নবজাতকের স্বাভাবিক ওজন আড়াই কেজি ধরা হলেও চট্টগ্রামে কম ওজন ও শারীরিক ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্মের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই ওজনের চেয়ে কম ওজনের শিশুর জন্মের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ। এই ধরনের কম ওজনের শিশুর প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু জন্মের কিছুদিনের মধ্যে মারা যায়।
জন্মের পর এসব শিশুর দ্রুত ও উন্নত চিকিত্সা সেবা দেয়া জরুরি। কিন্তু চট্টগ্রাম মেডিক্যাল ছাড়া জেলার কোথাও নিওটোনেলজি বিভাগ না থাকায় ত্রুটিপূর্ণ এসব শিশুর অধিকাংশই বিনা চিকিত্সায় মারা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যালের প্রসূতি ও গাইনি বিভাগের ধারণক্ষমতা ৩৫০ জন। কিন্তু প্রতিদিন ৫৫০ জনের বেশি প্রসূতি প্রসবকালে চিকিত্সাধীন থাকেন। বেড না পেয়ে হাসপাতালের ফ্লোরে ও বারান্দায় পর্যন্ত প্রসূতি মায়েদের রাখতে হচ্ছে। চিকিত্সকরা জানান, চট্টগ্রাম মেডিক্যালে চিকিত্সাধীন ৮০ শতাংশ নারী প্রসবকালীন জটিলতা নিয়ে ভর্তি হয়। জেলা ও শহরের অন্যান্য হাসপাতালে প্রসবকালীন ঝুঁকিতে থাকায় উন্নত চিকিত্সা পেতে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ভর্তি হচ্ছেন জটিল প্রসূতি নারীরা।
চট্টগ্রাম মেডিক্যালের গাইনি ওয়ার্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট বাচ্চা প্রসবের ঘটনা ঘটেছে ৪৬৩৬টি। এর মধ্যে প্রসবকালে মারা গেছে ১৯টি শিশু। আর কম ওজন ও শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করায় ২৩৯ নবজাতককে উন্নত চিকিত্সার জন্য হাসপাতালের নিওটোনেলজি ওয়ার্ডে রেফার করা হয়েছে।
চিকিত্সকরা জানান, ৪০ থেকে ৩৭ সপ্তাহের মধ্যে শিশুর জন্ম হলে স্বাভাবিক ধরা হয়। এর কম সময়ের মধ্যে জন্মগ্রহণে মা ও বাচ্চার মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। বর্তমানে ৩৭ সপ্তাহের কম সময়ে জন্মের হার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মের হার বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে চিকিত্সকরা বলেন, অভিজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া যত্রতত্র এমআর করানো, ডিএনসি বেড়ে যাওয়া, হাইপার টেনশন, ডায়াবেটিক ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা অসুস্থতার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মের হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কম ওজন নিয়ে শিশু জন্মগ্রহণ করছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যালে প্রতিদিন শতাধিক নারীর ডেলিভারি হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০টি সিজারিয়ান হয়। কিন্তু জনবল সংকটে প্রসবকালীন চিকিত্সা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে প্রসূতি ও গাইনি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. শাহেনা চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, জনবল স্বল্পতায় সার্বক্ষণিক ডেলিভারি কার্যক্রম চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। রোগী অনুপাতে ওষুধের বরাদ্দ অনেক কম। সিজারিয়ানের জন্য মাত্র ৩টি ওটি টেবিল রয়েছে। গাইনি ওয়ার্ডে লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো প্রয়োজন।
চিকিত্সকরা জানান, গর্ভকালীন মায়ের নানান অসুস্থতা, প্রসবকালীন জটিলতা, জন্মের পর অপ্রতুল চিকিত্সা ও সেবা পেতে বিলম্বের কারণে ত্রুটিপূর্ণ এসব শিশুর মধ্যে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে এই ধরনের শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্মের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন চিকিত্সকরা। মায়ের শারীরিক অসুস্থতা ও পুষ্টিহীনতায় শারীরিক ত্রুটিপূর্ণ বাচ্চা জন্মের হার বেড়েছে।
চিকিত্সকরা জানান, জন্মের ২৮ দিন বয়স পর্যন্ত শিশুকে নবজাতক ধরা হয়। কম ওজনের নবজাতকের ক্ষেত্রে জন্মের পরপর কান্নাকাটি না করা, দ্রুত শ্বাস না নেয়া, বুকের দুধ টানতে না পারা, জীবাণু দ্বারা সংক্রমণ, কম ওজনসহ বেশ কিছু সমস্যা দেখা দেয়।
জন্মকালীন ত্রুটিপূর্ণ ও কম ওজনের বাচ্চাদের উন্নত চিকিত্সার জন্য চলতি বছরের শুরুতে উন্নত প্রযুক্তি সেবা সংযুক্ত করে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নিওটোনেলজি বিভাগ চালু করা হয়েছে। ইউনিসেফ ও জাইকার অর্থায়নে এই ওয়ার্ডে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। ৩২ বেডের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ওয়ার্ডে বর্তমানে ১০৬ জন নবজাতক চিকিত্সাধীন রয়েছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ বাচ্চাদের ভ্যান্টিলেটরযুক্ত আইসিইউ বেডে রেখে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। চিকিত্সকরা জানান, চিকিত্সাধীন শিশুদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ নবজাতকের ওজন ২ কেজি থেকে দুই কেজি ৭০০ গ্রাম। বর্তমানে নিওটোনেলজি বিভাগে দেড় কেজির নিচে ১০টি নবজাতক চিকিত্সাধীন রয়েছে। এদের জরুরি চিকিত্সা ও পরিচর্যা করে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। কিন্তু নিওটোনেলজি ওয়ার্ডে আধুনিক চিকিত্সা সরঞ্জাম সংযুক্ত করা হলেও প্রয়োজনীয় চিকিত্সক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের চরম সংকট রয়েছে। ২৪ ঘন্টা এসব নবজাতককে চিকিত্সকের নজরে রাখতে হয়। ওয়ার্ডে মাত্র ২ জন নবজাতক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ এবং ২ জন সহকারী রেজিস্টার রয়েছে। এতে সার্বক্ষণিক জরুরি চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ওয়ার্ডের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জগদীশ চন্দ্র দাশ ইত্তেফাককে বলেন, দেড় কেজির নিচের নবজাতককে অতি অল্প ওজনের বলা হয়। সমপ্রতি কম ওজনের শিশু জন্মের হার বেড়ে গেছে।
