প্রিয় মুশফিক,
অনুমান করতে পারি, আপনার মনটা এখন খুব খারাপ। আপনার হূদয় সবসময়ই বড্ড নরম; আনন্দ-শোক আপনাকে একটু বেশিই স্পর্শ করে। দলের আরো একটা পরাজয়ে আপনি বিমর্ষ হয়ে পড়বেন, এটাই স্বাভাবিক।
এই সময়ে আপনাকে একটা খবর দেই। আমরা পরিসংখ্যান ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম, আপনার দলটি এখন একটি জায়গায় ‘বিশ্বসেরা’; ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার ১০০ রানের নিচে অলআউট হওয়ার ‘কৃতিত্ব’ আপনাদেরই।
আপনি অবশ্য রেগে উঠতে পারেন। বলতে পারেন, এই কৃতিত্ব আপনারা শুক্রবার অর্জন করেননি। আগে থেকেই আপনারা শতরানের নিচে অলআউট হওয়ায় চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তবে আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই, আপনার নেতৃত্বকালেই জিম্বাবুয়েকে টপকে বাংলাদেশ এই কৃতিত্ব অর্জন করেছে।
আচ্ছা, পরিসংখ্যানটাই বলা যাক।
বাংলাদেশ এই শুক্রবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৭০ রানে অলআউট হওয়ার ভেতর দিয়ে ১৪তম বারের মতো এই কাজ করলো। এই জায়গায় আপনার দলের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হল জিম্বাবুয়ে—তারা এ পর্যন্ত ১১ বার শত রানের নিচে অলআউট হয়েছে। শ্রীলঙ্কা খুব পিছিয়ে নেই; তারা ১০০ রানের নিচে অলআউট হয়েছে ১০ বার। আর পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ পর্যন্ত ৮ বার করে অলআউট হয়েছে শতরানের নিচে।
ওপরের কটকটে পরিসংখ্যানটা দেখে অবশ্য আপনি একটু নড়েচড়ে বসতে পারেন, মুশফিক। ভাবতে পারেন, শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দল আপনাদের কাছাকাছিই আছে। ফলে আপনারা আর এমন কী অন্যায় করেছেন?
মুশফিক, একটা কথা— লোকেরা বলে, নির্জলা পরিসংখ্যান মূর্খের অস্ত্র। এই ওপরের পরিসংখ্যানে বিশ্বাস করে শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিজেদের কাতারে ভাবলে সেটা মূর্খের কাজই হবে। কারণ, তারা প্রত্যেকেই আপনাদের চেয়ে শয়ে শয়ে বেশি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে।
এই ব্যাপারটা বুঝতে আপনাকে জানতে হবে যে, জিম্বাবুয়ে ৪২৮ ম্যাচে ১১ বার ১০০ রানের নিচে অলআউট হয়েছে। শ্রীলঙ্কা তাদের ইতিহাসে ৭২৮ ম্যাচে শতরানের নিচে অলআউট হয়েছে ১০ বার। আর আপনারা মাত্র ২২৮টি ম্যাচ খেলেই ১৪ বার এই কাজ করে ফেলেছেন। মানে, জিম্বাবুয়ে প্রায় ৩৯ ম্যাচে ১ বার করে, শ্রীলঙ্কা ৭২ ম্যাচে ১ বার করে অলআউট হয়েছে শতরানের নিচে। পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ যথাক্রমে প্রায় ১০৩ ও ৯০ ম্যাচে ১ বার করে এই ঘটনার শিকার হয়েছে। ওয়ানডে ইতিহাসে, টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম, ৫ বার একশ’ রানের নিচে অলআউট হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তারা গড়ে প্রতি ১৬৬ ম্যাচ পর পর এই ঘটনার সামনে পড়েছে।
আর আপনারা?
আপনাদের দল মাত্র ১৬টার কাছাকাছি করে ম্যাচ খেলার পরই একবার করে এই কেলেঙ্কারির শিকার হয়েছে। অবশ্য, আদৌ যদি আপনারা এটাকে কেলেঙ্কারি বলতে চান!
আপনারা এরকম প্রতিটা ঘটনার পরই ‘কেলেঙ্কারি’ শব্দটা শুনলে চটে ওঠেন; বলেন, এটা দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা ব্যাপারটা এতো নিয়মিত ঘটতে থাকলে সেটাকে ‘দুর্ঘটনা’ না বলে অন্যায় বলাটাই অবশ্য রীতি। কিন্তু আপনারা তো এসবকে অন্যায় ভাবতেও রাজী নন।
হ্যাঁ, আপনি ভাবতে পারেন, হঠাত্ করে বাংলাদেশ দলকে ‘আপনারা’ বা ‘আপনাদের দল’ বলে কেন বলছি? আমরা তো চিরকাল এরকম প্রতিটা ঘটনায় আপনাদের দুর্ঘটনাতত্ত্ব সমর্থন করে যে কোনো মূল্যে আপনাদের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছি। তাহলে হঠাত্ কেন আপনাদের আলাদা একটি পক্ষ হিসেবে ভাবছি? তার চেয়ে বড় কথা, ১৪ বার শত রানের নিচে অলআউটের দায় আপনার কাঁধেই কেন দিচ্ছি?
১৪ বারই তো আর আপনার নেতৃত্বে ঘটেনি ঘটনাটা। তবে এই ব্যাপারটাকে আসলেই এরকম লজ্জার একটা রেকর্ডে আপনার দলই পরিণত করেছে।
২০১১ বিশ্বকাপের আগেই বাংলাদেশ ৯ বার শতরানের নিচে অলআউট হয়েছিল। সেগুলোর বেশিরভাগটা ছিল মাত্রই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু করে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনে ঘটা ঘটনা। মানে, সেটার চাইলে আপনি ব্যাখ্যা দিতে পারেন। কিন্তু আপনার পূর্বসূরী সাকিবের হাত ধরে এক ২০১১ বিশ্বকাপে দেশের মাটিতে দু’ দুবার একশ’ রানের নিচে অলআউট হল বাংলাদেশ। এরপর আপনার নেতৃত্বে গত আড়াই বছরে এই ঘটনা ঘটেছে তিনবার। একটু হিসাব করে বলুন, দায়টা তাহলে আপনাদের এই এগিয়ে যেতে থাকা প্রজন্মেরই নয় কী?
যে সময়ে আমরা দাবি করছি, বাংলাদেশের ক্রিকেট এগোচ্ছে। কমবেশি আমরা দেশের মাটিতে ম্যাচও জিতেছি, সেই সময়ে এই রেকর্ড হতে থাকাটা কী প্রমাণ করে? আমরা এই সময়ে ক’বার তিনশ’ পার করা ইনিংস খেলতে পেরেছি। নিশ্চিত থাকুন, টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে সেটা একেবারেই নিচের দিকে। পাশাপাশি বারবার এই শতরানের নিচে অলআউট হওয়াটা কী এটা প্রমাণ করে না যে, বিপদের সময় করণীয় সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই! এর আরেকটা অর্থ করা যেতে পারে মুশফিক, আমরা দেশের মাটিতে ধীরগতির ও নিচু বাউন্সের উইকেটে ভিনদেশি দলগুলোকে মাঝে মাঝে বিপদে ফেলতে পারলেও মানসম্পন্ন বোলিংয়ে কঙ্কালসার একটা দল।
অবশ্য মানসম্পন্ন বোলিংয়ের দরকার কী?
এই ম্যাচের পর কী মনে হচ্ছে না যে, যে কোনো বোলিংই আমাদের কঙ্কাল বের করে দিতে পারে!
সবচেয়ে বেশিবার শতরানের নিচে
বাংলাদেশ ১৪ বার
জিম্বাবুয়ে ১১ বার
শ্রীলঙ্কা ১০ বার
পাকিস্তান ৮ বার
উইন্ডিজ ৮ বার
