দেশের উত্তর অঞ্চলের মানুষের বিশেষ করে কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সরকার রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) প্রতিষ্ঠা করে। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি জড়িয়ে পড়ে নানা অনিয়মে। বের হতে পারছে না দুষ্ট চক্র থেকে। খেলাপি ঋণে জর্জরিত হয়ে সরকারের কাছ থেকে বারবার মূলধন ঘাটতি পূরণ করেছে। তবে শুরুর সময়ে ব্যাংকটিতে যে সুশাসনের যে অভাব হয়েছে তা কখনোই পূরণ হয়নি। বদলির ক্ষেত্রে নিয়মকানুন না মানায় তাতে সে অভাব দিনে দিনে আরো বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, রেষারেষি, আঞ্চলিকতার প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে রাকাবের বিরুদ্ধে। ফলে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে পারেনি ব্যাংকটি। আর রাজধানীর বাইরে প্রধান কার্যালয় হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি কম থাকায় নিয়মনীতির চর্চাও যেন কম হয়েছে। অবশ্য বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অংশবিশেষ ধরা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের শোকজ খেতে হয়েছে বহুবার। জরিমানাও গুনতে হয়েছে। সমস্যায় জর্জরিত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এ প্রতিষ্ঠানকে বেশি দূর টেনে নিয়ে যাওয়া যাবে না বিষয়টি উপলব্ধি করে সরকারও রাকাবকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ করার পরিকল্পনা করেছে। তবে সেটা বাস্তবায়ন হওয়াটা সময়সাপেক্ষ। তাই তার আগপর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুযায়ী, ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকসহ শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিন বছর পর পর বদলি হওয়ার কথা। তবে বদলির ক্ষেত্রে যে অনিয়ম হচ্ছে সে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হলেও তা মানছে না ব্যাংকটি। বরং বহালতবিয়তে কর্তৃত্ব জাহির করে চক্রটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ও রাকাবের কর্মী বিবরণীর তথ্যে বদলির ক্ষেত্রে যে অনিয়ম হয়েছে তা স্পষ্ট দেখা গেছে। ব্যাংকটির ১৮টি জোনাল কার্যালয়ের (ঢাকা করপোরেট শাখাসহ) মধ্যে অন্তত ১০টি জোনাল কার্যালয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির ঘটনা ঘটেছে। আর এসব বিষয়ে প্রমাণ পেয়ে ৫৬ জন কর্মকর্তাকে বেশি সময় থাকা কর্মস্থল থেকে বদলির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দেয়। তবে তা-ও মানেনি রাকার কর্তৃপক্ষ। অবশ্য এর মধ্যে কয়েক জন চালাকি করে নামেমাত্র দুই থেকে তিন মাস অন্য শাখায় কাজ করে পুনরায় আগের জায়গায় ফেরত এসেছেন।
তথ্যমতে, ৩ থেকে ১০ বছরের বেশি সময়ে কর্মরতদের মধ্যে: প্রধান কার্যালয়ে শওকত শহিদুল ইসলাম, রনজিৎ কুমার সেন, মজনুর রহমান, আবুল কালাম (ডিজিএম), মো. মোক্তারুজ্জামান ও নাহিদ আফসান (এজিএম), মুকুল কুমার বর্ধন, মোস্তাক হাসান, মো. জামিল, আব্দুল মালেক (এসপিও), জোবায়দা নাসরিন ও শিরিন আফরোজ (বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়) রয়েছেন।
রাকাবের নিজস্ব কাগজপত্রেই দেখা গেছে, একসময়ের নিম্নমান সহকারীরা এখন অনেক শাখা ও বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। প্রধান কার্যালয়ের কর্মী-ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বে থাকা রনজিৎ কুমার সেন, কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগের মজনুর রহমান, আইন বিভাগের মো. মোসাদ্দেক হোসেন (ডিজিএম) কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ১৯৮৪ সালে নিম্নমান সহকারী হিসেবে। এর মধ্যে মোসাদ্দেক হোসেন বিভাগীয় মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বেও ছিলেন।
বদলি বিষয়ে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মান্নান ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে বদলির কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ৫৬ জনের বদলির যে নির্দেশনা আছে তার ৯০ শতাংশই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পুরোটা বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগছে। রাতারাতি সব নির্দেশনা মানা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
