লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে গতকাল রবিবার ভোরে হাজীরহাট বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে তিস্তার পানিতে তলিয়ে গেছে ১০ গ্রাম। জেলার সানিয়াজান এলাকা ও সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, নেত্রকোনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, সুনামগঞ্জ, গাইবান্ধা, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলায় পানিবন্দী হয়ে কয়েক লাখ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এসব স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হলেও অধিকাংশ বানভাসি মানুষই ত্রাণ সহায়তার বাইরে রয়ে গেছেন।
এদিকে বন্যার কারণে গত ছয়দিন ধরে গাইবান্ধার বালাসি থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত নৌরুটে রেলওয়ে ওয়াগন পারাপার বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উত্তরাঞ্চলের আট জেলায় পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি ও কালীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানীতে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে গতকাল সকালে তিস্তার পানি সামান্য বেড়ে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যাকবলিত সানিয়াজান এলাকায় পানিতে ডুবে মিলন নামের ৩ বছরের এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
তিস্তার পানির চাপে কালীগঞ্জের হাজীরহাটে বৈরাতী এন জামান স্কুল সংলগ্ন অংশে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। এতে উপজেলার বৈরাতী, দক্ষিণ ঘনশ্যাম, চর কাঞ্চনশ্বর, মটেরপাড়, আমিনগঞ্জ, কাঞ্চনশ্বর, তুষভান্ডার, কাকিনা, রুদ্রেশ্বর ও মহিষামুড়ি গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বিকাল ৪টা পর্যন্ত ওইসব পানিবন্দী মানুষের কাছে সরকারি কোন সাহায্য পৌঁছায়নি। রান্নার অভাবে বন্যার্ত লোকজন শুকনো খাবার খেয়ে জীবন যাপন করছেন। বিশুদ্ধ পানির চরম সঙ্কট রয়েছে দুর্গত এলাকায়।
এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুজ্জামান আহমেদ জানান, বাঁধ সংস্কারের ব্যবস্থা নেয়া হবে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নাদিম সারোয়ার জানিয়েছেন, ১০০ মেট্রিক টন চাল আর ১০ লাখ টাকা চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জরুরি চিঠি দেয়া হলেও এখনো কোন ত্রাণ সামগ্রী জেলায় এসে পৌঁছায়নি।
চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যমুনা নদীর পানি সামান্য কমলেও জেলার চৌহালী-এনায়েতপুর থানার বন্যাদুর্গত এলাকায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। গতকালও নদীর পানি বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। চৌহালী উপজেলার ঘোরজান, খাসকাউলিয়া, খাসপুকুরিয়া, উমরপুর ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের হাজারো ঘরবাড়ি তলিয়ে আছে পানিতে। গতকাল ঘোরজান ইউনিয়নের মুরাদপুর চরে কৃষক আব্দুস ছালাম ফকিরের আড়াই বছরের শিশুপুত্র নাহিদ বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে বলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান মন্টু জানিয়েছেন। দুপুরে সে সকলের অগোচরে বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে পড়ে যায়। বিকালে তার লাশ ভেসে উঠলে স্বজনেরা উদ্ধার করেন।
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার চর বজরা বাঁধের ভেঙ্গে যাওয়া অংশ দিয়ে তিস্তার পানি ঢুকে পড়ায় বজরা-কাশিম বাজার সড়কের হাঁস খাওয়া ব্রীজসহ ৪শ’ মিটার পাকা সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে। গত ৪ দিন ধরে ঐ সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পানির চাপে ব্রীজের উত্তর অংশের দুইপাশে ৫০ ফুট সড়কে ফাটল দেখা দিলে সড়ক ও জনপথ বিভাগ পাইলিং দিয়ে সড়কটি রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সে াতের তীব্রতায় মাটি ধসে যাওয়ায় ব্রীজটি যেকোন মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়ার আশংকা রয়েছে। গতকাল এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত ব্রীজ এলাকা পরিদর্শন এবং স্থানীয় বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছেন।
দোহার নবাবগঞ্জ (ঢাকা) ও চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ঢাকার দোহার ও ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার চরাঞ্চলের ৪০টি গ্রামের প্রায় ৩ সহস াধিক পরিবার গত ৫ দিন ধরে পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কিন্তু তারা গতকাল পর্যন্ত কোন সরকারি সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পানির সাথে লড়াই করেই চলছে তাদের জীবন। গতকাল চরভদ্রাসনের চর ঝাউকান্দার মোল্লাডাঙ্গীতে সংবাদ সংগ্রহের জন্য গেলে সংবাদকর্মীদের দেখে অসহায় মানুষগুলো স্পিডবোটের দিকে এগিয়ে আসেন ত্রাণ পাবার আশায়। এ ব্যাপারে চরভদ্রাসন উপজেলার দায়িত্বে থাকা সদরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যানদের তালিকা প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। আজ সোমবার বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেয়া হবে।
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন দেবগ্রাম, দৌলতদিয়া ও উজানচরের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কয়েকশ’ পরিবার। এছাড়া ছোটভাকলা ইউনিয়নের চর বরাট এলাকায় আশ্রয় নেয়া নদীভাঙ্গা প্রায় ৩০০ পরিবারের বাড়িঘরে পানি উঠায় তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার ভাগ্যকুল পয়েন্টে পদ্মা গতকাল সকাল ৯টায় বিপদসীমার আট সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছিল। নদীতে পানি বাড়ায় জেলার শ্রীনগর, লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার পদ্মা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলের আরও কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফসলী জমি তলিয়ে গেছে। তিন উপজেলার বহু মানুষ পড়েছেন বহুমুখী দুর্ভোগে। উজানের পানি নেমে আসার কারণে এই অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে মনে করছেন পানি বিশেষজ্ঞরা।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ও ছাতক সংবাদদাতা জানান, টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বেড়েছে সুনামগঞ্জের নদী ও হাওরের পানি। সুরমা নদীর পানি গতকাল বিকাল ৪টায় সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৯ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নতুন করে জেলা সদরের পৌর এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া ছাতক, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার ও ধর্মপাশা উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ছাতকে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল হাশেম জানান, জেলায় প্রায় ৫শ একর রোপা আমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বিকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষ সভা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক শেখ মো. রফিকুল ইসলাম।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, তিস্তা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৬ সে.মি এবং করতোয়া নদীর পানি ২ সে.মি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ঘাঘট নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ১০ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা কবলিত এলাকার অধিকাংশ হস্তচালিত নলকূপ পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের ফলে জেলার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার বন্যা কবলিত এলাকার ২৫ হাজার পরিবারের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। পানি উঠায় জেলার ৪১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, করতোয়া নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে এখন বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার প্রায় ২৫০ হেক্টর জমির আউশ, আমন ধান ও বীজতলা ডুবে যাওয়ায় চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন এখানকার কৃষকেরা। ইতিমধ্যে উপজেলার লাহিড়ি মোহনপুর, উধুনিয়া, বাঙ্গালা, সলপ, সলঙ্গা, পঞ্চক্রোশী ও দুর্গানগর ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রাম বন্যা কবলিত হয়েছে। এসব এলাকায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, গারো পাহাড়ে প্রবল বর্ষণজনিত কারণে জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। শত শত ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। ৫ হাজার হেক্টর জমির আমন তলিয়ে গেছে। সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে সোমেশ্বরীর প্রবল সে াতে শিবগঞ্জের ব্যাপক এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের নুরালীপুর গ্রামের ৪২টি বাড়ি ধনু নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে খালিয়াজুরী এবং মোহনগঞ্জসহ কয়েকটি হাওরে ট্রলার ও নৌকা চলাচল বন্ধ রয়েছে।
মাদারগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে বালিজুড়ি, জোড়খালী, চর পাকেরদহ ইউনিয়নের চরাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ঐ সব ইউনিয়নের সাথে থানা সদরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। মাদারগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ধান ও সবজি তলিয়ে গেছে। বানভাসি মানুষ পানীয় জল ও খাদ্য সংকটে রয়েছেন।
গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, টানা বর্ষণে উপজেলার ১১ ইউনিয়নের সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে প্রায় এক হাজার হেক্টর সদ্য রোপা আমন ফসল। পুকুর পানিতে তলিয়ে ভেসে গেছে প্রায় অর্ধকোটি টাকার মাছ। এছাড়া অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ড্রেন না থাকার কারণে পৌর শহরের শতাধিক পরিবার জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এসব পরিবারের রান্নাবান্নাও বন্ধ হয়ে গেছে।
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, ভারি বর্ষণে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার সবচেয়ে বড় বিল বড়িল বিলের প্রায় এক হাজার একর জমির সদ্য লাগানো আমন ক্ষেত সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অতিরিক্ত চারা না থাকায় পানি সরে যাবার পর নতুন করে আবাদের আশাও হারিয়ে ফেলেছেন চাষীরা। বড়িল বিল এলাকার মানকোন ইউনিয়নের জোতকৃষ্ণচরণবাড়ি গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন জানান, এ বছর তিনি ৫ একর জমিতে আমন আবাদ করেছিলেন, যার পুরোটাই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তার মতো ক্ষতিগ্রস্ত অনেক চাষীই এ ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সুনামগঞ্জ কারাগারে বন্যার পানি
সিলেট অফিস জানায়, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন জনপদ ও ফসলী জমি। অনেক স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। বহু বাড়িঘরে পানি উঠায় বাসিন্দারা বিপাকে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে বিভাগের ১৮ হাজার হেক্টর ফসলী ক্ষেত। তবে সুনামগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে দ্রুত। সুরমা নদীর কাছে জেলা কারাগারে পানি ঢুকে পড়ায় কারা কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। নদীর সাথে সংযোগ দেয়া একটি ড্রেন দিয়ে দ্রুত পানি ঢুকছে জেলের ভিতরে। পানি আরো বাড়লে আসামিদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে।
