সামপ্রতিককালে বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন পরিস্থিতি, স্বাস্থ্যবিধি ও দরিদ্রতা নিয়া বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে। তাহাতে বলা হইয়াছে যে, অনিরাপদ পানি পান করিতেছে এই দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৬ কোটিরও বেশি। তাই বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনকে আমলে নিলে বলিতে হয়, কেননা এই দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ নিরাপদ পানি হইতে বঞ্চিত। তবে এই কথাও সত্য যে, দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির অভাব যেমন আছে, তেমনি গত এক দশকে এই ব্যাপারে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাও বিদ্যমান। এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ২০০ বত্সর আগেও ঢাকায় ‘সারফেস ওয়াটার’এর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হইত। এমনকি কয়েক দশক আগেও মানুষ কুয়া, নদী-নালা, পুকুর-জলাশয় প্রভৃতি উত্স হইতে পানি ব্যবহার করিত। কিন্তু ষাটের দশক হইতে হঠাত্ গ্রাউন্ড ওয়াটারের ব্যবহার বাড়িয়া যায়। কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের মহামারির কারণে এই প্রবণতা দেখা দেয়। কিন্তু বর্তমানে কলেরা নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও দূষিত পানি বিশুদ্ধ করিবার বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক উপায় হাতের নাগালে। ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহারের পদ্ধতি হিসাবে যখন টিউবওয়েলের প্রচলন হইল, তখন আর্সেনিকসহ দেখা দিল নানা সমস্যা। ইহার পর ডিপ টিউবওয়েলের যুগে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর এতটাই নিচে নামিতে থাকিল যে, তাহা গ্রীষ্মকালে বিশুদ্ধ পানির অভাবকে আরো বাড়াইয়া দিল। এইজন্য এখন আবার সারফেস ওয়াটার বা ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারের প্রতি জোর দিতেছেন সকলে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, বাংলাদেশের ৪১ শতাংশ পানির উত্সগুলিতে রহিয়াছে ক্ষতিকারক ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া। পাইপের মাধ্যমে বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা পানিতে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি প্রায় ৮২ শতাংশ। আর টিউবওয়েলের পানিতে আছে ৩৮ শতাংশ। এই ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলি ও অন্ত্রের প্রদাহের জন্য বহুলাংশে দায়ী। অন্যদিকে আমাদের ১৩ ভাগ পানিতে রহিয়াছে আর্সেনিক। প্রতিবেদনের সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ হইতে দেখা যায়, দূষিত পানি ব্যবহারের সঙ্গে দারিদ্র্যের একটি সম্পর্ক বা সংযোগ রহিয়াছে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন বিশুদ্ধ পানির ব্যাপারে সচেতন এবং তাহারা এইজন্য বাড়তি অর্থকড়ি ব্যয় করিতে প্রস্তুত। পক্ষান্তরে, গরিবদের মধ্যে এই ব্যাপারে সচেতনতা কম। আমরা জানি, নিম্নমানের পানি কার্যক্ষমতা হ্রাস করে। ইহা শিশুর অপুষ্টির জন্যও দায়ী। এইজন্য যেইসব দরিদ্র অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির অভাব রহিয়াছে, সেইখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা আবশ্যক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিভিন্ন টার্মিনাল ও কর্মক্ষেত্রে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বাড়ানো ও পয়ঃনিষ্কাশনের উত্তম ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। জাতীয় বাজেটে এই ব্যাপারে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা দরকার।
দূষিত পানির কারণে শুধু ডায়রিয়া, টাইফয়েড বা আমাশয়ই নহে, আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, ইহার কারণে ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভার রোগ ও গ্যাস্ট্রিকসহ ত্বকের নানা রোগও হয়। অতএব, নিরাপদ পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আমাদের অধিক গুরুত্ব দিতে হইবে। এইজন্য শিল্পাঞ্চল ও আবাসিকসহ সব এলাকায় জলাধার সৃষ্টির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদ-নদীর ড্রেজিং, লবণাক্ত ও পুকুরের পানি ফিল্টার করা, পুকুর ও গভীর কূপ খনন এবং বর্জ্য ও দূষিত পানি নিষ্কাশনসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
