গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আপডেট : ০১ জুন ২০১৯, ০২:৩৩

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে মানিক মিয়া এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। তিনি তথাকথিত নিরপেক্ষতার বদলে মানুষের মুক্তির পক্ষে নিজেকে, সাংবাদিকতাকে নিয়োজিত করেছিলেন। কোনো মতবাদ প্রচার নয়, সাংবাদিকতার একমাত্র ও প্রধান লক্ষ্য যে গণমানুষের মুক্তির জন্য নিয়োজিত থাকা, ন্যায়ের প্রশ্নে অবিচল থাকা— এই কথা তিনি তাঁর সারাজীবনের কাজ দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করে জীবনব্যাপী তিনি এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) তাঁর হাত ধরেই সাংবাদিকতা এক নতুন মোড় নিয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ ব্যক্তিত্ব তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৬৯ সালের এইদিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ক্ষণজন্মা এই সাংবাদিক। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের কথা সহজ ভাষায় মানুষের সামনে তুলে ধরতেন মানিক মিয়া। তিনি ছিলেন নির্ভীক সাংবাদিকতার কিংবদন্তী পুরুষ, আধুনিক সংবাদপত্রের রূপকার, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা। ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’, ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ আর ‘রঙ্গমঞ্চ’ শিরোনামে কলাম লিখে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতাকামী করে তোলেন মানিক মিয়া। ‘মোসাফির’ শিরোনামে তাঁর ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে নির্ভীক সত্য ভাষণ, অনন্য রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা এবং গণমানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই বাংলার মানুষের হূদয়ে তিনি অবিনশ্বর হয়ে রয়েছেন। ইত্তেফাক সবসময় মনে করেছে, সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের কথা বলা, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। ইত্তেফাক পূর্ব পাকিস্তানে যে ভূমিকা পালন করেছিল তা ছিল সময়ের দাবি। আওয়ামী লীগের সেই সময়ের রাজনীতিকে ইত্তেফাক জনগণের দাবি বলেই মনে করেছিল। মানুষের মুক্তির পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে জাতির প্রতিটি ক্রান্তিকালে। মানিক মিয়া ছিলেন তার কান্ডারি। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অবস্থান, ইত্তেফাকের সাংবাদিকতা এবং আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান ছিল এক ও অভিন্ন।

এ প্রসঙ্গে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘আজ যে স্বাধীনতার সোনালি ফসল আমরা ঘরে তুলছি সেজন্য ইত্তেফাক এবং মানিক মিয়ার একক অবদান অসাধারণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ইত্তেফাক একটি অবিস্মরণীয় নাম হয়ে থাকবে। আজকের সাংবাদিকতায় বাণিজ্য ও মুনাফা প্রধান লক্ষ্য, কিন্তু সে যুগের সাংবাদিকতায় আদর্শ এবং তার জন্য লড়াই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। সাংবাদিকদের গাড়ি-বাড়ি ছিল না কিন্তু ছিল অটুট আদর্শ, নিষ্ঠা। মানিক মিয়া শুধু সংবাদপত্রের মালিক ছিলেন না, ছিলেন জনজীবনভিত্তিক সাংবাদিকতার পথিকৃত্।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘আমার মানিক ভাই’ শিরোনামে এক লেখায় উল্লেখ করেছিলেন, ‘... আমার ব্যক্তিগত জীবনে মানিক ভাই’র প্রভাব যে কত গভীর, তা ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়। ১৯৪৩ সাল থেকে তাঁর সাথে আমার পরিচয়। সে পরিচয়ের পর থেকে সারাটা জীবন আমরা দু’ভাই একসাথে জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম করেছি। ... একটা বিষয়ে আমরা উভয়ই একমত ছিলাম এবং তা হলো, বাংলার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ভিন্ন বাঙালির মুক্তি নেই, এ বিষয়ে আমাদের মাঝে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ ছিল না। আর ছিল না বলেই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও দু’জন দু’ফ্রন্টে থেকে কাজ করেছি। আমি কাজ করেছি মাঠে-ময়দানে আর মানিক ভাই তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর সাহায্যে।’

নীতির প্রশ্নে, বাংলার মানুষের অধিকারের বিষয়ে মানিক মিয়া কখনো আপস করেননি। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তাঁর সেই সংগ্রামী জীবনের প্রধান হাতিয়ার। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, প্রবাদপ্রতিম এই ব্যক্তিত্ব দেশের সাংবাদিকতাকে একটানে বদলে দিয়েছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা, বেদনাকে জোরালোভাবে তুলে ধরবার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। শুধু সাংবাদিকতা কিংবা রাজনীতির পথপ্রদর্শকই নন, ব্যক্তি মানুষ হিসাবেও তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর সংস্পর্শে যিনি একবার এসেছেন তিনি তাঁর সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। তেমনি তাঁর সহানুভূতিশীল হূদয় ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ আজও মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। রাজনৈতিক জগতে তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য। ঘনিষ্ঠ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল মানিক মিয়ার।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন উদার গণতন্ত্রের ধারক। একজন রাজনীতিমনস্ক সাংবাদিক হয়েও তাঁর রাজনৈতিক কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল না, ছিল না ব্যক্তিগত কোনো লোভ। এ কারণেই সত্ ও নির্মোহ অবস্থান থেকে সত্য কথা বলার সাহস দেখাতে পারতেন। জেল-জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন এবং সরকারের অসহযোগিতাকে মোকাবেলা করে, নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে তাকে মানুষের অধিকারের কথা বলতে হয়েছে।

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে তিনি সত্য প্রকাশ করেছেন। একসময়ে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের সামরিক শাসক দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সে সময়ে সরকারের সঙ্গে আপস করলে তিনি ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি আপস করেননি। তিন বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন। সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মুসলেমউদ্দিন মিয়া। শৈশবেই মানিক মিয়ার মা মারা যান। গ্রামের পূর্ব ভাণ্ডারিয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলে মানিক মিয়ার শিক্ষা জীবনের শুরু। ১৯৩৫ সালে মানিক মিয়া ডিস্টিংশনসহ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে চাকরি শুরু করেন। ১৯৩৭ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার অন্তর্গত গোয়ালদি গ্রামের অভিজাত পরিবারের খোন্দকার আবুল হাসানের কন্যা মাজেদা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।

দৈনিক ইত্তেফাক আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে মানিক মিয়া একবছর জেল খাটেন। ১৯৬৬ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। এসময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। এরফলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য দুটি পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী বন্ধ হয়ে যায়। গণআন্দোলনের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হয়।

কর্মসূচি

মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মরহুমের আজিমপুর মাজারে আজ শনিবার সকাল সাতটা থেকে কোরানখানি এবং বেলা ১০টায় মিলাদ ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। রামকৃষ্ণ মিশন রোডে মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন কার্যালয়ে বাদ আসর মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এতে উপস্থিত থাকবেন মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এছাড়া মরহুমের কনিষ্ঠ পুত্র সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ধানমন্ডির বাসভবনে কোরানখানি ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। জ্যেষ্ঠ কন্যা মরহুমা আক্তারুন্নাহার বেবীর বাসভবনেও বাদ আসর মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। এদিকে মানিক মিয়া রিচার্স একাডেমি মরহুমের মাজারে পূষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে।

জেপির শ্রদ্ধা

ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পার্টি-জেপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষ হতে সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম বলেছেন, তিনি ছিলেন এদেশের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জুলুম, লোভ, লালসা উপেক্ষা করে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন বাঙালি জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে।

মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করি। আমরা তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করি এবং তাঁর সংগ্রামী আদর্শ আমাদের চিরদিন অনুপ্রাণিত করুক এই প্রত্যাশা করি।

মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য দলটির পক্ষ হতে নিম্নলিখিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলো হলো— আজ শনিবার সকাল ১০টায় মানিক মিয়ার আজিমপুরের নতুন কবরস্থানে মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং বাদ আছর লালমাটিয়ায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল।