এমন আনন্দ থাকুন অটুট
জীবনকে ভালবাসি বলেই বিশ্বাস করি, কেউ সহজে মরতে চায় না, মরতে চাইতে পারে না। এই যে ছুটে চলা, প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করা সবই তো বাঁচার জন্য, বাঁচানোর জন্য। আকস্মিক মৃত্যু ছাড়া সমস্ত মৃত্যুকেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা জীবন দিয়ে আগলে রাখতে চাই। ন্যূনতম,মধ্যম, উন্নত— সব রকম চিকিত্সা এবং চেষ্টার পরও আমরা ব্যর্থ হই। এখানেই মৃত্যুর শক্তি। বার বার কষ্টের দুয়ার ঠেলে, জীবনকে যখন বইতে অপারগ হই, ঠিক তখনই কিছুকে অবলম্বন করে নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণাই জীবনের সার্থকতা। সবার সাথে বেচে থাকাই আনন্দ। সেই আনন্দকে যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি, জন্ম থেকে জীবনকে লালনের সবরকম চেষ্টাকে কেন আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে অর্থহীন করে ফেলা? জীবনের আহ্বানেই আমাদের এই প্রতিবেদন লিখেছেন— সাকিলা মতিন মৃদুলা
মনোবিজ্ঞানীর ভাষ্য
কেউ আত্মহত্যা করলে কিংবা করার চেষ্টা করলে সাধারণ একটা মন্তব্য শোনা যায়, ‘নিশ্চয়ই আগেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। এটা জন্মগত প্রবনতা।’ একটু গভীরে গেলেই স্পষ্ট হবে এটা আসলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া, পলায়নপরতা। মনোবিজ্ঞানী মেহতাব খানম বলেন, এটা মানসিক রোগ নয়। তবে দীর্ঘদিন ডিপ্রেশনে থাকার ফলে মানসিকভাবে সে ভেঙ্গে পরে এবং নিঃসঙ্গতা বোধ করে। একটা পর্যায়ে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।’ লিও টলস্টয় বলেছিলেন, সচেতনতা, বিবেচনা আর বিশ্বাসের মধ্যে যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে সেই সফল ও মুক্ত মানুষ। আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া এই মানুষগুলো এই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। আত্মহত্যাকে নিছক মানসিক অসুস্থতা বলে অবহেলা করা অন্যায় এবং অপরাধ।
কিছু পরিসংখ্যান
২০১৩ সালে বিবিসি বাংলার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন ব্যক্তি নিজেকে হত্যা করে আর বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষে ৮ থেকে ১০ জন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বাংলাদেশ জার্নাল অব মেডিসিনের ২০১৩-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নীরবে আত্মহত্যার মহামারী চলছে। স্বপ্নগুলো যখন একের পর এক এলোমেলো হতে থাকে, আশ্রয়গুলো যখন হারিয়ে যায়, নিঃস্ব করে— তখন কিইবা করার থাকে? বিশ্বাস যখন সব দরজায় বাধাগ্রস্ত হয়ে আর্তচিত্কার করে, মানুষ যখন পাগল বলে ভর্ত্সনা করে— তখন জীবনকে ব্যঙ্গ করে ওরা মৃত্যুকে কাছে টেনে আনে। যদিও দায়ভার এড়াতে খুব সহজেই আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষগুলোকে আমরা মানসিক রোগী বলে কোনঠাসা করে দেই।
নারীর পাল্লাই ভারী
২০০১ সালের গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে সংঘটিত আত্মহত্যার ৫৮ শতাংশই নারী দ্বারা সংঘটিত। কিন্তু কেন? নারী এই সমাজে দুইভাবে অসহায়। প্রথমত দরিদ্র এবং শিক্ষার দৈন্যতায় আক্রান্ত দেশের মানুষ হয়ে এবং অতঃপর সেই দেশের নারী হয়ে। দুর্বল চিত্তের পলায়নপ্রবণ পরাজিত মেয়েরাই কেবল আত্মহত্যা করবে ধারণাটি সঠিক নয়। অনেক লড়াকু, আত্মবিশ্বাসী মেয়েটিও একসময় ক্লান্ত হতে পারে। সেও পালাতে চাইতে পারে জীবনের কাছ থেকে। আত্মহত্যা সমাধান হতে পারেনা। আমাদের সমাজে মেয়েদের সব রকম সমস্যা থেকে পরিত্রানের পথ যদি আত্মহত্যা হয় তবে খুব কম মেয়েরই বেঁচে থাকার কথা। মেয়েদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি হওয়ার কারণ আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সমাজব্যবস্থা। যেকোন দূর্ঘটনায় ও অব্যবস্থায় মেয়েরা নিজেদের দায়ী মনে করে। যৌন হয়রানি, পারিবারিক কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ— সবকিছুতেই দায়বার পড়ে মেয়েদের ওপরেই। আত্মগ্লানি আর অপরাধবোধে মেয়েরা একসময় নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। কখনও কখনও বেঁচে থাকার অনীহা থেকে বেছে নেয় এ পথ।
পরিবারের ভূমিকা
এক্ষেত্রে পরিবারই পারে সবচাইতে বড় ভূমিকা রাখতে। মানুষ হিসেবে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে হবে তা সে হোক ছেলে কিংবা মেয়ে। মেয়েদের জন্য সমাজ বেশী প্রতিকূল হওয়ায় এক্ষেত্রে পরিবারকে বেশী সাপোর্টিভ হতে হবে। ক্লান্ত বিমর্ষ মেয়েগুলো পথ চলতে গিয়ে একটু এলোমেলো পা ফেললেও একার সাহসের ওপর ভর করে মাটির ওপর পা রাখতে দ্বিধা করবেনা। রাইনার মারিয়া রিলকের প্রার্থনায়, ‘প্রভু, সবাইকে তার নিজের একক মৃত্যুটি দাও/ জীবনের পথ বেয়ে যেন সে মরণের ঠিকানায় পৌঁছে যায়/ তার নিজের প্রেম, মূল্যবোধ আর সংকটের হাত ধরে।’
চাই আশা
মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটিকে মুমুর্ষ অবস্থায় আমরা বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি। আত্মহত্যা করা মানুষটিকে কেন নয়? নিজ হাতে আত্মাকে হত্যা করে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার আগেই আমরা তাকে ফেরাইনা কেন? একাকী নিঃসঙ্গ হয়ে পরা মানুষটিকে আমরা আরও একা কেন করে ফেলি? ধৈর্যের সাথে অনুকূল প্রতিকূল সব পরিস্থিতিতেই মানিয়ে নেয়ার প্রয়াসে আমরা তাকে সঙ্গ দেইনা কেন? যদি কেউ এই পথকে ফিরে আসে বন্ধু হয়ে বন্ধুর মতো বন্ধুর পথের সাথী হইনা কেন? পাশের মানুষটির সতর্ক প্রয়াসে আত্মাকে ভালবেসে জীবনকে পরিপূর্ণতায় বাঁচিয়ে রাখুক প্রতিটি মানুষ। বন্ধ হোক আত্মহত্যা। বন্ধ হোক বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ করে যাওয়া করুন মৃত্যু। আঁদ্রে মরোয়া বলেছেন, ‘মানবিক কর্মকাণ্ডে স্থায়ী ভারসাম্য বলে কিছু নেই। আস্থা, প্রজ্ঞা, শিল্পকলা কিছু সময়ের জন্য আমাদের তা এনে দেয় এবং পরবর্তীতে নানা প্রভাব এবং আত্মার তীব্র আবেগ সেগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে।
