উজানের ঢলে আবারো উত্তাল হয়ে উঠেছে তিস্তা। তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে তিস্তার পানি বিপদসীমার (৫২ দশমিক ৪০ মিটার) ৩০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে নীলফামারী জেলার তিস্তারপাড়ের ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার প্রায় ১০ হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। অসহায় পরিবারগুলো ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদে সরে গেছে। এ ছাড়া আমনের ক্ষেতগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। তিস্তার বন্যার পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে বাইশপুকুরচর, কিসামত ছাতনাই, চর খরিবাড়ি, ছোটখাতা, ঝাড়শিঙ্গেরশ্বর, বাঘেরচর, টাবুর চর, ভেন্ডাবাড়ী, ছাতুনামা, হলদিবাড়ী, একতারচর, ভাসানীর চর, পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, গয়াবাড়ী, খালিশাচাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গোলমুণ্ডা, ডাউয়াবাড়ী, শৌলমারী ও কৈমারী এলাকা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, বন্যার পানিতে ১৫০ হেক্টর আমন ক্ষেত তলিয়ে গেছে। তবে ২/৩ দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে আমন ধানের ক্ষতি হবে না। গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ভাগ্যকূল গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি বৃদ্ধির কারণে উপজেলার দৌলতদিয়া, উজানচর ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের অধিকাংশ নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক’শ পরিবার। এছাড়া কিছু এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দেয়ায় অনেক পরিবার অন্যত্র সরে গেছে। গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় গতকাল তিস্তার পানি বিপদসীমার ১৫ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতো উপজেলার ১৭টি গ্রামের প্রায় ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে আমন ক্ষেত, ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। দেখা দিয়েছে নিরাপদ পানি ও খাবারের সঙ্কট। এছাড়া আলমবিদিতর ইউনিয়নে ব্যাংকপাড়া এলাকায় মার্জিনাল ডাইকের দেড় হাজার ফুট অংশ ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নে শংকরদহ চরে সদ্য নির্মিত একটি বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। বন্যা কবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে শুকনা খাবার প্রয়োজন বলে জানান স্থানীয় কোলকোন্দ ইউপি চেয়ারম্যান মমিনুর ইসলাম। সরিষাবাড়ী (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান গতকাল বিকাল ৪টায় যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৭০ সেমি উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আকস্মিক এই পানি বৃদ্ধিতে উপজেলার সাতপোয়া, পোগলদীঘা, পিংনা ও কামরাবাদ ইউনিয়নের ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের প্রায় কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের অনেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক পরিবার আবার পানিবন্দি ঘরের মধ্যেই বাঁশের চাটাই তৈরি করে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। সেখানে জ্বালানি, খাদ্য, বস্ত্র ও খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত কোন ত্রাণ সহায়তা পাননি বানভাসিরা। কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় কাজীপুরে ৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এখানকার ৮ ইউনিয়নের ৭৫টি গ্রামের ২০ হাজার পরিবারের অন্তত ১ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে ৪৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১০ হেক্টর বোনা আমন, ২১৩০ হেক্টর রোপা আমন, ১৯০ হেক্টর আউস ধান, ১০ হেক্টর আখ এবং ১৭ হেক্টর জমির শাক-সবজি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া ২৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বন্যার পানি উঠেছে এবং ৬৭ কিমি কাঁচা সড়ক ও ১২১টি পুকুরের প্রায় ৮৬ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাফিউল ইসলাম জানান, বন্যার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য ৩০ মে. টন চাউল এবং নগদ এক লাখ টাকা পাওয়া গেছে। এছাড়া চিকিত্সা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৩টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, বন্যার পানিতে উপজেলা সদর, কাজলা, কর্ণিবাড়ী, বোহাইল, চন্দনবাইশা, কামালপুর, কুতুবপুর, হাটশেরপুর ও চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এটি এম বেনজির রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা ও ২০ মে.টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা জমা দিলে আজ শুক্রবার থেকে তা বিতরণ করা হবে। সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়াসহ কয়েকটি স্থানে নদী ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি ৫ সেমি ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৯ সেমি বৃদ্ধি পাওয়ায় কাপাসিয়া ইউনিয়নের কাজিয়া চর, বাদামের চর, ভাটি কাপাসিয়া, পূর্ব লালচামার, উজান বুড়াইল ও ভাটি বুড়াইলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল সৃষ্ট বন্যায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন উপজেলার প্রায় ২০ হাজার মানুষ। তলিয়ে গেছে ৪ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ক্ষেত। দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন বন্যাকবলিতরা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হায়াত্ মো. রহমতুল্লা বলেন, ঘরে চাল ডাল থাকলেও রান্না করতে না পারায় সংকটে পড়েছে পানিবন্দী মানুষগুলো। চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যমুনার পানি বাড়তে থাকায় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর-চৌহালীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যমুনা নদীর এ পয়েন্টে পানি কম বাড়লেও বৃহস্পতিবার সকালে তা বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি বৃদ্ধিতে নতুন-নতুন এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে এ ২টি থানার অন্তত ৬০টি গ্রাম বন্যা আক্রান্ত হওয়ায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন অন্তত অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। গতকাল পর্যন্ত এসব এলাকার দুর্ভোগে পড়া মানুষগুলো কোন সরকারি সহায়তা পাননি। এদিকে পানি বাড়ায় চৌহালীর বোয়ালকান্দি থেকে পাথরাইল পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দেখা দিয়েছে ভাঙ্গন। গত ২ দিনের ভাঙ্গনে কয়েকশ’ ঘর-বাড়ি এবং উপজেলা পরিষদে অবস্থিত আদালত ভবন নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বিপদসীমা ছুঁই-ছুঁই অবস্থানে পৌঁছেছে। এতে ৫টি ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ঘরবাড়ি বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবল নদী ভাঙ্গনও দেখা দিয়েছে। বাসাইল (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, প্রবল বর্ষণ ও নদী ভাঙ্গনের ফলে ঝিনাই নদী তীরবর্তী প্রায় ৫০টি পরিবার গৃহহারা হয়েছে। গত তিন দিনে স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার দাপনাজোর, নথখোলা, কাজিরাপাড়া, আদাজান, বিলপাড়া ও কাশিল গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবারের বাড়িঘর ঝিনাই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। শুধু কাশিল ইউনিয়নেরই ৩০টি পরিবারের বাড়িঘর নদী গর্ভে চলে গেছে। নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে তিন হাজার হেক্টর জমির আমন ক্ষেত। এতে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় টানা বৃষ্টিপাতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার মাগুড়া থেকে টেংগনমারী পর্যন্ত প্রধান সড়কটির চার স্থানে গর্ত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ডাকাত আতংক:রাত জেগে পাহারায় বানভাসিরা দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, বন্যায় পৌর এলাকাসহ অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষ দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। বন্যাকবলিত অনেকেই তাদের বাড়িঘর ছেড়ে বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। চিকাজানীর পশ্চিম ডাকাতিয়া গ্রামের চান মিয়া দেওয়ানী (৭০), মাজহার, নূর প্রামাণিকসহ অনেকে জানান, রাত হলেই সশস্ত্র ডাকাতদল নৌকা ভিড়িয়ে গবাদি পশু লুট করার চেষ্টা করে। তবে দুর্গত লোকজন একত্র হয়ে তাদের প্রতিরোধ করছে। তারা প্রতিরাতে ৩টি পয়েন্টে রাত জেগে পালা করে পাহারা দিচ্ছেন। রাজারহাটে তিস্তায় ভাঙ্গন, ৫০ ঘরবাড়ি বিলীন রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে তিস্তা রাক্ষুসী রূপ ধারণ করেছে। গত ৩ দিনের ব্যবধানে বিদ্যানন্দ ইউপি’র মন্দির ও পাড়ামৌলা এলাকায় তৃতীয় দফায় তীব্র ভাঙ্গনে ৫০টি পরিবারের বসতভিটা, এক কিলোমিটার বাঁধ রাস্তা, কয়েক একর ফসলি জমি, মত্স্য খামার, গাছ-পালাসহ ডাংরারহাট বাজার সংলগ্ন ৬নং ক্রস বাঁধের প্রায় ১৪ মিটার নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রবল ভাঙ্গনে পাড়ামৌলা ও মন্দির মৌজা দুটি মানচিত্র থেকে হারাতে বসেছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙ্গন প্রতিরোধে গতকাল পর্যন্ত কোন ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।