ডেটলাইন : ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩।পারো, ভুটান।
চারদিকে পাহাড়ঘেরা ছোট্ট বিমানবন্দরের রানওয়ে ছুঁল ড্রুক এয়ারের বিমানটি। ড্রুক এয়ার ভুটানের জাতীয় বিমান সংস্থা। অন্যরকম এক আনন্দ উত্তেজনায় ফুটছি আমি। আমার বন্ধুরাও। ছোট্ট বিমানটি রানওয়েতে স্থির হতেই ওভারহেড লকার থেকে হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। ভেতরে উত্তেজনা—এই প্রথম নিজের দেশ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো দেশ দেখব নিজের চোখে। ছবিতে নয়। দু চারজন বন্ধুকে পেছনে ফেলে একটু দ্রুতই দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।
দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। সিঁড়ি লেগেছে দরজার মুখে। এক এক করে বেরিয়ে যাচ্ছেন যাত্রীরা। আমি এসে দাঁড়ালাম দরজায়। মুহূর্তেই ভয়ঙ্কর শীতল ঝোড়ো হাওয়া শরীরের অনাবৃত অংশে বিঁধছিল অজস্র তিরের ফলার মতো। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। হাওয়া যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে আমাকে। নিজেকে ধাতস্থ করে নেমে এলাম মাটিতে। না-শীত না-গরমের ঢাকা থেকে হিমশীতল পারোতে। আধুনিক এক জনপদ থেকে প্রায় প্রাগৈতিহাসিক ভূখণ্ডে। প্রাগৈতিহাসিক বলছি এজন্য যে, দেশে আমরা তখন বিটিভির মাধ্যমে সিএনএন-এর সম্প্রচার দেখছি। অথচ ভুটানে তখনো কোনো দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক পত্রিকা নেই। নেই কোনো রেডিও বা টিভি স্টেশন। ওদের সমাজটা মাতৃতান্ত্রিক আর মানুষগুলো ভীষণ সরল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্স শেষ বর্ষের ২৪ জন ছাত্র-ছাত্রী ও ৬ জন শিক্ষকসহ আমরা এসেছি শিক্ষা সফরে। ভুটান থেকে নেপাল হয়ে দার্জিলিং যাব। সেখান থেকে কলকাতায় তিন রাত থেকে ঢাকা ফিরব। সতেরো দিনের এ সফর।
ঢাকা থেকে যাত্রার ত্রিশ-চল্লিশ মিনিটের মাথায় বিমানের জানালা দিয়ে লক্ষ করলাম সাদা পেঁজা মেঘ তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। আরো কিছুক্ষণ পর মনে হলো শুভ্র বরফের ওপর দিয়ে চলেছে আমাদের বায়ুযান। দিগন্ত বিস্তৃত এই বরফের চাদর। জানতে পারলাম আমরা হিমালয়ের রাজত্বে এসে পড়েছি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভুটান হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাংশে অবস্থিত। দেশটির উত্তরে চীনের তিব্বত অঞ্চল এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারত। ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের পুরো দেশটাই পাহাড় দিয়ে ঘেরা। বিমান যখন পারোর আকাশে উড়ছিল, জানালা দিয়ে দেখলাম নিচে পাহাড়ের সারি, মাথায় তুষারের শুভ্রমুকুট। কোথাও কোথাও শুধু পাহাড়চূড়া নয়, পুরো পাহাড়ই গায়ে দিয়েছে তুষারের চাদর।
রানওয়েতে নেমেই শিহরণ বয়ে গেল শরীরজুড়ে। যেদিকে তাকাই শুধু পাহাড় আর পাহাড়। তীব্র শীত আর ঝোড়ো হাওয়া উপেক্ষা করে আমরা মেতে উঠলাম ছবি তোলায়। বন্ধুদের অনেকেই সঙ্গে করে ক্যামেরা এনেছে। প্রত্যেকের সংগ্রহে কয়েক রোল ফিল্ম আছে। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়ানো গেল না রানওয়েতে। দ্রুত হেঁটে আমরা টার্মিনাল ভবনে ঢুকে গেলাম।
এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ভবন দেখে খুবই হতাশ হলাম। মাঝারি আকারের তিন-চারটা কক্ষ নিয়ে ছোট্ট টার্মিনাল ভবন। প্রবেশপথের দরজা রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। সম্ভবত দরজার লক নষ্ট। ভুটানে পোর্ট এন্ট্রি ভিসা। সবাই পাসপোর্ট বের করে ভিসা ফর্ম পূরণ করতে ব্যস্ত। ভিসার ফরমালিটিজ শেষ করে বাইরে এসে দেখি মিশুক (আশফাক মুনীর) স্যার একটা বাস ঠিক করেছেন থিম্পু যাওয়ার জন্য। স্যার এসব কাজে খুবই পারদর্শী। সঙ্গে আছেন আমাদের আরো চার শিক্ষক—অধ্যাপক গোলাম রহমান, অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান, অধ্যাপক সুব্রত শংকর ধর ও বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক শাহেদ কামাল। অধ্যাপক গোলাম রহমান ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান। সঙ্গে তাঁর স্ত্রীও আছেন। সব মিলে আমরা ৩০ জন।
পারোতে বিমান অবতরণের পর যে মুহূর্তে মাটিতে পা রাখলাম, নিঃশ্বাস নিলাম, মনে হলো বাতাস এখানে কত নির্মল কত শুদ্ধ। আমরা তখন সমু্দ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৫০০ ফুট ওপরে। পুরো ভুটানই পাহাড়ি জনপদ। এখানে সমতল ভূমি নেই বললেই চলে। পাহাড়ের মাঝে মাঝে কিছু উপত্যকা। পারো এমনই একটি উপত্যকা। সমগ্র ভুটানে দ্বিতীয় কোনো বিমানবন্দর করার মতো পারোর আয়তনের সমতল ভূমি নেই।
একসময় ভুটান পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত অনেকগুলি আলাদা আলাদা রাজ্য ছিল। ষোড়শ শতকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে এর আবির্ভাব। ১৯০৭ সাল থেকে ওয়াংচুক বংশ দেশটি শাসন করে আসছেন। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ভুটান একটি বিচ্ছিন্ন দেশ ছিল। ১৯৬০-এর দশকে ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে দেশটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।
বেশিরভাগ দেশ চায় পর্যটন শিল্প থেকে আয় করতে। সেজন্য যত রকমের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ভুটানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম। তারা পর্যটকসংখ্যা একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে রাখতে চায়, যেন নিজেদের সংস্কৃতি ঠিক থাকে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলায় এটা ওদের নিজস্ব কৌশল। হিমালয়ের কল্যাণে উঁচু পর্বতমালা, সবুজ বন আর স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার কারণে পর্যটকদের প্রিয় ডেস্টিনেশন এই ভুটান।
দেশটির আনুষ্ঠানিক নাম কিংডম অব ভুটান। এখানকার অধিবাসীরা নিজেদের দেশকে তাদের মাতৃভাষা জংখা ভাষায় ‘দ্রুক ইয়ুল’ বা ‘বজ ড্রাগনের দেশ’ নামে ডাকে।
আমাদের বাস থিম্পুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল। আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। কখনো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কখনো বা ঘুরতে ঘুরতে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে উঠছি আর নামছি। খানিকটা দূরে অনেক উঁচু একটা পাহাড় চোখে পড়ল। কিছুক্ষণ পর দেখি আমাদের বাস ওই উঁচু পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় উঠে গেছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই ভয়ে বুকের মধ্যে ঢিব ঢিব শব্দ করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ বাইরে না তাকিয়ে জড়সড়ো হয়ে বসে আছি। যে পাহাড়গুলো পার করে এসেছি সেগুলো এখন অনেক ছোট লাগছে। একটু পরই আবার ওপর থেকে নিচে নামা শুরু হলো। চারদিকে চোখ জুড়ানো সবুজে ঘেরা পাহাড়। কোনো কোনো পাহাড়ের চূড়া মেঘের ওপর চলে গেছে। পাহাড়ের গায়ে আটকে আছে ধবধবে সাদা মেঘ। কখনো কখনো বাসের জানালা দিয়ে মেঘ ঢুকে পড়ছে ভেতরে। আহা, কী অপূর্ব!
হঠাত্ খেয়াল করলাম শুরু থেকেই একটা লেক আমাদের সঙ্গে এঁকেবেঁকে চলেছে। বাসের চালক গাইডের মতো ধারা বিবরণী দিয়ে যাচ্ছে। সে জানাল এই লেকের শুরু পারোর কোনো এক পাহাড়ের ঝরনা থেকে এবং এটি পারো থেকে থিম্পু পর্যন্ত এভাবে চলে গিয়ে কোনো এক নদীর সঙ্গে মিশে গেছে। লেকের একেবারে কিনার ঘেঁষে যাওয়ার সময় কানে ভেসে আসছে বয়ে যাওয়া পানির কলকল শব্দ।
নৈসর্গিক সৌন্দর্যের দেশ ভুটান। পৃথিবীর স্বর্গ এই ছোট্ট সুন্দর দেশটির অপার সৌন্দর্য দেখে মন ভরে যায়।
আমরা থিম্পুতে পৌঁছালাম পড়ন্ত বিকেলে। সূর্য পাহাড়ের আড়ালে ঢেকে যাওয়ায় দিনের আলো কমে এসেছে। দ্রুত সন্ধ্যা নেমে এল। রাস্তায় বিদ্যুত্বাতি জ্বলে উঠল।
খুবই ছোট শহর থিম্পু। চারতলার চেয়ে উঁচু কোনো ভবন চোখে পড়ল না। আমাদের বাসের চালক একটি হোটেলের সামনে বাস থামিয়ে এখানে রুম খালি আছে কি না দেখতে বলল। বাইরে থেকে হোটেলের চেহারা দেখে পছন্দ হলো না। হলুদ রঙের একটা তিনতলা ভবন। ছোট ছোট জানালা। আশপাশে একতলা দোতলা কয়েকটা ভবন। ছোট্ট সাইনবোর্ডে হোটেলের নাম লেখা। কিছুটা দূরে কয়েকটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। গাইডকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এইটাই থিম্পু সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল। এখান থেকে ভুটানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর যেমন পারো, ফুনসলিং, পুনাখাসহ অন্যান্য জায়গায় বাস চলাচল করে। ভারতের কয়েকটি রাজ্যেও যাওয়া যায়।
গোলাম রহমান স্যার, মিশুক স্যার ও সুব্রত স্যার নেমে গেলেন হোটেল ঠিক করতে। সঙ্গে আমি আর নাসির গেলাম। সাখাওয়াত স্যার ও শাহেদ কামাল স্যার বাসেই বসে থাকলেন। অন্যদের বাসে বসে থাকতে বলা হলো। কারণ এ হোটেলে রুম পাওয়া না গেলে অথবা পছন্দ না হলে অন্য হোটেল খুঁজতে যেতে হতে পারে।
দোতলায় হোটেল রিসিপশন ও রেস্টুরেন্ট একসঙ্গে। রিসিপশনে এক তরুণী বসে আছে। সঙ্গে একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোকও আছেন। সম্ভবত তিনিই হোটেলের মালিক। ভাবসাব দেখে তাই মনে হচ্ছে। মোটা গ্লাসের চশমাপরা। গলায় লাল মাফলার পেঁচানো। মাথায় নেপালি টুপি। মুখের চামড়া কিছুটা কুঁচকানো। গোলাম রহমান স্যার ও মিশুক স্যার তার সঙ্গে কথা বলছেন। আমি ও নাসির একটু দূরে বসে আছি। মনে হচ্ছে অনেক বার্গেনিং চলছে। সুব্রত স্যার চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রৌঢ় ভদ্রলোক চমত্কার ইংরেজিতে কথা বলছেন। কিছু কিছু শব্দ কানে আসছে। এক পর্যায়ে হোটেলের মালিকের চেহারা দেখে মনে হলো স্যারদের প্রস্তাবে তিনি রাজি হয়েছেন। কারণ এই প্রথম তার মুখে হাসি দেখলাম এবং একজন ওয়েটারকে নির্দেশ দিলেন সবাইকে চা খাওয়াতে।
আমি উঠে গিয়ে গোলাম রহমান স্যারকে বললাম, আমরা আরো দুই একটা হোটেল দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না?
স্যার বললেন, শোনো, এর চেয়ে বড় হোটেল থিম্পুতে নেই। আমাদের সৌভাগ্য যে একসঙ্গে এতগুলো রুম এই হোটেলে পেয়েছি। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কাজেই অন্য কিছু চিন্তা করার সময় নেই। নিচে গিয়ে সবাইকে বাস থেকে লাগেজ নিয়ে নেমে আসতে বলো।
হোটেলের নাম নরলিং। ভুটানে চার রাত আমরা এই হোটেলেই থাকব।
আমি এবং নাসির বাসের কাছে ফিরে গিয়ে দেখি, শাহেদ কামাল স্যার ঠাণ্ডার মধ্যে বাসের সামনে পায়চারি করছেন। স্যারকে দেখে খুবই বিরক্ত মনে হলো। কাছে যেতেই বললেন, তোমাদের দুই বন্ধু টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে বাস থেকে নামল। প্রায় ৩০ মিনিট হয়ে গেল এখনো আসছে না। অচেনা শহরে এরা গেল কোথায়? হোটেলে গেছে কি না দেখে আসো।
আমি বললাম, হোটেল রিসিপশন থেকে এইমাত্র আমরা এলাম। সেখানে ওরা যায়নি। আশপাশে হয়তো কোথাও গেছে। চিন্তা করবেন না স্যার আমি দেখছি। হোটেল ঠিক হয়ে গেছে। আমরা এখানেই থাকব। গোলাম রহমান স্যার সবাইকে বাস থেকে নামতে বলেছেন। আপনি হোটেলে চলে যান। ওরা না আসা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করছি।
নাসির বাসে গিয়ে সবাইকে নামতে বলল। স্যার খুবই বিরক্ত হয়ে বাস থেকে নিজের লাগেজ কাঁধে নিয়ে হোটেলের দিকে হাঁটা শুরু করলেন। এরমধ্যে গোলাম রহমান স্যার ও মিশুক স্যারও নিচে নেমে এসেছেন। সবাই যার যার লাগেজ নিয়ে হোটেলের দিকে চলে গেল। রেজা ও শাহজাদার লাগেজ কেউ নিতে রাজি না। আমি প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি ওদের অপেক্ষায়।
ভিনদেশে আমার এই প্রথম ভ্রমণ। রাস্তা দিয়ে দু চারজন মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। তাদের চেহারা এবং পোশাক সম্পূর্ণ অন্যরকম। মাঝে মাঝে দুই একজন ট্যুরিস্ট চোখে পড়ছে। উঁচু কোনো ভবন চোখে পড়ছে না। চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, থিম্পুতে বড় কোনো শপিংমল নেই। বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিটানো কিছু দোকান আছে। ভারতীয় বিভিন্ন পণ্যই বেশি চলে। নিজেদের তৈরি হ্যান্ডলুমের পোশাক পরে স্থানীয়রা। এক পর্যায়ে আমাকে বলল, তুমি ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে না থেকে হোটেলে চলে যাও। তোমার বন্ধুরা এলে আমি হোটেলে পৌঁছে দেব।
আমি বললাম, ওরা যদি হারিয়ে যায়? অন্য কোথাও চলে যায় রাস্তা ভুলে?
ড্রাইভার হেসে বলল, থিম্পু খুবই ছোট শহর। এখানে হারানোর কোনো সুযোগ নাই।
ড্রাইভার ও হেলপার সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলছে। ভুটানের শিক্ষার হার অনেক বেশি। প্রাথমিক শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। আর ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সবাইকে পড়তে হয়। তাই এখানে বাসের ড্রাইভার-হেলপাররাও কাজ চালানোর মতো ইংরেজি বলতে পারে। হঠাত্ চোখে পড়ল পশ্চিম দিক থেকে ওরা দুজন খোশমেজাজে গল্প করতে করতে হেঁটে আসছে। সবাই যে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এ বিষয়ে যেন ওদের কোনো চিন্তাই নেই। জিজ্ঞেস করে জানলাম ওরা দুজন কাছেই একটা দোকানে চা খেতে গিয়েছিল।
আমি বললাম, শাহেদ কামাল স্যার খুবই বিরক্ত। টয়লেটের নাম করে এভাবে চা খেতে চলে যাওয়াটা মোটেও ঠিক হয়নি। তোদের আজ খবর আছে।
আমার কথায় আলি রেজাকে মোটেও চিন্তিত মনে হলো না। কিন্তু শাহজাদা খুবই চিন্তিত হলো। জিজ্ঞেস করল, স্যার কি খুব বেশি রেগে গেছেন?
আমি বললাম, রাগ করবেন না তো কী করবেন! হোটেলে চল তারপর বুঝবি।
শাহজাদা বলল, আমার কী দোষ! রেজাই তো আমাকে জোর করে নিয়ে গেল।
আমি বললাম, এখন এসব বাদ দিয়ে হোটেলে চল আগে।
দোতলায় উঠতেই দেখি রিসিপশনের সামনে মিশুক স্যার নাসিরের সঙ্গে রাগারাগি করছেন। কারণ নাসির ট্যুর কো-অর্ডিনেটর। সে কারণে তাকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে কেন দুজন না বলে বাইরে গেল।
নাসির বলল, আমি তো বাসে ছিলাম না। তা ছাড়া কে কোথায় কখন গেল, কেন গেল আমি কিভাবে বলব?
এরমধ্যে আমার সঙ্গে রেজা ও শাহজাদাকে দেখে স্যারের রাগ আরো বেড়ে গেল। শাহজাদা সামনে না এসে এক কোনায় গিয়ে দাঁড়াল। শাহেদ কামাল স্যার রেজার কাছে এসে বললেন, টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে কোথায় গিয়েছিলে? রেজা কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্যারের রাগ আরো বেড়ে গেল। বললেন, টয়লেট করতে হোটেলে না এসে বাইরে গিয়েছিলে কেন? রেজা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এরমধ্যে সাখাওয়াত স্যার ও সুব্রত স্যার এগিয়ে এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলেন।
গোলাম রহমান স্যার আটটি রুমের চাবি এনে আমাকে দিয়ে বললেন, তুমি এবং নাসির মিলে সবার রুম বরাদ্দ করবে।
কে কোন রুমে কার সঙ্গে থাকবে তা ঠিক করার দায়িত্ব পড়ল নাসির ও আমার ওপর। অনেক কঠিন এবং জটিল একটা কাজ। এটা ঠিক করতে রীতিমতো আমাদের ঘাম বেরিয়ে গেল। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পছন্দকে একসঙ্গে মিলানো খুবই কষ্টকর কাজ। এ ওর সঙ্গে থাকবে তো ও এর সঙ্গে থাকবে না। আবার কেউ বলছে চারজনের বেশি একরুমে হলে সেখানে সে থাকবে না। শাহজাদা জানাল, সে কারো সঙ্গে রুম শেয়ার করতে পারবে না। তাকে বললাম, সিঙ্গেল রুমে থাকতে হলে নিজের টাকায় রুম ভাড়া করে থাকো। স্যারদের জন্যও কোনো সিঙ্গেল রুমের ব্যবস্থা নাই।
জটিল এক সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলাম। অনেক কষ্টে এই সমস্যার সমাধান করা হলো। কোনো রুমে চারজন, কোনো রুমে তিনজন, কোনো রুমে দুজন। মেয়েদের জন্য দুটি রুম বরাদ্দ দেওয়া হলো। চেকইন পর্ব শেষ করতে রাত প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। রাতের খাবারের ব্যবস্থা হোটেলের রেস্টুরেন্টে। সেই পর্ব শেষ হলো প্রায় দশটায়।
এরপর আমরা কয়েক বন্ধু মিলে বের হলাম রাতের থিম্পু দেখতে। হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেলাম। রাতের থিম্পু দেখতে ভালোই লাগছে। দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় তেমন কোনো লোকজন নেই। লাইটপোস্টের আলো পর্যাপ্ত না। গাড়ির কোনো হর্ন নাই। আলো-আঁধারির মধ্যে ঘুমন্ত শহর দেখতে ভালোই লাগছে। যেদিকে তাকাই শুধু পাহাড় আর পাহাড়। চারদিকে যেন পাহাড়ের মেলা বসেছে। আকাশভর্তি তারা জ্বলজ্বল করছে। চাঁদ দেখে মনে হচ্ছে দুই-একদিনের মধ্যে পূর্ণ জ্যোত্স্না হবে। বরফে ঢাকা সবুজ পাহাড়ের চূড়াগুলোয় চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে। কোথাও কোথাও পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কিছু বসতি চোখে পড়ল। বাড়িগুলোতে টিম টিম আলো জ্বলছে। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে চোখে পড়ল প্রাসাদোসম অট্টালিকা। আলো ঝলমল করছে। রাজপ্রাসাদ অথবা পুরোনো কোনো জং হতে পারে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই লক্ষ করলাম ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি। তারপরও একধরনের আনন্দ অনুভব করছি। জীবনে প্রথমবার দেশের বাইরে এসেছি বলে কথা! লাগুক না একটু ঠাণ্ডা। উঁচু নিচু পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কখন অনেকটা দূর চলে এসেছি বুঝতেই পারিনি। এরমধ্যে কমল আর সাম্মার বেঁকে বসল। এই ঠাণ্ডার মধ্যে তারা আর হাঁটতে পারবে না। তা ছাড়া রাতও অনেক হয়েছে। সারাদিনে ধকল তো কম যায়নি। কাজেই হোটেলে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত হলো।
ফেরার পথে রাস্তা ভুল করে অন্যদিকে চলে গেলাম। এদিকে রাস্তায় কোনো লোকজনও নেই যে কাউকে জিজ্ঞেস করব। বেশ কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক হাঁটাহাঁটি করে অবশেষে হোটেলের দেখা মিলল। ততক্ষণে ঠাণ্ডায় সবাই কাহিল।
হোটেলে ফিরে আলী রেজা, সাহিদ, নাসের ও শাহজাদাদের রুমে শুরু হলো আড্ডা। ওরা চারজন একরুমে। রুমে হিটিং সিস্টেম না থাকায় রাত যত বাড়তে লাগল ঠাণ্ডা তত বেশি জেঁকে বসতে শুরু করেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে একে একে আড্ডায় যোগ দিল মুন্নী, সুমিতি, লিপি, জেবিন, কাকন, শিমুল, রিটা, নাসির, তাপস, রেজা, ঝর্ণা, জুয়েল, অপু। আমি ও কমল এসে যোগ দিলাম। সুমিতি ও লিপির অভিযোগ কেন তাদের না নিয়ে আমরা রাতের থিম্পু দেখে এলাম! এরমধ্যে মঞ্জুর রুমমেট এসে জানাল তার পক্ষে ওই রুমে থাকা সম্ভব না। কারণ মঞ্জু বিকট শব্দ করে নাক ডাকছে। তার রুম পরিবর্তন করে দিতে হবে। মঞ্জুকে ঘুম থেকে উঠিয়ে আনা হলো। কাঁচা ঘুম থেকে উঠে আসায় বেচারার চোখ লাল হয়ে আছে। তাকে বুঝিয়ে বলা হলো যেহেতু তুমি নাক ডাকো কাজেই সবাই ঘুমানোর পর তুমি ঘুমাবে। একথা শুনে মঞ্জু প্রচণ্ড রেগে গেল। এক পর্যায়ে সে গোলাম রহমান স্যারের কাছে অভিযোগ করতে যাবে বলে হুমকি দিয়ে বসল। তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঠাণ্ডা করা হলো।
এরমধ্যে নাসির বলল, ঠিক আছে মঞ্জু আমাদের রুমে থাকবে। নাসির এবং আমি ট্যুর কো-অর্ডিনেটর হওয়ায় আমরা দুজন টুইন শেয়ার রুম পেয়েছি। এই টুইন শেয়ার রুম নিয়ে শাহজাদা সবচেয়ে বেশি ঝামেলা করেছে। কেন তাকে টুইন শেয়ার রুম দেওয়া হবে না! এদিকে নাসিরের রুমমেট করিম কোনোভাবেই তাদের রুমে মঞ্জুকে নিতে রাজি না। মঞ্জু এবার প্রচণ্ড রেগে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় বলল, আমি আমার রুমে ঘুমাব। অন্য কোনো রুমে আমি যাব না। কে ঘুমাতে পারবে কি পারবে না এটা আমার দেখার বিষয় না।
আড্ডার পরিবেশ খানিকটা নষ্ট হয়ে গেল। তা ছাড়া রাতও অনেক হয়েছে। এক পর্যায়ে সবাই যার যার রুমে ফিরে গেলাম।
আমার রুমমেট কমল। রুম ভীষণ ঠাণ্ডা হয়ে আছে। এদিকে সারাদিনের জার্নির ধকলে প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগছে। কম্বলের মধ্যে ঢুকে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কম্বল আর গরম হয় না। কমলকে বললাম, রিসিপশনে গিয়ে খোঁজ নিতে রুম হিটার পাওয়া যাবে কি না।
কমল বলল, আমি হিন্দি বলতে পারি না। তুমি যাও। তাছাড়া আমার খুব বেশি ঠাণ্ডাও লাগছে না। আমি এখন ঘুমাব।
আমি বললাম, হিন্দি জানলেই বা কী! ভুটানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হলো জংখা। তুমি ইংরেজিতে কথা বলবে।
কমল বলল, প্লিজ আমাকে মাফ করো। আমি যেতে পারব না। তুমি গেলে যাও, না হলে লাইট অফ করে ঘুমাও।
অগত্যা আমিই গেলাম রিসিপশনে। হিন্দি আমিও ভালো বলতে পারি না। আর জংখা ভাষা জানার তো প্রশ্নই আসে না। ইংরেজিতে হিটার পাওয়া যাবে কি না জানতে চাইলে রিসিপশনের মেয়েটি কাউন্টারের পেছনে লাগানো একটা নোটিশ দেখতে বলল। তাকিয়ে দেখি লেখা রয়েছে—এক রাতের জন্য হিটারের ভাড়া পঞ্চাশ রুপি। হিটার নেওয়ার সময় টাকা পরিশোধ করতে হবে। তার মানে চার রাতের জন্য দুইশত রুপি। এত টাকা দিয়ে হিটার ভাড়া করব কি না ঠিক বুঝতে পারছি না। আবার চিন্তা করলাম প্রথম রাতেই ঠাণ্ডা লেগে গেলে বেড়ানোর মজাটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আপাতত আজ রাতের জন্য নিই। পরেরটা পরে দেখা যাবে।
রুমে এসে হিটার লাগিয়ে আরাম করে ঘুমাতে গেলাম। বিদেশে শীতের সময় হিটিং সিস্টেম চালু থাকে বলে শুনেছি। রুমে হিটার জ্বালিয়ে এখন মনে হচ্ছে সত্যি বিদেশে এসেছি।
মাত্র চোখটা লেগে এসেছে, এরমধ্যে দরজায় প্রচণ্ড জোরে কড়া নাড়ার শব্দ। প্রথমে কিছুটা ভয় পেলাম। এত রাতে কে দরজায় কড়া নাড়ছে! তাও আবার এভাবে শব্দ করে। কমলকে ডাকলাম কিন্তু সে গভীর ঘুমে। তাকে উঠানো গেল না। লাইট জ্বালিয়ে দরজা খুলে দেখি শাহজাদাসহ কয়েকজন বন্ধু দাঁড়ানো। শাহজাদার কর্মকাণ্ডে অসম্ভব বিরক্ত হলাম। এত রাতে এভাবে বিরক্ত করার কারণ জিজ্ঞেস করতে সে জানাল, আমি যে রিসিপশন থেকে হিটার নিয়ে এসেছি—এটা সে দেখেছে এবং তার ধারণা আমি ট্যুর কো-অর্ডিনেটর হিসেবে বাড়তি সুবিধা নিচ্ছি। অন্য বন্ধুদের ধারণাও একই। আমি যে হিটার ফ্রি পাইনি, ভাড়া করে এনেছি, এটা কোনোভাবেই বিশ্বাস করাতে পারছি না। এক পর্যায়ে নাসিরের রুম চেক করতে বললাম। কারণ নাসিরও ট্যুর কো-অর্ডিনেটর। তাহলে তো তারও একটা হিটার পাওয়ার কথা।
শাহজাদার বক্তব্য হলো সে এতসব বুঝতে রাজি না। তাদেরও হিটারের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। অবশেষে এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে মধ্যরাতে রিসিপশনে গিয়ে প্রমাণ করতে হলো যে—আমি কোনো বাড়তি সুবিধা নিইনি। নগদ টাকা দিয়ে হিটার ভাড়া করে এনেছি।
হোটেলে সকালের নাস্তা খেয়ে কয়েকটা গ্রুপে ভাগ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভুটানের রাজধানী থিম্পু দেখতে।
ছোট্ট শহর থিম্পু। আমরা হাঁটছি উদ্দেশ্যহীনভাবে। কিছুই চিনি না। স্যাররা কয়েকজন গেছেন আগামীকাল পুনাখা যাওয়ার অনুমতিপত্র আনতে। হঠাত্ লক্ষ করলাম, চৌদ্দ-পনেরো বছরের একটি ছেলে আমাদের সঙ্গে হাঁটছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, থিম্পুর দর্শনীয় স্থান কী কী আছে? সে চমত্কার ইংরেজিতে বলল, আমার সঙ্গে আসো। আমি তোমাদের ঘুরিয়ে দেখাব। আমরা তো বিস্মিত। এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। ছেলেটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, তাহলে তো ভালোই হয়। আমার কথায় তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। মনে হলো সে একটা মহা আনন্দের কাজ পেয়েছে। ছেলেটার নাম লামা নাসাং। সে হাইস্কুলে পড়ে। আজ তার স্কুল বন্ধ। অল্প সময়ের মধ্যে লামার সঙ্গে আমাদের খুব খাতির হয়ে গেল। তার কাছ থেকে থিম্পুতে কী কী দেখার আছে তার একটা ধারণাও পেয়ে গেলাম।
লামা প্রথমেই আমাদের নিয়ে গেল মেমোরিয়াল কর্টেন দেখাতে। ভুটানের তৃতীয় রাজা জিগমে দরজি ওয়াঙ্গচুকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৭৪ সালে এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। স্তম্ভের ভেতরের বিভিন্ন পেইন্টিং এবং স্ট্যাচু বৌদ্ধ ফিলোসফির প্রতিফলন ঘটায়।
সেখান থেকে খানিকটা হেঁটে আসতেই বিখ্যাত ক্লক টাওয়ার। টাওয়ারের নিচে রয়েছে স্টেডিয়াম ও খেলার মাঠ। এই ক্লক টাওয়ারকে ঘিরে থিম্পুর অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান—ন্যাশনাল লাইব্রেরি, হাইকোর্ট ভবন, কুটির শিল্প কেন্দ্র, ইউসী পাঙ্গের ফলের বাগান, আজিদের প্রাসাদ ও পার্ক।
লাইব্রেরিটা ছোট হলেও বইয়ের সংগ্রহ যথেষ্ট ভালো। এরপর গেলাম থিম্পু স্পোর্টস কমপ্লেক্স দেখতে। দেখেই মনে হলো কমপ্লেক্সটি আধুনিক প্রযুক্তিতে অল্প কিছুদিন আগে নির্মাণ করা হয়েছে। অবশ্য সেখানে ভুটানি ঐতিহ্যেরও ছাপ রয়েছে।
আমাদের গ্রুপে আছে নাসের, কমল, সাম্মার, আলী রেজা, শাহজাদা, মঞ্জু, লিপি, কাকন ও অপুসহ আরো কয়েকজন। ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম হাইকোর্ট ভবন দেখতে। হাইকোর্ট ভবন দেখে মনে হলো এদেশের মানুষের মধ্যে দ্বন্দ-সংঘাত, খুন-খারাবি এসবের পরিমাণ খুবই কম। তাই হাইকোর্ট পর্যন্ত তাদের খুব একটা আসতে হয় না। এত ছোট হাইকোর্ট ভবন দিয়ে তাদের অনায়াসেই চলে যায়। শুনেছি ভুটানের মানুষ অনেক শান্তিপ্রিয় এবং সবসময় তারা হাসিখুশি থাকে। সেটা অবশ্য গতকাল আমাদের ড্রাইভার, হেলপার, হোটেলের ম্যানেজার, ওয়েটার এদের দেখেই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলাম।
হাইকোর্ট ভবন থেকে বেরিয়ে আসতেই অন্য বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। শহরটা এতই ছোট যে—দেখা না হয়ে উপায়ই বা কী! একসঙ্গে কয়েকটা গ্রুপ ছবি তোলা হলো।
এখান থেকে গেলাম ভুটানের সেন্ট্রাল পোস্ট অফিসে। নাসের কাল রাতে তার মা-র কাছে একটা চিঠি লিখেছে। তার ইচ্ছা সে ভুটান থেকে চিঠিটা পোস্ট করবে। মূলত তার চিঠি পোস্ট করতেই এখানে আসা। অবশ্য এই সুযোগে অন্য একটা দেশের পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট সম্পর্কে ধারণাও পাওয়া গেল। পোস্ট অফিসে এলেই আমার সুকান্তের বিখ্যাত কবিতা ‘রানার’-এর কথা মনে পড়ে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই গান যেন কানে বাজতে থাকে—
রানার ছুটেছে তাই ঝুম্ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,
রানার চলেছে, রানার!
রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার।
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার—
কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।...
খুব জানতে ইচ্ছা করছিল আমাদের মতো এখানেও কি ডাকপিয়ন সাইকেল নিয়ে ঘুরে ঘুরে চিঠি বিলি করে? লামাকে জিজ্ঞেস করলাম। সে জানাল এ বিষয়ে তার কোনো ধারণা নাই। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম চিঠি বিতরণের পদ্ধতি একই, শুধু সাইকেলের পরিবর্তে মোটরসাইকেল ব্যবহার হয়। নাসেরের চিঠি পোস্ট করে আমরা বেরিয়ে এলাম। পরে শুনেছি সেই চিঠি নাকি আমরা দেশে ফিরে আসার পর পৌঁছেছিল।
এরপর টেক্সটাইল মিউজিয়াম আর টাইকিন চিড়িয়াখানা দেখতে গেলাম। খুবই ছোট একটা চিড়িয়াখানা। অল্প কিছুসংখ্যক পশুপাখি আছে। তবে এখানকার প্রধান আকর্ষণ ভুটানের জাতীয় পশু টাইকিন।
এরপর আমাদের স্বঘোষিত গাইড লামাকে নিয়ে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে গেলাম দুপুরের খাবার খেতে। এই রেস্টুরেন্টের বিশেষত্ব হলো, এখানে সবধরনের খাবার পাওয়া যায়। এমনকি পাহাড়ি অঞ্চলের কিছু জনপ্রিয় খাবার এখানে আছে। এগুলো ভুটানিজদের খুব প্রিয়। যেমন, পাহাড়ি মোরগের কারি, চরমি গাইয়ের মাংস, শুকনো গরুর মাংস, চর্বিযুক্ত শুকরের মাংস এবং মেষশাবক ইত্যাদি। এছাড়া ভুটানের প্রধান খাবার হলো লাল চালের ভাত, বাজরা ও ভুট্টা সিদ্ধ। লামা বলল লাল মরিচ ও অনেক পদের মসলা দিয়ে রান্না করা পনির খুব সুস্বাদু খাবার। আমি লাল চালের ভাতের সঙ্গে সবজি, ডাল ও পাহাড়ি মোরগের তরকারি দিয়ে খেলাম। লামার কথামতো পনির টেস্ট করলাম কিন্তু ভালো লাগেনি। পাহাড়ি মোরগের কারি খেতে অবশ্য খারাপ লাগেনি। সব খাবারের মধ্যেই পনির অথবা শুঁটকির গন্ধ। অনেকে শুকনো গরুর মাংস খেল খুব তৃপ্তিসহকারে।
কমল চমরি গাইয়ের মাংস খেয়ে জানাল, সেটি অসাধারণ এবং ভুটানে যে কয়দিন থাকবে প্রতিদিন সে এটা খাবে। আমাদের কাছে ভুটানি মুদ্রা না থাকায় ভারতীয় মুদ্রায় বিল পরিশোধ করলাম। ভুটানের মুদ্রার নাম গুলট্রাম। এখানে সর্বত্র ভুটানের মুদ্রার পাশাপাশি ভারতীয় মুদ্রা চলে। এমনকি ভুটানের ব্যাংক থেকেও ভারতীয় মুদ্রা দেওয়া হয়।
আমরা চার দিনের জন্য ভুটান এসেছি শুনে লামা খুব অবাক হলো। ইউরোপ বা পশ্চিমা দেশ থেকে যেসব পর্যটক আসে তারা কেউ ১০-১৫ দিনের আগে যায় না। তাকে বললাম, আমরা এখান থেকে নেপাল হয়ে ভারতের দার্জিলিং যাব। সেখান থেকে কলকাতা হয়ে ঢাকা ফিরব। তাই ভুটানে চারদিনের বেশি থাকা সম্ভব না। শুনে লামা বলল, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু তোমাদের পারো এবং বুমথাং একদিন করে হলেও দেখে যাওয়া উচিত। পারো হলো দ্বিতীয় বৃহত্ ট্যুরিস্ট শহর। আর বুমথাং আমাদের রিলিজিয়াস সিটি। দুটি জায়গারই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার মতো।
আমি বললাম, একবারে সব দেখে ফেললে তো দ্বিতীয়বার আসতে ইচ্ছা করবে না। কাজেই কিছু জিনিস থাক না পরের বারের জন্য।
লামা সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বলল, ঠিক আছে। তারপর বলল, তোমরা কি পাহাড়ে উঠতে চাও? সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই রাজি হয়ে গেলাম।
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে পাহাড়ে যাওয়ার আগে একটা পুরোনো জং দেখলাম। এটা অবশ্য খুব ছোট একটা জং। ভুটানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো জং। দুর্গের আদলে তৈরি একধরনের স্থাপনা, যেখানে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা থাকেন। কোথাও কোথাও আবার এই জং থেকেই চালানো হয় দেশটির প্রশাসনিক কাজকর্ম। প্রাচীন ও বিশালাকৃতির জংগুলো বেশ খানিকটা দূরে এবং কোনো কোনোটা পাহাড়ের ওপর। সেখানে গাড়ি ছাড়া যাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই সেগুলো নিশ্চয় সবাই একসঙ্গে দেখতে হবে।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে কাছেই একটা পাহাড়ের পাদদেশে এসেছি। উদ্দেশ্য ট্রেকিং করা। গাইড লামাকে ফলো করে শুরু হলো পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার চেষ্টা। পাহাড়ে ট্রেকিং আমাদের সমতলের মানুষদের জন্য খুব কঠিন একটা কাজ। পাহাড়ি মানুষেরা যে পথ খুব দ্রুত পাড়ি দেবে—সেই পথই আমাদের পাড়ি দিতে অনেক শ্রম ও সময় লাগবে। সত্যিকার ট্রেকিং বলতে যা বোঝায় তা আমরা করছি না বা সেটা করার প্রস্তুতিও আমাদের নাই। আমরা একটা ছোট পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করছি মাত্র। পাহাড়ের গা বেয়ে খুবই সরু একটা পথ ওপরের দিকে উঠে গেছে। এদিকে লামাকে ফলো করতে গিয়ে নাসের পা ফসকে পড়ে গেল। মঞ্জু কাছেই ছিল বলে রক্ষা। সে সঙ্গে সঙ্গে নাসেরকে ধরে ফেলেছে। লামাও দ্রুত ওপর থেকে নিচে নেমে এসেছে। না হলে নাসেরের গড়িয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। যদিও খুব বেশি উচ্চতায় তখনো পৌঁছাইনি আমরা। তারপরও একটা ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।
কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর নাসের আর ওপরে ওঠার সাহস পেল না। মনে হলো পায়ে ভালোই ব্যথা পেয়েছে। নিচে নেমে গেল। আমরা লামা নাসাং নামক বালকটির নেতৃত্বে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। মনে হলো বিশাল এক বিজয় অর্জন করে ফেলেছি। আমাদের আনন্দ দেখে লামাও মহাখুশি। চিন্তা করলাম ছোট একটা পাহাড়ে উঠেই আমাদের এত আনন্দ হচ্ছে। তাহলে এভারেস্ট বিজয় করে হিলারী ও তেনজিংয়ের না জানি কত আনন্দ হয়েছিল!
পাহাড়ের ওপর থেকে মুগ্ধ হয়ে চারদিকের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখছি। সবুজে ঘেরা পাহাড়ের পর পাহাড় সারিসারি দাঁড়ানো। চারদিকে যেন সবুজের স্বর্গরাজ্য। ছোট্ট শহর থিম্পুকে ওপর থেকে আরো ছোট লাগছে। কোথাও কোথাও উঁচু পাহাড়ের গায়ে মেঘ আটকে আছে। হঠাত্ চোখে পড়ল কাছেই একটা পাহাড়ের ওপর সাদা পতাকা উড়ছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম কোনো ফায়ারিং জোনে ঢুকে পড়েছি কি না! আমাদের দেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে দেখেছি আর্মিরা যখন পাহাড়ে ফায়ারিং প্র্যাকটিস করে, তখন এধরনের পতাকা ওড়ানো হয়। কেউ যেন পতাকা চিহ্নিত এলাকায় না যায় সেটা বোঝানোর জন্য।
লামা সঙ্গে সঙ্গে জানাল, ভয় পাওয়ার কিছু নাই, এটা সেরকম কিছু না। এটা হলো প্রার্থনার পতাকা। প্রার্থনার পতাকা পাহাড়ে ওড়ানো হয়। এটা দ্বারা বোঝানো হয় আশপাশের সকল জীবের উপকারের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। স্থানীয় দেবতার প্রার্থনা করার নিদর্শন হিসেবে ঘরের ছাদেও ছোট সাদা পতাকা ওড়ানো হয়।
লামাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভুটানে কোন কোন ধর্মের মানুষ বসবাস করে?
লামা বলল, বৌদ্ধ ধর্ম ভুটানের প্রধান ধর্ম। স্বভাবতই এই ধর্মের মানুষের সংখ্যা এখানে সবচেয়ে বেশি। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এরপরই হিন্দু ধর্মের মানুষের অবস্থান। মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ। মুসলমানদের সংখ্যা সবচেয়ে কম। মোট জনসংখ্যার ০.২০ শতাংশ মুসলমান। এর বাইরে অন্যান্য ধর্মেরও কিছু কিছু মানুষ এখানে বসবাস করে। প্রতি বছর একবার জং বা গুরুত্বপূর্ণ গ্রামে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়, যা সেচু নামে পরিচিত। আশপাশের এলাকার মানুষেরাও এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কয়েক দিনের জন্য ওই এলাকায় চলে আসে। এই অনুষ্ঠানের প্রধান কার্যক্রম হলো একধরনের বিশেষ ধর্মীয় নৃত্য, যা চাম নৃত্য নামে পরিচিত এবং একটি বড় আঙিনায় এটি পরিবেশিত হয়।
আমি বললাম, তুমি এতকিছু জানো কিভাবে?
লামা বলল, এগুলো আমাদের স্কুলে পড়ানো হয়। আর ধর্মীয় বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকে স্কুলে ও পারিবারিকভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়।
আমরা যে পাহাড়ের চূড়ায় সেখান থেকে আরো উঁচু একটি পাহাড়ে যাওয়া যায়। সেখান থেকে আরো উঁচুতে আরেকটায়। এভাবে একটার পর একটা পাহাড়ে যাওয়া যায়। যারা ট্র্যাকিং করে তারা এভাবেই একটার পর একটা পাহাড়ে উঠে যায়।
সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে গেছে। বিকেলের নরম আলোয় প্রকৃতি যেন অন্য এক রূপে সেজেছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, কোলাহল নেই। চারদিকে শান্ত, স্নিগ্ধ, সুনিবিড় এক পরিবেশ। এরমধ্যে মঞ্জু পশ্চিম কোন দিকে সেটা জানার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছে। কারণ তার ইচ্ছা পাহাড়ের ওপর সে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়বে। রেজা বলল, বিদেশ বিভুঁইয়ে যেদিকে নামাজ পড়বি, সেটাই কবুল হবে। তারপর পাহাড়ের ওপর বলে কথা!
মঞ্জু এই যুক্তি কিছুতেই মানতে রাজি না। আমি রাগ করে বললাম, তোর যা খুশি কর। কিছুক্ষণ পর দেখি সে থিম্পু ভ্যালির দিকে মুখ করে নামাজ শেষ করে আবার অন্যদিকে নামাজের জন্য দাঁড়িয়েছে। কমল তার নামাজ পড়ার ছবি তুলছে। মঞ্জু তাকে বলেছে পাহাড়ের ওপর নামাজ পড়ার ছবি তুলতে। নামাজ শেষ হলে আমি বললাম, তুই দুইবার কেন নামাজ পড়লি ?
মঞ্জু বলল, পশ্চিম কোন দিকে নিশ্চিত না। তাই দুই দিকে কেবলা ভেবে পড়ে নিলাম। একটা তো ঠিক হবেই।
আমি বললাম, আরো দুই দিক তো বাকি থাকল? আরো দুইবার পড়। তাহলে আর কোনো রিস্ক থাকবে না। যে কোনো একটা কবুল হবেই।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। লামা বলল, সন্ধার আগেই আমাদের পাহাড় থেকে নিচে নামতে হবে। নামার সময় ঝুঁকি থাকে বেশি।
লামা সবাইকে ডেকে নিচে নামার কিছু টিপস দিল।
আমরা আস্তে আস্তে পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে নামতে শুরু করলাম। লামা হোটেল পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে এল। সে আমাদের হোটেলের পেছন দিকটায় থাকে। আসার পথে অনেক কথা হলো। বাংলাদেশ নামে একটা দেশ আছে, এটা সে আজ প্রথম জানল। তার ধারণা ছিল আমরা ভারতীয়।
আমি বললাম, তুমি কি জানো, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলে প্রথম যে দেশটি সমর্থন দিয়েছিল, তার নাম ভুটান?
লামা বলল, দুঃখিত। বিষয়টা আমার জানা ছিল না।
আমি বললাম, এটা বড় কোনো বিষয় না। তুমি না জানতেই পারো।
তারপরও লামা বারবার দুঃখ প্রকাশ করছে। ওর মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে। বাবা-মা কী করেন জিজ্ঞেস করতেই জানাল, দুজনেই কাজ করে। মা-র একটা মুদি দোকান আছে। বাবা স্কুলশিক্ষক। সে বাবা-মার একমাত্র সন্তান।
আমি বললাম, বাবা চাকরি করে আর মা করে ব্যবসা। বেশ ভালো তো!
সে অবাক হয়ে বলল, কেন? তোমাদের দেশে এমনটা হয় না?
আমি বললাম, ঠিক এরকমটা দেখা যায় না। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করে এমনটা দেখা যায়। তাও সংখ্যায় খুব কম। আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় খুব কমসংখ্যক মেয়েরা কাজ করে।
সে বলল, ভুটানে পুরুষ ও মহিলারা একসঙ্গে মাঠে পর্যন্ত কাজ করে। চাষাবাদ করে। আবার আলাদা আলাদাভাবে ব্যবসা বা চাকরিও করে। পুরুষেরা মেয়েদের মতো ঘরের সবধরনের কাজকর্ম করে থাকে, এমনকি রান্নাবান্নার কাজও। আবার কিছু কাজ আছে—যেটা আমাদের দেশে পুরুষরা কখনোই করে না। যেমন তাঁতে কাপড় বুননের কাজ। এই বুননের কাজ শুধু মেয়েরাই করে থাকে। পুরুষরা ঐতিহ্যগতভাবে পোশাক প্রস্তুত ও সেলাইয়ের কাজে অনেক বেশি দক্ষ। আবার নারী-পুরুষ উভয়েই ভিক্ষু হতে পারলেও বাস্তবে নারীরা তুলনামূলক কম ভিক্ষু হয়।
আমরা হোটেলের সামনে চলে এসেছি। লামা বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। আমি কিছু টাকা বের করে ওকে দিতে গেলাম, কিন্তু কিছুতেই সে নেবে না।
রেজা বলল, আমরা খুশি হয়ে তোমাকে দিচ্ছি। তুমি নেবে না কেন? তাছাড়া তুমি আমাদের অনেক সময় দিয়েছ। খুশি হয়ে কেউ কিছু দিলে সেটা নিতে হয়।
লামা বলল, আমি তো টাকার জন্য তোমাদের সময় দিইনি। বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের সঙ্গে আমার ঘুরতে ভালো লাগে। আজ আমার স্কুল ছিল না। তাই তোমাদের সঙ্গে ঘুরলাম। তোমরা যেমন আনন্দ করেছ, আমিও তোমাদের মতো আনন্দ করেছি। কাজেই আমি টাকা নেব কেন! প্লিজ এ বিষয়ে আর কিছু বললে আমার মন খারাপ হয়ে যাবে।
আমি বিস্মিত হয়ে ছেলেটার যুক্তি শুনলাম। পর্যটকদের প্রতি ওর ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হলাম। তার এই ভালোবাসার মূল্য টাকা দিয়ে ফেরত দেওয়া যায় না। আমরা বোকামি করেছি।
আমি বললাম, ধন্যবাদ।
লামা বলল, কাদ্রিন চি (kadrin chhe)।
আমি বললাম, এটার মানে কী?
লামা বলল, থ্যাংক ইউ
আমি বললাম, তোমার সঙ্গে কি আর দেখা হবে?
লামা বলল, না, কারণ তোমরা কাল পুনাখা যাবে। ফিরে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। পরদিন আমার স্কুল খোলা। তার পরদিন তোমরা চলে যাবে। তাই দেখা হওয়ার আর সুযোগ নাই।
সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লামা চলে যাবে এমন সময় আমি বললাম, কাদ্রিন চি
বন্ধুরাও সবাই কাদ্রিন চি বলা শুরু করল। লামা হাসতে হাসতে কাদ্রিন চি বলে চলে গেল।
বন্ধুরা গেল যার যার রুমে। আমি দাঁড়িয়ে লামার চলে যাওয়া দেখছি। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছেলেটা আমাদের আপন করে নিয়েছিল। আর হয়তো কখনোই ওর সঙ্গে দেখা হবে না। কিন্তু সে যে মায়া সৃষ্টি করে চলে গেল সেটা ভুলতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে।
সকাল ন টায় পুনাখার উদ্দেশে যাত্রা শুরুর কথা। হোটেলের সামনে বাস দাঁড়ানো। একে একে সবাই বাসে উঠছে। গতকাল রাতে বলা হয়েছে সময়মতো যেন সবাই ব্রেকফাস্ট শেষ করে বাসে উঠে যায়। সামনের ছয়টা আসন স্যারদের জন্য খালি রাখা হয়েছে। একসময় তাঁরাও এসে গেলে দেখা গেল, সবাই বাসে উঠে গেছে। মিশুক স্যার আমাকে বললেন, গুনে দেখো সবাই এসেছে কি না।
আমি না গুনেই বললাম, স্যার রেজা এবং শাহজাদা ছাড়া সবাই আছে।
স্যার বললেন, আবার সেই আলি রেজা এবং শাহজাদা! এদের সমস্যা কী?
গোলাম রহমান স্যার বললেন, একজন হোটেলে যাও, আরেকজন আশপাশে কোথাও আছে কি না দেখো।
আমি গেলাম হোটেলে ওদের রুমে খোঁজ করতে। দেখলাম, ওদের রুম তালা দেওয়া। হোটেল রিসিপশন এবং রেস্টুরেন্টে উঁকি দিলাম। কোথাও নাই। নাসির আশপাশে দেখে এসে জানাল ওদের পাওয়া গেল না।
শাহেদ কামাল স্যার ও মিশুক মুনীর স্যার ভীষণ বিরক্ত হলেন। মিশুক স্যার বললেন, এদের কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। বারবার বলা হয়েছে সকাল ৯টায় বাস ছাড়া হবে। তারপরও কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে! আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করা হবে। এরমধ্যে না এলে আমরা বাস ছেড়ে দেব। আমি এবং নাসির আবারো আশপাশে খোঁজ করতে গেলাম। ফিরে এসে অবাক হয়ে দেখি ওরা দুজন বাসে বসা। কোন দিক থেকে এল কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমরা তো কাছাকাছি সব জায়গায় খুঁজে এলাম। দেখলাম মিশুক স্যার প্রচণ্ড রাগারাগি করছেন। সুব্রত স্যার তাকে থামানোর চেষ্টা করছেন। বাসের ড্রাইভার ও হেলপার বেচারারা আমাদের ভাষা বুঝতে পারছে না। এদিক-ওদিক তাকিয়ে তারা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। গোলাম রহমান স্যার ঘোষণা দিলেন, পরবর্তী সময়ে কেউ এধরনের কাজ করলে তার জন্য অপেক্ষা করা হবে না। সবাইকে সময়ের ব্যাপারে আরো সচেতন হতে হবে। একজন বা দুজনের জন্য অন্যদের যেন অপেক্ষা করতে না হয়।
বাস পুনাখার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ি রাস্তায় পথ চলা শুরু হলো। থিম্পু থেকে পুনাখার দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার। বাসের ড্রাইভার জানাল পাহাড়ি রাস্তা হওয়ায় সময় লাগবে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা। মাঝপথে দোচালা পাস বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে কিছুক্ষণের জন্য যাত্রাবিরতি হবে।
একটার পর একটা পাহাড় পার হয়ে আমাদের বাস এগিয়ে যাচ্ছে। দুইপাশে অসংখ্য পাইন গাছ। যেদিকে তাকাই সেদিকেই সবুজ। কী যে অসাধারণ দৃশ্য তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। মাঝে মাঝে মনে হয় শিল্পীর তুলিতে বিশাল ক্যানভাসে আঁকা সবুজ অরণ্য। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর শাহেদ কামাল স্যার অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন রাস্তার দুইপাশে মাইলের পর মাইল আপেল বাগানের দিকে। এই প্রথম আপেল বাগান দেখার সুযোগ হলো। এর আগে দেখেছি ছবিতে। ১৯৮২ সালে আমার বড়ভাই বিলেত গিয়েছিলেন পিএইচডি করতে। তাঁর পাঠানো ছবিতে দেখেছি আপেল বাগান থেকে লাল টকটকে আপেল তুলে খাচ্ছেন। সেই আপেল বাগানের পাশ দিয়ে আমরা যাচ্ছি ভাবতেই নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে হলো। আমার ধারণা ছিল আপেল শুধু ইউরোপ-আমেরিকাতেই হয়। ভুটানে যে আপেলের বাগান হতে পারে তা আমার ধারণার মধ্যেই ছিল না। খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেল, এখানে জুন-জুলাইতে আপেল বড় হতে শুরু করে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে আপেল তোলা শুরু হয়। ওই সময় ভুটান ঘুরতে এলে বাগান থেকে আপেল পেড়ে খাওয়া যেত। আহা কী মজাই না হতো!
আলি রেজা ও শাহজাদা বকা খেয়ে পেছনের সিটে চুপচাপ বসে আছে। এক পর্যায়ে আমি ওদের পাশে গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় গিয়েছিলি? আশপাশে কোথাও তোদের খুঁজে পেলাম না।
দুজনের কেউই আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জানালা দিয়ে প্রকৃতি দেখছে। আরো কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর রেজা জানাল, ওরা হোটেলের পেছন দিকের একটি রাস্তা দিয়ে কাছের একটি ছোট মার্কেটে গিয়েছিল সিগারেট বিক্রি করতে। সেই সময় ভুটান-নেপাল-ইন্ডিয়াতে বিদেশি মদ-সিগারেট নিষিদ্ধ ছিল। তাই ডিউটি-ফ্রি শপ থেকে এগুলো কিনে আনলে অনেক বেশি দামে এখানে বিক্রি করা যায়। ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাই করার আগে কে যেন এই খবরটা জানায়। সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই কিনে আনে এগুলো এখানে বেশি দামে বিক্রি করার জন্য। শুধু আলি রেজা আর শাহজাদা নয়। আরো অনেকের দেখাদেখি আমিও এক কার্টুন বেনসন সিগারেট এনেছি। নাসির আমাকে বলেছে কলকাতায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা এগুলোর। ওখানে বেশি দাম পাওয়া যাবে। তাই আমি ব্যাগের তলায় রেখে দিয়েছি। কলকাতা আমাদের শেষ গন্তব্য।
আমি বললাম, এখনই বিক্রি করতে গেলি কেন? পরেও তো করা যেত।
রেজা জানাল তার এখনই টাকা দরকার। সে যে টাকা এনেছে ব্যক্তিগত খরচের জন্য সেটা দিয়েই এগুলো কিনেছে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে। তাছাড়া গতকাল সন্ধ্যায় ওই মার্কেটে দোকানের খোঁজ পায় এবং বলে এসেছিল আজ সকালে নিয়ে যাবে। কিন্তু গিয়ে দেখে দোকান বন্ধ। নয়টায় খুলেছে দোকান। তাই ওদের আসতে খানিকটা দেরি হয়েছে।
অল্প কিছুদূর যাওয়ার পর পাহাড়ের গা ঘেঁষে আমাদের বাস থামল। এই জায়গার নাম দোচালা পাস। এটি হচ্ছে ভুটানের সবচেয়ে উঁচু স্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৭০০ ফুট উঁচুতে এর অবস্থান।
থিম্পু শহর থেকে ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে দোচালা পাস পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এখান থেকে হিমালয়ের ৭টি শৃঙ্গ দেখা যায়। পুনাখা যাওয়ার পথে দোচালা পাসে ৩০ মিনিট যাত্রাবিরতি হবে—এটা আগেই ঠিক করা ছিল। অসাধারণ সুন্দর জায়গা। পুরো এলাকা যেন মেঘে ঢাকা। তাহলে কি হিমালয় চূড়াগুলো দেখা হবে না? মনটা খারাপ হয়ে গেল।
বাইরে তাকিয়ে দেখি, পাহাড়ের গায়ে এবং রাস্তার মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বরফ পড়ে আছে। সুব্রত স্যার বললেন, আমরা খুবই সৌভাগ্যবান। কিছুক্ষণ আগেই এখানে স্নোফল হয়েছে।
মিশুক স্যার সবাইকে নামতে বললেন। বাস থেকে নামতেই ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। তারপরও জীবনে প্রথম স্নোফল দেখার আনন্দই আলাদা। ঠাণ্ডা আমাদের কাবু করতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে সবাই স্নো হাতে নিয়ে ছবি তোলা শুরু করলাম। কেউ কেউ বরফের মধ্যে বসে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। বিদেশি সিনেমায় আলোকচিত্রে এতদিন স্নো দেখেছি। এখন সেই স্নো-এর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। ভাবতেই প্রচণ্ড আনন্দ অনুভব হচ্ছে। দুই-একজন স্নো দিয়ে তাদের মনমতো জিনিস তৈরি করতে শুরু করল। কেউ কেউ স্নো ছুড়ে ছুড়ে মজা করছিল। আনন্দে সবার চোখমুখ যেন ঝলমল করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। সাখাওয়াত স্যার সবাইকে ডেকে বললেন, তাকিয়ে দেখো হিমালয় পর্বতমালার চূড়াগুলো কী সুন্দর দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণ আমরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এবার সবার দৃষ্টি পড়ল হিমালয় পর্বতমালার দিকে। মনে হচ্ছে বরফের চাদরে ঢাকা অনেকগুলো পাহাড় সারি সারি দাঁড়ানো। কী যে সুন্দর দৃশ্য! আবার শুরু হলো ছবি তোলা। ক্রমাগত ক্যামেরার সাটার পড়ছে। শাহেদ কামাল স্যার একটু রেগে বললেন, এই ছেলেমেয়েরা, ছবি তোলা বন্ধ করো। এত সুন্দর একটা জায়গায় এসেছ, আগে কিছুক্ষণ ভালো করে চোখ দিয়ে দেখো। ভেতর থেকে ফিল করার চেষ্টা করো। আগেই তোমরা ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছ!
স্যারের কথায় কিছুটা লজ্জা পেলাম এবং একসঙ্গে ছবি তুলতে বারণ করায় মন খারাপ হয়ে গেল। পরক্ষণেই মনে হলো, স্যার তো ঠিকই বলেছেন। ভালোভাবে না দেখেই আমরা ছবি তোলা শুরু করেছি। ছবি তোলা বন্ধ করে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। অদ্ভুত সুন্দর! এদিকে সময় কম। একটু পরই পুনাখার উদ্দেশে রওনা হতে হবে। আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম শাহেদ কামাল স্যার কাছাকাছি নেই। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো আবার ছবি তোলা। দেশে ফিরে গিয়ে দেখাতে হবে না আমি হিমালয়ের সামনে কত রকমভাবে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি! আমি স্নোফল দেখেছি। স্নো-এর মধ্যে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি। এদিকে আবার ক্যামেরার ফিল্মের হিসেবও করতে হচ্ছে। ফিল্ম শেষ হয়ে গেলে পরের আকর্ষণীয় জায়গার ছবি তুলব কিভাবে?
আমরা ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমাদের ড্রাইভার এবং ভুটানের পথচারীরা নির্বিকার। এত ঠাণ্ডায়ও তারা বেশ স্বাভাবিক।
আমাদের সময় শেষ। সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম। মজার ব্যাপার হলো, আলি রেজা ও শাহজাদা এবার সবার আগে গাড়িতে উঠে বসে আছে।
বাসের চালক জানাল, ভুটানের প্রথা অনুযায়ী বছরের প্রথম স্নোফলের দিন সরকারি ছুটি থাকে। সেদিন রাস্তায় নেমে আসে শত শত মানুষ। স্নোফল উপভোগ করতে। ভুটানজুড়ে স্নোফল উত্সব শুরু হয়।
আমাদের বাস পুনাখার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে। সেই একই আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা। কখনো ওপরে উঠছি আবার কখনো নিচে নামছি। চারপাশে চোখধাঁধানো সবুজে ঘেরা পাহাড়, রাস্তার পাশে সবুজ গাছ, ছিমছাম রাস্তাঘাট। পুরো পাহাড়ি পথে আমরা এক এক করে ছোট ছোট গ্রাম, ধানখেত, ওক আর সারি সারি পাইনের বন, কিছুদূর পর পর রডোডেনড্রন ঝাড়ের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি পুনাখার দিকে। পাহাড়ি পথে যেতে যেতে কিছুক্ষণ পর পর চোখে পড়ে রাস্তার পাশে ভুটানি নারীরা নানারকম ফলের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। একবার মনে হলো স্যারদের বলি, কিছু সময়ের জন্য ফল কেনার বিরতি দেওয়া যায় না? কিন্তু সাহস করে বলতে পারলাম না। স্নোফল আর বরফে ঢাকা হিমালয় পর্বতমালার অসাধারণ এক স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে আমরা পুনাখা পৌঁছালাম।
পুনাখা পৌঁছালাম মধ্য দুপুরে। তাই সিদ্ধান্ত হলো দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা পুনাখার দর্শনীয় স্থানগুলো দেখা শুরু করব। মাঝারি মানের একটি রেস্টুরেন্টে গরম ভাত, সবজি, ডাল আর পালক পনির দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। এই রেস্টুরেন্টে মাছ-মাংস পাওয়া যায় না। শতভাগ নিরামিষভোজী রেস্টুরেন্ট। এমনকি ডিমও নেই। কেউ কেউ তাই ডিম ভাজা খেতে চেয়েও পায়নি।
তবে এদের মিষ্টি মরিচের চাটনিটা খেতে বেশ সুস্বাদু। পালক পনির এই প্রথম খেলাম। মূলত এটা দক্ষিণ ভারতীয় খাবার। ভারতীয় ট্যুরিস্টের সংখ্যা মনে হয় অনেক বেশি। অবশ্য ভুটানের মানুষও পনির খেতে খুব পছন্দ করে।
রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মেয়েটা জানাল এখানে নানাধরনের পনির পাওয়া যায়। তবে চমরী গাইয়ের দুধের পনির খুব নামকরা। তার রেস্টুরেন্টে সে ওই পনিরই ব্যবহার করে। তবে যে গাইয়ের পনিরই হোক আর যত নামকরাই হোক না কেন আমার ভালো লাগেনি।
অনেক পদের মসলা দিয়ে রান্না করা ঘন ডালই ছিল একমাত্র ভরসা।
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে প্রথমেই আমরা গেলাম পুনাখা জং দেখতে। ভুটানের দুই বিখ্যাত নদী পো চু আর মো চু-র মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুনাখা জং। এটি দেখার জন্য এক স্থানীয় গাইড ভাড়া করা হলো। শুরুতেই গাইডকে ঘিরে আমরা গোল হয়ে দাঁড়ালাম। সে ইংরেজিতে পুনাখার ইতিহাস বলা শুরু করল। মনে হচ্ছে টেপরেকর্ডারে ধারা বিবরণী শুনছি।
দুই নদী—মো চু আর পো চু। পাহাড়ের কোল ধরে এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে বহুদূর। মো চু নারী আর পো চু পুরুষ। এমনই বিশ্বাস এখানকার মানুষের। স্থানীয় ভাষায় চু শব্দের অর্থ নদী। মো চু নদী ভুটানের লিঘসি এবং লায়া পাহাড় থেকে সৃষ্টি হয়েছে। পো চু নদীর জন্ম পুনাখা উপত্যকার লুনানা অঞ্চলের হিমবাহ থেকে। এই দুই নদী মিলিত হওয়ার পর, প্রধানতম নদী যা পুনা সাং ছ্যু বা সানকোশ নদী এবং ওয়াড়ু ফুরোডাং দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালিখোলাতে ভুটান-ভারত সীমানা অতিত্রম করেছে এবং সবশেষে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
পো চু আর মো চু এসে মিলেছে পুনাখায়। একেবারে ছবির মতো একটা উপত্যকা। যে দিকে চোখ যায় দেখে মনে হয় যেন ঘন সবুজের গালিচা পাতা। গাইড জানাল—সারাবছরই পুনাখায় নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। তাই এখানে পর্যটকদের ভিড় সব সময়েই লেগে থাকে।
নদীর ওপর কাঠের ঝুলন্ত ব্রিজ পার হয়ে জংয়ে পৌঁছে গেলাম আমরা। দূর থেকে দুই নদীর সঙ্গমস্থল আর পুনাখা জংয়ের প্যানোরমিক দৃশ্য অসাধারণ। আমাদের গাইড আবার ধারাবর্ণনা শুরু করল। এই পুনাখা জং-কে বলা হয় আনন্দপ্রদ প্রাসাদ। এটি আসলে পুনাখার প্রশাসনিক ভবন। ৬০০ ফুট সুদীর্ঘ এই জংটি নির্মাণ করা হয় ১৬৩৭-৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। যাবদ্রারং রিনপোছে দ্বারা এটি নির্মিত হয়েছিল, স্থপতি ছিলেন জয়ে পালেপ ও নাগাওয়াং নামগিয়াল। এটি জং স্থাপত্যশিল্পের দ্বিতীয় প্রাচীন ও দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাসাদ এবং তাদের নির্মিত রাজকীয় প্রাসাদগুলোর অন্যতম একটি।
১৯০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর ভুটানের প্রথম রাজা উজেন ওয়াংচুক এই পুনাখা জং থেকেই তার রাজত্ব পরিচালনা শুরু করেন। বর্তমানে ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ এই পুনাখা জংটি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শীতকালীন বাসস্থান। ভুটানে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা দানের সবচেয়ে বড় আশ্রম।
প্রায় তিনতলা সমান পাথর আর কাঠের পাটাতনের সিঁড়ি বেয়ে আমরা পুনাখা জংয়ের মূল স্থাপনায় প্রবেশ করলাম। মূল ভবনটিও কাঠের। ভবনের সমস্ত দেয়ালজুড়ে বিশ্বাস আর ধর্মীয় অনুভূতির চিত্রকর্ম। পুনাখা জংয়ে প্রবেশ মাত্র দেয়ালের ডান দিকে চোখে পড়ল বিখ্যাত বৌদ্ধজ্যোতিষ চিত্র। ভারত আর চীনা শিল্পের সংমিশ্রণ এই জ্যোতিষচিত্রটি মানুষের জীবনছবি। মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বেঁচে থাকার গূঢ় রহস্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই চিত্রটিতে।
মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই একটি খোলা করিডর। করিডরকে ঘিরে চারদিকে দোতলা সমান স্থাপনা, ছোট ছোট অসংখ্য ঘর আর ঘরের প্রতিটি স্থানজুড়েই শিল্পের ছোঁয়া। জংয়ের শেষপ্রান্তে রয়েছে একটি মন্দিরে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের সুবিশাল মূর্তি। বুদ্ধের একপাশে দ্বিতীয় বৌদ্ধশিষ্য গুরু আর অন্য পাশে ভুটানের প্রতিষ্ঠাতা ঝাবদরাং-এর বিশাল মূর্তি। পর্যটকরা কেউ কেউ শ্রদ্ধার সঙ্গে বুদ্ধকে প্রণাম করছে। পল্লব আর সাম্মার গিয়ে অন্যদের মতো প্রণাম করে এল। প্রণাম শেষে বুদ্ধের পায়ের কাছে রাখা পাত্র থেকে তেল নিয়ে মাথায় ছোঁয়াল। এ যেন বুদ্ধের আশীর্বাদ কপালে স্পর্শ করা। মন্দিরের মূল আকর্ষণ বুদ্ধের জীবনচিত্র। দেয়ালজুড়ে ১২টি পর্বে এই চিত্রকর্মগুলোতে বুদ্ধের জীবন আর বৌদ্ধধর্মের বিকাশের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের গাইড ক্রমাগত ধারা বিবরণী দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এত শোনার সময় কোথায়? গাইডের কথা ঠিকমতো না শোনার জন্য শাহেদ কামাল স্যার খুবই বিরক্ত। দুই দফা বকাও খেতে হয়েছে অনেককে।
ছবি তোলা নিয়েই সবাই ব্যস্ত। আর ছবি তোলার এত বেশি সাবজেক্ট যে কোনটা বাদ দিয়ে কোনটার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলব—সেটিই ঠিক করতে পারছি না অনেক সময়। ইচ্ছা করলেই আবার অনেক ছবি তোলা যাচ্ছে না। কারণ ক্যামেরার ফিল্মের বাজেট সীমিত। ১৭ দিনের ট্যুরের আজ মাত্র তৃতীয় দিন।
১৪৯৯ সালে নির্মিত ‘ফার্টিলিটি টেম্পল’ রয়েছে পুনাখাতে। এর নাম থেকেই বোঝা যায়, এই মন্দির সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ঠিক কী হতে পারে। ছোট ছোট মন্দিরের মতো অনেকগুলো বৌদ্ধ ‘চোর্তেন’, যা কি না অশুভ শক্তিকে দূরে সরিয়ে শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে বলে স্থানীয় বৌদ্ধদের বিশ্বাস।
অস্তগামী সূর্যের মায়াবী আলো পুনাখা জংয়ের ওপর পড়ায় জংটির সৌন্দর্য অনেকগুণ বেড়ে গেছে। লাল কাপড় আর ন্যাড়া মাথার বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুব ইচ্ছা করছিল ভিক্ষুদের সঙ্গে ছবি তুলতে। কিন্তু তারা কী ভাববে, ভেবে ছবি তোলার কথা আর বলা হয়নি।
পুনাখা জংয়ের দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিকতা, স্বচ্ছ জলের পাহাড়ি নদী, কাঠের ঝুলন্ত সেতু, চারদিকের অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে মনটা ভরে গেল। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অনেকটা সময় কাটানোর পর এবার ফিরে যাওয়ার পালা।
পুনাখা থেকে ফেরার সময় সবাই ক্লান্ত। পাহাড়ি রাস্তায় দীর্ঘ বাসযাত্রা। সেইসঙ্গে হাঁটাহাঁটি হইচই দৌড়ঝাঁপ তো কম হয়নি।
বাসে উঠে অনেকেই ঝিমাতে লাগল। আমারও চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছে। এক পর্যায়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারিনি। কেউ একজন শব্দ করে বমি করছে। আমার ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি রিটা। ওর পাশে বসা সুমিতি ও লিপি। পেছনের সিটে তাপস ও শাহেদ। ওরা রিটাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছে কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। ক্রমাগত বমি করছে। এক পর্যায়ে শাহেদ কামাল স্যার এগিয়ে এসে রিটাকে সহযোগিতা করতে লাগলেন এবং বাস থামাতে বললেন। স্যারের কাপড়চোপড় বমিতে ভিজে গেল। স্যার নিজ হাতে সবকিছু পরিষ্কার করলেন। স্যার যেভাবে রিটার টেককেয়ার করলেন তা দেখে আমি অভিভূত।
আমাদের বাস আবার থিম্পুর উদ্দেশে ছুটতে শুরু করল। রাত আটটায় আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। সবাই ক্লান্ত। তাই যার যার রুমে চলে গেল। আমি আর কমল ফ্রেশ হয়ে কাউকে কিছু না বলে বের হলাম বাইরের কোনো ভালো রেস্টুরেন্ট খুঁজতে। নরলিং হোটেলের একই খাবার খেতে আর ভালো লাগছে না। গতকালই ঠিক করে রেখেছিলাম আজ রাতে বাইরে কোথাও খেতে যাব। হোটেলের ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি হোটেল ড্রুক-এর কথা বললেন। লোকেশন বুঝে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। থিম্পুর একমাত্র তিন তারকা হোটেল। এর চেয়ে বড় কোনো হোটেল শুধু থিম্পুতে না, ভুটানজুড়েই নেই।
পাহাড়ের গা ঘেঁষে হোটেল ড্রুক-এর অবস্থান। লাল রঙের তিনতলা ভবন। মাঝ বরাবর একটা গম্বুজের মতো উঠে গেছে। সাহস করে ঢুকে পড়লাম হোটেল ড্রুকে। প্রধান ফটকে মাথায় লাল পাগড়ি আর বিশেষ পোশাকপরা প্রহরী অভ্যর্থনা জানিয়ে স্বচ্ছ কাচের দরজা খুলে দিল। রিসিপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই একজন এগিয়ে এসে আমাদের রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল। রেস্টুরেন্টের একদিক কাচ দিয়ে ঘেরা। সেখান থেকে দেখা যায় শুধু সবুজ পাহাড় আর পাহাড়। ইন্টেরিয়র করা হয়েছে ভুটানি সংস্কৃতির আদলে। টেবিল-চেয়ার আসবাবপত্র সবকিছুতেই ভুটানি সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে।
কোনার দিকে একটা টেবিলে গিয়ে বসলাম। ভুটানি কায়দায় স্বাগত জানিয়ে খাবারের মেন্যু দিয়ে গেল ওয়েটার। অনেকক্ষণ মেন্যু উল্টে পাল্টে দেখে কোনো খাবারই পছন্দ করতে পারলাম না। তাছাড়া খাবারের মূল্য দেখে আমরা হতবাক। কমল বলল, চলো অন্য কোনো রেস্টুরেন্টে যাই অথবা আমাদের হোটেলে ফিরে যাই।
আমি বললাম, এতক্ষণ মেন্যু নিয়ে গবেষণা করে কোনোকিছু না খেয়ে চলে যাব! কী ভাববে ওরা? তাছাড়া আমাদের হোটেলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই সবার খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়ে গেছে।
অবশেষে এক বাটি স্যুপ আর এগ ফ্রায়েড নুডলসের অর্ডার দিলাম। ভুটানি এক শিল্পীর গান বাজছে। ভাষা তো বুঝতে পারছি না। তবে সুর অসাধারণ। খোঁজ নিয়ে জানলাম, যিনি গাইছেন তিনি এখানকার খুব বিখ্যাত এক শিল্পী।
রাত দশটায় স্যুপ আর নুডলস খেয়ে আমাদের হোটেলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। হোটেলে ঢুকে দেখি সবার রাতের খাওয়া শেষ। অনেকেরই প্রশ্ন আমরা এতক্ষণ কোথায় ছিলাম? হোটেল ড্রুকে খেতে গিয়েছিলাম, এটা তো আর বলতে পারছি না। রুমে হিটার ভাড়া করেছি এতেই বন্ধুদের নানা প্রশ্ন। যদিও কেউ কেউ জানে আমরা তখন পজিট্রন গাইড বের করছি। শুরু করেছি পজিট্রন কোচিং সেন্টারের। কাজেই অন্য বন্ধুদের চেয়ে আমাদের হাতে অর্থযোগ একটু বেশি। তারপরও মিথ্যা বললাম যে—আশপাশে একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেটা নিয়েও অভিযোগ—কেন তাদের না বলে আমরা দুজন ঘুরতে গেলাম? বন্ধুদের প্রশ্নের পর প্রশ্ন। কোনোরকমে সবাইকে ম্যানেজ করলাম। কিন্তু স্যুপ আর নুডলসে তো পেট ভরেনি।
হোটেলে আসতে না আসতেই খিদে লেগে গেছে। তাই রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে শোনা মাত্র খিদে আরো বেড়ে গেল। কী করব বুঝতে পারছি না।
হোটেল লবিতে সুব্রত স্যারের সঙ্গে দেখা। স্যার জানতে চাইলেন আমরা দুজন কোথায় ছিলাম। আরো বললেন, গোলাম রহমান স্যার রাতের খাবারের সময় তোমাদের খোঁজ করছিলেন। স্যারকে সত্য কথা বললাম। এটাও বললাম, যা খেয়েছি তাতে খিদে মেটেনি।
স্যার শুনে বললেন, গেলেই যখন তবে ভালোভাবে ডিনার করে এলে না কেন? এখন খাবে কী? এখানকার রেস্টুরেন্ট তো বন্ধ হয়ে গেছে।
স্যারকে বললাম, খাওয়া কোনো সমস্যা না। অন্য স্যাররা রাগ করেছেন কি না?
স্যার বললেন, কেউ কেউ খোঁজ করছিলেন। ঠিক রাগ করতে দেখিনি কাউকে।
স্যারকে অনুরোধ করলাম—তিনি যেন কাউকে কিছু না বলেন। এরপর হোটেল থেকে বেরিয়ে কাছাকাছি কয়েকটা রেস্টুরেন্টে গেলাম। সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ। এমনকি এক প্যাকেট বিস্কিট পর্যন্ত কোথাও পেলাম না। অথচ হাঁটাহাঁটি করে খিদে আরো বেড়ে গেল। কী আর করা! হোটেলে ফিরে এলাম। আমি জানতাম, বন্ধুদের কেউ কেউ ঢাকা থেকে চিড়া-মুড়ি সঙ্গে নিয়ে এসেছে। একমাত্র ভরসা সেই চিড়া-মুড়ির সন্ধান করা। কমল কারো কাছে চিড়া-মুড়ি খুঁজতে যেতে রাজি হলো না। সে রুমে গিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল। কিন্তু আমার যে কিছু একটা খেতেই হবে। তাই বের হলাম বন্ধুদের রুমে খাদ্যের সন্ধানে।
রাতে ইউনিসেফের কান্ট্রি ডিরেক্টরের বাসায় দাওয়াত। এটি বিশাল আনন্দের খবর আমাদের জন্য। কেননা গত চারদিন দেশি খাবারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এদের সব আজেবাজে খাবার খেতে খেতে মুখের স্বাদই নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো খাবারেই ঝাল মসলা নাই। আর সবকিছুর মধ্যেই শুঁটকির গন্ধ। প্রথম দেশের বাইরে এসেছি। কাজেই ভিনদেশি খাবারের অভিজ্ঞতাও এই প্রথম।
রাত আটটায় আমরা কান্ট্রি ডিরেক্টরের বাসায় পৌঁছে গেলাম। থিম্পু ভ্যালি থেকে খানিকটা উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে স্বতন্ত্র বাড়ি। দুই বছরের কিছুটা বেশি সময় ধরে তিনি স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে এখানে বসবাস করছেন। মেয়ের বয়স ৮ বছর। ঢাকা থেকে থিম্পু আসার সময় বিমানে তার সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এত বড় একটা গ্রুপ ভুটানভ্রমণে যাচ্ছে শুনে তিনি খুশি হলেন। থিম্পু এয়ারপোর্টে নামার পর গোলাম রহমান স্যারকে ফোন নম্বর দিলেন এবং তার বাড়িতে একদিন সবাইকে রাতের খাবারের জন্য দাওয়াত করলেন।
স্যার বললেন, আমার বাহিনী কিন্তু অনেক বড়। ৩০ জন।
তিনি বললেন, কোনো সমস্যা নাই। আপনার ফুল টিম নিয়ে আসবেন।
সেই সূত্র ধরে গোলাম রহমান স্যারের ফুল টিম আজ তার বাসায়। বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি। নিচে ওপরে মিলে প্রায় ৬/৭টি রুম। লিভিং রুমটা অনেক বড়। মাঝ বরাবর ফায়ারপ্লেস বানানো। বাড়ির ভেতরের প্রতিটা দেয়াল কাঠ দিয়ে মোড়ানো। ভেতর থেকে মনে হয় কাঠের তৈরি একটি বাড়ি। আমরা ছোট ছোট গ্রুপে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসলাম। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে গিয়ে নাসের স্লিপ করে পড়ে গেল। আমি এবং শাহেদ দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে দাঁড় করালাম। খবর পেয়ে শাহেদ কামাল স্যারও এলেন। স্যার হাত ধরে নাসেরকে হাঁটানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। সে দুই-তিনটি স্টেপের বেশি দিতে পারল না। তাকে ধরে নিয়ে একটা জায়গায় বসানো হলো। গৃহকর্তা এগিয়ে এলেন বরফ নিয়ে। অ্যাংকল জয়েন্টে ব্যথা পেয়েছে। সেখানে বরফ দেওয়ার ব্যবস্থা হলো। পেইন কিলার খাওয়ানো হলো। তাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে দেখে নাসের খুবই লজ্জিত। সে বারবারই বলছে তার তেমন কিছুই হয়নি।
শাহেদ কামাল স্যার বললেন, কিছুই হয়নি বলছ—তাহলে হাঁটতে পারছ না কেন? অন্য স্যাররাও এসে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। বন্ধুরা অনেকেই নাসেরকে ঘিরে বসে আছে। গৃহকর্তা কিছুক্ষণ পর পর এসে খোঁজ নিয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতালেও নিয়ে যেতে চাইলেন। সাখাওয়াত স্যার বললেন, হাসপাতালে নেওয়ার মতো কিছু হয়নি।
কিছুক্ষণ পর নাসের উঠে দাঁড়াল। আমরা সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কাল সকালে আমাদের নেপাল যাওয়ার ফ্লাইট। সত্যি যদি নাসেরের পা ভেঙে যেত, তাহলে কী ঝামেলায়ই না পড়তে হতো! এরমধ্যে গৃহকর্ত্রী জানালেন টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে। ডাইনিং টেবিলভর্তি নানা পদের খাবার দেখে মনটা ভরে গেল। পোলাও, মুরগির রোস্ট, খাসির মাংস, মাছের দোপেঁয়াজা, সবজি। আরো আছে বেগুন ভাজা, গরম ডাল এবং সালাদ। মুহূর্তের মধ্যে সবাই খাবার নেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। মনে হলো চারদিন না চল্লিশ দিন অভুক্ত সবাই। ভাবীর রান্নার হাত খুবই ভালো। যেটা মুখে দিই সেটাই সুস্বাদু লাগছে। যেভাবে সবাই খাচ্ছে তাতে মনে হলো খাবার কম পড়ে যায় কি না। কিন্তু না, সবাই গলা পর্যন্ত খাওয়ার পরও অনেক খাবার রয়ে গেল। আমার ধারণা ভাবী বুঝে শুনেই রান্না করেছেন। চারদিন ভুটানি খাবার খেয়ে আমাদের অবস্থা কী হতে পারে—সেটা তিনি অনুমান করতে পেরেছেন। অসম্ভব তৃপ্তিসহকারে রাতের খাবার খেলাম।
এরপর শুরু হলো গানের আসর। এ বাড়িতে যে গান-বাজনা হয়—সেটা ঢুকেই বুঝতে পেরেছিলাম লিভিং রুমের কোনায় রাখা হারমোনিয়াম ও সেতার দেখে। সবার অনুরোধে প্রথমেই গান শুরু করলেন সুব্রত স্যার। পর পর কয়েকটা রবীন্দ্রসংগীত শোনালেন। স্যারের গানের গলা খুব ভালো। এই প্রথম শুনলাম। এরপর আমাদের পল্লব কয়েকটা গান গাইল। আমি এক পর্যায়ে সেতারটা হাতে নিলাম ছবি তোলার জন্য। সুব্রত স্যার মনে করেছেন আমি হয়তো এই যন্ত্রটি বাজাতে পারি। স্যার ঘোষণা দিলেন, এবার মাজহার সেতার বাজিয়ে শোনাবে। আমি তো ঘামতে শুরু করলাম। বললাম, স্যার সত্যি আমি বাজাতে পারি না। স্যার কিছুতেই আমাকে ছাড়বেন না।
বললেন, লজ্জার কী আছে? ভুল হলেও অসুবিধা নাই। তুমি বাজাও।
আবারো স্যারকে বললাম, আমি সেতার বাজাতে পারি না। ফান করে ছবি তোলার জন্য হাতে নিয়েছি মাত্র।
স্যার কিছুতেই আমার কথা বিশ্বাস করতে রাজি না। অবশেষে গোলাম রহমান স্যার আমাকে রক্ষা করলেন। বললেন, সুব্রত, মাজহারের আজ মুড ভালো নেই। আরেকদিন তোমাকে সেতার বাজিয়ে শোনাবে। বরং তুমি আরেকটা গান গাও। তারপর চলো হোটেলে ফিরে যাই। আমাদের খুব সকালে এয়ারপোর্ট রওনা হতে হবে।
সুব্রত স্যার আর কোনো কথা না বলে গাইতে শুরু করলেন—
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?
কেন মেঘ আসে হূদয়-আকাশে,
তোমারে দেখিতে দেয় না।...
সুব্রত স্যারের গান দিয়ে শেষ হলো আনন্দঘন একটি রাত। মধ্যরাতে আমরা যখন হোটেলে ফিরে আসছি, থিম্পু শহর তখন ঘুমিয়ে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকও বন্ধ হয়ে গেছে। অথবা এখানে ঝিঁঝিঁ পোকার বসবাস নাই। চারদিকে অন্যরকম এক নিস্তব্ধতা। দূরে পুরোনো জংগুলোতে বিদ্যুত্বাতি জ্বলছে। আমাদের বাস পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিচের দিকে নেমে আসছে। আকাশে উথালপাথাল জোছনা। সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় জমে থাকা বরফের ওপর জোছনার সেই আলো পড়ে অসাধারণ এক দৃশ্য সৃষ্টি হয়েছে। পল্লব গান ধরল, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে...।’ v
