দলীয় সংসদ সদস্যদের কে কার পক্ষে নিতে পারেন, এনিয়ে একরকম প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছেন জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ এবং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ। দলের পাশাপাশি এরশাদ সংসদীয় পার্টির নেতৃত্বও নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টায় নেমেছেন। আর রওশন চান সংসদীয় দলের নেতৃত্ব ধরে রাখতে। দু’জনের এই প্রতিযোগিতায় টানাটানিতে পড়েছেন দলটির সংসদ সদস্যরা।
জাপার কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা রয়েছে এরশাদের। দলীয় কোনো সভা-সমাবেশে প্রকাশ্যে না বললেও ‘নিজের লোক’ মনে করা সংসদ সদস্যদের কারও কারও কাছে তিনি ইতিমধ্যে এই ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তার এই ইচ্ছার খবর জেনে গেছেন রওশনও, অনেকটা নাটকীয়ভাবে পেয়ে যাওয়া ‘বিরোধী দলীয় নেতা’র পদটি হাতছাড়া করতে রাজি নন তিনি। এজন্য ‘আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই’- এরশাদ ও রওশন প্রকাশ্যে এরকম কথা বললেও বিরোধী দলীয় নেতার পদ নিয়ে দু’জনের মধ্যে চলছে কৌশল, পাল্টা কৌশলের লড়াই।
পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে দু’একজন ছাড়া দলের ৩৪ জন সংসদ সদস্যের প্রায় সবাই ছিলেন রওশনের সঙ্গে। পরে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হওয়া দলের চার নারী সংসদ সদস্যও ছিলেন রওশনের নিয়ন্ত্রণে। তার এই নিয়ন্ত্রণে আস্তে-আস্তে ফাটল ধরান এরশাদ। নানা কৌশলে একজন, দু’জন, তিনজন করে কয়েকজন এমপিকে রওশনের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে এনে নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হন তিনি। বলতে গেলে দলীয় ৩৮ জন সংসদ সদস্যের বেশিরভাগেরই এখন সখ্য এরশাদের সঙ্গে। এবার পাল্টা রওশনকে কর্তৃত্বহীন করার লক্ষ্যে নিজ পক্ষে সংসদ সদস্যদের পাল্লা আরও ভারি করতে নরমে-গরমে আগাম সতর্কবার্তাও দিতে শুরু করেছেন তিনি।
দলের যেসব এমপি এখনও রওশনের সিদ্ধান্তে চলছেন এবং দলীয় সভা-সমাবেশে হাজির থাকছেন না, তাদের উদ্দেশ্য করে বুধবার এরশাদ বলেছেন ‘এমপি ভাইয়েরা, আপনারা যারা আমার অনুষ্ঠানে আসছেন না, তারা মনে রাখবেন- আগামী নির্বাচনে আমার স্বাক্ষর ছাড়া কেউ মনোনয়ন পাবেন না। নির্বাচন করতে হলে আমার স্বাক্ষর লাগবে। দলের গঠনতন্ত্রে আমাকে সে বিষয়ে সর্বময় ক্ষমতা দেয়া আছে। তোমরা যদি মনে কর, অন্য কেউ তোমাদের মনোনয়ন দেবে, সেটি পারবে না। তাই তোমাদের বলব-তোমরা আমার কাছে এসো, আমার পাশে দাঁড়াও, দল কর, নইলে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবে না, এমপি হতে পারবে না।’ ঢাকা মহানগর জাপার নবনিযুক্ত আহ্বায়ক সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাসহ নতুন কমিটির সংবর্ধনা উপলক্ষে বুধবার রাজধানীর কাকরাইলে জাপার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে এরশাদ দলীয় এমপিদের উদ্দেশে এই সতর্কবার্তা দেন।
এরশাদ যখন বুঝতে পেরেছেন, দলীয় এমপিদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তার সঙ্গে আছেন, তখনই তিনি বাধ সাধেন ‘বিরোধী দলীয় উপনেতা’ মনোনয়নের প্রক্রিয়ায়। গত ২৭ জুলাই জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে দেয়া এক চিঠিতে রওশন এরশাদ জানান, জাপার সংসদীয় পার্টি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদকে বিরোধী দলীয় উপনেতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তিনি স্পিকারকে অনুরোধ করেন। কয়েকদিন পরেই এতে বাধা দেন এরশাদ। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জাপা চেয়ারম্যান বলেন ‘বিরোধী দলীয় উপনেতার বিষয়ে জাপা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ ব্যাপারে যা বলা হচ্ছে তা বিভ্রান্তিকর ও অসত্য।’ শুধু বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত হননি তিনি। দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে দিয়ে একটি চিঠিও দেন স্পিকারের কাছে। সেই চিঠিতেও তিনি জাপা এখনও কাউকে বিরোধী দলীয় উপনেতা মনোনয়ন দেয়নি বলে জানিয়ে দেন।
গণমাধ্যমে বিবৃতি ও স্পিকারকে চিঠি দেয়ার পর রওশনকে আরও চাপে ফেলতে ঢাকা-৬ আসনের এমপি কাজী ফিরোজ রশীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক অ্যাকশনে যান এরশাদ। গত ৯ আগস্ট ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) জাপার আহ্বায়কের পদ থেকে কাজী ফিরোজ রশীদকে বাদ দেন তিনি। ওই পদে নিয়োগ দেন ঢাকা-৪ আসনের দলীয় এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাকে। এরশাদের আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে ফিরোজ রশীদ ইত্তেফাককে বলেন ‘এটা এরশাদের দল, উনি যেভাবে চালান সেভাবেই চলে, কখন কাকে রাখবেন-কাকে বাদ দেবেন, সেটি ওনার বিষয়।’
পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে এরশাদ যখন নাটকীয়ভাবে সরে দাঁড়ান তখন রওশনের সঙ্গে নির্বাচনে পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন দলের দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। জুনে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে দিয়ে এরশাদ দলের মহাসচিব পদ দেন বাবলুকে। এরপর থেকে ব্যারিস্টার আনিস ও বাবলু দু’জনই এখন এরশাদের আস্থাভাজন। মহাসচিব পদ হারানো রুহুল আমিন হাওলাদার প্রকাশ্য কোনো পক্ষ-বিপক্ষ না নিয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। স্বামীর পথ অনুসরণ করছেন হাওলাদার পত্নী নাসরিন জাহান রত্না এমপিও। সংরক্ষিত আসনের দলীয় এমপি মাহ্যাবীন মোরশেদকেও নিজের পক্ষে নিয়েছেন এরশাদ। এজন্য চট্টগ্রাম মহানগর জাপার আহ্বায়ক পদ থেকে সোলায়মান আলম শেঠকে বাদ দিয়ে মাহ্যাবীনকে ওই পদ দিয়ে দেন তিনি। এভাবে দলীয় এমপিদের কাউকে পদ-পদবি দিয়ে, কাউকে দলীয় পদোন্নতি দিয়ে, কাউকে সংসদে ভূমিকার জন্য প্রশংসা ও উত্সাহ দিয়ে, আবার কাউকে ভবিষ্যত স্বপ্ন দেখিয়ে পক্ষে টানার কাজ করছেন এরশাদ। এরশাদের কাছে গুরুত্ব না পাওয়ায় কয়েক এমপি রওশনের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন। কেউ কেউ নিজেদের সুবিধা মতো আচরণ করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে চলছেন। এমপিদের পক্ষে টানার প্রতিযোগিতায় এবং দলীয় সভা-সমাবেশে সরব উপস্থিতির দৌড়ে পিছিয়ে পড়া রওশন ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন। বিরোধী দলীয় নেতা হওয়ার পর শুরুতে বেশিরভাগ দিবস বা ইস্যুতে বিবৃতিও দিতেন না তিনি। সেখানে এখন বন্যা ও গাজায় ইসরায়েলের আক্রমণ থেকে শুরু করে সব বিষয়েই নিয়মিত বিবৃতি দিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন রওশন। পাশাপাশি বিরোধী দলীয় নেতা ও দলের সংসদীয় পার্টির নেতা হিসেবে বিভিন্নভাবে সুযোগ-সুবিধা দিয়েও এমপিদের নিজের পক্ষে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
