খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা; নানা ভূমিকাতেই সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটকে দেখেছেন এবং দেখছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে অনেকবারই বলেছেন, বাংলাদেশেরে ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো ঠিক এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত খেলা নিশ্চিত না করা হলে অনতিবিলম্বে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পড়বে। বিভিন্ন সময় দেশের মাটিতে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাফল্যের ফলে আমিনুলের এবং আরও অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষকের বলা এই চিরায়ত সত্যিকেও মিথ্যে বলে মনে হয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সাল যেন সেই সত্যিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
এ বছরে টানা ১২ ম্যাচ জয়শূন্য পর্ব কাটানোর পর, বিশেষ করে আবারও শত রানের নিচে অলআউট হয়ে বছরের ১১তম পরাজয় পাওয়ার পর আর নিজেকে সামলাতে পারেননি বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। শনিবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশের ক্রিকেটের চলতি বছরে প্রাপ্তি, উন্নয়ন ও অবকাঠামোর দৈন্য কয়েকটি পয়েন্ট করে তুলে ধরেছেন বুলবুল। সবশেষে ছোট্ট একটি উপসংহার দিয়ে বলেছেন, এই অবস্থা আসলে অপরিহার্য ছিল। বিশেষ করে বোর্ডে যোগ্য ও ঘরোয়া ক্রিকেট ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছুক কর্মকর্তারা না আসা পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকবে।
বাংলাদেশ জাতীয় দলই যে শুধু এ বছর টানা পরাজয়ের মধ্যে আছে তা নয়। বিভিন্ন পর্যায়ে দারুণভাবে ব্যর্থ বাংলাদেশের ‘এ’ দল, অনূর্ধ্ব-১৯ দল ও অ্যাকাডেমি দল। সেই কথাই ‘২০১৪ সালের পারফরম্যান্স’ শীর্ষক প্রথম ক্যাটাগরিতে বলেছেন বুলবুল। এরপর দেশের ক্রিকেট উন্নয়নের সমস্যা নিয়ে ৮টি পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান।
‘উন্নয়ন’ শীর্ষক এই ক্যাটাগরিতে বুলবুল লিখেছেন, ‘১. কোনো অঞ্চলের নিজস্ব দল নেই, ২. দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো জেলায় লিগ হচ্ছে না, ৩. আঞ্চলিক পর্যায়ে খেলোয়াড়ী ও কোচিংয়ের কোনো পথ-নির্দেশনা নেই, ৪. ঘরোয়া ক্রিকেট অনিয়মিত, ৫. স্কুল ক্রিকেটে মনোযোগ নেই, ৬. অ্যাকাডেমি (???), ৭. বাংলাদেশি কোচদের ভবিষ্যত্ নেই, ৮. বাংলাদেশি সাপোর্ট স্ট্যাফদের ভবিষ্যত্ নেই।’
বাকী কোনো পয়েন্ট নিয়ে তো আলোচনারই সুযোগ নেই। বিশেষ করে আঞ্চলিক দলগুলোর অস্তিত্বহীনতা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ক্রিকেট না থাকা, ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে বোর্ডের ছেলেখেলা তো বেশ অনেককাল ধরেই সমালোচনার ব্যাপার। আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অ্যাকাডেমি শব্দটা লিখে তিনটি প্রশ্ন চিহ্ন দিয়েই আসলে বুলবুল ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছেন—অ্যাকাডেমি কী করছে, কী ফল আসছে; সেটাই কারো জানা নেই।
এরপর দেশের ক্রিকেট অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় দুটি সমস্যাকে সামনে এনেছেন বুলবুল। লিখেছেন, ‘আন্তর্জাতিক ভেন্যু কিছু আছে বটে, নেই খেলার মাঠ’ এবং ‘অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুবিধাই নেই’।
ঢাকার ক্রিকেটের বড় ক্লাবগুলোরই বেশীরভাগ দলের নিজস্ব অনুশীলনের মাঠ নেই। এরপর ছোটখাটো দলের তো আশাই করা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়ে আসছে দেশের তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত খেলার মাঠ।
আর এই সব সমস্যারই পরিণতি দেখছেন বুলবুল এই ক্যারিবীয় সফরে ঘটা সর্বনাশের চূড়ান্তরূপে। বুলবুল উপসংহারে কোনো রাখঢাক না করে বলেছেন, বোর্ডে যোগ্য লোকেদের উপস্থিতিই কেবল পারে এই অবস্থা বদলাতে। সভাপতি বদলের দাবি করেন অনেকে। বুলবুল বলেছেন, সভাপতি তো কম বদল হচ্ছেন না, সমস্যা আসলে গত প্রায় ১৫ বছর ধরে বোর্ডে থাকা কিছু কর্মকর্তা, ‘এই কথাগুলো আমি অনেকদিন ধরে বলছি। অনেকে দেখি বোর্ড সভাপতিদের সমালোচনা করেন। সভাপতি তো বদল হয়, কিন্তু বিসিবিতে কিছু কর্মকর্তা আছেন, যারা গত ১৫ বছর ধরেই আছেন। আমরা মনে করি, আজকের এই ব্যর্থতা আসলে আসদের সিস্টেমের ব্যর্থতা এবং দুর্নীতিগ্রস্তদের ব্যর্থতা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি রত্ম। বোর্ডে যোগ্য লোকদের ফিরিয়ে এনে সেই ক্রিকেটকে দয়া করে রক্ষা করুন।’
