যেখানে থমকে যায় মেধাবীদের নান্দনিক প্রচেষ্টা

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৩৪

মানুষকে সুন্দরভাবে বাঁচতে শেখায় শিক্ষা। তাই প্রত্যেকটি দেশই শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদের স্বল্পতা থাকা সত্বেও শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ইউরোপের দেশগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি সাধনের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সারা বিশ্বকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করেছিল। একটি স্কুলের পরিচালনাপর্ষদের সদস্য হওয়ায় এবং নিজের সন্তান স্কুলগামী হওয়ায় আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণে আমার দৃষ্টিতে কিছু নৈরাজ্য বা অব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হচ্ছে যা না থাকলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী সত্যিকার অর্থেই ভার না হয়ে সম্পদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

প্রথম যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো, স্কুলগুলিতে শ্রেণিকক্ষের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা। আমি এমনও দেখেছি, ৫০ জন শিক্ষার্থীর ধারণক্ষমতা বিশিষ্ট শ্রেণিকক্ষে ৭০ থেকে ৮০ জন ক্লাস করছে। ফলে তাদেরকে শ্রেণিকক্ষে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতে হচ্ছে। গরমের দিনে শ্রেণিকক্ষ হিট চেম্বারে পরিণত হয়। এমন অবরুদ্ধ শ্রেণিকক্ষে ক্লাস করা ছাত্রের শিখনের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে এটাই স্বাভাবিক।

দ্বিতীয়ত কোচিং এবং প্রাইভেট টিউশনি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এগুলো ছাড়া শিক্ষার্থী কোনো কিছুই চিন্তা করতে পারে না। ফলে তাদের মধ্যে নিজে থেকে বই পড়ে শেখার ক্ষমতা একেবারেই তৈরি হচ্ছে না। তারা হয়ে পড়ছে কোচিং ও টিউশনিনির্ভর রোবটের মতো। এতে নিজস্ব চিন্তাশক্তি এবং বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না—যা পরবর্তী পর্যায়ে উচ্চশিক্ষায় নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। এটাও সুবিদিত যে কোচিং সেন্টারের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য বিশেষভাবে দায়ী। এই অশুভ শক্তির কাছে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায়ই হার মানছে। ফলে মান হারাচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। থমকে যাচ্ছে মেধাবীদের নান্দনিক প্রচেষ্টা।

তৃতীয়ত টিউশনি নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রায়শই শিক্ষার্থীদের মনকে ছোট করছে। তাদের আত্মবিশ্বাস অহরহই হুমকির মধ্যে পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ X টিচারের কাছে পড়া একজন ছাত্রকে Y টিচার বর্ণনামূলক প্রশ্নে কম নম্বর দিচ্ছে। এর কারণ প্রাইভেট টিউশনি নিয়ে X ও Y এর মাঝে রেষারেষি রয়েছে। অথচ এসব দেখার কেউ নেই।

চতুর্থত, পাঠ্যবইগুলোতে একই তথ্য বিভিন্ন বইয়ে ভিন্ন সংখ্যা বা ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। একটু সজাগ হলেই এই ধরনের ভুল থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি। উদাহরণস্বরূপ পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক বিজ্ঞান ও প্রাথমিক গণিত বইয়ে ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা যথাক্রমে ১৪ কোটি ৯৭ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ জন (পৃষ্ঠা নং-৯৩) এবং ১৪ কোটি ২৩ লাখ (পৃষ্ঠা নং-১৪৮) দেওয়া আছে। একটি নির্দিষ্ট বছরের আদমশুমারির দুইটি সংখ্যা হয় কী করে তা আমার বোধগম্য নয়। ছেলেকে ৯ম শ্রেণির সাধারণ গণিতের অঙ্ক করাতে গিয়ে দেখলাম চিত্রে ভুল রয়েছে। ১৬.২ অধ্যায়ের ১৬ নং অঙ্কের ২নং চিত্র সংশোধন প্রয়োজন। সঠিকটি একটি ট্রাপিজিয়ামের চিত্র হওয়া উচিত।

পঞ্চম বিষয়টি হলো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে জাতি কতটা পিছিয়ে পড়ে বিবেকবান মানুষ মাত্রই বুঝতে পারে। সরকারের অদম্য সদিচ্ছায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের নাগপাশ থেকে আমরা অনেকটা মুক্ত হয়েছি। কিন্তু এর পরেও কখনো কখনো জাতিবিধ্বংসী এই ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে পড়লে তদন্ত কমিটি হয়। তদন্ত শেষে উপচার্য মহোদয়ের নির্দেশক্রমে ২০১৮ সালেই পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। পুনঃ পরীক্ষার ফলাফলেই আসল এবং নকল ছাত্রের পার্থক্য বোঝা গেছে। ফাঁস না হওয়া প্রশ্নে যারা ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে তারাই প্রকৃত মেধাবী এবং দেশের ভবিষ্যত্ উন্নয়নে তাদের অবদানের দিকেই জাতি চেয়ে আছে। আমরা আশা করব ভবিষ্যতেও প্রশ্ন ফাঁস হলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই পুনঃপরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। এতে প্রশ্নফাঁসকারী চক্র যেমন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে, তেমনই প্রশ্ন কেনাতে অর্থলগ্নিকারীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে এই ভেবে যে তার প্রশ্ন কেনার টাকা সম্পূর্ণরূপে বিফলে যেতে পারে। তা ছাড়া প্রশ্ন ফাঁসকারীদের শাস্তির ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষকে হতে হবে আন্তরিক।

১৬ কোটি মানুষের এই ছোট্ট দেশে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরে সুষ্ঠু, সুন্দর ও কলুষমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। প্রাকৃতিক সম্পদের বিচারে আমরা রয়েছি ঘাটতির মধ্যে। একমাত্র জনসংখ্যাতেই আমাদের প্রাচুর্য রয়েছে। তাই জনসংখ্যার উন্নয়নে শিক্ষা বিষয়ক সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে দেশ পৌঁছে যাবে উন্নতির কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। শিক্ষার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় শুধু সরকারি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়—দরকার সর্বস্তরের মানুষের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ও দেশের প্রতি সুদৃঢ় ভালোবাসা।

n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭