বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘মা বলেছিলেন, বুলেট যেন তোমার পেছনে না লাগে’

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২২, ০২:৩০

‘আমার মা ছিলেন টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যাপক। ২৬ মার্চ সকালে ঢাকার ভয়াবহ অবস্থা দেখার পর বাসায় ফেরার পথে মা আমাকে বললেন, তোমাদের মতো যারা তরুণ তাদের কী করা উচিত? তখন আমি বললাম, আমরা প্রতিশোধ নেব।

তিনি বললেন, আমি তো তোমার কাছে এটাই শুনতে চাইছি। প্রতিশোধ নিতে হলে তোমাকে যুদ্ধ করতে হবে। আর যুদ্ধটা ফ্যান্টাসি না। তুমি তোমার মস্তিষ্কে ধরে রাখো, আমি যুদ্ধ করব। সবচেয়ে বড় হলো তোমাদের সাহস। যদি যুদ্ধে যাও তবে বীরের মতো যুদ্ধ করবে। যদি তোমাকে মরতেই হয় তবে বীরের মতো মরবে। বুলেটটা যেন তোমার পেছনে না লাগে। আর যদি যুদ্ধ শেষে ফিরে আসতে হয়, তবে বীরের মতো ফিরে এসো।’

ইত্তেফাকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এভাবেই বলছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) ওয়াকার হাসান বীরপ্রতীক। দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর ধরে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘আমার মামা ছিলেন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে। তার নাম সোলায়মান। তিনি ও আমি হেঁটে হেঁটে ঢাকা থেকে বের হয়ে গেলাম। গুলিস্তান হয়ে কাঁচপুরে নদী পার হয়ে চলে গেলাম নরসিংদী। ওখান থেকে লঞ্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়ে পৌঁছালাম ৯ এপ্রিল। ওখানে একটা কমিউনিটি সেন্টারে মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুট হচ্ছিল। ওখানে যোগ দিলাম। তবে আমরা আলাদা হয়ে গেলাম। কারণ তখন তিন ভাগ করা হচ্ছে সবাইকে। মামা যেহেতু আগেই নৌবাহিনীতে ছিলেন তিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাই তিনি এক ভাগে, এক ভাগে আমার মতো ছাত্ররা আর বাকিরা অন্য ভাগে। তারপর আমাদের মোট ৩০ জনকে একটি বাসে উঠিয়ে তেলিয়াপাড়ায় পাঠানো হলো। তেলিয়াপাড়া পৌঁছে বাস থেকে নেমে দেখি, বহু সেনা। জিগ্যেস করলাম এরা কারা। বলল, সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। তখনো সেক্টর গঠন হয়নি। মেজর সফিউল্লাহ আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ডেকে বললেন, তোমরা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো। তোমাদের এত ট্রেনিং লাগবে না। তোমরা খুব সহজেই কৌশল রপ্ত করতে পারবে। আর যুদ্ধ হলো একটা আর্ট। তারপর আমাকে ১০ জনের একটা সেকশন দেওয়া হলো। চার দিনের ট্রেনিং দেওয়া হলো আমাদের। চার দিন পরে আমাকে একটা প্লাটুনের দায়িত্ব দেওয়া হলো। ওখানেই প্রথমে আমরা যুদ্ধ করলাম।

 ‘একদিন হেলাল মোর্শেদ আমার মতো পাঁচ জন ছাত্রকে দিয়ে পাঁচটি দল তৈরি করলেন। এটি এপ্রিল মাসের ২১-২২ তারিখের কথা। তারপর আমরা রেকিতে বের হলাম। কোন জায়গায় অ্যামবুশ করলে আমরা বড় ধরনের আঘাত করতে পারব। আমরা একটা পাহাড়ি রাস্তা দেখে ঠিক করলাম। রাস্তাটা এমন ডান পাশ দিয়ে গেলে বাম পাশ সরাসরি দেখা যায় না। কিন্তু আমরা যারা পজিশনে থাকবো আমরা তাদের দেখবো। আমরা যখন রেকি করতাম দেখতাম সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে পাকিস্তানিদের চার-পাঁচটা ট্রাক সিলেট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে যায়। ঠিক হলো, কোথায় আমরা অ্যান্টি পারসোনাল মাইন পাতব। ওরা মাইনে এসে পড়লে আমরা অতর্কিত হামলা করব। তো যেদিন আমরা অপারেশন করব সেদিন ভোরবেলা আমরা অ্যামবুশের জন্য পজিশন নিয়ে নিলাম। আমাদের অবস্থান ছিল রাস্তা থেকে ১০ ফুট ওপরে।’

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘সেদিন ৯-১০টার মধ্যে তারা এলো না। আমরা ভাবলাম পরিকল্পনার কথা জেনে গেল নাকি! ঠিক তখন অবজারভেশন পোস্টে থাকা আমাদের দুজন সংকেত দিল ওরা আসছে। বেলা ১১টা হবে। ওরা বলল, পাঁচটা ট্রাক আর একটা জিপ আসছে। আমাদের সিদ্ধান্ত হয়েছিল মাইনটার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় মাইন বিস্ফোরণ হলে লেফটেন্যান্ট হেলাল মোর্শেদ প্রথমেই ফায়ার শুরু করবেন। তারপর আমরা শুরু করব। মাইনের ওপর দিয়ে জিপটা চলে গেল। জিপের মধ্যে একজন অফিসার। আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা তখনো ফায়ার করলাম না। কারণ তখনো মাইনটা বিস্ফোরিত হয়নি। এরপর একটা এক টনের ট্রাকও চলে গেল। চাকাটা মাইনের ওপর পড়ল না। তারপর এলো বড় একটি ট্রাক। ঐ ট্রাকে ৩০-৪০ জন পাকিস্তানি সেনা ছিল। বাজ পড়ার শব্দের মতো বিকট শব্দে একটি মাইন বিস্ফোরিত হলো। ঠিক একই সময় আরো দুটি মাইন বিস্ফোরিত হলো। আমরা দেখলাম, ট্রাকটা ১০-১৫ ফুট ওপরে উড়ে গেছে। তখনই আমাদের দুই পাশ থেকে প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ শুরু হলো। এর পেছনে আরেকটি ট্রাক ছিল, আমরা সবাই সেটার ওপরও প্রবল গুলিবর্ষণ শুরু করলাম। বাসটাও মাইনের ওপর গিয়ে পড়ল।

‘আমাদের লক্ষ্য ছিল পাঁচ-সাত মিনিট আমরা আক্রমণ করব। কিন্তু অ্যামবুশের সাফল্য দেখে আমরা ভুলেই গেছি আমাদের ফেরত যেতে হবে। এরপর দেখলাম পেছন দিক থেকে আরো দুটি ট্রাক আমাদের দেখে পেছনের দিকে ঢুকে গেল। আমরা বুঝতে পারলাম ওরা আমাদের পেছন দিক থেকে ধরবে। তখন লেফটেন্যান্ট হেলাল মোর্শেদ নির্দেশ দিলেন, এবার পিছু হটো। তখন আমরা যে যেদিক থেকে পারি তেলিয়াপাড়া ক্যাম্পের দিকে ফিরে গেলাম। আসার পরে মেজর সফিউল্লাহ আমাদের জিগ্যেস করলেন কত জন হতাহত হয়েছে? তখন আমরা বললাম যথেষ্ট হয়েছে। আমাদের ধারণা ছিল, প্রায় সবাই মারা গেছে। ঘটনার তিন-চার দিন পরে চা-বাগান খুললে ফিরে এলো কুলিরা। তারা বলল, তারা গুনে গুনে ৫৪টা লাশ তুলেছে।’

এরপর ফাস্ট ওয়ারকোর্সে যোগ দিয়ে মূর্তিতে চলে গেলেন এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ‘ট্রেনিং শেষে আমাকে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলে পাঠানো হলো। আমাকে একটা প্লাটুনের দায়িত্ব দেওয়া হলো। আমি হলাম ডেলটা কোম্পানিতে একটি প্লাটুনের কমান্ডার। তখন নিয়মিত যুদ্ধ শুরু করলাম। একের পর এক অ্যামবুশ করলাম। এ সময় আমরা শ্রীমঙ্গলে গিয়ে একটা দারুণ অপারেশন করলাম। এভাবে যুদ্ধ চলতে চলতে নভেম্বর মাস চলে এলো। তখন বলা হলো, এখন থেকে কনভেনশনাল যুদ্ধের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তৈরি। আর গেরিলা যুদ্ধ নয়, এখন হবে সম্মুখযুদ্ধ। তখন আমরা ভারতে। আমরা থাকতাম আম্বাশা পাহাড়ে। ওখান থেকে বাংলাদেশে ঢুকে ঢুকে অপারেশন করতাম তারপর আবার ফিরে যেতাম।

‘আমরা জকিগঞ্জ দখল করেই চারগ্রাম আটগ্রাম দখল করলাম। তারপর আমরা সুরমা নদীর পাশে এসে ডিফেন্স নিলাম। সেখানে এক অপারেশনে আমাদের ফায়ারে সাত-আট জন মারা গেল। তখন সামনের সৈন্যরা ঘুরে গিয়ে হাত উঁচু করে আত্মসমর্পণ করল। আমরা জীবিত অবস্থায় ২৬ জনকে আটক করলাম। আমাদের মোট ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হয়েছেন এই যুদ্ধে।’ এভাবে বহু যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

ইত্তেফাক/ইউবি