রাশিয়া-ইউক্রেন উত্তেজনা

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৩২

নতুন করে রাশিয়া ইউক্রেন উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো দাবি করেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনের ভূখণ্ডে যেকোনো সময়ে হামলা চালাতে পারে। এ অবস্থায় ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীকে সশস্ত্র অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য সেখানে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে। অতি সম্প্রতি ক্রিমিয়া উপদ্বীপের কার্চ প্রণালীতে ইউক্রেনের নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ রাশিয়া জোরপূর্বক দখল করে নেয়। সেই কারণে রাশিয়া-ইউক্রেন উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইউক্রেনের এ পদক্ষেপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকে এ ঘটনার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যা ঘটছে তা তার পছন্দ নয়। পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও জাহাজ দখল করার ঘটনার নিন্দা করে বলেছেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। নিকি হ্যালিও বলেছেন, রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাসমূহ অব্যাহত রাখার সুপারিশ করেন। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলের প্রতিবাদে ২০১৪ সালে এই অবরোধ আরোপ করে। রাশিয়ার সম্প্রসারণবাদী এসব কার্যক্রমের প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিশ্ব। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড ও কানাডা রাশিয়ার এই হস্তক্ষেপের নিন্দা করেছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানও রুশ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। জার্মানি এই সংকট নিরসনে রাশিয়া ইউক্রেন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আহবান জানিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উদূ্ভত পরিস্থিতির জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছে। ক্রেমলিন এক বিবৃতিতে বলেছে, কিয়েভের পদক্ষেপসমূহ উদ্বেগজনক। মস্কো ইতোমধ্যে বার্লিনকে ঘটনাপ্রবাহ অবহিত করেছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন চ্যান্সেলর মার্কেলের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।

২০১৪ সালের ক্রিমিয়া দখলের পটভূমিতে রাশিয়া-ইউক্রেন প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ অবস্থার মুখোমুখি রয়েছে। গত ২৫ নভেম্বর কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরের সংযোগকারী কার্চ প্রণালীতে ইউক্রেনের তিনটি যুদ্ধ জাহাজ জব্দ করে রুশ নিরাপত্তা বাহিনী। এ ঘটনায় সতত রুশবিরোধী ইউক্রেনের জনগণ ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। তারা রাতভর রাজধানী কিয়েভে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এসময় তারা রুশ দূতাবাসে একটি গাড়িও পুড়িয়ে দেয়। জনগণের এই ক্ষোভের সঙ্গে সঙ্গতি জানিয়ে প্রেসিডেন্ট পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য সামরিক শাসন জারির আদেশে স্বাক্ষর করেন। দেশটির পার্লামেন্ট রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে পরবর্তী ৩০ দিনের জন্য সামরিক শাসন জারির জন্য অনুমোদন দেয়। ইউক্রেন অভিযোগ করেছে, রাশিয়া অন্যায়ভাবে জাহাজগুলি জব্দ করেছে। সামরিক শাসন জারির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের জন্য সামরিক আইন জারি করা জরুরি। তিনি আরো বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডে হামলা চালাতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০১৪ সালের সংঘাতের পর ইউক্রেনের রুশসংলগ্ন এলাকায় প্রায় যুদ্ধ অবস্থা বিরাজ করছে। রাশিয়া ইউক্রেনের রুশ-বংশোদ্ভূত নাগরিকদের সমর্থনে সীমান্ত হামলা অব্যাহত রেখেছে। প্রেসিডেন্ট সামরিক আইন জারি করে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। পুতিন নিজে অভিযোগ করেছেন যে, সামরিক আইন জারির উদ্দেশ্য প্রতিরক্ষা নয় বরং আগামী মার্চে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট অবশ্য নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি নির্বাচন পিছাবেন না। ইউক্রেনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সামরিক আইন জারি করা হলে বিক্ষোভ দমন, সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচন স্থগিতের ক্ষমতা পাবে দেশটির সরকার। জনগণ কেবল সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় কার্যাদি সম্পাদনের অধিকার ভোগ করবে।

কৃষ্ণসাগরের সঙ্গে আজভ সাগরের সংযোগকারী কার্চ প্রণালী দিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের জাহাজগুলো চলাচল করে। ইউক্রেনের নৌবাহিনীর জাহাজ ৩টি জব্দের পর রাশিয়া ঐ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। পরে অবশ্য রুশ নিরাপত্তা বাহিনী কার্চ প্রণালী খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইউক্রেনের নৌবাহিনী অভিযোগ করে যে, রুশ নৌবাহিনী প্রথমে তাদের জাহাজগুলো লক্ষ্য করে গোলা ছোঁড়ে। এই ঘটনায় ছয় সেনা আহত হয়। তাদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গোলা ছোড়ার পর জাহাজগুলো তীরে ভিড়িয়ে তল্লাশি চালায় রুশ নিরাপত্তা বাহিনী। আর রুশদের দাবি, জাহাজগুলো রুশ জলসীমা অতিক্রম করে বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়ে। গোলা ছোড়ার কথা স্বীকার করে রুশ নিরাপত্তা বাহিনী বলেছে, তাদের গুলিতে ইউক্রেনের তিনজন সৈনিক আহত হয়েছে। তাদের যথাযথ চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানায়, দেশটির মানবাধিকার কমিশন বলেছে, জব্দ করা তিনটি জাহাজ থেকে চব্বিশজন নাবিককে আটক করেছে রাশিয়া। বার্তা সংস্থা জানায়, রাশিয়ায় নিযুক্ত ইউক্রেনের একজন কূটনীতিককে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢুকতে দেখা যায়। রাশিয়া বরাবরই তাদের নিজস্ব জলসীমায় ইউক্রেনের অনুপ্রবেশের অভিযোগ করে আসছে।

এ ধরনের অভিযোগের পিছনে অবশ্য ২০১৪ সালের ঘটনাবলীর সংযোগ রয়েছে। ইউক্রেনের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে রুশ-বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর বসবাস। এরা চায় রাশিয়ার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক। অপরদিকে ইউক্রেনের সাধারণ জনগণ রুশবিরোধী। এর আগে যে সরকার ছিল তা ছিল রুশপন্থি। তারা ইউক্রেনকে পশ্চিমা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। রুশ না আমেরিকা—প্রভুত্বের এ দ্বন্দ্বে জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। ক্রিমিয়ার জনগণ সম্ভবত এ দ্বন্দ্বের ফল ভোগ করছে। গোষ্ঠীগত এ দ্বন্দ্বের অবসান না হলে ইউক্রেনের স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে। ইউক্রেনের জনগণের উচিত বাইরের হস্তক্ষেপমুক্ত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের উপাদান নিশ্চিত করা। বিভেদ নয়, ঐক্যই ইউক্রেনের জনগণের স্বাধীনতার গ্যারান্টি।

n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ