চট্টগ্রাম বন্দরে আবার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির আশংকা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম চেম্বার ও বিজিএমইএ-এর নেতৃবৃন্দও বন্দর পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তা ও আতংকে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। আগামী ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের ব্যানারে বন্দর এলাকায় সমাবেশ আহবান করা হয়েছে। উক্ত সমাবেশের জন্য চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রচার-প্রচারণা ও মাইকিং শুরু হয়েছে। বন্দর রক্ষা পরিষদ চট্টগ্রাম বন্দরের সিসিটি ও এনসিটিতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা সাইফ পাওয়ার টেক নামক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে। একইসাথে বন্দরে দীর্ঘদিন পূর্বে কাজ সম্পন্ন হওয়া নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার দাবি জানানো হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ জানান, চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) সাইফ পাওয়ার টেক নামক প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ করছে। তাছাড়া সাইফ পাওয়ার টেক এনসিটি’র ৫টি বার্থের মধ্যে ২টি বার্থ পরিচালনা করছে। দীর্ঘদিন ধরে এনসিটি পদ্ধতি ঠিক না করায় সাইফ পাওয়ার টেক নির্দিষ্ট রেটে ওই দুটি বার্থে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়। অপর ৩টি বার্থ অফিসিয়ালি এখনো কর্মহীন রয়েছে।
এনসিটি প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৮ সালে কাজ শেষ হলেও এটা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হচ্ছে। কিন্তু এটি বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালাবে নাকি প্রাইভেট অপারেট দিয়ে চালাবে তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। এ দোদুল্যমান অবস্থায় গত কয়েক বছর চলার পর আওয়ামী লীগ সরকার নতুনভাবে ক্ষমতায় আসার পর নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠকেই সদস্যগণ বলেন, এনসিটি পরিচালনার জন্য বন্দরের নিজস্ব অর্থে ইকুইপমেন্ট কেনা উচিত হবে না। তাদের মতে, বন্দরের ১২শ’ কোটি টাকা ব্যয় না করে এনসিটি পরিচালনার জন্য যে প্রাইভেট অপারেটর নিয়োগ করা হবে সেই যেন তার অর্থে ইকুইপমেন্ট ক্রয় করে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থে ইকুইপমেন্ট ক্রয় করার টেন্ডার আহবান করে। এক পর্যায়ে অর্থমন্ত্রীর চিঠির প্রেক্ষিতে টেন্ডার স্থগিত হয়ে যায়।
কিন্তু এবার বন্দর রক্ষা পরিষদের ব্যানারে নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়। তাদের মতে, বন্দরের অর্থেই ইকুইপমেন্ট ক্রয় করতে হবে। এমনকি বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এনসিটি পরিচালনার জন্য দাবি জানানো হয়। এদিকে বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ জানান, বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এনসিটি পরিচালনার জন্য ইতিপূর্বে যাচাই-বাছাই করা হয়। কিন্তু তাতে দেখা যায়, যে পরিমাণ লোকবল ও অর্থব্যয় হবে সেক্ষেত্রে এনসিটি পরিচালনা লাভজনক হবে না। পরে বন্দর কর্তৃপক্ষ সে চিন্তা থেকে ফিরে আসে।
এদিকে বন্দরের বার্থ অপারেটরদের একটি অংশ চাচ্ছে বন্দর নিজস্ব অর্থায়নে মেজর ইকুইপমেন্ট ক্রয় করে প্রাইভেট অপারেটর দ্বারা পরিচালনা করা হউক। এতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং দেশের অর্থ দেশেই থাকবে। গত বৃহস্পতিবার নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও এনসিটি পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা যায়। অপরদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন প্রকল্পের ইকুইপমেন্টসহ সরঞ্জামাদি ক্রয় করা নিয়ে সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির সংশ্লিষ্টদের মতে, শতশত কোটি টাকা ব্যয়ে ইকুইপমেন্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রে আরো অনিয়ম ও দুর্নীতি হবে না এর কোন নিশ্চয়তা নেই। তাছাড়া বন্দরের তহবিল খরচ না করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে এনসিটি পরিচালনা লাভজনক হবে।
গত প্রায় ৬ বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে কোন শ্রমিক অসন্তোষ কিংবা কোন আন্দোলন-সংগ্রাম দেখা না গেলেও গত কয়েকদিন ধরে বন্দর নিয়ে আবার সভা-সমাবেশ শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যায়। এমনকি বিগত ৫ জানুয়ারি সারাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দর একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। এ ব্যাপারে বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে জানান, বন্দর একদিনের জন্যও বন্ধ হলেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গার্মেন্টস ব্যবসায়িগণ। কারণ বন্দরের শতকরা ৯০ ভাগ পণ্য হচ্ছে গার্মেন্টস সামগ্রী। তাই এ ধরনের সভা-সমাবেশ আন্দোলন নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় ও আতংকে রয়েছেন বলে নাসির উদ্দিন আহমদ জানান। চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, বন্দর বর্তমানে সর্বোচ্চ উত্পাদনশীলতায় চলছে। এটার আরো উন্নতির জন্য কাজ করা যেতে পারে। কিন্তু কোন প্রকার ইস্যু নিয়ে বন্দরে অচলাবস্থা দেখা দিলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, বন্দরকে নিয়ে যেন কেউ রাজনীতি না করেন। তবে কোন বিষয়ে দ্বিমত থাকলে অবশ্যই মতামত প্রকাশ করবেন। তিনি দ্রুত এনসিটি পরিচালনার দাবি জানান।
