দেশের বৃহত্তম শিল্পখাত গার্মেন্টস শিল্প। দীর্ঘকাল যাবত্ সমৃদ্ধ হয়েছে এই খাত, নিয়োজিত হয়েছে লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিক। সেই সঙ্গে ঘটে গেছে বিশ্ব ইতিহাসের অমানবিক-মানবিক বিপর্যয়। অত্যন্ত স্বল্প মূল্যে নিজেদের শ্রম বিকিয়েছে যারা বাঁচার তাগিদে, সংসারের হাল ধরতে দু’মুঠো অন্ন যোগানোর দুঃসহ লড়াই করেছে জীবন বাজি রেখে সেই সব নারী শ্রমিক বাজিগরেরা জুটিয়ে গেছে মালিক পক্ষের কাঙ্ক্ষিত মুনাফা, নিজেরা খুইয়েছে জীবন মুখোমুখি হয়েছে লঙ্ঘিত মানবতার সুতোর ফাঁদে। সময়ের আবর্তে বিস্মৃত হয় তাজরিন, রানা প্লাজার দুঃসহ ক্ষতের বীভত্স যন্ত্রণার মুহূর্তগুলো। কিন্তু... যেন একটু অন্যভাবেই দেখলেন... অন্যভাবেই ভাবলেন একজন। তিনি শিল্পী দিলারা বেগম জলি। সম্প্রতি গুলশানের বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে উদ্বোধন হলো শিল্পীর একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘বয়ন-বয়ান’। প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয় ভাষিণী, সমাজ বিজ্ঞানী সাইদিয়া গুলরুখ। উপস্থিত ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা, বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জের পরিচালক নওশীন খয়ের ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহা-পরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। উদ্বোধনী বক্তব্যে ফেরদৌসী প্রিয় ভাষিণী বলেন, ‘শিল্পীরা সবসময়ই সমাজ ও মানুষ নিয়ে ভাবেন। তবে এই প্রদর্শনীটিতে শিল্পী দিলারা বেগম জলি পথ দেখালেন কিভাবে মানুষ হতে হয়। শিল্পের জানালা উন্মুক্ত করে তিনি যেন উড়ালেন শান্তির কপোত। মানবতাবাদী প্রকাশের এক দুঃসাহসিক বিন্যাস দেখিয়েছেন দিলারা বেগম জলি, তাই তাকে মানবতার শান্তিদূত বা পিস-মেকার বলা যায় অবলীলায়। সমাজ বিজ্ঞানী সাইদিয়া গুলরুখ বলেন, ‘রানা-প্লাজা বা তাজরিন গার্মেন্টসের শ্রমিক মেয়েদের হয়ে কথা বলেছেন, শিল্পী দিলারা বেগম জলি... বিস্মৃত স্মৃতির পাতা আবার উল্টে দেখার সুযোগ তৈরি করলেন তিনি’। শিল্পী দিলারা বেগম জলি বললেন, ‘সময়ের কালক্ষেপণে হারিয়ে যায় অনেক কিছুই। কিন্তু... কেউ একজন ওদের কথা ভেবেছে, ওদের স্মৃতির দুঃসহতাকে নিয়ে কাজ করেছে... ওদের জবানি হয়েছে... ঠিক এতটুকুই আমার মানুষ হিসাবে প্রাপ্তি। মানুষ যেন মানুষ হবার চর্চাটা আগে করে তারপরে শিল্পচর্চা।’
এবারের প্রদর্শনীতে শিল্পী দিলারা বেগম জলি কাজ করেছেন গার্মেন্টস কর্মীদের দুঃসহ জীবনের পরিণতি নিয়ে। মানবতার এতোবড় বিপর্যয়কে শিল্পী উপেক্ষা করতে পারেননি। তাই যেমনভাবে সুঁই ফুটিয়ে ফুটিয়ে ড্রইং করেছেন, অন্যদিকে ভিডিও প্রেজেন্টেশনে পারফর্মিং আর্টে নিজেই পারফর্ম করেছেন ‘উই’ ও ‘তাজরিন নামা’য়। দেখিয়েছেন দগ্ধতার দহন, কাপড়ের ফাঁদে সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় নিজেই গ্রাস হবার দৃশ্য। আবার গার্মেন্টসের টুকরো টুকরো কাপড়ে নির্মাণ করেছেন ঝুলন্ত পুতুল... যেন জীবন নিয়ে খেলার তুমুল তামাসার শিকার নারী শ্রমিকেরা। সুঁইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে যারা গাঁথে শিল্পের সফল ইমারত... সেই সুতোতেই গ্রাস হয় তারা। একটি টেবিলে ছিদ্র হয়েছে ওদের খাবার থালা, পানির বোতল, জীর্ণ ব্যাগ, স্যান্ডেল, সুমাইয়ার বিছানা পড়ে আছে... শাড়ি... ব্লাউজে ভেসে উঠেছে নিখোঁজ নামার করুণ আর্তি, পোস্টার থেকে হারানো মুখচ্ছবি... মানব প্রতঙ্গের ভগ্ন অস্থি, পলিথিনে মোড়া শবের মিছিল, দেয়ালে ঝুলন্ত কালো ব্যাগে... হারানো মুখচ্ছবি ঝাপসা মুখ... নারী বার বার মুখোমুখি হচ্ছে বিপন্ন মানবতার দুঃসহ অভিজ্ঞতার। দৃশ্যত বিষাদ, বেদনার বিষণ্ন প্রকাশ হলেও শিল্পী দিলারা বেগম জলি... দর্শক... সমাজ... শিল্প ভুবনকে আহ্বান জানালেন শান্তির পথে... মানবতার পথে বন্ধ তালার দুয়ারটি খুলতে, চোখের ওপর ছানিপড়া স্বার্থপর সুখের পর্দাটি সরিয়ে... মানবিক পৃথিবীর নিঃসঙ্গ একটি জীবন যেন নারীরা পায়... বেঁচে থাকার মৌলিক শর্তগুলো নিয়ে যেন সমাজ, কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেন! শিল্পের বিবেকে সমাজের এক পরম মর্মবাণীর বার্তা বহন করল প্রদর্শনীটি।
