দেশে খাদ্যে ফরমালিনসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার বাড়ছেই। খাদ্যে এসব রাসায়নিক শনাক্তকরণ ও পরিমাণ নির্ণয়ে দেশের বিজ্ঞানীরা কম খরচ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ও কৌশল উদ্ভাবন করছেন। এ উদ্ভাবনের অনেকগুলো ভোক্তা পর্যায়ে সহজেই ব্যবহার সম্ভব। কিন্তু দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে নজর নেই সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। আর ভেজাল শনাক্তকরণের কতগুলো নিরীক্ষা দেশীয় গবেষণাগারে কম খরচে নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা যায়। দেশীয় প্রযুক্তি ও কৌশলের বহুল ব্যবহার, প্রচার ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে গতি আসবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একইসাথে এ প্রযুক্তি ভোক্তাদের দ্বারা তাত্ক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বলে নিরাপদ খাদ্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলেও বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও সমুদ্র বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর বিষয়ে গবেষণা করেছে। পৃথক এসব গবেষণায় খাদ্যে ফরমালিন, ইথিফোন, কার্বাইড, পেসটিডসাইড (কীটনাশক), ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক এন্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এসব রাসায়নিক শনাক্ত ও পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ও কৌশল উদ্ভাবন এবং হালনাগাদকরণ করেছেন বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এআই মুস্তফা বলেন, কৃষিমাঠ থেকে উত্পাদনের পর ভোক্তার টেবিলে আসা পর্যন্ত খাদ্য বিভিন্ন উপায়ে মানবস্বাস্থ্যের জন্য অনিরাপদ ও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। খাদ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হলে মানবস্বাস্থ্যের জন্য তা মারাত্মক হুমকি। এ রাসায়নিক শনাক্ত ও নির্ণয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। খাদ্যে রাসায়নিকের উপস্থিতি নির্ণয়ে বিজ্ঞানীরা বেশকিছু ‘কিট্স’ তৈরি করেছেন। আর গবেষণাগারে রাসায়নিক নির্ণয়ের প্রক্রিয়াও উন্নত হয়েছে। এ প্রযুক্তিগুলো সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায়, দেশের বাজারগুলোতে কলা, আম, লিচু, টমেটো, আনারসসহ বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি ফল এবং সবিজতে সাধারণত ফরমালিন, কার্বাইড বা ইথিফোন ব্যবহার করা হয়। কৃত্রিম উপায়ে দুধের স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয় ফরমালিন। মাছ-মাংস তাজা রাখার জন্যও ব্যবহূত হয় ফরমালিন। আয়োডিন ছাড়াই চমকপ্রদ প্যাকেটে বিক্রি হয় লবণ। ফার্মে চাষ করা মাছ, মুরগি ও গরুর মাংসে থাকে মাত্রাতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক। মসলা, পানি ও প্রাণিজ খাদ্যে থাকে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সীসাসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ভারী ধাতু। মুড়িতে মেশানো হয় ইউরিয়া। গুড় ও চিনিতে মেশানো হয় অতিরিক্ত হাইড্রোজ, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
ফরমালিন নির্ণয় কিট
স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর উদ্ভাবন করে মাছ ও মাংসে ফরমালিনের উপস্থিতি শনাক্তকরণ কিট উদ্ভাবন করেছে খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (আইএফএসটি)। এর শনাক্তকরণ ক্ষমতা ৩ পিপিএম, দুধে ফরমালিন শনাক্তকরণ দ্রবণ যা দ্বারা ৫ পিপিএম ফরমালিন শনাক্তকরণ করা যায়। এ প্রতিটি কিটের মূল্য ১০০ টাকা। এ কিট তৈরির সাথে জড়িত বিজ্ঞানী ড. নাসিমা হক জানান, কিটটি স্বল্পমূল্য ও সহজে ব্যবহারযোগ্য। তাই ভোক্তা পর্যায়ে এর ব্যাপক ব্যবহার সম্ভব। ফল ও সবিজতে ফরমালিন শনাক্তকরণের জন্য সরাসরি কোনো কিট নেই। ফরমালিন উদ্বায়ী পদার্থ হওয়ায় ফলের উপরিভাগে ফরমালিনের উপস্থিতি নিশ্চিত নয়। তাই অভ্যন্তরস্থ ফরমালিন শনাক্তকরণের জন্য ফল ও সবজি হতে ফরমালিন নিষ্কাশন করে বিদ্যমান ‘মাছে ফরমালিন শনাক্তকরণ কিট’ দিয়ে ৩ পিপিএম পর্যন্ত ফরমালিন শনাক্তকরণ করা যায়। অত্যাধুনিক যন্ত্র এইচপিএলসি ব্যবহার করে খাদ্যে ফরমালিনের পরিমাণ নির্ণয় করা যায়।
ইথিফোন সনাক্তকরণ প্রযুক্তি
কৃষিতে গ্রোথ রেগুলেটর এবং ফলমূল পাকানোর জন্য ইথিফোন ব্যবহার করা হয়। জিসিএমএস মেশিনের মাধ্যমে ইথিফোনের সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করে বিসিএসআইআর। ফলে ইথিফোন সনাক্তকরণে স্বল্পমূল্যের কিটও আবিষ্কার করেছে প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবরেটরিজ। এর মূল্য ৫০ টাকা।
ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও এন্টিবায়োটিক নির্ণয়
ফল তাড়াতাড়ি পাকানোর কাজে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা হয়। ফলে এর উপস্থিতি নির্ণয়ে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর উদ্ভাবন করেছে বিসিএসআইআর। মাছ, মুরগি ও গবাদিপশুকে রোগজীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য অতিমাত্রায় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। এ এন্টিবায়োটিকের ‘রেসিডিউ’ খাদ্যে বিদ্যমান থেকে খাদ্যকে বিষাক্ত করে তোলে। এলসিএমএসএমএস ও এইচপিএলসি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের এন্টিবায়োটিকের রেসিডিউ নির্ণয়ে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর উদ্ভাবন করেছে আইএফএসটি। এ প্রক্রিয়া চিংড়ি শিল্প রপ্তানিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
মাইকোটক্সিন ও পেস্টিসাইড
বিভিন্ন ছত্রাকের আক্রমণে খাদ্যদ্রব্যে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর টক্সিন তৈরি হয়। বিশেষত, শাক-সবজি, সিরিয়াল, মাছ ও মাংসে অফলাটক্সিন, অক্রাটক্সিন ও পেসুলিন আক্রমণ করে। এ সকল বিষাক্ত ছত্রাক নির্ণয়ে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর উদ্ভাবন করা হয়েছে ফুড টক্সিলোজি এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও ফুড মাইক্রোবায়োলজি গবেষণাগারে। দেশের বাজারে নিরাপদ বিস্কুট ও চানাচুর এবং এ জাতীয় পণ্যে বিশুদ্ধতা নির্ণয়ে এ প্রক্রিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে।
শাক-সবজিতে কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য কীটনাশক বা পেস্টিসাইড ব্যবহার করা হয়। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের রেসিডিউয়ের উপস্থিতি ও পরিমাণ নির্ণয় করা হয় জিসি-ইসিডি এবং জিসিএমস প্রযুক্তির মাধ্যমে। শুধু নির্ণয় নয়, শাক-সবজিতে কীটনাশক দূর করার জন্য ‘ভেজিটেবল ওয়াশ’ নামে একটি তরল পণ্য উদ্ভাবন করেছে আইএফএসটির বিজ্ঞানীরা।
ভারী ধাতু ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক নির্ণয়
বিভিন্ন মসলা, পানি, প্রাণিজ খাদ্যে ভারী ধাতুর (আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, লেড, মারকারী) উপস্থিতি এটোমিক এবজরপশন স্পেক্ট্রোমিটারের মাধ্যমে নির্ণয় করা হচ্ছে বিসিএসআইরে। মুড়িতে ইউরিয়ার পরিমাণ স্পেক্ট্রোফটোমিটারের মাধ্যমে আর গুড় ও চিনিতে হাইড্রোজের উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। এখানে কোমল পানীয়তে মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন, এলকোহল ও প্রিজারভেটিভের উপস্থিতি নির্ণয়ের কৌশলও উদ্ভাবন করা হয়েছে।
বিসিএসআইআর’র একজন জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে মূল্য বেশি হওয়ায় বিদেশি প্রযুক্তি ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহার সম্ভব নয়। কিন্তু দেশীয় প্রযুক্তির মূল্য কম হওয়ায় ভোক্তারা সহজেই ব্যবহার করতে পারবেন। আর ভোক্তারা নিজেরাই খাদ্যে ভেজাল সনাক্ত করতে পারলে খাদ্যে রাসায়নিকের ব্যবহার এমনিতেই কমে যাবে এবং জনসচেতনতাও বাড়বে। তাই দেশীয় প্রযুক্তিগুলোর বাজারজাতকরণ ও প্রচারণায় সরকারের বেশি নজর দেয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. জহুরুল হক বলেন, আমাদের কাজ গবেষণা করা। প্রযুক্তির উন্নত ব্যবহার নিশ্চিত করা। খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক নিখুঁতভাবে নির্ণয়ে সব ধরনের প্রযুক্তি ও কৌশল এখন আমাদের রয়েছে। এর কোনগুলো আমাদের একেবারেই নিজস্ব উদ্ভাবিত। আর কোনগুলো বিদ্যমান প্রযুক্তিকে নিজস্ব প্রয়োজন মেটাতে উন্নত ও হালনাগাদ করা হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল নির্ণয়ে বেশ কিছু কিট আবিষ্কার করা হয়েছে। এগুলো যত বেশি বাজারজাত করা যাবে, তত বেশি মানুষ উপকৃত হবে। তিনি জানান, ক্ষতিকারক ফরমালিনের বিকল্প হিসেবে নিরাপদ প্রাকৃতিক প্রিজার্ভেটিভ উদ্ভাবনের লক্ষ্যেও গবেষণা হচ্ছে।
