তিন টেন্ডারেই বাবর নেন দুই কোটি টাকা

চাঁদাবাজির মামলায় আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রুবেল

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২২, ২০:৪২

অবৈধভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা অর্জনের পেছনে আইনবহির্ভূত পথ বেছে নিয়েছিলেন ফরিদপুর সদরের আলোচিত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহতাশেম হোসেন বাবর। তার আশ্রয়-প্রশয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান ফরিদুপুরের আলোচিত দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। 

হুন্ডির মাধ্যমে তারা আড়াই হাজার কোটি টাকা পাচারও করেন বিদেশে। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের এই বেআইনি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শুরু। যেখানে সাজ্জাদ ও রুবেল হাজার হাজার কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে নিতে কমিশন দিয়েছেন বাবরকে। এমনকি নিজেরাও নিয়েছেন কমিশন। 

অর্ধকোটি টাকার চাঁদাবাজির মামলায় দুই বছর আগে ফরিদপুর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রুবেল বলেছেন, তিনটি টেন্ডারের কাজ পেতে বাবর চাচাকে তিন দফায় প্রায় দুই কোটি টাকা দিয়েছি। আর শতকোটি টাকার কাজ বরকতকে পাইয়ে দিয়ে ৬ ভাগ হারে কমিশন নিয়ে রুবেল একাই নিয়েছেন ৬ কোটি টাকা। হাইকোর্টে দাখিল করা এই জবানবন্দিতে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। 

৫০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে বরকত ও রুবেলের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ১২ জুন মামলা করা হয়। মামলাটি করেন ফরিদপুরের ব্যবসায়ী ও কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম চৌধুরী। এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রুবেল ও বরকত। জামিন সংক্রান্ত মামলায় সেই জবানবন্দি সম্প্রতি হাইকোর্টে দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।

জবানবন্দিতে রুবেল বলেছেন, আমি ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি। আমি ও আমার ভাই বরকত ২০১২ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হই। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে এলজিইডি, গণপূর্ত ও বিভিন্ন সরকারি অফিসের টেন্ডার বাণিজ্য শুরু করি। পিডব্লিউডি এর মসজিদের কাজের ব্যাপারে চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সিদ্দিককে এক কোটি টাকা দিয়েছি। জেলা পরিষদের অডিটোরিয়ামের ব্যাপারে বাবর চাচাকে মোহতাশেম হোসেন বাবর এক কোটি টাকা দিয়েছি। উপজেলা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ব্লিডিং এর ব্যাপারে বাবর চাচাকে ৪০ লাখ টাকা দিয়েছি। পাট গবেষণা মার্কেটের ব্যাপারে কাজ নেওয়া বাবদ বাবর চাচাকে ৪০ লাখ টাকা দিয়েছি। আমি বরকতকে এলজিইডির একশত কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়ে ৬ ভাগ হারে ছয় কোটি টাকা আমি নিজে নিয়েছি। 

জবানবন্দিতে রুবেল আরও বলেন, ২০১৯ সালের প্রথম দিকে দলের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে কোন্দল হয়। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম চৌধুরীর গ্রুপের প্রভাব কমে যায়। তখন আমার ভাই বরকত আমাকে বলে, শামসুল আলম চৌধুরীর কোন প্রভাব দলে নাই কিন্তু উনার অনেক টাকা আছে। তাকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে বড় অংকের টাকা নেওয়া যাবে। তারপর আমি, বরকত এবং শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি লেভি ভাই মিলে প্লান করি যে, তার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হবে। ফুয়াদ ভাইয়ের নেতৃত্বে থাকা হেলমেট বাহিনীর ডিআইবি বটতলার যুবলীগের ডেভিড, মিনার, নাসিম, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ফাইন আমার ভাই বরকতের নেতৃত্বে থাকা হাতুড়ি বাহিনীর ছাত্রলীগের সাইফুল, মোল্লাবাড়ি সড়কের খালেকের ছেলে তছলিম, ছাত্রলীগের সুপ্ত রাজীব মন্ডলদেরকে দিয়ে শামসুল আলম চৌধুরীকে দিয়ে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি দেখানো হয়। সে আমাদের চাঁদা না দেওয়ায় আমি, ফুয়াদ ভাই, বরকত উনার ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নেই। ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে আমরা সকলে মিলে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করি। রাজীব, মিনার, সাইফুল, নাসিম, ডেভিড, তছলিমসহ অন্যান্যরা তাকে লোহার রড, হাতুড়ি ও কাঠ দিয়ে মারধর করে। আমি ও বরকত পিস্তল দিয়ে ভয় দেখাই। শামসুল আলমকে বাঁচানোর জন্য তার ছেলে এবং ম্যানেজার এগিয়ে আসলে তাদেরও মারধর করা হয়। তারা যখন আহত অবস্থায় ছিলো তখন ওই দোকান থেকে নগদ ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা জোরপূর্বক সাইফুল নিয়ে আসে। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে আমরা চলে আসি। 

জবানবন্দিতে বরকত বলেছেন, ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি আমি। শহরের রাজনীতিতে আমার প্রভাব থাকার কারণে পরিবহন সেক্টর, এলজিইডিসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠঅন আমরা নিয়ন্ত্রণ করি। দলীয় গ্রুপিং এর কারণে দলের উপর শামসুল আলম চৌধুরীর প্রভাব কমে যায়। তবে প্রভাব কমলেও সে একজন বড় ব্যবসায়ী। তার প্রভাব কমে যাওয়ার কারণে আমি, ফুয়াদ ভাই, রুবেল ও লেভী ভাই মিলে আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে তার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হবে। পরে পরিকল্পনা মাফিক সবাই মিলে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। 

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বসুন্ধরা এলাকা থেকে পরোয়ানাভুক্ত আসামি বাবরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বাবর আড়াই হাজার কোটি টাকা পাচারের মামলার অন্যতম আসামি। 

ইত্তেফাক/এএএম