ঢাকা খুব কাছে, খুব দূরে

আপডেট : ০১ জুন ২০১৯, ১৮:০১

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ঢাকার মানুষের অতিথেয়তার কোনো তুলনা নেই। প্রতি সন্ধ্যাবেলাতেই দাওয়াত, নিমন্ত্রণ। আর তা মানেই বিশাল আয়োজন, অন্তত দশ রকম পদ। শুধু চাখতে-চাখতে উদরপূর্তি হয়ে যায়, এর কয়েকদিন পর খাদ্য সম্পর্কে ভীতি জন্মে যায়। তবে ঢাকার লোকের কলাকাতা সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা আছে

কলকাতা থেকে পাখি ওড়া দূরত্ব, একশ’ মাইলেরও বেশি হবে না বোধ হয়। মোটর গাড়ির দূরত্বে দুশো কুড়ি-পঁচিশ মাইল। অথচ মনে হয় যেন কতদূরে। ভারতীয় সংবাদপত্র, বেতারে, দূরদর্শনে বাংলাদেশের সংবাদ থাকে ক্কচিত্-কদাচিত্, সেই খবরও ঝড়ে লঞ্চ ডুবির বা রাজনৈতিক ওলটপালটের। বাংলাদেশের প্রচার মাধ্যগুলোতেও ওই একইরকম ভারতীয় সংবাদ অতি নগণ্য, যা থাকে তাও দাঙ্গা বা রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির। এর নাম ঐতিহাসিক নিয়তি।

সম্পূর্ণ নিজেস্ব উদ্যোগে বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম। যাঁরা বেড়াতে ভালোবাসে তাঁরা পৃথিবীর যেকোনো দেশেই কিছু না কিছু দর্শনীয় বস্তু পেতে পারে। কিন্তু একটা মুশকিল হয় এই যে, অন্য দেশে গিয়ে অনবরত বিমাতৃভাষা বলতে বলতে চোয়াল ব্যথা হয়ে যায়। সেই হিসেবে আমার পক্ষে ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশ অতি প্রকৃষ্ট স্থান, সেখানে প্রকৃতি অতি ঐশ্বর্যময়ী এবং সাংস্কৃতিক আবহাওয়া আমাদের কাছে সাবলীল লাগে। বাংলাদেশের নাবিকরাও বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে একবার অন্তত কলকাতায় ঘুরে যেতে চান, সম্ভবত ওই একই কারণে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা অতি জীবন্ত ও স্পন্দমান শহর। কলকাতার ছড়ানো বিশালত্ব সহসা চোখে পড়ে না। সেই তুলনায় ঢাকা শহর ছোট হলেও এর নতুন সৌন্দর্য প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রাস্তাগুলো চওড়া-চওড়া এবং পরিষ্কার, খানাখন্দ নেই এবং সন্ধ্যার পর ঢাকা শহর যতখানি আলোয় ঝলমল, ততোখানি আলো এখন নেই কলকাতায়। পশ্চিম বাংলার অনেকেরই ঢাকা শহর মুখস্থ, অনেকেরই বাল্য-কৈশোর কেটেছে ঢাকা কিংবা আশেপাশের এলাকায়। তাঁরা কিন্তু এতদিন পর ঢাকা শহর দেখলে চিনতে পারবেন না। বুদ্ধদেব বসুর রচনার বর্ণিত ঢাকা শহরও এখন খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত।

কলকাতার তুলনায় ঢাকায় সংবাদপত্রের সংখ্যা অনেক বেশি। কলকাতা ছাড়া পশ্চিমবাংলার আর কোনো জায়গা থেকে খবরের কাগজ বিশেষ বেরোয় না। কিন্তু ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বড় শহর থেকে দৈনিক কাগজ বেরোয়। আমাদের দৈনিক সংবাদপত্রে সাহিত্যের জন্য আলাদা পৃষ্ঠা যেমন লোপ পেতে বসেছে, সেই তুলনায় ওদেরগুলোতে সিংহভাগ বরাদ্দ থাকে। ওদের কোনো কোনো লেখকের সাক্ষাত্কার ফলাও করে ছাপানো হয়।

ঢাকায় আছে শিশুদের জন্য আলাদা উদ্যান, সেখানে বিশাল মেরি গো রাউন্ডটি বহুদূর থেকে চোখে পড়ে। সেটি দেখলে বড়দেরও চাপার লোভ হবে। এছাড়া আছে ‘শিশু একাডেমি’। সেখান থেকে ছোটদের জন্য চমত্কার চমত্কার রঙিন বই প্রকাশ হচ্ছে কম দামে। আরো দুটি প্রধান একাডেমি আছে ঢাকা। তার মধ্যে ‘শিল্পকলা একাডেমি’র কথা কলকাতার অনেকেরই অজানা, বাংলাদেশের শিল্পসামগ্রী সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়েছে এরা। আরেকটি ‘বাংলা একাডেমি’, এই নামের সঙ্গে আমরা অনেকেই আগে থেকে পরিচিত।

ঢাকার মানুষের অতিথেয়তার কোনো তুলনা নেই। প্রতি সন্ধ্যাবেলায় দাওয়াত, নিমন্ত্রণ। আর তা মানেই বিশাল আয়োজন, অন্তত ১০ রকম পদ। শুধু চাখতে-চাখতে উদরপূর্তি হয়ে যায়। এর কয়েকদিন পর খাদ্য সম্পর্কে ভীতি জন্মে যায়। তবে ঢাকার লোকের কলকাতা সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা আছে। তাঁরা ভাবে কলকাতায় বুঝি মাছ একেবারেই পাওয়া যায় না। আসলে কলকাতায়ও ভালো ভালো মাছ পাওয়া যায়।

ঢাকায় কী খারাপ কিছু নেই বা সমালোচনা করার মতো? আছে নিশ্চয়ই, কারণ ঢাকা শহর তো আর স্বর্গ নয়, কিংবা স্বর্গে গেলেও নিশ্চয়ই অনেক দোষ ধরা যাবে।

 

১৭ নভেম্বর ১৯৭৯, দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত