২০ দলে কলহ

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪২
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে দেখা দিয়েছে কলহ। কেউ জোট ছেড়েছেন, কাউকে জোট থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে, আবার কেউ গোপনে জোট ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি কয়েকটি শরিক দলের ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে বিভাজন। দলাদলির জের ধরে এসব দলে ঘটেছে একপক্ষ কর্তৃক আরেক পক্ষকে পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের ঘটনাও। তবে নিজেদের জোটে এই বিবাদের পেছনে সরকারের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্তঃকলহের কারণে ২০ দলের শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) এখন ভেঙ্গে দুই টুকরা। একাংশের নেতৃত্বে শেখ শওকত হোসেন নিলু, আরেকাংশের নেতৃত্বে ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। দুজনই এনপিপি’র চেয়ারম্যান দাবিদার। গত ১১ আগস্ট ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি নিলুকে, বৈঠকে এনপিপি চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ পান ফরহাদ। ওই বৈঠকেই জোট প্রধান, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জানিয়ে দেন, শেখ শওকত হোসেন নিলু এখন আর ২০ দলে নেই। গতকাল রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে নিলু অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক হতাশার কারণেই খালেদা জিয়া তাকে জোট থেকে বহিষ্কার করেছেন। বিএনপি ও এর জোটের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়ে শেখ নিলু বলেন, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনে ২০ দলের অংশ না নেয়া মস্তবড় ভুল ছিল। ২৯ ডিসেম্বর ‘রোড টু ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোথায়, কার আশ্রয়ে ছিলেন—এমন প্রশ্ন তুলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে নিলুর দলের বর্তমান মহাসচিব আব্দুল হাই মণ্ডল লিখিত বক্তব্যে বলেন, বিএনপির একশ্রেণীর অর্বাচীন তারেক রহমানের নাম ব্যবহার করে দলটির সিনিয়র নেতা ও জোট নেতাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। ফলে ২০ দলীয় জোট তাত্পর্যহীন হয়ে পড়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে অভিযোগ করেছেন ‘সরকার বিএনপি ও ২০ দল ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করছে। তবে সরকার যতোই ষড়যন্ত্র করুন কাউকে জোট থেকে বের করা যাবে না। কেউ যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে জনগণই তাদের বিচার করবে।’ অবশ্য পরদিন ফখরুলের এই অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। ২০ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে ৮টি দলের নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন নেই। এসব দলের কয়েকটি সাইনবোর্ড বা নামসর্বস্ব। ভাঙ্গন আর দলাদলিতে জড়িয়ে পড়া এসব দলকে জোটে সম্পৃক্ত করায় বিএনপির ভেতরে যেমন অস্বস্তি আছে, তেমনি অসন্তোষ রয়েছে জোটের উল্লেখযোগ্য শরিকদের মধ্যেও। অন্যদিকে, ২০ দলীয় জোটের দ্বিতীয় প্রধান দল জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ও জোটের ভেতরে দেখা দিয়েছে সন্দেহ, অবিশ্বাস। সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় রয়েছে জামায়াত, এরকম ধারণা জন্মেছে বিএনপি ও জোটের অন্য শরিকদের কারও কারও মধ্যে। তবে এই সন্দেহকে ‘অমূলক’ দাবি করে জামায়াতের কেন্দ্রীয় একজন প্রভাবশালী নেতা ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে উল্টো বিএনপির নেতৃত্বের যোগ্যতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দলটির এই নেতা ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন ‘বিএনপি একটি বড় শক্তি, জামায়াতও একটি বড় শক্তি। দুটি শক্তি এক হওয়ায় যে বৃহত্ শক্তি হয়েছে- সেটির একক নেতৃত্ব দেয়ার মত দক্ষতা ও সক্ষমতা বিএনপির আছে বলে আমাদের মনে হয়নি। আর এই কারণেই পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের আন্দোলনে সফলতা পাওয়া যায়নি।’ জি এ খানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ মুসলিম লীগ বিভক্ত হয় গত সেপ্টেম্বর মাসে। অভ্যন্তরীণ বিরোধে দল ভেঙে নিজেকে সভাপতি ঘোষণা দেন দলের নির্বাহী সভাপতি কামরুজ্জামান খান। পরে অপর অংশটি কামরুজ্জামানকে বহিষ্কার করে। পরে বিএনপির কারাবন্দী নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বড় বোন জোবায়দা কাদের চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করে নতুন কমিটি করা হয়। এখন একই নামে দুটি দলই ২০ দলীয় জোটের শরিক। জোবায়দা কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন অংশটি বিএনপির জোট ছেড়ে নতুন কোনো মেরুকরণে সম্পৃক্ত হতে পারে, ২০ দলেই এমন গুঞ্জন রয়েছে। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের দু’-তিন মাস পরেই বিএনপির জোট থেকে বেরিয়ে যায় শেখ আনোয়ারুল হকের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী-ন্যাপ)। এরপর গাইবান্ধার আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে মে মাসে ‘ভাসানী-ন্যাপ’ নামে নতুন দল দাঁড় করিয়ে সেটিকে ২০ দলে রাখা হয়। ২০ দলের আরেক শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। এর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নে মতানৈক্য দেখা দিলে দলটির মহাসচিব আব্দুল মালেককে দল থেকে বহিষ্কার করেন সৈয়দ ইবরাহিম। শোনা যাচ্ছে, আব্দুল মালেকও একই নামে নতুন দল গঠন করে নতুন কোনো মেরুকরণে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। জোটের এই পরিস্থিতি সম্পর্কে ২০ দলের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ (অব.) গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘শেখ শওকত হোসেন নিলু জোটের সঙ্গে বেঈমানী করেছেন। আরও কোনো কোনো শরিকদারের মধ্যেও হয়তো বা লোভ-লালসা কাজ করতে পারে। লোভ-লালসার কারণে আরও কেউ হয়তো এরকম বেঈমানী করতে পারেন।’ অলি আহমদ এমন কথা বললেও খোদ তার দলেরই মহাসচিব ও সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম জোটের সমালোচনা করেছেন। শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে অলি আহমদ ও ঢাকা মহানগর বিএনপির নবনিযুক্ত আহ্বায়ক মির্জা আব্বাসের সামনেই শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেছেন, ‘নামসর্বস্ব, নিবন্ধনহীন ও ভগ্নাংশ দল নিয়ে শুধু ২০ দলীয় জোটের পরিধি বাড়িয়ে কোনো সুফল আসবে না। সারাদেশে সাংগঠনিকভাবে কোনো অবস্থানই নেই-এমন হুন্ডা পার্টি, টেম্পু পার্টি জোটভুক্ত হলে আমাদের আপত্তি আছে। তাহলে এই জোটে থাকার প্রশ্নে আমরা নতুন করে চিন্তা করবো।’ সামনের আন্দোলনে সফলতা পেতে হলে আন্দোলনের পূর্ব-অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে, জোটের মধ্য থেকে এমন পাঁচ-সাতজন নেতাকে নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একটি ‘কোর কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। শাহাদাত হোসেন সেলিম অভিযোগ করে বলেন, ‘জোটে অভিজ্ঞ ও যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এলডিপি ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক হলেও আমাদের সঙ্গে হাত মেলাতে বিএনপির নেতারা কুণ্ঠাবোধ করেন, যেন ব্রাহ্মণের সাথে নমশুদ্র হাত মেলাচ্ছে! জোটের বিভিন্ন মিটিংয়ে জোট নেতাদের নাম নিতেও কুণ্ঠা বিএনপির। জোটের জনসভায় অনেক শীর্ষনেতা মঞ্চে উঠতে পারেন না, উঠলেও তাদেরকে বসতে দেয়া হয় না। ঢাকা মহানগর এলডিপির বর্ধিত সভায় শাহাদাত হোসেন সেলিমের দেয়া ওই বক্তব্যকে সমর্থন করে ওই অনুষ্ঠানেই দলের মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ বলেছেন, শুধু সংখ্যার দিক দিয়ে জোটের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। যাদের দেশব্যাপী সংগঠন আছে, তাদের নিয়ে কাজ করতে হবে। তার মতে, বড় বড় নেতারা বাড়িতে ঘুমিয়ে থেকে কর্মীদের রাস্তায় নামার নির্দেশ দিলে রাজধানীতে আন্দোলন কখনোই সফল হবে না। বিএনপিসহ ২০ দলের কয়েকটি শরিক দলের বেশ ক’জন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করার পর উদ্ভুত সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জোটটির বেশিরভাগ শরিকের মধ্যে হতাশা ভর করেছে। জোটের আগে এসব দল এখন নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছে। নিজেদের ভবিষ্যেক প্রাধান্য দিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এসব শরিকদের কেউ কেউ।