বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য উন্নয়নে অশুল্ক বাধা দূর করার তাগিদ

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৬
ভারতের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নে অশুল্ক বাধা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন উভয় দেশের উদ্যোক্তারা। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের মধ্যে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট জরুরি বলে উল্লেখ করেন তারা। এছাড়া বাণিজ্য উন্নয়নে সীমান্তে পণ্য স্থানান্তরের পদ্ধতি সহজীকরণের উপরও জোর দেন বক্তারা। গতকাল রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) ও ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (আইবিসিসিআই) আয়োজিত ব্যবসা উন্নয়ন সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে আইবিসিসিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমেদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান। বক্তব্য রাখেন ভারতের কেন্দ ীয় সরকারের উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন এবং ভারতের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জেনারেল (অব.) ড. ভিকে সিং, মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী ড. মুকুল সাংমা, ত্রিপুরার শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী তপন চক্রবর্তী, বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার পংকজ শরন এবং ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদসহ অনেকে। ড. মশিউর রহমান প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ভারতের সাথে বাণিজ্য সহজ হলে উভয় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। উভয় দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়লে আমাদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে ও অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে। ড. মশিউর বলেন, ভারতের সাথে বাণিজ্য বাড়াতে পণ্যের মান পরীক্ষার জন্য বিএসটিআইয়ের সনদপত্রের বিষয়ে একটি সমাধানে আসা প্রয়োজন। এছাড়া অশুল্ক অন্য বাধাগুলো দূর করতে দুই দেশকেই সচেষ্ট হতে হবে। পণ্যের সহজ পরিবহনের জন্য ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। ড. ভিকে সিং বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন অনেক দিক থেকেই বাংলাদেশের উপর নির্ভরশীল। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য বাড়াতে আমাদের সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা রয়েছে। তবে বাণিজ্যের জন্য উদ্যোক্তাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। উদ্যোক্তারা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা অনুভব করে আমরা তা নিরসনের চেষ্টা করবো। তিনি বলেন, মেঘালয় থেকে বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের বিদ্যুত্ আমদানি করে বিদ্যুতের সঙ্কট কাটাতে পারে। মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যে শিক্ষা ও চিকিত্সা খাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে বস্ত্র খাতে ভারত ও বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে গেলে দুই দেশের জন্যই ইতিবাচক হবে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে স্থলপথ, জলপথসহ সব ধরনের যোগাযোগ সহজ করার প্রয়োজন বলে তিনিও উল্লেখ করেন। ভিকে সিং বলেন, দুই দেশের যোগাযোগ সহজ করতে সরকারি পর্যায়ে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। পংকজ শরন বলেন, ভারত বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে সে পণ্য রপ্তানি করতে আগ্রহী। তবে কোন কোন খাতে এ ধরনের বিনিয়োগ করা যায় তা উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করতে হবে। এ ধরনের বিনিয়োগ হলে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের কর্মসংস্থান তৈরি ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী ড. মুকুল সাংমা বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের উন্নয়নে সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে। মেঘালয়ে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। প্রচুর কয়লাও রয়েছে। শিল্পের প্রয়োজনে বাংলাদেশ এখান থেকে কয়লা আমদানি করতে পারে। তিনি বলেন, মেঘালয়ে অনেক বাঁশ, বেত ও কাঠ উত্পাদন হয়। বস্ত্র, কাগজ ও অন্যান্য শিল্পের জন্য বাংলাদেশ তাদের চাহিদার বাঁশ এ অঞ্চল থেকে আমদানি করতে পারে। তাছাড়া মেঘালয়ের কৃষিপণ্যের উপর ভিত্তি করে যৌথভিত্তিতে কৃষিভিত্তিক শিল্পও গড়ে তোলা যায়। তবে এ জন্য আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন। পণ্য ট্রানশিপমেন্ট করা সম্ভব হলে উভয় দেশই লাভবান হবে। এছাড়া মেঘালয় রাজ্যে বিনিয়োগ করে বিদ্যুত্ উত্পাদন করে বাংলাদেশ বিদ্যুত্ সঙ্কট কাটাতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ‘যোগাযোগ চ্যালেঞ্জ’ ও ‘অবকাঠামোগত বাধা, ‘বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক পৃথক সেশনে বক্তব্য রাখেন আব্দুল মতলুব আহমেদ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ নজরুল ইসলাম, ভারতের অভ্যন্তরীণ নৌপথ কর্তৃপক্ষের পরিচালক এসকেভি রেড্ডি, বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট সালমান জায়েদি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, প্রাণ আরএফএল-এর পরিচালক তানভীর ইসলাম, মেঘালয়ের প্রধান সচিব পি ডব্লিউ ইংটি, ত্রিপুরার শিল্প ও বাণিজ্য সচিব এম নাগারাজু এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। এসকেভি রেড্ডি বলেন, স্থলপথের তুলনায় নৌপথে যোগাযোগের সুবিধা অনেক বেশি। কম খরচে ও কম সময়ে পণ্য পরিবহনের জন্য নৌপথ ব্যবহার করা যেতে পারে। স্থলপথ ও রেলপথের তুলনায় এ পথে যোগাযোগ করা সহজ। এ জন্য তেমন কোনো সংস্কারমূলক কাজও করতে হবে না। তবে এ জন্য দুই দেশের সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। নৌপথেও যদি কন্টেইনার স্থানান্তরের সুযোগ দেয়া হয় তবেই এ সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। পি ডব্লিউ ইংটি বলেন, বর্তমানে মেঘালয়ের ২৫টি পণ্য আমদানি ও রপ্তানির অনুমোদন রয়েছে, তা বাড়ানো প্রয়োজন। সীমান্তবর্তী এলাকায় টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। বাংলাদেশে রপ্তানিকৃত পণ্যের পেমেন্ট দ্রুত করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তিনি। এম নাগারাজু বলেন, ইউরোপের মতো বাংলাদেশের সাথে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা তুলে দিতে পারলে উভয় দেশই লাভবান হবে। দক্ষিণ আমেরিকাতেও পণ্য পরিবহনে সব বাধা তুলে দেয়া হয়েছে। এখানেও ভারতকে আতঙ্কের কারণ না ভেবে ‘বড়বাজার’ হিসেবে দেখলে বাণিজ্যের পথ প্রসারিত হবে। ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেশি হলেও তা আমাদের রপ্তানি খাতের প্রয়োজনেই হয়েছে। ভারত থেকে যেসব পণ্য আমদানি হয় তার বড় অংশ কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি। তিনি বলেন, ভারতে আমরা যে রপ্তানি করি তার বড় অংশ যায় উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে। যেখানকার মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা ভারতের অন্য অঞ্চলের তুলনায় কম। তাদের আয় বাড়লে আমাদের রপ্তানিও বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে ‘কানেক্টিভিটি’ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিএসটিআইয়ের মান সনদ নিয়ে জটিলতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্তরে স্তরে যেসব অশুল্ক বাধা রয়েছে তা দূর করতে হবে। তাছাড়া ভারত যেসব পণ্য আমদানি করে তার মধ্যে বেশ কয়েকটি রয়েছে যা বাংলাদেশ রপ্তানি করে। কিন্তু ভারত তা অন্য দেশ থেকে আমদানি করে। এ পণ্যগুলো যেন বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করতে পারে সে ব্যাপারে দুই দেশকেই উদ্যোগী হতে হবে। তানভীর ইসলাম বলেন, স্থলবন্দরের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে সীমান্তে অনেক সময় লাগে। এজন্য শুল্ক বিভাগের লোকবল বাড়ানো দরকার। সূর্যাস্তের পরই সেখানে সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রপ্তানি ও আমদানিকারকদের সমস্যায় পড়তে হয়। স্থল বন্দর বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বন্দর বাড়ানো হলে দুয়েকটি বন্দরের উপর চাপ কমবে। বৃষ্টির সময় বন্দরে পরিবহনের সুবিধার্থে শেডের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তিনি। সমাপনী সেশনে বক্তব্য রাখেন আইসিসি’র সভাপতি রুপেন রায়, আইবিসিসিআইয়ের সভাপতি মোহাম্মদ আলী এবং মাতলুব আহমেদ। রুপেন রায় বলেন, আমাদের এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য হলো- বাণিজ্য সহজীকরণে করণীয় এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করা। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যুত্ সংকট নিরসন মেঘালয়ের ভূমিকা, ভারতের সাথে বাংলাদেশের যৌথ বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য বাধা অপসারণে করণীয় সম্পর্কে ধারণা নেয়া। এ বিষয়গুলো চেম্বারের পক্ষ থেকে আমরা উভয় দেশের সরকারের কাছে দিব। মাতলুব আহমেদ বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভি কে সিংয়ের কাছে মেঘালয় ও ত্রিপুরা ছাড়াও ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারে আমাদের রপ্তানি সহজ করতে ভারত সরকারকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে ভারত সরকারও ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছেন ভি কে সিং। দুই দেশের সরকারই যেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে এ জন্য আমরা দুই সরকারের কাছে সুপারিশ করবো। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভি কে সিংয়ের সাক্ষাত্ এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সাথে ভারতের সফররত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি কে সিং সাক্ষাত্ করেছেন। সাক্ষাতে মাহমুদ আলী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে একটি উচ্চতর মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি দু’দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের যোগাযোগ আরও প্রসার এবং বিদ্যুত্ খাতে সহযোগিতার উপর গুরুত্বারোপ করেন। ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি কে সিং সমগ্র ভারত এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসায় বাণিজ্যের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে বলে জানান এবং তার সরকারের পক্ষ হতে এ বিষয়ে সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস প্রদান করেন। ভি কে সিং আরও জানান যে, বাংলাদেশে আসার পূর্বে তিনি আসামের গৌহাটিতে উত্তর-পূর্ব ভারতের মুখ্যমন্ত্রীদের সাথে এক সভায় মিলিত হন। যেখানে আন্তঃযোগাযোগ ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপারে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। এসময় বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার পংকজ শরন এবং বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক তারিক মোঃ আরিফুল ইসলাম।